বিভাসবাবুর বাড়ি

কৌশিক কারক, আকাশ চন্দ, উৎস ভট্টাচার্য

বাড়িটা পেয়ে প্রথমে মনে হয়েছিল হাতে চাঁদ পেয়েছি। ঝাড়খণ্ডের এই প্রত্যন্ত প্রদেশে থাকার অসুবিধা খুব। বিশেষ করে বাঙালিদের থাকার নানা বখেরা আছে, সেসব বাঙালি মাত্রেই জানেন তাই আর বিশদে বললুম না। একটা গোটা বাড়ি সবরকম সুবিধে সহ নামমাত্র ভাড়াতে পাওয়া শুভলক্ষণ বিবেচনা করে এক শীতল বিকালে এসে নামলাম লোটাকম্বল সমেত। উদ্দেশ্য নিতান্তই সাধারণ, কিছুদিন কলকাতা থেকে গা ঢাকা দেওয়া। আমার প্রমোটিং—এর ব্যবসা আছে। সেই সূত্রে কিঞ্চিত রাজনীতি আর যৎসামান্য বেআইনি কম্মো একটু—আধটু করতে হয়। টাকার চিন্তা নেই, তাই মাঝেসাঝে একটু এদিক সেদিক করে ঘুরে বেড়াই। ব্যাপারটা হয়েছে কি, এই কিছুদিন আগে একটা বড় প্রোমেটিং—এর জন্য ঝপাঝপ গোটা কয়েক লাশ পড়ে যেতেই আমার তলব এলো মধ্যরাতের পার্টি অফিসের মিটিংয়ে। যেতেই আমাকে জামাই আদর করে বসিয়ে গায়ে পিঠে হাত বুলিয়ে বোঝানো হল অনেক কিছু। আমি যেটা আদপে বুঝলাম সেটা হল ক'দিন।

আমাকে অদৃশ্য হতে হবে যদি পার্মানেন্টলি অদৃশ্য না হতে চাই। অগত্যা 'বিভাসবাবু'র আগমন ঘটল এই কাহিনীতে। নির্দায় এবং অতি নিরীহ মানুষ হলেন বিভাস সামন্ত। ঠাকুরের কৃপায় ও নিজের পরিশ্রমে অনেক কিছু করেছেন সমাজের জন্য ও নিজের জন্যও। যদিও কু—লোকে নানা কু—কথা বলে। তবে লোকের কথা না ধরাটাই ভালো।

আমার গা ঢাকা দেওয়ার জায়গাটি তিনি নিজেই বাতলে দিলেন। বাকিদেরও দেখলুম শুনেই খুব পছন্দ হয়ে গেল। আমার দলীয় নেত্রী প্রায় শাশুড়ির মতো ছলছল চোখে আমায় বিদায় জানালেন এবং তাঁরই নির্দেশে পুরো দু—পের্টি দামি মদ আমার গাড়িতে ঢুকে গেল বিদায় স্মৃতি স্বরূপ। আর কি চাই রে পাগলা!!

মধ্যরাতে শহর ছাড়লাম কারোকে কিছু না জানিয়েই।

বাড়িটা সত্যি খুব নিরিবিলি। বড় একটা বাগান পরিচর্যার অভাবে জঙ্গলে পরিণত হয়েছে। উঁচু পাঁচিল ঘেরা চারপাশে।

সবমিলিয়ে একটা চমৎকার গা ঢাকা দেওয়ার আদর্শ স্থান। একটাই সমস্যা শেষ জনবসতি বেশ খানিকটা দূরে। আচমকা শরীর খারাপ হলে বা কোন দুর্ঘটনা ঘটলে লোক ডাকতে ডাকতে রুগী ছবি হয়ে যাবে।

বাড়িটা যতটা অপরিষ্কার হবে ভেবেছিলাম ততটা নয়। একটা কেয়ারটেকার আছে। এমনিতে হয়তো রোজ আসে না। তবে খবর পেয়ে সে এসে বাড়িটা বাসযোগ্য করে দিয়েছে। মাঝবয়েসি দেহাতি মানুষ। কথা বলে কম, হাসে বেশি। লোকটিকে আমারও বেশ পছন্দ হলো। রাতের খাবার বলল ওই দিয়ে যাবে। আর কাল থেকে এখানেই রান্না করতে আসবে ওর বউ। খাওয়াদাওয়া নিয়ে বিশেষ ব্যস্ত নই আমি কোনকালেই। লোকটির নাম বহরু। সে একটা ফ্লাক্স ভরে মোষের দুধের চা নিয়ে এসেছে। সঙ্গে ওদের ঘরে তৈরি নিমকি জাতীয় একটা খাবার। দীর্ঘ রাস্তা গাড়ি চালিয়ে এসে বেশ ক্লান্ত লাগছিল, বেশ চাঙ্গা হয়ে উঠলাম আগুন গরম চা পেটে যেতে। বাড়িতে ইলেকট্রিসিটি আছে কিন্তু কয়েকটা আলো খারাপ তাই ঘরগুলো আলো—আঁধারিতে মাখামাখি। বাথরুমে আলো ঠিক আছে এটাই বাঁচোয়া।

