কুসুমডিহির আতঙ্ক

কৌশিক কারক, আকাশ চন্দ, উৎস ভট্টাচার্য

গত তিনটে ইলেকশনে গ্রামটার একজনও ভোট না দিতে সবাই নড়েচড়ে বসতে বাধ্য হয়েছিল। এবার খবর আছে যে শুধু কুসুমডিহি নয় ওর পাশাপাশি ইকবালপুর, রশিদগঞ্জ, পায়রা দীঘি মোল্লার পুর....সব কটা গ্রামের মানুষ এক মত হয়ে ভোট বয়কট করবে। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে যা হয় আর কি! বেঁচে থাকার ন্যূনতম চাহিদাটুকু এদের পূরণ হয় না। একটা প্রাইমারি স্কুল আর একটা বয়েজ হাই স্কুল কোন মতে ধুঁকছে। নিকটবর্তী আধমরা স্বাস্থ্য কেন্দ্রও পাঁচ মাইল দূরে। সবচেয়ে বড় কথা রাস্তা বলে কিছুর অস্তিত্ব বর্ষাকালে অন্তত বোঝা যায় না। এবার তাই প্রশাসন আর নেতাদের টনক নড়েছে, কারণ গ্রামগুলোর ভোটার সংখ্যা তো নেহাৎ কম নয়। পিচঢালা রাস্তা তৈরি হবে, সে কারণে ওই পাণ্ডব বর্জিত গ্রামে যেতে হবে। অফিসে সবাই বললো জলপথে যেতে নইলে স্থলপথে ধুলো খেতে খেতে অবস্থা টাইট হয়ে যাবে। সঙ্গে আছেন আমার সিনিয়র মিঃ শ্রী বাস্তব, মানে আমাদের শ্রীবাস্তবদা, সমবয়সী সহকর্মী সুনন্দ বোস আর ঋত্বিক চৌধুরী। সুনন্দ একটা ছেলেকে জোগাড় করেছে। বেশ ভালো রান্না জানে নাকি, ওর নাম মন্টু রজক।

একটা কেরোসিন স্টোভ, দশ লিটার কেরোসিন, চাল, ডাল, তেল, নুন, চিনি, চা পাতা, গুঁড়ো দুধ....হাঁড়ি পাতিল, থালা গেলাস, কড়াই, খুন্তি, কেটলি... অর্থাৎ পুরো সংসার নিয়ে আমরা যাচ্ছি। কুসুমডিহিতে একটা মাটির বাড়ি ভাড়া করা হয়েছে। চৌকি বিছানা ওরাই দেবে। আমি নিজে কয়েকটা চাদর আর পাম্প বালিশ নিয়েছি।

কুসুমডিহি গ্রামটা বেশ বড়, মোটামুটি সচ্ছল বাসিন্দার সংখ্যা কম নয়। আমরা যে বাড়িতে উঠেছিলাম তার পাশেই মোড়লের বাড়ি। মোড়ল তো বেশ অবস্থাপন্ন। চন্ডী মণ্ডপে দোল দুর্গোৎসব হয়। হ্যাঁ, তবে তখনো গ্রামে বিদ্যুৎ আসে নি। রাত হলে হ্যাজাক আর লণ্ঠন ভরসা। কাছেই একটা পুকুরে সবাই স্নান করে, যদিও প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই কুয়ো বা টিউবওয়েল আছে। নদীতেও যায় অনেকে কিন্তু শৌচালয় নেই প্রায় কোন বাড়িতেই। আমরা শহরের অফিসার মানুষ, গ্রামের উন্নতির জন্য এসেছি দেখে মোড়লমশাই তাঁর বাড়ির বাথরুম ব্যবহারের অনুমতি দিলেন। না অনুমতি ঠিক নয়, তাঁর বাড়ির অব্যবহৃত টয়লেট ব্যবহার করতে অনুরোধ করলেন। আমাদের বিরাট একটা সমস্যা মিটে গেল। দিনের বেলাটা কাজে কোথা দিয়ে কেটে যেত বুঝতে পারতাম না। কিন্তু রাত নামলে শুরু হতো নরক যন্ত্রণা। অতো অন্ধকার আমরা জীবনেও দেখিনি। আটটার মধ্যে যেন সব নিস্তব্ধ হয়ে যেত।

মোড়লমশাই সন্ধে থেকে ওই আটটা অবধি চণ্ডীমণ্ডপে আড্ডা দিতেন। একদিন একথা সেকথা বলার পর বললেন, ''আপনারা কুসুমডিহির রক্ষে কালী মন্দির যাননি, তাই না?'' আমাদের সিনিয়র মিঃ শ্রীবাস্তব গত তিন পুরুষ ধরে আমাদের রাজ্যে বাস করছেন। নিজেদের পারিবারিক অনুষ্ঠানগুলো ছাড়া সবকিছুই বাঙালিদের মতো। তিনি বললেন, ''নাহ, সময় কোথায়?''

