অতৃপ্তি

কৌশিক কারক, আকাশ চন্দ, উৎস ভট্টাচার্য

বয়স পনেরো তখন ছুঁয়ে গেছে, ছেলেমানুষি ভাবটা কখন চলে গিয়ে আমার মধ্যে আলাদা একটা গাম্ভীর্য ভাব এনে দিলো, তখন থেকে আয়নায় যখন দেখি গোঁফের রেখা দেখা দিতে শুরু করেছে। মনও তখন দুরন্ত হয়ে চলে যেতে চাইতো, যেন যেখানে শুধু আমোদ প্রমোদে কাটিয়ে দিতে পারতো সারাবেলা। বয়স, সে আর চায় না একাকী চার দেওয়ালে বন্দি হয়ে থাকতে, কিন্তু শাসন! সে তো ভীষণ কড়া। তাই চুপ করে রাখতে হতো নিজেকে। তবে স্বাধীনতা নিশ্চয়ই ছিলো, লেখাপড়া ছাড়া বন্ধুদের সাথে মেলামেশা, খেলাধূলা, আরো কিছু। সুতরাং কোনও বন্ধুর বাড়ি গিয়ে কিছু সময় কাটিয়ে আসতে বাড়ির অভিভাবকরা খারাপ চোখে দেখতেন না। কারণ পড়াশোনা, ভালো রেজাল্ট করা এটা ছিলো আমার একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ।

একদিন দিনক্ষণ মনে নেই, বন্ধুদের সাথে ফুটবল খেলে বাড়ি ফিরছিলাম। সেদিন কেন জানি না খেলায় মন ছিলো না। তাই খেলা শেষ হবার আগেই মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম। রাস্তায় রজতদার সাথে দেখা।

রজতদার সাথে আগে থেকেই আলাপ পরিচয় ছিলো। আটাশ—ত্রিশ বছর বয়স, মাঝারি চেহারা, লম্বায় বেশী না হলেও সাড়ে পাঁচতো হবেই। তামাটে গায়ের রঙ, সব মিলিয়ে ঠিকই দেখতে। কথাবার্তায় একটা খর্ব ভাব লক্ষ্য করা যায়। বিয়ে করেছেন বছর খানেক হলো। যদিও রজতদা নয়, অন্যের মারফত শোনা কথা। এছাড়া রজতদা কি করেন জানিনা। উনিও বলেননি। তবে ওনার পোশাক পরিচ্ছদে বোঝা যায় আয় নেহাৎ কম নয়, তবে বন্ধুমহলে শোনা কথা কি একটা বিজনেস করেন। কি বিজনেস তাই নিয়ে আর কথা ওঠেনি।

সেই রজতদা একপ্রকার জোর করে তাঁর বাড়িতে নিয়ে গেলেন। অত করে বলতে না বলতে পারিনি। তাছাড়া আমি জানি ঠিক সময় মতো বাড়ি ফিরতে পারবো, কারণ খেলার মাঠে আমি বেশি সময় দিইনি।

ছোটখাটোর ওপর সুন্দর দোতলা বাড়ি। এ রাস্তার ধারেই সম্পূর্ণ সে এবং তাঁর স্ত্রী, দোতলায় জানি না কারা, অবশ্য জানি ওনারা দুই ভাই। রজতদা ছোটো।

প্রথম দেখাতেই আমি ভাবতে থাকি, আমার এই বয়সেই এরকম মসৃণ লিটল চেহারায় লালিত্য ভরা রূপ কি আমার এই প্রথম দেখা? হয়তো তাই, মেদ শূন্য ওরকম চেহারা যা এক নজরে অন্তস্থল হতে বলে এবং তোমায় বারে বারে দেখি, যা আমার বান্ধবীদের মধ্যে খুঁজে পাইনি। রজতদার স্ত্রী বিছানায় বসেছিলেন। আমি দাঁড়িয়ে থাকায় রজতদাই বললেন, ''কিরে দাঁড়িয়ে থাকবি? বস।''

ঘরে যদিও চেয়ার ছিলো, আমায় উশখুশ করতে দেখে রজতদাই বললেন, ''আমি চেয়ারে বসছি। তুই তোর অনু বৌদির কাছে খাটেই বস, লজ্জার কিছু নেই।''

আমি জড়সড় হয়ে বসতে অনু বৌদি ধীর মিষ্টি স্বরে বললেন, 'এ তো ছেলেদের মানায় না। তাই বলছি একটু স্মার্ট হয়ে বসে বলতো তোমার নামটা, যদিও জানি তোমার রজতদা তোমার নাম জানে, তবু তোমার নাম তোমার মুখ থেকে শুনতে নিশ্চয়ই ভালো লাগবে আমার।''

নাম বলতেই অনু বৌদি উচ্ছ্বাসে বললেন, ''আদর! আদর তোমার নাম।''

তারপর স্মিত হেসে বললেন ''অবশ্যই এ নামটি আমার পছন্দ হয়েছে বলতে হয়, কারণ অমন চেহারা দেখলে কে না আদর না করে থাকতে পারে।''

আমি লজ্জায় মাথা নত করতে রজতদাই হাসতে হাসতে বললেন, ''দুর বোকা। তোর অনু বৌদি ভুল বলেনি।''

তারপর অনু বৌদিকে বললেন ''তোমরা কথা বলো, আমায় বেরোতে হচ্ছে'', রজতদা নির্বিকার মুখে আমাকে বললেন, ''চলি রে, ইচ্ছে হলে চলে আসবি, আমি না থাকলে তোর অনু বৌদির সাথেই না হয় কিছুক্ষণ গল্প করে চলে যাবি। এতে দ্বিধার কোনও কারণ নেই।''

রজতদা চলে যেতে আমিও উঠে দাঁড়াই। অনু বৌদি বললেন, ''তুমি উঠলে কেন? তোমার সাথে ভালো করে আলাপই হলো না।''

তারপর ঈষৎ ভ্রূজোড়া কুঁচকে বললেন, ''আমায় বুঝি অসহ্য লাগছে?''

