মূর্তি রহস্য

কৌশিক কারক, আকাশ চন্দ, উৎস ভট্টাচার্য

একটা আস্ত দলা পাকানো মাংসপিণ্ড। কাঠ কয়লার মতো কুচকুচে কালো। হাত, পা, গলা, নিতম্ব বা স্তনের অবয়ব স্পষ্ট হলেও মুখ, চোখ, নাকের আকৃতি আর বোঝা যাচ্ছে না। মাছি ভনভন করে উড়ে বেড়াচ্ছে সেটার চারিপাশে। তীব্র বমন উদ্রেককারী পোড়া মাংসের গন্ধ যেন ম ম করছে আশেপাশের বাতাসে। অদূরে পড়ে রয়েছে ছেঁড়া সাদা ওড়না এবং কমলা রঙের সালোয়ারটার ফালাফালা করা আধ—পোড়া অবশিষ্টাংশ। তারও কিছু দূরে পড়ে একটা স্কুল—ব্যাগ এবং একটি দোমড়ানো মোচড়ানো মেয়েদের সাইকেল। মুরারীপুর গ্রামের প্রায় সকল গ্রামবাসীই জমায়েত হয়েছে গ্রামের শেষাংশের জঙ্গলাকীর্ণ এই স্থানে, যেখানে আজ সকালে পাওয়া গিয়েছে এই গাঁয়েরই এক নিম্ন—মধ্যবিত্ত পরিবারের ষোল বছরের তরুণী সবিতার ধর্ষিত এবং দগ্ধ মৃতদেহ! গাঁয়ের আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে সবিতার পিতা মাতার কণ্ঠ থেকে প্রতিধ্বনিত হয়ে চলেছিল তাদের একমাত্র সন্তানকে এমন ভয়ঙ্করভাবে হারানোর শোক,

—''ওরে সবি রে!...তুই এইভাবে আমাদের কেন ছেড়ে চলে গেলি মা...কে করল তোর এত বড়ো সর্বনাশ?''

উন্মাদপ্রায় সেই দম্পতিকে সান্ত্বনা দিতে চেষ্টা করছিল গাঁয়ের পরিচিত আর পাঁচটা মানুষ, কিন্তু সবিতার মা—বাবা ক্রমাগত মাটিতে মাথা ঠুকে বলে চলেছিল। —''আমাদের বিচার চাই...বিচার!...যারা সবির এই অবস্থা করেছে তাদের প্রত্যেকের ফাঁসি চাই।''

বৃথাই ওরা বিচার পাবে বলে ওদের সান্ত্বনা দিতে লাগল বাকি গ্রামবাসীরা, কারণ সকলেই জানে যে এই গ্রামে মেয়েদের ওপর ঘটে চলা এমন অপরাধ নতুন কোন ঘটনা নয়। ফাঁসি তো দূরের কথা, অপরাধীদের দু—এক মিনিটের হাজত বাসও হবে কিনা সন্দেহ, কারণ...

নিজের প্রিয় বান্ধবী সবিতার পোড়া লাশটার দিকে নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল এই গাঁয়ের আরেক তরুণী, লক্ষ্মী। এখনো যেন সে ভাবতেই পারছে না যে কাল সকালেও যে হাসিখুশি মেয়েটা ওর সাথেই স্কুলে গিয়েছে, টিফিন ব্রেকে বাড়ি থেকে লুকিয়ে নিয়ে আসা কুলের আচার খাইয়েছে, এমনকি গণিতের ক্লাস—টেস্টে দুটো ঐকিক নিয়মের অঙ্ক অবধি স্যারের চোখ এড়িয়ে তাকে দেখিয়েছে...সে আজ শুধুমাত্র একটা লাশ! একটা পোড়া মাংস—পিণ্ড! না, সবিতার মা বাবার মতো কাঁদতে ইচ্ছা করছে না লক্ষ্মীর, কারণ তার চোখে যেন জ্বলছে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার দুর্দমনীয় ইচ্ছার আগুন! সে খুব ভালো করেই জানে কি হয়েছিল সবিতার সাথে, কে করেছিল তার এই সর্বনাশ...কারণ গতকাল রাতে এই নৃশংস ঘটনাটা তার চোখের সামনেই ঘটেছে!...সে আর সবিতা একই স্কুলের দশম শ্রেণীর ছাত্রী। গতকাল স্কুল থেকে ফিরে ওরা ইংরেজি টিউশন পড়তে গিয়েছিল। সেখান থেকে ফিরতে ফিরতে বেশ রাত হয়ে গিয়েছিল, তাই ভয় লাগলেও শর্টকাটে বাড়ি ফিরতে ওরা বেছে নিয়েছিল এই ঝোপঝাড়ে ভরা জায়গাটা। দুজনেই যতটা সম্ভব জোরে সাইকেল চালাচ্ছিল। কিন্তু তাও বোধহয় শেষ রক্ষা হল না, অন্ধকারের মধ্যেই ওদের পথ আগলে দাঁড়িয়েছিল ওরা...

* * *

অদ্ভুত দেখতে বটে মূর্তিটা। উচ্চতায় ছয় ইঞ্চির ছোটই হবে, কিন্তু তাও দেখলেই যেন ভয় লেগে যায়। পাথরের তৈরি ওটা, তবে খুব যে দামি কোন পাথর তেমন নয়। একটা বিকট দর্শন সিংহ, যেন হা করে সেটা সবাইকে গিলে খেতে চাইছে! আর তার ওপরে বসে আছেন কোন এক ভুঁড়ি ওয়ালা দেবতা, মুখের অভিব্যক্তি দেখে মনে হচ্ছে ভীষণ রেগে আছেন তিনি। তার মাথায় সুন্দর কারুকাজ করা মুকুট রয়েছে, এছাড়াও তার সারা গা নানাবিধ অলঙ্কারে সুসজ্জিত। তার ডান হাতে কেমন যেন ছাতার মতো একটা বস্তু, আর বাঁ হাতে রয়েছে কি যেন একটা ডিম্বাকৃতি বস্তু। তিনি কোলের কাছে ধরে আছেন ছোট্ট একটা প্রাণীকে...কি জানি ইঁদুর না কাঠ—বেড়ালি সেটা বোঝা মুশকিল। এটা কি কোন হিন্দু দেবতার মূর্তি? মনে তো হয় না...তাহলে হঠাৎ এটা এখানে থেকে পাওয়া গেল কিভাবে?

