বুবাই

কৌশিক কারক, আকাশ চন্দ, উৎস ভট্টাচার্য

বারান্দা দিয়ে ক্লাসের দিকে এগোতেই কানে এল 'স্যার আসছে, স্যার আসছে'। ক্লাসে ঢুকতেই সব একেবারে চুপচাপ। কিন্তু এই নিস্তব্ধতা ভেঙে কিছু ছেলের চাপা গুঞ্জন কানে এল আমার। বাঁদিকে তৃতীয় বেঞ্চের ছেলেরা তখনও চাপা গলায় নিজেদের মধ্যে বাক—বিতন্ডা করেই চলেছে। একটু ধমকের সুরেই বলে উঠলাম,—এখনও কথা হচ্ছে কেন? কীসের এত আলোচনা?

সকলের তটস্থ হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও বুবাই তিড়িং করে দাঁড়িয়ে বলল,—স্যার, আসলে ব্যাপারটা হল, আমি জিগ্যেস করেছিলাম যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর আমাদের নিমাই মান্না স্যারের মধ্যে কে বড় কবি?

বুবাইয়ের প্রশ্ন শুনে তো আমি অবাক। কোথায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর কোথায় নিমাই মান্না!

স্কুলে তখন সবে সবে জয়েন করেছি। মাস দুয়েক হয়েছে। তবে, জয়েনের পর প্রথম আমার সাথে পরিচয় ঘটে নিমাই মান্না স্যারের। খুবই হাসিখুশি এবং সজ্জন ব্যক্তি। এই স্কুলের বাংলা শিক্ষক। বিভিন্ন পত্র—পত্রিকায় লেখালিখি করেন। ওনার বেশকিছু লেখা আমি পড়েছি। বেশ ভালোই লেখার হাত। তবুও স্বয়ং কবিগুরুর সাথে তুলনা একেবারেই চলে না।

আমি বেশ জোর দিয়েই বললাম,—নিমাই স্যারের লেখা ভালো তাতে সন্দেহ নেই ঠিকই। তবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে তুলনা করা উচিতই নয়।

আমায় থামিয়ে দিয়ে বুবাই বলল,—কিন্তু রবি ঠাকুর তো আর আমাদের মধ্যে নেই এবং আমাদের সাথে পরিচিতও নন। সুতরাং সবদিক বিচার করলে নিমাই স্যার ইজ গ্রেট।

একটা ছোট্ট ধমক দিয়ে ওকে থামিয়ে দিয়ে বললাম,—কবিগুরু সম্পর্কে আজ যা বললে সেটা যেন আর কখনো না শুনি!

বুবাইয়ের সাথে এইভাবেই আমার পরিচয়ের সূত্রপাত্র। একেবারে গোড়া থেকে শুরু করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। আমার নাম অসীম দাশগুপ্ত। নিউ জলপাইগুড়ির বাসিন্দা। আমি প্রথমে ইংরেজি অনার্স নিয়ে বি. এ. তারপর এম. এ. পাস করি এবং মুর্শিদাবাদের রমীপুর গ্রামের হাইস্কুলে ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হয়ে চলে আসি।

এখানে থাকি স্কুল লাগোয়া একটি হোস্টেলে। হোস্টেল মানে ছোট একফালি ঘর। শিরিষ, তেঁতুল ও আম গাছে ঘেরা। মাঝখানে অনেকখানি ফাঁকা জায়গা। একটু দূরে লাইব্রেরি। সামনে একটি ছোট্ট রাস্তা, যেটা সোজা গিয়ে মিশেছে বড়ো বাস রাস্তায়। রাস্তার বাঁদিকে বাঁশবন আর ডানদিকে গ্রামের একমাত্র হেলথ সেন্টার। হেলথ সেন্টারের অবস্থা খুবই শোচনীয়। একজন মাত্র ডাক্তার ও একজন মাত্র আয়া কাম নার্স।

স্কুলের প্রায় সকল ছাত্রের মুখ চেনা হওয়া সত্ত্বেও প্রথম দিন থেকেই আমার নজর কেড়েছিল খুবই। ডানপিটে গোছের ছেলেটি ক্লাস নাইনে পড়ে। পড়াশোনায় একদম গোল্লা। কিন্তু, দুষ্টুমিতে একেবারে এক নম্বর। যত সময় গড়াতে থাকল, আমার যেন কীরকম একটা টান আসতে লাগল ওর প্রতি। ভালোবাসার ও মায়ার টান।

