যক্ষের যন্ত্রণা

কৌশিক কারক, আকাশ চন্দ, উৎস ভট্টাচার্য

শিবেন লাহার নাম শোনেনি, সেই সময় অনন্তপুরে একজনও খুঁজে পাওয়া যেত না। সারা গ্রামে একটাই দুর্গাপুজো হতো। ওই লাহা বাড়িতে। চারদিন ধরে সবাইয়ের বাড়িতে রান্নার হাঁড়ি চড়তো না। ছোটো—বড়ো সকলের নিমন্ত্রণ ওই লাহা বাড়ি। বাড়িতে সেই সময় আত্মীয়স্বজন এলেও তারও অলিখিত নিমন্ত্রণ।

অনন্তপুরে কত যে ওদের জমি জায়গা, পুকুর, ধান জমি তার হিসেব বোধহয় বড়ো কর্তা শিবেন লাহারও মনে থাকতো না। পুকুর, বাগানে ঘেরা কয়েক বিঘা জমির ওপর। রাজপ্রাসাদের মতো বাড়ি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

পুজোর সময় যখন লাহা বাড়ির গিন্নিরা এক গা গয়না পরে ঠাকুর দালানে আসতো, তাদের গয়না দেখে সারা গ্রামবাসীর চোখ কপালে উঠতো। সেই আলোচনা সারা বছর ধরেই গ্রামের লোকদের আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতো। বিশেষ করে মহিলাদের।

কে বলতো, বড়ো গিন্নির হিরে বসানো চওড়া হারটারই ওজন কমপক্ষে পনেরো ভরি। লাহা বাড়িতে কত ভরি যে সোনা আছে, তা কেউ হিসেবেই আসতে পারতো না। কেউ বলে পাঁচশো ভরি। কেউ বলে হাজার ভরির কম হবে না।

এছাড়া, মা দুর্গার গয়না তো আলাদা। সেও পাঁচশো ভরির কম নয়। মা দুর্গার হিরে জহরত বসানো সোনার তৈরি মাথার মুকুটটার দামই হিসেব করে উঠতে পারে না ওরা।

আজ থেকে আশি বছর আগেকার লাহা বাড়ির এখন জীর্ণ দশা। কালের যাঁতাকলে, কে কোথায় ছিটকে গেছে। কতজন এই পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে গেছে। লাহা বাড়ি এখন একটা ভাঙা কঙ্কালে পরিণত হয়েছে।

এখনো কিছু কিছু গল্প, গ্রামের দাদু—ঠাকুমার মুখে শোনা যায়। সব থেকে আশ্চর্য একটা কাহিনী, ফিসফিস করে অনন্তপুরের আকাশে—বাতাসে ঘোরাফেরা করে। সেটা হলো....

ঠাকুরের গয়না ভর্তি সিন্দুকটা। সেটা নাকি, আজও লাহা বাড়ির বড়ো কর্তা শিবেন লাহিড়ী যক্ষ হয়ে পাহারা দেয়। অনেকেই নাকি, চেষ্টা করেছিল। ওই গয়না চুরি করবার। বেশিরভাগ লোকই হদিশ পাইনি। সবথেকে করুণ দশা হয়েছিল বিধু কুমোরের। সে নাকি খোঁজ পেয়েছিলো। সেই লুকোনো সিন্দুকের। কিন্তু ওই বিরাট ভাঙা প্রাসাদ ছেড়ে বাইরে বেরোতেই, দুটো দিন সময় কেটে গেছিলো। একই জায়গায় নাকি গোলক ধাঁধার মতো পাগলের মতো ঘুরেছে। শেষে যখন বাড়ি ফিরলো, একেবারে উন্মাদ।

ওর মুখ থেকে, নানা সময়ে নানা কথা শুনেছে গ্রামের লোকেরা। কোনটা সত্যি? কোনটা পাগলের প্রলাপ? বোঝাই যায় না।