মোড়ল ভবেন চাটুজ্যে বললেন, ''এই রবিবার আপনাদের আমার বাড়ি একটু শাক ভাত খেতে হবে, আর আমি নিজে আপনাদের নিয়ে যাবো মন্দিরে। বড় জাগ্রত মা আমাদের।''

বলা বাহুল্য মনটা একটু সুখাদ্যের আশায় নেচে উঠলো। মন্টুর রান্না আর মুখে দেওয়া যাচ্ছিলো না।

সেই রবিবার সকাল সকাল স্নান করে বহুদিন পর মোড়লের বাড়ির লুচি আলুর ছেঁচকি আর হালুয়া খেয়ে মন্দির দেখতে গেলাম। নদীর ধার দিয়ে বেশ ঘন্টা দেড়েক হেঁটে তবে সেই মন্দিরের দর্শন পেলাম। বহু পুরোনো মন্দির, পাথরের তাই টিকে আছে। অনেক ভক্তের আনাগোনা আছে সেটা বেশ বোঝা যায়। কাঠের প্রণামী বাক্সে সবাই টাকা দিলাম। শহরের মানুষ আমরা, এতটা হেঁটে বেশ হাঁপিয়ে গিয়েছিলাম। মলিন হয়ে যাওয়া শ্বেত পাথরের চাতালে মন্দিরের ছায়ায় বসলাম। নদী থেকে ঠান্ডা মন ভালো করা বাতাস বইছে। একটু দূরে চোখ গেল, কিছুর একটা ধ্বংসাবশেষ মনে হচ্ছে। দেখি সুনন্দ এক দৃষ্টিতে সেদিকে চেয়ে আছে। আমি মোড়লকে জিগ্যেস করলাম, ''ওটা কী ভবেনবাবু?''

ভবেনবাবু উত্তর না দিয়ে বললেন, ''এবার বাড়ি চলুন, সূয্যি মাথার ওপর উঠছে। গরমে আর হাঁটা যাবে না।''

ফেরার সময় দেখলাম সুনন্দ বার বার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখছে। সত্যি বলতে কোন ঐতিহাসিক কিছুতে কোন দিন আমার কোন আকর্ষণ ছিল না। ইতিহাস বিষয়টাই আমার কাছে চিরকালের বিভীষিকা। ভাঙা চোরা কিছু বাড়ি আর জিনিসপত্রে মানুষের কেন ইন্টারেস্ট হয় কে জানে! ফিরে এসে হাত পা ধুয়ে বসেছি, খানিক পরে ভবেনবাবুর ছেলে খেতে ডাকলো। এ ছোকরা শহরে একটা প্রাইমারি স্কুলের মাস্টার। বয়স বেশ কম। কথায় কথায় জানা গেল আজ ওর জন্মদিন। যাঃ, কী উপহার দেওয়া যায়? ইনি আবার ভালো রকম রাজনীতি করেন। চাকরিটাও সেই সুবাদে কিনা কে জানে! মিষ্টি করে হেসে বললো ''আমাদের রাস্তা খুব ভালো করে করুন এর চাইতে বড় উপহার আর কী হবে? মনে মনে ভাবলাম, ''জিও বেটা, তোমার হবে!''