এই দেখুন, এত কথা বলতে গিয়ে আপনাদের আমার পরিচয়টাই দেওয়া হয়নি! আমার নাম শ্রীযুক্ত দেবনারায়ণ তালুকদার বয়স প্রায় পঞ্চান্নর কাছে, বিয়ে করিনি তাই আমার পরিবারে আর কেউ নেই। বলতে পারেন এই মুহূর্তে এই মুরারীপুর গ্রামের তালুকদার জমিদার বংশের একমাত্র জীবিত বংশধর বোধহয় আমিই! জমিদারির এখন আর কিছুই অবশিষ্ট নেই, শুধমাত্র এই জীর্ণ দুর্দশাগ্রস্থ জমিদার বাড়িটা ছাড়া। আমি অঙ্ক নিয়ে এম. এস. সি করলেও কখনো চাকরি করিনি। আমাকে জন্ম দিয়েই মা মারা যান, আমার যখন পাঁচ বছর বয়স তখন কর্কটরোগে আক্রান্ত হয়ে বাবা মারা যান। তাই ছোটবেলা থেকে মানুষ হয়েছি ঠাকুমা হরসুন্দরী দেবীর কাছে। শুনেছিলাম যে একদিন রাতে হঠাৎ আমার ঠাকুরদা রামনারায়ণ তালুকদার নিরুদ্দেশ হয়ে যান। হাজার চেষ্টা করেও তার কোন খোঁজ পাননি ঠাকুমা। আর আশ্চর্যজনকভাবে, আমার ঠাকুরদার বাবা ইন্দ্রনারায়ণের সাথেও এই এক ঘটনা ঘটে। তিনিও একদিন কাউকে কিছু না বলে কোথাও চলে যান, তারপর আর কখনো ফিরে আসেননি। যাইহোক, এই সব নিয়ে আর ভাবি না। আমি তো সশরীরে এখনো এই গ্রামের বুকেই নিঃশ্বাস নিচ্ছি। কলকাতার বাগবাজারে আমার একটা বড়সড় কাপড়ের দোকান আছে, আগে আমি নিজেই সেখানে বসতাম। কিন্তু ইদানিং শরীরটা ভালো না থাকায় ম্যানেজারের হাতে ব্যবসা ছেড়ে আমি এই গ্রামেই ফিরে এসেছি। দোকানের কর্মচারীদের মাইনে দেওয়ার পর ব্যবসার লাভের অংশ যেটুকু আমার কাছে আসে তা দিয়ে আমার দিব্যি চলে যায়।

হ্যাঁ, তা যে কথা বলছিলাম আর কি। এই গ্রামের দীঘির ওপারে আমাদেরই আরেকটি বাড়ি আছে। জমিদারি আমলে সেই বাড়িটা ছিল এই বংশের জমিদারদের বাগান বাড়ি। মানে প্রতিদিন সন্ধ্যা থেকেই ওখানে শুরু হয়ে যেত জলসা, মুজরা, মদ, গান, বাজনা ইত্যাদি আর রাতের দিকে জমিদার বাবুদের সুন্দরী বাঁধা মেয়েমানুষদের সাথে একটু ইয়ে...সে আর নতুন কি! তবে এখন ওই বাড়িটার অবস্থা আমার বসত বাড়িটার থেকেও খুব সঙ্গিন। তাই ওটাকে তুলেই দিলুম প্রোমোটারের হাতে। ওটাকে ভেঙে ওই স্থানে নতুন ফ্ল্যাট বাড়ি বানাবে সে। তাই চলছিল বাড়ি ভাঙার কাজ। সত্যিই বলতে পূর্বপুরুষদের এই স্মৃতিগুলোকে এইভাবে ধ্বংস হয়ে যেতে দেখা কষ্টকর, কিন্তু কোন উপায় নেই। এমন সময় একদিন দেখলাম প্রমোটার ছোঁড়া আমার কাছে এসে হাজির হল। ওই ছোঁড়া আমাকে বেশ সমীহ করেই চলে। সে তার ব্যাগ থেকে একটা কাগজে মোড়ানো কিঞ্চিৎ ভারী বস্তু আমার হাতে তুলে দিল। তারপর বলল,

—''কাকাবাবু, এই মূর্তিটা আপনাদের ওই বাড়ির একটা দেওয়ালের মধ্যে পোঁতা ছিল, তাই দেওয়াল ভাঙতে গিয়ে এটা পেলাম...কি জানি কোন ঠাকুরের মূর্তি এটা!...হয়তো আপনাদের কোন পূর্বপুরুষ এটাকে পুজো করতেন, তাই সোজা আপনার কাছেই নিয়ে এলাম!''

সে ওটাকে আমাকে দিয়ে চলে গেলে আমি কাগজের মোড়ক খুলে প্রথম দেখলাম এই মূর্তিটাকে!

আমাদের কুলপুরোহিত সদানন্দবাবুর বয়স প্রায় আশির কাছাকাছি। তার ছেলে কলকাতায় চাকরি করে, বৌমাকে নিয়ে সেখানেই থাকে। কিন্তু বাকি পূর্বপুরুষদের মতো সদানন্দবাবু এখনো আমাদের পারিবারিক ভগ্নপ্রায় রাধামাধবের মন্দিরে পূজা করেন। তার হয়তো এই সব ঠাকুর দেবতার সম্বন্ধে জ্ঞান থাকতে পারে, তাই মূর্তিটার সম্বন্ধে কৌতূহল হওয়ায় পরদিন সেটাকে নিয়ে গেলাম মন্দিরে। সদানন্দ বাবু সদ্য পূজা সেরে বেরোতে যাবেন, এমন সময় আমার সাথে তার দেখা হল। আমি তাকে মূর্তিটা দেখালে তিনি বেশ কিছুক্ষণ ধরে চেয়ে রইলেন সেটার পানে। তারপর বললেন,

—''দেখো বাবা দেবু, এটা কিসের মূর্তি তা আমি বলতে পারব না...তবে যতটা সম্ভব মনে হচ্ছে এটা কোন বৌদ্ধ দেবতার মূর্তি!''

—''সে কি! বৌদ্ধ দেবতার মূর্তি পাওয়া গেল আমাদের বাড়ি থেকে! আমরা তো জমিদারি পাওয়ার আগে থেকেই গোঁড়া হিন্দু...তাহলে এই দেবতাকে আমাদের বাড়িকে কে পূজা করত?''

