ভালোবাসার টানে

কৌশিক কারক, আকাশ চন্দ, উৎস ভট্টাচার্য

এক


''না। এবার দেখছি ব্যাপারটা সুমনকে জানাতেই হবে। এই নিয়ে পরপর চারবার, একই জায়গায়, একই সময়ে। না, ব্যাপারটাকে আর চেপে রাখা যাবে না।''

গত একমাস ধরে প্রতি শনিবার লেডিজ ক্লাব থেকে সন্ধ্যেয় বাড়ি ফেরার সময় মোড়ের বটগাছটার নীচে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অনিমেষকে। প্রথম প্রথম এটাকে চোখের ভুল ভাবলেও এখন আর সেটা ভাবতে পারছে না সুমিতা। মনের মধ্যে কেমন যেন একটা ভয় ঢুকে গেছে। হাজারটা ভয়ংকর স্মৃতি যেন তাড়া করে বেড়াচ্ছে ওকে। অপরাধবোধ প্রবল থেকে প্রবলতর হয়ে উঠছে ওর মনে। এরকমটা হওয়ার কথা কিন্তু ছিল না।

অফিস থেকে সুমন বাড়ি ফেরার পর খাবার টেবিলে বসে কথাটা ওকে বলল সুমিতা।

সেটা শুনেই আঁতকে উঠে সুমন বলল, ''সেকি!!! এ কি করে হয়? না, না, তুমি নিশ্চয়ই ভুল দেখেছ। কবে থেকে এরকম হচ্ছে? আর তুমি আমাকে এটা আগে থেকে জানাওনি কেন?''

''প্রথম প্রথম আমি ভেবেছিলাম আমার মনের ভুল। কিন্তু এখন দেখছি সেটা নয়। সুমন আমার কিন্তু খুব ভয় করছে। আচ্ছা, অনিমেষ কোনোভাবে বেঁচে যায়নি তো?''

''সেটা কী করে হয়? পুলিশ ওর লাশ পেয়েছিল। আর তারক তো—''

''কিন্তু আমি যে নিজের চোখে ওকে দেখেছি সুমন। তাও একবার নয়, দুবার নয়, চারবার। চোখের ভুল কি পরপর এতবার হতে পারে?''

''দেখো, আমার মনে হয় তোমার একবার ডাক্তার দেখানো দরকার। এটা তো কোনোরকম মেন্টাল স্ট্রেস থেকেও হতে পারে। হয়তো তুমি এখনো সেই ব্যাপারটা ভুলে উঠতে পারোনি, তাই এরকম হ্যালুসিনেট করছ। কিন্তু ভেবে দেখো, আমরা যেটা করেছিলাম সেটা কিন্তু নিজেদের সুন্দর নিরাপদ ভবিষ্যতের কথা ভেবেই করেছিলাম। আমার মনে হয় একবার বাইরে কোথাও থেকে ঘুরে এলেও হয় আমাদের। আমাদের একান্তে কিছুটা কোয়ালিটি টাইম কাটানো দরকার। তাহলে তুমিও হয়তো এই মেন্টাল স্ট্রেস থেকে মুক্তি পাবে।''

''ঠিক আছে, তুমি যেটা বলছ সেটাও হতে পারে, কিন্তু আমি যে স্পষ্ট ওকে দেখেছি—''

''কোন কিন্তু নয়। কাল আমি অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে নেব। তোমার হেলথ নিয়ে আমি কোনরকম রিস্ক নেবো না সুমিতা।''

দুই

পরের দিন ডাক্তারের চেম্বার থেকে ফেরার সময় সুমন বলল, ''দেখলে তো সুমিতা। আমিও কিন্তু জানতাম, তুমি কোনো কারণে একটু বেশিই স্ট্রেস নিয়ে ফেলেছ। অবশ্য আমি খানিকটা এর জন্য দায়ী। তবে হ্যাঁ, আর দেরি নয়। ডাক্তার ম্যাডাম যা বললেন, আমাদের জীবনে এবার নতুন একজনের আসার সময় হয়ে এসেছে। আমাদের অতীতের সবকিছুকে পেছনে ফেলে এগিয়ে চলার সময় হয়ে গেছে। দেখবে নতুন অতিথি এলে পুরোনো অনেক কিছুই আর আমাদের জীবনে কোন ছায়া ফেলতে পারবে না।''