সন্ধ্যা সাতটার আগেই বহরু বিদায় নিল আজকের মতো। সদর দরজা ভালো করে এঁটে দেখে নিলাম কোনো ফাঁক—ফোকর থেকে গেল কিনা। তারপর নিশ্চিন্তে ঘরে এসে একটা বোতল খুললাম। সত্যিই জায়গাটা নির্জন বটে। একটানা বিভিন্ন রকমের ঝিঁঝির ডাক শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল পৃথিবীর মধ্যে আমিই কেবল মাত্র টিঁকে আছি। জঙ্গলের ভেতর থেকে ডেকে উঠছে কিছু নাম না জানা অজানা পাখি। এছাড়া কোন সভ্যতার শব্দ কানে আসছে না। মানুষ নেই কাছাকাছি সে তো জানাই আছে। কয়েকটা রুটি আর মাংসের তরকারি রাখা আছে টেবিলে। বহরু দিয়ে গেছে রাতের জন্য। আজ ওতেই চলে যাবে। রাত ন'টার মধ্যেই খাওয়া সেরে বিছানায় গিয়ে টের পেলুম এদিকে ঠান্ডার ভাব একটু বেশিই। একটা হাল্কা কম্বল ভাঁজ করে রাখা ছিল পায়ের কাছে সেটা খুলে নিলাম। একটা কেমন যেন গন্ধ লাগলো নাকে। ব্যবহার না হওয়ার জন্য গন্ধটা হয়েছে। তবে দামি মদের গন্ধ অচিরাৎ কম্বলের গন্ধ ঢেকে দিল। ঘুমিয়ে পড়তেও দেরি হল না।

কত রাত জানি না, হঠাৎ যেন কিসের জন্য ঘুমটা ভেঙে গেল। চোখ জুড়ে আছে, তখুনি ফের ঘুমিয়ে পড়তাম কিন্তু মনে হল দরজায় কে যেন টোকা দিচ্ছে। নেশার ঘোর আর ক্লান্তির ঘুম একসাথে চেপে ধরেছে আমায়। টোকা দেওয়ার শব্দ ভালো করে খেয়াল না করলে শোনাই যাচ্ছে না। কয়েক মুহূর্ত যেতে না যেতেই ফের ডুবে গেলাম গভীর নিদ্রায়।

পরদিন সকালে উঠলাম বেশ দেরি করে। শরীর সামান্য যেন ভারি লাগছে। নতুন জায়গায় আবহাওয়া মনে হচ্ছে মানিয়ে নিতে সময় লাগবে। বহরুর দেখা নেই। অবশ্য দুপুরের আগে দেখা না হলেও অসুবিধা নেই। ফ্লাক্স ভর্তি চা আছে, এখনো গরম। নিমকিও আছে ক'টা। চা খেয়ে আমি একটু বাড়ির চারপাশটা দেখতে বেরোলাম। বাড়িটা ঘিরে যে জঙ্গলটা হয়ে আছে সেটা রীতিমতো ঘন ও বিস্তৃত অনেক দূর অবধি। বাড়ির ভেতরের বাগানটাও খুব কম নয়। পেছনের দিকে অনেকটা মাটির ঢিবি টিলার মতো উঁচু হয়ে আছে কবে থেকে জানি না তবে সেটার ওপর গজিয়ে ওঠা বুনো ঝোপঝাড় দেখে মনে হল নাহোক বছর কয়েক কেউ এদিকে আসেনি। বাড়ির পেছনে দুটো তালাবন্ধ ঘরও চোখে পড়ল। সেগুলোরও দরজা জানালা সমান ঝোপঝাড় হয়ে গেছে।

এটা বিভাস বাবুর কেনা বাড়ি না বানানো জানি না তবে যেটাই হোক বাড়িটা অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে অনেক দিন এটা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। আমি ঘুরে দরজার দিকে আসার জন্য হাঁটতে শুরু করলাম। তখনই খেয়াল হল সামনের ঘন জঙ্গল থেকে কোন পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে না। একদম নিস্তব্ধতা ছেয়ে গেছে চারপাশে।