—''তা আমিও জানি না বাবা...তবে আমি বলি কি, তুমি ওই মূর্তিটা নিজের কাছে রেখো না। ওটাকে নিয়ে গিয়ে গঙ্গায় বিসর্জন করে দাও। এই সব দেবতার মূর্তি মূলত নানা তন্ত্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত হয়, এরা খুব সাংঘাতিক। কি হতে কি হয়ে যায়!'' আমি ফিরেই আসছিলাম, তখন আমাকে ডেকে তিনি প্রসঙ্গ পাল্টে আবার বললেন,

—''আরে খবর শুনেছো!...গাঁয়ের রতন চাষির মেয়ে সবিতাকে কারা যেন কাল রাতে ধর্ষণ করে পুড়িয়ে মেরেছে!...ছি ছি ছি, কি হচ্ছে এই গ্রামে বলো তো!''

—''হ্যাঁ আমিও শুনেছি খবরটা...মেয়েটা খুব ভালো ছিল জানেন। ও আর ওর বান্ধবী লক্ষ্মী আমার কাছে আসতো অঙ্ক পড়তে!''

—''এই নিয়ে এই গ্রামের এটা চার নম্বর কেস, এদিকে এখনো কারোর বিরুদ্ধেই কোন আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি!...আর বেশিদিন চললে হয়তো আবার এমন ভয়ঙ্কর অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার ভার তুলে নেবেন স্বয়ং ঈশ্বর...তখন আবার পুনরাবৃত্তি হবে অতীতের!''

উত্তেজিত হয়ে এত কথা বলে ফেলে পরে যেন কিছু একটা গোপন করার জন্য চুপ করে গেলেন সদানন্দবাবু। কিন্তু আমি ছাড়বার পাত্র নই, সটান তাকে জিজ্ঞাসা করলাম,

—''কোন শাস্তির কথা বলছেন আপনি? আর কোন অতীতেরই বা পুনরাবৃত্তি হোক এমন চাইছেন?''

* * *

সেদিন রাতে বিছানায় শুয়ে ছটফট করছিল লক্ষ্মী। বারবার সবিতার মায়া ভরা মুখটা যেন ভেসে আসছিল তার চোখের সামনে। সেদিন টিউশন থেকে ফিরতি পথে ওই জঙ্গলটার ধারে ওদের পথ আগলে দাঁড়িয়ে ছিল সুকুমার, পরেশ, কিংশুক আর সমীর। এরা সবাই এই গ্রামের মস্তান গোছের যুবক। তবে এটা তাদের একমাত্র পরিচয় নয়, তাদের আরো বড় পরিচয় হল যে তারা সকলেই স্থানীয় এম.এল.এ. মন্টু বসাকের দলের লোক। সেই পরিচয় ভাঙিয়েই তারা ইচ্ছামতো এই গ্রামের মেয়ে বউদের ক্রমাগত নিজেদের শিকার বানিয়ে চলেছে। সবিতার আগেও এমন ন্যক্কারজনক ঘটনা ওরা আরো ঘটিয়েছে, এবং বলাবাহুল্য এই মন্টু বসাকের প্রভাবে তাদের পুলিশ প্রশাসন ছুঁতে অবধি পারেনি। সবাইকেই পয়সা দিয়ে কিনে নিয়েছে যেন লোকটা। কোন গ্রামবাসী ওদের বিরুদ্ধে থানায় কমপ্লেন জানানো তো দূর, ওদের দিতে আঙ্গুল তুলে কথা বলার অবধি সাহস পায় না। সকলেই জানে যে ওদের বিরুদ্ধে মুখ খুলবে, সে—ই হবে ওদের পরবর্তী শিকার।

খ্যাক খ্যাক করে হাসতে হাসতে ওরা এগিয়ে এসেছিল লক্ষ্মী আর সবিতার কাছে, সকলেরই মুখে মদের গন্ধ, চোখে কামের আগুন! তারপর সবিতার হাতটা জাপটে ধরে সমীর বলেছিল,

—''কি রে হারামজাদী। সেদিন তোকে খুব ভদ্রভাবে জানিয়েছিলাম মনের কথা...যে তোকে আমার ভালো লাগে তোকে বিয়ে করতে চাই কিন্তু তুই ভরা বাজারে সকলের সামনে আমার গালে চড় মেরেছিলি, তাই না? আজ তুই বুঝবি, মাগী...যে আমরা অভদ্র হলে কি করতে পারি?''

ওরা সবিতাকে সাইকেল থেকে নামিয়ে পাঁজাকোলা করে তুলে এনে মাটিতে রেখেছিল। ওর চিৎকার করেও কোন লাভ হয়নি। লক্ষ্মী ছুটে এসেছিল ওদের দিকে। নিজের গায়ে যেটুকু জোর আছে সেটা দিয়েই ওদের থেকে ছাড়াতে চেষ্টা করেছিল সবিতাকে। কিন্তু পরমুহূর্তেই পরেশ ওর চুলের মুঠি ধরে টানতে টানতে নিয়ে গিয়ে ওকে ধাক্কা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল একটি গাছের গায়ে, তারপর বলেছিল,

—''শালী তোর সাহস আছে তো বলতে হয়! তুই পারবি তোর বান্ধবীকে আমাদের হাত থেকে বাঁচাতে? চল ভাগ শালী, আর যদি কাউকে এই সব বলেছিস তো তোর ওই বিধবা মা আর তোকে পাশাপাশি শুইয়ে একসাথে তোদের এমন শিক্ষা দেব, বুঝেছিস?''

