সেই আতঙ্কের রাত

কৌশিক কারক, আকাশ চন্দ, উৎস ভট্টাচার্য

ট্রেন থেকে যখন নামল সুহাস, তখন দুপুরের রোদের তেজ অনেক কমে গিয়েছে। বেশ মনোরম একটা হাওয়াও বইছে। স্টেশন থেকে বেরিয়ে দেখল টোটো রয়েছে কয়েকটা। একটা রিকশাও দাঁড়িযে রয়েছে। আগে তো ভ্যানই থাকতো বেশি। আগে থেকে বলা থাকলে লতিফ ভ্যান নিয়ে আসত। দাদাবাবু, ''এদিকে এসো।'' চেনা গলা শুনে চমকে তাকায় সুহাস। লতিফই তো। ''ভাগ্যিস এখনও অন্য প্যাসেঞ্জার পাইনি? চলে এসো দাদাবাবু।'' লতিফই তো? চলে এসো দাদাবাবু। লতিফের রিকশায় উঠতে উঠতে সুহাস বলল, ''লতিফ চাচা, তুমি রিকশা কিনলে কবে?'' ''দু বছর হয়ে গেছে দাদাবাবু। ভ্যানটা বিক্রি করে কিছু টাকা পেয়েছিলাম। বাকি টাকা ব্যাঙ্ক থেকে ধার নিয়েছি। মাঝে মাঝে একশো দিনের কাজ করেও কিছু রোজগার হয়।'' ''একটা কথা বলি দাদাবাবু, তোমাদের ওখানে কিন্তু এখন খুব ভূতের উপদ্রব। সাবধানে থেকো।'' কানাঘুষোয় এই খবরও কানে এসেছিল সুহাসের। ''হ্যাঁ, আমিও শুনেছি লতিফচাচা। কিন্তু, হঠাৎ করে ভূতের উপদ্রব শুরু হল কেন কে জানে।'' ''একটা কথা বলছি দাদাবাবু, কিছু মনে কোরো না। তোমাদের বংশটা ভালো। কিন্তু, তোমাদের অন্য শরিকরা যা অত্যাচারী ছিল। কতো মানুষ চোখের জল ফেলছে ওদের জন্য, কতো মানুষের অভিশাপ রয়েছে।'' এটা যে ঠিক, তা জানে সুহাস। আসলে পাশাপাশি দুটো বাড়ি। একটা ভাগ ওদের। সেই বাড়িটা ঠিক রয়েছে। ওরা এক বছর পর পর দুর্গাপুজোর সময় আসে। অন্য বছরটা শরিকদের পালা। তবে শরিকদের বাড়ির অবস্থা খুবই খারাপ। ওদের লোকজনও বিশেষ নেই। ওরা কোনরকম পুজো সেরেই পালিয়ে যায়। ঐ বাড়িতেই নাকি ভূতের উপদ্রব। কিন্তু, দুটো বাড়িই তো পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। সুতরাং, এ বাড়ির লোকজনও এসব শুনে একটু ঘাবড়েছে বই কি! আজ চতুর্থী। সুহাস এসে বাড়ি পরিষ্কার, পুজোর কেনাকাটা, ঢাকি—কুমোর—ডেকরেটরের লোকজনের সঙ্গে কথাবলা—এইসব কাজ এগিয়ে রাখবে। কিছু পেমেন্টও করে রাখবে। ঠাকুর তো অর্ডার দেওয়া আছেই। বাকি সব নিয়েও অসুবিধে নেই। প্রতি বছর একই লোক করে। শরতের নীলসাদা আকাশে ধীরে ধীরে রঙের ছোপ লাগছে। অন্ধকার নামার আগেই বাড়িতে ঢুকে যেতে হবে। ওপরের ঘরগুলো পরিষ্কার করাতে সময় লাগবে। ঐ তো, বিশাল লোহার গেটটা দেখা যাচ্ছে। গেটের দুদিকে দুটো সিংহ বসে আছে। নিজের পূর্বপুরুষের বাড়ির সামনে এলে প্রতিবারের মতো এবারেও মনটা খুশিতে ভরে উঠল সুহাসের।

