কালাশ

কৌশিক কারক, আকাশ চন্দ, উৎস ভট্টাচার্য

এক

সঞ্জয় সান্যাল, তাঁর স্ত্রী দেবযানী দেবী আর তাঁদের বছর পাঁচেকের ফুটফুটে ছেলে সুজয়—তিনজনের ছোট্ট সুখী পরিবার। সঞ্জয়বাবু কেন্দ্রীয় সরকারি আধিকারিক। সব কিছুই ভালো, কেবল দোষের মধ্যে তাঁর বদলির চাকরি—ক'দিন এপ্রান্তে তো তারপরই আবার অন্য প্রান্তে। তা সেবারে তাঁর পোস্টিং হলো বর্ধমানের বিক্রমপুরের কাছে ছোটো একটা শহরতলিতে। কোয়ার্টারের সুবন্দোবস্ত নেই, তবে মোটামুটি সস্তাতেই ব্যবস্থা হয়ে গেল একটা একতলা বাড়ির।

আসবাবপত্রও নতুন করে কেনবার ঝঞ্ঝাট রইলো না। প্রয়োজনীয় বেশ কিছু আসবাবের সাথেই একটা বড় আয়নাওয়ালা ড্রেসিংটেবিলও ছিলো—আর সেটা বেশ পছন্দই হল দেবযানী দেবীর।

প্রথম কয়েকদিন দিব্যি চলছিলো সবকিছু। কেবল জায়গাটা যেন একটু বেশিই নিরিবিলি। আশেপাশের বাড়িগুলোও একটু দূরে দূরে, আর প্রতিবেশীরাও যেন কেমন। বোধ হয় জলের দরে সাজানো গোছানো বাড়িটা সঞ্জয়বাবুদের পেয়ে যাওয়াটা, ওরা ভালোভাবে নেয়নি—তাই বুঝি ওরা ঐরকম অদ্ভুতভাবে তাকায় দূর থেকে। ওদের মধ্যে কেউ কেউ যেন কিছু বলতে চায়—কিন্তু বলে উঠতে পারে না।

বাড়িটার সামনেই বেশ কিছুটা জমি নিয়ে একটা বাগান—অবশ্য এতই অগোছালো জংলা গাছে ভর্তি যে, এখন আর একে ঠিক বাগান বলা যায় না। সে যাই হোক, সুজয় একদিন নিজের মনে খেলতে খেলতে সেই বাগানটায় চকচকে লাল কাপড়ের টুকরোর মতো কিছু একটা দেখতে পেল। জিনিসটা মাটিতে পোঁতা রয়েছে। কৌতূহলবশত সে বসে পড়ে খানিক টানাটানি করল বটে, কিন্তু তাতে বিশেষ সুবিধা হল না। শেষে ব্যর্থমনোরথ হয়ে জায়গাটা ছেড়ে চলে আসছে সে, এমন সময় হঠাৎ কীসে যেন পা আটকে পড়ে গেল সুজয়। হাঁটুর কাছটা সামান্য ছড়ে গিয়ে রক্ত বেরোল একটু। সুজয় খেয়াল করলো না বটে, কিন্তু সেই রক্তের ছোঁয়া পেল ধুলোমাখা লাল কাপড়ের টুকরোটাও। তারপর দেবযানী দেবীর কাছে যেতে, তিনি সুজয়কে একটু বকাবকি করলেন আর অবশ্যই ক্ষতটায় ওষুধ লাগিয়ে দিলেন। খুবই তুচ্ছ একটা ঘটনা। মনে রাখার মতো কিছু নয়—কিন্তু হয়ত সেই সামান্য রক্তপাতই সকলের অজান্তে খুলে দিয়েছিল অন্ধকারের এক গোপন কুঠুরির দরজা।

ভালোই চলছিল সব কিছু। কিন্তু ক'দিন পর থেকে মাঝে মাঝেই সুজয়, দেবযানী দেবীকে বলতে থাকে, ''ও মা দেখো না, আয়নাটা থেকে কে যেন আমায় ডাকছে।''

বাচ্চারা তো কল্পনাপ্রবণ হয়—কত কিছুই কল্পনা করে নেয়; তাই বিশেষ আমল দেন না সুজয়ের মা। আর তাছাড়া তিনি নিজে প্রসাধন করার সময় অস্বাভাবিক তেমন কিছু দেখতেও পাননি কখনো। আর তেমন ভাবনাও যে ভীষণ রকম অবাস্তব।

কিন্তু বাস্তবের অন্তরালে, যে আপাত অবাস্তব বিভীষিকারা লুকিয়ে থাকে, তারা কবে আর কীভাবে আত্মপ্রকাশ করবে, তা কে—ই বা সঠিক বলতে পারে?

তারপর এলো সেই শয়তানী রাত। কি যেন একটা শব্দে হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে যায় সুজয়ের। সে একটু ধাতস্থ হয়ে দেখে আয়নাটা থেকেই আসছে শব্দটা! তার বাবা—মা অঘোরে ঘুমাচ্ছে তখন। সে ধীরে ধীরে আয়নাটার কাছে গিয়ে দাঁড়ায় আর তখনই দেখতে পায়, ধোঁয়াটে একটা অতিরিক্ত প্রতিবিম্ব ধীরে ধীরে তার নিজের প্রতিবিম্বটার সাথে মিশে যাচ্ছে। তারপর সে অবাক হয়ে দেখে, তার নিজের প্রতিবিম্বটার চোখটায় কোনো মণি নেই—ফটফটে সাদা! উফ! কী পৈশাচিক জিঘাংসা মণিহীন সেই চাউনিতে। সেই অপছায়া মুখে এক কুটিল হাসি নিয়ে তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে। সে চিৎকার করতে চায়, কিন্তু তখনই প্রবল আতঙ্কে দেখে, সে নিজে আয়নার অপর প্রান্তে বন্দী, আর সেই প্রেতছায়া তার আগের অবস্থানে। প্রাণপণে সে চিৎকার করে; কাচের গায়ে আঘাত করে করে হাত ক্ষতবিক্ষত হয় তার। কিন্তু এর কোনো শব্দই তার বাবা—মা'র কানে পৌঁছায় না।

