বক্র

কৌশিক কারক, আকাশ চন্দ, উৎস ভট্টাচার্য

এক

ঘুম আসছে না তার আজ। দিনটা ভালো নয়, টের পেয়েছে সে। নিজের ঘরে গুটিশুটি মেরে শুয়ে আছে অনেকক্ষণ, রাত গভীর করে এসেছে। তবুও ঘুম নেই তার চোখে। তাদের মিরিকের এই বাংলোর ঝাপসা কাঁচ ভেদ করে এই শীতের রাতেও দেখা যাচ্ছে দর্জিদের পরবের আলো। আজ সারারাত ওরা তাঁবু খাটিয়ে গানবাজনা করবে, খাবে, নেশা করবে। টুংটাং শব্দ ভেসে আসছে মানুষের বেঁচে থাকার। আর সেইসঙ্গে ভেসে আসছে খুন হয়ে যাওয়া মাংসের আঁশটে গন্ধ। ভেসে আসছে ভারী ঠাণ্ডা হাওয়ার ঝাপটা আর তার সাথে পায়ের টেনে টেনে চলা স্খলিত শব্দটা। ওই শব্দটা তার ভালো লাগে না, সে টের পায় ওই শব্দের মধ্যে রয়েছে মন খারাপ করা একটা কালো অন্ধকার। যার থেকে বের হবার পথ খুঁজলেও পাচ্ছে না সে। বুকের ওপর চেপে বসতে থাকা ভয়ের ভারটা কুরে কুরে বাড়ির কাঠের কাজের জন্য আনা ঘুরন্ত রেঞ্চটার মতো ভিতরে ঢুকে যাচ্ছে। তার একার পক্ষে এই লড়াইটা লড়া বড্ড কঠিন যে। নিজের মানুষদের পাশে না পাবার যন্ত্রণায় গুঙিয়ে উঠল ক্যাথি। দরজার ল্যাচ খুলে গেল ঠিক সেই সময়েই। ক্যাথির জানলায় টানা তার সাধের গোলাপি পর্দার পাশে পড়ল একটা দীর্ঘ কালো ছায়া।

দুই

বসে আছি ফালুটে, প্রমথেশবাবুর বাংলোয়। সময়টা শীতকাল। বিশ্ববিদ্যালয়ে বড়দিনের ছুটি পড়ার সাথে সাথেই চলে এসেছি ফালুটে, প্রমথেশবাবুর কাছে, কিন্তু তার আগেই এসে পড়েছে কেসটা, উনি নিজেই এবার ডেকেছিলেন আমাকে। আর বরাবরের মতো, আমিও এক ডাকেই হাজির হয়েছি প্রৌঢ় বিজ্ঞানীর কাছে। আমি এক ভাষক মাত্র। পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে জানি প্রমথেশবাবু থাকা মানেই কোনো জটিল, রহস্যময় ঘটনাবলির সাক্ষী হতে যাচ্ছি, সেটা লেখার পাতায় যতটা সম্ভব পুঙ্খানুপুঙ্খ ফুটিয়ে তোলাই আমার মূল উদ্দেশ্য। আমি অরুণেশ রায়, পেশায় সাহিত্যের অধ্যাপক এবং সেই সঙ্গে শখের লেখক, প্যারানর্ম্যাল সোসাইটির ভূতপূর্ব মেম্বার অ্যাস্ট্রোফিসিসিস্ট প্রমথেশ চ্যাটার্জী শুধু আমার বন্ধু মানুষই নন, সেই ''রুরু'' নামের নারকীয় জীবের হাত থেকে আমাকে ও আমার বন্ধুকে উদ্ধার করার পর, আমি ধীরে ধীরে হয়ে উঠি ওনার এক সহকারী। নামধাম পালটে, নিজের দিদার দেওয়া সর্বজয় ছদ্মনামে ''রুরু'' গল্পটা প্রকাশ করি। তারপর থেকেই ওনার সম্পর্কে অনেক বেশি মানুষ জানতে পারেন। প্রমথেশবাবু প্রথমে একেবারেই খুশি হননি, কারণ উনি এই প্রচার থেকে দূরে থাকতেই হিমালয়ে একা বাস করা শুরু করেছিলেন। ফালুটের যে প্রত্যন্ত অঞ্চলে আমি আর আমার বন্ধু প্রদীপ্ত গিয়েছিলাম এক চূড়ান্ত অতিপ্রাকৃত শক্তির থেকে বাঁচবার আশায়, এবং অদ্ভুতভাবে বেঁচেও গিয়েছিলাম, যেটা যাঁরা ''রুরু'' গল্পটা পড়েছেন তাঁরা জানেন, সেইখানেই ওনার অন্যতম এবং এখন একমাত্র বাংলো বাড়ি। তারপর দীর্ঘদিন গেছে ওনাকে এটা বোঝাতে যে ওনার মতো একজন মানুষের সাহায্য আমাদের মতো কিছু বিপদগ্রস্ত লোকের একান্ত দরকার। আর তার জন্য ওনার কথা মানুষের জানার দরকার, আর ঠিক সেই কারণেই আমার এই গল্প প্রকাশ। তারপর ''অঘোরীরকবলে'', ''মানুষখেকো'', ''রিপু''...একের পর এক আমাদের বিভিন্ন অভিযানে বেরিয়ে পড়া, আর সাফল্য। সেই এডভেঞ্চারের স্বাদ দিতেই বারবার বেরিয়ে পড়ি প্রমথেশবাবুর সাথে। আরো একটা ইন্টারেস্টিং কেস এসেছে শুনে আমিও উৎসুক হয়েছিলাম। গতকাল এসেছি। আজ কখন ভদ্রলোক দেখা করতে আসবেন সেই অপেক্ষাতেই বসেছিলাম।

সকাল ন'টা। বাংলোর গ্র্যাণ্ডফাদার ক্লক সগর্বে ঘোষণা করল দিনের প্রথম প্রহরের যাত্রা আর তার ঠিক এক মিনিটের মধ্যেই আমাদের ঘরে ঢুকলেন, একজন অ্যাংলো পুরুষ এবং ভদ্রমহিলা। স্বামী—স্ত্রী। বয়স চল্লিশের আশেপাশে। চেহারায় আপাতভাবে জৌলুস আছে। কিন্তু ভদ্রলোকের মুখচোখ শুকনো। ব্যাকব্রাশ করা বনেদি চুল আর দামি ফ্রেমের চশমা, ভদ্রমহিলার শাড়ি আর অভারকোটের সঙ্গে মানানসই টুপি, কিন্তু সব মিলিয়ে খুব অবসন্ন দুটো মুখ। চোখের নীচে কালি, চামড়া ফাটা, চুল উস্কোখুস্কো। বুঝলাম, সমস্যা চেহারায় ছাপ ফেলেছে।

প্রমথেশবাবু সেই প্রথম দিনের মতো আজো গম্ভীর। রাজকীয় এক রহস্যময়তা তাঁকে ঘিরে রাখে তাঁর সমাধান করা রহস্যগুলির মতোই। এই সেই মানুষটা যাঁর তত্ত্বাবধানে কতশত জটিল রহস্যের সমাধান হয়েছে, যার শেষের দিকের বেশ কয়েকটার সাক্ষী আমি নিজে। ভদ্রমহিলা আসার পর আমরা দুজনে বসলাম ওনার কথা শোনার জন্য। প্রমথেশবাবু বললেন ওনার পেটেন্ট কথাটা, ''প্রথণ থেকে শুরু করুন।'' আর তারপরই ভদ্রমহিলা শুরু করলেন ওনাদের কাহিনী।