''সত্যি বলছ? তুমি রাজি তাহলে? এতদিন তো বাচ্চার কথা শুনলেই রেগে যেতে। বলতে এখনো সময় আছে।''

''আমি ভাবতাম আমাদের নতুন ব্যবসা, আগে সব একটু গুছিয়ে নিই। তারপর প্ল্যান করা যাবে, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আমাদের অতীতের সব স্মৃতি মুছে এগিয়ে চলতে হলে আমাদের আর দেরি করলে হবে না। শোনো, আমি ভেবে নিয়েছি,আমি অফিস থেকে দিন সাতেকের অফ নেব। কোনরকম অ্যাপয়েন্টমেন্ট রাখবো না। রবিদাসবাবুকে সবকিছু বুঝিয়ে দিয়ে দিন সাতেকের জন্য কোথাও থেকে ঘুরে আসব। শুধু তুমি আর আমি। নো অফিস, নো কাজ।''

''কোথায় যাবে? এত তাড়াতাড়ি কি করে সব ব্যবস্থা হবে?''

''সেটা আমি ঠিক করে নিয়েছি। আমরা আবার উটি যাবো। তারককে বলে দেব। আমরা ওর লজেই উঠব। আর সেখানে গেলেই—''

না!! না!! সুমন, এ তুমি কি বলছ? না!! না!! আর যেখানেই হোক, ওখানে আর নয়, তুমি কি করে বলছ? ওখানেই তো আমরা—''

হ্যাঁ, ওখানেই যাবো আমরা। ওখানেই তো আমাদের জীবনের সবচেয়ে সুখের স্মৃতি আছে। ওখানেই তো আমাদের জীবনের সাফল্যের সবচেয়ে বড় সিঁড়িতে উঠেছিলাম। আমি জানি তুমি ভাবছো ওখানে গেলে হয়তো আগের স্মৃতি তোমাকে তাড়া করবে। কিন্তু আমি ডাক্তারের সাথে আলাদাভাবে কথা বলেছি। উনি কিন্তু আমাকে বলেছেন, অতীতের কোন ঘটনার স্মৃতি তোমার অবচেতন মনে প্রভাব ফেলছে। সেই ঘটনার জায়গায় তোমাকে আরেকবার নিয়ে গেলে তোমার মনের এই অমুলক ভয়টা কেটে যাবে। আর তোমার মনে যে সন্দেহ দেখা দিয়েছে সেটাও দূর হয়ে যাবে। তুমি গিয়ে মিংমার সাথে কথা বলে নিশ্চিন্ত হয়ে যাবে। আমাদের কাজে যে কোন ভুল নেই সেটাও বুঝে যাবে তুমি।''

''শুধু মিংমা কেন? তারকও তো আছে?''

''না তারক তখন ওখানে থাকবে না। কি একটা কাজে ও বাইরে যাবে। অবশ্য বলেছে আমরা ওখানে যাওয়ার দিনতিনেক পর ও ওখানে চলে আসবে।''

''ঠিক আছে। কিন্তু আমার কেমন যেন—''

''কোন কিন্তু নয় সুমিতা, আমি কথা দিচ্ছি আমাদের সব সমস্যার শেষ করেই আমি ওখান থেকে ফিরবো।''

তিন

আজ তিনদিন হল সুমন আর সুমিতা এসেছে উটিতে। এসে তারকের লজেই উঠেছে ওরা। বেশ ভালোই কাটছে দিনগুলো। উটির আবহাওয়া সবসময়ই ভালো। এখন সেই হাড়কাঁপানো ঠাণ্ডা নেই। আর সেইরকম ট্যুরিস্টদের ভিড়ও নেই।

তাই নিস্তব্ধতাটা যেন মাঝে মাঝে বড্ড বেশি মনে হয় সুমিতার। তাই সুমন বাজার করতে গেলে বা বাইরের বাগানে ফোনে কথা বলার জন্য গেলে সুমিতার অনিমেষের কথা মনে আসে। এখন যেমন সুমন গেছে বাজার থেকে দেশি মুর্গি আনতে। রাতে রোস্ট হবে। এইসময় মনে নানা চিন্তা এসে ভিড় করছিল সুমিতার আর সাথে ভিড় করে আসছে অনিমেষের স্মৃতিগুলো। বারবার চোখের সামনে চলে আসছিল বিগত কয়েক বছরের সব ঘটনাই।

