পোট্রেট

কৌশিক কারক, আকাশ চন্দ, উৎস ভট্টাচার্য

লাগছে, লাগছে না। লাগে তুক না লাগে তাক। সুদীপের, জীবনে অনেক ব্যাপারেই সফল সুদীপ। কিন্তু চাকরির ব্যাপারটা তার কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। এটা সুদীপ মেনে নিতে পারছে না।

যখন পড়াশোনা করত তখন সুদীপ ছিল লেডী কিলার। পাশের বাড়ির বেবীর সঙ্গে সুদীপের যখন প্রথম প্রেম হয় তখন সুদীপ পড়ত ক্লাস এইটে। সেব্যাপারে অবশ্য সুদীপের দোষ ছিল না। তার সমান বয়সী বেবীর আগ্রহ ছিল এই ব্যাপারে অনেক বেশি। সুদীপকে ভুলিয়ে নিজেদের চিলেকোঠার নির্জন ঘরে নিয়ে গিয়ে ঠোঁটে ঠোঁট রেখে প্রথম চুমুটা খেয়েছিল, আটকাতে দেয়নি সে। খেয়েছিল অনেকক্ষণ ধরে। প্রথমদিন ঘেন্নায় সুদীপ মুখে জিভটা কিন্তু তারপর থেকে এই জিভ আর ঠোঁটের খেলা বেবীদের বাড়ির নির্জন চিলেকোঠার ঘরে অনেক খেলেছে তারা। তবে বিধি বাম। হাতেনাতে ধরতে না পারলেও বেবীর বাড়ির লোকজন কিছু আন্দাজ করেছিল। তাই হঠাৎ, বেবীর বিয়ে হয়ে গেল একদিন দুম করে।

বেবীর বিয়ে হয়ে যাওয়ায় দুঃখ পেয়েছিল সুদীপ। তবে তার থেকে অনেক বেশি হয়েছিল তার শারীরিক কষ্ট। কিন্তু এই কষ্টটা তাকে বেশিদিন ভোগ করতে হয়নি। বেবী শ্বশুরবাড়ি চলে যাওয়ার পর সুদীপদের বাড়িতে কাজ করতে আসে, রত্না। বয়স বছর পনেরো ষোলো। সুদীপের থেকে বছর চারেকের ছোট।

নিচু দরিদ্র ঘরের মেয়ে হলেও রত্না দেখতে শুনতে ছিল ভালো। ঠাট্টা ইয়ার্কিতেও পারদর্শী। তাই মা—বাবার আড়ালে তার সঙ্গে খুনসুটি করার রাস্তা খুঁজে নিতে সুদীপের দেরি হয়নি। প্রথম প্রথম মৌখিক। তারপর একটু আধটু গায়ে হাত দেওয়া। শেষকালে একদিন রত্নার পায়ে নূপুর পরিয়ে দেওয়ার সময় পায়ের গোছ থেকে কোমর পর্যন্ত আদর করে ফেললো সুদীপ। একবার দুবার শিউরে উঠলেও রত্না বাধা দেয়নি। আর দেরি করেনি সুদীপ। সেদিনই রাতে সকলের আড়ালে, সে রত্নাকে চুমুতে চুমুতে অস্থির করে তুলেছিল। রত্মার কিশোরী শরীর কি এক অদ্ভুত সুখে ভরে গিয়েছিল।

তার পরের দিন সকালে রত্না যখন সুদীপ কে চা দিয়ে এলো তখনই তাকে নিজের মনের কথা জানিয়েছিল সুদীপ।

''আমি একটা পোট্রেট আঁকতে চাই রত্না।''

রত্না বেশি লেখাপড়া জানে না। তাই আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলো সে।

''কি আঁকবে বললে।''

পোট্রেট। মানে একটা মানুষের অবয়ব ''এক্ষেত্রে আমি আঁকব একটা মেয়ের ছবি।''

''ও।''

''কিন্তু তোর সাহায্য চাই।''

''কি রকম''?

রত্নার কাছে সরে এসেছিল সুদীপ। ফিসফিস করে বলেছিল, ''তোকে উলঙ্গ হয়ে আমার সামনে দাঁড়াতে হবে। আমি তোকে দেখে নারী শরীরের আঁটঘাট চিনব। তবেই তো আমার তুলিতে আঁকা ছবি জীবন্ত হয়ে উঠবে।''

শিউরে উঠেছিল রত্না।

''ছিঃ! এ তুমি কি বলছ সুদীপদা?''