''আমাদের নাম ত ফোনেই জেনেছেন প্রমথেশবাবু, উনিই মিরিকের ব্রুক্সটি—গার্ডেনের মালিক ন্যাথানিয়েলব্রুক আর আমি মিসেলব্রুক। আমাদের জন্ম এখানেই, মানে ভারতে। মিরিক আমার বাবা আর ওর বাবা দুজনেরই চায়ের ব্যবসা ছিল। আমাদের বিয়ের পর সেটা জয়েন্ট বিসনেস হয়ে দাঁড়ায়। সব মিলিয়ে আজ প্রায় আশি বছরের উপর আমাদের বাস এখানে। আমাদের বাবারা না হলেও আমরা পুরোপুরি বাঙালিই হয়ে গেছি বলতে পারেন। আমি প্রথম জীবনে কোলকাতায় ছিলাম প্রায় পনেরো বছর। ওখানেই স্কুল—কলেজে পড়াশোনা করেছি। তারপর ন্যাটের সঙ্গে বিয়ে আর এখানে আবার চলে আসা। এতগুলো কথা বলার একটাই উদ্দেশ্য। আমি যা বলতে চলেছি তা আমার কুসংস্কারাচ্ছন্ন মনের প্রলাপ নয়। যদিও আমার বাড়ির লোক সেটাই মনে করে। যদিও ন্যাট আমাকে খুব সাপোর্ট করে, আর সে—কারণেই আজ ও আমার সঙ্গে এসেছে এখানে।'' ভদ্রমহিলা তাকালেন স্বামীর দিকে। মাথা নাড়লেন ন্যাথনিয়েল, মুখে আশ্বাসের বিষণ্ণ, হালকা হাসি। হাত রাখলেন স্ত্রীর হাতে। বলতে লাগলেন মিসেল।

''আমার আর ন্যাটের দুই মেয়ে। বড় ক্যাথরিন, ছোট লিজা। ছোট ক্লাস ফোর আর বড়...'' একটু চুপ করে থেকে বললেন... ''ক্লাস টেন হবার কথা ছিল।...'' ঘরে নেমে এলো অস্বস্তিকর নীরবতা।

''কতদিন হলো?'' প্রমথেশবাবু প্রশ্ন করলেন।

''আটমাস''... গলা খাঁকরি দিয়ে বললেন মিসেল। সেদিন আমাদের পাড়ায় দর্জিদের পরব ছিল। আমাদের বাড়িতেও অনুষ্ঠান ছিল। ফাদার যোসেফ ন্যাটের অনেক দিনের বন্ধু। উনিও সেদিন ছিলেন। ক্যাথির পরের দিন স্কুলে পরীক্ষা ছিল তাই ও একটু তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ে। আমরা অনেক রাত অব্দি জেগেছিলাম। শেষে আমি আর ন্যাট গিয়ে দেখেও আসি। ক্যাথি ঘুমিয়ে পড়েছিল। তারপর আমরাও শুয়ে পড়ি। কিন্তু পরদিন সকালে উঠে আর কোনো চিহ্ন খুঁজে পাইনি ক্যাথির। কেউ কোনো শব্দও শোনেনি রাতে। লিজা আমাদের সঙ্গেই শুত তখনও, সে রাতের পর পুলিশ, গোয়েন্দা কিছুই বাদ যায়নি। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। মেয়েটা যেন উবে গেল। এক—রাতের মধ্যে। আমি আর ন্যাট তারপর বহু জায়গায় গেছি, বহু চেষ্টা করেছি, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। মাসতিনেক পর থেকেই পুলিশের আর তেমন উৎসাহ ছিল না। তারপর আস্তে আস্তে আমরাও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এলাম। জীবন আমাদের স্বাভাবিক ছন্দে নিয়ে এলো বলা যায়। লিজাকেও ত দেখতে হবে। বুকে পাথর চেপে আমরাও আস্তে আস্তে ক্যাথিকে বুলতে আরম্ভ করলাম। ওর বাবা লিজাকে আঁকড়ে ধরল বেঁচে থাকার একমাত্র রসদ হিসাবে। একমুহূর্তও কাছছাড়া করত না, সেইসব দিনগুলোয় ওকে বুকে জড়িয়ে থাকতাম আমরা। এইভাবেই কেটে যাচ্ছিল দিন, কেটে গেল আরো ক'টা মাস। ভুলেই ছিলাম আমরা, এমন সময়, আজ থেকে ঠিক দুমাস দশদিন আগের একটা রাতে আমি স্বপ্নটা দেখলাম। দেখলাম ক্যাথি ডাকছে আমায়। ওর পরনে সেই নাইট গাউনটা যেটা ওর বাবা ওকে এনে দিয়েছিল ওর জন্মদিনের উপহার হিসাবে। সারা শরীরে রক্ত, যেন কেউ ওকে ছুরি বা অন্য কোনো ধারাল অস্ত্র দিয়ে মেরেছে, আঁতকে উঠে আমার ঘুম ভেঙে গেল সেদিনের মতো। রাত তিনটে বাজে তখন। বাইরে একটা রাতজাগা পাখি ডাকল। মনটা তারপর থেকে সারাদিনই খুব খারাপ হয়ে রইল। ন্যাটকেও বললাম। ও বলল, উদ্বিগ্ন মনের কল্পনা। আমিও তাই মেনে নিয়েছিলাম। আসলে আমরা মনে মনে বুঝেই নিয়েছিলাম যে ক্যাথি আর বেঁচে নেই। শুধু এটা বুঝিনি যে কেন? কি হয়েছিল সেদিন, আমাদের কারোর সঙ্গে সেরকম শত্রুতাও নেই যে এরকম কিছু করতে পারে''...

থামলেন মিসেল। তেনজিংজি কফি নিয়ে এসেছেন। কাঁপা হাতে ধূমায়িত কাপ তুলে নিয়ে শুরু করলেন আবার...