সুমিতা, সুমন আর অনিমেষ তিনজনেই একই কলেজে পড়ত। সুমন আর সুমিতা দুজনেই অনাথ। বড়ো হয়েছিল একটা ছোটো অনাথাশ্রমে। অনেক আগে থেকেই দুজনেরই পছন্দ ছিল দুজনকে। সুমনের সাথে কাছাকাছি থাকবে বলেই একই কলেজে ভর্তি হয় সুমিতাও। আর সেখানেই ওদের আলাপ হয় অনিমেষের সাথে। বড়োলোকের ছেলে অনিমেষ। বাবার বড় ব্যবসা। আর সেখান থেকেই শুরু হয় দুজনের প্ল্যান।

হ্যাঁ, একদম প্ল্যান করেই অনিমেষকে নিজের প্রেমের জালে জড়িয়েছিল সুমিতা। অনিমেষ ছিলো সুমনের ক্লাসমেট। সুমনই, ওদের আলাপ করিয়ে দেয়। নিজের প্রেমিকাকে নিজেই তুলে দিয়েছিলো অন্য আরেকজনের হাতে। প্রায় দুবছর ধরে চলেছিল ওদের প্রেম। না প্রেম নয়, প্রেমের নাটক। প্রেম একজনকেই করেছে সুমিতা, আর সেটা হল সুমন। দুবছর ধরে অনিমেষকে ঘোরানোর পর বিয়ের কথা বলে সুমিতা। সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে যায় অনিমেষ। নিজের বাবার সাথে সুমিতাকে দেখা করাতেও চায়। কিন্তু না, ওর বাড়িতে ঢুকতে চায়নি সুমিতা। তাহলে তো ওদের প্ল্যান সহজে সফল হতো না। তাই বাবার সাথে দেখা করাবার আগে রেজিস্ট্রি বিয়ে করতে বলে। বোঝায় অনিমেষকে যে ওর মতো কুলগোত্রহীন মেয়েকে ওর বাবা কিছুতেই মেনে নেবেন না। কিন্তু একবার বিয়েটা হয়ে গেলে ওনার কাছে মেনে নেওয়া ছাড়া অন্য কোন উপায় থাকবে না। হয়তো সময় লাগতে পারে কিন্তু সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। সুমিতার অন্যান্য সবকিছুর মতো সেটাও সহজেই মেনে নিয়েছিলো অনিমেষ। বোকাটা আসলে খুব ভালোবাসত ওকে। কথাটা মনে হতেই খুব হাসি পায় সুমিতার। রেজিস্ট্রির সময় সই করেছিলো তারক আর সুমন নিজে। কিন্তু তারপরেও অনিমেষকে বাড়িতে কিছু জানাতে দেয়নি সুমিতা। দুজনে মিলে এসেছিলো এখানে, এই উটিতে, হানিমুনে। আর তারপরেই সফল করেছিলো ওদের প্ল্যান।

এখানে আসার দিন রাতেই তারক, এই তিনজনে মিলে মেরে ফেলেছিল, সুমন আর এই লজের নেপালী চাকর মিংমা, এই তিনজনে মিলে মেরে ফেলেছিল অনিমেষকে। গোটা ব্যাপারটাই সাজানো হয়েছিলো রাহাজানি আর খুন হিসেবে। সেইদিন ইচ্ছে করেই বেড়াতে গিয়ে একটু রাত অব্দি জঙ্গলে বসিয়ে রেখেছিলো অনিমেষকে। আর সেখানেই তিনজনে মিলে শেষ করে দেয় ওকে। আর তারপর পুলিশের কাছে গিয়ে অসহায় মেয়ের মতো নিজের স্বামীর খুনের সাক্ষ্য দেয় সুমিতা। লাশ সনাক্ত করে। খবর দেওয়া হয় অনিমেষের বাবাকে। রাখালবাবু এসে নিজের ছেলের লাশ আর ছেলের বিধবা বৌকে নিয়ে ফিরে যান কলকাতায়।