সোনা হেন ঝকঝকে কাঁসার থালায় বাটি উপুড় করা ভাত, কড়কড়ে আলুভাজা, গাঢ় মেরুন রঙের শাক ভাজা, ঘন সোনা মুগের ডাল, রুইমাছের কালিয়া, মোচার ঘন্ট, খাসির মাংস, ঘরে পাতা খাঁটি দুধের দই, মিষ্টি, পায়েস, চাটনি...ওহ, খাওয়ার শেষে ক্রেনে করে তুলে নিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা! কিন্তু সুনন্দ দেখলাম তেমন কিছু খেলো না। খানিকটা নাড়াচাড়া করে উঠে পড়ল। ধুস, সবার পেটে সব সয় না, ওর জন্য মন্টুই ঠিক আছে। সবচেয়ে সুখবর হলো মোড়ল গিন্নি নিজে রাতের খাওয়ার জন্য নেমন্তন্ন করলেন।

পাশাপাশি দুটো মাটির ঘরে দুটো চৌকিতে আমরা চারজন ঘুমোই। সুনন্দ আর আমি একটা চৌকি শেয়ার করি। মন্টু একটা খাটিয়ায়ে শোয়। আজ দুবেলা খাওয়াটা বেশি হয়ে যাওয়ায় শরীরটা বেশ হাঁসফাঁস করছিলো। তাড়াতাড়ি নয়টার মধ্যে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। রাত তখন কটা কে জানে কোন একটা শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। পাশে দেখি সুন্দর নেই, বাথরুম গেছে ভেবে আবার পাশ ফিরে শুলাম। সকালে উঠে নিমের দাঁতন মুখে করে মেঠো রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলাম, দেখি সুনন্দ আসছে। কেমন যেন টলছে, দু চোখ টকটকে লাল। এগিয়ে গিয়ে ওকে বললাম, ''কিরে এত সকালে তুই হাঁটতে গিয়েছিলি বুঝি?''

ও কোন উত্তর দিলো না, একই ভাবে টলতে টলতে এগিয়ে চললো। দাঁতনটা ছুঁড়ে ফেলে তাড়াতাড়ি ওকে গিয়ে ধরতেই চমকে উঠলাম। জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে।

সেদিন সব কাজকম্ম মাথায় উঠলো। প্রচণ্ড জ্বরের ঘোরে ভুল বকে যাচ্ছে। দরকারি যেসব ওষুধ পত্র এনেছি তার মধ্যে প্যারাসিটামল ছিলো, কিন্তু তেমন করে জ্বর নামছে না। এদিকে আমরা কেউই থার্মোমিটার সঙ্গে আনিনি। হাতের আন্দাজে উত্তাপ বুঝতে হচ্ছে। মোড়লের বাড়িতে খোঁজ করেও সেটা পাওয়া গেল না। সন্ধের দিকে জ্বরটা যেন আপনা থেকেই সেরে গেল। এখানে একটা জিনিস খুব ভালো লাগে, খাঁটি গরুর দুধ, টাটকা সবজি আর মাছ। এছাড়া ভরপুর অক্সিজেন তো আছেই। মোড়ল গিন্নি বড় কাঁসার বাটিতে সাবু পাঠিয়ে দিলেন আর ভারী একটা গেলাস ভর্তি দুধ। আমাদেরও যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়লো। ভবেনবাবু একথা সেকথার পর কুসুমডিহির ইতিহাস বলতে শুরু করলেন।

সঙ্গে তাঁর তরুণ পুত্রও ছিলো। শ্রীবাস্তবদা হঠাৎ প্রশ্ন করলেন, ''আচ্ছা মন্দিরের কাছে ওই ভাঙা বাড়িটা কার, দেখে তো মনে হয় বিশাল প্রাসাদ ছিল?''

—''রাতের বেলায় ওসব কথা থাক মশাই। দিনের আলোয় কোন একদিন বলবো।''

আরও কিছুক্ষণ গল্প করে ভবেনবাবু উঠে গেলেন। পটা, মানে মোড়ল পুত্র পকেট থেকে সিগারেট বের করে আমাদের অফার করলো। আমি আর সুনন্দ স্মোক করি না, ঋত্বিক কখনো সখনো। আর শ্রীবাস্তব দিনে পাঁচ ছয়টা খান। ছেলেকে আবার জিগ্যেস করতে সে বললো বয়স্করা এই নিয়ে রাতে কেন দিনেও মুখ খোলেন না। ওই ধ্বংসস্তূপ জগৎ শেঠের এক আত্মীয় মনোহর শেঠের। তাঁর প্রাসাদের মতো বাড়ি লোকজন দাসদাসীতে ভর্তি ছিল...তিন স্ত্রীর আটটি ছেলে আর চার মেয়ে ছিল। মেজ মেয়ের নাম....