''ভেবেছিলাম ব্যাপারটা এক রাতের স্বপ্ন। কিন্তু না। তার দু'দিন বাদে,... সেদিন ছিল লিজার বার্থ—ডে। সেই ঘটনার পর থেকে বাড়িতে আর কোনো উৎসব করিনি আমরা। ন্যাটই বলল সেদিন ছোট করে একটা অনুষ্ঠান করা যাক। বাড়িতেই আমরা তিনজন, বাইরে থেকে ফাদার যোসেফকে ডাকা হলো। আর আমার ভাই আর ওর স্ত্রী। সেদিন পার্টির শেষে যখন ওকে ন্যাট ঘুম পাড়াতে নিয়ে গেল, তখনই ঘটল ঘটনাটা। আচমকাই লিজা চিৎকার করে উঠল ওপর থেকে, আর দুদ্দাড় করে ওপর থেকে নেমে এলো ন্যাট। লিজা এখন ওর দিদির ঘরটাই পেয়েছে। ন্যাট ওকে শুইয়ে দিয়ে বেরিয়ে আসতেই লিজার চিৎকার শুনতে পায়। আমিও ছুটে যাই ওপরে। গিয়ে দেখি, লিজা, খাটের একেবারে কোণে ঢুকে গেছে। ন্যাট নিচু হয়ে গায়ের জোরে ওকে বের করার চেষ্টা করতে লাগল, কিন্তু... ওইটুকুন বাচ্চা মেয়ে আমার! সেও বেরোতে চেষ্টা করছে, কিন্তু কেউ যেন প্রচণ্ড শক্তিতে ওকে টেনে ধরে আছে। শেষে আমি হাত লাগাতে অনেক কষ্টে বের করতে পারলাম ওকে। ব্যাপারটা একদিনের ভেবেছিলাম। এক সপ্তাহ আর কিছু ঘটেনি। লিজাকে আমার কাছেই নিয়ে শুতাম তারপর। ক্যাথির ঘরটা বন্ধ থাকত। পরের ঘটনাটা ঘটল অষ্টম দিনের মাথায়। ওর বাবা আর ও বাগানে খেলা করছিল। আমি ছিলাম রান্নাঘরে। আচমকাই চিৎকার শুনে ছুটে বাইরে গিয়ে দেখি, ওকে কেউ আমাদের বাগানের বড় পাইন গাছটার পিছনে টেনে ধরে আছে, লিজার কেবল ফ্রকের অংশটুকু দেখা যাচ্ছে, আর ওর পরিত্রাহি চিৎকার শুনতে পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু শুধু তাই নয়। ও সরে যাচ্ছে গাছটা থেকে, আমাদের থেকে আরো দূরে, কেউ যেন ওকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, কোনো সাংঘাতিক শক্তি, যাকে আমরা চোখে দেখতে পাচ্ছি না। ন্যাট ছাড়াবার চেষ্টা করেও পারছে না। সব ভয় ছুঁড়ে ফেলে সেদিন ছুটে গিয়ে আঁকড়ে ধরেছিলাম লিজাকে। কোনোমতে ছাড়িয়ে এনেছিলাম সেদিন। লিজা বলেছিল ও দিদিকে দেখেছে, দিদি ওকে টেনে নিয়ে যেতে চাইছিল। তারপর থেকে ভয়ে ও আমার কাছছাড়া হতেই চায় না। সারাবাড়িতে নেমে এসেছে একটা বুক চাপা অন্ধকার। ফাদার যোসেফ অনেক ধরনের প্রক্রিয়া করেছেন, কিন্তু কিছু লাভ হয়নি। শেষ পনেরো দিনে আমি দশবার স্বপ্নে দেখিছি ক্যাথিকে। যত দিন যাচ্ছে, স্বপ্নটা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। রক্তাক্ত ক্যাথি, একটা জঙ্গলের মধ্যে দাঁড়িয়ে আধো অন্ধকারে আমার দিকে হাত বাড়াচ্ছে, আর তারপর ডান হাতের আঙুল তুলে কি যেন একটা দেখাচ্ছে। আগে আবছা মতো দেখতাম ওকে, কিন্তু গত ক'দিনে ওর মুখের উপর পড়ে থাকা চুলটা পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছি। ও বারবার আমাকে কিছু বলতে চেষ্টা করছে বলে আমার মনে হয়েছে, কিন্তু স্বপ্নটা খুব অল্পক্ষণের জন্য দেখেছি। আর কিছুই ঘটেনি তারপর। অনেক জায়গায় ঘুরেছি প্রমথেশবাবু, শেষমেষ ফাদার যোসেফের মুখে আপনার কথা শুনে, আপনার কাছে আসা। আমি বুঝতে পারছি না প্রমথেশবাবু, ক্যাথির লিজার ওপর কেন এই রাগ? ও লিজাকে খুব ভালোবাসত, আগলে রাখত সবসময়, লিজার যখন চার বছর বয়স, আমি একবার সাংঘাতিক অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। ওর তখন কতই বা বয়স, দশ বছর বড়জোর, সারাক্ষণ আগলে রাখত লিজাকে এর মুহূর্তও নজর থেকে সরাত না, নিজের ঘরে নিয়ে গিয়ে খাওয়াত, ঘুম পাড়াত, ওর বাবার কাছে শুনেছি। ওকে বিশেষ দেখতেই হত না লিজাকে, সব ভার একা ক্যাথিই নিয়েছিল। সেই ক্যাথি... আমি আর কিছু ভাবতে পারছি না প্রমথেশবাবু''... দুহাতে মুখ ঢাকলেন মিসেল।

কয়েক মুহূর্ত চুপ করে তাকিয়ে রইলেন প্রমথেশবাবু, উনি মাঝে মাঝে এমন উদ্ভট একেকটা আচরণ করেন যে ভদ্রসমাজের রীতি মানতে বেগ পেতে হয় রীতিমতো। কোথায় সান্ত্বনা দেবেন শোকার্ত ভদ্রমহিলাকে, তার বদলে তীক্ষ্ন চোখে তাকিয়ে আছেন তাঁর দিকে। আমিই কিছু একটা বলব বলে মুখ খুলতে যাচ্ছি, এমনসময় উনি অবান্তর প্রশ্নটা করলেন।

''আচ্ছা, গাউনটার রং কি ছিল?'' চমকে উঠলেন মিসেল! ''কোন গাউন?''

''আপনি যে বললেন, স্বপ্নে দেখেছেন ক্যাথির পরণে ছিল ওর বাবার দেওয়া নাইট গাউন? রংটা মনে নেই?''...

''গাঢ় গোলাপি''... অবাক চোখে তাকিয়ে জবাব দিলেন মিসেল।

''আপনাদের সঙ্গে এই ফাদার যোসেফও কি সে রাত্রে ও বাড়িতেই ছিলেন?''

''হ্যাঁ প্রমথেশবাবু''...

এতক্ষণ বাদে, এই প্রথম মুখ খুললেন ন্যাথানিয়েল, ক্যাথির বাবা।

আমার মনেও আপনার মতোই প্রশ্ন জেগেছিল প্রমথেশবাবু। কিন্তু যোসেফ আমাদের ফ্যামিলির বহুদিনের পরিচিত বন্ধু মানুষ, তাই ওকে...''

''কে বন্ধু, কে শত্রু, তা কি আমরা সহজে বুঝতে পারি মিস্টার ব্রুক?'' পলক না ফেলে প্রমথেশবাবু আর মিস্টার ব্রুক চেয়ে রইলেন পরস্পরের দিকে। সন্তানহারা পিতার চোখের গাঢ় কালি কি যেন বলতে চাইছিল, আর সে চোখের বিমূঢ় ভাষা পড়ার ক্ষমতা আর কার আছে না আছে জানি না, কিন্তু প্রমথেশবাবুর যে আছে সে প্রমাণ আমি আগেও পেয়েছি। আমি জানি ওনারা অনেক দরজা ঘুরে এবার ঠিক জায়গাতেই এসেছেন। আর ফিরতে হবে না ব্রুক দম্পতিকে। সত্য এবার ওনারা জানবেনই, আর অন্তত একটি মেয়ে বেঁচে যাবে, ব্রুক পরিবারের। আমার ভাবনার মাঝেই প্রমথেশবাবু চলে গেছেন তাঁর তৃতীয় প্রশ্নে... ''আপনাদের ব্যবসায়িক শত্রু সেই অর্থে বিশেষ কেউ আছেন কি?''

''নাহ, আমার বাবার ভীষণ সুনাম রয়েছে এখনো, ও অঞ্চলে। আমরাও সে সুনাম ধরে রাখার চেষ্টা করে চলেছি।...''

''আচ্ছা, যে রাতে ক্যাথি নিখোঁজ হয়, সে রাতে কি ওর পরণে নাইট গাউনটাই ছিল... যেটা মিসেল স্বপ্নে দেখেছেন?''

এবার দুজনেরই অবাক হবার পালা... 'হ্যাঁ, ওটাই ত পরেছিল।... কেন বলুন ত?''

উত্তর দিলেন না প্রমথেশবাবু। কি যেন ভাবনায় ডুবে গেছেন উনি। তারপর হঠাৎই আবার জেগে উঠে প্রশ্ন করলেন, ''লিজা এখন কোথায়?''

''আমার ভাই আর ওর স্ত্রীর কাছে...''

''হুম। ঠিক আছে। আমি কাল যাব আপনাদের বাড়ি...'' যথারীতি ভব্যতার কোনো লক্ষণ না দেখিয়েই উঠে পড়লেন প্রমথেশবাবু। এতদিন থেকে থেকে আমি অভ্যস্ত হয়ে গেছি এসবে। উঠে গিয়ে ওনাদের দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে এলাম। দরজার কাছে গিয়ে আমার হাত দুটো জড়িয়ে ধরলেন ন্যাথানিয়েল, ''প্লিস অরুণেশবাবু, ওনাকে একটু বলবেন, আমার একটা মেয়ে অন্তত বেঁচে আছে, সে যেন আর কোনো বিপদে না পড়ে। ক্যাথির আত্মার শান্তির জন্য যা করার করব আমরা।...''