কলকাতায় ফিরে কিছুদিন পরে নিজের রূপ ধরে সুমিতা। শ্বশুরকে ক্রমাগত চাপ দিতে শুরু করে। সারাজীবন তার পক্ষে একা কাটানো সম্ভব নয়, সামনে গোটা জীবন পড়ে আছে এই জাতীয় কথাবার্তা বলে রাখালবাবুকে একরকম বাধ্যই করেছিলো ওর নামে সম্পত্তির একটা বড় অংশ লিখে দিতে। সুমন বলেছিল ছেলের পর বাবাও যদি খুন হয় তাহলে সুমিতা সন্দেহের তালিকায় চলে আসবে। তাই ওর কথামতো রাখালবাবুকে মানসিক চাপ দিয়ে বাধ্য করেছিলো সুমিতা। সন্তানহীন বৃদ্ধ মানুষটা আশার চেয়ে অনেক অনেক বেশিই দিয়েছিলেন ওকে।

সম্পত্তি পাবার দুমাসের মধ্যেই সুমনের সাথে বিয়েটা সেরে ফেলেছিলো সুমিতা। নিজেদের ব্যবসা শুরু করেছিলো ওরা। আজ মাস ছয়েকের মধ্যে সেটাকে বেশ কিছুটা বাড়িয়ে নিয়েছে সুমন। সেইজন্যই প্রথমে হয়তো সন্তান চায়নি সে, খুব একটা বেশি সময়ও দিতে পারতো না সুমিতাকে। কিন্তু আজ সুমিতা খুব খুশি। ওর আর সুমনের স্বপ্ন সফল। তারক আর মিংমা যে লজে কাজ করতো এখানে আজ সেই লজেরই মালিক ওরা। টাকার একটা ভাগ ওদেরও দিতে হয়েছিলো। কিন্তু মাঝে মাঝে কোথাও যেন একটা কিছু কাঁটার মতন খচখচ করতো সুমিতার মনে। সুমনকে কয়েকবার বলেওছিলো যদি প্রাণে না মেরে অনিমেষের কাছ থেকে অন্য কোন ভাবে সম্পত্তি হাতানো যায়। কিন্তু তাতে অনেক সময় লেগে যেত বলে সুমন রাজি হয়নি। সেই অপরাধবোধ থেকেই কি আজ অনিমেষের ছায়া বারে বারে ওর সামনে চলে আসছে? নিজেকে প্রশ্ন করে সুমিতা।

চার

''কেমন আছো সুমিতা?''—একটা গলার আওয়াজ শুনে চিন্তার জাল ছিন্ন হল সুমিতার। পেছন থেকে এসেছে আওয়াজটা। ঘুরে তাকাতে ভয় করছিল ওর। কারণ এই গলার আওয়াজ ও চেনে, খুব ভালো করেই চেনে। আর ওর ভয় পাবার কারণ হল এটা সুমনের নয়। এই আওয়াজ ও আগে অনেকবার শুনেছে। আজ অনেক কাছ থেকে শুনেছে এই আওয়াজের মালিকের মুখ থেকে নিজের নাম। এখনো ভোলেনি এই আওয়াজ। আর সুমিতা নিজেও জানে যে হাজারবার চাইলেও কোনদিন ভুলতে পারবে না।

''কি হলো, সুমিতা? আমাকে চিনতে পারছো না? এর মধ্যেই ভুলেও গেলে আমায়?'' আতঙ্কটা চেপে বসল সুমিতার বুকে। ও জানে পেছনে তাকালেই ও দেখতে পাবে সেই মুখটা যেটা ও গত একমাস ধরে প্রতি শনিবার সন্ধ্যেয় বাড়ি ফেরার সময় মোড়ের বটগাছটার নীচে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছে।

তবুও অনেক কষ্ট করে সাহস নিয়ে পেছন ফিরে তাকালো সুমিতা। আর তারপরেই ওর শিরদাঁড়া দিয়ে আতঙ্কের একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। যে ভয় মনের ভেতরে ছিল সেটা এখন ওর সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। ওর নিজের মনের অপরাধবোধ আর আতঙ্ক আজ শরীর নিয়ে ওর সামনে এসে উপস্থিত।

''অনিমেষ!!! তুমি—তুমি—তুমি কি করে??? মানে—আমি—''

''তোমার ভালোবাসার টান আমাকে ফিরিয়ে এনেছে সুমিতা।''

''না!! এ হতে পারে না। আমি ভুল দেখছি। তুমি সত্যি নও।'' —দুহাতে চেপে ধরে মাথা নীচু করে বসে থাকে সুমিতা। আতঙ্ক আর একরাশ ভয় একসঙ্গে চেপে ধরে ওকে।