ডানপিটে এই ছেলেটিকে কেন আমি ভালোবেসে ফেললাম এই প্রশ্ন অনেকের মাথায় আসে। এর গুরুতর কারণ এই যে, ডানপিটে ছেলেদের মনে কোনো কিছুর ভয় থাকে না। সরাসরি অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারে। এদের মন পরিষ্কার হয়। মিথ্যে কথা খুব একটা বলে না। আর সবথেকে বড়ো গুণ হল, প্রয়োজনের সময় এই সব ছেলেরাই নিঃস্বার্থভাবেই পাশে এসে দাঁড়ায়। অবশ্যই এই প্রতিটি গুণ বুবাইয়ের মধ্যে বর্তমান এবং এই কারণেই ও হয়ে উঠেছিল আমার প্রিয় পাত্র।

একদিন বিকেলবেলা বুবাই এসে বলল,—স্যার, আজ রাতে আপনি আমাদের বাড়িতে খাবেন। কথা শুনে আমি স্বভাবতই একটু অবাক হয়ে গেলাম। অনেকবার বারণ করা সত্ত্বেও বুবাই আমার কোনো কথাই কানে তুলল না। জোর করে নিয়ে গেল ওদের বাড়ি। মাটির বাড়ি, টালির চাল, হ্যারিকেনের আলো এবং পায়রার বকম, বকম। এরই মাঝে দাওয়ায় বসে রাতে আহারের সাথে জমিয়ে আড্ডা।

খাওয়ার শেষে টর্চ নিয়ে বুবাই আমাকে অনেকটা রাস্তা এগিয়ে দিয়ে গেল। সেদিন ছিল জ্যোৎস্না রাত। আলো আঁধারির খেলা। বাঁশ বাগানের পিছন দিকে গোল চাঁদটাকে দেখে আমার মনে পড়ে গেল বিখ্যাত সেই গানের কলি দুটো। 'বাঁশ বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ঐ, মাগো তোমার শোলোক বলার কাজলা দিদি কই?'

বুবাই কাউকে ভয় পায় না বটে। তবে একবার আমি তাকে প্রচন্ড ভয় পেতে দেখেছিলাম। সেদিন পরপর দুটো পিরিয়ড অফ থাকায় ক্লাস টেস্টের খাতাগুলি চেক করছিলাম। এমন সময় সুনীলবাবু এসে বললেন—অসীম, তোমার বুবাইয়ের কান্ড শুনেছো?

বুবাইয়ের সাথে যে আমার খুব সখ্যতা এটা সবাই জেনে গিয়েছিল। খাতা থেকে মাথা তুলে সুনীলবাবুর দিকে তাকালাম।

উনি বলে চললেন,—জানো তো স্কুলের ছুটির পর আমাদের রবীন বনু হেলথ সেন্টার লাগোয়া একটা মেঠো ঘরে ছাত্রদের পড়ায়। কালকে বুবাইদের পড়াচ্ছিল। বুবাইয়ের ঠাকুমার পানের নেশা। মাঝে মধ্যেই বুবাইকে পাঠিয়ে ওর ঠাকুমার কাছ থেকে পান এনে খায়।

কালকেও যথারীতি বুবাইকে পান আনতে পাঠিয়েছিল। বুবাই পানের মধ্যে একগাদা জর্দা মিশিয়ে রবীনবাবুকে দিয়েছিল। পানটা মুখে পুরে তো ওর অবস্থা খারাপ। মাথা ঘুরে, বমি করে একদম অজ্ঞান। দুজন ছুটে গিয়ে হেলথ সেন্টারের ডাক্তার রনজয় বসুকে ডেকে আনে। বনুর অবস্থা দেখে ডাক্তারের চক্ষু চড়ক গাছ। শরীর একদম ঠান্ডা। পালস খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ব্যাগ খুলে একটা ইনজেকশন পুশ করে বলেন,—এক্ষুনি তোমাদের স্যারকে হেলথ সেন্টারে নিয়ে চলো। প্রায় রাত দুটোর পর জ্ঞান ফেরে বনুর।

স্কুল ছুটির পর সুনীলবাবু, হাজরাবাবুদের সাথে গিয়ে দেখে এলাম রবীনবাবুকে। এখন একটু ভালো আছেন ভদ্রলোক। তবে, ঘুমের ভাবটা কাটেনি। হেলথ সেন্টার থেকে বেরিয়ে পাড়ার ছেলেদের থেকে জানতে পারলাম গতকাল রাত থেকে বুবাই বাড়ি ফেরেনি। ওর বাবা একেবারে রেগে কাই হয়ে রয়েছে।

আমার হোস্টেলে ফিরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশপানে চেয়ে বুবাইয়ের কথা ভাবছি এমন সময় পিছন থেকে এল পাঁচুদার গলা। পাঁচুদা হল আমাদের স্কুলের দারোয়ান। বলল,—স্যার!

