কৌশিক কারক, আকাশ চন্দ, উৎস ভট্টাচার্য

সূচনা:
রাত্রি গভীর। আকাশে ঘন কালো মেঘ। পথ কর্দমাক্ত ও পিচ্ছল, ব্যাঙের ডাক, ঝুপঝুপ করে বৃষ্টি পড়ছে, এক অদ্ভুত ভয়াল পরিবেশ। মাঝে মাঝেই বিদ্যুতের তীব্র শব্দ বুকের অন্তর্স্থল অবধি কাঁপিয়ে দিচ্ছে। আকাশের বুক চিরে ক্ষণে ক্ষণেই বিদ্যুতের গোলাপি নীল শিখার ঝলকানি, আর সেই ঝলকানিতে চারিদিক আলোকিত হয়ে উঠছে। এই দুর্যোগের রাতে, এক নারী চলেছে ঘোমটা দিয়ে। সেই নারীর শরীর কেঁপে উঠলেও তার বুকের বস্ত্রখন্ডটিকে আঁকড়ে ধরে দ্রুত চলার চেষ্টা করছে সে। মাঝে মাঝেই পেছনে তাকায় তারপর আবার ঐ কর্দমাক্ত পথ দিয়ে দ্রুত পায়ে এগিয়ে চলে। বহুদূরে দেখা যায় টিমটিম এক আলো। গ্রামের সীমানা অতিক্রম করে, শ্মশানের শেষে পশ্চিম ভাগে বটগাছের তলায় উপস্থিত হয়। ধুনি জ্বালিয়ে বসে আছেন, এক সন্ন্যাসী, সর্বাঙ্গে ছাই মাখা, মাথার থেকে নেমেছে জটার ঝুরি। মেয়েটি কাতর স্বরে বলল—
—বাবা আমার সন্তানকে রক্ষা করুন।
সন্ন্যাসীর চোখ খুলে গেল, রক্তবর্ণ চোখ। কর্কশ স্বরে বললেন—
—কি চাই?
—বাবা দয়া করুন!
শালবনী গ্রাম, শাল গাছ ঘেরা, সবুজে সবুজ, পাশ দিয়ে বয়ে গেছে কংসাবতী নদী। প্রকৃতি যেন অকৃপণ হাতে সাজিয়েছে শালবনীকে। সেই গ্রামের জমিদার ছিলেন রঘুনাথ রায়। টাকা, পয়সা, লোক—লস্কর কোনো কিছুর অভাব ছিল না। গ্রামের প্রজাদের তিনি সন্তানসম ভালোবাসতেন। প্রজারাও তার উদারতার জন্য তাকে ভগবানের মতো শ্রদ্ধা করত। স্ত্রী গত হবার পরে দ্বিতীয়বার দারপরিগ্রহ করেননি। সময়ের সাথে তার একমাত্র পুত্র দীননাথ বিবাহ যোগ্য হলে, তিনি তার বিবাহ দিয়ে পালটি ঘরের সুলক্ষণা কন্যা বিরজাকে পুত্রবধূ করে নিয়ে আসেন। দ্বিরাগমনের দিন রাত্রিবেলায় রঘুনাথের বিধবা ভগিনী উমাদেবী দাদার জন্য দুধ নিয়ে এসে দেখেন, তার দাদা মেঝেতে পড়ে আছেন, তীব্র আতঙ্কে তার চোখ ঠেলে বেরিয়ে আসছে, রঘুনাথের দৃষ্টি জানলার দিকে। ঘরের বাকি লোকজন এসে বুঝতে পারেন তিনি মৃত।
কিছু বছর পরের ঘটনা :
রঘুনাথের মৃত্যুর পর দীননাথ জমিদারির হাল ধরেন। যথাসময়ে তার একটি কন্যাসন্তান হয়। বিরজা প্রত্যহ গ্রামের শিব মন্দিরে পূজা দিতে আসেন, তার কন্যা দুর্গা ও দাসী শান্তিকে নিয়ে। স্নান সেরে দুধের ঘট নিয়ে বাবার মাথায় ঢালেন। দুর্গা প্রতিমার মতো বিরজার রূপ, সেরকম তেজ।