এরপর অসহায় সুজয় দেখতে পায়, তারই রূপ ধারণ করা সেই প্রেত, নিজের মাথা দিয়ে বারংবার আঘাত করতে থাকে সেই আয়নায়। খসে পড়া একটা ধারালো কাচের টুকরো ছুরির মতো বাগিয়ে ধরে তার হাতে। তারপর...তারপর নিমেষের মধ্যে আমূল গে�থে দেয় সঞ্জয়বাবুর গলায়। আর্তনাদের সময়ও পান না তিনি। গলা থেকে গলগল করে বেরিয়ে আসা রক্তস্রোতের মধ্যে মুহূর্ত কতক ছটফট করে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। ইতিমধ্যে জেগে উঠে ভয়াবহ দৃশ্যটা দেখে আর্তনাদ করে ওঠেন বিহ্বল দেবযানী দেবী। রক্তজল করা পৈশাচিক একটা হাসি হেসে সেই সুজয়রূপী প্রেতমূর্তি তাঁর দিকে বিকৃতভাবে তাকায় আর মাথাটা একবার শয়তানী উল্লাসে পাক খেয়ে যায় তার। তারপর সেই সাক্ষাৎ শয়তান একটানে রক্তমাখা কাচের টুকরোটা সঞ্জয়বাবুর গলা থেকে উপড়ে নিয়ে ঢুকিয়ে দেয় হতভম্ব দেবযানী দেবীর বুকের বাঁদিক বরাবর। পরপর তিনবার।

প্রাণহীন শীতলতার রক্তমাখা নৈঃশব্দ্য, মাংস ছিঁড়ে নেওয়া আর হাড় চিবানোর অনৈসর্গিক শব্দে বিঘ্নিত হতে লাগলো।

সংবাদপত্রে ছোট্ট একটা খবর বেরোয়—

''বর্ধমানের বিক্রমপুরে এক বাঙালি দম্পতিকে মর্মান্তিকভাবে হত্যা করা হয়েছে। তাঁদের ক্ষতবিক্ষত রক্তমাখা দেহাবশেষ পাওয়া গেছে। কোনো হিংস্র শ্বাপদ যেন তাঁদের দেহাংশ ছিঁড়ে খেয়েছে। তাঁদের বছর পাঁচেকের শিশুপুত্র নিখোঁজ। পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে।''

সংবাদপত্রের বর্ণনায় অবশ্য নৃশংসতার আসল স্বরূপটা প্রায় অপ্রকাশিতই থেকে গেছে।

দুই

সকাল থেকেই আকাশের মুখ ভার। একটু বেলা বাড়তেই ঝিরঝির বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। তারপর ক্রমাগত বেড়ে চললো তার বেগ। সাথে আকাশ ফালাফালা করে বজ্রবিদ্যুতের যোগ্য সঙ্গত।

বেলা গড়িয়েছে, সাথেই যেন উত্তরোত্তর বেড়েছে প্রকৃতির কান্নার বেগ। সন্ধ্যা নেমেছে গহীন রাতের মিশকালো অন্ধকার সাথে নিয়ে। বাতাসের সোঁ সোঁ শব্দে কি মিশে আছে কোনো যন্ত্রণাময় দীর্ঘশ্বাস?

কান ফাটানো শব্দ করে কাছেই কোথাও বাজ পড়লো। কিন্তু, শুধুই কি বাজ? নাকি কোনো অবিচারের ক্ষোভ, অনিয়ন্ত্রিত আক্রোশে ফেটে পড়তে চাইছে? মুষলধারায় পড়ে চলা বিরামহীন বৃষ্টির শব্দের সাথেই, কান পেতে শুনলে, একটা চাপা গোঙানীর মতো কান্নার আওয়াজ, অস্পষ্টভাবে হলেও শোনা যাচ্ছে।

সমস্ত শব্দ ছাপিয়ে হঠাৎ শোনা গেল হাড়হিম করে দেওয়া একটা জান্তব হুংকার। এরকম বাদল দিনে সন্ধের আগেই সকলে ঘরে ফিরেছে। কিন্তু চার দেওয়ালের মাঝে সুরক্ষিত থেকেও অজানা আশঙ্কায় অতি বড় সাহসী মানুষেরও বুক কেঁপে উঠলো সেই শব্দে। চেনাশোনা কোনো প্রাণীর ডাক বলে শনাক্ত করা গেল না সেই অপার্ধিব হুংকারটাকে। এ কোন মূর্তিমান আতঙ্ক এসে বাসা বাঁধলো শান্ত শহরতলিটার বুকে? অস্পষ্ট ফিসফাস কিছু কথা বাতাসে ভেসে চললো—সে জেগে উঠেছে...অনন্ত জিঘাংসা আর খিদে নিয়ে সে জেগে উঠেছে...

সেই রাতে মানুষের অবয়বে থাকা কিছু জন্তুর মরণ আর্তনাদের শব্দ প্রাকৃতিক শব্দবাহুল্যে তলিয়ে গেল। টাটকা শোণিতের ধারা প্রথমে মিশে গেল অবিশ্রান্ত বারিধারায়, তারপর দ্রুতই তা নিশ্চিহ্ন হল।

* * *

হীরক, সৌগত, শর্মিলী'রা উদয় স্যারের কোচিং থেকে গল্প করতে করতে ফিরছিলো। ওদের বাড়ি একই দিকে, তাই নিয়মিত একসাথেই ফেরে ওরা। সামনেই পরীক্ষা, তাই সেদিন স্যার অন্যদিনের তুলনায় একটু বেশিক্ষণই পড়িয়েছেন। সন্ধে নেমেছে বেশ কিছুক্ষণ আগেই। তবে অন্ধকারটা তেমন গাঢ় নয়, চাঁদের আলো আছে বেশ।

একথা সেকথার পর ওদের গল্পে হঠাৎ করেই এসে পড়লো সেই ঝড়বৃষ্টির রাতের কথা। ভয়ঙ্কর পাশবিক হুংকারের শব্দটা সেদিন ওরা সকলেই শুনতে পেয়েছিলো। কিন্তু পরদিন অস্বাভাবিক কোনো কিছুরই চিহ্ন মাত্র পাওয়া গেল না। তাই সেই রাতের শব্দটাকে নিতান্তই মনের ভুল ধরে নিয়ে জনজীবন স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে এসেছিলো খুব দ্রুতই।

সৌগত বলে ওঠে—

''আচ্ছা! সেদিন আমরা সব্বাই একসাথে ভুল শুনলাম? এও কি হয় কখনো?''

হীরক চোখের কোণ দিয়ে একবার শর্মিলীর ভয়ার্ত মুখটা দেখে নিয়ে ছদ্ম ভয়ের ভঙ্গী করে বলতে থাকে—

''হ্যাঁ রে, সৌগত! আমার তো মনে হয় মস্ত একটা দানো ঐ শ্মশানের দিকটা থেকে আমাদের এখানে এসেছে। উরি বাবা! হাঁউ মাঁউ হাঁউ...''

শর্মিলী ওকে থামিয়ে দেয়,

''আহ। তোরা থামবি...''