এবার রত্নাকে জড়িয়ে ধরে আদরে আদরে ভরিয়ে দিয়েছিল সুদীপ।

''কেন আমার সামনে তোর লজ্জা কিসের।''

সেদিন নিজেদের লজ্জা তারা বিসর্জন দিয়েছিল নিজেদের সামনে। রতিক্রিয়ার প্রায় শেষ পর্যায়ে রাজি হয়েছিল রত্না। কিন্তু শর্ত একটাই, ''ও ছবির মুখ আমার মতো করতে পারবে না। লোকে যেন না বোঝে ওটা আমি।''

''তাই কখনো হয়। তোর ঠাঁই যে আমার বুকে। তুই যে আমার একান্ত ব্যক্তিগত। ও ছবির মুখ হবে অন্য, ওরে পাগলী।''

সেই শুরু হয়েছিল নগ্ন রত্নার ছবি আঁকা। প্রতিদিন গভীর রাতে রত্মা তার উলঙ্গ দেহ ভঙ্গিমা মেলে দাঁড়াতো সুদীপের সামনে। আর সুদীপের তুলি চলত ক্যানভাসের ওপর। কিন্তু নগ্ন কিশোরী শরীর সামনে রেখে ছবির কাজ এগোতো কম।

সঙ্গম হত তার থেকে অনেক বেশি। এমনি করে একদিন রত্না গর্ভবতী হয়ে পড়ল। একদিন রাতে সুদীপকে সে জানালো সে কথা।

''ওগো তোমার সন্তান আমার পেটে। আমায় স্বীকৃতি দাও প্রিয়।''

রত্নার কথা শুনে সুদীপ তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে।

''আজ আমাদের কত সুখের দিন। তোকে আর একটা সুখবর দেওয়ার আছে।''

''কিগো''।

বোম্বেতে এক জাহাজ কোম্পানি থেকে আমি চাকরির ডাক পেয়েছি। কাল আমাকে চলে যেতে হচ্ছে।

রত্মা সুদীপের চাকরির খবর কিছুই জানতো না।

সে শিউরে ওঠে, ''লোক জানাজানি হয়ে গেলে আমি কোথায় যাব, আমায় একা ফেলে তুমি চলে যাবে?''

''দূর বোকা। আমি মাসখানেক পর ফিরে এসে তোকে বিয়ে করব।''

ছবি তখনও আঁকা শেষ হয়নি। ছবির মুখাবয়ব আঁকা তখনও বাকি। রত্না এবার ছবির দিকে চায়। ''কিন্তু ছবিটা? শেষ হলো না তো?''

''জীবন অনেক বড় রত্মা। আমি আর তুই সারাজীবন একসঙ্গে থাকব। ও ছবি নিশ্চয় একদিন শেষ হবে।''

এই ঘটনার পরদিন সুদীপ মানে সুদীপ্ত নারায়ণ চৌধুরী চলে যান বোম্বেতে মানে বর্তমান মুম্বাইতে। তারপর কিছুদিনের ঘটনা কালের অতলে তলিয়ে গেছে। তবে রত্নার মানে রত্নাবলীর সঙ্গে কিন্তু সুদীপ্ত নারায়ণের বিয়ে হয়নি। ওনার স্ত্রীর নাম ছিল মাধুরী। এবং সুদীপ্ত বা সুদীপ্ত নারায়ণ পরবর্তীকালে পুরোপুরি মুম্বাই নিবাসী হয়ে যান। তারপর সেখানেই বিরাট ব্যবসা ফেঁদে বসেন। রত্না বা তার পেটের সন্তানের কি হলো সে কথা আর জানা যায়নি। কালস্রোতে চৌধুরী বাড়ি ও ধীরে ধীরে, তার পরিবারের সদস্যদের হারিয়ে একেবারে একা হয়ে যায়। এখন ওখানে কেউই থাকে না। শুধু কোনো উৎসব অনুষ্ঠানে ক্বচিৎ—কদাচিৎ পরিবারের জ্ঞাতি গুষ্টিরা ঐ বাড়িতে দু একদিনের জন্য সমবেত হন। তবে রত্নার ঐ অসম্পূর্ণ পোট্রেটটি আজও চৌধুরী বাড়িতে সুদীপ্ত নারায়ণের গোপন স্টুডিওতে আছে বলে শোনা যায়।

এইটুকু বলে সম্বুন্ধ সান্যাল চুপ করলেন।

অরিত্র এতক্ষণ চুপ করে ওনার কথা শুনছিল। এবার মুখ খুলল।

''এই ঘটনাটা কতদিন আগেকার?''