শালবনীর সকলে বিরজাকে মা জননী বলে। প্রজাদের দুঃখ—কষ্ট তিনি সহ্য করতে পারতেন না। প্রজারাও তাকে মায়ের মতো দেখে। দীননাথ বিরজাকে প্রাণাধিক ভালোবাসতেন, তাই তার কোনো আব্দার তিনি ফেলতেন না। তার ঘরে অনেকগুলি মানুষের বাস। খুড়শ্বশুরের ছেলে গোপাল, তার পত্নী পারুল, এবং তাদের একমাত্র পুত্র কানাই, তার পিসিশ্বাশুড়ির পুত্র মুরারি, তার পত্নী কানন এবং তাদের দুই কন্যা কমলা ও বিমলা, দীননাথের বিধবা বোন ননীবালা, ও তার পুত্র যদু ও কন্যা রাণু। এনারা সকলেই এই পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। উমাদেবী কাশীবাসী হয়েছেন, অনেক কাল আগেই।
প্রতিদিন সকালে স্নান সেরে গরদের শাড়ি পরে বিরজা চিরুণি দিয়ে চুল আঁচড়ে, ভেজাচুলে সিঁথিতে সিঁদুর দেয়, তর্জনি দিয়ে সিঁদুরের কৌটো থেকে সিঁদুর নিয়ে কপালে বড় করে সিঁদুরের টিপ পরে। বিরজার গলায় মোটা সোনার হার, হাতে বালা, মাথা পর্যন্ত ঘোমটা টানা। এইরকম এক সকালে বিরজা মানদাকে ডেকে বলেন—দেখ দেখি আমার দুগ্গা মা তৈরি হল কি না?
—দুগ্গা মা তো ফুলের সাজি নিয়ে অপেক্ষা করছে।
দুধের ঘটি আর ফুলের সাজি নিয়ে বিরজা যাচ্ছিলেন মহাদেবের মাথায় জল ঢালতে, দরজায় নায়েব মশাই হন্তদন্ত হয়ে প্রবেশ করছিলেন, বিরজাকে দেখেই থমকে দাঁড়ান তারপর বললেন—
—মাঠাকরুন কি মন্দিরে যাচ্ছেন?
—হাঁ বাবা।
সেইদিন, বাবার মাথায় জল ঢেলে মন্দিরের ঘন্টা বাজিয়ে বেরুতে যাবেন, এমন সময় এক ভয়ঙ্কর দর্শনের সাধু ''ব্যোম ভোলে।'' বলতে বলতে মন্দিরে প্রবেশ করলেন। তাকে দেখেই বিরজা চমকে ওঠেন। শশব্যস্ত হয়ে বলেন—''বাবা আসুন, আসুন, আমাদের পূজা হয়ে গেছে।''
—সাধুবাবার পরনে একটি লেঙটি, গোটা গায়ে ছাই—এর প্রলেপ। কর্কশ স্বরে তিনি বললেন—তুই এখানে দাঁড়া, বেটি।
বিরজার পাগুলো যেন আটকে গেছে। সাধুবাবা আবারো 'ব্যেম ভোলে' বলে চিৎকার করে মহাদেবকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে বললেন—
—বাবার কাছে প্রণাম করতে এসেছিস?
ঝুপ করে প্রণাম সেরে বিরজা বলেন—গরিবের বাড়িতে দুটি খেয়ে যান বাবা;
বিরজার কথার উত্তর না দিয়েই দুর্গার দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন,
—এইটি তোর মেয়ে দুর্গা, মা রে এর যে ঘোর বিপদ।
বিরজার বুক ধকধক করে ওঠে।
তিনি তখনো বলে চলেছেন—তুই ঘরে কালসাপ পুষেছিস রে মা, সাবধান, সাবধান!