আমি ডাকসাইটে ধরনের লোক, যুক্তিতর্কের বাইরে বিশেষ কিছু নিয়ে ভাবি না কোনকালেই। সেই আমিও মিনিট কয়েক থমকে গেলাম চারপাশে ছড়িয়ে পড়া নিস্তব্ধতায়। মনের অগোচরে কেউ যেন বিপদঘন্টি বাজিয়ে দিল। গা ঝেড়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে দুপা এগিয়ে গেলাম বাইরের দিকে। একটা গাছের পাতাও নড়ছে না। বায়ুশূন্য এরকম পরিবেশ কলকাতায় অনেকবার দেখেছি। কিন্তু ফাঁকা পার্বত্য অঞ্চলে এমন হয় বলে জানা নেই। সামনে উঁচু টিলার ধাপে ধাপে ক্রমশ ঘন হয়ে যাওয়া অরণ্য কিছু অজানা রহস্য কি গহীন বুকে চেপে রেখে দিয়েছে! আমার চোখ খুব ভালো। হাতের নিশানাও খারাপ নয়। তবে সঙ্গের রিভলবারটা লাইসেন্স ছাড়া এটাই সমস্যা। আমি ব্যবসায়ী মানুষ তাই সর্বদাই একটু সাবধানে থাকতে হয়। এই অস্ত্রটাও ওই সাবধানতার অঙ্গ।

ঝুপসী জঙ্গলে খানিকটা খড় চোখ বুলিয়ে মনে হল তেমন কিছু ভয়ের নেই। এসব দিকে বাঘ আছে বলেই শুনিনি। ঘুরে নিজের ঘরে চলে এলাম। বাড়ির ভেতরের দিকটা একটু সরেজমিন করার ইচ্ছা আছে। এই জঙ্গলে এতবড় একটা বাড়ি না বানিয়ে কলকাতার দুটো ফ্ল্যাট কিনে রাখলে কত লাভ হতো ভাবলেই আমার গা চড়চড় করছে।

তা সে যাকগে, আমার টাকা তো আর যায়নি। বাড়িটা আড়াইতলা বললে সঠিক বলা হয়।

বিরাট জায়গায় ছড়িয়ে খেলেছে পুরো। এক একটা বিশাল মাপের। ছোট ঘরও আছে। কিন্তু সেগুলো তালা মারা। বড় গোটা পাঁচেক ঘর ব্যবহার করা হয় মনে হল। আমি বাড়িঘর ঘেঁটেই খাই বলে ম্যাপিংটা মোটামুটি বুঝি। দোতলায় দুটো ঘর পেরিয়ে আড়াই নম্বর ঘরের কাছে এসে টের পেলাম বাড়ির পেছনে যে দুটো বন্ধ ঘর দেখে এলাম এই ঘরটা ঠিক তাদের মাথার ওপরে উঠেছে। দরজাটা মজবুত ও শক্ত করে আটকানো। এখনো অবধি যে ক'টা বন্ধ দরজা পেলাম কোনটাই এত সুরক্ষিত করে আটকানো নেই। তাহলে এটা এত মজবুত করার দরকার পড়ল কেন!

যদিও আমার মাথা ঘামানোর কিছু নেই তাও ব্যাপারটা দেখে একটু খটকা খেলাম।

একটু আনমনা হয়ে গেছিলাম, চমক ভাঙলো নীচে গলার আওয়াজ পেয়ে। বহরু এসেছে বোধহয়। নীচে নেমে এলাম। বহরু বিরাট একটা টিফিন কৌটো ভরে নাহোক পাঁচ রকম খাবারদাবার নিয়ে এসেছে। নতুন চাও করে এনেছে। আমি বারান্দায় বসে চায়ের কাপ হাতে নিতেই বহরু বলল—'বাবু রাতে আসতে পারবো না। খাবার যা এনেছি আপনার রাতে হয়েও থেকে যাবে।'

আমি একটা পাঁচশো টাকার নোট বের করে তার দিকে বাড়িয়ে ধরে বললাম—'এটা রাখো, পরে আবার দেবো। রাতে কোথাও যাবে নাকি, আসবে না বলছো!'

বহরু টাকাটা পকেটে পুরতে পুরতে ঘাড় নেড়ে বলল—'কোথাও যাবো না, বিকেল থেকে তুলকালাম ঝড়বৃষ্টি হবে তাই বেরোতে পারবো না।'

আমি একটু বেকুবের মতো বহরুর দিকে তাকিয়ে থেকে বললাম—'বিকেলে ঝড়বৃষ্টি হবে তুমি জানলে কি করে?'

বহরু ধবধরে ফর্সা দাঁত বের করে জবাব দিল—'আমি কেন গোটা গ্রাম জানে আজ বিকেল থেকে তুমুল হবে। এই জঙ্গল আমাদের অনেক কিছু বলে দেয়। শুনছেন না গোটা জঙ্গল চুপ করে গেছে। সব পাখি, পোকার দল পালিয়ে গেছে। ওরা টের পায় দুর্যোগ আসলে। আমাদেরকেও বলে দেয়।'