—ও পাঁচুদা! বলো কী বলতে...

—আমি জানি আপনি কার কথা ভাবছেন।

—আমি আবার কার কথা ভাবব?

—বুবাইয়ের কথা?

—ও কোথায় তুমি জানো?

—জানি

—কোথায়?

—শ্মশানের দিকে যেতে যে শস্যখেতটা আছে তার কোণের দিকে একটা মাচা ধরনের আছে। খড় দিয়ে ঢাকা। মড়া পোড়াতে এসে ওখানে বসে সব ধেনো খায়। ঐ মাচার উপরই আছে বুবাই।

—আমি যাব ওখানে। নিয়ে যেতে পারবে আমায়?

—হ্যাঁ স্যার। নিশ্চয়। এখনই চলুন আমার সাথে।

পাঁচুদার সাথে জোর কদমে হাঁটা দিলাম শ্মশান উদ্দেশ্যে। শ্মশানে পৌঁছে দেখলাম বাঁশের মাচার উপর খড় বিছিয়ে শুয়ে ছিল বুবাই। ডাকলাম, —বুবাই। মশা যে ছেঁকে ধরেছে। বাড়ি যাবি তো?

—স্যার, আপনি!

—বাড়ির সবাই চিন্তা করছে। মা কান্নাকাটি করছে।

—বাড়িতে গেলে বাবা মারবে।

—মারুক। মার খাবি। ভুল করবি, আর মার খাবি না? চল, আমি সাথে যাচ্ছি।

—আমার ভয় করছে।

—তোর আবার ভয় আছে নাকি! শ্মশানে সারারাত একা কাটিয়ে দিলি, আর এখন বলছিস ভয় করছে?

এরপর বুবাইকে ওর বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যাই। প্রথমে ওর বাবা তেড়ে মারতে গিয়েছিল বটে, তবে অনেক বোঝানোর পর তাঁকে শান্ত করা যায়। মা ছেলেকে ফিরে পেয়ে আনন্দে কেঁদে ফেলেন।

সন্ধে হওয়ার তখনও সামান্য কিছুটা সময় বাকি। হোস্টেলের ফিরতি পথে পা বাড়ালাম। সামান্য আলো—আঁধারির মধ্যে মেঠো রাস্তা ধরে এগিয়ে চলেছি, এমন সময় মাঝ রাস্তায় পিছন থেকে শুনতে পেলাম বুবাইয়ের গলা, —স্যার! স্যার!!

থমকে দাঁড়িয়ে পিছন ঘুরে দেখতে পাই দূর থেকে ছুটে আসছে বুবাই। কাছে এসে সস্নেহে একেবারে জড়িয়ে ধরল আমায়। চোখে জল। হাঁটু মুড়ে ওর সামনে বসে পড়লাম আমি। মুখটা তুলে হাত দিয়ে চোখের জল মুছে দিলাম। হেসে বললাম—ধুর বোকা এরকম করে কেউ কাঁদে? কী হয়েছে?

ভেজা গলায় বুবাই বলল,—ধন্যবাদ স্যার। ধন্যবাদ।

—খুব হয়েছে। যা, এবার বাড়ি ফিরে যা। আর মনে রাখিস। কখনো করবি না আর এরকম!

—আচ্ছা স্যার। বলে ফিরে গেল বুবাই।

আমার চোখেও জল চলে এল। ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগলাম। মনে একটাই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে, একে কী বলে? ছাত্র শিক্ষকের সম্পর্ক? নাকি তার চেয়েও বেশি কিছু?