লক্ষ্মীর মুখ কেটে রক্ত বেরোচ্ছিল, সে বুঝতে পেরেছিল যে এদের সাথে লড়াই করার মতো শক্তি তার নেই। ততক্ষণে সবিতার চিৎকার থেমে গিয়েছিল, শোনা যাচ্ছিল তার গোঙানির আওয়াজ। লম্পটগুলো প্যান্ট খুলে একে একে ঝাঁপিয়ে পড়ছিল সবিতার ওপর, শুরু করেছিল ওর শরীরটাকে নিয়ে দাপাদাপি করা, প্রথমে কিংশুক, তারপর সমীর, তারপর সুকমার আর শেষে পরেশ। অবশেষে ওরা সবিতার গায়ে যখন মদ ঢেলে আগুন লাগিয়ে দিল, তখন শেষবারের জন্য চিৎকার করেছিল সবিতা...আর থাকতে পারেনি লক্ষ্মী। কোন মতে নিজের সাইকেলটাকে নিয়ে বয়ে, রাগে, শোকে কাঁপতে কাঁপতে ফিরে এসেছিল বাড়ি।

সকালের দিকে মুরারীপুর থানায় তেমন কাজকর্ম থাকে না ও.সি. জীবনকৃষ্ণ সান্যালের। সরকারের দেওয়া মাইনে ছাড়াও মন্টু বসাকের দয়াতে তার উপরি ইনকামটাও বেশ ভালোই হয়। এখন তিনি সামনের টেবিলের ওপর পা তুলে বসে জলখাবার খাচ্ছেন। চায়ের ধূমায়িত কাপ রাখা আছে সামনেই। সবে মাত্র তিনি ডবল ডিমের টোস্টে একটা বড়সড় কামড় দিতে চলেছিলেন, ঠিক এমন সময় তার সামনে এগিয়ে এলো একটি দোহারা চেহারার উজ্জ্বল শ্যামবর্ণা তরুণী। সান্যালমশাই—এর তাকে কিছু বলার আগে মেয়েটিই খোদ বলে উঠল,

—''নমস্কর সাহেব, আমার নাম লক্ষ্মী প্রামাণিক। আমি সবিতা বণিকের ধর্ষণ এবং হত্যার ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। আমি অপরাধীদের বিরুদ্ধে থানায় ডায়েরি করতে চাই!''

সান্যাল মশাই বিস্ফারিত গোল গোল চোখে তাকিয়ে রইলেন লক্ষ্মীর দিকে!

* * *

প্রথমে খুব ইতস্তত করছিলেন সদানন্দবাবু, কিন্তু পরে আমার জোরাজুরিতে হার মানলেন। অবশেষে একটা দীর্ঘ—নিঃশ্বাস নিয়ে তিনি বলে উঠলেন,

—''বাবা দেবু, দেখো এই পৃথিবীতে এমন অনেক ঘটনা ঘটে যার কোন সঠিক ব্যাখ্যা দেওয়া যায় না। আমি যদিও—বা একটু আগে বললাম যে এমন অপরাধের শান্তি ঈশ্বর দিয়েছিলেন, কিন্তু সেটা শুধুমাত্র মুখের কথা...আসলে কে করেছিল এমন ভয়ঙ্কর কাজ, তা আজও আমার অজানা...আর জেনে রেখো এই ঘটনাগুলির প্রত্যক্ষ সম্পর্ক আছে তোমার হারিয়ে যাওয়া পূর্বপুরুষদের সাথে!...এত দিন তুমি বিশ্বাস করবে না ভেবে বলিনি তোমায়...কিন্তু আজ তা বলতে তুমি নিজেই বাধ্য করেছ আমাকে!''

—''আপনি বলুন ঠাকুরমশাই...বিশ্বাস পরের কথা, আমি আগে সমস্ত ঘটনা শুনতে চাই!''

আমাকে নিয়ে মন্দিরের চাতালে বসলেন সদানন্দ বাবু। এমন রৌদ্রোজ্জ্বল সকাল বেলাতেও তার মুখটা যেন আতঙ্কে কালো হয়ে গেল। তিনি বলতে লাগলেন,

—''সেটা কোন সালের ঘটনা তা জানি না, তবে পুরোটাই শুনেছিলাম আমার ঠাকুরদার মুখে। সেই সময় তোমার ঠাকুরদার বাবা অর্থাৎ ইন্দ্রিনারায়ণ তালুকদার ছিলেন এই গ্রামের দন্ডমুণ্ডের কর্তা। সেটা দেশ স্বাধীন হওয়ার আগেকার কথা, সেই সময় জমিদারির আয় যেন উথলে উঠছে। তাছাড়া সদ্য সদ্য 'রায়বাহাদুর' উপাধি পেয়েছেন ইন্দ্রনারায়ণ, তাই তখন তাকে পায় কে। যেমন তার প্রতিপত্তি তেমন তার রমণীমোহন রূপ। আয় যেমন তার ছিল, তেমনই বাইজি বেশ্যাদের প্রতি ব্যয়ও তিনি করতেন দুই হাত খুলে। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে তাদের প্রতি ইন্দ্রনারায়ণের আকর্ষণ কমে গেল, তার নজর গেল গ্রামের গরিব ঘরের সুন্দরী অবিবাহিত মেয়েদের দিকে। প্রতিদিন রাতেই তোমাদের ওই বাগান বাড়িতে বাইজিদের মুজরা হয়ে গেলে, তার লেঠেলরা তার শোয়ার ঘরে যোগান দিত গ্রাম থেকে অপরহণ করে নিয়ে আসা এমন হতভাগ্য মেয়েদের। মদ্যপ অবস্থায় সারা রাত ধরে তাদের সর্বনাশ করতেন ইন্দ্রনারায়ণ! কিন্তু একদিন হঠাৎ কি যে হল...

—''কি হল সেদিন?''