''আমার ভালোবাসার মতন আমিও সত্যি সুমিতা''—প্রত্যেকটা শব্দের সাথে সাথে আওয়াজটা যেন আরো কাছে এসে পড়ে সুমিতার।

''আমি—আমাকে—ক্ষমা করে দাও অনিমেষ।আমি—আমি—মস্ত বড় পাপ করেছি—আমাকে মেরো না—আমাকে যেতে দাও। আমাকে এই যন্ত্রণা থেকে রেহাই দাও।'' —দুহাত জোড় করে আকুতি করে ওঠে সুমিতা।

''তোমাকে আমি এখনো আগের মতোই ভালোবাসি সুমিতা। তোমার কি আমি ক্ষতি করতে পারি? আমি তোমাকে অনেক আগেই ক্ষমা করে দিয়েছি।'' তাহলে তুমি কেন এসেছো অনিমেষ''? কিসের জন্য এই যন্ত্রণা দিচ্ছ আমায়?''

''তোমার যন্ত্রণা থেকে তোমাকে রেহাই দিতে এসেছি। তোমাকে ক্ষমা করে দিলেও যে জঘন্য কাজ ও করেছে তার জন্য আমি ওকে তো ছাড়বো না।''

''ওকে মানে?—সুমনকে? না অনিমেষ, দোহাই তোমার। ওকে তুমি ছেড়ে দাও। যা শাস্তি দেবে আমায় দাও। আমি তোমার দোষী। তুমি ওকে ছেড়ে দাও। আমি মিনতি করছি। দয়া করে সুমনের কোন ক্ষতি তুমি করো না।''

''মিনতি! আমাকে তো মিনতি করার সুযোগটাও দেয়নি ওরা। কিন্তু আমাকে মেরে ফেলার জন্য যদি ওকে মারার হত তাহলে আমাকে মারার পর সেদিন রাতে সুমন আর তুমি এই বিছানাতেই যখন নিজেদের প্ল্যান সফল হবার সেলিব্রেশন করছিলে আমি তখন এখানেই তো ছিলাম, মারার হলে তখনই ওকে মেরে ফেলতাম। কিন্তু না, সেইজন্য আমি ওকে মারতে চাই না। আমার মৃত্যুর জন্য আমি নিজের নির্বুদ্ধিতা আর দুর্ভাগ্যকেই দায়ী করি। তোমাদেরকে নয়।''

''তাহলে কেন? কিসের জন্য? তুমি একমাস ধরে আমায় দেখা দিচ্ছো? তুমি কি চাও এখন?''

''একমাস ধরে আমি তোমাকে দেখা দিইনি সুমিতা। তোমার সাথে আজই আমার মারা যাবার পর প্রথম দেখা। আমি তো সেদিন থেকে এখানেই আছি। আমি এখান থেকে কোথাও যাইনি। আত্মার জগতে কিছু নিয়ম আছে। আমিও সেই নিয়মে বাঁধা। আমরা যারা অপঘাত মৃত্যুর পর এই জগতে থেকে যাই তারা নিজেদের মৃত্যুর জায়গা থেকে বেশিদূরে যেতে পারি না। তাই তোমাকে দেখার ইচ্ছে থাকলেও আজ অবধি তোমার কাছে আমি যেতে পারিনি।''

''কিন্তু আমি যে তোমায় নিজে চোখে দেখেছি। একবার নয়—বারবার।''

''ভুল দেখেছো। ওই দেখো তোমার ফোন বাজছে। সুমনের ফোন। হ্যাঁ, আমি জানি এই ঘরে নেটওয়ার্ক কম। কথা বলতে হলে তোমাকে ব্যালকনিতে যেতে হবে। কিন্তু বাইরে যাবার আগে একবার পাশের ঘরের জানালা দিয়ে পেছনের বাগানে উঁকি মেরে দেখো তো। কি দেখতে পাও?''

অনিমেষের কথামতো পাশের ঘরে ঢুকে ধীরে ধীরে জানালার কাছে গিয়ে উঁকি মারতেই চমকে উঠলো সুমিতা। বাগানের কোণে বড় গাছটার তলায় একজন দাঁড়িয়ে আছে। অন্ধকারে প্রায় মিশে থাকলেও অনিমেষকে ঠিক চিনতে পারলো ও।

''কি চমকে গেলে তো? একেই তো তুমি একমাস ধরে দেখছো। সরি দেখছো না, তোমাকে দেখানো হচ্ছে। এই ফোনটাও সেইজন্যই এসেছে যাতে তুমি ব্যালকনিতে যাও আর আমাকে দেখতে পাও।'' ''কিন্তু তুমি তো এখানে আমার সামনে!! তাহলে ও কে??''

