অপদেবতার মূর্তি

কৌশিক কারক, আকাশ চন্দ, উৎস ভট্টাচার্য

এক

আকাশের বুক চিরে বিদ্যুতের রেখা আরেকবার ঝলকে উঠল। সেইসঙ্গে বাড়ল বৃষ্টির বেগ, ঝোড়ো হাওয়াও বইছে সমানতালে। গোটা গ্রাম অন্ধকারে ঢেকে গেছে। পথঘাট ডুবে গেছে জলে। বাজ পড়ার আগে ক্ষণিকের আলোয় মাঝে মাঝে দেখা যাচ্ছে একটা মানুষের অবয়ব, যদিও তাঁকে দেখতে পাবে এমন কেউ এই দুর্যোগাচ্ছন্ন সন্ধ্যায় ঘরের বাইরে নেই। তবুও চারিদিকে সতর্ক দৃষ্টি ফেলে অতি সন্তর্পণে জল ঠেলে গ্রামের পথ ধরে এগোচ্ছে সেই ছায়াশরীর।

ক্রমাগত ছলাৎ ছলাৎ শব্দটা বৃষ্টির আওয়াজে অনেকটাই চাপা পড়ে যাচ্ছে। আকাশ বিদীর্ণ করে বিদ্যুৎ চমকালো আরো একবার। আবারো নির্জন গ্রামের পথে প্রকট হল ছায়াশরীরের অবয়ব। মাথায় অবিন্যস্ত ঝাঁকড়া চুল, মুখে গোঁফ— দাড়ির আধিক্য, খালি গা, কঠিন চেহারা। দেহের নিম্নাঙ্গে লজ্জা নিবারণের জন্য স্বল্প বস্ত্র জমা জলের উপরে নজরে আসছে। মানুষটা মনে মনে ভাবল, ''তার গণনা তো ভুল হওয়ার নয়, এই গ্রামেই আছে সেই জিনিস যা নিতে সে এসেছে।'' জিনিসটা তার অবশ্যই চাই। তখনই বেশ কিছুটা দূরে একটা ক্ষীণ আলোর ঝাপসা রেখা দেখতে পেল সে, আর তার কানে ভেসে এল বাচ্চার কান্নার অস্পষ্ট আওয়াজ। একটু দ্রুত সেদিকে এগিয়ে গেল মানুষটা।

প্রচণ্ড ঝড়, বৃষ্টির দাপটে ছোট্ট কুঁড়েঘরটার অবস্থা শোচনীয়। যেকোন সময় ভেঙে পড়তে পারে। ঘরের মেঝে জলের তলায় চলে গেছে অনেকক্ষণ। ছায়াশরীরের মতো মানুষটা দরজা পেরিয়ে চোখ ফেলল ঘরের ভিতর। একটা মাঝারি আকারের টেবিলে ঢাকা দেওয়া একটা বাটি, একটা ছোট ঘড়ায় জল আর একটা প্রদীপ জ্বলছে সেখানে। বিছানায় চোখ পড়তেই মানুষটার চোখদুটো চকচক করে উঠল। তার গোঁফ দাঁড়ির আড়ালে খেলে গেল এক নীরব পৈশাচিক হাসি।

কোনমতে বাচ্চাটাকে বুকে চেপে কান্না থামালো কাজলী। বেলার দিকে ব্যথা উঠেছিল। ধাইবুড়ি কাজ সেরে নাড়ি কেটে পরিষ্কার করে দিয়েছে। জ্ঞান হারানোর আগে সে শুনেছিল, ব্যাটা হয়েছে। তারপর যখন জ্ঞান ফিরল ধাইবুড়ি দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে, আবার পরে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে চলে গেল। ঝড়, বৃষ্টিতে বোধহয় আর আসতে পারেনি। মরদটা সকাল থেকে মহুয়া টেনে কোথায় পড়ে আছে কে জানে! এদিকে সন্ধ্যা নেমেছে। অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে সারা শরীর জুড়ে। ওদিকে! বৃষ্টির জল ঘরে ঢুকছে হু হু করে। কি হবে সেই দুশ্চিন্তায় আবার অজ্ঞান হয়ে গেল কাজলী।

সদ্যজাত বাচ্চার কান্নার আওয়াজে তার জ্ঞান ফেরে। বুকে তুলে দুধ খাওয়ায়। দুধ টানতে টানতে ঘুমিয়ে পড়ে বাচ্চাটা। তখনই কাজলীর মনে হল, কেউ ঘরে ঢুকেছে। প্রদীপের নিভু আলোয় ঠিক বুঝতে পারে না সে। ভাবে, বোধহয় তার মরদটা ফিরেছে এতক্ষণে। ব্যাটা হয়েছে শুনলে খুব খুশি হবে। কিন্তু হতভাগীর শরীর আবার অবসন্ন হয়ে এল। লোকটা কাছে আসতে সে বুঝতে পারল এটা তার মরদ নয়, বাচ্চাটাকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে কোনো অচেনা আগুন্তুক। তবু কিছু করতে পারল না সে। চোখদুটো বুজে আসছে তার। অসহায়ভাবে হাত বাড়িয়েও আবার অজ্ঞান হয়ে গেল কাজলী।

দুই

'শাল কান্দে, পিয়াল কান্দে, কান্দে মহুল বন...

অযোধ্যা পাহাড়ে বসে কান্দে হামার মন গো, কান্দে হামার মন

এই তিরি কিরিখা গাছগুলা, কোথা লেইগে আইলো...

রঙ দিখাল দিখাল খেল বাবুরা দিখাল...'