একবার আতঙ্কের বশে ঢোক গিলে আবার বলতে লাগলেন সদানন্দবাবু,

—''সেদিনও এমনই একটা মেয়েকে ভোগ করেছিলেন ইন্দ্রনারায়ণ, মেয়েটি খুব চিৎকার করছিল। সেই দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা পাইক বা বাড়ির গেটের দারোয়ান সবাই বেশ উশখুশ হয়ে রসিয়ে রসিয়ে শুনছিল মেয়েটার আর্তনাদ। কিন্তু পরমুহূর্তেই ঘটনা সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী হয়ে দাঁড়ালো। এবার ভয়ার্ত কণ্ঠে চিৎকার করে উঠলেন স্বয়ং ইন্দ্রনারায়ণ! একবার নয় বেশ কয়েকবার! কোতূহলী পাইক পাহারাদাররা ধাক্কা মেরে খুলে ফেলল ভেতর থেকে বন্ধ করা ইন্দ্রনারায়ণের শোয়ার ঘরের দরজা। ভেতরে ঢুকে তো তারা অবাক...কোথায় ইন্দ্রনারায়ণ, কোথায় সেই মেয়েটি! সম্পূর্ণ খাঁ—খাঁ করছে ফাঁকা খাট! সম্পূর্ণ বন্ধ ঘরের ভেতর থেকে যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়েছে দুটো মানুষ! এরপর সেই রাতে বিস্তর খোঁজাখুজির পর গ্রামের পেছনের জঙ্গলের এক স্থানে গিয়ে শিউরে উঠল ওরা সকলে। মশালের আলোয় ওরা স্পষ্ট দেখতে পেল এক জায়গায় পড়ে আছে মানুষের চামড়া, হাড়, নাড়ি—ভুঁড়ি এবং এক মানব দেহের বেশ কিছু রক্ত মাখা অংশ। যেন কেউ প্রবল আক্রোশে জীবন্ত ভক্ষণ করেছে মানুষটিকে, এবং খিদে মিটে গেলে তার দেহের উচ্ছিষ্ট অংশগুলোকে এখানে ফেলে রেখেছে। অদূরে পড়ে থাকা মানুষটার আধ—খাওয়া মুণ্ডূটা দেখে কারোর আর চিনতে বাকি রইল না, যে এই দেহাবশেষ স্বয়ং ইন্দ্রনারায়ণের!...গ্রামের মানুষরা ভয় পাবে, তাই ভেবে সেই রাতে গোপনে ওই দেহাবশেষ শ্মশানে নিয়ে গিয়ে সৎকার করা হয়। পরে রটিয়ে দেওয়া হয় যে ইন্দ্রনারায়ণ নিরুদ্দেশ! এই ঘটনার কথা শুধু ওই লেঠেলরা এবং তোমাদের পরিবারের অল্প কিছু সদস্যরাই জানতেন। আর জানতেন আমার ঠাকুরদা, কারণ সেই রাত্রে তাকেও সৎকারের সময় কিছু পূজা উপাচার করার জন্য ডাকা হয়...এদিকে যে মেয়েটাকে সেদিন ইন্দ্রনারায়ণ ভোগ করতে চলেছিলেন, তাকে অজ্ঞান অবস্থায় নিজের বাড়িতেই পাওয়া যায়। তার জ্ঞান ফিরলে সে বলে যে সেদিন রাতে ওই ঘরে ঠিক কি হয়েছিল তা তার মনে নেই!''

আমি বিহ্বল হয়ে শুনছিলাম সব কথা। সদানন্দবাবু থামতেই জিজ্ঞাসা করলাম,

—''আর আমার ঠাকুরদা...তার কি হয়েছিল?''

—''তোমার ঠাকুরদা রামনারায়ণও নিজের বাপের ধারা পেয়েছিলেন। তারও মনোজগতে জেগে ওঠে গ্রামের গরিব মেয়েদের প্রতি কামতৃষ্ণা। একদিন তিনিও লেঠেলদের পয়সা খাইয়ে ওই বাগান বাড়িতেই নিজের শয়ন কক্ষে জোগাড় করলেন গ্রাম থেকে অপহৃত একটি সুন্দরী মেয়েকে। অতঃপর বন্ধ ঘর থেকে শোনা গেল রামনারায়ণেরও আর্তচিৎকার, দরজা ভেঙে সকলে ঢুকে দেখল ঘরে কেউ নেই। এই ক্ষেত্রে ওই অজানা নরখাদক রামনারায়ণকে ভক্ষণ করে তার দেহাংশগুলিকে ফেলে রেখেছিল গ্রামের পুব দিকে নদীর পাড়ে। সেখানেই গোপনে সৎকার করা হয় তার দেহাবশেষ, এবং গ্রামবাসীদের বলা হয় রামনারায়ণও নিরুদ্দেশ হয়েছেন। এই ক্ষেত্রেও মেয়েটিকে অজ্ঞান অবস্থায় নিজের বাড়িতে পাওয়া যায়, সেও বলে যে ওই রাত্রে বাগান বাড়িতে ঠিক কি হয়েছিল তা সে জানে না!''

* * *

সেদিন সন্ধ্যায় আর মন বসছিল না লক্ষ্মীকে অঙ্ক শেখাতে। মূর্তিটাকে অবশ্য এখনো গঙ্গার জলে বিসর্জিত করিনি, সেটাকে আমার পড়ার ঘরের শো—কেসের মধ্যে রেখে দিয়েছি। লক্ষ্মী কেমন যেন থম মেরে গিয়েছে, হয়তো প্রিয় বান্ধবী সবিতার এই পরিণতি দেখে। মনটা আমারও বড্ড খারাপ, কি করবো, আমি বয়স্ক মানুষ। এই বয়সে ওই সব গুন্ডা বদমাশদের সাথে পাঙ্গা নেওয়ার সাহস আমারও নেই। একটা সহজ বীজ—গণিতের অঙ্ক কষতে গিয়েও বার বার ভুল করছে লক্ষ্মী। বুঝলাম আজ আর অঙ্ক কষা হবে না ওর, তাই ওকে ছুটি দিয়ে দিলাম। ও বই খাতা গুছিয়ে নিতে শুরু করলে আমি ওকে বলে উঠলাম,

—''যাই বলিস না কেন রে লক্ষ্মী, ওই বাদমাশগুলোর সম্বন্ধে থানায় কমপ্লেন করে তুই ঠিক করিসনি...গোটা গ্রাম ওদের চেনে...এবার নিশ্চয়ই ওরা তোর কোন ক্ষতি করার চেষ্টা করবে!''

—''ওরা যা ইচ্ছা করুক, জেঠু...কিন্তু এতবড় অপরাধ নিজের সামনে তাও আবার নিজের প্রিয় বান্ধবীর সাথে হতে দেখে আমি কি করে চুপ থাকবো, বলতে পারবেন আপনি?''

আমি চুপ করে গেলাম, সত্যিই এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সাধ্য আমার নেই। এমন সময় লক্ষ্মীর চোখ গেল অদূরে শো—কেসে রাখা মূর্তিটার দিকে, সে আগ্রহের সাথে বলল,

—''আরেহ বাহ! ওটা কিসের মূর্তি জেঠু? একবার আমাকে দেখতে দেবে?''

আমি মূর্তিটা ওর হাতে দিয়ে ওকে জানালাম কিভাবে মূর্তিটা আমি পেয়েছি। বেশ কিছুক্ষণ উল্টে—পাল্টে মূর্তিটাকে দেখল লক্ষ্মী, তারপর একটু সম্ভ্রম মিশ্রিত আদুরে গলায় সে বলল,

—''আমাকে এই মূর্তিটা দেবে জেঠু? প্লিজ না বলো না...প্লিজ...''