আশ্বাস দিয়ে বাড়ি পাঠালাম ওদের। মনটা ভার হয়ে গেল। জানি না কি হবে এরপর। আর প্রমথেশবাবু বারবার কেন ওই একটা অদ্ভুত প্রশ্নের পিছনে পড়ে আছেন, ওনাকে যতদূর চিনেছি, অকারণে এ কাজ উনি করবেন বলে মনে হয় না...।

প্রশ্নটার অর্থ তখন সত্যিই বুঝিনি। কি সাংঘাতিক একটা কথা যে এই সামান্য প্রশ্নের আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে সেটা আন্দাজও করতে পারিনি আমি তখন। আজো মনে হয় চিরদিনই যদি না বুঝে থেকে যেতে পারতাম ত ভালো হত।

তিন

মিরিক শহরের দক্ষিণপ্রান্তে ব্রুক্স হাউস। বনেদি পরিবার, সেটা বাড়ির মধ্যে ঢোকার আগেই টের পাওয়া যায়। আজ সকাল সকালই চলে এসেছি মিসেলদের বাড়ি। প্রমথেশবাবু ঢুকেই উপরে চলে এলেন। প্রথমে গেলাম মিসেল আর ন্যাটের ঘরে। চমৎকার ব্রিটিশ স্টাইলের পুরনো খাট। দেওয়ালে ফুলেল ওয়ালপেপার। বিছানার পাশের জানালা দিয়ে পাহাড় দেখা যাচ্ছে। শান্ত একটা সকাল। এত সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশ, এর মাঝে মানুষ যে কি করে এসব...

''আপনি পশ্চিমের এইদিকে মাথা করে ঘুমান ত?'' প্রমথেশবাবু তাকালেন মিসেলের দিকে।

মিসেল ঘাড় নাড়লেন। ''তো এদিকে শুয়ে চোখ বুজলে আপানার বাঁদিক হলো ওই পাইনবনের দিকটা। ওদিকটাই কি দেখাত ক্যাথি?''

বোবা হয়ে তাকিয়ে থাকা মিসেলের দিকে ফিরলেন প্রমথেশবাবু, ''আপনি কি বলেছিলেন ক্যাথি স্বপ্নে একটা বিশেষ দিকে আঙুল তুলে দেখিয়েছিল, সেটা কোন দিক, সেটাই বুঝতে চাইছি। আপনি এদিকে মাথা করে শুলে, ধরে নিলাম আপনার সামনেই ক্যাথি, মানে ধরুন এই আমিই ক্যাথি, সেক্ষেত্রে আমি আমার ডান হাতটা তুলে বাড়ালে ত ওইদিকেই দেখানো হবে, তাই না? আর জঙ্গল বলতে আপনার বাড়ির কাছে এই পাইনবন ছাড়া আর কিছু আছে কি?...

''কিন্তু, মানে, এভাবে ত ভেবে দেখিনি প্রমথেশবাবু!''

''এভাবে ভেবে দেখার জন্যই ত আমাকে ডেকেছেন তাই না? চলুন, এবার আপনার ছোট কন্যার সঙ্গে আলাপ করা যাক।''

লিজা বসেছিল নীচের ঘরে, মামার কোলে। মিষ্টি সুন্দর বাচ্চা একটা, কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো মুখটা একেবারে ভাবলেশহীন। আমি জানতাম লিজার সাথে দেখা হবে, তাই একটা চকোলেট নিয়ে গিয়েছিলাম ওর জন্য। তিন—চারবার বলার পর অনেক কষ্টে হাতে ধরাতে পারলাম সেটা। প্রমথেশবাবু গোটা ব্যাপারটাই লক্ষ্য করলেন, কিন্তু কিছু বললেন না। সরে এলাম বারান্দার কাছে, প্রমথেশবাবু তখনও ভিতরেই দাঁড়িয়ে আছেন। মিসেল অপ্রস্তুত গলায় বললেন, ''আসলে ও সেদিনের পর থেকেই খুব সন্ত্রস্ত হয়ে আছে। বাড়ির লোক ছাড়া কারোর সাথেই ভালোভাবে মিশতে পারছে না।... আপনি কিছু মনে করবেন না...''

আমি মাথা নেড়ে কিছু একটা বলতে যাচ্ছি, দেখি প্রমথেশবাবু কথা বলছেন লিজার সাথে। কি একটা যেন জিজ্ঞাসা করছিলেন ওকে। লিজা মাথা নাড়ল। আগেও দেখেছি ওনার একটা অদ্ভুত ক্ষমতা আছে মানুষের সাথে মিশে যাওয়ার। এমনিতে গম্ভীর অল্পভাষী, কিন্তু যখন কারোর সাথে মেশেন তখন মুহূর্তেই তার মন জয় করে ফেলেন। এভাবে কথা বের করতেও ওনার জুড়ি মেলা ভার। ঠিক এই সময়েই যিনি পর্চ দিয়ে ঘরে ঢুকলেন, তাঁর পোশাক দেখে বুঝতে অসুবিধা হল না, ইনি কে। ''ফাদার যোসেফ''... এগিয়ে গেলেন মিসেল। ''হ্যাঁ, প্রমথেশবাবু এসেছেন শুনে আমি...''

''হ্যালো ফাদার''...

''নমস্কার প্রমথেশবাবু'''..

''আপনি এসেছেন যখন, আমি জানি একটা কিছু ব্যবস্থা হবে।...''

মৃদু হাসলেন প্রমথেশবাবু। ''সে রাতে আপনিও এ বাড়িতে ছিলেন তাই না ফাদার?''

''কোন রাতে...'' আচমকাই ফাদারের গলাটা যেন কেমন সতর্ক শোনাল, নাকি আমার মনের ভুল!

''যে রাতে ক্যাথি নিখোঁজ হয়...''

''ইয়ে, হ্যাঁ, আমাকে ন্যাট রিকোয়েস্ট করেছিল। আমি থাকতে চাইনি জানেন, কিন্তু ওদের কথা ফেলতে পারলাম না তাই...''

''তাতে কি হয়েছে... আমি শুধু জানতে চাইছি, সে রাতে আপনি কি কিছু শুনেছিলেন? এমন কিছু যেটা স্বাভাবিক নয়?''...

মাথা নাড়লেন পাদ্রীসাহেব। ''তেমন কিছুই পড়েনি আমার। তবে...''

''তবে?''

''যোসেফ, এসেছিল'' ন্যাথানিয়েল ছেদ পড়ল প্রশ্নে। আপনারা ভিতরে এসে কথা বলুন প্রমথেশবাবু। আর, তেমন কিছুই ত করতে পারিনি, একটু কফি হয়েছে, প্লিস, ভেতরে আসুন।''

কফিতে চুমুক দিয়ে প্রমথেশবাবু পুরোন প্রশ্নটার খেই ধরলেন আবার।

''তবে কি, সেটা বলুন ফাদার।''

ন্যাট আর ক্যাথির মামাকে দেখে কেমন যেন সিঁটিয়ে গেলেন ফাদার যোসেফ। ''তেমন কিছুই না প্রমথেশবাবু, আসলে আমার রাতে ঘুম ভালো হয় না, আমি ইনসমনিয়ার পেসেন্ট। ত সে রাতেও আমার ঘুম ভালো হচ্ছিল না। কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছিল। আর মনে হয়েছিল এ বাড়িতে কিছু একটা আছে। কোনো ইভিল স্পিরিট। আমি সাবধানও করেছিলাম ন্যাটকে। দেখুন, আজ কি অবস্থা। ক্যাথির আত্মা আজ ইভিল স্পিরিটের কাছে বন্দি। মেয়েটার মুক্তির ব্যবস্থা করুন প্রমথেশবাবু।''

''প্রমথেশবাবু, প্লিস, আমাদের ফ্যামিলিটা বাঁচান। ক্যাথিকে ত আর ফিরে পাব না, শুধু একটু শান্তি চাই এখন আমি।''

ক্যাথির মামা যেন ফাদারকে একটু এড়িয়ে যাচ্ছেন। উনিও তাহলে ফাদারকে সন্দেহ করেন, এটা ঠিক আর ক্যাথলিক চার্চের ফাদারদের ইতিহাস জানতে কারোর বাকি নেই। যোসেফকে কেন জানি না আমারও ঠিক সুবিধের মনে হচ্ছে না। লোকটা কিছু লুকোচ্ছে, এটা নিশ্চিত। তবে, প্রমাণ ত কিছু নেই, তাই কি ন্যাট কিছু বলছেন না, শুধু ব্যবহারে কিছুটা উষ্মা প্রকাশ ছাড়া!