বিরজার বুকটা ধক করে উঠল। তার মেয়ের নাম ইনি জানলেন কি করে? বাবার পায়ে লুটিয়ে পড়ে বিরজা বলল—বাবা কী হবে বাবা, উপায় বলে দিন বাবা।
—বাবাকে ডাক। উনি সব রক্ষে করবেন। ব্যোম ভোলে।
দুর্গাকে নিয়ে বাড়ি পৌঁছে, একটু দুধ মিষ্টি ফলের ব্যবস্থা করে মানদাকে নিয়ে ঐ মন্দিরে এসে দেখেন, সেখানে কেউ কোথাও নেই।
বিরজার মনটা ভারী হয়ে গেল। কোনো কাজেই আর মন বসছে না তার। মানদা এসে বলল—মা কী রান্না হবে, কইলে নে তো।
দীননাথ সেরেস্তা থেকে ফিরে, বিরজার থমথমে মুখ দেখে তার নথটি নাড়িয়ে বললেন—কি হয়েছে গিন্নী?
বিরজা কান্নাভেজা সুরে সব কথাই বলেন। দীননাথ তার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলেন—গিন্নী, সবার সব কথা কানে নাও কেন?
ঘোলের শরবতটুকু এক চুমুকে শেষ করে তিনি বললেন,—বড় বউ, অনেকদিন তোমার হাতে মুগের ডাল, এঁচোড়ের চপ, চিংড়ির ভাপা খাই না, একদিন কর না গো। নায়েবমশাই অনেকগুলি হিসেবের খাতা নিয়ে এসেছিলেন দীননাথকে দেখানোর জন্য, তিনি বলেন—
—মাঠাকরুন আপনার এই বুড়ো ছেলেটি কি ভাগ পাবে?
বিরজা জিভ কেটে বলল—সে আর বলতে।
তারপরে মল ঝমঝমিয়ে চললেন তিনি রান্না ঘরে।
কয়েকদিন পরের ঘটনা। বিকালে বিরজা আসন তৈরির কাজে ব্যস্ত ছিলেন, সে সময় দুর্গা এসে বলে, —ও মা আমি খেলতে যাই ওদের সাথে, আজ কিন্তু বাইরে খেলছি।
—দূরে কোথাও যেওনি।
গোপালের বৌ পারুল, পোয়াতি, সে তার নথ নাড়িয়ে নাড়িয়ে বলে—বলি বয়েস তো আর কম হল না বড়বৌ, এবারে মেয়েটার বিয়ে দাও।
বিমলা কমলা দুর্গা আর রাণু লুকোচুরি খেলছিল, বারবার দুর্গা ধরা পড়ে যায়। দুর্গা দৌড়তে দৌড়তে যায় পোড়ো মন্দিরটায়। তাড়াহুড়োতে দরজাটা ঠেলতেই, ক্যাঁচ করে খুলে যায়, মন্দিরটা ভাঙা, কিন্তু ভেতরে ঢুকে দুর্গা অবাক হয়ে যায়, বেশ পরিষ্কার, কিন্তু ভ্যাপসা একটা গন্ধ, কোন ঠাকুরের মূর্তিও নেই। অথচ দুর্গার মনে আছে আগে যখন এই মন্দিরে এসেছিল, দেখেছিল মন্দিরের দরজায় একটা মরচে পড়া তালা। হঠাৎ দুর্গা মাথায় খুব জোর আঘাত অনুভব করে, তারপরেই সে জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ে।
সন্ধ্যা গড়িয়ে যায় দুর্গা তখনো ফেরে না, কমলা বিমলা সকলে ফিরে আসে। বিরজা জিজ্ঞাসা করাতে তারা বলে—বড়মা আমরা লুকোচুরি খেলছিলুম। দুর্গাকে কত খুঁজেছি, পেলুম না।
বিরজার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। তিনি শীঘ্রই দীননাথকে সংবাদ পাঠান। বিরজার বুক কেঁপে ওঠে, দুই চোখ জলে ভেসে যায়। বারবার কুডাক ডাকে তার মন। দীননাথের লেঠেলরা, এমনকি নায়েবমশাই নিজে পুরো গ্রাম তন্নতন্ন করে খোঁজেন। অবশেষে, গ্রামের শেষপ্রান্তে যে পোড়ামন্দির আছে সেখান থেকে উদ্ধার করে দুর্গার অচৈতন্য দেহ। জ্ঞান ফেরার পরেও সে কিছুতেই মনে করতে পারে না ঐ দিকে কখন গেছিল।