কাঁপা কাঁপা গলাটায় বেশ বোঝা যায় ও ভালোই ভয় পেয়েছে। বন্ধুরা বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করলেও, তার ভয়টা জ্বালানি পাওয়া হুতাশনের মতো আরো বেশি করে মাথা তুলতে চাইছে—তাই তার তীব্র আপত্তি এই বিষয়ের কথাবার্তা'তে। ওদিকে ওর অবস্থা দেখে মজা পেয়ে দুই বন্ধুতে হেসে ওঠে।

ওরা ওদের বাড়ির প্রায় কাছাকাছি এসে পড়েছে। মাঝে মিনিট দশেকের রাস্তা কেবল। এদিকটা একটু নিরিবিলি, কিন্তু এতটাই পরিচিত জায়গাটা যে, অন্য সময় হলে দূর কল্পনাতেও ভয়ের লেশ মাত্র মনে আসতো না। কিন্তু সেদিন গা ছমছমে একটা অনুভূতি তিনজনকেই যেন অদৃশ্য বাঁধনে বেঁধে ফেলতে চাইলো। কিছু একটা অস্বাভাবিক ব্যাপার ঘটেছে, কিন্তু সেটা যে ঠিক কী—ওরা প্রথমটায় বুঝতে পারলো না। তারপর খেয়াল হল—নৈঃশব্দ্য, একটা অপার্থিব নীরবতা। ঝিঁঝিঁর ডাকের চিরপরিচিত গুঞ্জনটা ভোজবাজির মতো ভ্যানিশ হয়েছে। গোটা প্রকৃতি যেন আতঙ্কে শব্দহারা হয়ে গেছে, আর অসহায়ভাবে অপেক্ষা করছে অশুভ কিন্তু অবশ্যম্ভাবী কোনো ঘটনার।

ওদের মনের মাঝে নানা প্রশ্ন ঘুরছে, এমন সময় হঠাৎ করে লোডশেডিং হয়ে গেল, আর অদূরের ল্যাম্পপোস্টের আলোগুলো মুছে গেল নিমেষেই। কিন্তু এ কী! এমন মিশকালো আঁধার কেন? একটু আগেও তো পরিষ্কার আকাশে সুস্পষ্ট চাঁদের আলো ছিলো—মেঘের লেশ মাত্র ছিলো না। তাহলে? চোখের সামনে এমন অন্ধত্বের মতো জমাট বাঁধা আঁধার নামলো কেমন করে? একটা কালো চাদরে যেন ওদেরকে মুড়ে ফেলা হয়েছে।

শর্মিলী অজানা আশঙ্কায় চিৎকার করে ওঠে। সৌগত মোবাইলের টর্চটা কোনোরকমে জ্বালাতে পারলো, কিন্তু সেই অপরিসীম অন্ধকারের সাগরে সে আলো বড়ই অকিঞ্চিৎকর মনে হতে লাগলো। শর্মিলীও জ্বালালো তার মোবাইল টর্চটা। সেই আলো—আঁধারিতে তাদের নিজেদেরই কেমন যেন অদ্ভুত দেখতে লাগছে। প্রাথমিক ধাক্কাটা কাটিয়ে উঠতেই ওদের দু'জনের খেয়াল হল, আরে! হীরক কোথায়? বন্ধুর নাম ধরে ওরা ডাকাডাকি করলো বেশ কিছুক্ষণ। কিন্তু হীরকের সাড়াশব্দ নেই।

খুব সম্ভবত সেই বিসদৃশ আলোছায়ার অতি পরিচিত পথঘাটও বড় অচেনা লাগতে লাগলো ওদের। একটু এগিয়ে ওরা আবারও হীরককে খুঁজতে লাগলো। তখনই ওদের চোখে পড়লো আঁধারের আবডালে গা ঢাকা দিয়ে শিকারি শ্বাপদের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে একটা বাড়ি। কিন্তু এও কি সম্ভব? এই রাস্তায় এতদিন ওরা যাতায়াত করছে—কই, কখনো চোখে পড়েনি তো বাড়িটা। তবে কি ওরা পথ ভুল করলো? তাই বা কেমন করে হবে!

শর্মিলী আর সৌগত সাত—পাঁচ ভাবছে এমন সময় হঠাৎ শুনতে পেল,

''কিরে! আমাকে খুঁজছিস?''

ওরা যে হীরক'কেই খুঁজছিলো একথা তো মিথ্যে নয়, আর কণ্ঠস্বরটা হীরকেরই—তবু আকস্মিক ভেসে আসা সেই স্বরে এমন কিছু একটা ছিলো, যেটায় ওরা রীতিমতো চমকে উঠলো। পিছন ফিরে ওরা দেখলো হীরক ওদের দিকে তাকিয়ে অদ্ভুতভাবে হাসছে। এমনিতে হীরক'কে দেখতে শুনতে মন্দ নয়, কিন্তু এই অল্প আলোতে তার হাসিটা বড় কুৎসিত দেখাচ্ছে।

ওদেরকে প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়ে সে নিজেই কৈফিয়ত দেয়,

''ঐ অন্ধকারে একটু পিছিয়ে পড়েছিলাম রে।''

যদিও কথাটা বিশ্বাস করা শক্ত, কারণ সৌগতরা ওকে অনেক খুঁজেছিলো—তবু ওরা আর তর্কে যায় না—এখন ভালোয় ভালোয় বাড়ি পৌঁছাতে পারলেই বাঁচে ওরা।

''চল। চল। আর দেরি করিস না—আমার বাড়ির পথে এগোই আবার''—এই বলে সৌগতরা এগোতে যাবে, এমন সময় হঠাৎ করেই ঝমঝমে বৃষ্টি নামলো আর সাথে ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকাতে লাগলো। এ কী! এতক্ষণ তো ঝড়বৃষ্টির কোনো লক্ষণই ছিলো না! শর্মিলীর কাছে ছাতা আছে—কিন্তু এই বৃষ্টি ছাতায় মানবে না।

হীরক বলে উঠলো,

''এত বৃষ্টিতে কী করে যাবি? ঐ তো সামনেই একটা বাড়ি দেখা যাচ্ছে...ওটায় কিছুক্ষণ আশ্রয় নেওয়া যাক, তারপর বৃষ্টি কমে এলে বাড়ি যাবো—বাড়ি তো কাছেই।''

সৌগত আর শর্মিলীর মোটেই ইচ্ছে ছিলো না অদ্ভুত ঐ বাড়িটায় আশ্রয় নেওয়ার—কিন্তু সামনে আবার পরীক্ষা রয়েছে, এই বৃষ্টিতে ভিজে জ্বর বাধালে সমস্যা হবে। বাড়িটার ভিতরে কোনো আলো জ্বলছে কিনা বাইরে থেকে দেখবার উপায় নেই, জানলায় মোটা পর্দা দেওয়া। কয়েকবার নক করতে দরজাটা আর্তনাদের মতো 'ক্যাঁচ' শব্দ করে খুল গেল। তারপর দরজার পাশ থেকে একটা মিষ্টি বাচ্চার মুখ দেখতে পাওয়া গেল। বছর চার—পাঁচ বয়স হবে বাচ্চাটার। ওকে দেখেই পূর্বপরিচিতের মতো হীরক বলে উঠলো,

''বন্ধুদেরও নিয়ে এলাম।''

সৌগতরা বেশ অবাক হয়—কী সব বলছে হীরক—ও কি ছেলেটাকে চেনে নাকি? কৈ! আগে তো কোনোদিন ওকে দেখেনি ওরা!