তারপর থেকে সবাই, লাহা বাড়িকে এড়িয়ে চলে। ক্রমশ গাছপালা, জঙ্গলে বাড়িটা অর্ধেক ঢেকে গেছে।

অনন্তপুরের ছেলে কৌশিক, যখন তার কলেজের দুই বন্ধু পার্থ আর সুজনকে এই গল্পগুলো করছিলো। দুই বন্ধুই একেবারে নেচে উঠলো।

পার্থ বললো। ''একেবারে রোমাঞ্চকর ঘটনা। ব্যাপারটা একটু ইনভেস্টিগেট করতে হচ্ছে তো! কি বলিস সুজন।''

''রাইট। যদি ভাগ্যক্রমে ওই রত্ন ভাণ্ডার খুঁজে পাই।'' দুই বন্ধুর মুখে লোভের আস্তরণ।

ঠিক হলো, পঞ্চমীর দিন কলেজ হয়ে ছুটি পড়ে যাচ্ছে। ষষ্ঠীর দিন সকালে কৌশিকদের গ্রাম অনন্তপুরে যাওয়া হবে। গ্রামের পুজো দেখা হবে। ওই ফাঁকে লাহা বাড়িতে গুপ্তধন খোঁজা যাবে। কৌশিক বুঝলো, বলেই ভুল করেছে। ওই পোড়ো বাড়িতে ঢোকা মানে...যক্ষ না থাক, সাপখোপ অবশ্যই থাকবে। এখন বারণ করলেই, ভাববে সে মিথ্যে বলেছে! তাছাড়া সবাইয়ের চোখ এড়িয়ে ওই জঙ্গলে ঘেরা বাড়িতে যেতে হবে।

পুজোর ষষ্ঠীর দিন বেলায়, অনন্তপুর বাস স্টপে ওয়েট করছিলো কৌশিক। সাড়ে দশটার সময় দুই বন্ধু এসে নামলো। কৌশিক বললো।

''গ্রামে ঢোকার আগে, আমরা ঘুরপথে আগে লাহা বাড়িতে যাবো। কেননা সন্ধের পর যাওয়ার প্রশ্নই নেই।'' ওদের নিয়ে বাস স্টপের একটা দোকানে ঢুকে পরোটা, ছোলার ডাল আর দানাদার পেট পুরে খাওয়া হলো।

সুজন বললো। ''এটা এক পক্ষে ভালোই হয়েছে। রাত বিরেতে, সাপ বিছের উপদ্রব। তার সাথে উপরি পাওনা হলো মশা।''

কৌশিকের মনে কিরকম একটা অস্বস্তির ভাব। বাড়িতে বলে রেখেছে, সন্ধে বেলা বন্ধুদের নিয়ে আসবে। পথ চিনতে পারবে না বলে, কলকাতায় গিয়ে নিয়ে আসতে যাচ্ছে। কেউ না আবার দেখে ফেলে?

''এখান থেকে কতদূর?'' পার্থ বলে ওঠে।

''প্রায় দু মাইল। আল খেত ধরে আমরা যাবো। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে, যা বলার আমি বলবো।'' ওরা এবার উঠে পড়লো।

নীল আকাশ শরতের সাদা মেঘের ভেলা। দূর থেকে ভেসে আসছে পুজোর ঢাকের আওয়াজ। তিন বন্ধু চলেছে সবুজ মাঠের আল ভেঙে। ছেলেগুলোর চোখে অজানা রহস্যের হাতছানি।

কৌশিকের কথানুযায়ী ওরা এবার বাঁদিকে মোড় নিলো। দুই বন্ধুর কাঁধে রুকস্যাক। তিনজনেই উত্তেজনায় ছটফট করছে। কৌশিকও এতদিন, রূপকথার গল্পের মতো সব শুনেছে। দূর থেকেই বাড়িটার আলসে ভাঙা ছাদটুকুই দেখেছে।