দুর্গা বলে—আমি ঐ মন্দিরের ভেতরে লুকিয়েছিলুম। হঠাৎ মাথায় খুব লাগল। তারপর আর কিছু মনে নেই।
বিমলা বলে—মন্দিরে তো তালা দেওয়া ছিল জেঠি।
বিরজার যত্নে আর পরিচর্যায় দুর্গা সুস্থ হলেও, তার প্রাণ চঞ্চলতা যেন হারিয়ে গেল। অন্যমনস্ক হয়ে দিনরাত জানলার দিকে তাকিয়ে থাকে। খাওয়াদাওয়া করে না। মায়ের পায়ে পায়ে যে মেয়ে ঘুরে বেড়াত, ঘরের এককোণে সে বসে থাকে। কখনো একা একাই ছাদে উঠে চেয়ে থাকে জমাট বাঁধা অন্ধকারের দিকে।
বেশ কিছুদিন নির্বিঘ্নে কেটে যায়। সেইদিন সন্ধেবেলায় গা ধুয়ে বিরজা তুলসীমঞ্চে সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বালে, শাঁকে তিনবার ফুঁ দেয়। হঠাৎ প্রণাম করার সময় বিরজার মনে হয় একজোড়া চোখ যেন নিভৃত হতে লক্ষ্য রাখছে। পেছন ফিরে তাকাতেই হঠাৎ দমকা হাওয়ায় প্রদীপ নিয়ে যায়। আবার প্রদীপ জ্বালাতেই সঙ্গে সঙ্গে তা নিভে গেল। কেউ যেন এক ফুঁয়ে নিভিয়ে দিচ্ছে প্রদীপ। এইরকম বার তিন হবার পরে হৃৎস্পন্দন বহু গুণ বেড়ে যায়। আবার প্রদীপ জ্বালাল সে। তারপর এগোতেই তীব্র আর্তনাদের আওয়াজ ভেসে আসে ঘরের ভেতর থেকে। দৌড়ে ঘরে ঢুকেই দেখে পারুল অজ্ঞান হয়ে সিঁড়ির সামনে পড়ে আছে, রক্তে ভেসে যাচ্ছে চারিদিক। কবরেজ মশাই আসেন, যমে মানুষে টানাটানি করে প্রাণ ফিরে আসে পারুলের।
তার জ্ঞান ফেরার পরেই সে বলে, অল্পবয়সী এক মেয়ে গা ভর্তি গহনা, আর মাথায় ভর্তি সিঁদুর, ঘোমটা দিয়ে সিঁড়ির কাছেই দাঁড়িয়েছিল। তিনি হাত ধরতেই তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। সেই মেয়েটি হা হা করে হাসছিল।
সকলে মুখে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট। এই আকস্মিক দুর্ঘটনায় ঘরের সকলেই ভীত। বিরজার মন খচখচ করতেই থাকে। ইতিমধ্যে যত দিন অতিবাহিত হয় তত যেন দুর্গার ব্যবহারের পরিবর্তন হতে থাকে। বিরজা উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে। মনের মধ্যে সন্দেহ দানা বাঁধতে শুরু করে। দুর্গা তার সাথে মন্দিরে যেতে চায় না, একা একাই ঘোরে। অনেকবার জিজ্ঞাসা করলে, যখন সে বিরক্তি নিয়ে তাকায়, তখন, বিরজার ভেতর অবধি শুকিয়ে যায়। কি হিমশীতল সে চাউনি, এ চাউনি তো এক সাত বছরের মেয়ের নয়, এ যেন এক প্রতিহিংসাপূর্ণ পূর্ণ বয়স্কলোকের চাউনি।
সেদিন মহাদেবের মাথায় জল ঢালার জন্য একটু বেশি ভোরে স্নান করতে যান বিরজা। স্নান সেরে আসার সময় তিনি লক্ষ্য করেন দুর্গা হনহন করে ঘরের বাইরে চলে গেল। কোন কিছুতেই তার যেন কোন লক্ষ্য নেই। ঘরে ফিরে, দ্রুত ভিজে শাড়ি ছেড়ে, গরদ পরে, সে মাদনাকে ডাকে, আর জিজ্ঞাসা করে—দুগ্গা মা কোথায় রে?