বাচ্চাটা মিহি স্বরে আমন্ত্রণ জানায়, ''হ্যাঁ, হ্যাঁ, সবাই এসো। এসো তোমরা...''

ঘোর কাটে শর্মিলীদের—ওরা ভিতরে ঢোকে। ঘরটায় একটা হালকা নীলচে আলো জ্বলছে। একটা সোফায় ওরা বসলো। কেমন যেন অস্বস্তি হয় শর্মিলীদের। বড়রা কেউ নেই নাকি? ঘরে এরকম নীলচে আলো জ্বলছে কেন? কারেন্ট নেই...তাই বুঝি কম পাওয়ারের বাতি জ্বলছে ইনভার্টারের সৌজন্যে।

কথাগুলো শর্মিলী জিজ্ঞেস করতে বাচ্চাটা কেবল হাসলো। বড় রহস্যময় সেই হাসি। প্রথমে নিঃশব্দে হাসছিলো সে, তারপর সশব্দে। গলার স্বরটা শুনে চমকে উঠলো ওরা। স্বাভাবিক শিশুকণ্ঠ তো নয়! বিকৃত কর্কশ একাধিক স্বর আসছে না হাসির শব্দটা থেকে? শুনলেই কেমন যেন অন্তরের অন্তস্থল অবধি শুকিয়ে যায়। এর মধ্যে একটা বিকট মাংসপচা গন্ধ টের পাচ্ছে ওরা। না না না, কিছু একটা গণ্ডগোল আছে—বড়সড় গণ্ডগোল। পালাতে হবে এখান থেকে—এখনই পালাতে হবে। আড়চোখে সৌগত দরজাটার দিকে তাকাতেই ওর হৃৎপিণ্ড গলায় উঠে আসার উপক্রম হল—দরজা কোথায়? হালকা অন্ধকারের পটভূমিতে দরজার জায়গাটায় গাঢ়তর চাপ চাপ অন্ধকার কেবল। ভয়ের সহজাত প্রতিক্রিয়ায় শর্মিলীর হাতটা চেপে ধরে সৌগত—শর্মিলী নিশ্চয়ই ওর চেয়েও বেশি ভয় পেয়েছে—আর তাই বোধহয় ওর হাতটা বরফের মতো ঠান্ডা। হঠাৎ বাচ্চাটার দিকে চোখ যেতেই ভয়টা চরমে পৌঁছালো—মণিহীন কিন্তু তীক্ষ্ন দৃষ্টিতে সে চেয়ে আছে ওদেরই দিকে। হঠাৎ কী যেন মনে হতে সৌগতর চোখ চলে যায় ওর পাশেই বসে থাকা হীরকের দিকে—কী সর্বনাশ! ওর চোখে মরা মাছের মতো ঘোলাটে দৃষ্টি, মুখে একটা শয়তানী হাসি। শর্মিলী খুব সম্ভবত আগেই জ্ঞান হারিয়েছে। এবারে সৌগত দারুণ আতঙ্কে চেঁচিয়ে ওঠে, আর ঠিক তখনই টিমটিম করে জ্বলতে থাকা নীলচে আলোটাও নিভে যায়। একটা অর্ধোচ্চারিত আর্তনাদের অপমৃত্যু ঘটলো। সমবেত শিশুকণ্ঠের হাসি শোনা যেতে লাগলো কেবল। তারপরই শোনা গেল রক্তজল করা একটা জান্তব হুংকার।

তিন

ওদের উদয় স্যারের কোচিং থেকে ফিরতে বেশ দেরি হয়েছিলো। বাড়ি ফিরতেই অনেক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে। পরীক্ষা সামনেই, তাই স্যার বেশি সময় পড়িয়েছেন, তারপর গ্রুপ ডিসকাশন, ডাউট ক্লিয়ারিং সব শেষ হতে হতে অনেকটা দেরি হয়ে গেছে—এই সবই যথাযথভাবে বুঝিয়ে বলেছে ওরা। তারপর জাগতিক নিয়মে রাত বাড়লে খাওয়াদাওয়া সেরে ঘুমোতে গেছে।

গভীর রাতে অস্বস্তিকর একটা শব্দ শুনে ঘুম ভাঙে শর্মিলীর মা চন্দনা দেবীর। কেউ যেন বুকে হেঁটে ঘষটে ঘষটে সারা ঘরের মেঝেয় ঘুরে বেরাচ্ছে। তিনি নিজেও জানেন না, শব্দটা শুনেই তাঁর এরকম অদ্ভুত কথাই কেন মাথায় এলো। কিন্তু ভোঁতা শব্দটা যে একেবারেই সেইরকম। মেঝের দিকে হঠাৎ চোখ যেতেই অজানা আতঙ্কে হাড় হিম হয়ে গেল তাঁর। নাইট ল্যাম্পের হালকা আলোয় যে আলো—আঁধারির কাটাকুটি তৈরি হয়েছে, তাতেই দেখতে পাওয়া গেল, মেঝেতে সত্যিই একটা মনুষ্যাকৃতি বুকে হেঁটে ঘুরে বেরাচ্ছে—তার হাতদুটো নেই আর কোমরের পর থেকেও না। হেঁচড়ে হেঁচড়ে সরীসৃপের ভঙ্গিমায় সারা ঘরে রক্তের অশুভ আল্পনা এঁকে চলেছে সে। চন্দনা দেবীর বুক কেঁপে ওঠে, মনুষ্যকৃতিটা বড্ড চেনা লাগছে না? হ্যাঁ, কোনো ভুল নেই। সেই মূর্তিমান আতঙ্ক তার বীভৎস মুখটা উপরের দিকে তুলতেই, চিনে নিতে অসুবিধা হয় না তাঁর—বিকৃত হলেও, এ যে তাঁরই সন্তানের মুখ। কিন্তু একী! বিকৃত সেই মুখটা থেকে রক্তমাখা লোলুপ রসনা সাপের জিভের মতো বারবার বের হয়ে আসছে। এক অব্যক্ত অনুভূতি নিয়ে চিৎকার করতে যেতেই একজোড়া কালচে নীল রঙের পা সাঁড়াশির মতো গলাটা চেপে ধরে তাঁর। ছটফট করতে করতে অচিরেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি, তবে নির্নিমেষ অন্ধকারে তলিয়ে যাওয়ার আগেই দেখতে পেয়েছিলেন, খাটের তলা থেকে, খাটের প্রান্ত বেয়ে, তাঁর ঘুমন্ত স্বামী সৌমেন বাবুর গলার কাছে উঠে আসছে একজোড়া দানবীয় হাত।