প্রমথেশবাবুর কফি খাওয়া শেষ। দুজনের দিকেই ফিরে তাকালেন তিনি এক এক করে।

''আপনারা তাহলে দুজনেই ধরে নিয়েছেন যে ক্যাথি আর বেঁচে নেই। এখন শুধু তার অসাধু আত্মার থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আমায় ডাকা হয়েছে।''

''প্রমথেশবাবু...আমরা...''

''শুনুন, একটা কথা বলি, আমাকে যখন দায়িত্ব দিয়েছেন তখন আমাকে দুটো দিন সময়ও দিন। আমার একটু ভাববার দরকার আছে। পরশু সকাল দশটায় বসব আমার বাংলোয়। আসবেন আপনারা সবাই। চলি এখন, চলো অরুণেশ।''

ওদের হতভম্ব মুখগুলোর সামনে দিয়ে, আর একটিও কথার সুযোগ না দিয়েই, নিজের স্বভাবমতো আচমকাই বিদায় নিলেন প্রমথেশবাবু। আমার মনের মধ্যে গুমরোতে থাকা প্রশ্নগুলো করার সুযোগ খুঁজতে খুঁজতেই গাড়িতে উঠলাম। জানি না, কি হতে চলেছে আগামী চব্বিশ ঘন্টায়, তবে ওনার মাথায় যে কিছু একটা প্ল্যান আছে, আমি সে—ব্যাপারে নিশ্চিত। আগের অভিজ্ঞতায় বুঝেছি, উনি আসলে ওনার কিছু কাজ করার জন্য কালকের দিনটা নিলেন, কিন্তু সেটা কি, সেটা এখনো বুঝে উঠতে পারিনি।

চার

রাস্তার প্রায় সবটাই চড়াই। ভীষণ কষ্ট হচ্ছে এভাবে এগোতে, কিন্তু কতটা এগোব আর কতদূর গিয়ে লক্ষ্যবস্তু পাব সেটা বুঝতে পারছি না। আর হ্যাঁ, লক্ষ্যবস্তুটাই বা কি? সেটাও জানি না যথারীতি। প্রমথেশবাবু দিব্বি এগিয়ে যাচ্ছেন তরতর করে। এই বয়সে যে কিভাবে ওনার এত ক্ষমতা হয়, জানি না। ঘড়িতে সন্ধে সাতটা। কাল বাংলোয় ফেরার পর তেমন কোনো কথা ওনার মুখ থেকে বের করতে পারিনি। শুধু খেতে বসে যখন জিজ্ঞেস করলাম যে ওদের বাড়িটা সত্যিই হন্টেড কিনা, আর ফাদার যোসেফকে ওনার কেমন মনে হয়েছে, উনি একটাই কথা বলেছিলেন।

''আমি কোনো অনিষ্টকারী আত্মার উপস্থিতি টের পাইনি ওই বাড়িতে।''

তখন আমার অবাক হবার পালা। ''তাহলে কি ক্যাথি বেঁচে আছে? আর যোসেফ কি তাহলে...''

''আর প্রশ্ন নয় অরুণ, কাল বেরোতে হবে, তার জন্য আমার কিছু প্রস্তুতির দরকার।'' আলোচনা সেখানেই শেষ করে দিলেন প্রমথেশবাবু।

আজ বের হয়েছি দুপুর দুটোয়। চারটের সময়ই এসে পড়েছি মিরিকে ব্রুকদের বাড়ির কাছে। কিন্তু ভিতরে যাইনি। প্রমথেশবাবু বাইরে থেকে বাড়ির চারপাশটা দেখতে চেয়েছিলেন। কিছুক্ষণ এভাবে গেল। তারপর খুব সন্তর্পণে বাড়ির পাঁচিলের ডানধার ঘেঁষে প্রমথেশবাবু পৌঁছলেন মিসেলের শোবার ঘরের ঠিক নীচে। জানলার দিকে বেশ কিছুক্ষণ চেয়ে কি যেন হিসেব করলেন একটা। তারপরেই ফিরে হনহন করে হাঁটা দিলেন জঙ্গলের দিকে। তারপর প্রায় ঘন্টা দুয়েক কেটে গেছে। আমরা জঙ্গলটার বিভিন্ন দিক ঘুরে চলেছি। প্রমথেশবাবু এইসব অঞ্চলগুলো হাতের তালুর মতো চেনেন। আমার আপাতভাবে এদিক—ওদিক মনে হলেও আমি জানি উনি দিকভ্রষ্ট হননি। শুধু উনি যেটা খুঁজছেন সেটা এখনো পাননি। ভাবতে ভাবতে একটু পিছিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ চাপা গলায় প্রমথেশবাবুর ডাক শুনতে পেলাম।

''অরুণ, অরুণ...এদিকে এসো...''

হাঁচড়পাঁচড় করে উঠলাম। একটু উঠতেই দেখলাম একটা মোটামুটি সমতল জায়গা। একটা কাঠের কেবিন দেখা যাচ্ছে। মিটার কুড়ি দূরে হবে। পাহাড়ের অন্ধকার বড় অন্যরকম। ঝুপসি হয়ে আসা প্রকৃতির মাঝে দাঁড়িয়ে কেমন অন্যরকম একটা অনুভব হচ্ছিল। আজ আকাশে চাঁদ আছে। কিন্তু তার আলো বড়ই ফ্যাকাসে। কি যেন একটা অসুবিধে হচ্ছে। কি যেন একটা স্বাভাবিক নয়। কিন্তু সেটা কি, বুঝতে পারছিলাম না। প্রমথেশবাবুর পাশে দাঁড়িয়ে ওনার দিকে ফিরে প্রশ্নটা করতে যাব, দেখলাম উনি ঠোঁটের উপর আঙুল রেখে কেবিনের দিকে তাকালেন। আরে, অন্ধকার কেবিনটার কোণের জানালায় আলোর আভাস দেখতে পাচ্ছি। প্রমথেশবাবুকে অনুসরণ করে চুপিসাড়ে এগিয়ে গেলাম কেবিনটার একেবারে কাছে। জানলার পাশে গিয়ে খুব সন্তর্পণে উঁকি মারলাম ভিতরে। আর ভিতরটা দেখেই স্থানু হয়ে গেলাম আমি। একটা মনখারাপি হলদেটে আলো জ্বলছে ঘরটায়। একপাশে একটা বেড, হ্যাঁ, বেড, সাধারণ বিছানা নয়। হসপিটালে যেরকম থাকে সেইরকম বেড। তার উল্টোদিকের দেওয়ালে অসংখ্য যন্ত্রপাতি। ভয়ানক সব যন্ত্র। অদ্ভুত দর্শন কাঁচি, হাত বাঁধার লোহার বেড়ি, চামড়ার বেল্ট, গ্রিপার, জিভ—ছেঁড়া বা টাং রিপার, ব্রেস্ট—রিপার, এই কটাই মোটামুটি সনাক্ত করতে পেরেছিলাম সেদিন, আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে। কিন্তু যেটা দেখে আমি স্থানু হয়ে গিয়েছিলাম সেটা এই যন্ত্রগুলোও নয়। ঘরের মাঝখানে একটা চেয়ার ছিল। দুর্ভাগ্যক্রমে একটা বিশেষ পেপারের জন্য পড়াশোনা করতে হয়েছিল টর্চারের বিভিন্ন সামগ্রীর ওপর, সেই থেকেই জেনেছিলাম নামটা, জুডাসের চেয়ার। অষ্টাদশ এবং ঊনবিংশ শতকে ব্যবহৃত অসংখ্য কাঁটাওলা একটা লোহার চেয়ার যার বসার জায়গায় নীচে চেয়ারটাকে গরম করার জন্য হিটার জাতীয় কিছু রাখা হত। কোনো বন্দিকে সাংঘাতিক কষ্ট দেবার জন্য এই চেয়ার ব্যবহার করা হত তখন। সে চেয়ার যে এখনো থাকতে পারে, আর সেটাও এখানে, এটা আমার কাছে একেবারেই অসম্ভব একটা ভাবনা ছিল। কিন্তু না, সেজন্যেও নয়। আমি স্থানু হয়ে গিয়েছিলাম তার কারণ, চেয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা। দেওয়ালের অর্ধেকটা খালি করে ফেলেছেন তিনি। একটা বস্তায় ভরছেন অস্ত্রগুলো। এক এক করে। প্রমথেশবাবু ইশারায় ডাকলেন আমায়। দেখলাম ওনার হাতে চলে এসেছে ওনার বহুদিনের সঙ্গী অটোমেটিক রিভলবার। পায়ের শব্দ না করে, প্রায় ভেসে ভেসে এগিয়ে গেলাম দুজনে। আচমকাই ভেজানো দরজায় ধাক্কা দিলেন প্রমথেশবাবু। হাট হয়ে খুলে গেল দরজাটা। রিভলবারটা সোজা তোলা হাট হয়ে থাকা দরজার সামনেই যে মানুষটা দাঁড়িয়ে আছেন, তার অবাক চোখের সামনে।