হঠাৎ উঠে বসে সুন্দর বললো, ''কুসুম....কুসুম ছিলো ওর নাম।''

পটা চমকে গিয়ে বললো, ''কী করে জানলেন? ও বুঝেছি, এখানকার লোকজনের কাছে শুনেছেন, তাইতো?''

ও মাথা নাড়তে লাগলো, ''আমি জানি, আমি জানি, আমি জানি....''

বড্ড ক্লান্ত ছিলাম সবাই, মন্টু সেদিন আলু সেদ্ধ ভাত করলো, ঘি কাঁচা লঙ্কা দিয়ে তাই খেয়ে শুয়ে পড়লাম। মাঝ রাতে আবার ঘুম ভাঙলো, সুন্দর বিছানায় নেই। ও অসুস্থ তাই না ঘুমিয়ে ওর জন্য অপেক্ষা করবো ভেবে জেগেই রইলাম। আবার একটু চোখ লেগে এলো। কিন্তু মনের মধ্যে উদ্বেগটা থাকায় ঘুমটা ভেঙেও গেল...সুনন্দ তখনো ফেরেনি। সে রাতে পটাকে নিয়ে গোটা গ্রামটা চষে ফেললাম আমরা চারজন, কোত্থাও ওকে পেলাম না। ভোর হয়ে আসছে। পুব আকাশ আবিরে রাঙিয়ে সূর্য উঠছে হঠাৎ চোখ পড়ল নদীর দিকে, মাতালের মতো টলতে টলতে সুনন্দ আসছে না? হ্যাঁ ওই তো! কাছে এলে দেখলাম আজও চোখ রক্ত বর্ণ, গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে।

এবার সত্যিই বড় চিন্তার কথা। ওকে তো আর সাইটে রাখা যাবে না। ঋত্বিক আমাকে চুপি চুপি জিগ্যেস করলো সুনন্দর কোন খারাপ অভ্যেস নেই তো। পটার স্কুল সেদিন কী কারণে যেন বন্ধ ছিল, কথাটা তার কানে গেল। সে প্রতিবাদে করে জানালো শুধু এই গ্রাম কেন আশাপাশে দশটা গ্রামেও ওসব পল্লী নেই।

ভবেনবাবুও চিন্তিত হয়ে বললেন, ''ছেলেটাকে ওর বাপ—মায়ের কাছে পাঠিয়ে দিন, গতিক সুবিধের বুঝছি না।'' রঘুবীর শ্রীবাস্তব বললেন, ''কেন বলুন তো, এটা তো ম্যালেরিয়ার নয় বলেই মনে হচ্ছে। তবে জ্বরটা কিসের? আপনাদের গ্রামে এরকম জ্বর হয়?''

—''ব্যাপারটা জ্বর জারির নয় মশাই, বুঝুন একটু। রোজ রাতে ও নদীর ধার ধরে কোথায় যায়? গোটা রাত কোথায় কাটায়? জ্বর নিয়ে ফেরে কেন?''

—''বুঝছি না, যদি একটু খুলে বলেন...''

—'ওকে কুসুম ডেকে নিয়ে যায়!''

—''মানে, কুসুম আবার কে?''

—''এই কুসুমডিহির কুসুম, সেদিন যে ভাঙা প্রাসাদ দেখেছিলেন, তার মালিক মনোহর শেঠের মেজ মেয়ে কুসুম।''

—''ভূতের গপ্পো বলছেন নাকি মশাই? রাতে সময় করে শুনবো ঠিক আছে? এখন সময় মুড কোনোটাই নেই কিন্তু!''

—''এ গল্প আমি কেন আশপাশের কেউই রাতে বলবে না। ছেলেটাকে এখান থেকে ফিরিয়ে না নিয়ে গেলে বিপদে পড়বেন। ওর বাপ—মাকে কি জবাব দেবেন...যাক গে বেলা হলো চানে যাই...হরি হে মধুসূদন রক্ষে কর...'' শ্রীবাস্তব দা ধপ করে মোড়ার ওপর বসে পড়লেন, ''বোঝো কাণ্ড!''