তা ধরো ইংরেজ আমলের ঐ উনিশশো ত্রিশ বা পঁয়ত্রিশ সাল নাগাদ। কারণ সুদীপ্ত নারায়ণ মারা গিয়েছেন সেই নব্বই সালে। তখন তাঁর বেশ বয়স।

ঝিনুক মাথার ক্লিপ খুলে চুলটাকে আবার নতুন করে বাঁধছিল। আর্টিস্ট সুদীপ্ত নারায়ণের জীবনের ওপর একটা স্বল্প বাজেটের কাহিনী চিত্র বানাতে চায় ওরা। অরিত্র ও ঝিনুক এই তরুণ দুই চিত্র পরিচালক ছবি বানাতে সব সময় বিরল গল্পই খোঁজে।

সুদীপ্ত নারায়ণের জীবন তেমনই এক বিরল কাহিনী। কারণ তিনি ব্যবসাদার হিসেবে যতখানি পরিচিত আর্টিস্ট হিসেবে, ততখানি নন। অথচ তাঁর প্রতিভা অনেকের থেকে বেশি ছিল। বিদেশে অনেকবার ওনার ছবির প্রদর্শনী হয়েছে। কিন্তু ভারতীয় শিল্প জগতের কাছে তাঁর প্রতিভা গোপনই থেকে গেছে। উপরন্তু তাঁর ব্যক্তিগত জীবন যথেষ্ট বর্ণময়। তাই সুদীপ্ত নারায়ণের জীবনের ওপর সিনেমা করার প্রস্তাব যখন অরিত্র দিয়েছিল তখন রাজি হয়ে গিয়েছিল ঝিনুক।

সেই কারণেই কোলকাতা থেকে অনেক দূরেপ্রায় তিনশো বছরের পুরোনো এই চৌধুরী বাড়িতে আগমন দুজনের। বাড়ি পুরো খালি। বর্তমান মালিকরা দীর্ঘকাল বাইরে। জ্ঞাতি সম্বুদ্ধ সান্যালের হাতেই এই বাড়ির দায়িত্ব। ঘটনাচক্রে তিনি অরিত্রর বন্ধুর দুরসম্পর্কের দাদা। তাই চৌধুরী বাড়িতে থেকে নিজেদের কাহিনীর রসদ সংগ্রহ করার অনুমতি পেতে ওদের বেগ পেতে হয়নি।

সান্যালদা মানুষ খুব ভালো। ভালো ওনার স্ত্রীও। নিঃসন্তান এই দম্পতি প্রথম দেখাতেই অরিত্র আর ঝিনুককে আপন করে নিয়েছিলেন। ঝিনুকরা এখানে পৌঁছে ছিল দুপুরে। তারপর চব্যচোষ্য খেয়ে দুপুরে একঘন্টা ঘুমিয়ে শুরু হয়েছিল স্যানালদার কাছে গল্প শোনা। ওঁরা ঝিনুকদের রাতে খেয়ে যেতে বলেছিলেন। গল্প শেষ করে রাতের খাওয়া সেরে উঠতে প্রায় রাত নটা বেজে গেল। এই গ্রামাঞ্চলে নটা মানে অনেক রাত। তাই সম্বুদ্ধ সান্যাল ওদের অনুরোধ করেছিলেন সেদিন রাতে ওনার বাড়িতেই থেকে যাওয়ার জন্য।

''আজ রাতে এখানেই থেকে গেলে হয় না। কাল সকালে ওখানে যেও বরং।''

অরিত্র আর ঝিনুক সেদিনই চৌধুরী বাড়িতে যেতে চায়। তাদের অপরিসীম আগ্রহ চৌধুরী বাড়ির আনাচে—কানাচে লুকিয়ে থাকা ইতিহাস জানার। তাই তারা রাজি হলো না।

''আজকে ওখানে যেতে বারণ করছেন কেন সান্যালদা?''