''বেরিয়ে আসুন। বেরিয়ে আসুন বলছি, কোনোরকম চালাকির চেষ্টা করবেন না আর।''

''আপনি, আপনি কি করে, আমি কিছু...আপনি ভুল বুঝছেন প্রমথেশবাবু আমি আমি''...তোতলালেন ভদ্রলোক।

''আমি ত এখনো কিছু বলিনি আপনাকে, কি বুঝেছি সেটা না জেনেই ভুল বুঝেছি ধরছেন কেন?'' শ্লেষ ঝরে পড়ল প্রমথেশবাবুর গলায়।

''আমি, আমি ক'দিন আগেই আবিষ্কার করেছি কেবিনটা, আর ভাবছিলাম যে...''

''ক'দিন আগেই আবিষ্কার করেছেন? তাহলে আমাদের জানালেন না কেন এটার কথা?''

''আসলে আমি ঠিক বুঝতে পারছিলাম না।''

আপনি ঠিক কি বুঝতে পারছিলেন না? আমি সন্ধান করে আপনার এই ছোট্ট প্লেসার—হাউসে পৌঁছে যেতে পারব কিনা, নাকি আপনার ভয়ের আসল কারণটা অন্য।''

''প্রমথেশবাবু...''

''চিৎকার করবেন না, আমার সাথে কেউ চেঁচিয়ে কথা বলে না, হাত ওপরে করুন। ওপরে...অরুণ আমার রুকস্যাক থেকে দড়িটা বের করো।'' যন্ত্রচালিতের মতো বের করলাম দড়িটা।

''এবার যাও গিয়ে ওনার হাত দুটো বাঁধ।'' এগিয়ে গেলাম, কিন্তু হাত বাঁধতে গিয়েই হলো বিপত্তি। আমাকে এক ঝটকায় ধরাশায়ী করে লোকটা হুড়মুড়িয়ে গিয়ে পড়ল প্রমথেশবাবুর ঘাড়ে। ওনাকে সরিয়েই নিমেষে পা দিল বাইরে। চকিতে উঠে ঘুরে দাঁড়ালেন প্রমথেশবাবুও। দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম আমি। ইস, আমার দ্বারা যদি একটা কাজও ঠিকভাবে হয়। বেরিয়ে ছুটতে যাব এমন সময় পিছন থেকে টানলেন প্রমথেশবাবু। ''ওদিকে দেখো অরুণ!'' তাকালাম প্রমথেশবাবুর আঙুল অনুসরণ করে। আমাদের থেকে মিটার দশেক দূরে দাঁড়িয়ে আছে লোকটা। কিন্তু না, দাঁড়িয়ে নেই, কেউ যেন ওকে জোর করে আটকে ধরে আছে। ওর পিছনের পাইনগাছটার নীচের ডালগুলো অস্বাভাবিকভাবে ঝুঁকে এসেছে। ওই ত, ওই ত গলাটা আঁকড়ে ধরল ডালটা। দৌড়ে গিয়ে লোকটাকে ছাড়ানোর কথা ভাবছিলাম আমি, বাধা দিলেন প্রমথেশবাবু। আমি হলফ করে বলতে পারি, যা দেখেছি তার সবটুকুই সত্যি। আর তারপর যা দেখলাম, তাতে আমার পা যেন মাটিতে গেঁথে গেল। মরা চাঁদের আলোয় স্পষ্ট দেখতে পেলাম আটটি ছায়ামূর্তি ক্রমশ ঘিরে ধরছে লোকটাকে। আর লোকটা মাটি থেকে ক্রমশ গাছটার গুঁড়ি ধরে উপরে উঠে যাচ্ছে। না, উঠে যাচ্ছে বলা ভুল। গাছটার নেমে আসা ডালগুলো লোকটার গলা ধরে নির্মম দক্ষতায় গাছটার কাণ্ড ধরে ছেঁচড়ে তুলছে তাকে। কতক্ষণ এভাবে চলেছে জানি না। কিন্তু সেইখানে, সেই চরম মুহূর্তে টের পেলাম অনেকক্ষণ থেকে হওয়া অসুবিধাটা কি! জঙ্গলের একটা নিজস্ব শব্দ থাকে। গাছের শব্দ, পতঙ্গের শব্দ, বাতাসের শব্দ, পশুপাখির শব্দ। কিন্তু এই জঙ্গলটায় কোনো শব্দ টের পাইনি এতক্ষণ। এরকম নিশ্ছিদ্র নীরবতা আগে কখনো কোনো জঙ্গলে দেখিনি। আমরা প্রায়ই শহরের শব্দদূষণ নিয়ে আক্ষেপ করি। পাহাড়ের নীরবতায় ফেরার কথা বলে কাব্য করি, কিন্তু নীরবতার যে কি পাষাণপ্রমাণ ভার হতে পারে, সেটা সেদিন সেই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে যেভাবে অনুভব করেছি তার সারাজীবনেও কখনো ভুলতে পারব না। আর সেটা মোটেই সুখস্মৃতি নয়।

চোখের সামনে ছটফট করতে করতে লোকটা মাটি থেকে আন্দাজ ফুট ছয়েক উপরে উঠে গেল। চোখ বেরিয়ে এসেছে চাপে, জিভ মনে হচ্ছে খসে পড়বে। বীভৎস দৃশ্যটা থেকে মুখ ঘুরিয়ে তাকালাম প্রমথেশবাবুর দিকে। আশ্চর্য! ভাবলেশহীন মুখে তাকিয়ে উনি, যেন তেমন কিছুই ঘটছে না! কিন্তু না, হঠাৎই পরিবর্তন হলো ওনার মুখভাবে। ''দেখো, অরুণ, ভালো করে দেখো, গাছটার ডান দিকের জন!'' ফিসফিস করে কথাকটা বলেই তীক্ষ্নদৃষ্টিতে তাকালেন প্রমথেশবাবু, ওনার দৃষ্টি অনুসরণ করে যা দেখলাম, তাতে হৃদস্পন্দন স্তব্ধ হয়ে এলো। একেবারে ডানদিকের ছায়ামূর্তিটির পরণের পোশাকের রং গাঢ় গোলাপি।

পাঁচ

''আমি আর কিছু ভাবতে পারছি না প্রমথেশবাবু। কিন্তু তবুও আমি জানতে চাই সবটা। আপনি বলুন''...