নীচে থাকে নায়েব হরিপদ আর কাজের লোকেরা। দোতলার ঘরগুলো পরিষ্কার করাতেই সন্ধে হয়ে গেল। সুহাস জিনিসপত্র রেখে কোনরকমে মুখ হাত ধুয়েই ছুটল বাজারে। সঙ্গে গেল রাসু। পরিচিত মুদি দোকান, মিষ্টির দোকান কাছেই খুব একটা সময় লাগল না। আগেই তো সব বলা ছিল। ডেকরেটর পরিমল ওর লোকজন নিয়ে কাল সকাল সকাল চলে আসবে বলল। ওদের পুজোয় ঢাক বাজায় দীনেশ আর তার দলবল। আগে দীনেশের বাবা বাজাত। দীনেশের সঙ্গে কথা বলে বাজারের জিনিসপত্র নিয়ে ওরা বাজার থেকে বেরিয়ে সোজা পুজোবাড়িতে গেল। একদল বাঁদর পুজোবাড়ির ছাদের ওপরে দৌড়ে দৌড়ে বাইরে পালিয়ে যায়। পুজো দালানে বৃদ্ধ বুলান তখনো ঠাকুরের গায়ে রঙ বুলোচ্ছে। ওকে দেখে বুলানের মুখে হাসি ফুটে উঠল। সেই কবে থেকে এই বংশের ঠাকুর গড়ে বুলান। ''দাদাবাবু, আপনাদের পালায় শুধু ঠাকুর বানাবো। ওদের পালায় আর বানানো যাবে না।'' ''কেন গো?'' ''আর কি বলব দাদাবাবু—ওদের লোকজন নেই, ঠিকমতো টাকা পয়সা দেয় না, আর তাছাড়া...।'' ''ওরা অনেক পাপ করেছে। নইলে ওদের ভিটেয় ভূত ঘোরে। সবাই দেখেছে।'' সুহাস চিন্তিত মুখে বাড়ি ফেরে।

ভুবন ঠাকুর আর তার ভাই ভবেশ ঠাকুর এসে পৌঁছল একটু পরেই। পুজো নিয়ে আলোচনা হল। যাওয়ার আগে ভুবন ঠাকুর বলল, ''বুঝলে সুহাস ভাই, পানুবাবুকে বললাম, একটু শান্তি স্বস্ত্যয়ন করিয়ে নিন। রাজি হল না। বাড়িটা ভূতের দখলেই থাকুক তাহলে!'' এটা কলকাতা হলে সুহাস হাসত—কিন্তু, এখানে হাসি এল না। পানু জেঠু তো পুজো ছাড়তে পারলে বাঁচে। পুজোর দায়িত্বে তো পানু জেঠু, তার জামাই মিলন আর ভাইপো অশেষ মিলেই করে। আর কেউ আসেও না থাকেও না। ভুবন ঠাকুর বেরিয়ে যেতে পোশাক বদলে একটু বিশ্রাম নেয় সুহাস। নীচে রান্না হচ্ছে। রান্না শেষ হলেই ওর ডাক পড়বে। চারিদিক ঘন অন্ধকারের চাদরে যেন ঢাকা পড়েছে। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকে যেন কানে তালা লেগে যাবে। কোথায় কলকাতার হইচই আলোকোজ্জ্বল পরিবেশ, আর কোথায় এই গ্রামের নির্জন অন্ধকারাচ্ছন্ন নির্জন রূপ। এর তুলনা হয় না। কলকাতায় লোকের ভীড়ে পুজোর সময় হাঁপিয়ে ওঠে সুহাস।

বাড়ির কাজের লোকেদের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিল সুহাস। ও এখন খেতে নেমেছে একতলায়। ফুলমণির রান্নার হাত চমৎকার। তবে ষষ্ঠী থেকে কেটারিং সার্ভিস। এত লোকের রান্না করতে পারবে না ফুলমণি। আজ সামান্যই রান্না হয়েছিল। রুটি তরকারি আর রুইমাছ। খেয়েদেয়ে হাতমুখ ধুয়ে বাড়ির সামনে একটু হাঁটাহাঁটি করে সুহাস। তারপর দোতলায় উঠে বারান্দায় গিয়ে সিগারেট ধরায় সুহাস। ভাবে, কতো বছরের পুরনো এই পুজো। ওদের পুর্বপুরুষরা এখানে এসেছিল প্রায় সাড়ে চারশো বছর আগে। তখন থেকেই এই পুজো চলছে। আগে নাকি মহিষ বলি দেওয়া হত। এখন তো আখ চাল কুমড়ো আর কলা। একবার নাকি বলিতে বাধা পড়েছিল। বাড়ির বড় কর্তা নিজের রক্ত দিয়ে সে পাপের প্রায়শ্চিত্ত করে। এরপর থেকেই নাকি মহিষ বলি দেওয়া বন্ধ হয়ে যায়। একটু একটু ঠান্ডা হাওয়া বইছে। গা শিরশির করছে। ঘরে ঢোকার আগে সিগারেটটা নেভায় সুহাস। আর তখনি ওর চোখ চলে যায পানু জেঠুদের বারান্দায়। ওটা কে? অন্ধকারে কে দাঁড়িয়ে আছে? ওর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে যে হালকা চাঁদের আলোয় আবছা আবছা দেখা যাচ্ছে। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না মুখটা। সুহাসের মেরুদণ্ড বেয়ে যেন একটা হিমশীতল অনুভূতি বয়ে যায়। ও মুখ ঘুরিয়ে নেয় সঙ্গে সঙ্গে। তারপরে আবার তাকায়। না কেউ নেই দ্রুত ঘরে ঢুকে যায় সুহাস।