প্রায় একইরকম পৈশাচিক হত্যালীলার শিকার হন সৌগত আর হীরকের পরিবারের মানুষরাও। অমিল কেবল এই যে, শর্মিলীর প্রত্যঙ্গহীন পচনধরা শরীরটাও উদ্ধার হয়েছিলো, কিন্তু অন্য দু'টির প্রতিক্ষেত্রে আধখাওয়া স্বামী—স্ত্রী—র দেহ দুটির সাথে, জীবিত বা মৃত কোনো অবস্থাতেই খুঁজে পাওয়া গেল না হীরক বা সৌগতকে।

পুলিশী তদন্ত শুরু হল বটে, কিন্তু বীভৎস হত্যালীলাগুলোর কোনো কূলকিনারা পাওয়া গেল না। ভয়ঙ্কর হত্যাকাণ্ডগুলোতে একটা নির্দিষ্ট প্যাটার্ন লক্ষ্য করে, পুলিশ প্রাথমিকভাবে সেগুলোকে কোনো মানসিক ভারসাম্যহীন সিরিয়াল কিলারের কাজ হিসেবে সন্দেহ করছিলো। কিন্তু প্রতিটা ক্ষেত্রে বাড়ির দরজা যে ভিতর থেকে বন্ধ! আর একটা ব্যাপার হল বদ্ধ উন্মাদ হলেও, কোনো মানুষের পক্ষে কি অতটা পরিমাণে আর ঐরকম নৃশংসভাবে কাঁচা নরমাংস ভক্ষণ করা সম্ভব? উত্তরটা খুব সম্ভবত, 'না'। আর সেই কারণেই সম্ভাব্য কোনো সমাধানই মাথায় আসছিলো না পোড়খাওয়া তদন্তকারী অফিসার পল্লব হালদারের। এদিকে কেবল বিচ্ছিন্ন দু'তিনটি ঘটনাতেই এই নরমেধযজ্ঞ সীমাবদ্ধ রইলো না। কয়েকদিনের অন্তরই এক বা একাধিক পরিবার সেই নারকীয় প্রতিহিংসার নিয়মিত শিকার হতে লাগলো।

ওদিকে তদন্তের বিশেষ অগ্রগতি না হওয়ায় এবং মৃত্যুর সংখ্যা উত্তরোত্তর বাড়তে থাকায়, ওপর মহল থেকে চাপ আসতে লাগল—কপালের ভাঁজ বাড়লো অফিসার পল্লব হালদারের। এমনই একটা সময়ে একটি হতভাগ্য পরিবারের অন্তিম পরিণতির স্থানটি পরীক্ষা করে, একরাশ বিবমিষা আর আতঙ্কের মিলিত অনুভূতি সাথে নিয়ে, সবে বেরিয়েছেন পল্লববাবু, তাঁর নজর পড়লো এক হতদরিদ্র বৃদ্ধের দিকে। পরনে তার শতছিন্ন পরিধেয়, মুখে অজস্র বলিরেখা আর দাড়িগোঁফের জঙ্গল, শুষ্ক রুক্ষ্ম দেহত্বক। বৃদ্ধকে প্রথম দর্শনে ভবঘুরে—এমনকি 'পাগল' বলে মনে হওয়াও অস্বাভাবিক নয়। তাঁর চোখে কিন্তু পাগলামীর কোনো লক্ষণ নেই। পরিবর্তে তাঁর চোখে রয়েছে আশ্চর্য এক প্রজ্ঞা! তিনি যেন পল্লব হালদারকে কিছু বলতে চান, কিন্তু ভরসা করে এগোতে পারছেন না। তিনি নিজেই এগোলেন বৃদ্ধের দিকে, জানতে চাইলেন—

''আপনি কি কিছু বলবেন?''

আকারে ইঙ্গিত বোঝা গেল বৃদ্ধ কিছু বলতে অবশ্যই চান, কিন্তু সর্বসমক্ষে নয়—কেবল পল্লববাবুকেই আলাদাভাবে জানাতে চান তিনি। অগত্যা বাকি পুলিশকর্মীদের প্রয়োজনমতো নির্দেশ দিয়ে, সেই বৃদ্ধের সাথে একান্তে কথা বলতে লাগলেন পল্লববাবু।

সেই বৃদ্ধ জানালেন, তিনি ঐ এলাকারই পুরনো বাসিন্দা, পরিস্থিতির ফেরে তাঁর এমন দারিদ্র্য। অকিঞ্চিৎকর আত্মপরিচয় পর্বটা দ্রুত শেষ করে, বুড়ো লোকটি গলা আরো এক ধাপ নামিয়ে হঠাৎ প্রশ্ন করে বসলেন,

''স্যার, 'কালাশ'—এর নাম শুনেছেন কখনো?''

পল্লব হালদার ঠিক বুঝে উঠতে পারলেন না, কী বলছেন মানুষটা। লোকটা তাঁর অস্বাভাবিক ফ্যাঁসফ্যাঁসে গলায় আবার প্রশ্ন করলেন, এবারে অবশ্য অন্য প্রশ্ন, ''এই যে দিনদিন একটা একটা করে পরিবার বেঘোরে মারা পড়ছে—ভয়ঙ্কর সেই মৃত্যুগুলো—কোনো কিনারা হল কি সে'সবের?''

বৃদ্ধ আরো কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু ততক্ষণে পুলিশ অফিসার পল্লব হালদার ভ্রূকুটি কুটিল ভঙ্গিমায় কড়া দৃষ্টিতে তাঁকে আপাদমস্তক জরিপ করা শুরু করেছেন—তবে তাঁর মস্তিষ্ক বলছে এই কঙ্কালসার অশক্ত লোকটির পক্ষে আর যাই হোক ওরকম হত্যালীলা...নাহ! শুনেই দেখা যাক ব্যাটা বলতে কী চায়। বৃদ্ধ সম্ভবত ওনার মনোভাব উপলব্ধি করেই ম্লান হেসে বললেন,

''না, না। আপনি যেমনটা ভাবছেন, তেমনটা মোটেই নয় স্যার! এই খুনী কোনো রক্তমাংসের মানুষই যে নয়। রক্তলোলুপ পিশাচটার নাম 'কালাশ'!''