''না তেমন কিছু না। বাড়িটা বেশ দূরে। আর তাছাড়া আমি আর তোমাদের বৌদি ভেবেছিলাম যে তোমরা দিনের বেলায় ওখানে কাজ করবে রাতে আমার বাড়িতে থাকবে।''

''কিন্তু সান্যালদা ওখানে রাতে থাকলে আমাদের কাজ করার অনেক সুবিধা হবে।''

''দেখো তোমরা অল্পবয়সী দুটো ছেলেমেয়ে। রাতে ওই ফাঁকা বাড়িতে তোমরা 'দুজনে একা থাকবে তাই বলছিলাম। অবশ্য, ওখানে কালাচাঁদ আছে। ও বাড়ির কেয়ারটেকার।''

অরিত্রর বুঝতে বাকি রইল না যে সান্যালদার আপত্তিটা আসলে কোথায়। গ্রামের মানুষ তাই বোধহয় এমন প্রাচীনপন্থী। ওনার মনোভাব ঝিনুকও বুঝেছে। ও লজ্জায় মাথা নিচু করে নিয়েছিল। কিন্তু অরিত্র আর ঝিনুকের সম্পর্কের কথা সবাই জানে। এতদিনে যখন মাঝে মাঝে চুমু খাওয়া ছাড়া অরিত্র আর কোনো শারীরিক সম্পর্কের জন্য জোর করেনি তখন অরিত্রকে ভরসা করা যায়।

ওদের চৌধুরী বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে সম্বুদ্ধ সান্যাল আর দাঁড়ালেন না। কালাচাঁদের সঙ্গে ওদের আলাপ করিয়ে দিয়েই চলে গেলেন।

কালাচাঁদ পাশাপাশি দুটো ঘর সাজিয়ে রেখেছিল। একটা অরিত্রর একটা ঝিনুকের। পুরোনো আমলের বড় বড় ঘর। পুরোনো জিনিসপত্রে ঠাসা। বৃহৎ পালঙ্কের মতো খাট। কালাচাঁদ ঘর সাজিয়ে গুছিয়ে ভালো ব্যবস্থাই করেছে। কিন্তু সে নিজে মানুষটা কেমন যেন বিদঘুটে। আনুমানিক বছর ষাটেক বয়স তার। মুখভর্তি কাঁচা পাকা দাড়ি গোঁফ। মাথায় জট পাকানো চুল। ঝিনুকরা আসার পর থেকে সে একটা কথাও বলেনি।

এ বাড়িতে ঢোকার পর থেকে ঝিনুকের যেন মনে হচ্ছে সে এক অন্য দুনিয়ায় এসে পড়েছে। বাইরের কোনো প্রাণস্পন্দন যেন বহুযুগ এবাড়ির ভেতরে পৌঁছায়নি। গোটা বাড়িতে সময় যেন থমকে আছে। একটু একটু করে বাড়িটা ঘুরে দেখছিল ওরা। সব কেমন যেন নিটোল করে সাজানো। বুঝি এইসব জিনিসের মালিকরা তাদের রেখে দিয়ে কোথাও গেছে আবার হঠাৎ এসে পড়বে। এ বাড়িতে লোক নেই বহির্জগতের প্রাণস্পন্দন নেই। কিন্তু এই নীরবতা যেন কিছুক্ষণের জন্য হয়তো চুপ করেছে। আবার হঠাৎ কথা বলে উঠবে।

ওরা এক দালান থেকে আর এক দালান হয়ে ক্রমশঃ বাড়ির ভেতরে ঢুকছিল। ভেতরে কত অন্ধকারে ঢাকা করিডোর পরের পর তালাবন্ধ ঘর। প্রায় তিনশ বছরের এই পুরোনো বাড়িতে ইতিহাস যেন কথা বলতে চায়। ধীরে ধীরে অতীতের কোন এক অদ্ভুত অনুভূতির ভেতরে তলিয়ে যাচ্ছিল ওরা।

হঠাৎ একটা কর্কশ গলা।

''রাতে বাড়ির অত ভেতরে যাবেন না।''

ওরা চমকে পেছনে ফিরল। পেছনে কালাচাঁদ।

''ভুলেও রাতে ঘরের বাইরে বেরোবেন না। যান আপনাদের ঘরে যান। কথাটা মনে রাখবেন''।

''কেন কালাচাঁদ?''