আমি ইতস্তত হয়ে বললাম, ''না না আমার খুব ভালো লাগছে।''

আমার উত্তর শুনে কি জানি অনু বৌদি উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়লেন। তারপর হাসি থামিয়ে মিষ্টি করে বললেন, ''ভালো যদি লাগে তাহলে তাকে তো দেখতেই হয়। সুতরাং সময় পেলেই চলে আসবে, আর আমায় আপনি নয় তুমি বলবে, আমি তুই বলবো। আর যা বলতে চাইছি, মোবাইল ব্যবহার করিস?

বললাম, ''ঐ মায়েরটা একটু আধটু। তবে কিছুদিন পরে ভাবছি মাকে বলে কেনা যায় কিনা।''

অনু বৌদি তার উত্তরে বললেন, ''এখন দরকার নেই।''

তারপর থেকে অনু বৌদির সাথে দেখা করা, গল্প করা প্রায়দিনই হতো, রজতদার দেখা খুব একটা পেতাম না। পেলেও রজতদা এতোই বিজি থাকতেন যে দু—চার কথাবার্তার পর বলতেন ''তোরা কথা বল। আমায় বেরোতে হচ্ছে।''

আমার জীবনের মোড় জানিনা কিভাবে যেতে চলেছে, যদিও আগের সেই বন্ধুদের সাথে আড্ডা, খেলাধূলা, সময়মতো পড়াশুনা সবই ছিল রুটিন মাফিক। তবে মাঝে মধ্যে অনু বৌদির সাথে দেখা করাটা আমাকে বাধ্য করাতো। এর কারণ আমি নিজেও হিসেব মেলাতে পারিনি। কিন্তু যখন অনু বৌদির সামনাসামনি হয়ে বসে ওর মুখের দিকে তাকাই তৎক্ষণাৎ মনে হতো আমার শূন্য হৃদয় পূর্ণ করার বাসনায় হাত বাড়িয়ে দিই, যদি কিছু পাই, পরমুহূর্তে মনে হতো তোমার পেলব হাসিটিই আমার বড় পাওনা। জানি না তোমার ঐ হাসির মধ্যে কত কথা জমা রয়েছে, হয়তো একদিন যাবো জেনে, তবে এক এক সময় কিছুক্ষণের জন্যে মনের অন্তস্থলে একটা উষ্ণ হাওয়া বয়ে আমার সারা শরীর কেমন যেন করে দিতো। তারপর হাওয়াটাই আপনাআপনি যেতো থেমে।

অনু বৌদি তাঁর পদ্মের ন্যায় চোখ দুটি বড় করে বলতো ''কি দেখছিস হাঁ করে বোকার মতো, এই নে আরো সামনে এসে বসলাম। ভালো করে দেখে।''

আমি স্বলজ্জ হাসিতে শুধু চেয়েই থাকতাম। ভাবতাম জানিনা আমার অন্তর আর ইচ্ছায় কি চায়। শুধু অনু বৌদিকে ভালো লাগাটাই একগুচ্ছ তাজা ফুলের মিষ্টি গন্ধটাই আমার উঠতি যৌবনে সব পাওয়া? না আরও কিছু বাকি রয়ে গেছে। মন বলে থাক, জোয়ার এখনও দূরে। এটাই ভালো।

একদিন অনু বৌদির ঘরের সম্মুখে দেখি দরজার পাল্লা আধ ইঞ্চি মতো ফাঁক। বুঝলাম ভেতর থেকে বন্ধ করা হয়নি। কলিং বেলের সুইচ টিপতেই অনু বৌদির গলা শোনা গেল, ''কে?''

নাম বলতেই অনু বৌদির গলা শোনা গেল, ''ভুলে গেছি বন্ধ করতে, চটপট ঢুকে দরজা বন্ধ করে দে, ঘর অন্ধকার দরজার বা পাশে সুইচ বোর্ড আছে, সুইচটা অন করে বসবি।''

আলো জ্বেলে দেখি খাটে তুতে রঙের চাদর বিছানো তার ওপর উবু হয়ে শুয়ে অনু বৌদি। পরনে নীল রঙের শাড়ি প্রায় জানু বরাবর, নীল ডিপ ব্যাক ব্লাউজ।

আমি চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে, দৃষ্টি অনু বৌদির সুঠাম দেহখানির মধ্যে, মনের ভেতরটা কেমন যেন হঠাৎ কিসের আশায় ছটফট করতে লাগলো, এক স্বপ্নের ঘোরে চলে গেলাম নির্জন কোনো স্থানে, সেখানে শুধু আমি আর অনু বৌদি।