আরেকটা সকাল। না, প্রমথেশবাবুর কথামতো তারপরের দিন নয়। আরো চারদিন পরের একটা সকাল। এরমধ্যে জঙ্গল থেকে লাশ আবিষ্কার হয়েছে। শুধু তাই নয়। প্রমথেশবাবুর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওই পাইনগাছের নীচের মাটি খুঁড়ে পাওয়া গেছে মোট আটটি কঙ্কাল। যাদের ওপর সাংঘাতিক টর্চারের চিহ্ন বর্তমান, যার মধ্যে একজনের পরণে ছিল গাঢ় গোলাপি রঙের নাইট গাউন। পুলিশ এসেছে, এবং যথারীতি কোনো ক্লু না পেয়ে বলেছে দেখা করবে প্রমথেশবাবুর সঙ্গে! কিন্তু এসবের আগে দরকার ছিল মুখোমুখি আলোচনার। আর সেকারণেই হাজির হয়েছেন সবাই, আজ প্রমথেশবাবুর বাংলোর ঘরে। তেনজিংজির দেওয়া কফির কাপে চুমুক দিয়ে শুরু করলেন প্রমথেশবাবু। ''হেবে বলে এক জিউসকন্যার উল্লেখ পাওয়া যায় গ্রীকপুরাণে। যিনি কিনা তরুণ, বা বলা ভালো মূলত কিশোর বয়স্কদের রক্ষাকারী এক দেবী। ইনি যাদের রক্ষা করেন তাদের বয়স মোটামুটিভাবে, ধরা যায় এগারো থেকে উনিশ। এনার নাম থেকেই শব্দটা এসেছে, হেবেফিলিয়া। জানি আপনারা শব্দটার সাথে পরিচিত নন, তাই একটু বিশদে বলছি। পিডোফিলিয়া শব্দটা হয়তো আপনারা শুনেছেন। শিশুদের ওপর থাকা বিকৃত যৌনকামনাকে পিডোফিলিয়া বলে। কিন্তু এর অনেক শ্রেণীবিভাগ আছে। তার মধ্যে একটা হলো হেবেফিলিয়া। কিশোর—কিশোরীরাই হেবেফিলিক ব্যক্তির একমাত্র টার্গেট। একেবারে শিশুরা নয়, বা আঠারোর উপরে থাকা ব্যক্তিরাও নয়। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে এ নিয়ে বহু রিসার্চ হয়েছে। আমেরিকার নিউইয়র্কে সিং সিং জেলে এদের একটা সেল আছে আলাদা। কিন্তু আমাদের দেশে একটা বড় সমস্যা হলো এ নিয়ে কেউ কোনো কথা বলতে চায় না। জানাজানি হলে সামাজিক কলঙ্কের ভয়, একলা হয়ে যাবার ভয়, স্রোতের বিপরীতে যাবার মানসিকতা না থাকা, লড়াই করার সাহস না থাকা, সর্বোপরি অন্যায়কারীর জিতে যাবার সম্ভাবনা শতকরা একশো, হ্যাঁ একশো শতাংশ হওয়া... এই সবকিছুর জন্যই অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপরাধীরা আমাদের সামনে থাকে, কিন্তু আমরা কিছু করতে পারি না। আর তারাও এই বিকৃত মানসিক ব্যাধির থাবা বসিয়ে চলে নিরীহ, নিরপরাধ শিশুগুলোর ওপরে। এর দায় কিন্তু আমাদের ওপরেও বর্তায়, যারা কিনা সবকিছু জেনেও চুপ করে থাকি। পূর্ণদৃষ্টিতে ফাদার যোসেফের দিকে তাকালেন প্রমথেশবাবু। যোসেফ জেনেছিলেন। কিন্তু...

''আপনি বিশ্বাস করুন প্রমথেশবাবু আমি কিন্তু ওকে বলেছিলাম, ও মানতে চায়নি, আমার কোনো কথা শুনতে চায়নি ও। আমি...''

''সেটা যথেষ্ট নয় যোসেফ। আটটি বাচ্চার প্রাণ চলে গেল।... সেটা যথেষ্ট নয়...'' এত উত্তেজিত কখনো দেখিনি প্রমথেশবাবুকে।

''আপনি বিশ্বাস করতে পারেননি, না ভয় পেয়েছিলেন? মিসেস ব্রুক?''

মাথা নীচু করে বসে আছেন মিসেস ব্রুক। কোনো জবাব নেই মুখে।

''সেই পরবের রাতে উনি ক্যাথির ঘরে গিয়েছিলেন অন্যান্য অনেক রাতের মতোই। কিন্তু ক্যাথি আগের মতো ছোটটি আর ছিল না। তাছাড়া পূর্ব অভিজ্ঞতার ধাক্কা তাকে বুঝিয়েছিল যে প্রতিবাদের রাস্তায় হাঁটতে হবে। কিন্তু সে ছোট ছিল। তার একটা সমর্থনের দরকার ছিল, সাহায্যের দরকার ছিল। ক্যাথি আপনাকে পাশে পায়নি তার চূড়ান্ত প্রয়োজনের সময়। নিজের বাবা! অনুভব করতে পারেন ক্যাথির শকটা? ক্যাথি বুঝে গিয়েছিল যে তার পাশে কেউ দাঁড়াবে না, তাই একাই প্রতিবাদের রাস্তায় হাঁটতে গিয়েছিল সে। বিপদ বুঝে ন্যাথানিয়েল তাকে নিয়ে চলে আসেন তাঁর গোপন আস্তানায়। হয়ত নিজের মেয়েকে সেখানে নিয়ে যাবার ইচ্ছে ততটাও ছিল না, কিন্তু ক্যাথির চিৎকার সে রাতে শুনে ফেলেন যোসেফ। এবং উপরে উঠে সবটা নিজের চোখে দেখেন তিনি। বন্ধুকে ভয় দেখিয়ে মুখ বন্ধ করেন ন্যাথানিয়েল। প্রাণের ভয়, কি তাই ত যোসেফ!'' যোসেফের দিকে তীব্র চোখে তাকালেন প্রমথেশবাবু। তারপর ওনার উত্তরের অপেক্ষা না রেখেই বলতে লাগলেন, ''জঙ্গলের কাঠের কেবিনে অন্যান্যবারের মতোই ক্যাথিকে নিয়েও চলে নানা ধরনের বিকৃত খেলা। যার ধাক্কা সইতে না পেরে ক্যাথি মারা যায় অন্যান্যদের মতোই, আজ থেকে ঠিক মাস—আড়াই আগে। আর অন্যান্যদের মতোই ন্যাথানিয়েল ওকে কবর দিয়ে দেন কাছের পাইনগাছটার তলায়। আপনারা যখন আমার কাছে প্রথম আসেন, তখনই লক্ষ্য করেছিলাম যে ন্যাথানিয়েলের বিশেষ উৎসাহ নেই তদন্তের ব্যাপারে, বারবার উনি যেন একটা জিনিসই আমার থেকে চাইছেন আর সেটা হলো ক্যাথির আত্মার মুক্তি! উনি যেন শুরু থেকেই জানতেন যে ক্যাথি বেঁচে নেই। তাই যদি হয়, তাহলে তার মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান করার আগেই, তাকে চিরতরে মুক্তি দেওয়ার ইচ্ছেটা আমার কাছে একটু অস্বাভাবিক লেগেছিল। আপনাদের বাড়ির থেকে চলে আসার পর আমি একটু রিসার্চে মন দিই। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই বিভিন্ন সোর্স থেকে জানতে পারি যে গত দশ বছরে মিরিক এবং তার আশেপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ছয় থেকে সাতজন টিনেজার মেয়ে নিখোঁজ হয়েছে।

আমার অস্বাভাবিক লেগেছিল আরো দু—একটা জিনিস। যে দুটি ঘটনার কথা আপনি বলেছিলেন সে দুটিতেই একটা ব্যাপার কমন ছিল, সেটা হল, আপনি যাবার পর তথাকথিত আত্মার হাত থেকে ছাড়া পেয়েছে লিজা। বোনকে ক্যাথির ভালোবাসার কথাটা আপনার মুখ থেকে শোনার পরই মানেটা আমার কাছে পরিষ্কার হয়। ও বাড়িতে কোনো ইভিল স্পিরিট ছিল না মিসেল। ছিল এক অসহায় দিদির আত্মা, যে নিজের বোনকে বাঁচতে চেষ্টা করছিল তাদেরই বিকৃতকাম বাবার হাত থেকে। লিজাকে তার বাবার কাছে ছাড়তে চাইছিল না ক্যাথি। আক্রমণের জন্য নয়, বাঁচাবার জন্য লিজাকে সে টেনে নিয়ে যেতে চাইছিল কোনো সুরক্ষিত জায়গায়। তাই যতবার আপনি গিয়েছেন, সে লিজাকে আপনার কাছে ছেড়ে দিয়েছে সাথে সাথেই।