ফোনের কলার টিউনে গানটা বাজতেই মনের বিষণ্ণতা অনেকটা কেটে গেল রক্তিমের। কল্যাণকে ঘরের কথা বলে ফোন রেখে দিল। চটপট রাতের ট্রেনের টিকিটও কেটে ফেলল সে।

এরকমই ভেবে একটু হালকা হল রক্তিম। ঠিক করল, কল্যাণের সাথে ঘর লিজের ব্যাপারে পাকাপাকি কথা বলে দু—তিন দিন কাটিয়েই বাড়ি ফিরে যাবে। তারপর মন দিয়ে সংসার করবে। অভাব অনটনের খোঁচা শুনতে আর ভালো লাগে না।

গাড়ি নিয়ে স্টেশনেই অপেক্ষা করছিল কল্যাণ। ভোরবেলা ট্রেন থেকে নেমে প্লাটফর্মের বাইরে বেরিয়ে আসতেই হাসিখুশি ছেলেটাকে দেখতে পেল রক্তিম। ব্যাগদুটো পিছনে ফেলে কল্যাণের পাশে সিটে বসে পড়ল সে। আঁকাবাঁকা পাকদণ্ডী পেরিয়ে অযোধ্যা পাহাড়ের দিকে এগিয়ে চলল গাড়িটা।

অয্যোধ্যা পাহাড়ে রক্তিম এসেছে বহুবার। আজকাল পর্যটকদের ভিড় বেড়েছে। একটা সময় লোকজন খুব একটা আসতই না এদিকে। রক্তিমের মতো কিছু উৎসুক পর্যটক ট্রেক করে এই স্থানের প্রকৃতিকে উপভোগ করত। বলতে গেলে সেই প্রথম দিন থেকেই কল্যাণের সঙ্গে তার পরিচয়। একতলা ছোট বাড়িটায় ট্রেকার্সদের থাকার জন্যে দু তিনটে ঘর ছিল তখন। রক্তিমের হাত ধরেই আজ সেখানে দাঁড়িয়েছে তিনতলা এই অতিথি নিবাস। কল্যাণের সঙ্গে তাই একপ্রকার আত্মীয়তা গড়ে উঠেছে রক্তিমের। শুধু কল্যাণ কেন, কার্তিক, জগাই, সোমনাথ এমনকি গ্রামের সব মানুষের সঙ্গেই আজ তার সম্পর্ক নিবিড়।

গাড়ির কাচ দিয়ে আশেপাশের দৃশ্য দেখতে দেখতে রক্তিম বলল, ''সেই আগের অয্যোধ্যা আর নেই রে কল্যাণ, গাছ কেটে কেটে শেষ করে দিল সব।'' কল্যাণ গাড়ি চালাতে চালাতে কথার সমর্থনে মাথা নাড়ল। রক্তিম জিজ্ঞাসা করল, ''নতুন কোনো জায়গা আছে নাকি রে কল্যাণ? সেই বামনী ফ্যাঁস, টুরগা ফ্যাঁস, মার্বেল রক, আপার ড্যাম, লোয়ার ড্যাম, চড়িদা গ্রাম, ময়ূর পাহাড়, পাখি পাহাড় এসব দেখে দেখে পুরোনো হয়ে গেল। নতুন কোনো জায়গা বল না।'' কল্যাণ খানিকটা ভেবে বলল, ''নতুন জায়গা বলতে পারডি লেক আর উসুলডুংড়ি আরকি বলি বলুন তো..., সবই তো আপনার দেখা। আপনি চাইলে রামমন্দির, সীতাকুণ্ড ছাড়িয়ে শিকার ময়দান দেখে আসতে পারেন। ডাউরি খাল, টুরগা ড্যাম বা খয়রাবেড়ার ধারে তাঁবু ফেলে একরাত থাকতে পারেন। না হলে মুরগুমা ড্যামের ধারে নতুন দু—একটা কটেজ হয়েছে সেখানে ঘুরে আসতে পারেন। আজকাল রাতের দিকে ওদিকটায় হাতি বেরোচ্ছে। রক্তিম মুখটাকে ব্যাজার করে বলল ''ধুর তোর স্টকে নতুন কিছু নেই। আমাকেই কোন একটা অচেনা স্পষ্ট খুঁজে বের করতে হবে।''

ঘরে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে ডাইনিং—এ এল রক্তিম। পোশাক বদলে সে একদম তৈরি। ব্রেকফাস্ট করেই বেরিয়ে পড়বে। গরম গরম লুচি নিয়ে হাজির হল রাঁধুনি জগাই। লুচির টুকরোয় সুস্বাদু তরকারি মাখিয়ে মুখে পুরল রক্তিম আর জাগাইকে ডেকে জিজ্ঞাসা করল, পাহাড় জঙ্গলে ঘেরা কোন নতুন জায়গার সন্ধান তার কাছে আছে কিনা। জগাই মাথা চুলকে বলল,''মহুয়া আর কাঠের লেইগে কত জায়গায় তো যেতে হয়। পাখি পাহাড়ের পিছনে একটা জঙ্গল আছে, একবার ঘুরে আইসতে পারেন। তবে বেশি গভীরে যাবেন না, আর সন্ধের আগেই ফিরে আইসবেন। ঐ জঙ্গলে ছোট সাইজের ভালুক আছে, আমার সামনে পড়েছে অনেকবার। কখনও কুডুüল দিয়ে শেষ করে দিয়েছি, কখনো আমাকেই আঁচড়ে কামড়ে দিয়েছে, এই দ্যাখেন'', বলে গেঞ্জি তুলে দেখাল। রক্তিম দেখল পিঠজুড়ে অনেকগুলি গভীর আঁচড়ের দাগ।

জঙ্গলে ঢুকে রক্তিম বুঝল একদম মনের মতো জায়গায় এসেছে সে। বড় বড় গাছে ঢাকা জঙ্গল, গাছের আচ্ছাদন পেরিয়ে রোদ সেভাবে ঢুকছে না। প্রচুর পাখি এ—গাছ থেকে ও—গাছে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মন ভালো হয়ে গেল রক্তিমের। ঘুরতে ঘুরতে অনেকটা দূরে চলে এল সে। একটা মৃদু কুলকুল শব্দ ভেসে আসছে তার কানে। সে বুঝল কাছাকাছি কোথাও ঝর্ণা আছে। সে সেই ঝর্ণা খুঁজে পাওয়ার লোভে যেদিক থেকে আওয়াজ আসছে সেদিকেই এগিয়ে গেল।