মানদা এসে বলে—মাঠাকরুন দুগ্গা মা তো ঘরে নেই।
মন্দিরে গিয়ে দুধ ঢেলে বেরনোর সময় বিরজা দেখে, ঝোপের আড়াল থেকে লুকিয়ে দুর্গা তার উপরে নজর রাখছে। দুর্গার কাপড় পুরো ভিজে। অজানা ভয়ে, আতঙ্কে তার হাত পা ঠান্ডা হয়ে যায়। ঘরে ফিরে দৈনন্দিন কাজে মন দেয়। তার বিধবা ননদ ননীবালা বড় শান্ত, কম কথার মানুষ।
সে বলে—বৌদিদি, সবজি কেটে রেখেছি, আমার শরীরটা ভালো লাগছে নে, এট্টু শরবত পাঠিয়ে দিবি? আজ আবার একাদশী তো।
—ঠাকুরঝি, এই রোগা শরীরে উনুনের তাতে এসে তোমার কাজ নেই। আমি এখুনি পাঠাচ্ছি। হ্যাঁ গা বাছারা আমার মুখে কিছু দিয়েছে?
ননীবালা বলে—না গো বৌদিদি।
বিরজা ননদটিকে ভালোবাসে প্রাণ দিয়ে। লুচির ময়দা মেখে, সবে খেন্তি গরম লুচি ভেজে তুলছে, ঠিক এই সময় পুরোহিত পত্নী মালতি এসে বিজয়ার পায়ে পড়ে বলে—মা ঠাকরুন, সকাল থেকে আমার জগাইরে কোত্থাও পাচ্ছি নে।
বিরজা তাকে শান্ত করে দীননাথকে সংবাদ দেন। চারিদিকে চলে খোঁজ। সারাদিনের চিরুণি তল্লাশির পর অবশেষে গ্রামের বড় সায়র থেকে উদ্ধার হয় জগাই—এর মৃতদেহ। অথচ জগাই সাঁতার জানত। জগাই—এর মৃতদেহের উপড়ে আছাড়ি বিছাড়ি দিয়ে মালতি কাঁদতে থাকে।
বিরজার মনে পড়ল, সকালবেলায় দুর্গাকে দেখেছে ঐ সায়রের দিকে যেতে। বিরজার ভেতর অবধি কেঁদে ওঠে, সে দেখে দুর্গার মুখে একটা নিষ্ঠুর শ্লেষ মেশানো হাসি।
এই সকল ঘটনার মাঝে বিরজা ও ঘরের সকলে জানতে পারে বিরজা পোয়াতি। বিরজাকে এই অবস্থায় দেখে দুর্গা কেমন হিংস্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। বিরজা অনুভব করে সেই নিষ্ফল আক্রোশকে। মনে জোর এনে দীননাথকে জানাতেও পারে না। যথা সময়ে বিরজা তার পিতৃগৃহে একটি ফুটফুটে পুত্র সন্তানের জন্ম দেয়। নাম রাখেন রমানাথ। এত কিছু অশুভের মাঝে এই সন্তান যেন নতুন প্রাণ সঞ্চার করে বাড়িতে। জমিদারবাড়িতে উৎসবের হাট বসে। নায়েবমশাই বললেন—বৌমা, ছেলে পেয়ে, এই বুড়ো ছেলেকে ভুলে যেও না যেন।
কিন্তু দুর্গার মুখ থমথমে। বিরজা খেয়াল করেছেন। মেয়ে যেন ইচ্ছে করেই তাকে এড়িয়ে চলছে। ননীবালা, পারুল, কানন সকলে তাকে আগলে রাখে। সেদিন দরজার কাছে বিমলা আর হরিকে দাঁড়াতে দেখে বিরজা বলে—বাইরে দাঁড়িয়ে কেন? ভেতরে আয়।
হরি বলে—বড়মা একটা কথা বলব। দুগ্গা না রোজ বিকেলে ঐ পোড়া মন্দিরটায় যায়। কেমন পাগলির মতো মাথা নাড়ে।
বিমলা বলে—জেঠি আমি ওকে কাঁচা মাছ খেতে দেখেছি ঐ মন্দিরে! দুগ্গাকে কি ভূতে ভর করেছে নাকি?