এভাবেই নানা ঘটনার মধ্যে দিয়ে দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল। ইদানীং নাটকের দিকে আমার ঝোঁক সৃষ্টি হয়েছিল। নাটক লেখা, অভিনয় প্রভৃতি। বাবা—মা বারবার চিঠি লিখে বলত, কোনোভাবে ট্রান্সফার নিয়ে বাড়ির কাছাকাছি কোনো স্কুলে চলে যাওয়ার জন্য। অনেক চেষ্টা চরিত্তির পর একটা উপায় করা গেল। চলে এলাম নিজের শহরে। এখানকার একটা স্কুলে যোগদান করলাম।

কিন্তু আসাটা অতো সহজে হয়নি। বুঝতে পারিনি কীভাবে ভালোবাসার বাঁধনে বাঁধা পড়েছি। ছাত্র—শিক্ষক সকলের মুখে এক কথা,—এই তো বেশ ভালো ছিলে। হঠাৎ চলে যাওয়ার কী দরকার হল? সত্যি বলতে আমারও খুব খারাপ লাগছিল ওদের ছেড়ে আসতে। কিন্তু আসাটা জরুরি ছিল আমার কাছে।

যেদিন আমায় বিদায় সম্বর্ধনা দেওয়া হল, সেদিন তো স্কুলে সমস্ত গ্রাম যেন ভেঙে পড়ল। সকলেই এসেছিল। আসেনি কেবল একজন। বুবাই। সমস্ত অনুষ্ঠানে আমার চোখ খালি খুঁজে বেড়াচ্ছিল ওকে। প্রচুর ভালোবাসা, উপহার, মিষ্টিমুখ আর চোখ ভেজানো স্মৃতির পথ ধরে ইতিউতি বিচরণের মধ্যে দিয়েই শেষ হল সম্বর্ধনা অনুষ্ঠান।

সন্ধ্যাবেলায় একটা মধুসূদন রচনাবলী নিয়ে হাজির বুবাই। এসেই আমায় প্রণাম করে রচনাবলীটা আমার হাতে দিয়ে বলল,—এই নিন। এটা আপনার জন্য।

—দুপুরে এলি না কেন?

—সন্ধ্যাবেলায় আসব বলে। আর তাছাড়াও অতো লোকের মধ্যে শান্তিতে কথা বলা যেত না।

আরও কিছুক্ষণ কথা বলে বুবাই চলে গেল।

যাওয়ার দিন ওর কি ব্যস্ততা। সমস্ত প্যাকিং একাই করল। রিকশা ডেকে আনল। বাইরে বেরিয়ে দেখি সমস্ত গ্রাম হাজির আমায় বিদায় জানানোর জন্য। সবাই চলল বড়ো বাস রাস্তা পর্যন্ত হাঁটতে হাঁটতে। জিনিসপত্র নিয়ে বুবাই রিকশাতে। বাস সময়মতোই এল। ভিড় মোটামুটি আছে। তবে বসার সিট অনায়াসেই পেয়ে গেলাম। আমার সাথে অতগুলো লোক দেখে বাস কনড্রাক্টর ভেবেছে আমি কোনো ভি. আই. পি.। তাই একেবারে জানালার ধারে একটা সিট খালি করে দিল। আমার লাগেজগুলো বুবাই আর দুজন ছাত্র মিলে বাসের ছাদে তুলে দিল। সবাইকে বিদায় জানিয়ে বাস এগিয়ে চলল গন্তব্যের দিকে।

বহরমপুরে বাস থেকে নেমে দেখি বুবাই আমার লাগেজ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। জিগ্যেস করলাম,—তুই এখানে?

—হ্যাঁ স্যার। বাসের ছাদেই চলে এলাম। মালগুলো নামাতে আপনার যদি অসুবিধা হয়? তাই। আপানাকে ট্রেনে তুলে দিয়ে তবে আমার ছুটি।

—সেকিরে! যদি পড়ে যেতিস?

—ও আমার অভ্যেস আছে। নির্দিষ্ট সময়ে ট্রেন চলে এল। উঠে পড়লাম। বুবাই লাগেজগুলো তুলে দিল। শেষবারের মতো আমায় প্রণাম করে ভেজা গলায় বলল,—স্যার, আমাদের ভুলে যাবেন না তো? আবার আসবেন কিন্তু।

আমার গলাও ধরে এল,—নিশ্চয়ই আসব রে। তোকে কখনও ভুলতে পারি আমি? শোন। ভালোভাবে থাকবি। দুষ্টুমিটা কমিয়ে একটু পড়ায় মন দিস। আর যাওয়ার ভাড়াটা নিয়ে যা।