অত্যন্ত বিরক্তির সাথে পল্লববাবু বলে উঠলেন,

''হোয়াট রাবিশ! এইসব ভুতুড়ে গালগল্প শুনিয়ে আমার সময় নষ্ট করবেন ভেবেছেন?''

লোকটা কিন্তু এতটুকু ঘাবড়ালেন না, পরিবর্তে বেশ আত্মপ্রত্যয়ী ভাবেই বলে উঠলেন,

''সত্যি করে বলুন দেখি স্যার, তদন্ত করতে গিয়ে কিছুই কি অস্বাভাবিক মনে হয়নি আপনার—মনে হয়নি এ কাজ মানুষের অসাধ্য?''

এর কোনো জবাব কিন্তু অফিসারের কাছে ছিলো না, কারণ বাস্তবেই নৃশংস হত্যাকাণ্ডগুলোতে অনেক অসঙ্গতি তাঁর অভিজ্ঞ চোখে ধরা পড়েছে, যার কোনো লৌকিক ব্যাখ্যা তিনি বের করতে পারেন নি। আমতা আমতা করে কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলেন পল্লববাবু। ওদিকে সেই শীর্ণকায় বৃদ্ধ আবার ঘোরলাগা কণ্ঠে বলতে শুরু করলেন,

''স্যার! বুঝতে আপনিও ঠিকই পারছেন, কিন্তু আপনার লেখাপড়া জানা মন মেনে নিতে বাধা দেবে বইকি! কিন্তু চেনা জগতের বাইরেও একটা অজানা জগৎ আছে, স্যার। ভয়ঙ্কর সব অস্তিত্বরা পর্দা ঠেলে সেখান থেকে কখন উঁকি দেবে, তা বলা যায় না। পাপ—মহাপাপের পরিণাম এই কালান্তক বিভীষিকা।''

বলতে থাকেন সেই বৃদ্ধ—পল্লববাবুও আর বাধা দেন না।

''আজ থেকে বছর বারো আগে এই বিক্রমপুরেই ঘটেছিলো এক নৃশংস অমানবিক ঘটনা। যদিও সেইসব কথা জনসমক্ষে আসেনি কোনোদিন—আসতে দেওয়া হয়নি।''

এলোমেলো ভাবে বলতে থাকেন বুড়ো লোকটা,

''একটা পরিবার থাকতো এলাকারই একটা বাড়িতে। বাপ, মা আর একটা বাচ্চা। প্রথম প্রথম সব ভালোই ছিলো, কিন্তু তারপর জমির ব্যবসা করে কিছু কাঁচাপয়সা হাত আসতে, কুসঙ্গে পড়ে বাপটা পাঁড় মাতাল হয়ে উঠলো। আকণ্ঠ মদ গিলে রাতদুপুরে ফিরে এসে অত্যাচার করতো বউটার উপর। শেষে তো রোজকার অত্যাচার সইতে না পেরে গলায় দড়ি দিলো বউটা।পুলিশী ঝামেলাও কৌশলে এড়িয়ে গেল শয়তানটা। বাচ্চাটা পড়ে গেল অকূল পাথারে।

তারপর ক'দিন যেতে না যেতেই বিয়ে করে নতুন বউ ঘরে তুললো লোকটা। ওতটুকু ছেলেটাকে সেই রাক্ষুসী সৎমা কী অত্যাচারটাই না করতো। আধপেটা খাবারের জন্য সমস্ত কাজকর্ম করানো তো ছিলোই, সাথে ছিলো অকথ্য অত্যাচার। গরম শিকের ছ্যাঁকা, চেলাকাঠ দিয়ে অমানুষিক মারধোর। এখানেই শেষ নয়—শুধু সাধারণ শারীরিক নির্যাতনই নয়। মুখে আনতেও গা ঘিনঘিন করে—বিকৃত শিশুকামী সেই মহিলা নানাভাবে ভয় দেখিয়ে অথবা খেতে দেওয়ার লোভ দেখিয়ে বাচ্চাটাকে যৌন নির্যাতনও করতো। একদিন বাচ্চাটা প্রতিবাদ করায় রাগে অন্ধ সেই রাক্ষসী এলোপাতাড়ি মারতে থাকে তাকে। বেকায়দায় আঘাত লেগে বাচ্চাটা মারা যায়—অভুক্ত অবস্থায়, নির্মম অত্যাচারের শিকার হয়ে প্রাণ হারায় বেচারা। বেগতিক বুঝে কোনোক্রমে বাড়ির বাগানেই বাচ্চাটার লাশটা পুঁতে দেওয়ার ব্যবস্থা করে শয়তানিটা। বাপটা দু'একবার খোঁজ করেছিলো বটে, কিন্তু তাকে 'নিজেই কোথাও চলে গেছে' গোছের যা হোক একটা কিছু বুঝিয়ে দিয়েছিলো রাক্ষসীটা।''

এতক্ষণ ধৈর্যের সাথে সব শুনছিলেন পল্লব হালদার, কিন্তু এবারে প্রশ্ন করলেন,

''অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা সন্দেহ নেই, কিন্তু এর সঙ্গে এখনকার খুনগুলোর কী সম্পর্ক? আর যে ঘটনাটা সেই সময়ে পুলিশের নজরেই আসেনি, সেইসব এত ডিটেলসে আপনিই বা কেমন করে জানলেন?''