ওদেরকে কথা শেষ করতে না দিয়েই বিরজা বলে—তোরা লুচি খাবি? আমি শান্তিকে বলছি দাঁড়া, গরম গরম লুচি ভাজতে।
বিরজার আচমকা এই কথা পরিবর্তনে দুই শিশু হতবাক হলেও, বিরজা দেখেছিল, আড়াল থেকে একজোড়া হিংস্র চোখের চাউনি। মনের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। মানদাকে বলে ঘরের শিশুগুলির উপরে নজর রাখতে। এই ঘটনার দুই একদিন পরেই হঠাৎ বিরজার একপায়ের নূপুর ভেঙে যায়, তাই অপরটিও খুলে রাখেন। সেইদিন যখন ভিজে কাপড় নিয়ে তিনি ছাতে আসেন, কাপড় মেলে ফেরার সময় তার দৃষ্টি আটকে যায়, পেছনের ছাদের কিনারায়, ছোট্ট বিমলা পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে একমনে আচার খাচ্ছে, আর দুর্গা পা টিপে টিপে এগিয়ে চলেছে তার দিকেই। কিছু বলা বা বোঝার আগেই সে তীব্র বেগে ধাক্কা দিল বিমলাকে। বিমলা টাল সামলাতে না পেরে পড়ে যায় কার্নিশ টপকে। দুর্গা অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে।
বিরজা হতবাক হয়ে পা টিপে টিপে নীচে নেমে আসে। ভয়ে তার শরীর ঘামে ভিজে গেছে, এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না তার। নিজের চোখকেই অবিশ্বাসী মনে হয়। নীচে বিমলার নিথর দেহ পড়ে আছে। কানন সকলকে দোষারোপ করে মাথা ঠুকছে দেওয়ালে। সকলে কাননকে শান্ত করার চেষ্টা করছে। আড়াল থেকেই দুর্গার দিকে কড়া নজর রাখেন তিনি। কয়দিন পরেই রমানাথের জন্য দুধ গরম করে এনেই হতভম্ব হয়ে যান, দেখেন, ঘরে মানদা নেই, দুর্গা তার ভাই—এর সাথে খেলা করতে করতে ফিসফিস করে বলছে—এবারে তোর পালা রে ভাই।
বিরজা দরজা থেকে সরে লুকিয়ে যান। দুর্গা চারিদিক দেখে, চলে গেল ধীরে ধীরে। পরদিন বিরজা, বিধবা ননদ ননীবালা ও রমানাথকে নিয়ে পাশের গ্রামে পূজা দিতে যাবে বলে ঠিক করেন। সেদিন দুর্গা এসে আচমকাই বায়না করে বলে, সেও যাবে। বিরজা তাকে আদর করে ভুলিয়ে বাধা দিলেও সে কথা শুনতে চায় না। অবশেষে বিরজা গম্ভীর গলায় বললেন—মা দুগ্গা তুমি আজকাল বেশি জেদ করছ। তোমার যাওয়া হবে না আজ।
পালকিতে করে যাবার সময় বিরজা ননীবালাকে সব কথা খুলে বলে। ননীবালা একটুক্ষণ চুপ করে থাকার পর বলে—বৌদিদি আমিও দেখেছি। ভূত ভর করেছে ওর উপর। রাত্তির বেলা ছাদে গিয়ে হাসে, কারো সাথে খেলে না। বৌদিদি এই গেরামে এক বাবা এসেছে শুনেছি, সবাই বলে নাগা বাবা, তিনি গেরামের শেষে থাকেন, তিনি নাকি অনেক যাদু টোনা জানেন। একটিবার যাবে?