আমি বেশ অবাক হলাম ওর কথা শুনে, ওকে বললাম সদানন্দবাবু ওই মূর্তিটার সম্পর্কে আমাকে যা বলেছেন সেই সব কথা। কিন্তু লক্ষ্মী নাছোড়বান্দা, তার খুব ইচ্ছা এমন অজানা দেবতাদের মূর্তি নিজের ঘরে রাখার, তাদের পূজা করার! অগত্যা আমি হেসে বললাম,

—''আচ্ছা বাবা, আজ থেকে এই মূর্তিটা তোর...এবার শান্তি হল তো?''

* * *

—''দাদা, ওই হারামজাদী লক্ষ্মী আমাদের নামে থানায় কমপ্লেন করে এসেছে, বলেছে নাকি আমরা সবিতাকে রেপ করে পুড়িয়ে মেরেছি এটা সে নিজের চোখে দেখেছে...সান্যাল স্যার প্রথমে ওর কমপ্লেন নিতে চাননি, তখন নাকি মেয়েটা বলে যে সে আরো ওপরের মহলে যাবে। তাই বাধ্য হয়েই সান্যাল স্যারকে ওর কমপ্লেন নিতে হয়। তিনি যদিও বা সেটা পরে ছিঁড়ে ফেলেছেন, তবুও আমাদের বললেন যে শত্রুর শেষ রাখতে নেই!'', মন্টু বসাকের কাছে একটানা বলে চলল কিংশুক।

—''বটে...এই মাগীর তো দেখছি বড্ড তেল হয়েছে! এখনো অবধি গ্রামের কেউ আমাদের দিকে আঙ্গুল তুলতে সাহস পায় না, সেখানে ও কিনা ওপরের মহলে যাওয়ার কথা ভাবে!'' গুটখা চিবাতে চিবাতে বললেন মন্টুবাবু।

—''তাহলে দাদা, আর দেরি কেন, আজ রাতেই আমরা ওই মাগীর সব তেল নিংড়ে বার করে আনি...কি বলেন!''

—''উহু...শুধু তোরা একা নয়...এই ফুলের মধু চেখে দেখতে আমারও যে বড় ইছা করছে রে...আজ সকালে তোদের বৌদি বাপের বাড়ি গিয়েছে, তাই রাতটা না হয় লক্ষ্মীর সাথেই একটু লুডু খেলে কাটাবো ভাবছি!'' দাঁত বের করে হাসতে হাসতে বললেন মন্টু বসাক।

* * *

লক্ষ্মী মূর্তিটা নিয়ে চলে গেলে আমি সেখানেই কিছুক্ষণ বসে রইলাম। মনটা বড্ড বিষণ্ণ লাগছিল, তা সে সবিতার জন্যই হোক বা আমার দুই হতভাগ্য লম্পট পূর্বপুরুষদের জন্যই হোক যারা কোন অজানা নরখাদকের শিকার হয়েছিলেন! মনের মধ্যে একটা প্রশ্ন বারবার উঁকি দিয়ে চলেছিল যে কে এমন হিংস্রভাবে ভক্ষণ করেছিল রামনারায়ণ আর ইন্দ্রনারায়ণকে? কিভাবে সম্পূর্ণ বন্ধ ঘর থেকে তারা দুজনেই উধাও হয়ে গিয়েছিলেন? এটা কি রক্ত মাংসে গড়া জন্তুর কারসাজি, নাকি এর পেছনে আছে কোন অলৌকিক অপশক্তির হাত? আমি সাত—পাঁচ ভেবে চলেছি, বাইরে নেমে গিয়েছে সন্ধ্যার অন্ধকার। আর শোনা যাচ্ছে না কোন পাখির ডাক, একটা ঠান্ডা শিরশিরে বাতাস আসছে ঘরের খোলা জানলা দিয়ে। আমি ধুতি—পাঞ্জাবীর ওপরে কোনমতে চাদরটা জড়াতে যাব, এমন সময় পেছন থেকে একটি অতি সুপরিচিত কণ্ঠের ডাক শুনে আমার সমস্ত শিরদাঁড়া বেয়ে যেন আতঙ্কের হিমেল স্রোত নেমে গেল।

—''দেবু...দেবু চিনতে পারছিস আমায়? এখনো নিশ্চয় ভুলে যাসনি আমায়?''

ঠিক সেই সময় আমি পেছন ফিরে দেখলাম খুব অদ্ভুতভাবে কেঁপে কেঁপে উঠছে দেওয়ালে মালা পরিয়ে ঝোলানো আমার ঠাকুমা হরসুন্দরী দেবীর ছবিটা। সন্ধ্যার অন্ধকারে যেন দেখতে গেলাম একটা অস্পষ্ট নারীর অবয়ব ধীরে ধীরে ছবিটা থেকে বেরিয়ে আমার দিকেই এগিয়ে আসছে। আমি দুই পা পিছিয়ে গিয়ে অস্ফুট কণ্ঠে বললাম,

—''ঠাম্মি...ত..তুমি...তুমি এসেছো ঠাম্মি!''

ঠাকুমার সেই অপার্থিব পরিচিত কণ্ঠস্বরটা যেন বলে উঠল,

—''ও মা...তুই এবং তোর কৌতূহলই যে আমাকে ডেকে আনল তোর কাছে। তাছাড়া তোর একটা কাজে আমি খুব খুশি হয়েছি। তাই আমাকে এভাবেই ওপার থেকে এপারে কিছুক্ষণের জন্য আসতে হল এমন কিছু কথা বলতে, যা তুই ভয় পাবি বা অবিশ্বাস করবি ভেবে জীবিত কালে তোকে বলে যেতে পারিনি রে!''—

—''কোন কথা ঠাম্মি...ঠাকুরদা আর তার বাবার সাথে কি হয়েছিল সেই কথা?''