সেদিন রাতে পটার সঙ্গে কথা বলে শুলাম। রোজ রাতে সুনন্দ কোথায় যায় কিছুতেই বললো না, একবার তো আমার দিকে কটমট করে চেয়ে নিজের চরকায় তেল দিতে বললো। আর কথা না বাড়িয়ে শুয়ে পড়লাম। তবে ঘুমালাম না, কিন্তু একটা সময় চোখের পাতা দুটো জড়িয়ে এলো। তবে দরজার মৃদু আওয়াজেই জেগে উঠলাম...সুনন্দ ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। অন্য ঘরে গিয়ে ঋত্বিককে টোকা দিয়ে ডাকলাম। উঠোনে নেমে দেখি পরিকল্পনামতো পটাও হাজির, হাতে একটা তিন ব্যাটারির টর্চ। পটা বললো আজ তৃতীয়া, খুব ক্ষীণ চাঁদের আলো। সুনন্দ যেন হাওয়ায় ভেসে চলছে। প্রায় পঞ্চাশ হাত দূরে থেকে ওকে আমরা অনুসরণ করছি। কিন্তু দূরত্ব যেন ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে। ঋত্বিক ফিসফিস করে জিগ্যেস করলো, ''ওকে ডাকবো?''

পটা বললো, ''এক দম না, তা হলে কিছুই বোঝা যাবে না।''

কখন যেন মন্দিরের কাছে চলে এসেছি, সুনন্দ মাঠে নেমে পড়েছে। খুব সাবধানে পা ফেলে চলছি সবাই। দূরে...অনেক দূরে ...কোথাও কে যেন কাঁদছে, বড় বুক নিংড়ানো সেই কান্নার আওয়াজ...কোথাও যেন মহা অকল্যাণকর কিছু ঘটেছে। কাছেই শেঠদের ধ্বংসস্তূপ, জমাট বাঁধা অন্ধকারে তার অতীত গৌরব শনশনে বাতাসে হাহাকার মিশিয়ে দিচ্ছে। পটা অতি মৃদু স্বরে বললো, ''সাবধানে পা ফেলুন, ওই ভাঙা প্রাসাদের অনেক পাথরের টুকরো এদিক—ওদিক ছড়িয়ে আছে।''

ওদিকে সুনন্দ এমনভাবে হাঁটছে যে এই জায়গাটা যেন ওর খুব চেনা। হাঁটছে না ও যেন ছুটছে...সেই কান্নার উৎসে।

প্রাসাদ পেরিয়ে অনেক...অনেকটা দূরে জঙ্গল মতো, দূর থেকে লম্বা বিরাট ভূতুড়ে গাছগুলো বেশ বোঝা যাচ্ছে। কান্নার শব্দটা এখন বেশ প্রকট, এ কান্না শুধু প্রাণ নিংড়ানো নয়, ভয়ানক কোন অনুভূতি জাগায় মনে। বেশ ঘেমে গেছি, সমস্ত মন প্রাণ চাইছে ফিরে যেতে...কিছু একটা ঘটবে, খুব অমঙ্গলজনক কোন বিপদের সম্মুখীন হতে যাচ্ছি আমরা। কোন একটা নিষিদ্ধ জগতে অনধিকার প্রবেশ করতে যাচ্ছি যেন।

ঋত্বিক ফিসফিস করে বললো, ''অরুণদা আজ ফিরে যাই চলো। কাল যা করার করবো।''

পটা মৃদু ধমক দিলো, ''উনি আপনাদের বন্ধু তো নাকি? আমরা তিনজন আছি তো, ভয় পাবেন না। দেখি না কী হয়!''

সুনন্দ হঠাৎ হারিয়ে গেল, থেমে গেল সেই ভয়ানক কান্নাও। নিঃশব্দ সেই জঙ্গলে অসহায়ভাবে আমরা তিনজন দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ খিলখিল হাসির শব্দে চমকে দেখি হাত বিশেক দূরে এক মানুষ সমান উঁচু সাদা একটা আগুন জ্বলছে, সেই আলোতে সুনন্দকে দেখতে পেলাম বিরাট একটা মজা পুকুরের পাশে বসে, ওর পাশে সাদা থান পরে এক সুন্দরী বিধবা...আলোটা যেন তার গা দিয়ে বেরোচ্ছে।

পরক্ষণেই দেখি কোথায় বিধবা আবার সেই ধবধবে সাদা আলো...আবার এক ঢাল কালো চুলের এই বিধবা মেয়ে। দৃষ্টি ভ্রম হচ্ছে নাকি? কেমন যেন বিবশ হয়ে গিয়েছিলাম, আবার খিলখিল হাসি...সেই মেয়ে চোখ তুলে তাকালো...কী সাংঘাতিক সে দৃষ্টি...কী যেন আছে সে দৃষ্টিতে...আবার শুরু হলো কান্না...