—ননীবালা বোন, আমি থাকলে তাও সে থমকে থাকে, কিন্তু আমি না থাকলে, সে এই দুধের শিশুকে মেরে ফেলবে। আমি যাতে এ নিয়ে কথা না বলি, তাই সে কড়া দৃষ্টি রাখে আমার উপর।
ননীবালা বললেন—বৌদিদি আমি সব সামলে নেবো। তুমি পিছনের দরজা দিয়ে চলে যেও। পরে দাদাকে সব কথা বলবো আমি।
পরিশেষ
বিরজা বাবার কাছ থেকে চুপিচুপি ঘরে ফিরে আসে। দীননাথ রাত জেগে বসেছিলেন। বিরজার কাছে সব কথা শোনার পর, দীননাথের ভ্রূ কুঁচকে যায়।
সেদিন সকালেই হাজির হয় নাগাবাবা। তার 'হর হর মহাদেব' শব্দে সকলের পিলে চমকে ওঠে। দীননাথ এসে তাঁর পা ধুইয়ে দেয়। বাড়ির আঙিনায় তিনি বসেন।
তারপর বলেন—তোর বিটিকে নিয়ে আয়, হর হর মহাদেব।
সকলে খোঁজ করে, কিন্তু দুর্গা কোথাও নেই। তথক্ষণে ঐ সাধক বাবার কথায় সেখানে যজ্ঞবেদী তৈরি করে শুরু করেন যজ্ঞ। কিসব মন্ত্র দুর্বোধ্য ভাষায় উচ্চারণ করতে থাকেন তিনি।
দীননাথের লেঠেলরা ঐ পোড়া মন্দির থেকে দুর্গাকে জোর করে ধরে নিয়ে আসে। নাগাবাবাকে দেখেই দুর্গা দাঁত কিড়মিড় করতে থাকে। লেঠেলরা অবাক হয়ে যায়, এইটুকু মেয়ের গায়ে শক্তি দেখে। হা হা করে হাসতে হাসতে দুর্গা বলে—তুই পারবি না, পারবি না;
বলেই আবারো হা হা করে পাগলের মতো হাসতে থাকে। আত্মীয়রা ভয়ে সিঁটিয়ে যায় দুর্গাকে দেখে, তার চুল এলোমেলো, মুখের মধ্যে কি হিংস্রতা, চোখ জোড়া টকটকে লাল। ছাড়া পেলে সে যেন ধ্বংস লীলায় মেতে উঠবে। পরিবেশ থমথমে, হঠাৎ শুকনো ধুলোর ঝড় ওঠে, হাওয়ার তোড় বাড়তে থাকে। ঠিক ঐ সময়ে রান্নাঘরের বাসনকোসন ঝনঝন করে পড়ে যায়, সকলে আতঙ্কিত। দুর্গার মুখ ক্রোধে আরক্ত, একরাশ ঘেন্না নিয়ে সে তাকিয়ে আছে।
একটি থামের সাথে দড়ি দিয়ে তাকে বাঁধা হয়।
নাগাবাবা বলেন—তুই কে? কেন এসেছিস? বল!
খিলখিলিয়ে হাসতে শুরু করে দুর্গা। তারপরেই আছাড়িবিছাড়ি দিয়ে কান্না।
—ও মা আমাকে বাঁচাও।
বিরজা মেয়ের কষ্ট সহ্য করতে না পেরে, জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।
নাগাবাবা তাঁর গায়ের পবিত্র ছাই লেপে দেয় দুর্গার শরীরে।
দুর্গা চিৎকার করে বলে—মারছিস, আমায়? শেষ করে দেব সব। ঐ যে জগাই, আমি মেরেছি ওকে। জানিস কেন? ও যে দেখে ফেলেছিলো আমাকে মন্দিরে, তাই ওকে জলে ডুবিয়ে মেরেছি। বেশ করেছি। তোদেরকে মারবো। বড়ো খিদে আমার বড়ো খিদে। পেট ভরে না যে।
—তোকে কে এনেছে?
—হা হা হা, বলব না।
—বল, কেন এসেছিস?
বলে কিছুটা তেল জাতীয় তরল দুর্গার মাথায় দিল, আরো ছাই লেপে দিল। দুর্গা বিকট আওয়াজ করে চিৎকার করতে করতে বলে—
—এই পরিবারের সর্বনাশ করতে এসেছি। আমার পথে যারা বাধা হবে তাদেরকে শেষ করে দেব। বিমলাকে আমি ঠেলেছি, এত সাহস যে, জমিদার গিন্নীর কাছে আমার নামেই নালিশ করছিল, তাই ছাদ থেকে ঠেলে দিয়েছি। বাকিদেরকে সাবাড় করতুম, করা হল না।
—কেন এসেছিস বল, সত্যি করে বল।
—এই বলে যজ্ঞে আহুতি দিলেন। যজ্ঞের লেলিহান অগ্নিশিখা বর্ধিত হলো। এলেমেলো শুকনো হাওয়ার দাপট বৃদ্ধি পেল। সোঁ সোঁ করে হাওয়া বইলেও নাগাবাবা সেসব অগ্রাহ্য করে একমনে ঘৃতাহুতি দিয়ে যাচ্ছেন যজ্ঞে। দুর্গা হিংস্র পশুর মতো গর্জন করছে।
শান্তস্বরে নাগাবাবা যজ্ঞের পবিত্র ছাই তার কপালে দিয়ে বলেন—কে ডেকেছে তোরে? কেন এসেছিস?