—''হ্যাঁ, বলছি শোন। এই কথাগুলো আমি শুনেছিলাম আমার শাশুড়ি মা কিরণবালা দেবীর কাছ থেকে। তিনি সকলের থেকে গোপন রাখতে বলেছিলেন এই কথাগুলো, কিন্তু আজ পরিস্থিতি অনুযায়ী তোকে বলতে বাধ্য হচ্ছি সব কথা। কিরণবালা ইন্দ্রনারায়ণের স্ত্রী ছিলেন এবং এটাই ছিল তার সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য। তিনি অতিশয় ক্রুদ্ধ এবং বিরক্ত হয়ে উঠেছিলেন তার স্বামীর প্রতিপত্তিবলে প্রতিদিন রাতে গ্রামের এক একটা নির্দোষ মেয়ের সতীত্ব হরণ করার এহেন আচরণে। তার সহ্যের বাঁধ ভাঙল, স্বামীর প্রতি শ্রদ্ধা, ভক্তি এবং ভালোবাসা তার মনে থেকে নিঃশেষিত হয়ে গেল। তিনি পরিকল্পনা করতে লাগলেন কিভাবে ইন্দ্রনারায়ণকে উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া যায়। তার বাপের বাড়ির কুলপুরোহিতের বৌদ্ধ তন্ত্রে জ্ঞান ছিল, তাকে দিয়েই তিনি গোপনে তৈরি করিয়েছিলেন ওই মূর্তিটা, যেটা তুই একটুআগেই লক্ষ্মীকে দিয়েছিস। ওটা এক ভয়ঙ্কর বৌদ্ধ দেবতার মূর্তি, যার মধ্যে কঠোর তন্ত্র সাধনা করে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেন ওই কুলপুরোহিত। মন্ত্রের মাধ্যমে ওই দেবতাকে নির্দেশ দেওয়া হয় যে, বাড়ির চার দেওয়ালের মাঝে এই মূর্তি থাকবে, সেখানে কোন নারীর প্রতি যেন কোন অত্যাচার না হয়। ওই মূর্তির উপস্থিতিতে, সেই বাড়িতে যদি কোন পুরুষ কোন নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে তার সাথে সঙ্গম করতে চায়, তাহলে সেই পুরুষকে পাপিষ্ঠ মনে করবে এই ভয়ঙ্কর দেবতা। এবং শাস্তি স্বরূপ সেই পুরুষটিকে অত্যন্ত যন্ত্রণা দিয়ে ভক্ষণ করবে এই দেবতা, তারপর তার শরীরের অবশিষ্ট অংশ ফেলে আসবে বাড়ি থেকে দূরে অন্য কোন স্থানে। নিপীড়িত মেয়েটিকে স্নেহের সাথে তার নিজের বাড়ি পৌঁছে দেবে এই দেবতা এবং সেই সময়কার সমস্ত স্মৃতি লোপ পাবে মেয়েটির মস্তিষ্ক থেকে। যেহেতু সব মেয়েদের সর্বনাশ এই বংশের পুরুষরা ওই বাগান বাড়িতে গিয়েই করেন, তাই গোপনে ওই বাড়ির একটি দেওয়ালের মাঝে ইঁট সরিয়ে ওই মূর্তিটাকে পুঁতিয়ে দিয়েছিলেন কিরণবালা। তাই এই দেবতার রোষেই ওই বাড়িতে ধর্ষণ করতে গিয়ে প্রাণ হারান আমার শ্বশুরমশাই এবং স্বামী! এরপর দেশ স্বাধীন হলে আমাদের জমিদারি চলে যায়। তাই এই বংশের আর কোন পুরুষ ওই বাড়িতে গিয়ে স্বেচ্ছাচারিতা করার কথা ভাবেননি।...এবং আমি অত্যন্ত খুশি হয়েছি যখন আজ তুই এই মূর্তিটা লক্ষ্মীকে নিয়ে যেতে দিলি...কারণ এত বছর পর আবার ওই দেবতা শাস্তি দিতে চলেছেন বর্তমান যুগের কিছু লম্পটদের!''

* * *

এত রাতে দরজায় কড়াঘাতের আঘাত শুনে বেশ অবাকই হল লক্ষ্মী। সে এখন বাড়িতে একা আছে, কিছুদিন হল তার বিধবা মা শ্বাসকষ্টজনিত কারণে স্থানীয় সরকারি হাসপাতালে ভর্তি। ক্রমাগত কড়া নাড়ার আওয়াজ শুনেও যখন সে দরজা খুলতে উদ্যত হল না, তখন দরজার ওপর পড়তে লাগল লাথি এবং ভারী শরীরের ধাক্কা। আতঙ্কে ঠকঠক করে কাঁপতে লাগলো লক্ষ্মী, ওর সামনেই কিছুক্ষণের মধ্যে ভেঙে দুই ভাগ হয়ে গেল ঘরের দরজাটা। মদ্যপ অবস্থায় খিলখিল করে হাসতে হাসতে ঘরে প্রবেশ করল সুকুমার, পরেশ, কিংশুক, সমীর এবং অবশেষে মন্টু বসাক।

—''কিরে শালী, তোকে বলেছিলাম না সবিতার কথা কাউকে বললে তোরও ওর মতো হাল করব, তাও তুই থানায় কমপ্লেন করতে গেলি...এইভাবে যে নিজের বিপদ নিজেই ডেকে আনলি তুই...'', দামি ধুতি পাঞ্জাবীটা খুলে ধীরে ধীরে নগ্ন হতে হতে বললেন মন্টুবাবু। লক্ষ্মী চিৎকার করে সেই ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু মন্টুবাবুর ওই চার সাগরেদ তাকে চুলের মুঠি ধরে হ্যাঁচকা টানে তুলে নিয়ে গিয়ে ফেলল সোজা বিছানার ওপর। তারপর খুব ভক্তি ভরে সেই চারজন মন্টুবাবুকে বলে উঠল,

—''সবার প্রথমে আপনার চান্স দাদা...আমরা এই শালীর হাত পা ধরে আছি, যাতে মালটা ছটফট করতে না পারে!''

শুধুমাত্র অন্তর্বাস পরিহিত মন্টুবাবু কামচঞ্চল মুখে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলেন বিছানায় জোর করে শুইয়ে রাখা লক্ষ্মীর কাছে!