প্রথম রাতে কিছুতেই ঘুম হচ্ছিল না সুহাসের। বারবার ঐ মুখটার কথা মনে পড়ছিল ওর। যদিও—বা মাঝরাতে ঘুম এল—হঠাৎ রাতচরা পাখির ডাকে ঘুম ভেঙে গেল ওর। তারপর আর ঘুম আসতে চায় না। ছটফট করতে করতে একসময় অবশ্য ঘুমিয়ে পড়ল সুহাস। সকালে একটু দেরী করেই ঘুম ভাঙল ওর। তাড়াতাড়ি মুখ—হাত ধুয়ে চা খেয়েই রাসুকে সঙ্গে নিয়ে চলল বাজারে। ফিরে এসে দেখে কাকু—কাকিমা আর পলাশ এসে গেছে। পলাশ ওর খুড়তুতো ভাই। একটু পরেই সুহাসের বাবা—মা চলে এল। বাকিরা বোধহয় আজ আসবে না। কাল সকালে অনেকেই আসবে। কাল যে বোধন। পুজো বাড়িতে চলে গেল সুহাস আর পলাশ। আলো পাখা লাগানো হচ্ছে কয়েকটা ঘরে। বিছানারও ব্যবস্থা হচ্ছে। বিছানারও ব্যবস্থা হচ্ছে। মহিলাদের মধ্যে যারা পুজোর কাজ করবে তারা ওখানেই থাকবে। পুজোর দালানে প্রতিমার রঙ প্রায় সম্পূর্ণ। বুলান বলল, ''আর আধঘণ্টার মধ্যেই কাজ শেষ হয়ে যাবে।'' পুজোবাড়ি থেকে ফিরতে অনেক বেলা হল। এর মধ্যেই জেঠুর মেয়ে করবীদি আর ওর বর এসে গেছে। সঞ্জয়দা প্রতি পুজোতেই দশমী পর্যন্ত থাকে। ওদের ছেলে বিল্লু খুব মজার। পুজোবাড়িতে বাচ্চারা না থাকলে জমে না। জেঠু আর জেঠিমা কেউই আর নেই। কিন্তু, করবীদি আসবেই। বিকেলেও পুজোবাড়িতেই সময় কাটল ওদের। রাতের আড্ডা জমে উঠল। সুহাস তখনই ওর গতরাতের অভিজ্ঞতার কথা বলল। কাকিমা বলল, ''ও বাড়িতে তোমরা ভুলেও কখনো যেও না।'' পলাশ বলে, ''দাদা তুই বোধহয় ভুল দেখেছিস।'' সঞ্জয়দা বলল, ''সব কিছুকেই হালকা করে উড়িয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। সাবধানে থাকাই ভালো। ''আজ অবশ্য রাতে ভালোই ঘুম হল সুহাসের।''