এবার মাঠ ছাড়িয়ে ওরা ঝোপে আগাছায় ভরা একটা শ্যাওলা ধরা পথ ধরলো।

কৌশিক বললো, ''আমরা বাড়িটার পিছন দিক দিয়ে ঢুকবো।'' ঘামে ভেজা মুখ। চারিদিকে শ্মশানের নির্জনতা বিরাজ করছে। একটা এঁদো পুকুরের ধার দিয়ে ওরা চলেছে। পার্থ আর সুজন হাঁফিয়ে পড়েছে।

''আর কতদূর রে ভাই?'' দুজনেই বলে ওঠে। কৌশিক আঙ্গুল তুলে ডানদিকটা দেখায়। দেখে সবুজ শ্যাওলায় মুড়ি দিয়ে একটা বিরাট বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।

ভাঙাচোরা পাঁচিলের ভেতর দিয়ে একটা হাঁ করা গর্ত দেখা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, সবুজ চাদর মুড়ি দিয়ে কেউ হাঁ করে আছে। বোঝা যাচ্ছে, এককালে এটাই বাড়ির খিড়কি দরজা ছিল।

পা টিপে টিপে ওরা তার মধ্যে দিয়ে ঢুকলো। একটা লম্বা দালানের মধ্যে এসে পড়লো। জায়গাটা আবছা অন্ধকার। আর স্যাঁতসেঁতে ঠাণ্ডা।

''এবার কোনদিকে যাবি'' পার্থর গলা একটু মিইয়ে গেছে। কৌশিকের মাথায় এখন বিধু কুমোরের কথা ঘুরছে। দুদিন এখানে গোলকধাঁধায় ঘুরেছে। ভালো করে চিনে যেতে হবে। ইতিমধ্যে সাড়ে বারোটা বাজছে। সার সার ঘরের মাঝ দিয়ে একটা গলি মতো চলে গেছে। এটাই মনে হয়, সামনের দিকে যাবার রাস্তা।

গলির পথটা আরও অন্ধকার। ওখানে ঢুকতেই, একটা ঝটপট আওয়াজ পেলো। দুটো বাদুড় ডানা ঝাপটিয়ে উড়ে গেলো।

''ভ্যাম্পায়ার...রক্তচোষা বাদুড়''। সুজনের সাহসটাও বোধহয় কমে এসেছে। একটু বাদেই ওরা একটা চাতালের মতো জায়গা পেলো। দুদিক দিয়ে দুটো সিঁড়ি ওপরে উঠে গেছে।

কৌশিক বললো। ''ওপরে যাবি? শুনেছি ওখানেই বাড়ির কর্তারা থাকতো। নীচে বাড়ির আশ্রিতরা।''

দুই বন্ধু মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো। ভেবে পাচ্ছে না, কি বলবে? রোমাঞ্চ, গুপ্তধন এখন মন থেকে মুছে গিয়ে মনে হচ্ছে, না এলেই ভালো হতো। সেটা মুখ ফুটে বলতেও পারছে না। পরিবেশ যে মনের ওপর এতখানি প্রভাব ফেলবে ভাবতে পারেনি।

এই সময় একটা হালকা ধুনোর গন্ধ ওদের নাকে এসে লাগলো। তিনজনেই নাক টানলো। এই হানাবাড়িতে ধুনোর গন্ধ? ওরা গন্ধটার টানে সামনের দিকে কয়েক পা এগিয়ে গেলো।

এবার ওদের চোখে পড়লো একটু দূরেই খিলান করা দুর্গা মন্দির। কৌশিক বললো—

''ওটাই নাট মন্দির। আজকের দিনে সারা গ্রামবাসী এখানে জড়ো হতো। মা দুর্গা দেখতে। ঐতো, বলি দেবার হাঁড়ি কাঠ! শুনেছি, যারা মায়ের কাছে মানত করতো, তারা প্রত্যেকে পাঁঠা এখানে নিয়ে আসতো, এই চত্বরটা রক্তে লাল হয়ে যেত।''