অনু বৌদি ওইভাবে শোয়া অবস্থায় বললো, ''কিরে আমি কি তোর কড়া টিচার যে তোকে দাঁড় করিয়ে মজা দেখবো? খাটেই বস।''

আমি বসতেই উজ্জ্বল হাসিতে অনু বৌদির সারা অঙ্গ ওঠা নামা করতে লাগলো। আমি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকি। আমার সারা অঙ্গ জুড়ে কেমন করতে থাকে, মাথাটা ঝিমঝিম করতে থাকে, ভাবছি অনু বৌদির হঠাৎ ঐভাবে হেসে ওঠার কারণ কি? এর অর্থ বুঝবার আগেই অনু বৌদি বললো ''আদর। পিঠের এখানটায় একটু টিপে দিবি? দে না, ভীষণ কষ্ট হচ্ছে।''

আমি কি করবো, বুঝতেই পারছি না। একটা ভয় মনের মধ্যে যেন কাকে দাবিয়ে রাখতে ব্যস্ত। যৌবন, দ্বার খুলে বেরিয়ে আসতে চায়। যদি ঘটে যায় কোন অঘটন? হঠাৎ কখন অজান্তে অনু বৌদির মসৃণ পিঠে আমার হাত ওঠানামা করতে থাকে বুঝিনি। এরপর খেয়াল হতে হাতটা সরিয়ে অনু বৌদি বললো, ''থামলি যে?''

বলে উঠে বসলো। তারপর গালটা টিপে দিয়ে বললো, ''সঙ্কোচ হচ্ছে বুঝি?''

বলে আমাকে হঠাৎ জড়িয়ে ধরলো। তারপরই নিজের হাত দুটো আবার আমার শরীর হতে ছাড়িয়ে ঠিক হয়ে বসলো। তাকালো আমার দিকে, আমি তখন এক নিষ্পাপ নারীকে দেখি, যার চোখে জল।

অনু বৌদি হেসে বললো, ''তোকে জড়িয়ে ধরতে অবাক হয়ে গিয়েছিলি না?

ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে ভাবছিলি এবার কি হবে? তারপরেই বললো, যা হবার হতো, কি রে বলনা।''

আমি শান্ত গলায় বললাম, ''তোমার চোখে জল কেন?''

অনু বৌদি ম্লান স্বরে বললো, ''মনে মেঘ জমেছে, জলের ধারা ভাই। সবকিছু পাওয়ার পরেও একটা বড় আবদার থেকে যায় বুঝলি? সেটিই হলো নারীর শ্রেষ্ঠ কিছু পাওয়া।''

আমি না বুঝেই বললাম, ''হয়তো সত্যি।''

অনু বৌদি বললো, ''এবার যেদিন আসবি তোর সাথে এক মজার খেলা খেলবো।''

অনু বৌদির বাড়ি কয়েকদিন যাওয়া হয়নি। এদিকে ঠিক হল দেশের বাড়ি যাওয়া হবে। ঠিক হলো পরশু অর্থাৎ শুক্রবারই দুপুরে যেতে হবে। একদম গ্রাম, স্টেশন থেকে শুধু ভ্যান বা গরুর গাড়ি আছে। তাই দুপুরের আগেই খেয়েদেয়ে বেরিয়ে পড়তে হবে। নাহলে পৌঁছতে পৌঁছতে রাত হয়ে যাবে। আমি ছোটবেলায় বারদুয়েক গিয়েছি ঠিকই, কিন্তু এখন যাওয়ার মজাটাই আলাদা। ওখানে মেঠো রাস্তায় বিজলী বাতি থকলেও সে অলো এতই ম্রিয়মাণ যে অন্ধকার হলেই সব ঝপসা দেখায়। আলোর ওপাশে কে বা কারা কিছুই বোঝা যেত না।

সেদিন ভোরে ঘুম ভাঙার পর থেকে কেন জানিনা অনু বৌদিকে একবার দেখার জন্যে মনটা ছটফট করতে লাগলো। উদ্দেশ্য কিছুই না, কিছুক্ষণ কথা বলে আনন্দ পাওয়া। তার কথা বলার ধরণটাই আমার কাছে অন্য মেয়েদের থেকে অনেক আলাদা, আনন্দদায়ক। যে কথার ভাষায় আবার আনন্দ দেয়।

সকাল নটার সময় মাকে অজুহাত দিয়ে বেরিয়ে গেলাম। মাত্র দশ মিনিটের হাঁটা রাস্তা। একটু কথা বলে চলে আসবো, দেশের বাড়ি যাবার কথাটাও বলা হয়ে যাবে।

সেখানে গিয়ে দেখি বাড়ির সামনে কিছু মানুষের জটলা। সেখানে সবাই ফিসফিসিয়ে আলোচনা করছে। আবার কয়েকজনকে দেখলাম অনু বৌদির ঘরের জানালা দিয়ে উঁকি মারতে। জানি না কি উদ্দেশ্যে উঁকি মারা হচ্ছে? আমার বুক ঢিপঢিপ করতে লাগলো। ভাবছি নিশ্চয়ই মারাত্মক কিছু ঘটেছে। একসময় ভয়ে ভয়ে আমিও এগিয়ে গেলাম সেদিকে। তখনো বুক ঢিপঢিপ করছিলো।

একজনকে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞসা করলাম, 'কি হয়েছে?''