''আমি বারণ করছি তাই।''

কালাচাঁদ বড় রুক্ষ। সে কথা প্রায় বলেই না। যেটুকু বলে তার মধ্যেও স্পষ্ট জবাব দেয় না। ঝিনুক ফিসফিস করে বলে ওঠে, ''অরি রাতে সান্যালদার কথা শুনে ওঁর বাড়িতে থেকে গেলেই হত।''

''ভয় পেলি?''

''না রে। রাতে এ বাড়িতে থেকে কি লাভ?''

''আরে বোকা রাতের এইসব বাড়গুলো জীবন্ত হয়ে ওঠে। অন্য রকম কথা বলে। আমি এ বাড়ির রাতের ভাষা বুঝতে চাই। হারানো ইতিহাস খুঁজে পেতে চাই।''

ঝিনুক অরিত্রর হাত ধরে টানে। ''সেসব দিনের বেলায় খুঁজে পাওয়া যাবে। এখন চল গিয়ে শুয়ে পড়বি চল।''

''আরে দাঁড়া না। ঐ পোট্রেটটা একবার দেখার ছিল।''

''কোনটা?''

''আরে রত্নাবলীর অসম্পূর্ণ পোট্রেটটা। ঐ তো।''

''ও কাল সকালে দেখিস। এখন চল ঘুম পাচ্ছে।''

''আপনারা কিন্তু এখনও ঘরে গেলেন না।''

কালাচাঁদ আবার ফিরে এসেছে।

''রাত বাড়ছে ঘরে চলুন তাড়াতাড়ি। আমিও বেরোব।''

''তুমি কোথায় যাবে কালাচাঁদ?''

''আমার বাড়িতে। আমি রাতে এখানে থাকি না।''

অরিত্র এবার ব্যাকুল।

''সুদীপ্ত নারায়ণের স্টুডিওটা একবার দেখা যায় কালাচাঁদ?''

''না দেখা যায় না। ওখানে কি দেখবেন''?

''ওনার আঁকা একটা অসম্পূর্ণ পোট্রেট।''

কালাচাঁদ এবার গর্জে ওঠে।

''যান ঘরে যান। আর মনে রাখবেন ভুলেও রাতে ঘরের বাইরে বেরোবেন না।''

অরিত্র পরিচালক মানুষ সৃষ্টিশীলতা তার সমস্ত সত্ত্বায় ছড়িয়ে রয়েছে। সে সহজে ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়। সে চেপে ধরলো, কালাচাঁদকে।

''প্লিজ কারণটা বলে যাও? ঘরের বাইরে কেন আসা যাবে না কালাচাঁদ?''

কালাচাঁদ আরও বিরক্ত।

''আমি কারণ বলতে পারবো না। আপনারা ভালোয় ভালোয় ঘরে যান।''

অরিত্র লক্ষ্য করলো কালাচাঁদের চোখে মুখে চাপা আতঙ্ক। সে চিৎকার করে উঠলো।

''না না। আমি বলব না। আমি বলতে চাই না। কেন আমাকে বিরক্ত করছেন আপনারা?''

কালাচাঁদের সেই চিৎকার এই বিশাল চৌধুরী বাড়ির আনচে—কানাচে প্রতিধ্বনি হয়ে ঘুরে বেড়াতে লাগল। কিন্তু অরিত্র নাছোড় বান্দা।

''দেখো কালাচাঁদ এই বাড়িকে নিয়ে একটা সিনেমা বানাতে চাই। আমাদের সুদীপ্ত নারায়ণের ব্যাপারে সবকিছু জানা দরকার।''

অরিত্রর হাতে একটা পাঁচশো টাকার নোট উঠে আসে।

''প্লিজ বলো।''

চোখেমুখে ভয় থাকলেও নোটটা ফেরাতে পারে না কালাচাঁদ?

''শুধু এটুকু জেনে রাখুন ভালোবাসার রাত। আজ বহু বছর এই রাত চৌধুরী বাড়ির বুকে অভিশাপ হয়ে দেখা, আজকের রাত্র। দেখছেন না এই বাড়িতে কোনো লোক থাকে না। যান আজ আর কোনো কথা নয়।''

কোনোরকমে কথা শেষ করে ওদের দুজনকে প্রায় ঠেলে শোবার ঘরে পাঠিয়ে দিল কালাচাঁদ। আর রাত যেন তার গভীরতা বাড়িয়ে নিল ঝুপ করে। নীরবতা যেন আজ সবকিছু গিলে নিতে চায়। কি বলে গেল কালাচাঁদ এই রাতে কোনো অভিশাপ এই চৌধুরী বাড়ির বুকে দেখা দেয়?

বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ। ঘুম আর আসে না অরিত্রর। ও ঘরে ঝিনুক একা একা কি করছে কে জানে। শরীরে কি ভয়ানক অস্বস্তি। এ কি কামোত্তেজনা, এ বাড়িতে কেউ নেই, কোনো লোক থাকে না বহু বছর। তবু যেন চোরাস্রোতের মত এই বাড়িতে কিছু না কিছু ঘটে চলেছে। কোথা থেকে একঘেয়ে অস্বস্তিকর একটা শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। কোথাকার শব্দ এটা? রাতের অন্ধকারে এই বাড়ি ধীরে ধীরে জেগে উঠছে। রোজ দিন জাগে? নাকি শুধু আজকে জেগেছে, আজ ভালোবাসার রাত বলে? বিছানায় শুয়ে ছটফট করে অরিত্র। আজকে ভালোবাসার রাত কেন? আজ তো ভ্যালেন্টাইন ডে নয়। এই রাত অভিশাপ বয়ে আনে কেন? কি এই রহস্য? আরও কত রহস্য লুকিয়ে আছে এই বাড়িতে? অরিত্রর আজ সবটাই জানা চাই।

রাত তখন কত কে জানে অরিত্র ছটফট করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছিল। হঠাৎ তার ঘুমটা ভেঙে যায়। দরজায় কেউ টোকা দিচ্ছে। অরিত্র প্রথমে ভাবলো মনের ভুল। কিন্তু না টোকা পড়ছে বারবার। নির্ঘাত ঝিনুক। একা একা ভয় পেয়েছে বোধহয়। লাফ দিয়ে বিছানা থেকে নেমে পড়ে অরিত্র। খুলে দেয় দরজা। ঝিনুক দাঁড়িয়ে দরজার সামনে।

''কিরে এত দেরি করলি দরজা খুলতে?''

অরিত্র খেয়াল করে ঝিনুকের গায়ে শুধু অন্তর্বাস। বিব্রত বোধ করে অরিত্র।

''আয় ঘরে আয়। একা একা ভয় লাগছে নাকি''?

''হু''।

তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে আসে ঝিনুক।

''দরজা দিয়ে দে অরি।''

অরিত্র দরজা দিয়ে ঝিনুকের কাছে আসে। খাটের ওপর বসে পড়েছে ঝিনুক। শুধু অন্তর্বাস গায়ে থাকার দরুন স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে ওর স্বাস্থ্য। স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ওর শরীরের প্রতিটি ভাঁজ। লাস্য আর যৌবন যেন উপচে পড়ছে ঝিনুকের শরীর থেকে। শ্যামাঙ্গিণী ঝিনুক এই রাতে চৌধুরী বাড়ির নীরবতায় আজ যেন অপরূপা হয়ে উঠেছে। এই মেয়েটিই কিছুদিন বাদে অরিত্রর স্ত্রী হবে। তারপর তার সন্তানের মা হবে। তাই লাভ কি আজকে রাতে সংযম রেখে?

ঝিনুক খাট থেকে উঠে ঘরের আয়নার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। নিজেকে দেখছিল বোধহয়। ভাবছিল এই পোশাকে অরিত্রর ঘরে চলে আসা তার উচিত হয়নি। অরিত্র সেই অবস্থাতেই গিয়ে ওকে ধরল। অতর্কিত আক্রমণ করে চুমু খেয়ে যাচ্ছে সমানে। সঙ্গে অল্প হাত চালাচালি। অত স্বাস্থ্যবতী মেয়েটাকে সহজেই বিছানায় এনে ফেলল অরিত্র। বিছানায় শুইয়ে ফেলেছে। শিউরে উঠছে ঝিনুক। উথালপাথাল করছে তার দেহ। আর ঝিনুকের দেহের ওপর অরিত্রর দেহটা চেপে বসছে ধীরে ধীরে।