এদিকে চড়ছিল নেশা! থাকতে পারছিল না ন্যাথানিয়েল। আসলে ক্যাথির পর দুমাসের বেশি কেটে গিয়েছিল, আর নতুন শিকার ঘরেই পেয়ে গিয়েছিল নরপিশাচ ন্যাথানিয়েল। এবারে সম্ভবত আপনিও কিছুটা বুঝেছিলেন ব্যাপারটা, শুরুতেই। তাই হয়ত অবচেতনে হলেও শাস্তি চেয়েছিলেন। নিষ্কৃতি চেয়েছিলেন। আর সেকথা ভেবেই আমার কাছে আসেন আপনি। আর আপনার বাড়িতে আমার কথা শুনে ন্যাথানিয়েল বুঝে যান যে আমি কিছু আন্দাজ করেছি। সে রাত থেকেই ওনার চেষ্টা ছিল ওই কেবিন থেকে সবকিছু সরিয়ে ফেলার। কিন্তু সে সুযোগ আর উনি পাননি।

''কেন সেদিন বারবার করে আমি ওর পোশাকের কথাটা জানতে চেয়েছিলাম জানেন? কোন বাবা কখনো তার চোদ্দ বছরের মেয়েকে জন্মদিনের উপহার হিসাবে রাতপোশাক দেয় না। এটা স্বাভাবিক নয়। এটা সিগনাল। আর আমরা এই সিগনালগুলোই মিস করি। গাঢ় গোলাপিকে মনস্তত্ত্বে কামনার রং হিসাবে অনেক সময়েই দেখা হয়। এগুলো আমরা বুঝেও বুঝি না, বুঝতে চাই না, চোখ বন্ধ করে পার হতে চাই প্রলয়, কিন্তু তা যে হয় না মিসেল। আমি জানি কথাগুলো শুনতে আপনার খুব খারাপ লাগছে। কিন্তু...''

''আমাকে আমার ভাই দু—একটা ঘটনার কথা বলেছিল। আমি তখন ব্যাপারটা সিরিয়াসলিই নিই। আমি বুঝিয়েছিলাম ওকে।... ও বলেছিল যে এটা ওর রোগ। আগে ছিল, এখন আর হবে না। আমার কাছে ক্ষমাও চেয়েছিল। ভেবেছিলাম মেয়েকে দেখে...আপনি বিশ্বাস করুন ও যে এতগুলি মেয়ের সর্বনাশ করেছে তা আমি জানতাম না, ভাবতেও পারিনি। ভেবেছিলাম মেয়েকে কাছে টেনে ও শান্ত হয়েছে, হয়ত পিতৃস্নেহ...হয়ত...''

প্রমথেশবাবু ঝুঁকে এলেন মিসেলের দিকে, গাঢ়স্বরে বললেন, ''একটা জিনিস মাথায় বসিয়ে নিন মিসেল। এইসব লোক থেকে কোনওদিন কারোর পিতা, ভাই, স্বামী হয় না। আর এরা আমাদের মধ্যেই থাকে। আমাদের পাশে বসে, আমাদের সঙ্গে এক দোকান থেকে মিনারেল ওয়াটারের বোতল কেনে, বাসে একসাথে পার হয় রাস্তা, সিনেমা দেখতে যায়, কিন্তু তাই বলে এরা আমাদের মতো নয়। এদের মধ্যে মানুষের সহজ—স্বাভাবিক সম্পর্কগুলোর প্রতি বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা থাকে না। এদের খিদের কাছে সবকিছু ম্লান হয়ে যায়। এদেরকে চিনতে শিখুন। আপনার সৌভাগ্য যে লিজা বেঁচে গেছে, কিন্তু একটা কথা মনে রাখবেন, ন্যাথানিয়েলরা শেষ হয়েও শেষ হয় না। সতর্ক থাকবেন। ভালো থাকবেন।...''

ল্যাণ্ডফোনটা বেজে উঠল হঠাৎই...একপাশ থেকে শুধু প্রমথেশবাবুর কথাই শুনতে পেলাম আমরা...

''বলছি...''

''হ্যাঁ, ইন্সপেক্টর বলুন...''

...

''সেটা আমার পক্ষে জানা সম্ভব নয়। আমি মেয়েটির অন্তর্ধান রহস্যের সমাধান করতে গিয়েছিলাম। ওই গাছে ওনার লাশ দেখে আপনাদের খবর দিই।...''

...

''কিভাবে হলো তা ত আমি জানি না, তবে...''

...

''জানি...হ্যাঁ, কেবিনটা...স্যাডিস্ট বলেই আমারো অনুমান।...''

...

''আমার মতে আপনি বাকি বডিগুলো আগে ডিএনএ টেস্ট করে সনাক্তকরণের ব্যবস্থা করুন...''

...

''ওই মেয়েগুলির বাড়ির কেউ কি না জানি না ইন্সপেক্টর...''

...

''হ্যাঁ, শুনেছি ভদ্রলোকের হাতের মুঠোয় পাওয়া গেছে একটুকরো গোলাপি কাপড়।...''

...

পরিশিষ্ট

''প্রশ্নটা করেই ফেল অরুণ...''

বসে আছি প্রমথেশবাবুর বারান্দায়। বিকেল শেষ হচ্ছে ক্রমশ। দুপুরের দিকেই বিদায় নিয়েছেন মিসেল আর ফাদার। শুধু মনে একটা কুটিল প্রশ্ন বারবার উঁকি দিয়ে যাচ্ছিল যেটা কিছুতেই শান্তি দিচ্ছিল না আমাকে। এবার করেই ফেললাম সেটা...

''আপনি বলেন every Life matters....আপনি নিশ্চয়ই আন্দাজ করেছিলেন এরকম কিছু একটা হতে পারে, সেক্ষেত্রে আমাদের কি ন্যাথানিয়েলকে বাঁচিয়ে পুলিসের হাতে তুলে দেওয়া উচিত ছিল না? এভাবে চোখের সামনে...''

ইস্পাত—শীতল চোখে আমার দিকে তাকালেন প্রমথেশবাবু।

''আটটি নিষ্পাপ এবং ক্রোধী আত্মার সঙ্গে লড়াই করার ক্ষমতা আমার ছিল না অরুণ। আর সবকিছু আগে থেকে আন্দাজ করা সম্ভব নয়। আমি ঈশ্বর নই। ...এবার আমি একটা প্রশ্ন করি? ন্যাথনিয়েলকে যদি পুলিসের হাতে দেওয়া যেত, যেটা আমি ভেবেওছিলাম প্রাথমিকভাবে, তাহলে বিচারের জন্য মাসের পর মাস কেটে যেত, তখন এই নির্বোধ মিসেলই আবার ওকে ক্ষমার কথা তুলতেন। নিজের মেয়েটা চোখের সামনে গুটিয়ে যাচ্ছে দেখেও উনি পারতেন না। বিশ্বাস রাখতে পার, মিসেলের দলে পড়েন শতকরা পঁচানব্বই জন মানুষ। ক্যাথি একটি শক্তিশালী আত্মা। বাকিরা যা পারেনি তা ও পেরেছে। আত্মাদের দেহ ধারণ করা ভীষণ কষ্টকর একটা ব্যাপার। ক্যাথি কেন পেরেছে জান? ও চেষ্টাটা এবার নিজের জন্য নয়, ওর বোনের জন্য করছিল তাই। শুভশক্তির কাছে একটা না একটা সময় অশুভশক্তিকে পরাস্ত হতেই হয়। এবার লিজার মুখে আস্তে আস্তে হাসি ফিরে আসবে। ক্যাথি ও তার সঙ্গীরা দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষায় ছিল ওই জায়গাটায়, ক্যাথির পর আসলে, উনি ওই কেবিনে আর যাননি। শক, ভয়। আমি শুধু চেয়েছিলাম ওনাকে ওনার কৃতকর্মের মুখোমুখি দাঁড় করাতে। আর কিচ্ছু নয়। বুকে হাত দিয়ে বলো ত, তুমি এতে খুশি হওনি অরুণ?''

সহসা প্রশ্নটার উত্তর দিতে পারলাম না। সন্ধ্যার ঘন আঁধারে রাতপাখিটা করুণস্বরে ডেকে গেল।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%