যাকে বললাম হয়তো আমার চেয়ে কিছু বড়ো হবে। উত্তরে বললেন, ''জানালার পাল্লা ভেজানো থাকলেও সামান্য ফাঁক দিয়ে যা দেখলাম, গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছে। দুজনের মধ্যে বনিবনা ছিল না। তাই গলায় ফাঁস লাগিয়েছে।''

বুকটা ছ্যাৎ করে উঠে সারা শরীর কেঁপে উঠলো। ভয়ে তোতলিয়ে বললাম ''কে?''

উনি বললেন, ''আমি কি করে জানবো? তবে আধো অন্ধকার ঘরে যেটুকু দেখে বুঝলাম মহিলা। তাও পেছন থেকে দেখেছি। সামনেটা দেখলে তবুও চেষ্টা করতাম চিনি কিনা। তাছাড়া ওই জটলার মধ্যেই বলাবলি করছিলো কারা, বনিবনা হচ্ছিল না, তাই স্ত্রীর আত্মহত্যা। তবু একবার সন্দেহ দূর করার জন্য দেখা, মহিলা না পুরুষ। অনেক সময় উল্টোও হয়তো। চলি পুলিশ এলে আবার ঝামেলা।''

উনি চলে গেলেন। আমার মনে ওই অবস্থাতেও ইচ্ছে হলো সত্যি কি অনু বৌদি আত্মহত্যা করেছে। তাকে যখনই দেখেছি তখন কি এমন কিছু দেখা গেছে তার মধ্যে যে নিজেকেই শেষ অব্ধি এই পথটা বেছে নিতে হলো? তবে কি তার চোখে ফোঁটা ফোঁটা জলের মধ্যেই ছিলো তার জীবনের আত্মকথা, যা আমি আগে বুঝিনি? জানলার সামান্ ফাঁক দিয়ে আবছা আলোয় ঝুলন্ত অবস্থায় যাকে দেখলাম সে অনু বৌদি ছাড়া আর কেউ নয়। গলায় কাপড় জড়িয়ে আত্মহত্যা। শরীর মন মিলিয়ে আমার যে কি অবস্থা ছিল আমি নিজেই জানি না। মনের মধ্যে শুধু একটা কথাই গুমরে গুমরে উঠছিলো—অনু বৌদি তোমার মিষ্টি স্বরে আদর করে বলে, এমন মিষ্টি স্বর আর কার অন্তর হতে বেরিয়ে এসে থাকতে পারে। বুকে এক অব্যক্ত যন্ত্রণা নিয়ে এক অথর্ব বৃদ্ধের মতো আমি বাড়ি ফিরলাম।

সেদিন ভগ্ন হৃদয়ে ট্রেনে চাপলাম আমি। বিকেলে ট্রেন থেকে নামলাম। গুটিকয়েক লোক সেখানে। শীতের বিকেল। তাই বাবা ভ্যান ডাকতে গেলেন তাড়াতাড়ি। আমি তখন চোখ বুজে দেখছি সেই দৃশ্য। এ ব্যথা কারুর কাছে বলার নয়। ভাবতে ভাবতেই হঠাত মেয়েলি স্বরের আওয়াজে আমি চমকে উঠে তাকালাম।

''আদর। এই তো আমি।''

কেউ নেই। আমি অস্থির হয়ে গেলাম। দুজন মহিলা ঘোমটা মাথায় দাঁড়িয়ে। তাদের মধ্যে কেউ? কিন্তু আমার এই নামে যে আর কারুর অধিকার নেই। আমি ভাবছি এমনসময় আমার শরীর আবার কেঁপে উঠলো। সেই মিষ্টি গন্ধ। এ একমাত্র তার গন্ধ। কিন্তু সে তো আর নেই। আজ সকালেই তাকে আমি দেখে এসেছি শেষবারের মতন।

এমন সময় বাবা ভ্যান গাড়ি নিয়ে এলেন। সম্ভবত বাবার চেনা। নাহলে বাবা তাকে নাম ধরে ডাকবেন কেন?

ভ্যান চলতে থাকে। বাবা আর মা চালকের দুপাশের সিটে আর আমি পেছনে বসে পা ঝুলিয়ে বসেছি। চালকের নাম ধীরেন, বাবা ওই নামেই ডাকছিল। কিছুটা যাবার পরেই ঝপ করে সন্ধ্যে নেমে এলো। এখানে সন্ধ্যা মানে ঘন নির্জন মেঠো রাস্তা, পাশে অন্ধকার ঝোপঝাড়, জোনাকির আলো আর বড় বড় তালগাছ। শোঁ শোঁ হাওয়ার সাথে গাছে ডালপালা আর আর পাতার খসখসানিতে একটা অদ্ভুত ধ্বনির আভাস আসছিল কানে। কখনো পথ চলতি দু একজন লোককে দেখা যাচ্ছিলো হাতে টর্চ নিয়ে কিন্তু তা ক্ষণিকের জন্য। তারপর আবার সেই ঘন অন্ধকার আর ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক।

হঠাৎ রাস্তার ধার থেকে আমার কানে ভেসে এলো তীক্ষ্নগলার মেয়েলি স্বর, ''আমি আসছি আদর। কষ্ট পাস না। তুই যে আমার ভালোলাগা আদর।''

আমার তৎক্ষণাৎ লোমকূপ খাড়া হয়ে উঠলো, কাঁপা কাঁপা স্বরে বলে উঠি, ''কে—কে তুমি?''