মনে মনে ভাবলাম সেই জন্য এত নিস্তব্ধতায় ঢেকে গেছে জঙ্গল। আমি আগেই লক্ষ্য করেছি এই পরিবর্তন। বহরু ভেতরে কি সব করতে চলে গেল। আমি চায়ের কাপ শেষ করে একটা সিগারেট ধরিয়ে চিন্তা করলাম বন্ধ ঘরের কথাটা একটু ঘুরিয়ে বহরুকে জিজ্ঞেস করলে কেমন হয়। বহরু মিনিট পনেরো পর চায়ের কাপ নিতে এল। কাপটা হাতে তুলে নিয়ে বলল—'বাবু আমি মোটামুটি সবকটা জানালা বন্ধ করে দিয়ে গেলাম। আপনার শোবার ঘরেরটা শুধু খোলা আছে। ওটা বিকেলের আগেই বন্ধ করে দেবেন। আর আজ রাতে মোটে দরজা খুলে বাইরে বেরোবেন না। ঝড়বৃষ্টি হলে কিছু সাপখোপের উপদ্রব বাড়ে।

এদিকে তেমন একটা হিংস্র প্রাণী নেই তবে বুনো কুকুরের মতো একজাতের জন্তু আছে যেগুলো বেশ ভয়ংকর। পারলে হাতের কাছে বেশকিছু বাতি আর টর্চ রাখবেন। আলো যাবেই, আর একবার গেলে আজ আর আসবে না।'

বহরু খালি কাপ নিয়ে চলে যাবার জন্য ঘুরতেই আমি বললাম—'আচ্ছা বহরু এই বাড়ির সবকটা ঘর তুমি কোনদিন খোলা দেখেছো?'

একথায় বহরু কেন জানি না তার স্বভাবসিদ্ধ হাসিটা হাসল না। সে একটু গম্ভীর হয়ে বলল—'বাড়িটা কলকাতার বাবু কেনার পর আমি এখানে ঢুকেছি। আমি এসে থেকে বন্ধ ঘরগুলো বন্ধই দেখেছি। আমার খোলার কোন দরকার পড়েনি, আর কলকাতার বাবু তো থাকেই না।'

বললাম—'তার আগে বাড়িটা কার ছিল জানো না বা হাসলও না। তুমি তো এখানকার মানুষ।'

আমার কথায় বহরু চমকেও গেল না। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল—'আপনি শহরের মানুষ বাবু, শুনলেও সব কথা মানবেন না। তাই এসব শুনে কি হবে। ক'দিন ঘুরতে এসেছেন, থাকুন, ঘুরে বেড়িয়ে চলে যান।'

বললাম—'সবাই তো অবিশ্বাসী নাও হতে পারে, তোমার যদি অন্য কোন অসুবিধা না থাকে তাহলে বলতে পারো।' আমার কথায় বহরু বিশেষ কান দিল বলে মনে হলো না। সে পাথুরে পাহাড়ের মতো নির্লিপ্ত মুখে বলল—'এই অঞ্চলটা আমাদের আদিপুরুষ থেকেই আলাদা করে রাখা হয়েছে। এই বাড়িটা পাহাড়ের শেষ ধাপে করা। এর পেছনে যদি আরেকটু যান দেখবেন গভীর খাদ নীচে নেমে গেছে। আমরা এটাকে বলি নরকের দরজা। আমাদের পূর্বপুরুষরা জানতেন ওই দরজার মুখ কোথায়। ওনারা জানতেন কখন দরজা নিজে থেকেই খুলে যায়। সেই সময় আমাদের বাঁচার উপায়ও তাঁরা বলে গেছেন। আরেকভাবেও দরজা খোলা যায়, সময়ের আগেই। সেটা সবাই জানে না।'

পাহাড়ি কিংবদন্তি বড় ভয়ানক বস্তু। আধুনিক সমাজে তা যতই হাস্যকর শুনতে লাগুক না কেন কোথাও একটা তার ভয়ঙ্কর সত্যতা লুকিয়ে থাকে। এটা পাহাড়ের সব মানুষের বিশ্বাস। শুধু জানা ছিল না আমার। বললাম—'এই গল্পের সাথে এই বাড়ির সম্পর্ক কোথায়?' বহরু যেন আপনমনে কথা বলছে এমন ভঙ্গিতে বলল—'অসময়ে একটা বিশেষভাবে সেই দরজা খোলার কায়দা একজন জানত। সে খুলতে গেছিল। আর তাকে দেখেনি কেউ।'

চিরাচরিত নিয়মে ভূতের গল্পের ধারা ধরে ফেললাম। বললাম—'সে এই বাড়ির প্রথম মালিক, তাই তো?' বহরু অচেনা মানুষের মতো আমার দিকে তাকিয়ে বলল—'না, সে একটা সাধুবাবা ছিল। এখানকার লোক নয়। তোমার দেশের লোক। খুব ক্ষমতা ছিল বাবার। আমাদের মোড়লের ঘরে বাবার ছবিও ছিল। পরে যদিও সেটা হারিয়ে যায়। সবাই খুব মানতো ওনাকে। ওনার নিখোঁজ হওয়ার পর এই বাড়িতে আর কেউ থাকে না। আগের মালিক জীবনে আসেই নি। আর এই মালিক বারকয়েক বন্ধু—বান্ধব নিয়ে এসেছে বটে কিন্তু দিন তিনেক পরেই চলে যায়। অন্য লোক বলতে আপনিই প্রথম একলা এসে থাকলেন।'