পটা হাত ধরে টান দিলো, ''পালান!''

রক্ষেকালী মন্দিরের কাছে আমরা সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েছিলাম। পরদিন ভোর বেলায় মন্দির সাফাই করার লোক আমাদের আবিষ্কার করে। সুনন্দ প্রায় সম্পূর্ণ উন্মাদ হয়ে গেছে। ওকে ওর বাবা—মা কলকাতায় ফিরিয়ে নিয়ে গেছে। হসপিটালে রেখে চিকিৎসা চলছে। ভগ্ন হৃদয়ে আমরা আছি, কাজ করছি। মন্দিরের পুরোহিতের কাছে বসে শুনলাম এই আলেয়ার গল্প। তিনি নিজে আমাদের সঙ্গে দেখা করতে এসে অনেক গল্প করলেন। কুসুমডিহি গ্রামের নাম এই আলেয়ার নামে।

বড় দয়াময়ী ছিলেন ওই নারী। বাল্য বিধবা এই রমণীর সতেরো বছর বয়সে পদঙ্খলন হয়, কেউ আবার বলে তাঁর বাবা মনোহর শেঠ অত্যন্ত স্নেহের হতভাগিনী মেয়েকে অনেকটা জমি লিখে দিতে চেয়েছিলেন তাই ভাইরা ষড়যন্ত্র করে মেরে পুঁতে দিয়েছিলো ওই জলায়। বিশ, পঁচিশ বছর অন্তর হঠাৎ করে ওই ক্ষিপ্ত ডাকিনী কোন এক পুরুষকে ডাক দেয়। সে ডাক উপেক্ষা করার ক্ষমতা তার থাকে না। বদ্ধ উন্মাদ হয়ে যায়।

শ্রীবাস্তবদা বিষণ্ণ হয়ে বলেছিলেন, ''এর কোন প্রতিকার নেই ঠাকুর মশাই? ওর দেহের সৎকার করা যায় না, বা পিন্ড দানটান করে...''

—''অতো বড় জলায় কোথায় সেই মেয়েকে পুঁতে রেখেছে কে বলবে? আর এত যুগ পরে তার হাড়গোড় অবশিষ্ট আছে নাকি? কুসুমের দেহ ছড়িয়ে আছে এই গ্রামের আকাশে, বাতাসে, মাটিতে, জলে।''

আমি বললাম, ''তাহলে কোনো উপায় নেই এর থেকে মুক্তি পাওয়ার?''

—''আছে, আপনারা রাস্তা বানান, বিজলী বাতি নিয়ে আসুন, অনেক স্কুল কলেজ হোক। সভ্যতা আর শিক্ষার আলো আলোকিত করুক এই অবহেলিত গ্রাম গুলোকে। গ্রামের মেয়েরা শিক্ষিত হোক, স্বাবলম্বী হোক...তাহলেই হয়তো সেই হতভাগিনীর আত্মার শান্তি হবে।''

না সুনন্দ আজও সুস্থ হয়নি। এখন মেন্টাল হসপিটালের স্থায়ী বাসিন্দা। আর এই মধ্য বয়সেও ব্যাখ্যা করতে পারিনি সেদিন কী দেখেছিলাম। কুসুমডিহি গ্রামে এখন প্রায় প্রতিটি বাড়িতে টিভি, দুটো বয়েজ আর একটা গার্লস স্কুল। একটা কো এড কলেজও হয়েছে। আশেপাশের গ্রামগুলোতেও তাই। মন্দিরটা আছে, আছে ধ্বংসাবশেষও। তবে সেই জলাটার আর কোন অস্তিত্ব নেই, মাটির নয় অসংখ্য ইঁটের বাড়ি ঘর গড়ে উঠেছে সেখানে। এখন আর কোন আলেয়ার কথা শোনা যায় না। বরং ইলেকশন এলেই গোটা কয়েক লাশ পড়ে। বেশ উন্নত হয়েছে গ্রামগুলো।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%