আওয়াজ শুনে হাঁটতে হাঁটতে জঙ্গলের অনেকটা গভীরে চলে গেল রক্তিম। একজায়গায় এসে সে দেখল তিরতির করে জল বয়ে যাচ্ছে। জলের রেখা ধরে কিছুটা যেতে সে দেখতে পেল জলধারার দুপাশে কিছু ভাঙা ইঁটের টুকরো ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। একটু অবাক হয়ে আরও কিছুটা এগোতেই সে দেখতে পেল জঙ্গলে ঢাকা একটা প্রাচীন মন্দিরের ভগ্নাবশেষ। কৌতূহলী রক্তিম পা বাড়াল মন্দিরটার দিকে। প্রথমে ঘুরে দেখল চারপাশ। আগাছায় ভরে গেছে একেবারে। তারপর অতিকষ্টে আগাছা পেরিয়ে পা রাখল সেই পরিত্যক্ত মন্দিরে।

মন্দিরে প্রবেশ করতেই কিছু সরীসৃপ অসন্তুষ্ট হয়ে সরে গেল সরসর শব্দ করে। একটু ভয় পেল রক্তিম, এই ভাঙা মন্দিরে বেশিক্ষণ না কাটানোই ভালো। একটা টিলার উপরে খানিকটা উঁচুতে তৈরি এই মন্দিরটা। এখান থেকে দূরে পাখি পাহাড় চোখে পড়ছে। অস্তমিত সূর্য পাহাড়টার গায়ে লাল রঙে লেপে দিচ্ছে। এই দৃশ্য দেখে সময়ের হুঁশ ফিরল রক্তিমের, আর দেরি করা ঠিক হবে না। ফেরার পথ ধরবে এমন সময় মন্দিরের এক কোণায় কিছু মাটি চাপা পড়া একটা ছোট শিশুর হাত দেখতে পেয়ে আঁৎকে উঠল সে। দুরুদুরু বুকে কাছে গিয়ে ভালো করে দেখে একটু নিশ্চিন্ত হল, যাক কোনো মানুষ নয়, একটা পুতুল।

তিন

প্রাচীন মন্দিরটা গ্রাম থেকে অনেকটাই দূরে। দুজন তান্ত্রিক এক কঠিন পূজা ক্রিয়ার সমস্ত জোগাড় সেরে উদ্বিগ্নে অপেক্ষা করছে কারোর জন্য। এই দুর্যোগে সে আসতে পারবে তো দুশ্চিন্তায় তারা বারবার খোলা দরজার দিকে তাকাল। সেদিকে নিকষ অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেল না তারা।

এদিকে সময় বয়ে যাচ্ছে, ঠিকমতো পূজা সম্পন্ন না হলে অনর্থ ঘটবে। ভয়ে ভয়ে মূর্তিটার দিকে তাকালো দুজন। আর দেরি করা ঠিক হবে না। হোমের কাঠে ঘৃতাহুতি দিয়ে অগ্নি সংযোগ করল সেই তান্ত্রিকদ্বয়। তখনই কাপড়ে জড়িয়ে বৃষ্টির জল বাঁচিয়ে একটা সদ্যজাত শিশুকে নিয়ে মন্দিরের দরজায় হাজির হল তৃতীয় তান্ত্রিক।

বাচ্চাটিকে দেখে উল্লাসিত হল তিনজনেই। মুখে যেন হাসি ফুটল কাঠের তৈরি পুতুলসদৃশ মূর্তির মুখেও। এরপর শুরু হল পূজা। বাচ্চাটাকে শোয়ানো হল রক্ত দিয়ে আঁকা একটি চিহ্নের উপর। তার মাথার কাছে রাখা হল মূর্তিটাকে। তান্ত্রিক তিনজন কালো কাপড়ে বেঁধে নিল নিজেদের চোখ। যজ্ঞের আগুন ততক্ষণে মন্দিরের ছাত স্পর্শ করেছে। সেই কুণ্ডকে ঘিরে রেখে দুর্বোধ্য ভাষায় তিনজন পর্যায়ক্রমে মন্ত্রপাঠ করতে লাগল। হঠাৎ জোরে কেঁদে উঠল বাচ্চাটা। মন্ত্রোচ্চারণের ধ্বনি আরও তীব্রতা পেল। এই একঘেয়ে দুর্বোধ্য মন্ত্রধ্বনির সাথে মানবশিশুর খুলি ফাটানো ও হাড় চিবানোর নির্মম শব্দ মিশে গেল বৃষ্টিধৌত জঙ্গলে ডাকা সেই প্রাচীন মন্দিরগাত্রে।

পরদিন ভোরে সেখানে আর কোন প্রাণের সাড়া পাওয়া গেল না। শুধু গ্রামে নেমে এল বিষাদের ছায়া। বাচ্চা হারানোর শোকে পাথর হয়ে গেছে কাজলী, আর বাপটার নেশা কেটে গিয়ে দেওয়ালে মাথা খুটে নিজেকে দোষারোপ করছে বারবার।

চার

সন্ধ্যাবেলা ঘরে ঢুকে রক্তিম ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছিল মূর্তিটাকে। ছোট বাচ্চার আদলে বানানো দেড় দু ফুটের একটা কাঠের মূর্তি। চোখ, মুখ, হাত পায়ের আঙুল এত নিপুণ হাতে তৈরি দূর থেকে দেখলে সত্যি বাচ্চা বলে ভুল হয়। মূর্তিটার চোখের তলায় কালচে কালি লাগানো আর গায়ে অল্প স্বল্প কালচে লাল দাগ। সেগুলো রক্তের দাগ কিনা রক্তিম জানে না। ব্যাগে ভরার আগে ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে।

পিছনে একটা আওয়াজ পেয়ে ঘুরে তাকাল রক্তিম। দরজা ঠেলে কল্যাণ ঘরে ঢুকেছে, সন্ধ্যাবেলার টিফিন নিয়ে। তার দৃষ্টি রক্তিমের হাতের মূর্তির দিকে। মুখে বিস্ময় এবং ভয়ের ভাব স্পষ্ট। রক্তিম মূর্তিটা একহাতে তুলে দেখিয়ে বলল, ''এটা পেলাম, আমার নতুন সংগ্রহ। তাও আবার বিনামূল্যে। কথা শেষ করে হাসল সে।'' কল্যাণের মুখে ভয়ের ভাব তখনও কাটেনি। সে অনুনয়ের সুরে বলল, ''দাদা আপনি আর যাই করুন। ওটাকে আগে দূর করুন। সঙ্গে রাখবেন না দয়া করে এই অপদেবতাকে।''