বহরু চলে যেতে আমি স্নানঘরে ঢুকলাম। কলের জল তুলে দিয়েছে বহরু। বিশাল বিশাল ড্রাম ভর্তি করা আছে। তিনদিন জল না তুললেও অসুবিধা নেই। জলটা বেশ গরম। প্রথম মগটা মাথায় ঢালতেই হাত থেকে সেটা পড়ে যাবার জোগাড় হল। উষ্ণ জল হিমশীতল বরফের মতো নামতে লাগল শরীর বেয়ে। বরফগলা জলও বোধহয় এর থেকে কম ঠান্ডা হয়।

দাঁতে দাঁত লেগে গেল প্রায়। কোনরকমে গা মাথা মুছে কাঁপতে কাঁপতে বেরিয়ে এলাম। মগটা মাটিতে পড়ে ছিল সেটা ড্রামের গায়ে লাগিয়ে দিতে গিয়ে ফের জলে হাত লেগে গেল। অবাক হয়ে দেখলাম জল একইরকম উষ্ণ আছে।

দুপুরের খাওয়াটা সারলুম খুব অসোয়াস্তির সঙ্গে। যুক্তি ও বুদ্ধির বাইরে পরিস্থিতি চলে গেলে কিভাবে সামাল দিতে হয় জানা নেই। তার ওপর হঠাৎ করে আকাশ অন্ধকার করে এসে দুপুর দুটোতেই বিকেল পাঁচটার মতো দেখতে লাগছে। এবং আশ্চর্যজনকভাবে এখনো বিন্দুমাত্র বাতাসের কম্পন নেই গোটা পাহাড়ে। খেয়ে উঠে মুখ ধুতে গিয়ে পরের ধাক্কাটা খেলুম। পায়ের নীচে পট করে কি একটা ফাটলো টের পেয়ে তাকিয়ে দেখে একটা অসাধারণ লাফ মেরে নিজেই অবাক হয়ে গেলুম। লম্বা লম্বা কেঁচো আর জোঁকের মাঝামাঝি কিছু সরীসৃপ প্রাণী বাড়ির ভেতর থেকে সারিবদ্ধভাবে বেড়িয়ে এসে বেসিনের গর্ত দিয়ে গৃহত্যাগ করছে। তাদের মধ্যে গোটা কয়েক প্রাণ দিয়েছে সবে আমার চটির নীচে। বাকিরা তাদের সসম্মানে পাশ কাটিয়ে ফের নিজেদের সারি ঠিক করে নিয়ে পেরিয়ে যাচ্ছে জায়গাটা। আমি তড়িঘড়ি টর্চ নিয়ে লাইনের শুরু খুঁজতে লেগে গেলাম। প্রাণীগুলো বেশি জটিল রাস্তা নেয়নি। সহজেই এগোলাম এবং আমার আশঙ্কা সত্যি প্রমাণিত করে আবিষ্কার করলাম সেই মজবুত করে আটকানো দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। চৌকাঠের পাশ থেকে অবিরামভাবে বেরিয়ে আসছে প্রাণীগুলো। বুদ্ধিমানের মতো ওদের না ঘাঁটিয়ে চুপচাপ সরে এলাম। এমনিতেই স্থানত্যাগ করছে যখন তখন খুঁচিয়ে লাভ নেই। বারান্দায় বসে ভাবছি সত্যিই যদি তেমন ঝড়বৃষ্টি শুরু হয় তাহলে গাছপালা ভেঙে বাড়ির কোন ক্ষতি হবে নাতো। কি কুক্ষণে এখানে এসে উঠলাম তা কে জানে! দুপুর আড়াইটা বাজে মোটে। মোবাইল—এর চার্জ কম দেখে আগেই চার্জে বসিয়ে দিয়েছি। এরপর কারেন্ট চলে গেলে আর কিছু করা যাবে না। সামনের পাহাড় আর জঙ্গলটা আরো ঘন ও গভীর মনে হচ্ছে মরা আলোর জন্য। সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে পড়ল বাড়িতে কেউ জানে না যে আমি কোথায় আছি। অবশ্য জানাবার মতো তেমন কেউ নেই। বউ ব্যস্ত নিজেকে নিয়ে। সন্তানাদি নেই এখনো অবধি। যদি এ যাত্রায় টিঁকে যাই তাহলে পরে হলেও হতে পারে। বাবা জন্মের আগেই নাকি নিরুদ্দেশ হয়েছেন। শোনা যায় সাধু হতে গেছেন। বউ বাচ্চাদের রেখে ওমন সাধু হলে কতদূর তা ফলপ্রসূ হয় জানি না। সেই শোকে মা আমার জন্মের পর বছর দুই কাটিয়ে আমাকে দিদিমার জিম্মায় দিয়ে বাবারই এক বন্ধুর হাত ধরে ফের নতুন জীবন শুরু করতে চলে গেলেন। মামারা ফেলে না দিয়ে বড় করে তুলেছেন এটাই যথেষ্ট আমার কাছে।