মা'ও চমকে উঠে বললো, ''কী হল? ভয় পেলি কেন? কাকে 'কে' 'কে' বলে জিজ্ঞেস করছিস? আমিই ত তখন থেকে ডাকছি।

কাঁপা কাঁপা স্বরে আমি বললাম, ''তুমি? তুমি আমায় ডাকছিলে? কিন্তু গলার স্বরটা যে...''

মা রাগত স্বরে বললো, ''কি আবোল—তাবোল বকছিস?''

মায়ের গলার স্বর কি পাল্টে গেল? ঐ গ্রাম রাস্তার অন্ধকারে গাটা কেমন ছমছম করে উঠলো আমার। বাবাও মায়ের কথায় সায় দিয়ে বললেন, ''ছাড়ো ত! যতসব মনের ভুল।''

মৃদু স্বরে বললাম, ''হবে হয়তো!'' কিন্তু মনে মনে বললাম, ''মা। তোমার স্বর যদি আমি ভুলে যাই, তবে আমার জন্ম, আমার বড় হয়ে ওঠা, সব বৃথা। কিন্তু স্বর আমার কানে এসে বাজলো, সেই স্বর আমি ভুলি কী করে? ও যে আমার ভালো লাগার অনু বৌদি। যার কণ্ঠস্বর এখন আমার কাছে দারুণ আতঙ্কের কারণ।'' আমি ভ্যানের ওপর পা তুলে বসলাম। আমার চোখমুখের অবস্থা তখন যেমনটা দেখাচ্ছিল, সেটা যদি সেই অন্ধকারে আমার মা দেখতে পেতো, তাহলে হয়তো মা'ও চিন্তান্বিত হয়ে উঠত। বাবাও চিন্তায় পড়ে যেতেন এটা ভেবে যে ঠিক কী নিয়ে ছেলে এতটা শঙ্কিত হয়ে উঠেছে।

ভয়টা কিছুতেই কাটছিল না। অন্ধকার রাস্তার দুপাশে হেলানো গাছগুলো হাওয়ায় নড়াচড়া করলেই বারে বারে চমকে উঠছি। বুকের ঢিপঢিপ শব্দ আরো বাড়তে থাকে। ভাবছিলাম মায়ের গা ঘেঁষে বসলেই বোধহয় ভালো হতো, মা'ই বললো, ''ভ্যান চলছে—উঠতে যাস না, হাত দিয়ে চাপ দিতে দিতে আমার কাছে এসে বস।'' ইচ্ছে থাকলেও বললাম, ''এই ত কাছাকাছিই আছি তোমার। আমি ঠিক আছি।''

ভ্যান চালাতে চালাতে ধীরেনদা আমায় বলল, ''দাদাবাবু! আমি দু'একবার শহরে গেছি—সেখানকার রাস্তাঘাটে রাত দিন বোঝাই দায়। দিন রাতের তফাৎটা এখানে—সন্ধে হতেই রাত নেমে আসে ঝপ করে। রাস্তায় মানুষজনও থাকে গুটিকতক। তাও বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া কেউ বেরোয় না। তবে ভয়ের কিছু নেই। এই গ্রামের মানুষজন আর যাই হোক, খারাপ নয়। দোষ নেবেন না, আর একটা কথা—আপনার মা—ই আপনাকে নাম ধরে ডাকছিলেন।''

ধীরেনদার কথায় মা আমাকে মৃদু ধমক দিয়ে বলল, ''তোকে অনেকবার বলেছি ভূতের গল্প বই পড়া ছাড়। যত সব ভূতের বই পড়ে আর ভূতের সিনেমা দেখে। বারণ করলেও শোনে না।''

বাবা বললেন, ''আহা! ছেলেমানুষ। একটা সময়ে সব ঠিক হয়ে যাবে।''

মা বলল, ''খামোখা ভয় পাচ্ছিস। ভূত দেখার ভয় পাচ্ছিস—তাই ত? আরে বোকা অনেকে বানিয়ে বানিয়ে ভূত দেখার কথা বলে বটে, আবার অনেকে ভুলও দেখে। আসলে বিদেহী আত্মা বা ভূত বলে কিছু নেই রে। সব শোনা কথা। সব মিথ্যে। মারা যাওয়ার পর আর কোন অস্তিত্ব থাকে না।''

বাবা বললেন, ''তোমার কথা সম্পূর্ণত ঠিক নয়। সবক্ষেত্রে কিন্তু মিথ্যে নাও হতে পারে। কারণ আমি স্বচক্ষে দেখেছিলাম। সুতরাং—''

মা ঝাঁজাল গলায় বলল, ''তুমি থামবে? যত সব অলক্ষুণে কথা। কোথায় কখন কী বলতে হয়, জানে না!''

ধীরেনদা রাস্তার বাঁদিকে ভ্যান ফেরাতেই বাবা বললেন, ''এসেই গেলাম প্রায়—আর কিছু পথ গেলেই—''

আমি চুপ হয়ে বসে। চারদিক ঝাপসা অন্ধকার। আকাশে সরু একফালি বাঁকা চাঁদ। তার ক্ষীণ আলো আকাশেই যায় হারিয়ে। রাস্তার দুপাশের বড় বড় হেলানো গাছগুলোর ডালপালাগুলো হাওয়ার দাপটে দুলে উঠে একে অপরের সাথে জড়াজড়ি করে ঝুঁকে পড়ে, বিশ্রী শব্দ করে, রাস্তাটাকে ঢাকতে চাইছে যেন! মনে হল রাস্তাটাই এখন বিভীষিকা। রাস্তার দু'ধারে ঝোপঝাড়ের ফাঁকে ফাঁকে শুধু দেখা যায় বিন্দু বিন্দু জোনাকির আলো। আর আছে ভ্যানের পিছনে ঝোলানো লণ্ঠনের আলো। সে আলো অতি সীমিত। আমি চুপচাপ বসেই ছিলাম। বাবা আর ভ্যানচালক ধীরেনদার মধ্যে গ্রাম সম্পর্কিত কিছু আলোচনা চলছিল।

হঠাৎ সেই অন্ধকারে বুঝি কার একটা হাত, আমার হাত চেপে ধরল। সাথে সেই মিষ্টি গন্ধটা, যেটা একজনের শরীর থেকেই পেতাম। সেই হাতের স্পর্শে ছিল বরফের শীতলতা। আমার হাতটা চেপে ধরে সে ফিসফিস করে বলল, ''আদর! আমি এসেছি।''

আতঙ্কে আমার শরীর থরথর করে কাঁপতে লাগল। আমার চোখেমুখে আতঙ্কের অভিব্যক্তি আরো প্রকট হয়ে উঠল। গলা শুকিয়ে কাঠ। বাকশক্তি রুদ্ধ! অস্পষ্ট স্বরে কোনমতে বলে উঠলাম, ''না না তুমি নও। এ কোনমতেই হতে পারে না!''

আমার ভয়ার্ত আর্তনাদ শুনে বাবা—মা একসাথে বলে উঠলেন, ''কাকে কী বলছিস? কি হলো তোর?

ধীরেনদাও ততক্ষণে গাড়ি থামিয়ে দিয়েছিল।

মা বাবাকে বলল, ''তোমার ব্যাগ থেকে টর্চটা বের করে দেখতে পাচ্ছো না কী হলো?''

বাবা বললেন, ''টর্চ আনতে ভুলে গেছি। দাঁড়াও মোবাইলের ফ্ল্যাশ লাইটটা জ্বালি।'' বাবা গাড়ি থেকে নেমে আলোটা জ্বেলে চারপাশটা ভালোভাবে দেখে নিয়ে বললেন, ''কই গাছপালা ঝোপঝাড় আর আমরা বাদে, আর ত কেউই নেই!'' তারপর আমার দিকে আলো ফেলে বললেন, ''ওকি রে! তোর মুখটা অমন ফ্যাকাশে কেন? ভয় পেয়েছিস?''

আমি আতঙ্কিত স্বরে বললাম, ''হ্যাঁ, আমার মনে হল, কে যেন আমার হাত চেপে ধরেছে...''

মা আমার কাছেই ছিল, আরো কাছে এসে মাথায় ঘাড়ে হাত বোলাতে বোলাতে বলল, ''কী হয়েছে? শুধু শুধু ভয় পেয়ে আমাদের ঘাবড়ে দিচ্ছিস। বল কি হয়েছে?''

''একটা হাত—বরফের মতো ঠাণ্ডা, আমার হাতটা চেপে ধরেছিল—আমি স্পষ্ট অনুভব করেছি...'' আমি কাঁপা কাঁপা স্বরে বলে উঠলাম।

মা বলল, ''কী যা—তা বকছিস! এখানে আমরা ক'জন ছাড়া আর কে—ই আছে? আমিই তোর হাত ধরেছিলাম—অন্ধকারে ভেবেছিস অন্য কেউ। আসলে ভয় পেতে পেতে ভয়টাই তোকে পেয়ে বসেছে। যতো সব মনের ভুল। আর গ্রামগঞ্জে খোলামেলা জায়গায় ফাল্গুন মাসেও রাতের দিকে ঠাণ্ডা হাওয়া দেয়। এই দেখ আমাদের সবাইয়ের হাত কেমন ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। এই দেখ তোর পায়ে হাত দিচ্ছি, বল ঠাণ্ডা লাগছে কি না! হাঁদা একটা! বয়স বাড়ছে, কিন্তু বুদ্ধি খুলছে না। এখনো ছেলেমানুষী ভয় রয়েই গেছে।''

আমার খুব ইচ্ছে হল সত্যিটা বলি। বলি, ''মা! ও হাত তোমার কেন, কোন জীবিত প্রাণীরই নয়! ঐ হাত অনুবৌদির বিদেহী আত্মার। যে আত্মহত্যা করার পরও, এখনো, আমার কাছে কাছেই থাকে। সে যখন জীবিত ছিল, তাকে আমি পছন্দ করতাম। কিন্তু এখন দারুণ আতঙ্কে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছি আমি।''

আতঙ্কে এমনই অবশ হয়ে পড়েছিলাম যে, মনের কথা মনেই রয়ে গেল, মুখে কিচ্ছুটি বলতে পারলাম না আমি।

ধীরেনদা আবার প্যাডেলে চাপ দেয়। গাড়ি চলতে লাগল উঁচু নীচু মেঠো রাস্তার উপর দিয়ে। সাবধানে ধীরে ধীরে চালাচ্ছিল ধীরেনদা। এক সময় গন্তব্যে পৌঁছে আমাদের দেশের বাড়ির সামনে ভ্যান থামাল ধীরেনদা।

ভ্যানে থাকতেই বাবা, তাঁর ছোটদাদুর ছেলে বীরেন কাকাকে জানিয়ে দিয়েছিলেন। দাদু যখন মারা গেছিলেন, বাবার যখন অল্প বয়স। ঠাকুমাও বছর দুয়েক হল গত হয়েছেন। ছোটদাদু আমার দাদুর ভাই। তাঁর ছেলে বীরেন কাকা বাবার চেয়ে বছর দুয়েকের ছোট। গ্রামেরই একটা হাইস্কুলে শিক্ষকতা করেন উনি।

ভ্যান থেকে নেমেই দেখি বীরেন কাকা—কাকিমা, খুড়তুতো ভাই তন্ময় আর বোন তানিয়া—সবাই মিলে অপেক্ষা করছে। প্রথমেই বীরেন কাকা এসে বাবার হাত ধরলেন। কাকিমাও আমার সাথে টুকটাক কিছু কথা বলে, মা—কে নিয়ে সদর দরজার দিকে এগোতে থাকেন। দু'জনের মথ্যেই কথাবার্তা, হাসির উচ্ছ্বাস। আমি তখনো দাঁড়িয়ে, যদিও তন্ময় ও তানিয়া সামনেই ছিল, তবুও বাড়ির বাইরের চারপাশটা দেখতে দেখতে কেবলই মনে হচ্ছিল, এই বুঝি কেউ পিছন থেকে নাম ধরে ডাকলো!

''আদর।''

ভয়ে ভয়ে তাকিয়ে বললাম, ''সব কেমন আছো?''

তানিয়ার বয়স এগারো হলে কি হবে, চটপট জবাব দিল, ''আমি আর দাদা ভালো। তুমি আসতে আরো ভালো লাগছে। কিন্তু রাতে দাঁড়িয়ে চোখ এদিক—ওদিক ঘোরালেও কিছু দেখবে না বুঝবে? না ঝোপঝাড় দেখে ভাবছো এই বুঝি কেউ এলো?''

আমি চমকে বললাম, ''না, কাকে দেখবো? কে আসবে?''

তনিয়া হেসে ফেলল, ''কি ভীতু!''

তন্ময় বলল, ''চলো দাদা, ভেতরে যাই। সবাই তোমাকে দেখবে বলে ব্যস্ত।''

বাড়ির দোরগোড়ায় এক বিজলী বাতি জ্বলছিল, তাতে সামনের কিছুটা দেখা গেলেও চারপাশ সেই আলোআঁধারির মতো রয়ে গেছে। অনেকখানি জায়গা নিয়ে দোতালা বাড়ি, বাবার ঠাকুর্দা এই বাড়ি তৈরি করিয়েছিলেন। মোটা ইটের গাঁথনির দেওয়াল, বড় বড় ঘর। নীচের বৈঠকখানা আরো বড়। ওখানে বসেই বাবা—মা ছোটদাদু এবং বাড়ির অন্যান্য সবাই মিলে নানা বিষয় নিয়ে কথা বলছিল। ওখানে দুটো বাতি জ্বলছিল কিন্তু তার আলো এমন বেশি কিছু নয়। তন্ময়কে জিজ্ঞেস করায় ও বলল, এখানে ভোল্টেজ এরকম কমই থাকে, তাই এমনি হয়। গল্প—গুজব অনেকক্ষণ চলল, সাথে চা জলখাবার। রাতের ডিনার খেতে প্রায় সাড়ে এগারোটা বেজে গেল।

ছোটদাদু একবার মজা করে বলল, ''কি আর খেলে দাদুভাই।''

আমি বললাম, ''খাওয়াটা কম নয়, বরং বেশিই হয়েছে।''

দাদু একগাল হেসে বললেন, ''বেশ। তাহলে খাওয়া নিয়ে আর কোনো কথা নয়, এবারে যাই শুতে। তোমরাও যে যার শুয়ে পড়ো।''

দোতালায় তন্ময়ের ঘরেই আমাদের দুজনের শোবার ব্যবস্থা হয়েছে। বন্দোবস্ত সবদিক থেকে ভালো। খাটের পাশেই জানালা। আমি আর তন্ময় কিছুক্ষণ কথাবার্তা বললাম। পড়াশোনা নিয়ে কিছু সময় গেল। তারপর শুয়ে পড়লাম। তন্ময় ঘুনিয়ে গেলেও আমার চোখে ঘুম নেই। ভয়, এই বুঝি ঠাণ্ডা হাত আমায় চেপে ধরল। ওই বুঝি সামনে এসে 'আদর' বলে ডেকে উঠল। ওই অন্ধকার ঘরে শুয়ে বুঝতে পারছি আমার মধ্যে ভয়ংকর কিছু চেপে আমাকে মৃত্যুমুখে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। মনকে কিছুতেই স্থির করাতে পারছিলাম না। স্টেশন থেকে আসার পথে যা কিছু ঘটেছে সবই কি আমার দুর্বলতা! আসলে কিছুই নয়, অনুবৌদিকে নিয়ে বেশি ভাবার জন্যই কি এসব?

দেয়াল ঘড়িতে তখন রাত্রি দুটোর ঘন্টা। চোখে আমার ঘুম নেই। মনের মধ্যে কি যেন দুপদাপ করে চলেছে। জানালার বাইরে থেকে পাতার খসখসানি শব্দ শুনে চমকে চমকে উঠছি। এই বুঝি জানালা খুলে কেউ ঠাণ্ডা হাত বাড়িয়ে দেয়।

রাতে একবার ক্লান্তিতে আমার চোখের পাতা প্রায় বুজে এসেছে সেইসময় মশারির বাইরে থেকে আমার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, ''আদর, এই দেখ আমি এসেছি। আয় আমার কাছে আয়।''

আমি কাঁপতে কাঁপতে অস্ফুট স্বরে চেঁচিয়ে উঠি, ''কে? কে?''

উঠে বসেই আমার চোখ চলে যায় জানালার দিকে। এখন সেটা খোলা। তার সামনে আমার দিকে পেছন ঘুরে একজন মহিলা দাঁড়িয়ে। তার গলায় কাপড় জড়ানো। দেখে ভয়ে আমার সারা শরীর থরথর করে কাঁপতে লাগল। জিভ ভয়ে আড়ষ্ট। কথা বলার শক্তি হারিয়েছি আমি। আমি বুঝতে পেরেছি এ অনুবৌদির বিদেহী আত্মা, মরার পরেও আমার সঙ্গে ছাড়েনি, পেছন পেছন এসেছে এইখানে।

আমি কোনোরকমে কাঁপা কাঁপা গলায় বললাম, ''প্লিজ, অনুবৌদি। তুমি আর আমাকে কষ্ট দিও না। তুমি যাও। আমাকে বাঁচতে দাও।''

আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলার আগে দেখি অনুবৌদি ডান হাতটা ওপরে তুলে নাড়তে নাড়তে মিলিয়ে গেল। জ্ঞান ফিরতে দেখি বাবা, বীরেন কাকা, ছোট দাদু সবাই খাটের সামনে দাঁড়িয়ে আমাকে দেখছে। মা আমার মাথার কাছে বসে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।

ছোটদাদুই প্রথমে বলল, ''দাদু ভাই, এখন শরীর কেমন আছে? কি দেখে ভয় পেয়েছিলে?''

এর উত্তর জানা থাকলেও বললাম, ''ও কিছু নয়। এখন ঠিক আছি।''

মা বলল, ''ছেলেটা আমার সেই ভ্যান গাড়িতে ওঠার পর থেকেই ভয় ভয় করে গেল। কি জানি, এমনতরো হয়নি আগে।''

তন্ময় বলল, ''একটা ব্যাপার কিছুতেই মাথায় আসছে না। তোমার আওয়াজে আমার ঘুম ভেঙে যেতে শুনি তুমি বিড় বিড় করে কিসব বলছ। আর জানালাটাই বা কে খুলল? আবার নিজে থেকেই বা বন্ধ হলও কি করে? তুমি কি দেখেছ?''

এর উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। অনুবৌদি নামে এক মহিলা, যে আমার ভালোলাগা এক নারী, যার হাসি, কথা বলা, কাছে মুখোমুখি হয়ে বসা, সবই ছিল আমার কাছে অদ্ভুত কিছু, হয়তো আরো কিছু—

আমায় চুপ করে থাকতে দেখে বীরেন কাকা বলল, ''থাক, এখন ও বিশ্রাম করুক। পরে শোনা যাবে।''

তানিয়া বলল, ''গরম একটু দুধ খাবে দাদা?''

হেসে বললাম, ''আমি ঠিক আছি।''

মনে মনে বললাম, অনুবৌদি আর কোনোদিনই আমার আদরের নাম ধরে ডাকবে না। আমার মুখোমুখি দাঁড়াবে না। তার বিদেহী আত্মা শেষ বিদায় জানিয়ে চলে গেছে স্বর্গ বলে যদি কোন জায়গা থেকে থাকে, সেখানে। কারণ আমি জানি সে নিষ্পাপ এক নারী, যে বলেছিল অনেক পাওয়ার পরও একটা বড় আবদার থাকে যার সাথে কোনো কিছুর তুলনা চলে না। অবশ্য একটা কথা চিরকাল মনে থাকবে, আমার সাথে মজার খেলাটা কি? কি উদ্দেশ্য, বা কেন সে বলেছিল একথা?

জানি না, তবে এটুকু জানি, অনুবৌদি আমাকে ভালোবাসতেন। মা'র অনিচ্ছা সত্ত্বেও দেশের বাড়িতেই সবার সাথে কয়েকটা দিন গল্প আনন্দ করে কাটিয়েছি। অনুবৌদির বিদেহী আত্মা আর কোনোদিন আমার সামনে এসে বলেনি, ''আদর। এই তো আমি।''

কিন্তু আমি কি তাকে ভুলেছি?

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%