চিন্তিত রক্তিম বলল, ''কেন বলত? ব্যাপারটা কি শুনি। খাবারের ট্রে নামিয়ে রেখে কল্যাণ, ''আমাদের এক অপদেবতা গদ্রবঙ্গার মূর্তি এটা। এর পূজা করলে, বা সঙ্গের মানুষ অপার সম্পদের মালিক হয়ে উঠবে। গদ্রবঙ্গাকে খুশি করতে পারলে সে অন্য কোন ধনী ব্যক্তির বাড়ি থেকে চুরি করে ধন সম্পদ এনে দেবে মালিকের কাছে। সাঁওতাল বিদ্রোহ ও তার পরবর্তী সময়ে কিছু তান্ত্রিক গোত্রীয় সাঁওতাল উপাসক এর পূজা করত। যেসমস্ত জমিদার সাঁওতালদের উপর অত্যাচার করত, জঙ্গলের সম্পদ লুট করত, বিশ্বাসঘাতকতা করে ব্রিটিশদের সাথে হাত মেলাত তাদের বাড়ি থেকে সম্পত্তি চুরি করার জন্য তারা পূজা করত গদ্রবঙ্গার। সেই সব সম্পত্তি তারা বীর সাঁওতালদের হাতে তুলে দিত।'' এতটা বলে একটু থামল কল্যাণ। রক্তিম বলল, ''এ তো ভালো কথা। ধন সম্পত্তি পেলে ক্ষতি কি?''

কল্যাণ চোখদুটোকে বড় বড় করে বলল, ''ক্ষতি আছে দাদা, বিশাল ক্ষতি। এই পূজার জন্য তাদের গদ্রবঙ্গাকে দান করতে হত কোন সদ্যজাত শিশু। সেই শিশুর মাথা চিবিয়ে রক্ত চুষে খেত এই ভয়ানক অপদেবতা। এখনও অনেকে রাতারাতি বড়লোক হয়ে গেলে আমরা বুঝি সে নিশ্চয় গদ্রবঙ্গার পূজা করেছে। নাহলে এই সাঁওতালদের পরিবারের টাকা আসবে কুথা থেকে বলেন''!

রক্তিম সব শুনে বলল, ''এসব তোদের কুসংস্কার, বুঝলি।'' বাধা দিয়ে বলল কল্যাণ, ''না দাদা, আপনি জানেন না। এ বড় ভয়ানক। সম্পদ, টাকা পয়সা দেয় তো ঠিক, তার বদলে চেয়ে নেয় তার সবচেয়ে প্রিয়জিনিস, তার সন্তান।'' রক্তিম রসিকতা করে বলল, ''যদি কেউ সম্পত্তি নিয়ে সন্তানকে না দিতে চায়?''

''তাহলে পরিবারের সকলকে শেষ করে বাচ্চাকে নিয়ে যাবে গদ্রবঙ্গা।''

কথা শেষ করে আর দাঁড়াল না কল্যাণ। আরো একবার সাবধান করে নিজের কাজে চলে গেল।

রক্তিম মনে মনে ভাবল, 'কল্যাণ একটা গেঁয়ো আদিবাসী ভূত, যত উটকো কুসংস্কার। সংসারে যত অশান্তি সব তো টাকা নিয়েই। এই মূর্তির যদি টাকা দেওয়ার ক্ষমতা থাকে দিক দেখি। পরে যা হবে দেখা যাবে।' মূর্তিটাকে পরিষ্কার করে যত্ন করে ব্যাগের মধ্যে ভরে রাখল রক্তিম। কল্যাণ দেখলে আবার ঝামেলা করবে।

মাঝরাতে হঠাৎ রক্তিম দেখল, ওর ঘরটা লালচে আলোয় ভরে গেছে। মূর্তিটা কিভাবে যেন ব্যাগ থেকে বেরিয়ে খাটের পাশের টেবিলে উঠে বসে আছে। তাকে অবাক করে দিয়ে সেটা বলে উঠল, ''রক্তিম, তুই টাকা পেতে চাস?'' একটা ঘোরের মধ্যে মাধা নাড়িয়ে 'হ্যাঁ' বলল রক্তিম। মূর্তি বলল, ''অনেক টাকা দেব তোকে, অনেক টাকা। আমি যা চাইব তুই দিবি তো?'' রক্তিম জিজ্ঞাসা করল, ''কি চাও তুমি?'' এবার এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল মূর্তিটা। তারপর বলল, ''রিনি।''

কথাটা শুনেই ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসল রক্তিম। স্বপ্নের ভয়াবহতায় দম প্রায় বন্ধ হয়ে আসছে তার। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। বাপরে কি ভয়ানক স্বপ্ন। কল্যাণের গল্প শুনেই সে এইসব স্বপ্ন দেখেছে। কিছুক্ষণ পর জানলা দিয়ে সদ্য ভোরের আলো ঘরে ঢুকতে দেখে কিছুটা স্বাভাবিক হল রক্তিম। বাথরুমে ঢুকে চোখে মুখে ভালো করে জল দিল, আর তখনই ফোনটা বেজে উঠল। ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ভেসে এল নন্দিনীর গলা, ''তুমি এত টাকা কোথায় পেলে গো? বাড়িতে ঝামেলা হয়েছে বলে আবার চুরিটুরি করোনি তো?'' রক্তিম আমতা আমতা করে বলল, ''টাকা''!

''হ্যাঁ, এই সাতসকালে একটা লোক এসে পার্সেলটা দিয়ে গেল। পার্সেল খুলে দেখি একশোটা সোনার পয়সা, মানে মোহর। যে লোকটা দিতে এসেছিল বলল, তোমার নামে এসেছে। লোকটাকে দেখতে বড় অদ্ভুত। কালো ভূতের মতো চেহারা, থ্যাবড়ানো নাক, মোটা ঠোঁট, অনেকটা সাঁওতালদের মতো দেখতে। এমন কুরিয়ারের লোক আমি জন্মে দেখিনি। লোকটা চলে যাওয়ার পর পার্সেলটা খুলে দেখি এতগুলো মোহর। কে পাঠালো গো তোমায় এগুলো? আবার অ্যান্টিক হিসাবে কেননি তো! কিগো তুমি শুনছ?'' একটানা অনেকক্ষণ কথা বলে ওপাশ থেকে কোন সাড়াশব্দ না পেয়ে একটু চিন্তাতেই পড়েছিল নন্দিনী।

রক্তিম একটা ঢোক গিলে কোনমতে বলল, ''নতুন কোন অ্যান্টিক তো কিনিনি। আচ্ছা আমি ফিরে এসে দেখছি কে পাঠিয়েছে। এখন রেখে দাও, কাউকে কিছু বলো না। মেয়েটার খেয়াল রেখ।'' দুজনেই হয়তো আরো কিছু বলত হঠাৎই কেটে গেল ফোনটা। এখানে এই এক সমস্যা,টাওয়ার ধরে না ঠিকঠাক। 'একশোটা মোহর!' বিস্ময়ে হতভম্ব রক্তিম খাটের উপর বসে পড়ল। ব্যাপারটা কি মূর্তির কথা! কি করে সম্ভব এটা! কল্যাণের কথা, স্বপ্নের কথা মনে পড়তেই একটা শিরশিরে ভয় ঘিরে ধরল তাকে।

পাঁচ

সকাল থেকে একটু দুশ্চিন্তায় আছে নন্দিনী। ব্যাপারটা কিছুই বুঝতে পারল না। এতগুলো মোহর রক্তিম পেল কোথায়? মোহরগুলো আবার পুরোনো আমলের। ধার করে এত টাকার অ্যান্টিক কিনবে না, এটা সে নিশ্চিত। তাহলে? মাথা ব্যথা করছে নন্দিনীর। আর ভাবতে ভালো লাগছে না, রক্তিম এলে সব জানা যাবে।

দুপুরের দিকে মেয়েকে ঘুম পাড়িয়ে নিজে যখন বিশ্রাম নিচ্ছিল, কতগুলো অন্য চিন্তা আবার তাকে ঘিরে ধরল। রক্তিমের বাবা মা মারা গেছেন অনেক ছোটবেলায়। একলা ভবঘুরে ছেলেটাকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিল সে। ভেবেছিল বিয়ের পর বুজিয়ে সুঝিয়ে মানুষটাকে বদলে দেবে। এতদিন তাও এতকিছু ভাবত না সে। কিন্তু আজ তাদের জীবনে আরেকজন এসেছে। রক্তিম এখনও না শোধরালে ভবিষ্যতে চরম সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে তাদের।

এমনিতে রক্তিমের মন ভালো। ঝামেলা অশান্তি হলেও বেশিক্ষণ মনে রাখে না। শুধু বাজে খরচটা কমাতেই হবে ওকে। নন্দিনীর আবার মনে পড়ল সকালের পার্সেলটার কথা। কত টাকা হবে মনে মনে হিসাব করল নন্দিনী। আন্দাজ! কুড়ি লাখ। এই টাকাটা সত্যি যদি ওদের হত, আর ভাবনাই থাকত না। একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে সে। ঠিক তখনই আবার সকালের পার্সেল দিতে আসা লোকটার কথা মনে পড়ে। কেমন অদ্ভুত যেন তার হাবভাব, মনে পড়তেই গা—টা শিরশির করে উঠল নন্দিনীর।

বিকেলেরে দিকে আকাশে মেঘ জমতে শুরু করল। একটু পরেই সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে শুরু হল বৃষ্টি। সময়ের সাথে সাথে বৃষ্টির বেগ বাড়তে লাগল। ঘরের মধ্যে বসে মেয়েকে দুধ খাওয়াচ্ছিল নন্দিনী। বাইরে ঘন ঘন বাজ পড়ছে। নন্দিনী নিজের খেয়ালে জানলার দিকে তাকালো। আর তখনই ওর বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। মনে হল একটা মানুষ যেন নিমেষে সরে গেল জানলা থেকে। কে ছিল ওই জানলার দিকে। আর অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল! সকালের সেই লোকটা কি! এই দুর্যোগে কে আসবে এখনো কাউকে দেখতে পেল না। নিজের মনেই হেসে ফেলল নন্দিনী। নিশ্চয় কি সব ভুল দেখছে।

মেয়ে ঘুমিয়ে পড়তে তাকে বিছানায় শুইয়ে মশারি টাহিয়ে দিল সে। তারপর রান্নাঘরে গেল নিজের কাজে। বাইরে একনাগাড়ে বৃষ্টি হচ্ছে। কাজ সেরে রান্নাঘর থেকে ফিরে এসে এক ভয়ানক দৃশ্য দেখে ভয়ে তার হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে গেল। ''ও মা গো'', বলে চিৎকারল করে উঠল নন্দিনী। মুখটা আবারো সরে গেল জানলা থেকে। ভয়ে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে। সকালের সেই লোকটা, ঘষা কাঁচে মুখ সেঁটে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টে রিনিকে দেখছিল। কি বীভৎস ফ্যাকাশে সেই মুখ। এবারে সে স্পষ্ট দেখেছে, কোন ভুল হয়নি তার।

বারবার চেষ্টা করল নন্দিনী রক্তিমকে ফোন করার। কিন্তু পারল না। দরজা জানলা ভালো করে বন্ধ করল সে। কেন এসেছিল লোকটা? সে কি জেনে গেছে পার্সেলে কি ছিল! কোনো বিপদ হবে না তো! ভাবনায় তার চোখে জল এসে গেল। তাড়াতাড়ি খাওয়াদাওয়া শেষ করে মেয়েকে নিয়ে শুয়ে পড়ল নন্দিনী।

দুশ্চিন্তা কাটিয়ে যখন ঘুমিয়ে পড়েছিল সে জানে না। মাঝরাতে মেয়ের কান্নার শব্দে ঘুম ভেঙে গেল তার। চোখ খুলে সে দেখল একটা ছায়াশরীর বিছানা থেকে রিনিকে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করছে। আতঙ্কে কাঠ হয়ে গেল নন্দিনী। চিৎকার করতে গিয়ে দেখল গলা দিয়ে আওয়াজ বেরাচ্ছে না। কিন্তু তার মেয়েকে কেউ এভাবে নিয়ে যেতে পারবে না। হাত বাড়িয়ে মেয়েকে নিজের কাছে তুলে নিল। লোকটা কিন্তু এগিয়ে এল না। যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেখানে দাঁড়িয়েই ঘড়ঘড়ে গলায় বলল, ''রিনি..., রিনি...তুর বেটিঠোকে আমার চাই।'' কি বলে লোকটা। এতক্ষণে হুস ফিরেছে নন্দিনীর। সাহস করে চিৎকার করে বলল, ''কেন এসেছ এখানে? ও আমার মেয়ে। চলে যাও।'' লোকটা কথার কোন উত্তর না দিয়ে শুধু বলতে লাগল, ''রিনি..., রিনি'' এবার লোকটা হাত বাড়িয়ে এগোতে লাগল নন্দিনীর দিকে ''রিনিকে দিয়ে দে। উকে আমার চাই।''

খাটের এক কোণায় বসে মেয়েকে বুকের কাছে শক্ত করে চেপে ধরল নন্দিনী। ততক্ষণে সে বুঝে গেছে লোকটা মানুষ না, ও মানুষ হতে পারে না। মানুষ হলে বন্ধ দরজা জানলা ভেদ করে ঘরে ঢুকলে কেমন করে! তবু মনে সাহস এনে জোর গলায় বলল, ''না, কিছুতেই না, আমি থাকতে কিছুতেই তা হতে দেব না। রিনি আমার, শুধু আমার। তাকে কেউ নিয়ে যেতে পারবে না।'' কথা বলতে বলতেই হাত বাড়িয়ে বেড সুইচটা পেয়ে গেল নন্দিনী। আলো জ্বলতেই স্পষ্ট দেখল সকালের সেই সাঁওতাল লোকটা। কি ভয়ানক তার মুখ। আলো গায়ে পড়তেই নন্দিনীর সামনে থেকে ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে গেল লোকটা। যাওয়ার আগে একটা কথা ভেসে উঠল তার কানে, ''আমি আবার আসব, তুর বেটিঠোকে আমি লিবই।'' দরদর করে ঘেমে গেল নন্দিনীর সারা শরীর। বাকি রাতটা আলো জ্বালিয়েই মেয়ের পাশে জেগে বসে রইল সে। ভোরের দিকে আরেকবার ফোন করল রক্তিমকে। এবার রিং হচ্ছে।

ছয়

ফোন রেখে উদ্ভ্রান্ত রক্তিম দৌড়াল কল্যাণের কাছে। কল্যাণ এই অবস্থায় কখনও তাকে দেখেনি। কল্যাণের কাছে গিয়ে একপ্রকার কেঁদেই ফেলল। ফোনে নন্দিনী যা বলেছে সবকিছু খুলে বলল সে। কল্যাণ অবাক হয়ে বলল, ''সর্বনাশ করেছেন দাদা। ওটাকে রেখে দিলেন, আমার কথা শুনলেন না?'' রক্তিম ব্যস্ত হয়ে বলল, ''আমার ভুল হয়ে গেছে। আমি এখনি ফেলে দিচ্ছি ওটাকে। আমার মেয়েটাকে বাঁচা কল্যাণ, ওর কিছু হয়ে গেলে আমি বাঁচব না। একটু আশ্বস্ত করে বলল কল্যাণ, ''একটু মাথা ঠাণ্ডা রাখুন। যা হওয়ার হয়ে গেছে, এখন আর মূর্তিটাকে ফেলার দরকার নেই। আমি দেখছি কি করা যায়। আপনি আগে আজ রাতের ট্রেনে কলকাতায় ফেরার দুটো টিকিট কেটে ফেলুন, তারপর আমরা বেরাবে।''

পোশাক বদলে বেরিয়ে এল কল্যাণ। গতকাল রাতে প্রচুর ঝড় বৃষ্টি হয়েছে। আজ সকালেও ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হয়ে যাচ্ছে। তার মধ্যেই রাস্তায় নামল দুজন। কল্যাণ সঙ্গে নিল আতপ চাল, চিড়ে, দুধ, কিছু ফল আর একটা গোটা মুরগি। কল্যাণ হাঁটতে হাঁটতে বলল, ''গদ্রবঙ্গার স্বপ্ন এবং প্রকোপ থেকে বাঁচাতে পারে একমাত্র মারংবুরু। মনে মনে তাকে ডাকুন।'' রক্তিম অশান্তিতে ছিল, সে মনে মনে একটা কিছু কল্পনা করে প্রার্থনা করতে লাগল।

সাতসকালে কল্যাণকে আসতে দেখে একটু অবাক হল বৃদ্ধ নায়েক। ইনি হলেন আদিবাসী পুরোহিত। কল্যাণ তাকে সব বলতে তিনি শঙ্কিত হয়ে পড়লেন। কালবিলম্ব না করে ঘর থেকে তেল, সিঁদুর, সাদা বুনো ফুল আর পোড়া মাটি দিয়ে বানানো কয়েকটা হাতি, ঘোড়ার ছোট ছোট মূর্তি নিয়ে বেরিয়ে এলেন। এই সমস্ত উপকরণ বিশেষ প্রয়োজন। মারাংবুরু ও মা জাহেরকে সন্তুষ্ট না করতে পারলে নিস্তার নেই।

নিরিবিল জঙ্গলে একটা বড় শাল গাছের নীচে জাহের এরার থান। একটা বড় পাথর বসানো রয়েছে সেই গাছের নীচে বাঁধানো চাতালে। রক্তিম দেখল সেই পাথরে তেল, সিঁদুর লাগানো আর সামনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে আতপচাল, বাসি ফুল আর বেশ কতগুলো ছোট হাতি, ঘোড়ার মূর্তি। এই বোঙাই আদিবাসীদের সবচেয়ে শক্তিশালী দেবতা মারাংবুরু। বৃদ্ধ নায়েক পূজা শুরু করলেন। হাতে হাতে রীতি মেনে তাকে সাহায্য করল কল্যাণ। রক্তিম একভাবে দাঁড়িয়ে সব দেখছে। তার মন পড়ে রয়েছে নিজের বাড়িতে। পূজা শেষ হতে কল্যাণের ডাকে তার চমক ভাঙলো। মারংবুরুর কাছে মাথা ঠুকে প্রতিজ্ঞা করে বলল, সে আর কখনও সংসারকে অবহেলা করবে না, শুধু এবারের মতো ঈশ্বর যেন তাকে ক্ষমা করেন, তার মেয়েকে রক্ষা করেন। কল্যাণ এবং নায়েকের কথামতো একটা ঘোরের মধ্যে পূজার জন্য নিজের কাজগুলো করে গেল সে। শেষে মুরগিটাকে এক কোপে বলি দিয়ে পূজার কাজ শেষ করল রক্তিম।

ফেরার পথে নায়েক বললেন, ''আদিবাসীদের মূলত কোল সম্প্রদায়ের দেবতা গদ্রবঙ্গা। কিন্তু মারাংবুরু পূজা করে কোল, ভিল, ওরাও, মুন্ডা সহ সক্কল আদিবাসী। দুশ্চিন্তায় ডুবে যাওয়া রক্তিম বৃদ্ধ পুরোহিতের হাতদুটো চেপে কাঁপা গলায় জিজ্ঞাসা করল, ''আমার মেয়েটা বাঁচবে তো নায়েক?'' খানিক চুপ করে থেকে নায়েক বললেন, ''ভরসা রাখেন। গদ্রবঙ্গা কাজ শেষ করে তিন দিনের মধ্যেই। আইজ রাইতের পর আর ভয় লাই। আপনারা স্বেচ্ছায় সন্তানঠোকে দিতে না চাইনলে দুইজনকে মেরে আপনার বেটিকে লিয়ে লিবে। আমি তেউড়ি ফুলের মালা আর মন্ত্রপড়া চাল দিয়ে মাদুলি বানাইন দিব। সেগুলান একবার গলায় পরে নিলে আর কুনো চিন্তাঠো লাই।''

নায়েক সব সামগ্রী নিয়ে ঘরে ঢুকে গেলেন। বাইরে দাঁড়িয়ে রইল কল্যাণ আর রক্তিম। বৃষ্টি এখন নেই। কিন্তু আকাশে আবার ঘন মেঘ জমছে। আবার জোরে নামবে। রক্তিমের মনের ভিতরেও তোলপাড় চলছে। নন্দিনীর কথা মনে পড়ছে। মেয়ের মুখটা ভেসে উঠছে চোখের সামনে। অপদেবতার কথাটা মনে পড়তেই শিউরে উঠল সে। কিছুক্ষণ পর নায়েক লোকটি ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন তিনটে মালা আর মাদুলি নিয়ে। তারপর একটি কালো কাপড়ে বোঙার গায়ের তেল সিঁদুর লাগিয়ে কল্যাণের হাতে দিয়ে কিছু বুঝিয়ে দিলেন। ফেরার পথে মনে মনে প্রস্তুত হল রক্তিম, যেভাবে হোক পরিবারকে বাঁচাতেই হবে।

সাত

সকাল সকাল ঘুম ভাঙল দুজনের। ট্রেনে ভালো ঘুম হয়না রক্তিমের। আর এরকম মানসিক পরিস্থিতিতে ঘুমের প্রশ্নই ওঠে না। তবু শেষ রাতে একটু তন্দ্রা লেগেছিল। জানলার বাইরে চোখ রেখে মুষড়ে পড়ল রক্তিম এবং কল্যাণ। ট্রেন প্রায় বারো ঘন্টা লেট। যেন দুই অদৃশ্য শক্তির লড়াই চলছে দৃষ্টির আড়ালে। সেই অশুভ শক্তি সহজে কিছুতেই জিততে দেবে না রক্তিমদের। গতকাল রাতে তুমুল ঝড় বৃষ্টির মধ্যেও ট্রেন যে 'বরাভূম' স্টেশন ছেড়ে এগিয়েছে সত্যিই ঈশ্বরের অসীম কৃপা। কিন্তু অপদেবতাও সমানতালে চেষ্টা চালাচ্ছে তাদের পথে বাধা দেওয়ার। সারারাত ধরে বিভিন্ন স্থানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ট্রেনটা সবে অর্ধেক রাস্তা পেরিয়েছে।

গতকাল রক্তিম একবার ফোনে টাওয়ার পেয়ে ফোন করতে পেরেছিল নন্দিনীকে। শুধু বলতে পেরেছিল, ''আগামীকাল আমি আসছি, সাবধানে থেকো। তারপর থেকে আর ফোন করতে পারেনি'', টাওয়ার নেই। অথচ ওর সাথে কথা বলা একান্ত জরুরি। উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল রক্তিম। কল্যাণেরও যেন আর ভালো লাগছে না।

ট্রেনটা দুটো স্টেশনের মাঝখানে আবার দাঁড়িয়ে পড়ল। কল্যাণ একটা হকারকে ডেকে দুকাপ চা নিয়ে—এল। গরম চায়ে চুমুক দিয়ে রক্তিম বলল, ''আমার তো খুব চিন্তা হচ্ছে কল্যাণ! ঠিক সময়ে পৌঁছাতে পারব তো কল্যাণ ট্রেনে! মন আনচান করছিল গলা কেঁপে গেল রক্তিমের। আরো লেট করে, কিন্তু সে তা বাইরে প্রকাশ করল না। বরং রক্তিমকে আশ্বস্ত করে বলল, ''এখন বরং আমাদের কিভাবে কি করা উচিৎ সেই ব্যাপারে একটা পরিকল্পনা করা যাক।'' তার প্রস্তবে সম্মত হল রক্তিম। দুজনে আলোচনা শুরু করল।

দুজনের আলোচনার মধ্যেই ট্রেনটা আবার চলতে শুরু করেছে। রক্তিম মাঝেমধ্যেই ফোন দেখছে। এখনও একই অবস্থা। দেখতে দেখতে দুপুর গড়িয়ে বিকাল হল। কল্যাণের কপালে চিন্তার ভাঁজ আরো গভীর হল। সন্ধ্যে হওয়ার আগে পৌঁছাতে না পারলে এতক্ষণের সব পরিকল্পনা ব্যর্থ হবে। অস্বস্তি বাড়তে লাগল রক্তিমেরও, একটা দ্বিতীয় প্ল্যানও ভেবে রাখা দরকার। ফোনে টাওয়ার আসতেই দেরি না করে নন্দিনীকে ফোন করল সে। সময় থাকতে থাকতে সবটা তাকেও ভালো করে বুজিয়ে দিতে হবে।

সন্ধ্যাবেলা ট্রেন হাওড়ায় এসে পৌঁছাল। এখান থেকে বাসে চড়ে ঘন্টাখানেকের মধ্যে বাড়িতে পৌঁছে যাবে রক্তিমরা। কিন্তু আগে আগে পৌঁছে প্রস্তুতি নেওয়ার যে পরিকল্পনা ছিল তার আর সুযোগ পাবে না। ভয় ক্রমশ গ্রাস করতে শুরু করল ওদের। কল্যাণ বলল, ''দাদা আপনি মালা পরে মাদুলি ধারণ করে ফেলুন।'' রক্তিম পরিবারের সুরক্ষার নিশ্চয়তা একপ্রকার জোর করল। বোঝ না পেয়ে নিজে এসব পরতে চাইল না। কল্যাণ যে বাড়ি পৌঁছানোর পর তাড়াহুড়ো হতে পারে। তাই আগে থেকে কাজ করে নেওয়া ভালো। কল্যাণের বারংবার অনুরোধে রাজী হল সে। এবার তাদের যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাড়ি পৌঁছাতে হবে। কি আছে ভাগ্যে কে জানে!

বাস থেকে নেমে নন্দিনীকে আবার ফোন করল রক্তিম। বৃষ্টি আবার বেড়েছে, চারিদিক ঝাপসা। রাস্তায় লোকজন নেই বললেই চলে। ফোনের ওপাশ থেকে কি বলল কিছুই বুঝতে পারল না সে। হঠাৎই একটা ভয়ার্ত চিৎকার করে উঠল নন্দিনী। তারপর কেটে গেল ফোনটা। কোনো কিছু না ভেবে বাড়ির দিকে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়াল দুজনে। ছুটতে ছুটতে বাড়ির দোরগোড়ায় এসে উপস্থিত হল রক্তিম। ঠিক পিছনেই হাজির হল কল্যাণ। শেষবারের মতো সাবধান করল সে, ''মনে রাখবেন আপনার আর বৌদির পূর্ণ সম্মতি না পেলে গদ্রবঙ্গা আপনাদের মেয়েকে নিতে পারবে না। তাই যাই হয়ে যাক মালা আর মাদুলি আগে বৌদিকে দেবেন। তারপর মেয়েকে পরাবেন। রক্তিম হয়ত শুনল, হয়ত শুনল না। হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল ঘরে। শিশুসদৃশ মূর্তিটাকে হাতে নিয়ে দরজার কাছে দাঁণাল কল্যাণ।

ঘর প্রায়ান্ধকার। তবু আবছা ছায়ার মতো দেখা যাচ্ছে ভিতরটা। রক্তিম দেখল নন্দিনী আর একটা অচেনা ছায়াশরীরের মধ্যে রিনিকে নিয়ে কাড়াকাড়ি পর্বের অন্তিমে সেই অচেনা লোকটা একটা ধাক্কা দিল নন্দিনীকে। মেয়েকে আঁকড়ে ধরেই ঘরের একপাশে ছিটকে পড়ল নন্দিনী। লোকটা ঘড়ঘড়ে গলায় জিজ্ঞাসা করল, ''তাহলে নিজে থেইকে বেটিকে দিবিক লাই?'' মাতৃত্বের শক্তিকে হাতিয়ার করে ঝাঁঝিয়ে উঠল নন্দিনী, ''আমি বেঁচে থাকতে আমার মেয়েকে কখনও কেড়ে নিতে পারবি না শয়তান।'' ঠাণ্ডা মাথায় নায়েকের কথামতো আবার এগিয়ে আসতে লাগল ওদের দিকে। কল্যাণ মারংবুরুকে স্মরণ করতে করতে কালো কাপড়ে জড়িয়ে দিল মূর্তির চোখদুটো। রক্তিম ততক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে নন্দিনীর পাশে। তাকে দেখে ভরসা পেল নন্দিনী, মেয়েকে তার কোলে তুলে দিল। ছায়াশরীরটা অনেকটা কাছে চলে এসেছে। খানিকটা ভয়েই বোধহয় ভুল করে ফেলল রক্তিম। হাতের একটা মালা আর মাদুলি পরম যত্নে পরিয়ে দিল মেয়ের গলায়। কল্যাণের চিৎকারে হুস ফিরল তার। তাইতো নন্দিনীকে আগে বাঁচানো দরকার। মেয়েকে শুইয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়াল সে।

গদ্রবঙ্গার মূর্তিটা ইতিমধ্যেই গরম হয়ে উঠেছে। অনেক চেষ্টা করেও কল্যাণ কোনভাবে আর সেটাকে হাতে ধরে রাখতে পারল না। তার হাত থেকে মাটিতে পড়ে যেতেই সরে গেল চোখের কাপড়। রক্তিম নন্দিনীর কাছে পৌঁছানোর আগেই ছোট একটা আর্তনাদ করে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল নন্দিনী। সাথে সাথে ঘরের আলো জ্বলে উঠল। সেই মূর্তি, সেই ছায়াশরীরকে আর কোথাও দেখা গেল না। কেউ কোথাও নেই। শুধু মেঝতে পড়ে রইল একটা ছেঁড়া কালো কাপড় আর নন্দিনীর নিষ্প্রাণ দেহ।

হতভাগ্য হতবাক রক্তিম দেখল ঘরের কোনায় শূন্য পড়ে আছে পার্সেলের বাক্সটা। যদিও সেদিকে তার ভ্রূক্ষেপ নেই। আরো বড় শূন্যতা ঘিরে ফেলেছে মনকে, তার সমগ্র চেতনাকে। মৃত নন্দিনীর জড়িয়ে ধরে দুঃখে হাহাকার করে উঠল রক্তিম। তার সাথেই তাল মিলিয়ে কেঁদে উঠল সদ্য মা হারা শিশুকন্যা। কল্যাণ এসে তার কাঁধে হাত রাখল। বলল, ''গদ্রবঙ্গার হাত থেকে আজ অবধি কেউ নিস্তার পায়নি। আপনার মেয়েকে বাঁচাতে পেরেছেন আপনি। এখন এর সব দায়িত্ব আপনার। একে মানুষ করাই আপনার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য।'' মেয়েকে পরম মমতায় বুকে জড়িয়ে আবার কেঁদে ফেলল রক্তিম।

——

অধ্যায় ২০ / ২০
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%