—না স্যার। আমার কাছে আছে। সাবধানে যাবেন।

—তুইও সাবধানে যাস।

—ট্রেনটা দুলে উঠল। আস্তে আস্তে গতি বাড়িয়ে সমস্ত স্মৃতি পিছনে ফেলে এগিয়ে চলল নতুন জীবনের দিকে।

দেখতে দেখতে অনেকগুলো বছর কেটে গেল। ওদের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। নতুন স্কুল আর নাটক, এই নিয়েই মেতে আছি। এক সময় একটা নাটকের কল শোয়ে হঠাৎ আবার ঐ গ্রামে গিয়ে হাজির হলাম।

যেদিন পৌছলাম সেদিন দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর আমাদের নাটকের দলের সহ—অভিনেতা কাম বন্ধু ধীমানকে বললাম,—চল, একটু ঘুরে আসি।

—কোথায়?

—চল না একজনের বাড়ি নিয়ে যাব।

—তোর কোনো আত্মীয়?

সংক্ষেপে 'হ্যাঁ' বললাম ঠিকই, কিন্তু বুবাইয়ের সাথে আমার সম্পর্কটা যে ঠিক কী তা এখনও আমি ঠাওর করতে পারিনি।

রাস্তাঘাট আগের তুলনায় অনেত পাল্টে গেছে। এখানে—ওখানে দালান বাড়ি। রাস্তা মোরাম দিয়ে বাঁধানো। ট্রেকার চলছে। রাস্তায় ইলেকট্রিকের পোল। হেলথ সেন্টারটাও একেবারে নতুনের মতো। নতুন সাজে সেজেছে আমার ফেলে আসা সেই গ্রাম।

বুবাইদের বাড়ি যাওয়ার গলিটা গুলিয়ে ফেলেছিলাম। আচমকা পাঁচুদার সাথে দেখা। আমায় দেখেই একদম আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়ল। বলল,—আরে, স্যার আপনি!

—পাঁচুদা, কেমন আছো?

—ভালো। আপনি? কতদিন পর এলেন। আমাদের তো ভুলেই গেছেন।

—কী বলো পাঁচুদা! তোমাদের কী ভোলা যায়! আচ্ছা পাঁচুদা, আমি না বুবাইদের বাড়ি যাওয়ার রাস্তাটা ভুলে গেছি। তুমি একটু নিয়ে যেতে পারবে আমায়?

বুবাইয়ের নাম শুনে পাঁচুদা হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগল। ব্যাপারটা কী হল?

আমি জিগ্যেস করলাম,—ও পাঁচুদা! কী হল কী তোমার?

কাঁদতে কাঁদতে পাঁচুদা বলল,—ওহোঃ আপনি তো জানেনই না। জানার কথাও নয় আপনার। আপনি যেদিন চলে গেলেন সেদিন বাসের ছাদে উঠে বুবাইও আপনার সাথে আপনার লাগেজ পৌঁচ্ছে দেওয়ার জন্য যাবে ঠিক করেছিল। বাসের ছাদে ঠিকই উঠেছিল। কিন্তু মাঝ রাস্তায় কোনোরকম ঝাঁকুনির বেকায়দায় পা স্লিপ করে চলন্ত বাসের ছাদ থেকে পড়ে যায় ও। মাথায় বীভৎসভাবে চোট লাগে। খুলি ফেটে যায়। রক্তে চারপাশ ভেসে যায়। স্পট ডেড। বাস ফুল স্পিডে থাকায় বাসের কেউ বুঝতে পারেনি।

আবার কাঁদতে শুরু করে পাঁচুদা। কথা শুনে আমি হতভম্ব হয়ে মাঝ রাস্তায় থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম। সারাশরীর একদম অবশ হয়ে পড়ল আমার। মাথাটা ঘুরে উঠল একবার। মনে হল যেন আমার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। এত সবের মধ্যেও আমার গা—টা শিরশির করে উঠল। একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে এল শিরদাঁড়া বেয়ে। তবে ওইদিন আমার সাথে স্টেশনে কে এসেছিল?

সম্বিত ফিরে পেলাম ধীমানের ধাক্কায়। গ্রামে আমার আসার খবর ছড়িয়ে পড়েছে। আমার সাথে দেখা করার জন্য চারপাশে ভিড় হয়ে যায় নিমেষেই। চারপাশে কত লোকের কত কথা। সব কথা ছাপিয়ে আমার কানে শুধু বেজে চলেছিল একটাই কথা।

'স্যার, সাবধানে আসবেন।'

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%