বুঝতে পারছো না তো? যদি জানতে চাও এতদিন ধরে কে তোমায় আমাকে দেখাচ্ছে তাহলে ফোনটা রিসিভ কোরো না। জানালার কাছেই দাঁড়িয়ে থাকো আরও কিছুক্ষণ। সব পরিষ্কার বুঝতে পারবে।''

আরও তিনবার রিং হয়ে হয়ে গেল। অনিমেষের কথামতোই ফোনটা ধরলো না সুমিতা। তারপর দেখলো লজের গেট দিয়ে ঢুকছে সুমন আর মিংমা। এসে ওরা দাঁড়ালো বাগানে দাঁড়িয়ে থাকা অনিমেষের পাশে। নিজেদের মধ্যে কিছু কথাবার্তা বলতে লাগলো তিনজনে।

''কি হচ্ছে এসব? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। ওই লোকটা কে? আর সুমন ওর সাথে কি করছে?''

''তুমি কি এখনো কিছুই বুঝতে পারছ না সুমিতা। তুমি কি বুঝতে পারছো না কে এসবের পেছনে? কি ওর উদ্দেশ্য?''

''হ্যাঁ, কিন্তু তার মানে সুমন—সুমন আমাকে মিথ্যে বলে—কি করতে চায় ও?''

''সত্যি আর কি বলবো তোমাকে? আমার বাবার কাছ থেকে পাওয়া সম্পত্তি সব তোমার নামে। আর সুমনের সেটা নিজের নামে চাই। আমার মুখের মতন একটা মাস্ক পরে আমি সেজে থাকা লোকটা হল তারক। কি সুমন তোমাকে বলেছিলো না, যে তারক এখন এখানে নেই বাইরে গেছে?''

''কিন্তু সুমন কেন এরকম করবে? কি জন্য? কি চায় ও? না! না! ও আমায় ভালোবাসে।''

''তুমি যে কারণে আমাকে প্ল্যান করে সরিয়ে দিয়েছিলে সুমনের জন্য, ঠিক সেই কারণেই সুমন অন্য কারুর জন্য তোমাকে প্ল্যান করে নিয়ে এসেছে। এতদিন ও বাচ্চা নিতে চাইতো না কেন বুঝতে পারছো না তুমি? তোমরা এখানে আসার পর ওদের সব কথা শুনেছি আমি। সুমনের অফিসের নতুন সেক্রেটারি রিয়ার সাথে সম্পর্ক আছে। ওকে বিয়ে করবে বলেই আজ তোমাকে নিয়ে এখানে এসেছে। ঠিক যেভাবে আমাকে শেষ করেছিলো, তোমাকেও শেষ করবে একইভাবে। গোটা ব্যাপারটাই সাজাবে দুর্ঘটনা হিসেবে। বলবে মাথা খারাপ হয়ে গিয়ে আত্মহত্যা। ডাক্তার আর তার প্রেসক্রিপশন সেটাই প্রমাণ করবে।

তোমার মেন্টাল স্ট্রেস আর তারজন্য ডাক্তারের দেওয়া ওষুধ। তারপর ফিরে গিয়ে সব সম্পত্তি ওর, এমনকি আমার জীবনবীমার প্রায় পঞ্চাশ লাখ টাকা যেটা এক সপ্তাহ আগে তোমার অ্যাকাউন্টে ঢুকেছে সেটাও ওর হয়ে যাবে। অবশ্যই অ্যাকাউন্টগুলো সব এতদিনে জয়েন্ট করা হয়েছে অথবা সুমনকে নমিনি করা আছে নিশ্চয়ই।''

''হে ভগবান! সুমন আমার ভালোবাসার এই প্রতিদান দিলো আমায়। আর ওর জন্য আমি তোমাকে—ছিঃ! ছিঃ! এ আমি কি পাপ করলাম। ওই দেখো অনিমেষ ওরা এইদিকেই আসছে, তিনজনেই আসছে। আমাকে এবার ওরা মেরে—হ্যাঁ এটাই আমার প্রাপ্য, আমি তোমার সাথে যা করেছি তার এটাই শাস্তি। অনিমেষ তুমি আমাকে পারলে ক্ষমা করে দিও।''