লেখাপড়া বেশি হয়নি। জীবনটা বই—এর মধ্যে মুখ গুঁজে কাটিয়ে দেওয়ার জন্য বেশ ছোট বলেই আমার বিশ্বাস। তাই বছর পনেরো বয়সেই বিভিন্ন কাজে হাতেখড়ি দিয়েছি। যদিও লোকের কাছে সেগুলো নাকি সমাজ বিরোধী কর্ম কিন্তু আমার কাছে ওগুলো নিজের ক্ষমতা যাচাই করার প্ল্যাটফর্ম। এবং বলা বাহুল্য যে আমি সেখানে স্কলারশিপ নিয়ে পাস করেছি। যারা একদা আমাকে দেখে ঘেন্নায় এড়িয়ে যেতো তারা আজও এড়িয়ে চলে তবে দু চোখে ঘেন্না থাকে না, থাকে ভয়। আমি উপভোগ করি তাদের ভয়টাকে। সবথেকে নাক উঁচু বাড়ির মেয়েকে তুলে নিয়ে এসে বিয়ে করেছি। আজ সেবাড়িতে আমি গেলে সবাই প্রায় হাত—জোড় করে দাঁড়িয়ে থাকে। ওটাও ভয়। বউ ক্লাব আর পার্টিতে যত টাকা খরচা করে তার এককণাতে একটা সংসার ভালোভাবে চলে যায়।

সুতরাং আমাকে এই পাহাড়ি ভূতের গল্প শুনিয়ে ভয় দেখানো কঠিন কাজ। ঠিক সাড়ে তিনটে নাগাদ আচমকা ঝড়ো হাওয়া বইতে শুরু করতেই আমি উঠে পড়লাম বারান্দা ছেড়ে। সদর দরজা শক্ত করে আটকে দিয়ে নিজের ঘরে এসে বসে একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে নিয়ে রাখলাম টেবিলে। তারপর দিনের প্রথম বোতলটা খুলে ঢালতে লাগলাম গ্লাসে। পাশে শীতল শরীরে বুকভরা মৃত্যু নিয়ে শুয়ে আছে আমার অত্যাধুনিক দামি বিদেশি রিভলবার। আমি বিড়বিড় করে বলে উঠলাম নিজের মনেই—'আয় শালা কে আসবি, দেখে নেবো কত বড় মাইকা লাল আছিস'। আগুনের মতো গলা বেয়ে নেমে গেল প্রথম ঢোঁকটা। হঠাৎ যেন মনে হল আমাকে কেউ লক্ষ্য করছে। রিভলবারটা হাতে নিয়ে মাথা ঘোরাতেই চোখ পড়ল আলমারির সাথে লাগানো আয়নাটার দিকে। এক পলকের জন্য মনে হল আয়নার ভেতর থেকে আমাকে দেখছিলো কেউ। না যে সে কেউ নয়, আমাকে দেখছিলো একজন সাধুবাবা।

আমি কি উন্মাদ হয়ে যাচ্ছি, না এটা শুধুই দৃষ্টিবিভ্রম? যেকোনো বিপদের সময় ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করা উচিত। কিন্তু সমস্যা হল মাথা কোন বিয়ারের বোতল নয় যে ফ্রিজে ঢুকিয়ে দিলাম আর ঠান্ডা হয়ে গেল। আয়নার কাঁচটার দিকে কতক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম বলতে পারবো না, সম্বিত ফিরল একটা মেঘের গর্জন কানে আসতে।

একটা নির্জন গভীর খাদের কিনারে ফাঁকা বিশাল বাড়িতে একলা বসে দৃষ্টিবিভ্রম হওয়াটা কোন কাজের কথা নয়। তারওপর সকাল থেকেই যে ধরনের ব্যাপার—স্যাপার দেখছি তাতে আমার জায়গায় অন্য কেউ হলে অবধারিত নার্ভাস ব্রেকডাউন হতো। নিজেকে ধাতস্থ করতে ফের খানিকটা নিট পেগ গলায় ঢেলে দিলুম। কে যেন বেশ বলেছিল ভয় পেলে ভয়ের উৎসের মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়াতে। আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম আমি। সাধারণ আয়নার মতোই আমার হাল্কা দাড়ি সহ মুখ দেখা যাচ্ছে সেখানে। একটু ঘোলা লাগছে বোধহয় মোছামুছি হয় না বলে। আমি একটা হাত বাড়িয়ে কাঁচটা একটু ঘষে দিলাম।