''এবারে সেই কথাই বলছি স্যার'' উত্তরে আবার বলতে থাকে লোকটা—

''বাড়িটা যেখানে সেই জায়গাটা ছিলো বেশ নিরিবিলি, প্রতিবেশীরাও বিশেষ খোঁজখবর করেনি। কিন্তু পাপ কি কখনো চাপা থাকে! সেই বাড়িটার প্রচণ্ড প্রেতের উপদ্রব শুরু হল। আধখাওয়া ছোটোখাটো পাখি বা বিড়ালছানা, কুকুরছানা ইতস্তত পড়ে থাকছে, সারাক্ষণ আঁশটে একটা গন্ধ। রাতারাতি দেওয়ালে গাঢ় কালির ছাপ পড়ে যাচ্ছে, আরও কত কিছু! একরাতে তো গা হাত পা ভারি হয়ে, শ্বাসরোধ হয়ে প্রায় মারা পড়ার উদ্রেক হল ঐ পাপিষ্ঠা মহিলার। অগত্যা বাধ্য হয়ে এক তান্ত্রিকের ডাক পড়লো।

আমার সংসারে কোনোদিনই মতি নেই। সেসময়ে এদিক—ওদিক ঘুরে ঘুরে সাধুসঙ্গ করে বেড়াই। তখন ঐ তান্ত্রিক বাবাজীর সাথেই জুটেছিলাম আমি। আর সেইজন্যই এত বিস্তারিতভাবে আমি সব জানতে পেরেছিলাম। এতদিনে কম ভণ্ড বাবাজী তো দেখলাম না, কিন্তু সেই বাবাজীর এলেম ছিলো বটে। কারোর মুখের দিকে কিছুক্ষণ একনাগাড়ে তাকিয়ে থেকে গড়গড় করে তার নাড়ীনক্ষত্র সব বলে দিতে পারতেন। তা সেই বাড়ি পৌঁছেও ঐ মহিলার দিকে কিছুক্ষণ কটমট করে তাকিয়ে বাবাজী বজ্রনিনাদে ক্রুদ্ধ গর্জন করে উঠলেন। সাধনক্ষমতায় সেই পাপিষ্ঠার অপকর্ম জানতেও তাঁর বাকি রইলো না। ক্রুদ্ধ তান্ত্রিক বাবাজী ভাবীকালের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি প্রত্যক্ষ করে, ঘোর অমঙ্গলের বার্তা দিলেন। নিয়তির অমোঘ বিধান খণ্ডানো অসম্ভব, তবু সেই প্রেতকে মুক্তি দেওয়ার অনেক প্রচেষ্টা তিনি করেছিলেন। কিন্তু নাহ! দৈবের নির্দেশে সেই প্রচেষ্টা বিফলে গেল। তিনি মন্ত্রের বাঁধনে এক গূঢ় উপাচার ক্রিয়ায় সেই প্রেতকে কেবল নির্দিষ্ট কিছু বছরের জন্য নিষ্ক্রিয় করতে পারলেন। সাথেই ছিলো একটি ভয়ঙ্কর সতর্কবার্তা—সময়ের বাঁধন আলগা হলে, আর এলাকায় শিশু নির্যাতনের মতো জঘন্য অপরাধ আবারও সংঘটিত হলে, কোনো একটি বাচ্চার রক্তেই মন্ত্রের বাঁধান থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি পাবে সেই প্রেত। আর তখন সে কেবল সাধারণ প্রেত থাকবে না, পরিবর্তে সে হয়ে উঠবে অপ্রতিরোধ্য পিশাচশক্তি—''কালাশ''। একবার একটা দেহ পেয়ে গেলে পৈশাচিক আক্রোশে আর অপরিসীম ক্ষুধায় কালাশ তখন গ্রাস করবে একের পর এক পরিবারকে।

তান্ত্রিক বাবজী কর্মপ্রক্রিয়া শেষ করে আর এক মুহূর্ত থাকলেন না সেই পাপের আবাসনে। শুনেছিলাম সেই পাপিষ্ঠা এরপর আত্মহত্যা করেছিলো আর সেই অভিশপ্ত বাড়িটা, হতভাগ্য লোকটি জলের দরে বেচে দিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিলো। এর মধ্যে বাড়িটা বহুবার হাত বদল হয়েছে। আমি বেশ বুঝতে পারছি, নির্দিষ্ট সময়ের অবসানে, যে রূপেই হোক আবারও একই ধরনের পাপাচার ঘটেছে আর তাই সেই অসীম বলশালী পিশাচশক্তি জেগে উঠেছে, স্যার। আর নিস্তার নেই।''

বুড়ো লোকটার নেশা ধরানো অদ্ভুত কণ্ঠস্বরে কিছু একটা বিশেষ ব্যাপার নিশ্চয়ই আছে, না হলে আশৈশব নাস্তিক পল্লব হালদার চিন্তান্বিতভাবে বলবেন কেন,

''এর কি কোনো প্রতিকার নেই?''

পল্লববাবুর মত পরিবর্তনের আর একটা কারণ এও হতে পারে, তিনি জানেন মানুষের চেহারায় কিছু পশুশক্তি সত্যিই কিছুদিন আগে, একটি বাচ্চা মেয়েকে নির্যাতন করে নৃশংসভাবে খুন করেছে। অবশ্য যাদেরকে সন্দেহ করা হচ্ছিলো, জীবিত বা মৃত—কোনো অবস্থাতেই তাদেরকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।

সেই বৃদ্ধ চিন্তিতভাবে উত্তর করলেন,

''সত্যিকারের সমাধান হয়ত যিনি করতে পারতেন, সেই তান্ত্রিক বাবাজী দেহ রেখেছেন তাও প্রায় বছর তিনেক হয়ে গেল। ওনার থেকে খুব সামান্যই শেখার সুযোগ হয়েছিলো। তবে এই দুর্দিন যে আগামীতে আসবে সেটা তিনি বুঝতে পেরেই আমাকে কিছু নির্দেশ দিয়ে গেছিলেন। আমি সাধ্যমতো চেষ্টা তো করবোই, যাতে সেই পিশাচের হাতে আর কোনো নিরাপরাধ মানুষের প্রাণ না যায়—কিন্তু স্যার, তার জন্য আপনার কিছুটা সাহায্য লাগবে আমার।''

বৃদ্ধের শোনানো সেই অসম্ভব কাহিনী যে পুলিশ অফিসার পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পেরেছেন তা হয়ত নয়—কিন্তু জোর দিয়ে অস্বীকার করার ক্ষমতাও যেন কোন মন্ত্রবলে হারিয়ে গেছে তাঁর।

ধরা গলায় তিনি জবাব দিলেন,

''সম্ভব হলে নিশ্চয়ই সাহায্য করবো।''

চার

''ঘটনার সূত্রপাত যখন এই বাড়িটাই, তখন তো ঠিকই ভেবেছি।''

বৃদ্ধ স্বগতোক্তির ঢঙে বলে উঠলেন।

এখন দেখলে সেই বৃদ্ধকে আলাদা ব্যক্তি বলে ভুল হতে পারে। এখন তাঁর পরনে তান্ত্রিকোচিত বেশভূষা, আচরণেও একটা তেজোদ্দীপ্ত ভাব। পল্লব হালদারের সাথে তিনি হাজির হয়েছেন একটা নিরালা একতলা বাড়িতে। বাড়িটার সামনের একখণ্ড জমিটা জংলী আগাছায় ভর্তি।