* * *

—''সব বুঝেছি ঠাম্মি...এবার শুধু আমাকে বল ওটা কোন দেবতার মূর্তি? কি নাম তার?'' চিৎকার করে উঠলাম আমি।

—''বৌদ্ধ তন্ত্রমতে ওই দেবতাকে বলা হয় 'যক্ষরাজ বৈশ্রবান'! ওই দেবতাকে হিন্দুদের দেবতা 'কুবের'—এর সাথে তুলনা করা যায়। যক্ষরা এক শ্রেণীর অলৌকিক জীব, কেউ কেউ তাদের দেবতা বললেও অনেকে রাক্ষসের সাথেও তাদের তুলনা করে। তবে নরখাদক হলেও যক্ষরা রাক্ষসদের মতো অকারণে নরহত্যা করে না। আমরা যক্ষদের কোন প্রাচীন গুপ্তধনের রক্ষক হিসাবে চিনি, এবার চিনব সমাজের নারীজাতির রক্ষক হিসাবে! বৈশ্রাবনের ডান হাতে থাকে একটি 'ছত্র' যা বোঝায় এই দেবতার সার্বভৌমতা। তার কাছে থাকে বেঁজি যার মুখ দিয়ে নির্গত হয় সোনা, এই বেঁজি উদারতার প্রতীক এবং মানব মনের ছয়টি রিপু—রূপী সাপের প্রধান শত্রু। এই দেবতার বাহন হল তুষার সিংহ। এই দেবতা বাঁ হাত ধরে রাখেন একটি জামির ফল, যা নির্দিষ্ট করে প্রতিটি মানুষকেই তার কর্মফল ভোগ করতেই হবে। বৌদ্ধরা মনে করেন অপরাধীদের শাস্তি দেওয়া ছাড়াও এই দেবতা সম্পদ এবং প্রতিপত্তির প্রতীক।''

ব্যাস, এতটা বলেই যেন অদৃশ্য হয়ে গেল ঠাকুমার অবয়ব, এবং কাঁপা বন্ধ হল তার মালা পরানো ছবিটার!

* * *

মন্টুবাবু ঝাঁপিয়ে পড়লেন লক্ষ্মীর শরীরের ওপর। টেনে হিঁচড়ে খামচে ছিঁড়ে ফেলতে লাগলেন মেয়েটির পরনের শাড়ি ব্লাউসের সর্বাংশ। তার নগ্ন শরীরের সর্বাংশে চুম্বন করার সাথে সাথেই তিনি খুলে ফেললেন নিজের অন্তর্বাস। বেপর্দা হল তার সুদৃঢ় পুরুষাঙ্গ। উল্লাসের অট্টহাসিতে যেন ফেটে পড়লো তার চার সাগরেদ। ঠিক সেই সময় আচমকা ঘরের মধ্যেকার তাপমাত্রা যেন খুব কমে যেতে লাগল, ওদের সকলের চোখ চলে গেল বিছানার পাশেই রাখা বৈশ্রাবনের মূর্তিটার দিকে। এক অদ্ভুত হলুদ আলোকরশ্মি যেন জ্বলা নেভা করছে মূর্তিটার দুই চোখে। তখনই যেন চোখের সামনে অন্ধকার নেমে এল লক্ষ্মীর, আচমকাই জ্ঞান হারাল সে। ওই পাঁচ লম্পটের যেন মনে হল মূর্তির চোখদুটি থেকে ওই আলো যেন ক্রমশ তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে চলেছে! সেই আলো যেন ধীরে ধীরে রূপ নিল এক হলুদ রঙের অতিকায় চেহারার দানবিক পুরুষ দেহের! লম্বায় যেন এই ঘরের সিলিং ছুঁয়ে আছে সেই দানব, তার ভাটার মতো দুই চোখ দিয়ে যেন আগুন ঠিকরে বেরোচ্ছে। নিজের সুবিশাল মুখটা খুলল সেই দানবে, বেরিয়ে এল তার লকলকে লাল জিভ এবং তীক্ষ্ন শ্বদন্ত! আচমকা ওদের মনে হল যেন একটা তীব্র হাওয়ার আলোড়ন শুরু হয়েছে গোটা ঘর জুড়ে। এতটাই এই হাওয়ার তেজ যেন ওরা নিঃশ্বাস নিতে পারছে না! সেই দুর্দমনীয় ঘূর্ণিঝড় প্রথমে শূন্যে ভাসিয়ে তুলল ওই পাঁচ লম্পটের দেহগুলোকে। তারা আতঙ্কে চিৎকার করে উঠলো, দেখলো সে যেই দানবের হা করা মুখ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে...এবং এই হাওয়ার তরঙ্গ যেন ক্রমাগত তাদের শরীরগুলোকে নিয়ে যাচ্ছে ওই দানবের সুবিশাল দুই ঠোঁটের ফাঁকের মাঝে!

* * *

পরদিন সকালে হুলুস্থুল বেধে গিয়েছে সকল গ্রামবাসীদের মাঝে। এই গ্রামের সকলের ত্রাস এম.এল.এ মন্টু বসাক এবং তার চার সাগরেদ যথা সুকুমার, পরেশ, কিংশুক এবং সমীরের আধ—খাওয়া ছিন্ন ভিন্ন রক্তাক্ত দেহাবশেষ ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে গ্রামের শেষের জঙ্গলের সেই স্থানে যেখানে ধর্ষণ করে পুড়িয়ে মারা হয় সবিতাকে। সেই স্থান জুড়ে পুলিশ এবং গ্রামাবাসীদের ভিড় জমায়েত হয়ে গিয়েছে। সকলের চোখে আতঙ্কের ছাপ, শুধু সবিতা আর তার মতো আরো যে সকল মেয়েদের সর্বনাশ করেছিল এই লম্পটগুলো, তাদের পরিবারের লোকজনের মুখে ছেয়ে রয়েছে প্রশান্তি। ভিড় ঠেলে আমিও গেলাম সেই দিকে। এই পাঁচজন যে কোন নরখাদকের পেটে গিয়েছে তা শুধু জানি আমি, কারণ লক্ষ্মী এখন সুস্থ হয়ে উঠলেও, সেই রাত্রের কোন ঘটনাই তার মনে নেই। আমি কোন বৌদ্ধ মন্ত্র জানি না, তবুও সেই ভয়ঙ্কর দেবতাকে মনে মনে প্রণাম জানিয়ে বলে উঠলাম,

—''জয় বাবা বৈশ্রাবনের জয়...যখনই কোন নারীর নারীত্ব হনন করতে চেষ্টা করবে কোন পাপিষ্ঠ পুরুষ...তুমি নরহন্তা নরখাদক হয়ে শাস্তি দিয়ো সেই লম্পটকে!''

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%