ষষ্ঠী থেকে জমজমাট বাড়ি। আজ বোধন। সকালে গ্রামের কালীমন্দিরে গিয়ে দেবীর কাছ থেকে পুজোর অনুমতি নেওয়া হল। এই দেবীকে ডাকাতে কালী বলে গ্রামের লোক। আগে ডাকাতরা নাকি পুজো করত—নরবলিও দিত। এখানে নাকি এক তান্ত্রিকের পঞ্চমুণ্ডীর আসনও আছে! ঠাকুরমশাই পুজোর পরে হঠাৎ একটা জবাফুল সুহাসের হাতে তুলে দিয়ে বললেন, ''সঙ্গে রেখো বাবা।'' সুহাসের মা ফুল ওর মাথায় ঠেকিয়ে রুমালে বেঁধে দিল। সপ্তমীতে সকাল সকাল ''নবপত্রিকা বা কলা'' বৌয়েব স্নান হল। আজ দেশ—বিদেশ থেকে এই শরিকের প্রায় সবই চলে এল। এই কদিন নতুন ধুতি—পাঞ্জাবি পরে ওরা প্রায় সবাই। কেই বলির আখ ধরে, কেউ চালকুমড়ো—আবার কেউ কলা। হারান কামার এককোপে বলি দেয়। বলির বাজনা একেবারে অন্যরকম। বলির জায়গার দুপাশে সার বেঁধে সবাই দাঁড়িয়ে থাকে। রোজই অঞ্জলি দেয় ওরা। ঠাকুরকে সাজানো থেকে শুরু করে ১০৮টা পদ্মফুল ফোটানো, প্রদীপ দিয়ে 'ওঁ' লেখা প্রতিবারই হয়। প্রতিবারেই ভালো লাগে সুহাসের। সারাদিন পুজোবাড়িতে আসে অজস্র দর্শনার্থী। বিভিন্ন গ্রাম থেকে—এমনকি কলকাতা থেকেও আসে। সন্ধেবেলায় আরতি দেখতেও ওর খুব ভালো লাগে। বৈকালিক লুচি—নাড়ু খেতেও বেশ লাগে। নবমীর দিন গ্রামের অনেকেই আমন্ত্রণ পায় পুজোবাড়িতে খাওয়ার। কিন্তু, নবমীর সন্ধে থেকেই মনখারাপ হয়ে যায় সুহাসের। এই ক'দিন ভূতের কথা ভুলে গিয়েছে সুহাস। মনে পড়ে গেল পানুজেঠু আর জেঠুর ভাইপো অশেষকে দেখে। ওরা বিকেলে এসেছে। অতিথিনিবাসে উঠেছে। কালকেই ফিরে যাবে। পানুজেঠু পরিষ্কারই বলল, পুজোর খরচ চালানো আর সম্ভব নয়। সুহাস বুঝল এবার থেকে প্রতি পুজোই ওদের চালাতে হবে। রাতে ওরা পুজোবাড়িতেই খেল। সুহাস আর পলাশ ওদের ছেড়ে দিয়ে এল অতিথিনিবাস পর্যন্ত। পানুজেঠুর ধারণা ঐ বাড়িতে হয়তো অসামাজিক কোনো কাজকর্ম হয়। সেইজন্যই কেউ বা কারা ভূতের ভয় দেখায়। ''ওরা হয়তো চাবির নকল করে ফেলেছে কাজের লোকদের কাছ থেকে চাবি জোগাড় করে।'' কথাটা খুব একটা পছন্দ হল না সুহাসের। অশেষ বলল, ''আমি কালীপুজোর সময় আসব। দেওয়ালির পরের রাতে আমাদের বাড়িটা পরিষ্কার করিয়ে রাখব। তোমরা যদি আমার সঙ্গে ওখানে রাত কাটাও তাহলেই ভৌতিক রহস্যের ইতি হয়ে যাবে।'' পলাশ বলে উঠল, ''দাদা থাকবি?'' সুহাসের খুব একটা ইচ্ছে ছিল না। তবু পাছে ও ভয়ে পেয়েছে ভাবে ওরা তাই বলল, ''থাকাই যায়। তবে...।'' ওর কথা শেষ হওয়ার আগেই পলাশ বলল, ''তাহলে এটাই ঠিক থাকল।'' পানুজেঠু বলল, ''আমার জামাই মিলন ঐ বাড়িটা সারাবার পক্ষপাতী। আমার মনে হয় ওকে বললে তোমাদের সঙ্গে ও সেই রাতে থাকবে।'' শেষ পর্যন্ত সেটাই ঠিক হল।

দশমীতে বিসর্জনের ঠিক আগে অনেকেই চলে গেল। প্রতিমা বরণ হয়ে যাওয়ার পরে ঝিরঝির করে বৃষ্টি নামল। তার মধ্যেই সিঁদুর খেলা চলল। বেজে উঠল বিসর্জনের বাজনা। কনকাঞ্জলির পরে ঠাকুর চললেন বিসর্জনে। বিসর্জনের বাজনা বেজে উঠল। নদীর জলে দেবীকে বিসর্জন দেওয়ার সময় প্রতিবারের মতোই খুব মন খারাপ হয়ে গেল সুহাসের। বিজয়ার সন্ধ্যায় কোলাকুলি আর প্রণাম সারার পরে বাড়িটা বড় ফাঁকা লাগল সুহাসের। পরের দিনে ফিরে গিয়েই অফিসে যেতে হল। আবার, লক্ষ্মীপুজোর দিন সকাল সকাল এসে পুজোর ব্যবস্থা করল ও আর পলাশ। সুহাসের বাবা—মা ছাড়া বয়স্কদের মধ্যে কেউই আর আসে নি। পরের দিনই চলে এল ওরা। যেতে হবে আবার কালীপুজোর সময়। এই সময় অফিসের চাপ খুব বেশি। তা নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়ল সুহাস। অশেষ একদিন ফোন করে আবার মনে করিয়ে দিল দেওয়ালির পরের রাতে ওদের বাড়িতে রাত কাটাবার ব্যাপারটা। মিলনও রাজি আছে। সুতরাং, ওরা চারজনেই রাত জাগবে ওখানে। সুহাস খুব একটা উৎসাহ দেখাল না। তবে ও বুঝে গেছে ওকে সে রাতে থাকতেই হচ্ছে।

কালীপুজোর আগেই একটা ভয়ঙ্কর ঘটনা গোটা গ্রামকে আতঙ্কিত করে তুলল। পাশের গ্রামের এক বৃদ্ধ এই গ্রামে এসেছিল ব্যবসার কারণে। লোকটার নাম সন্তাোষ। ওর কাঠের আসবাবের দোকান আছে। নিজে ভালো মিস্ত্রি। এখানকার হারানের দুটো গাছ নিয়ে দরাদরি করতে এসেছিল। কথাবার্তা পাকা হওয়ার পরে ফেরার সময় বৃষ্টি নামে। তখন ও অন্ধকারে বৃষ্টির মধ্যে এই বিশাল দুটো বাড়ি দেখে ঢুকে পড়ে। অশেষদের বাড়ির একতলার বারান্দায় ঢুকে বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে চেয়েছিল। রাসুকে দেখতে পেয়ে চা খেতে চেয়েছিল। রাসু যদিও অন্ধকারে ওদিকে থাকতে বারণ করে। সন্তাোষ বলেছিল, ''একটু পরেই তো চলে যাব।'' রাসু একটু পরেই চায়ের কাপ নিয়ে যায় ওখানে। গিয়ে চমকে ওঠে। বুড়ো মাটিতে শুয়ে ছটফট করছে। রাসু চায়ের কাপ ফেলে দৌড় দেয়। গ্রামের লোকদের নিয়ে যখন ফিরে আসে, তখন দেখে বুড়োর মৃতদেহ পড়ে আছে। দেখে মনে হচ্ছে কেউ ঘাড় মটকে দিয়েছে সন্তাোষের। সেই দৃশ্য দেখে রাসু অজ্ঞান হয়ে যায়। পুলিশও এই ঘটনার সমাধান করতে পারেনি। অফিস থেকে ফেরার পথে ফোনে অশেষের কাছ থেকে ঐ ঘটনার বিবরণ শুনে শিউরে ওঠে সুহাস। বোঝে, ওখানে রাত কাটানো ঠিক হবে না। মা কালীর মন্দিরের পুরোহিতের দেওয়া সেই ফুল একটা প্লাস্টিকে মুড়ে ওর পার্সে ঢুকিয়ে দিয়েছিল। সেটা বের করে মাথায় ঠেকায় সুহাস।

কালীপুজোর আগের দিন বিকেলের মধ্যেই পৌঁছে যায় সুহাস, পলাশ আর সঞ্জয়দা। আগামীকাল সুহাসের বাবা—মা, কাকু—কাকিমা, করবীদি আর বিল্লু আসবে। এসে ঘর পরিষ্কার করিয়েই ওরা পুজো বাড়িতে ছোটে। আজই সমস্ত কিছু ঠিক করে ফেলতে হবে। পুজো দালানে মা কালীর মূর্তি গড়ার কাজ শেষ। বুলান চুপ করে বসে আছে। ''দাদাবাবু, মাকে বলছিলাম ছেলের এদিকে মন নেই, আমার দিন তো শেষ হতে চলেছে, শহরেই থাকছে। এরপর কে তোমার মূর্তি গড়বে?'' সুহাসেরও মন খারাপ হয়ে যায়। বুলানের শরীর ভেঙে গেছে। এই চিন্তা হওয়াই স্বাভাবিক। ডেকরেটরের লোকজন কাজ করছে। ওদের সঙ্গেও কথা বলে নিল সুহাস। ভুবন ঠাকুর এসে কথা বলে গেল। আজ বড়রা কেউ নেই। সঞ্জয়দা তাই একটা স্কচ এনেছিল। ওরা বসে পড়ল। সঞ্জয়দা বলল, ''তোমাদের জন্য আমার চিন্তা হচ্ছে। দেওয়ালির পরের রাতে তোমরা যে ও বাড়িতে থাকবে সেটা খুবই ঝুঁকির হয়ে যাবে।'' পলাশ বলে, ''কিচ্ছু হবে না সঞ্জয়দা। তুমি চিন্তা কোরো না।'' সুহাস চুপ করে ভাবতে লাগল।

পরের দিন ঘুম ভাঙতে একটু দেরিই হল। মুখ—হাত ধুয়েই সুহাস আর পলাশ ছুটল বাজারে। সঙ্গে যথারীতি রাসু। ফর্দ মিলিয়ে জিনিস আনতে সময় লাগল। যদিও লক্ষ্মীপুজোর সময়েই সবার সঙ্গে কথা হয়ে গিয়েছিল। একটা টোটোয় উঠে পড়ল ওরা বাজার সেরে। পলাশ বলে, ''আচ্ছা রাসুদা, লোকটার সত্যি কি হয়েছিল বল তো? ও মারা গেল কি করে?'' ''ভূতে গলা টিপে দিয়েছে দাদাবাবু। ও চেহারা আমি কোনদিন ভুলব না। জিভ বেরিয়ে গেছে। ভয়ে মুখ সাদা হয়ে গেছে। সে ভাবতে পারবে না দাদাবাবু!'' ওরা কোন কথা বলে না। টোটোচালক বলে, ''আমিও দেখতে এসেছিলাম। ঐ ভূতের বাড়িতে আপনারা ঢুকবেন না। আমি তো অন্ধকারে যাওয়ার সময়ে ঐ বাড়ির দিকে তাকাইই না।'' টোটোর ভাড়া মিটিয়ে ভিতরে ঢুকে ওরা দেখে সবাই চলে এসেছে। কচুরি আর মাখা সন্দেশ দিয়ে ব্রেকফাস্ট করতে করতে সব ভুলে গেল সুহাস। তারপরেই ওরা পুজোবাড়িতে দৌড়ল।

সুহাস ভাবে, কালীপুজোর রাতে কেমন পুরো পরিবেশটা বদলে যায়। এখানে বাজি ফাটে না তেমন একটা। সুহাস কাজের লোকজনের ছেলেমেয়েদের জন্য কিছু ফুলঝুরি, চরকি আর আলোর বাজি নিয়ে এসেছিল। তা নিয়েই ব্যস্ত ওরা। পুজো মিটতে অনেক রাত হয়। পুজোর পরে ওরা কালীমন্দিরে যায়। ভীড়ের জন্য ঢোকাই যাচ্ছে না। কোনরকমে ঢুকে মা কালীকে প্রণাম করে বেরিয়ে আসে সুহাস। পানুজেঠু, অশেষ আর মিলন চলে গেল অতিথিনিবাসে। ভোররাতে শুয়ে পড়ে সুহাস। পরের দিনেও দেরি করে ওঠা যাবে না। অনেক কাজ রয়েছে। আজ বিছানায় শোয়ামাত্র দুচোখ জুড়িয়ে আসে সুহাসের। ঘুম থেকে উঠে ওরা পুজোবাড়িতে চলে যায়। দুপুরে একবারমাত্র খেতে আসে। তারপর বিসর্জন পর্যন্ত সময় হু হু করে কেটে যায়। এই গ্রামের সমস্ত কালীপ্রতিমাকে বিসর্জনের জন্য এদিক দিয়েই নিয়ে যেতে হয়। তা দেখতে দেখতেই সময় কেটে গেল। রাতে খাসির মাংস রেঁধেছিল ফুলমণি। হাত চাটতে চাটতে সঞ্জয়দা বলে, ''শহরে কি আর এই খাসি আর ফুলমণির মতো এমন রাঁধুনি পাওয়া যাবে সুহাস।'' সত্যিই বলেছে সঞ্জয়দা। করবীদি অবশ্য সঞ্জয়দার দিকে তাকিয়ে একটু মুখ বেঁকায়।

পরের দিন সকালেই বাড়ি ফাঁকা হয়ে গেল। এ বছরের মতো প্রায় সব শেষ। শুধু দোলযাত্রার পুজোটা বাকি। জন্মাষ্টমী থেকে দোল পর্যন্ত এক এক শরিকের পালা। পরের বছরে পানুজেঠুরা যদি পুজো করে তবে আর এই শরিকের কিছু করার নেই পুজোর সময়ে একবার এসে ঘুরে যাওয়া ছাড়া। বড়রা চলে গেলে রাসু আর ভানুকে চাবি দিয়ে অশেষরা ওদের বাড়ির একটা ঘর পরিষ্কার করে রাখতে বলল। রাসু আর ভানু যে ভয় পেয়েছে তা ওদের মুখ দেখেই বোঝা গেল। তবু ওরা ঘর পরিষ্কার করার কাজে লেগে গেল। বিকেলে অনেকদিন পরে নদীর ধার পর্যন্ত হাঁটে ওরা চারজন। বেশ লাগছিল। শীতের একটা আমেজ চলে এসেছে। শেষ বিকেলের আবীররঙা আকাশটাকে খুব সুন্দর লাগছিল। এখনো নদীর ধারে অজস্র কাশফুল ফুটে আছে। দমকা হাওয়ায় রীতিমতো ঠাণ্ডা লাগছে। ফিরে আসতে আসতে সন্ধে হয়ে গেল। আকাশে অনেক বাদুড় উড়ছে। এখানে বাঁদর আর বাদুড় দুইই খুব বেশি। মিলনের সঙ্গে কথা বলে সুহাস বুঝল, মিলন বাড়িটা সারাবার পক্ষপাতী বাড়ির ঐতিহ্যের কথা ভেবে মোটেই নয় বা, থাকার জন্যও নয়। ও প্রোমোটারি করে। অন্য কোনো উদ্দেশ্য ওর আছে। ছেলেটা মোটেই সুবিধের নয়।

গতকাল পর্যন্ত হইচই হওয়ার পরে আজ নির্জনতা যেন চেপে বসেছে চারদিকে। বিশেষ করে আজ রাতে অশেষদের ওখানে রাত কাটাতে হবে বলে কিরকম একটা ভয় ভয় লাগছে সুহাসের। সঞ্জয়দা চলে যাওয়ার সময় ওকে বারবার বলে গেছে সাবধানে থাকতে। রাসু পর্যন্ত উসখুস করতে করতে একসময় বলেই ফেলল, ''দাদাবাবু, আজ রাতটা ও বাড়িতে না কাটালেই নয়?'' সুহাস মৃদু হেসেছিল শুধু। কোনো উত্তর দেয়নি। হঠাৎই ঝিরঝির করে বৃষ্টি শুরু হল। মনে হচ্ছে আজ আবহাওয়াও সুবিধের নয়। রাতে খেয়েদেয়ে মুখ হাত ধুয়ে সুহাস দেখে অশেষ আর মিলন এসে গিয়েছে। রাসু আর ভানু একটা ঘর পরিষ্কার করে মাদুর আর চাদর দিয়ে বসার ব্যবস্থা করে এসেছে। জলের বোতলও রেখে এসেছে। ওরা চারজন একটা তাসের প্যাকেট নিয়ে চলে গেল ঐ বাড়িতে। বাইরের গেটটা খুলে ভেতরে ঢুকতেই কিরকম একটা অস্বস্তি হল সুহাসের। কিরকম যেন বাতাসটা ভারি ভারি লাগছে। নিঃশ্বাস নিতে একটু অসুবিধেই হচ্ছে।

ঘরের দরজাটা খুলেই রেখেছিল রাসুরা। ভিতরে ঢুকে আলো জ্বালতে গেল অশেষ। ভেতরে একটা 'গররগরর' চাপা গর্জন শুনে চমকে গেল সুহাস। আলো জ্বালতেই একটা কুকুর ঘরের এক কোণে শুয়েছিল উঠে দাঁড়াল। একেবারে কালো কুচকুচে একটা কুকুর। একবার ওদের দিকে হিংস্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে বেরিয়ে গেল ধীরে ধীরে। সেই দৃষ্টি দেখে শিউরে উঠল সুহাস। ''গেট তো বন্ধ ছিল, ঢুকল কি করে বল তো?'' সুহাসের প্রশ্ন শুনে হেসে অশেষ বলে, ''ঢোকার জায়গা নিশ্চয়ই আছে। সকালে খুঁজে দেখতে হবে। সুহাস ভাবে দোতলায় এই গেট ছাড়া ওদের বাড়িতে ঢোকার আর তো কোনো রাস্তা নেই। ওর খুব অস্বস্তি হচ্ছে। ওরা বসে তাস খেলা শুরু করে দিল। বাইরে প্রকৃতিও যেন ক্ষেপে উঠল। এতক্ষণ ঝিরঝির করে বৃষ্টি হচ্ছিল। এবার প্রবল বেগে বৃষ্টি নামল সঙ্গে ঝোড়ো হাওয়া। হঠাৎ আকাশের বুক চিরে বিদ্যুৎ চমকে বাজ পড়ল। চমকে উঠল সুহাস। বাকি তিনজন অবশ্য খেলাতেই মেতে উঠল। কাছেই কোথাও বিকট শব্দে বাজ পড়েছে বোঝা যাচ্ছে।

খেলা জমে উঠেছে। মিলন হাসতে হাসতে বলছে, ''আমাদের খেলা দেখতে ভূতেরাও দর্শক হয়ে যাবে।'' সবাই হেসে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে ঝনঝন করে কিসের একটা শব্দ হল। ওরা খেলা বন্ধ করে বাইরে এল। কিন্তু, কিছুই বুঝতে পারল না। অশেষ বলল, ''ছুঁচোটুচো কিছু একটা ফেলেছে বোধহয়।'' ঠিক তখনি পাশের একটা ঘরের ভেতর থেকে দরজায় ধাক্কা দেওয়ার আওয়াজ ভেসে এল। মিলন বলল, ''ঝড়ে জানলা—জরজায় এরকম আওয়াজ হচ্ছে।'' ফিরে এসে খেলা আর তেমন জমল না। সুহাস বুঝতে পারে পরাশও একটু ঘাবড়ে গিয়েছে। কোথা থেকে যেন একটা কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে না। কান খাড়া করে শোনার চেষ্টা করে সুহাস। একটা পুরুষের গলা। গুঙিয়ে গুঙিয়ে কাঁদছে। সুহাসের মনে পড়ে গেল লতিফ আর বুলানের কথা। পানুজেঠুর পূর্বপুরুষেরা নাকি অনেক অত্যাচার করেছে। সেটা সুহাসও শুনেছে দাদুর কাছে। অনেক প্রজার ভিটেয় ঘুঘু চড়িয়েছে তাদের সর্বস্বান্ত করে ছেড়েছে তারা। শুধু তাই নয় ওদের অত্যাচারে অনেক দরিদ্র মানুষের প্রাণও গিয়েছে। এই বাড়িতেও সে সময় কাউকে কাউকে মেরে ফেলা হয়েছে নাকি। সে কারণেই গ্রামের মানুষ পানুজেঠুদের সহ্য করতে পারে না। হঠাৎ দরজার দিকে চোখ চলে যায় সুহাসদের। সেই ছায়ামূর্তিটা দাঁড়িয়ে রয়েছে দরজার সামনে। ওদের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে। সুহাস থরথর করে কেঁপে উঠে পলাশকে চেপে ধরে। পলাশ বিস্মিত হয়ে ওর দিকে তাকায়। দরজার সামনের ছায়ামূর্তিটা ততক্ষণে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে। সুহাস একটু লজ্জাই পেয়ে যায়। আবার ওদের খেলা শুরু হল। যদিও সে খেলায় আর মন নেই সুহাসের। বাকিরাও যে খুব একটা স্বস্তিতে নেই তা বোঝা যাচ্ছে। বাইরে তখনো ঝড়বৃষ্টির প্রবল দাপাদাপি।

কিছুক্ষণ তেমন কিছু ঘটল না। কিন্তু হঠাৎ জোরে একটা আওয়াজ হল। মনে হল দরজা বা জানলা ভেঙে গেল বোধহয়। ওরা বাইরে বেরিয়ে দেখল যে দরজাটায় কেউ ধাক্কা দিচ্ছে মনে হচ্ছিল সেই দরজাটায় ভেঙে গিয়েছে। অশেষ আর মিলন মোবাইলের টর্চ জ্বেলে এগিয়ে গেল। বারান্দা এতক্ষণের প্রবল বৃষ্টিতে জলে ভেসে গেছে। পলাশকে এগিয়ে যেতে দেখে সুহাসও এগিয়ে গেল। কিন্তু, একটা চাপা গর্জন শুনে ও থমকে দাঁড়িয়ে গেল। ওর পেছন থেকে সেই কালো কুকুরটা এসে ওকে ছাড়িয়ে গিয়ে ওর সামনে দাঁড়িয়ে গেল। কুকুরটা হাঁ করে গর্জন করছে। ওর ধারালো দাঁতগুলো ঝকঝক করছে ঘরের ভিতরের টিউবের ম্লান আলো পড়ে। জিভটা বেরিয়ে এসেছে। ওর দিকেই নিষ্ঠুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ভয়ে দাঁড়িয়ে গেল সুহাস। ওকে দাঁড়িয়ে যেতে দেখে পলাশও থমকে দাঁড়াল। অশেষ আর মিলন ততক্ষণে ঢুকে গিয়েছে ঐ ঘরটায়। ঠিক সেইসময় আলো নিভে গেল। লোডশেডিং! কিছুই দেখা যাচ্ছে না। হঠাৎ দুটো গলায় তীব্র আর্তনাদ শোনা গেল। সেই আর্তনাদ যেন রাত্রির বুক চিরে দিল। সুহাসের মেরুদণ্ড বেয়ে বরফের ডেলা নেমে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ ঝলসে উঠল। কি আশ্চর্য! সামনে কুকুরটা আর নেই। সেই আর্তনাদও থেমে গিয়ে অদ্ভুত এক নৈঃশব্দ নেমে আসছে। নীচ থেকে রাসু—ভানু আরো অনেকে ছুটে আসছে আলো হাতে। ভাঙা দরজার পাশ দিয়ে ওরা সবই ভিতরে ঢুকল। ঢুকেই আতঙ্কে থমকে দাঁড়াল সুহাস। ওদের ঠিক সামনেই অশেষ আর মিলন পড়ে রয়েছে। ওদের ঘাড়দুটো মরা মুরগীর ঘাড়ের মত বেঁকে রয়েছে। কেউ যেন ওদের মুণ্ডু ধরে ঘুরিয়ে ঘাড়দুটো ভেঙে দিয়েছে। চোখগুলো যেন বেরিয়ে এসেছে। দেখে মাথা ঘুরে গেল সুহাসের। ওর চোখের সামনে সব অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে।

ফেরার পথে সব শুনে সুহাসের বাবা—মা কোনো কথাই বলতে পারল না। খবর পেয়েই ওরা বাবা—মা আর কাকা—কাকিমা চলে এসেছিল। এখন সবাই হাসপাতাল—থানা—পুলিশ মিটিয়ে ফিরছে। একটা গোটা দিনই লেগে গিয়েছিল ঐ সমস্ত ব্যাপারে। ময়না তদন্তে খুনের কথাই বলা হয়েছে। স্থানীয় থানার ইনচার্জ বুদ্ধদেব ওদের বলেছিল, ''ঐ খুনিকে ধরতে হলে এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করতে হবে।'' পানুজেঠুর মুখের দিকে তাকালো যাচ্ছিল না। বোলেরো গাড়িটা এখন ব্রিজের ওপর দিয়ে দ্রুতগতিতে দক্ষিণেশ্বরের মন্দিরের দিকে ছুটে চলেছে। ''সুহাসদা, ভাগ্যিস কুকুরটা তোমার আটকাল—তাই আমরা দুজনেই বেঁচে গেলাম।'' পলাশের কথা শুনে সুহাসের মা বলল, ''গাড়ি আস্তে চালান।'' ড্রাইভার গাড়ির গতি কমিয়ে দিল। দক্ষিণেশ্বরের মন্দিরের দিকে তাকিয়ে হাত জড়ো করে মা বলল, ''রক্ষা করেছ মা।'' পরাশের মাও নমস্কার করল। সুহাস পকেট থেকে পার্স বের করে সেই প্ল্যাস্টিক জড়ানো ফুলটা মাথায় ঠেকিয়ে নিল। বাড়ি পৌঁছতে আর বেশি দেরি নেই। আকাশ ঝকঝক করছে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%