এভাবে ঘোরের মাথায় বেশ কিছুক্ষণ কেটে গিয়েছে। সার্বিক তৃপ্তির পর পাশাপাশি শুয়েছিল দুজনে। আজকের ভালোবাসর রাত যেন সার্থক। অরিত্রর শরীরের সব কষ্ট উধাও। পাশেই শুয়ে রয়েছে ঝিনুক। ঘুমে দু চোখ জড়িয়ে এল অরিত্রর।

কিন্তু এ বাড়িতে আজ ঘুমোতে নেই।

আবার দরজায় টোকা। ঐ বোধহয় কালাচাঁদ ডাকছে। দরজা খুলতে হবে। নিশ্চয় আজ রাতে কোনো দরকার কালাচাঁদের। ঘুম চোখে উঠে গিয়ে দরজা খুলে দেয় অরিত্র। কই, কেউ তো কোথাও নেই? তবে ডাক দিল কে? ঘরের বাইরের চাপচাপ অন্ধকারের ওপর বাড়ির বাইরে থেকে আকাশে সারারাত প্রদীপ জ্বেলে রাখা চাঁদের ভাঙা ভাঙা আলো এসে পড়েছে। কি অদ্ভুত মায়াময় পরিবেশ। সত্যিই এ রাত ভালোবাসার রাত। আজকের রাতে শুধু ভালোবাসতে হয় আর প্রেম করতে হয়।

ঝিনুক অরিত্রর পেছনে এসে দাঁড়িয়েছিল।

''চল যাই।''

''কোথায়?''

''ঐ পোট্রেটটা দেখে আসি।''

''কোথায় পাব তাকে?''

সুদীপ্ত নারায়ণের স্টুডিওতে।

জানে ঐ কালাচাঁদ। সে একবার আমায় ডাকলো। এ বাড়ির কোন গোপন কক্ষে সে স্টুডিও লুকিয়ে আছে জানি না তো! তারপর আর তাকে দেখতে পাচ্ছি না।

ঝিনুক অরিত্রর হাত ধরে টানে।

''চল না যাই দুজনে। দুজনে মিলে এরপর কত অজানার পথে পাড়ি দেব। আর সামান্য একটা ঘর খুঁজে পাব না?''

আজ ঝিনুক আগে অরিত্র পেছনে। রাত এখন কত জানা নেই। এ বাড়ির ছোট বড় বিভিন্ন ধরনের দালান আর করিডোর পেরিয়ে অন্ধকারে প্রায় গা ভাসিয়ে অরিত্রকে নিয়ে চলেছে ঝিনুক। এই উৎকট অন্ধকারে চলেছে। সারসার তালাবন্ধ ঘর তাদের পথের দুধারে। কত বছরের কত অজানা অখ্যাত হাসি কান্নার গল্প বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কোথায় সে স্টুডিও? কোথায় বা সেই অসম্পূর্ণ পোট্রেট? সেকি আদৌ এই জগতে আছে।

হঠাৎ একটা ঘরের সামনে দাঁড়ালো ঝিনুক। দরজায় দামি কারুকাজ করা পর্দা ঝুলছে। কিন্তু এ ঘরের দরজা খোলা।

অরিত্রকে নিয়ে ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ে ঝিনুক। এই তো। এই তো সেই স্টুডিও। বিভিন্ন ধরনের ছবির ক্যানভাস। সব সুদীপ্ত নারায়ণের হাতে আঁকা। তাঁর প্রথম জীবনের আঁকা এইসব ছবির কথা কেউ জানে না। কিন্তু সবকিছু কেমন যেন মলিন। ক্যানভাস তুলি সবকিছু। কেমন রঙ, যেন দুঃখ মাখা তাদের গায়ে। তাদের মালিক আঁকতে আঁকতে একদিন সেই যে তাদের ফেলে চলে গেছেন। আর ফিরে আসেননি। আর এরা আজও তাঁর পথ চেয়ে বসে আছে। আর তাদের মাঝখানে বিরাট ক্যানভাসে, রয়েছে এক নগ্ন নারীমূর্তির ছবি। যার মুখ আজও আঁকা হয়নি। তার শরীরের ভাঁজে ভাঁজে ধুলোর ছাপ পড়েছে। এই ছবিও যেন অপেক্ষা করছে তুলির ছোঁয়ার।

ঝিনুক ফিসফিস করে ওঠে।

''এই ছবি আজ শেষ করে দাও প্রিয়।''

ঐ ছবিটার ওপর কি এক অমোঘ আকর্ষণ বোধ করে অরিত্র। এ ছবি আজ শেষ করে দেওয়া চাই। কিন্তু নগ্ন দেহভঙ্গিমার অনেক জায়গাই ধুলোয় মলিন রঙ উঠে অনেক জায়গা মুছে গিয়েছে। সেইসব জায়গা নতুন করে আঁকতে নগ্ন নারী শরীর চাই। ঝিনুক যেন পড়ে ফেলে অরিত্রর মনের কথা।

''....আমি দাঁড়াচ্ছি নগ্ন হয়ে।''

কিন্তু?