গোটা আয়নাটা তার ফ্রেমের পরিধির মধ্যে তরলায়িত বস্তুর মতো দুবার দুদিকে ঢেউ খেলিয়ে স্থির হয়ে গেল। আমিও স্থির হয়েই কাণ্ডটা দেখলাম। ঠিক কি করা উচিত তৎক্ষণাৎ মাথায় এলো না। এবারেও সময়ের জ্ঞান হারিয়ে বেশ কিছুক্ষণ ওভাবেই দাঁড়িয়ে রইলাম আয়নাটার দিকে তাকিয়ে। যেটা ঘটলো সেটা ফের ঘটানোর সাহস যোগালো না। পায়ে পায়ে পিছু হেঁটে খাটে এসে বসে পড়লাম। গ্লাসে পেগ ঢালতে গিয়েও না ঢেলে একঢোঁক সোজাসুজি বোতল থেকেই চুমুক মেরে পাঠিয়ে দিলাম ভেতরে। আগুনে হাল্কার মতো সেটা নেমে যেতেই খানিকটা বুদ্ধি খুলল। পাশ থেকে রিভলবারটা তুলে নিলাম হাতে। কয়েক মিনিট ধরে সেটা একমনে চেক করে নিলাম যা যা দেখার আছে।

তারপর উঠে দাঁড়ালাম জোরালো টর্চটা হাতে নিয়ে। ওপরের ওই বন্ধ ঘরটা আমাকে দেখতে হবে। কিছু না বোঝা ঘটনার সূত্র ওখানেই আছে বলে আমার ধারণা তৈরি হচ্ছে। আয়নাটার দিকে না তাকিয়েই বেরোবার ইচ্ছে ছিল কিন্তু সেটা করা গেল না। সেটা যখন পেরিয়ে যাচ্ছি তখন অনিচ্ছাসত্ত্বেও চোখে পড়ল কোন প্রতিবিম্ব না সেখানে। কোন প্রতিবিম্বই পড়ছে না আয়নাতে সেটাও লক্ষ্য করলুম। মাথার ভেতর থেকে আয়নার কথাটা বের করে দিতে দিতে ঘর ছেড়ে বাইরে চলে এলাম। প্রথমেই মনে এলো পোকাগুলোর কথা। জোরালো টর্চটা মেরে দেখলাম লাইনটা যাচ্ছে কিনা এখনো।

এই একটা স্বস্তি পেলাম এতক্ষণ পরে। কোনো পোকা নেই দূরদুরান্ত অবধি। বাইরে ঝড়ের মতো শব্দ কানে আসছে তবে বৃষ্টিও শুরু হয়ে গেছে কিনা বুঝতে পারলাম না। আলো চলে গেছে যথানিয়মে। বাইরে থেকে খুব কম হলেও একটা আলোর মতো আসছে। হিসেব মতো এখন কটকটে রোদ থাকার কথা। বাইরে থেকে যে পরিমাণ আলো আসছে তা দেখার পক্ষে যথেষ্ট নয়। টর্চ জ্বেলে দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলাম। প্রথম হলঘর পেরিয়ে যেতে যেতেই আমার মনে হলো কিছু একটা অন্যরকম অনুভূতি হচ্ছে। থমকে দাঁড়িয়ে আগে পিছে দেখে নিলাম একবার। কিছু নেই। কিন্তু আমার তাও মনে হচ্ছে কিছু একটা মিস করছি। টর্চটা একটু ওপরে তুলে ঘোরাতেই টের পেলাম কি ঘটছে।

গোটা ঘরের কার্নিশ, জানলার মাথায় এমনকি সিলিং ফ্যানের ওপর থেকে ঝুলছে নানা জাতের ও সাইজের সাপ। তাদের নিঃশব্দ সঞ্চার অদ্ভুতভাবে অন্যরকম। তারা যেন হঠাৎ করে নিজেদের জায়গা থেকে আচমকা এই ঘরে চলে এসেছে, এরকম একটা ভাব। নিজেরাই যথেষ্ট ঘাবড়ে আছে মনে হচ্ছে। তাও সাবধানের মার নেই চিন্তা করে হাতের রিভলবারটা রেডি করে নিলাম।