কৌশিকের কথাগুলো যেন অন্যরকম মানে হয়ে দুজনের মনে আরও বেশি ভয় ঢোকাচ্ছে। ওরা যেন চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে পাঁঠাবলি। ছাগলগুলোর অন্তিম আর্তনাদ কানে যেন আসছে।

ধূপ ধুনোর গন্ধটা যেন আরও বেশি প্রকট হচ্ছে। প্রথম কৌশিকের চোখে পড়লো ধোঁয়ার কুণ্ডলীটা। পুজোর দালানের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে। এরপর তিনজনেই দেখলো। মনে সাহস এনে তিনজনেই দুর্গা দালানের দিকে এগোলো। অজান্তেই হাতে হাত ধরে ফেলেছে তিন বন্ধু। কৌতূহল, উৎকণ্ঠা ওদের চরমে।

সামনে গিয়ে দাঁড়াতে...ওরা ভয়ে বিষম খেলো। একি? ওরা ভুল দেখছে? সামনেই মাটির মণ্ডপের ওপর দশ হাত বের করে দাঁড়িয়ে আছে মা দুর্গা! তার দশ হাতে সোনার অস্ত্র! মাথায় হীরে বসানো স্বর্ণ মুকুট! এক গা সোনার গয়না! এই তো, তাদের চোখ আর হাতের সামনেই লাহা বাড়ির গুপ্তধন!

কিন্তু কই? এই মুহূর্তে ওদের মনে লোভ আসছে না তো? মা কি ওদের লোভ হরণ করে নিলো? তিনজনেই সম্মোহিতের মতো মায়ের ওই সুন্দর রূপ দর্শন করছে। খিদে, তেষ্টা, ভয় সব উধাও। হাত জোড় করে তিনজন যুবক মায়ের ভুবন ভোলানো রূপ দর্শন করে চলেছে।

হুঁশ ফিরল ওদের। কৌশিক ভাবছে কই? সবাই যে বলে, শিবেন লাহা নাকি যক্ষ হয়ে পাহার দেয়? এইসময় ওদের কানে এলো, সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসা খড়মের শব্দ। তিনজনেই পিছন ফিরে দেখলো।

একজন লম্বা রোগা ফর্সা লোক। কপালে রক্ত তিলক, পরণে কোরা ধুতি। চোখে সোনার চশমা। অন্ধকার সিঁড়ি বেয়ে নেমে খট খট করে প্রতিমার দিকে যাচ্ছে।

এক পলকের জন্যে ওদের দিকে তাকালো...সেই দৃষ্টিতে রয়েছে মৃত্যুর শীতলতা। যেন চোখের চাউনি দিয়ে বলতে চাইছে এখানে জীবিত মানুষের প্রবেশ নিষেধ। এই তবে যক্ষ? যে সোনার গয়নাগুলো পাহারা দিচ্ছে।

তিনজনেরই মস্তিষ্ক হঠাৎ জেগে উঠে বলে উঠলো। আর দেরি নয়। এই মুহূর্তে এখান থেকে চলে যাওয়া বাঞ্ছনীয়। কেননা ধীরে ধীরে মায়ের মূর্তি আবছা হয়ে আসছে। ভাঙা কাঠামো বেরিয়ে পড়ছে। তার মানে, জগৎ জননী মা তাদের এতক্ষণ রক্ষা করছিলো।

এবার ওরা সামনের দিকে দৌড় মারলো। পিছন থেকে ভেসে আসছে কান ফাটানো পৈশাচিক হাসির শব্দ। পাগলের মতো তিন বন্ধু কোনরকমে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এলো। ওঃ, খুব জোর প্রাণে বেঁচে গেছে। তিনজনেই এবার এগোলো কৌশিকের বাড়ির দিকে। যেন, শ্মশান ফেরত যাত্রী।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%