কাটা ছাগলের মতো দুর্গা কাঁপতে থাকে। তার তীব্র চিৎকারে দীননাথ ব্যাকুল হয়ে ওঠে। সেই সময়ে এতোটা থুতু ছিটিয়ে দেয় নাগাবাবার মুখে। সে বলে—আমায় মারছিস কেন? আমি নিজে আসিনি ও ডেকেছে আমায়।
দুর্গার আঙুল নায়েবের দিকে। সকলে হতভম্ব। দীননাথের নির্দেশে লেঠেলরা নায়েবকে ধরে আনে।
দীননাথ বলে—কাকা আপনি একাজ করতে পারলেন। ভালোবাসার এই দাম দিলেন?
নায়েবমশাই পাগলের মতো হাসতে থাকে, তারপর বলে—ভালোবাসা, ভালোবাসা কি হয় দীননাথ? সারাজীবন তোমার, আর তোমার বাপের সেবা করেছি। বরদার কথা মনে আছে তোমাদের? আমার একমাত্র সন্তান, তার কি অপরাধ ছিল, সে ননীবালাকে ভালবাসতো। তোমার পিতার সহ্য হলনি, আমাদের সাথে নাকি বিয়ে দেওয়া যায় নে। মেয়েটার বিয়ে দিল। সেই দুঃখে বরদা আত্মঘাতী হল। তোমাদের কাকিমাও সেই শোক মেনে নিতে পারেননি। তিনিও চলে গেলেন আমাকে ছেড়ে। আমার ভিটে আজ শ্মশানভূমি। তাই ভাবলুম তোমার ভিটেতে এত আনন্দ কেন হবে? তোমার বিয়ের আগেই দেবী দর্শনে গেছলুম কামাক্ষাতে। সেখানেই দীক্ষা। আবার হাসতে লাগলেন হা হা করে।
—রঘুনাথ এই পিশাচীকে দেখেই মারা যায়। তারপর দুগ্গাকে বশ করি। তার মধ্যে প্রবেশ করে পিশাচিনী। তোর বংশ শেষ করার ইচ্ছে ছিল দীননাথ, কিন্তু রমানাথকে মারতে পারল নি।
নাগাবাবা আরো কিছু মন্ত্র উচ্চারণ করে বলতে থাকেন দুর্গাকে—ছেড়ে দে এই শরীর। ছেড়ে দে বলছি!
অবশেষে কাটা ছাগলের মতো, লুটিয়ে পড়ে দুর্গা। ঠিক সেইসময় তাদের ঘরের আমগাছের কাঁচা ডালটা ভেঙে পড়ে, মড়—মড়—মড়াৎ করে।
নাগাবাবা শান্তমুখে দীননাথকে বলেন—বিপদ কেটে গেছে রে। যজ্ঞের ধোঁয়ায় চারিদিকে পবিত্র হয়ে গেছে।
সকলকে আশীর্বাদ করে তিনি চলে যান। দীননাথ সব জেনেও ছেড়ে দেন নায়েবমশাইকে। সন্ধ্যাবেলায় দুর্গার জ্ঞান ফেরার পরে, সে দেখে, তার বাবা, মা পাশেই বসে আছে।
উঠেই বলে—কমলা বিমলা চলে এসেছে? আমি ঐ মন্দিরে লুকিয়েছিলুম, তারপর মাথায় কি জোর লাগল। মা এখানে কখন এলুম?
বিরজা সস্নেহে দুর্গার মাথাখানি টেনে নেয় কোলের মধ্যে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন