মৃতের মন্দির

কৌশিক কারক, আকাশ চন্দ, উৎস ভট্টাচার্য

ঘুমটা ছ্যাঁত করে ভেঙে যেতেই ধড়মড় করে উঠে বসল অনির্বাণ। কেউ কী বাড়ির চারপাশে হেঁটে বেড়াচ্ছে? টর্চ হাতে ঘর থেকে বেরিয়ে বাড়ির চারপাশটা দেখে এল সে। নাহ, কেউ নেই। আশেপাশের বাড়িগুলোতেও আলো ফেলে ফেলে দেখেছে সে। শুধুই নির্জনতা। ঘরে ফিরে এসে দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো প্রায় রাত দেড়টা বাজে।

নিজের ওপর রাগ হলো। এখনও মনের ভেতর থেকে চাপা ভয়টা কাটিয়ে উঠতে পারছে না।

সুপর্ণা কিন্তু অঘোরে ঘুমোচ্ছে। যাক স্ত্রীকে ঘুমোতে দেখে একটু যেন স্বস্তি পেল অনির্বাণ। আজ অনেকদিন পর ওকে এত নিশ্চিন্তে বিশ্রাম করতে দেখা গেল।

বিছানার ওপর উঠে বালিশে ঠেস দিয়ে হ্যালান দিয়ে বসল অনির্বাণ। এক্ষুনি ঘুম আসবে না। সুপর্ণকে বুঝতে না দিলেও তার যে ট্রমা এখনও কাটেনি সেটা অনির্বাণ নিজে ভালোভাবেই বুঝেছে। চোখ বুজলেই মনে পড়ে তিন মাস আগে ঘটে যাওয়া সেই ভয়ানক রাতটার কথা! অনেকবার ভেবেছে মনোবিদের কাছে যাবে কী না, কিন্তু ঠিক মন চায়নি। নাহ! ব্যাপারটা গুছিয়ে লিখতে হবে। কোথায় যেন সে শুনেছিল, জীবনের কোনো ঘটনা একবার কাগজের ওপর নামিয়ে ফেললে সেটা নাকি মাথা থেকে বেরিয়ে যায়।

বেশি না ভেবে, অনির্বাণ পাশে টেবিলে গিয়ে বসে পড়ল। অফিস থেকে পাওয়া একটা নতুন ডায়েরি টেনে নিয়ে টেবিল ল্যাম্পের সুইচ টিপলো। লাল রঙের পার্কার পেনটা হাতে নিয়ে একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অনির্বাণ শুরু করল তার লেখা...

আজ প্রায় দুবছর হলো টুবলু নেই। আমাদের একমাত্র সন্তান। মাত্র ছ'বছরের ছিল সে!

সে দিনটা ছিল দোল পূর্ণিমা। সুপর্ণা টুবলুকে নিয়ে গেছিল তার বাপের বাড়ি। আমি এবং সুপর্ণা দুজনেই মফস্বলের। আমার বাড়ি দক্ষিণে আর ওর বাপের বাড়ি উত্তরে।

যাইহোক, ওদের সাথে সেদিন আমিও যেতে পারতাম, কিন্তু আমাকে ব্যবসার কাজের জন্য থেকে যেতে হয়। আজও মনে পড়ে বিকেলের দিকে ছেলের জন্য হঠাৎ করেই মনটা কেঁদে উঠেছিল। সঙ্গে সঙ্গে সুপর্ণাকে ফোন করেও ছিলাম, কিন্তু ফোন বেজে বেজে একসময় থেমে যায়। ভাবলাম কাজ করছে কিছু, ব্যস্ত আছে। কিন্তু মাত্র পাঁচ মিনিট পরই ফোনটা এসেছিল! সুপর্ণার বাবা করেছিল ফোনটা। বাইরে রঙ খেলা হচ্ছিল বলে সারাটা সকাল টবলুকে বেরোতে দেওয়া হয়নি। কিন্তু দুপুরবেলা কখন সবার অলক্ষে সে বেরিয়ে যায়। তাকে ঘরে দেখতে না পেয়ে প্রথমে ডাকাডাকি এবং পরে খোঁজাখুজি শুরু হয়। আমি সুপর্ণাকে বারবার সাবধান করে দিয়েছিলাম ওদের বাড়ির সামনের বড় পুকুরটার ব্যাপারে। পুকুর তো নয়, যেন একটা রাক্ষস।

প্রায় দু'ঘন্টা সারা পাড়া পাতিপাতি করার পর, কেউ একজন পুকুরের মাঝে ভাসমান লাল দুটো চপ্পল দেখতে পায়। তারপর আর কী ডুবুরি এল। টেনে তুলে আনা হল আমার টবলুকে...

সামলে নিয়েছিলাম নিজেকে। কারণ আমি নিজে ঠিক না থাকলে সুপর্ণা শেষ হয়ে যাবে। ও বারংবার আমার কাছে ক্ষমা চাইছে আর নিজেকে দায়ী করছে। আমি ছোটোবেলায় বাবাকে হারিয়েছি। কলেজ জীবনে মাকেও হারিয়েছি। ছেলেটাকে হারানোর পর সুপর্ণা ছাড়া তিনকুলে আর কেউ রইল না। আমাকে যে করে হোক সুপর্ণাকে বাঁচাতেই হত। সমস্ত দুঃখ, সমস্ত যন্ত্রণার বিষ নিজে পান করে নিয়ে পাথর হয়েছিলাম। সব ভুলে, এই দুটো বছর শুধু চেষ্টা করে গেছি সুপর্ণাকে খুশি রাখার। আমি এইরকমের যতটা পেরেছি বাড়িতে থেকেই কাজ করার চেষ্টা করেছি।

বলতে বাধা নেই, আমার মনে হয়েছিল খুব সামান্য হলেও সফল হয়েছি। ধীরে ধীরে, হয়তো কিছুটা আমার মুখের দিকে চেয়ে নিজেকে সামলে নিয়েছিল সুপর্ণা। যখন দেখলাম ছেলের দ্বিতীয় মৃত্যু বার্ষিকীটা শান্তভাবে কাটিয়ে দিল, তখন আমিও খানিক নিশ্চিন্ত হয়েছিলাম। শুধু রাতটা বিছানায় উসখুস করে কাটানো ছাড়া বাকি দিনের বেলাটা ঠিকই থাকত। টুবলুকে হারানোর প্রথম বারো মাস যে অবস্থা হয়েছিল ওর তার চেয়ে বেশ একটু সামলে নিয়েছিল নিজেকে।

ভেবেছিলাম এবার সব আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হয়ে যাবে। ভেবেছিলাম এত বছর নিজের কাজ করে সুপর্ণার সঙ্গে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, এই দু—বছর কাছাকাছি থাকার ফলে, তা অনেকটাই মিটিয়ে ফেলেছি! ভেবেছিলাম আর আমার সুপর্ণার কোনো বিপদ নেই...ভেবেছিলাম...ভুল ভেবেছিলাম।

আমার চোখের আড়ালে সুপর্ণা কী সাংঘাতিক বিপদের দিকে পা বাড়িয়েছিল তা ভাবলে দিনের বেলাও ভয়ে বুক শুকিয়ে যায়...

দিন পাঁচেক আগে, সন্ধ্যাবেলা ল্যাপটপে কাজ করছি, দেখি সুপর্ণা সন্ধ্যাপ্রদীপ দেওয়ার পরেও বেশ ঘটা করে ধূপ ধুনো দিচ্ছে। আমি জিগ্যেস করায় বলল, একজন অতিথি আসবেন। আমি একটু কাজটা বন্ধ করলে ভালো হয়। এই বলে সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

সুপর্ণার ব্যবহারে বেশ অবাক হয়ে আমি বিহ্বল হয়ে বসে রইলাম। কী করব না করব ভাবছি এমন সময় সে আবার তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে এসে আমার হাত ধরে বলল, ''এই তাড়াতাড়ি এসো! উনি এসে গেছেন!''

''কে? কে এসে গেছেন?''

''তাড়াতাড়ি ড্রয়িং রুমে এস!'' এই বলে সে আবার ব্যস্তসমস্ত হয়ে বেরিয়ে গেল।

একটু যেন খুশি খুশি ভাব দেখলাম ওর হাবেভাবে। ওর বাপের বাড়ি থেকে কেউ এল নাকি? যাইহোক, ল্যাপটপটা বন্ধ করে আমি ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম।

''বাপরে কী ধোঁয়া!'' বসার ঘরে এসে ধুনোর চোটে চোখ ধাঁধিয়ে গেছিল প্রথমটা। কিন্তু তারপরেই ধীরে ধীরে চোখের সামনে ধোঁয়া কেটে যেতেই চোখের সামনের দৃশ্য দেখে বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম।

আমার ঘরের মেঝেতে বাঘছালের আসন পেতে বসে আছেন এক তেজদীপ্ত মানবী। শরীরে তার গেরুয়া শাড়ি আর রুদ্রাক্ষের আভূষণ। সত্যি কথা বলতে তাঁকে দেখতে ঠিক কেমন তা আর এখন মনে নেই আমার, কারণ তাঁর সেই দুই চোখের দিকে একবার তাকাতেই আমি যেন কেমন একটা থমথমে হয়ে গেছিলাম।

''বোসো, ভৈরবী মায়ের হাতে বেশি সময় নেই!'' সুপর্ণা নীচু গলায় আমাকে আদেশ করল।

তাকিয়ে দেখি সেও মেঝেতে বসেছিল, আমাদের অতিথির মুখোমুখি।

আমি ধীরে ধীরে বসে পড়লাম। আমার কিন্তু কোনোদিনই ধর্মেকর্মে মতি ছিল না। ঈশ্বরের ওপর বিশ্বাস ছিল, ব্যবসায় সর্বদা সৎ পথে চলেছি, যতটা পেরেছি মানুষের সাহায্য করেছি, কিন্তু অতিরিক্ত ভক্তি দেখাইনি কোনোদিন। কালিঘাট আর দক্ষিণেশ্বর ছাড়া আর কোনো মন্দিরে কখনো পুজো দিতেও যাইনি। এমনকি পাড়ার মন্দিরটা ঠিক কেমন দেখতে তাও ভালো করে বলতে পারব না। অন্য সময় হলে হয়তো সুপর্ণার ওপর রেগেই যেতাম, কিন্তু সেই সন্ধ্যায় যে কী হল, ভৈরবীর মধ্যে কী এক অমোঘ দেবীত্ব ছিল, আমি যেন বুদ্ধি বিবেচনা হারিয়ে ফেললাম।

ঘরের পরিবেশ তখনো ধোঁয়াটে, ধূপ ধুনোর গন্ধে নিঃশ্বাস নিতে হচ্ছে। দেওয়ালের এলইডি আলো ভৈরবীর লম্বা কোঁকড়া চুলের ওপর অদ্ভুতভাবে প্রতিফলিত হয়ে রয়েছে, পুজো প্যাণ্ডেলে শ্যামা মায়ের মতো!

''এই আমার স্বামী।'' সুপর্ণা বলল, ''অনির্বাণ।''

ভৈরবী আমার দিকে হাসি হাসি মুখে তাকিয়ে রইলেন। শিড়দাঁড়া সোজা করে বসেছিলেন তিনি। আমি কী করব বুঝতে না পেরে দুহাত বাড়িয়ে তাঁকে প্রণাম করতে গেলাম।

কিন্তু তিনি আমাকে অবাক করে দিয়ে বললেন, ''এখুনি প্রণাম করার কোনো আবশ্যকতা নেই। আগে তোমার ক্লেশ দূর করি! তোমার মনে সত্যিই আমার প্রতি ভক্তি উদ্রেক করতে সক্ষম হই। তারপর না হয় প্রণাম কোরো।''

আমি উত্তর দিয়ে উঠতে পারলাম না। বোকার মতো একবার সুপর্ণার দিকে তাকিয়ে আবার চোখ ফেরালাম ভৈরবীর দিকে। আমার কোন ক্লেশ দূর করতে এসেছেন ইনি?

''পরশু অমাবস্যা।' ' সুপর্ণার দিকে তাকিয়ে কথা বলতে শুরু করলেন ভৈরবী। ''কাল তোমরা নিরামিষ আহার করবে, এবং পরশু সারাদিন নির্জলা উপোস দিয়ে থাকবে এবং ঠিক রাত এগারোটা নাগাদ আমার মন্দিরে চলে আসবে। মনে রাখবে বাড়ি থেকে বেরনোর আগে স্নান করে, নতুন বস্ত্র পরে বেরোবে।''

''আচ্ছা মা তাই হবে।'' সুপর্ণা দুহাত জোড় করে আকুল কণ্ঠে বলল।

ভৈরবী স্মিত মুখে হাসলেন, আর তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ''মনের মধ্যে বিশ্বাস রেখো, তোমাদের হারানো সম্পদ ঠিক ফিরে পাবে!''

ওনার এই কথাটা শুনেই আমার বুকটা ধড়াস করে উঠলো।

''হারানো সম্পদ ফিরিয়ে দেবেন মানে? টুবলু?''

আমি সুপর্ণার দিকে তাকালাম। সেও আমার দিকে হাসিমুখে অথচ ছলছল চোখে তাকিয়ে আছে!

আমি সুপর্ণার দিকে তাকাতেই তিনি বললেন, ''আমার মন্দিরে এসো, তারপর যেমনটা তোমার টুবুলকে তুমি শেষবার দেখেছিলেন, ঠিক তেমনটাই তোমার হাতে তুলে দেব আমি।''

আমি যেন নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছি না। একবার মনে হল, হয়তো আমাদের থেকে মোট টাকা হাতানোর লোভে, আমাদের ভাঁওতা দিচ্ছেন। এরকম তো হয়েই থাকে। সত্যিকারের তন্ত্র মন্ত্র বলে কিছু হয় নাকি, সবটাও তো ভাওতা। মনে মনে এইসব কথা ভাবছি, এমন সময় ভৈরবী বলে উঠলেন, ''টাকা লাগবে না।''

আমি চমকে উঠে তাকালাম। ভৈরবী তাঁর সেই স্মিত হাস্যোজ্জ্বল মুখে বললেন, ''টাকা পয়সার কথা চিন্তা করো না। ওসব লাগবে না। শুধু মনে বিশ্বাসটুকু রাখবে।''

আমি যে মনে মনে টাকার কথা ভাবছিলাম সেটা উনি জানলেন কী করে? তবে কী সত্যিই ওনার অলৌকিক ক্ষমতা আছে?

ভৈরবী ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছেন আর সুপর্ণা ভক্তিভরে ওনার বাঘছাল আসনটি গুটিয়ে নিয়ে বুকের কাছে ধরে রেখে দিল। বুঝতে পারলাম, আসনটা ওই কিনে রেখেছিল।

''এবার আমি আসি।'' ভৈরবী বললেন।

আমরা করজোড়ে নমস্কার জানালাম। পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করার চেষ্টা করলাম না, উনি নিজেই বলেছেন, আগে উনি আমাদের ছেলেকে ফিরিয়ে দেবেন, তারপর প্রণাম নেবেন।

হাত তুলে, দেবী প্রতিমার মত অভয়দানের ভঙ্গিতে,

''সুখি হও।'' বলে ধীর পায়ে, ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন ভৈরবী। আমরাও পিছন পিছন চললাম। বারান্দায় পা রেখে বুঝলাম, আমাদের মফস্বলটা আজ বড়ই শান্ত। বাইরের অন্ধকারটা যেন কোনো এক অজানা আশঙ্কায় থমকে রয়েছে। ভৈরবী যাবেন কোথায় এখন?

''ওহ ভালো কথা।'' ভৈরবী ফিরে তাকালেন আমাদের দিকে। ''আমার মন্দিরের পরিবেশ কিন্তু বড়ই ভয়ানক। পাকা রাস্তায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে প্রায় পনের মিনিট হাটতে হতে পারে। এই হাঁটা রাস্তাটি কিন্তু বড়ই বিপজ্জনক। নানা প্রকারের অশুভ শক্তি তোমাদের পথে বাধা সৃষ্টি করবে। কিন্তু ভয় পাবে না। সর্বশক্তিমানের নাম নিয়ে, সোজাসুজি হেঁটে আসবে। জায়গায় জায়গায় ত্রিশূল পোঁতা থাকবে পথ চেনানোর জন্য। সেগুলো আলো লক্ষ্য করে এগিয়ে আসবে। তোমাদের মধ্যে আমি সাহসিকতার জ্যোতি দেখতে পাচ্ছি। মনে সাহস আর বিশ্বাস থাকলে কারোও ক্ষমতা নেই তোমাদের ক্ষতি করে।'' এই বলে ভৈরবী বারান্দা থেকে নেমে গেলেন। আমরাও পেছন পেছন গেলাম, কিন্তু তিনি উঠোনে নেমেই যেন অন্ধকারে মিলিয়ে গেলেন।

''কোথায় গেলেন?'' আমি এদিক সেদিক তাকালাম।

''অন্ধকারে মিলিয়ে গেলেন।'' সুপর্ণা ফিসফিস করে বলল।

তারপর আসনটা মাথায় তুলে প্রণাম করে, আমার হাত ধরে সে বলল, ''চলো ঘরে চলো।''

আমি চুপচাপ সুপর্ণার সাথে বারন্দায় উঠে আসলাম। আর তখনই কথাটা মনে হল। আমি দাঁড়িয়ে পড়ে সুপর্ণার দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করলাম—

''আচ্ছা ওনার মন্দির কোথায় সেটাই তো জানা হল না!''

''আমি চিনি।'' সংক্ষেপে উত্তর এল।

''তুমি ওনার সাথে যোগাযোগ করলে কী করে?'' আমি জিগ্যেস করলাম।

''পাড়ার মন্দিরে উনি এসেছিলেন, গত বছর কালীপুজোর সময়, সেইদিনই ওনার সাথে সব কথা হয়। উনি আশ্বাস দেন যে আমাদের ছেলেকে ফিরিয়ে দেবেন। এবং আজকের এই দিনে যে তিনি আমাদের বাড়ি আসবেন সেকথাও জানিয়ে দিয়েছিলেন। ওনার আশীর্বাদ ছিল বলেই আমি নিজেকে সামলাতে পেরেছি।''

সুপর্ণার কথা শুনে আমার মাথায় যেন বাজ পড়লো। তাহলে আমি যে এতদিন ধরে এত চেষ্টা করছি ওকে কষ্ট ভুলিয়ে রাখার—সে সবই কী বৃথা? আমার মুখের ভাব দেখে সুপর্ণা বোধহয় বুঝতে পারল। সে চট করে আমার হাতদুটো ধরে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ''তোমার মতো স্বামী পেয়ে নিজেকে ধন্য বলে মনে করি। এই ক'বছরে তুমি আমার জন্য যা করেছ এই পৃথিবীতে আর কেউ তা করবে না। তোমার বুকের চাপা কষ্ট আমি যে ভালোভাবেই টের পাই। আমার কথায় কিছু মনে করো না। আমি যা করছি আমাদের দুজনের জন্যই করছি। ওনার অনেক ক্ষমতা। উনি ঠিক আমাদের টুবলুকে ফিরিয়ে দেবেন দেখো! উনি এরকম অনেকের জন্যই করেছেন।''

''আচ্ছা! ঠিক আছে! ঠিক আছে!'' আমি কোনোমতে নিজেকে সামলে নিলাম। সুপর্ণা হাসিমুখে ঘরে ঢুকতে যাবে সেই মুহূর্তে আমি প্রশ্ন করলাম, ''কিন্তু ওনার মন্দিরটা কোথায়?''

''এখানে থেকে প্রায় বাইশ কিলোমিটার দূরে। সেই যে রায়চৌধুরীদের ঘাট আছে না?''

আমি প্রায় চিৎকার করে বলে উঠলাম ''রায়চৌধুরীদের ঘাট? আরে সেতো আসলে...''

''আস্তে আস্তে।'' সুপর্ণা আবারও আমার হাত চেপে ধরলো। ফিসফিস করে বলল, ''জানি তো। ওটা শ্মশান!''

পরের দিনটা কেমন একটা ঘোরের মধ্যে কাটলো। সেদিনটা আর তেমন কিছু হয়নি। আমার বিশেষ মনেও নেই। তারপর দিনটাও দেখতে দেখতে কেটে গেল। ক্রমে সন্ধ্যা হল। ন'টা বাজতেই আমরা তৈরি হয়ে নিলাম। স্নান সেরে নতুন জামাকাপড় পরে বেরতে বেরতে প্রায় দশটা বেজে গেল। বেরোনোর আগে কী মনে হল আমার মায়ের পুরানো একটা তারা মায়ের লকেট সুপর্ণাকে পরিয়ে দিলাম। হাজার হোক শ্মশান ভূমিতে চলেছি!

রাতের নির্জন মফস্বলের রাস্তা, নিজের গাড়ি আছে, চল্লিশ মিনিটের বেশি লাগার কথা নয়।

''আচ্ছা! ভৈরবী মায়ের নাম কী?'' গাড়ি চালাতে চালাতে জিগ্যেস করেছিলাম আমি।

''জানি না গো।'' আমার পাশে সিটে বসে বাইরের দিকে দেখতে দেখতে উত্তর দিয়েছিল সুপর্ণা। ''নাম জানতে চাইনি। যদি রাগটাগ করেন।''

অন্ধকার রাত, দু—পাশাড়ি সারিবদ্ধ গাছ পেছনে ফেলে সপাট পিচ রাস্তা দিয়ে ছুটে চলেছে আমার গাড়ি।

''উনি কী সত্যিই মৃত মানুষদের ফিরিয়ে আনেন?'' আমি জিজ্ঞেস করলাম।

''হ্যাঁ কিন্তু সবার জন্য না। যাদের উনি যোগ্য বলে মনে করেন শুধুমাত্র তাদের ওপরই দয়া করেন। এর জন্য কোনো মূল্য নেন না।''

মনে প্রচুর প্রশ্ন ছিল। কিন্তু আর কিছু বললাম না। এইটুকু বুঝলাম তলেতলে সুপর্ণা অনেক কিছুই জেনেছে।

পৌনে এগারোটা নাগাদ শ্মশানের সামনে এসে গাড়ি থামালাম। রাস্তার একপাশে দাঁড় করালাম। গাড়ি থেকে নামতেই বুক ঢিপঢিপ করতে লাগল।

অন্ধকার রাত, ফাঁকা রাস্তা, নিস্তব্ধ পৃথিবী।

একটা যদি টিমটিম করে বাল্বও জ্বলতো তাহলেও যেন বুকে একটু বল পেতাম। যাইহোক, মনের অবস্থা মুখে প্রকাশ করলাম না। সুপর্ণা গাড়ি থেকে নেমে এল।

''এসো এই দিকে।'' সে আমাকে রাস্তা দেখিয়ে দিয়ে যেতে চাইল।

''আরে দাঁড়াও। টর্চটা জ্বালতে দাও।'' আমি গাড়ির ভেতর থেকে টর্চ বের করে, গাড়ি লক করে দিলাম।

''তাড়াতাড়ি। আর মাত্র পনেরো মিনিট বাকি!'' সুপর্ণা আমায় তাড়া দিল, তার যেন আর তর সইছে না।

''চলো চলো!''

সুপর্ণা জঙ্গলের ভেতর ঢুকে গেল। আমি তার সামনে টর্চের আলো ফেলে তাকে অনুসরণ করতে লাগলাম। রায়চৌধুরীরা ছিল এই এলাকার জমিদার। ষাট— সত্তর বছর আগেও বিশাল প্রতিপত্তি ছিল তাদের। কিন্তু তারপর যা হয়, কালের গর্ভে সব নিঃশেষ। তাদের জমি, জায়গা, সম্পত্তি এমনকি জমিদার বাড়িটারও কোনো হদিস নেই। থাকার মধ্যে পড়ে আছে এই পারিবারিক শ্মশান। বছর পনেরো—কুড়ি আগেও এখানে দাহ সৎকার হতো, কিন্তু শহরের কাছাকাছি একটি ইলেকট্রিক চুল্লি হওয়ার পর, এইখানে মানুষের আসা বন্ধ হয়ে গেছে। সেই থেকে ফাঁকা পড়ে আছে এই শ্মশান। শুনেছি রায়চৌধুরীদের বানানো শ্মশান কালীর মন্দিরের ধ্বংসাবশেষটি এখনও রয়েছে। তবে এলাকার মানুষ বলতো মন্দিরের নীচে নাকি যক্ষের বাস রয়েছে। তাই মন্দিরটাকে সবাই যক্ষের আস্তানা বলে ডাকে। এরা নাকি রায়চৌধুরীদের সম্পত্তি রক্ষা করে আসছে যুগযুগ ধরে। যাই হোক, এসব তো গল্পকথা, তবে আমার ধারণা ভৈরবী সম্ভবত ওই মন্দিরটিকেই নিজের ভদ্রাসন বানিয়েছেন।

''ওই দ্যাখো'' আঙুল তুলে দেখালো সুপর্ণা।

ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে টর্চ ফেলে একটা লাল ন্যাকড়া বাঁধা ত্রিশূল দেখতে পেলাম। মাটিতে বেশ অনেকটা পোঁতা। তার পাশ দিয়ে চলে গেছে রাস্তা।

''চলো।'' আমি একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে বললাম।

ভৈরবী বলেছিলেন সোজাসুজি হাঁটতে। সেইভাবেই এগোচ্ছি। অন্ধকার রাত, শ্মশানের পরিবেশ আর তার মাঝে ঝিঁঝিঁ পোকার নিরবচ্ছিন্ন ডাক কেমন যেন ঘোরের মধ্যে টেনে নিয়ে যাচ্ছে আমাদের। দু—একটা শিয়াল বা কুকুর এদিক—সেদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে মনে হয়। খড়খড় শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। নিজেদের মধ্যে কথা বলছি না আমরা। রাস্তাটা যথেষ্ট বন্ধুর।

এবড়োখেবড়ো। কিছুদূর যাওয়ার পর পায়ের নীচে নরম কিছু একটা ঠেকলো। রাবারের মতো কিছু একটা জিনিস। আলো ফেলে দেখতে যাবো, কিন্তু সুপর্ণা বিরক্তি প্রকাশ করল, ''আরে আলোটা সরালে কেন?''

অল্পসময়ে যা বুঝলাম, সরু একটা রাবারের পাইপের টুকরো আমি পায়ের নীচে চেপে দিয়েছি।

''শ্মশানে রাবারের পাইপ? হয়তো কোনো শিয়াল বা কুকুর মুখে করে এনেছে।'' আমি মনে মনে ভাবছি, এমন সময় সুপর্ণা তাড়া দিলো।

''আরে চলো।''

আমি আলো ফেলে এগিয়ে চললাম। আরো কিছুটা এগোনোর পর একটা ব্যাপার লক্ষ্য করলাম। মাটির ওপর—এদিক ওদিক গোছা গোছা চুল দেখতে পেলাম। একবার মনে হল তন্ত্র সাধনার জায়গা, অস্বাভাবিক কিছুই নয়। কিন্তু তাই বলে এতো চুল? যেন ঘাসের মতো মাটিতে গজিয়েছে! মনের ভেতর কেমন একটা অস্বস্তি হতে শুরু করেছে। কতক্ষণ হলো হাঁটছি, আর কতক্ষণ বাকি এইসব ভাবছি, এমন সময় টর্চের আলোয় সামনের দিকে চোখ পড়তেই চমকে উঠলাম। মাটি থেকে ওটা কী উঁকি মারছে? শুধুমাত্র এক ঝলকের যেন মনে হল একটা মানুষের কপাল আর চোখ দেখতে পেলাম। জায়গাটা ফেলে অনেকটা এগিয়ে এসেছি। সুপর্ণা দেখতে পায়নি। দেখতে পেলে নির্ঘাৎ সে কিছু বলতো। কিন্তু কয়েক মুহূর্তের জন্য আমি যা দেখলাম সেটা যেন আর ভুলতে পারছি না। ওটা কী মাটিতে পোঁতা একটা মানুষের মাথা? ওই যে চুল...ওগুলো কী আসলে এক একটা মানুষের কাটা মাথা...যেগুলো মাটিতে পোঁতা আছে? কথাটা মনে হতেই পা ভারী হয়ে গেল।

সুপর্ণাকে কি কিছু বলা উচিত? কিন্তু ওকে এখন কিছু বললে শুনবে না। তাছাড়া টুবলুকে ফিরে পেতে আমিও তো চাই! এত কাছে এসে ফিরে যাব? ভৈরবী মা তো বলেইছেন সাহস করে এগিয়ে যেতে।

নিজের মনের মধ্যে হারিয়ে গেছিলাম এমন সময়, ঠিক পেছন থেকে একটি মহিলা কণ্ঠ বলে উঠল।

''তোমরা কোথায় যাচ্ছো গো?''

আমি চমকে দাঁড়িয়ে গেলাম। সুপর্ণাও দাঁড়িয়ে পড়েছে, শুধু তাই নয়, সে একদম আমার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে। আমি ওর কাঁধের ওপর হাত রেখে পেছন দিকে তাকালাম। কেউ নেই। টর্চ ফেললাম। কাউকেই দেখতে পেলাম না। ভৈরবীর বলা কথাগুলো মনে পড়লো। মন্দির যাওয়ার পথে নানারকম অশুভ শক্তি আমাদের বাধা দেবে। আমি সামনের দিকে ফিরে সুপর্ণাকে নিয়ে এগোতে লাগলাম। কিছুটা দূর গেছি এমন সময় অবার শুনতে পেলাম, সেই একই নারী কণ্ঠ, ''এই...তোমরা মন্দিরে যাচ্ছ না কী?''

আমি আর এবার দাঁড়ালামও না, ফিরেও তাকালাম না। সোজা এগোতে লাগলাম সুপর্ণাকে নিয়ে। সুপর্ণা ভয় পাচ্ছে, কিন্তু আমি ধরে আছি বলে সাহস করে এগিয়ে যাচ্ছে।

''যেও না!'' পিছন থেকে আবারও ডাক শুনতে পেলাম। যেন আমাদের চারিদিকের বন জঙ্গল আমাদের সাথে কথা বলছে।

''যেও না বলছি! ফিরে যাও! যে তোমাদের ডেকেছে, তাকে তোমরা চেনো না! সে তোমাদের শেষ করে দেবে!''

কাঁপা গলায় কেটে কেটে আমাদের কথা শোনাচ্ছিল সেই অপার্থিব কণ্ঠ।

''তোমাদের শরীরগুলো খাইয়ে দেবে নিজের পুষ্যিদের! শয়তানের উপাসক সে। এই করেই ও নিজের শক্তি বৃদ্ধি করে! যেও না বলছি!''

কথাগুলো শুনে আমি আবার থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম। চারদিকে আবারও আলো ফেললাম। না! কেউই নেই। সুপর্ণার দিকে তাকিয়ে দেখি তার কপালে ঘাম, ঠোঁট কাঁপছে ভয়ে। আমি ধীরে ধীরে বললাম, ''ফিরে যাই চলো!''

সে ফিস ফিস করে বলল, ''তুমি কী পাগল? এত কাছে এসে ফিরে যাবো?''

''ও...ওই যে ও বলছে!''

''মিথ্যে বলছে। ওরা চায় না টুবলুকে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দিতে। আমাদের ভয় দেখিয়ে তাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে অনির্বাণ তুমি এসো প্লিজ।'' মিনতি করল সুপর্ণা।

ইচ্ছা না থাকলেও এগোতে হল। যা আছে কপালে! কিছুটা দূর আরো এগোলাম। কণ্ঠস্বরটা কী আবারও কিছু বলবে?

না। বেশ কিছুক্ষণ হাঁটার পরও আর কিছু শুনতে পেলাম না। আচ্ছা, ভৈরবী সত্যিই আমাদের বলি দেবে না তো? সত্যিই আমাদের দেহটা ওর পুষ্যিদের খাইয়ে দেবে না তো? আর আমাদের কাটা মাথাগুলো মাটিতে পুঁতে রাখবে না তো? ওই যে রাবারের পাইপটার ওপর পা দিয়ে ফেলেছিলাম। ওটা আদৌ রবারের পাইপ নাকি কাটা আঙুল? যে মাটির ওপর পা ফেলে হেঁটে যাচ্ছি তার নীচে শুধু মানুষের দেহ পোঁতা নেই তো? ভৈরবী তার তন্ত্র শক্তি দিয়ে মৃতদেহের গন্ধটাকে দমিয়ে রেখেছে যাতে বাইরের মানুষ জানতে না পারে। কথাগুলো মনে হতেই নতুন করে ভয় চেপে ধরল আমাদের। কিন্তু এর বেশি আর কিছু ভেবে উঠতে পারলাম না...

এক অপার্থিব আর্তনাদ রাতের অন্ধকার এবং নিস্তব্ধতা খান খান করে দিলো। সুপর্ণা ভয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে আমার বুকে মুখ গুঁজে দিলো। আমি ওকে জড়িয়ে ধরে রইলাম বটে, কিন্তু ভয়ে আমারো রক্ত ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। আমাদের ঠিক, দশ বারো হাত সামনেই বিশাল এক গর্ত রয়েছে। আর ভেতর থেকেই আসছে তীব্র আর্তনাদ আর ধস্তাধস্তির শব্দ। যেন গর্তটার নীচে একদল পিশাচ কোনো এক অসহায় নারীকে ছিঁড়ে খুড়ে খাচ্ছে। মানে আক্ষরিক অর্থেই খাচ্ছে। দু—একবার পরপর শব্দও শুনতে পেলাম। এগুলোই ভৈরবীর পুষ্যি নয় তো? সত্যি কথা বলতে কী ব্যাপারটা ঘটতে সময় লেগেছিল খুব বেশি হলে দশ থেকে পনেরো সেকেণ্ড। কিন্তু আমার কাছে সেটা কয়েক ঘন্টার মতো মনে হচ্ছিলো। বেশ কিছুক্ষণ অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকার পর, সুপর্ণাকে বললাম, ''ফিরে যাই চলো।''

সে ভিতু চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ''এখান থেকে ফিরে গেলে আমি কোনোদিন নিজেকে ক্ষমা করতে পারব না। যদি মরতে হয় তো মরব কিন্তু টুবলুকে নিয়েই ফিরব।''

সুপর্ণা ভয় পেয়েছে, কিন্তু ছেলের মায়া ছাড়তে পারছে না। কিন্তু আমি কী করব? ছেলে তো গেছেই, পাগলামো করতে গিয়ে যদি সুপর্ণাকে হারিয়ে ফেলি? বা যদি আমারই কিছু হয়ে যায়? সুপর্ণা একা এই শ্মশানে কী করবে? রাস্তা হারিয়ে হয়তো পাগলের মতো শ্মশানে ঘুরে বেড়াবে! কথাটা ভাবতেই বুকটা চিনচিন করে উঠল।

আচ্ছা কে এই ভৈরবী?...ইনি আদৌ আমাদের ভালো করতে চান তো? ইনি মানুষ তো?

মাথা কাজ করছিল না, কিন্তু সুপর্ণাকেও এখান থেকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারব না। অগত্যা, সামনের দিকে আলো ফেলে এবং সুপর্ণাকে ধরে সাবধানে এগোতে লাগলাম।

গর্তটার দিকে আর তাকাতেও সাহস হল না। সেটাকে পাশ কাটিয়ে সম্মুখে এগিয়ে চললাম। আবার ভয়ানক কিছু একটা দেখার বা শোনার জন্য মনে মনে নিজেকে প্রস্তুত করছি, এমন সময়...

''ওই দ্যাখো।''

সুপর্ণার ডাকে সম্বিত ফিরলো। তার আঙুল দেখাচ্ছে দূরে মন্দিরের ধ্বংসস্তূপের দিকে। মনে হচ্ছে এই সেই শ্মশান কালীর মন্দির। মন্দিরের ভেতর প্রদীপ জ্বলছে মনে হল, ঘুটঘুটে অন্ধকারে আলোর এক হাল্কা আভা মন্দিরের ভেতর থেকে ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। জঙ্গল বেশ পাতলা হয়ে গেছে, ফাঁকা মাঠের মতো সমতল আমাদের সামনে বিস্তৃত হয়ে গেছে। এই জায়গাটাই মূল শ্মশানভূমি। এখানেই সম্ভবত মৃতদেহ পোড়ানো হত। কিন্তু কেন জানি না আর ভয় করল না। সত্যি বলতে কী, মন্দিরটা আর ভেতরের আলো দেখার পর বেশ অনেকটা সাহস ফিরে পেয়েছি। সুপর্ণারও জড়তা কেটে গেছে। সে তাড়াতাড়ি পা ফেলে এগিয়ে চলেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই মন্দিরের সামনে চলে এলাম। সোজা হেঁটে মন্দিরের সিঁড়ির দিকে উঠতে যাব এমন সময় সুপর্ণা আমার হাতটা চেপে ধরল। আমি ওর দিকে তাকাতেই সে আমাকে ইশারা করে চারিদিকে দেখালো। টর্চ না ফেলেই বুঝতে পারলাম আমাদের দুই পাশে, মাঠের ওপর সারবদ্ধ হয়ে মানুষ বসে আছে। না...ঠিক মানুষ নয়, যেন মানুষের ছায়া। মনে হল এরা কী আদৌ মানুষ? মানুষ হলে কী চুপচাপ এইভাবে সারবদ্ধ হয়ে বসে থাকতে পারে? এই যে একটু আগের তীব্র আর্তনাদ শুনলাম? এরা মানুষ হলে ছুটে আসত না?

''চুপচাপ মন্দিরে গিয়ে উঠে চলো।'' সুপর্ণা আমার কানের কাছে মুখ তুলে বলল, ''টর্চটা নিভিয়ে দাও। ওদের অসুবিধা হতে পারে।''

আমি যেটা ভাবছিলাম সুপর্ণাও সেটাই ভাবছে। কিভাবে সে নিজেকে সামলে রেখেছ তা ওই জানে! সত্যিই! সুপর্ণা না থাকলে আমি ভয়ে হার্ট ফেল করতাম।

যাইহোক, টর্চ নিভিয়ে সোজা গিয়ে মন্দিরের সিঁড়ির ওপর পা রাখলাম। চার— পাঁচ ধাপ উঠে গিয়েই মন্দিরের ভেতরে গিয়ে ঢুকলাম। মাঝখানে বেশ বড় একটা বাটির মতো পাত্র আগুন জ্বলছে। তাতে ভেতরটা বেশ ভালোভাবেই দেখা যাচ্ছে, কিন্তু ভৈরবী কই?

সুপর্ণার দিকে তাকিয়ে বুঝলাম সেও কী করা উচিত বুঝে উঠতে পারছে না। দুজনেই বিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে আছি এমন সময়...

''তোমরা এসেছো?''

মায়াময় মাতৃময়ী কণ্ঠস্বরটা কানে আসামাত্র যেন ধড়ে প্রাণ ফিরে পেলাম।

''মা'' অস্ফুট ভাবে সুপর্ণা বলে উঠলো।

আমাদের চেয়ে ওই হাত দশেক দূরে হাতে ছোট একটা প্রদীপ নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। সত্যি কথা বলতে কী স্পষ্টভাবে তাঁর মুখটা আমি বা সুপর্ণা কেউই দেখতে পাইনি। কিন্তু তাঁর সেই অদ্ভুত দৈব অবয়বটিই যথেষ্ট ছিল। এর মাঝে আমি একবার হাতের ঘড়িটায় সময় দেখে নিলাম। এগারোটা বেজে দুই। খুব দেরি হয়নি।

সুপর্ণাকে নিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম ভৈরবীর দিকে। কিছুটা এগিয়ে যেতেই তিনিও ঘুরে গিয়ে বললেন, ''আসো তোমরা আমার সাথে'' এবং হাঁটা লাগালেন। বুঝতে পারলাম তিনি আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে চাইছেন। মন্দিরের ভেতরে সিঁড়ি দিয়ে নীচের দিকে নিয়ে যেতে লাগলেন। কোথায় নিয়ে চলেছেন ইনি আমাদের? মন্দিরের কোনো গর্ভগৃহ? সেখানেই কী আমাদের টুবলু অপেক্ষা করে আছে আমাদের জন্যে?

''আজ সারাদিন তোমরা কিছুই খাওনি?'' ভৈরবী জিগ্যেস করলেন।

''জলটুকু স্পর্শ করিনি মা।'' সুপর্ণা উত্তর দিলো।

সত্যি তো। আজ সারাদিন যে এইভাবে রয়েছি, সেটা একবারের জন্যও মনেই হয়নি। দিনের প্রথম দিকটা ছেলেকে ফিরে পাওয়ার আনন্দে কিছু মালুম হয়নি। আর এই শেষ দশ—পনেরো মিনিট তো স্রেফ ভয়েই কেটেছে।

ভৈরবী বললেন, ''এই শ্মশানে এর আগে কেউ জীবিত অবস্থায় ফেরেনি। অনেকেই তোমাদের মতো অনেক আশা নিয়ে এসেছিল, কিন্তু তাদের আর ফেরা হয়নি। কিন্তু আজ তোমাদের মৃত্যুযোগ নেই তাই তোমরা আজ বেঁচে ফিরতে পাচ্ছ।''

এসব কী বলছেন ভৈরবী? আমার যেন মাথা ঘুরতে লাগলো ওনার কথা শুনে। সুপর্ণা আমতা আমতা করে বলল, ''কিন্তু মা, আপনি যে বলেছিলেন আমাদের সন্তানকে আপনি ফিরিয়ে দেবেন?''

ভৈরবী যেন একটু হেসে বললেন, ''এইভাবে সন্তান লাভ সম্ভব হলে বিধাতা এইভাবেই সবাইকে সন্তান দিত। যার যাওয়ার সে গেছে এবার তোমরা এগিয়ে যাও। জন্ম—মৃত্যু এসব প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ী হয়। সে নিয়ম ভাঙে এমন সাধ্য স্বয়ং মহাদেবেরও নেই। তা যদি হত, তাহলে তিনিও সতীকে বাঁচিয়ে তুলতে পারতেন। তোমাদের আগে যাদের এই শ্মশানে এসে মৃত্যু ঘটেছে সেটাই ছিল প্রকৃতির নিয়ম।''

আমি কী বলব বুঝতে পারছিলাম না। সুপর্ণাও থ মেরে গেছে। ভৈরবী কাল সন্ধ্যায় যখন এসেছিলেন তখন এইসব বললেন না। তাহলে এখন কেন?

''আমরা কী তাহলে আমাদের সন্তানকে ফিরে পাবো না?'' সুপর্ণাই সাহস করে প্রশ্নটা করলো।

''মৃত মানুষ কখনো ফিরে আসেনা মা।'' ভৈরবী স্পষ্ট করে বললেন, ''তবে তোমাদের এখানে আসাটা বৃথা হয়নি। তোমরা এসেছে বলেই আজ এক পাপিষ্ঠ তার পাপের শাস্তি পেয়েছে। ঠিক তেমনি কৃষ্ণের আগমন হয়েছিল কংসকে শাস্তি দেওয়ার জন্য।''

কথা বলতে বলতে কখন যে একটি দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছি বুঝতে পারিনি। ভৈরবী আমাদের দিকে একপাশ ফিরে বললেন, ''এই দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাও। বাইরে সিঁড়ি আছে, সেটা শ্মশানের রাস্তায় নিয়ে গিয়ে তুলবে। চিন্তা করো না ফেরার পথে কেউ তোমাদের বিরক্ত করবে না।...আর হ্যাঁ এই দরজার ওপারে যাই দেখতে পাও না কেন, ভয় পাবে না। জানবে পাপী তার পাপের শাস্তি পেয়েছে। অন্যের জন্য যে গর্ত খোড়ে তাকে নিজেকেই সেই গর্তে পড়তে হয়। এবার যাও।''

ভৈরবীর এই যাও বলাটার মধ্যে কী ছিল জানি না, আমি আর সুপর্ণা কেমন যেন তাঁর আদেশের বশবর্তী হয়ে গেলাম। সন্তানকে ফিরে পাওয়ার যে স্বপ্ন আমাদের ভেঙে চুরমার হয়ে গেল, সেটা বুঝে যাওয়া সত্ত্বেও যেন দরজা খুলে বেরিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কিছুই করতে পারলাম না। কিন্তু ভৈরবী আগাম সতর্ক করে দেওয়ার পর বুঝিনি দরজার ওপারে ঠিক কী অপেক্ষা করেছিল আমাদের জন্য। দরজা খুলে এক হাতে শক্ত করে সুপর্ণার হাত ধরে অন্য হাতে সামনের দিকে টর্চ ফেলতেই, আমার শিরদাঁড়া দিয়ে তরল স্রোত নেমে গেল। সুপর্ণার চিৎকারে আকাশ বিদীর্ণ হয়ে গেল। আমাদের সামনে হাত পা ছড়িয়ে ছিন্নভিন্ন দেহে পড়ে আছেন স্বয়ং ভৈরবী।

কতক্ষণ বিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম জানি না, তরপর কী মনে হতেই সুপর্ণাকে কোলে তুলে নিয়ে সামনের দিকে হাঁটা দিলাম। সিঁড়ি একটা সামনেই ছিল, সেটা দিয়ে উঠতে লাগলাম। একে সারাদিনের উপোস, সেই সঙ্গে শারীরিক আর মানসিক ধকল, তারওপর একটি মানুষকে কোলে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে যাওয়া, এক কথায় দুসাধ্য! কিন্তু আমার মাথায় তখন একটাই কথা ঘুরছে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সুপর্ণাকে নিয়ে এখান থেকে বেরতে হবে। হবেই...

সিঁড়ির শেষ ধাপটা টপকে যখন শ্মশানের রাস্তায় পা রাখলাম, তখন বুঝতে পারলাম, সেই বিশাল গর্তটার বাইরে এসে দাঁড়িয়েছি। শ্মশানে ঢোকার কিছুক্ষণ পরেই গর্তের ভিতর থেকে আর্তনাদ আর ধস্তাধস্তির শব্দ পেয়েছিলাম, তাহলে যে আর্তনাদ শুনেছিলাম সেটা তাহলে কী ভৈরবীর?

''এবার আমাকে নামাও।'' সুপর্ণা আর্জি জানালো। কিন্তু আমি কোনো কথা না বলে, তাকে কোলে নিয়েই সোজা রাস্তা ধরে বেরতে লাগলাম। নিজের অনিচ্ছা সত্ত্বেও যেন সব কিছু পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছিল।

ভৈরবী আমাদের ডেকেছিলেন শয়তানের হাতে আমাদের উৎসর্গ করবেন বলে। উনি এরকম অনেকের সাথেই করেছেন। কিন্তু আজ আমাদের মৃত্যু যোগ ছিল না। উনি আমাদের জন্য গর্ত খুঁড়ে রেখেছিলেন। অন্ধকারে বুঝতে না পেরে আমরা গিয়ে পড়তাম গর্তের ভেতর আর তারপর ওনার পুষ্যিরা আমাদের দুজনকে ছিঁড়ে খেত। এই ব্যাপারেই সেই অশরীরী কণ্ঠস্বর আমাদের বারবার সতর্ক করে দিচ্ছিল। হয়ত জীবিতকালে তাকেও এইভাবেই শেষ হতে হয়েছিল। মন্দিরের বাইরে যে সব সারিবদ্ধ প্রেতাত্মাদের দেখলাম তারাও হয়তো এইভাবেই শেষ হয়েছে। কিন্তু আমাদের শেষ করতে পারলেন না ভৈরবী, আমাদের জন্য খোড়া গর্তে কোনোভাবে নিজেই গিয়ে পড়লেন আজ, আর তাঁর পুষ্যিরা তাঁকেই কী করেছে সেটা তো নিজের চোখেই দেখলাম। এই পুষ্যিরা আদপে কী? সেই রায়চৌধুরীদের গল্প কথার যক্ষ নয়তো? তারা কী তা বলতে পারব না, তবে তাদের হিংস্র গরগরানী আমি নিজে কানে শুনেছি। কিছু তো নিশ্চয়ই ছিল। তারা হয়ত আমাদেরও আক্রমণ করতে পারত, করেনি তার কারণ, ওই যাঁর সাথে মন্দিরের ভেতর দেখা হল... তিনি। যাঁকে প্রথম থেকেই ভৈরবী বলে ভুল করে আসছি। তিনি যে ভৈরবী নন এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। তিনি একবারও নিজেকে ভৈরবী বলে পরিচয় দেননি। তাহলে তিনি কে?

এর উত্তরটা দিল সুপর্ণা।

শ্মশানের বাইরে এসে গাড়ির দরজা খুলে সুপর্ণাকে বসিয়ে, নিজে ড্রাইভারের সিটে এসে বসলাম।

''মাথা ঠাণ্ডা রেখে গাড়ি চালাও।'' ক্লান্ত গলায় বলল সুপর্ণা, ''মা আমাদের সাথে আছেন।''

আমি সুপর্ণার দিকে তাকিয়ে দেখলাম, তার গলার লকেটটা যেন একবার ঝিলিক দিয়ে উঠলো।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%