''সুমিতা, তুমি আমাকে ভালো না বাসলেও আমি তো তোমাকে ভালোবাসতাম। তাই আমি থাকতে ওরা তোমাকে স্পর্শও করতে পারবে না। আমি সুমনকে আজ নিজের খুনের জন্য নয়, তোমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করার জন্য শাস্তি দিতে এসেছি। তোমার সুখ যে আমার কাছে সব সুমিতা—সব তোমার জন্যই—এতদিন জানতাম আমার সাথে যা করেছো সব ভালোবাসার টানে করেছো। তুমি সুখে আছো এই ভেবে আমিও শান্তিতে ছিলাম, কিন্তু আজ তোমার প্রতি ভালোবাসার টানেই আমি—''

ঘরের মধ্যে থেকে ঝোড়ো হাওয়া জানালা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল। ধপ করে মেঝেতে বসে পড়লো সুমিতা।

পাঁচ

পরের দিন সকালে পুলিশের কাছে জবানবন্দী দেয় সুমিতা। জানায় তার স্বামী সন্ধ্যেয় বেরিয়ে যায়। সারারাত আর ফেরেনি। ঘরে নেটওয়ার্ক ছিল না, তাই থানায় খবর দিতে পারেনি, আর রাত্রে একা সাহস করে বের হতেও পারেনি। হোটেলের কেয়ারটেকার মিংমাকে বারবার ডেকেও সাড়া পায়নি। সকাল হতেই পুলিশের কাছে যাবার জন্য তৈরি হবার আগেই পুলিশ এসে পড়ে হোটেলে।

পুলিশ সুমিতার বয়ানে সন্তুষ্ট হয়। সন্তুষ্ট না হবার কোন কারণও ছিল না। সুমন, মিংমা আর তারকের লাশ পাওয়া যায় খাদের নীচে, হোটেল থেকে অনেক দূরে। তাদের গাড়ি ব্যাল্যান্স হারিয়ে যাবার ফলে দুর্ঘটনা হয়েছে। সুমিতা নিশ্চিন্ত হয়। দুদিন বাদে ফেরার ট্রেনে চেপে বসে। মর্গের ডোমের সাথে কথা বলে সুমনের লাশ পোড়াবার টাকা দিয়ে দিয়েছে ও। ওই মুখ আর দেখার কোন ইচ্ছে নেই ওর। তাই আইনের চাপিয়ে দেওয়া দায় পয়সা দিয়ে সেরে ফেলেছে সুমিতা। তারক আর মিংমার লাশ বেওয়ারিশ অবস্থায় মর্গেই ছিলো। সে ব্যাপারে কোনোরকম আগ্রহ দেখানোর প্রয়োজন বোধ হয়নি তার।

কিন্তু তারপর থেকে অনিমেষ আর ওকে দেখা দেয়নি। দুদিন রাত জেগে অনিমেষের আসার অপেক্ষা করেছে। ওর উপস্থিতি অনুভব করতে পারলেও দেখা পায়নি। কিন্তু এটা বুঝেছে হয়তো প্রয়োজন পড়লে আবার দেখা পাবে ওর। ফোন ঘেঁটে রাখালবাবুর নাম্বারটা বের করে সুমিতা। বৃদ্ধ মানুষটা ছেলের স্মৃতি আঁকড়ে নিয়ে একাই থাকেন।

কিন্তু ওনাকে এতদিন পর গিয়ে কি বলবে সুমিতা? সবকিছু জানার পর নিজের ছেলের হত্যাকারিণীকে কি উনি মেনে নেবেন? নাম্বারটা ডায়াল করতে গিয়েও থমকে যায় সে।

সেই সময়টায় যেন একটা ঠান্ডা বাতাস বয়ে যায় ওর পাশ দিয়ে। নিজের মাথার উপরে একটা আশ্বাসের স্পর্শ অনুভব করে সুমিতা। ইশারাটা বুঝতে পারে ও।

বাকি জীবনটা অনিমেষের বিধবার পরিচয়ে কাটাতে পারলে ভালোই লাগবে সুমিতার। নাম্বারটা ডায়াল করে জবাবের অপেক্ষা করে—

ট্রেন এগিয়ে চলে সবকিছু পেছনে ফেলে একটা নতুন জীবনের দিকে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%