বাড়িটায় বাস করতো যে পরিবারটি, তার মধ্যে এক দম্পতির রহস্য মৃত্যু ঘটে আর তাঁদের সন্তান এখনো নিখোঁজ। এরপর থেকে বাড়িটা পুলিশের হেফাজতেই ছিলো। অগত্যা পল্লব হালদারের সহায়তা ছাড়া বাড়িটায় প্রবেশ করা সম্ভব ছিলো না।

দুজনে মিলে জংলা জমিটার একটা বিশেষ জায়গায় খানিকটা খোঁড়াখুড়ি করতেই কিছু হাড়গোড় উদ্ধার হল। তার থেকেই বিশেষ কিছু হাড় সংগ্রহ করলেন সেই বৃদ্ধ। তারপর কিছুটা জায়গা পরিষ্কার করে নিলেন। মন্ত্রশক্তির সাহায্যে বন্ধন করে পল্লব হালদারকে একটি বিশেষ গণ্ডীর মধ্যে থাকতে নির্দেশ দিলেন—কোনো অবস্থাতেই তিনি যেন এর বাইরে না যান—বারবার সে কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন। এরপর হোমকুণ্ড রচনা করে অগ্নি সংযোগ করতেই সেটি লেলিহান শিখায় জ্বলে উঠলো। শকুনের বিষ্ঠা, কালো বিড়ালের লোম ইত্যাদি নানা বিধ বিচিত্র উপাচার চারপাশে সাজিয়ে রেখে উদাত্ত কণ্ঠে মন্ত্রোচ্চারণ শুরু করলেন তিনি। বৃদ্ধের এই রূপ বড়ই অচেনা পল্লববাবুর কাছে। মাঝে মাঝে কাঁচা মাছ, দু' এক খণ্ড কাঁচা মাংসের টুকরো আগুনে নিক্ষেপ করছেন বৃদ্ধ। তীব্র মাংস পোড়া গন্ধে ভরে উঠছে চারদিক। বেশ কিছুক্ষণের গুমোট একটা পরিবেশ যেন আসন্ন ঝড়ের পূর্বাভাস দিচ্ছে। একেবারে নিস্তব্ধ, কোনো কীটপতঙ্গের শব্দ পর্যন্ত নেই। তারপর একটা অনৈসর্গিক দুর্গন্ধ বাকি সব কিছু ছাপিয়ে প্রকট হয়ে উঠতে লাগলো। ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় যেন বার্তা দিলো বহির্বিশ্বের থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে চলেছে জায়গাটা।

তারপর হঠাৎ অসংখ্য শিশুকণ্ঠের খিলখিল হাসি শোনা গেল—সেই হাসির শীতল স্পর্শ অন্তরের অন্তস্থলে কাঁপন ধরিয়ে দেয়। সেই বৃদ্ধ কিন্তু এক মনে নানারকম উপাচার সম্পন্ন করে চলেছেন, কণ্ঠে তাঁর উচ্চারিত হচ্ছে মন্ত্র। নিরবচ্ছিন্ন শিশুকণ্ঠের হাসির শব্দ কেমন যেন কর্কশ হয়ে উঠতে লাগলো। তারপর শূন্যতা আর অন্ধকার যেন ঘনীভূত হয়ে তৈরি করলো এক অনৈসর্গিক মূর্তির। স্বরূপে প্রকাশিত হল ''কালাশ''। এ কী দেখছেন তিনি—নিজের চোখকে বিশ্বাস হয় না পল্লব হালদারের।

দীর্ঘাকৃতি রোমশ দেহের পশুসদৃশ পিশাচটার গায়ে দেহাবরণের মতো ঝুলছে অসংখ্য বিচ্ছিন্ন মানব প্রত্যঙ্গ। রক্তলোলুপ রসনা প্রতিক্ষণে বার হয়ে আসছে, চোখদুটো আগুনের ভাঁটার মতো ধকধক করে জ্বলছে তার। করাতের মতো ধারালো দাঁতের সারি ঝিলিক দিয়ে উঠলো। হৃৎপিণ্ডে মাত্রাছাড়া কাঁপন ধরিয়ে একটা জান্তব হুংকার করে উঠলো সে, আর ঠিক তখনই আকাশের বুক চিরে ঝলকে উঠলো বিদ্যুতের আলো। কান ফাটানো শব্দে বাজ পড়লো কাছেই। অদূরের মেঘহীন আকাশ সাক্ষী—এই দুর্যোগ লৌকিক জগতের বিষয় নয়।

বারবার আক্রমণে উদ্যত হয় সেই অপজীব, প্রতিবারেই একটা অদৃশ্য রক্ষাকবচে ব্যর্থ হয় তার সব চেষ্টা আর নিষ্ফল আক্রোশে গর্জন করতে থাকে সে। আত্মরক্ষাই কালাশের বিরুদ্ধে একমাত্র পথ, দৈবনির্দেশে সমস্ত প্রত্যাঘাত থেকে সে সম্পূর্ণ সুরিক্ষত। এভাবে কতক্ষণ দুই যুযুধান পক্ষের লড়াই চললো, তা বলা শক্ত। পরিশেষে সেই বৃদ্ধ এক মহামন্ত্র উচ্চারণের সাথে সাথে পূর্বে সংগ্রহ করা হাড়গুলিকে একটা লাল কাপড়ের সাহায্যে একসাথে বেঁধে ফেললেন। এবারে একটা কাতর হাহাকারের শব্দ বাতাসে বিষণ্ণতা মাখিয়ে দিলো—সেই ভয়ঙ্কর অপজীবটিকে আর দেখতে পাওয়া গেল না। মন্ত্রপূত লাল কাপড়ে বাঁধা হাড়গুলো সযত্নে মাটিতে পুঁতে দিলেন সেই বৃদ্ধ।

এতক্ষণে পল্লববাবু জানতে চাইলেন,

''বিপদ কি তবে কেটে গেল?''

ম্লান হেসে সেই বৃদ্ধ বললেন,

''সময়ের বাঁধনে আবারো আটকে পড়েছে সে। হয়ত কিছুদিনের জন্য স্বস্তি। তবে যতদিন সামাজিক ব্যাধির মতো জঘন্য অপরাধগুলো ঘটবে, ততদিন কালাশের সংহার নেই। বারে বারে সে ফিরে আসবে, ফিরে আসবে নানারূপে নানা স্থানে...''

* * *

বর্ধমান—শিয়ালদা প্যাসেঞ্জারে অভিভাবকহীন একটি বাচ্চাকে দেখতে পাওয়া গেছে। বছর পাঁচেকের ছেলেটার মুখের আদল সংবাদপত্রে 'সন্ধান চাই' বিভাগে প্রকাশিত, 'সুজয় সান্যাল' নামের বাচ্চাটির সাথে মেলে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%