কিন্তু কি?

''ও ছবির মুখ আমার মতো করতে পারবে না। কেউ যেন না বোঝে ওটা আমি।''

অরিত্রর মুখ দিয়ে কে যেন কথা বলে ওঠে।

''তুই যে আমার একান্ত ব্যক্তিগত। তাই কি হয়''।

গোটা ঘর আবার যেন বহুকালের ধুলোময়লা সরিয়ে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। অরিত্রর তুলি নিপুণ হাতে চলছে ক্যানভাসের ওপর। এ ছবি আজ শেষ করা চাই। ছবির একেবারে শেষ পর্যায়ে অরিত্র ছবির মুখমন্ডলে তুলি বোলাতে শুরু করল। হঠাৎ ডাকলো ঝিনুক।

''একবার দেখো প্রিয়।''

''ওকি তোর পেট অমন ভারী কেন?''

তোমার সন্তান আমার পেটে। এ ছবি শেষ করে আমায় স্বীকৃতি দাও। আমি যে তোমায় চাই।''

হঠাৎ চমকে ওঠে অরিত্র। এ মেয়ে ঝিনুক নয়। এ অন্য কেউ। এর মুখ পাল্টে গিয়েছে কখন অরিত্র খেয়াল করেনি। ধীরে ধীরে সেই মুখে কালের বলিরেখা ফুটে উঠছে। আজকে রাতে বাইরে বেরোনো মানা। বিরাট ভুল করেছে অরিত্র।

কিন্তু আজ রাতে এ ছবি শেষ না করে তার মুক্তি নেই। তার ভেতর থেকে কে যেন আর্ত চিৎকার করে উঠল। কিন্তু এই বিশাল বাড়ির নির্জন স্টুডিওর ভেতর থেকে তার চিৎকার বাইরে গেল না।

পরদিন খুব সকালে ঘুম ভাঙলো ঝিনুকের। কাল বিছানায় শুয়ে সে যে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে সে বুঝতে পারেনি। নিশ্চিদ্র ঘুমে কেটে গিয়েছে সারারাত।

ঘুম থেকে উঠেই অরিত্রর ঘরে ছুটল ঝিনুক। ঘরের দরজা খোলা। গেল কোথায় ছেলেটা।

''কোথায় গেলি? তুই কোথায় অরি, অরি।''

ঝিনুকের চিৎকার বাড়ির আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়ায়। বাইরে বেরিয়ে ডাকে ঝিনুক। বারবার ডাকে। কিন্তু অরিত্রর সাড়া নেই। ডেকে ডেকে পাগলের মতো লাগছে তার। এবার কি ভেবে বাড়ির ভেতরে খুঁজতে থাকে সে। যদি সকালে উঠে বাড়ির ভেতরে কোথাও গিয়ে থাকে পুরোনো বাড়ির ইতিহাস খোঁজার নেশা যে অরিত্রর বহুদিনের।

এই দিনের বেলাতে এ বাড়ির ভেতরের গলিঘুঁজিতে অন্ধকার আর নেই। সব দেখা যাচ্ছে পরিষ্কার।

দিনের আলোয় রাতের পরিণতি ঐ বুঝি সামনে এল। অবশেষে তাকে খুঁজে পেল ঝিনুক।

একটা তালাবন্ধ ঘরের সামনে উপুড় হয়ে পড়ে আছে অরিত্র। নিষ্পন্দ নিষ্প্রাণ। আর তার সামনে বহু পুরোনো একটা নগ্ন নারীমূর্তির পোট্রেট। অসম্পূর্ণ নয় সম্পূর্ণ। যে ছবির মুখটা ঝিনুকের মতো। আর্তনাদ করে কেঁদে উঠল ঝিনুক। ভালোবাসার রাত তার অভিশাপ ফলিয়ে দিয়ে গেছে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%