আগের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া কর্তব্য সবারই। আমিও সেটাই পালন করে দুনম্বর ঘরে ঢুকলাম। এ ঘরের পরিস্থিতি স্বাভাবিক মনে হলো দেখে। কোথাও কোন সরীসৃপের টিকিও দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু মেঝেতে সাদা মুড়ির মতো কি সব ছড়িয়ে আছে গোটা ঘরে। আমি একটু দাঁড়িয়ে পড়েছিলাম সাপের খোঁজ নিতে গিয়ে, সেই ফাঁকে গোটা কয়েক মুড়ি আমার পায়ের উপর নড়ছে দেখে পা ঝাঁকিয়ে ফেলে দিয়ে আলো মারলাম সেগুলোর ওপরে। তখন মাথার ঢুকলো এগুলো মোটেই মুড়ি নয়। মৃত পচা প্রাণীর শরীরে জন্মায় এই ধরনের পোকা। এগুলোকে ম্যাগট বলেই লোকে চেনে। আর তাদের সাথে সাথেই চোখ পড়লো মোটা মোটা গাঁটওলা তেঁতুল বিছে ঘুরছে খুব মন্থর গতিতে। কুচকুচে কালো কয়েকটা কাঁকড়া বিছে দেখে মনে মনে নিজেকেই গাল দিলাম বুট না পরে আসার জন্য।

পায়ে ঘরে পরার হাওয়াই চপ্পল সম্বল করে বিচ্ছেদের রাজত্বে প্রবেশ করাটা খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। পাহাড়ি বিছে অতি ভয়ঙ্কর জীব। ঠিকভাবে কামড়ালে মৃত্যু ঘটাও অসম্ভব নয়। আর রিভলবার চালিয়ে কাঁকড়াবিছে মারাটাও বিশেষ কাজের কথা নয়। আমি বুলেটের ঝুড়ি নিয়ে আসিনি। সামনে আরো কি কি আসবে জানি না। বুলেটের কাজ অনেক আছে। যতটা পারা যায় বিছেদের এড়িয়ে খুব সাবধানে হল—ঘরটা পেরোতে শুরু করলাম। অবস্থা যা দেখছি বন্ধ ঘরটা খুললে বাঘ সিংহ বেরিয়ে না পড়ে এখন সেই চিন্তা করছি। পেছন দিকে যাবো না সামনে সেটা ভাবতে ভাবতেই ঘরটা পেরিয়ে গেলাম। এবার সামনে সেই দরজা। কিন্তু খুলবো কি করে? দরজায় লাগানো তালাটা খুব ভালো করে দেখলাম। বড় মাপের তালা হলেও জিনিসটা বেশ পুরোনো। আধুনিক পদ্ধতিতে তৈরি হলে ঝামেলা ছিল। তালাটা একবার ধরে দেখলাম। একটু নড়বড়ে হয়ে আছে মনে হলো।

কয়েক মিনিট সময় নিলাম পরবর্তী কর্তব্য ঠিক করতে। তারপর একটু পিছিয়ে গিয়ে রিভলবার তুলে নিশানা করলাম তালাটাকে।

বন্ধ ঘরে গুলির আওয়াজটা বোমার মতো কানে এসে লাগলো। আগুনের ঝলকের মতো স্ফুলিঙ্গ ঠিকরে এলো তালাটা থেকে। তবে কাজ হয়েছে দেখলাম একটা বুলেটেই। তালাটার একাংশ দুমড়ে ঝুলছে দেখা গেল আংটা থেকে। তালাটা তবুও যথেষ্ট কসরত করে খুলতে হল। দরজাটা খোলার আগে রিভলবার আর টর্চ দুটোই বাগিয়ে ধরলাম সুবিধে মতো।

তারপর এক লাথি মারলাম দরজাতে। অত জোরে লাথি খেয়েও দরজাটা ছিটকে খুলল না। খুব আলতোভাবে ভেতর থেকে যেন কেউ খুলে দিল এমন ভাবে সরে গেল পাল্লা দুটো। ঘরটা পুরো খালি শুধু একটা জিনিস ছাড়া। ঘরের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে একটা অতি সাধারণ ও পুরনো ফ্রেম দিয়ে তৈরি আয়না।

চৌকাঠ টপকাতে গিয়েও থমকে গেলুম। আগের দুটো ঘরে যা কেলো দেখে এলুম তাতে নিজের ছায়াটাকেও সন্দেহের বাইরে রাখা যাচ্ছে না। জোরালো টর্চটা বেশ ভালো করে ঘোরালুম গোটা ঘরে। যা ভেবেছি তাই, চৌকাঠের পর কোন মেঝে নেই। পুরো ফাঁকা অন্ধকার হাঁ করে আছে। আয়নাটা একদম ঘরের মাঝ বরাবর স্থির হয়ে ভাসছে শূন্যতেই। ব্যাপারটা কোন বিজ্ঞানের সাহায্যেই বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু এমন অসম্ভব ঘটনা নিজের চোখে দেখেও ভুলই বা বলি কি করে!

ঘরটা আগেরগুলোর তুলনায় ছোট ঠিকই, কিন্তু তা বলে দরজার ফ্রেম ধরে হাত বাড়ালেই যে নাগাল পাবো তাও নয়। কিন্তু আয়নাটা তো ধরতে হবে। দমকা ঝড়ে দরজা জানালা কেঁপে কেঁপে উঠছে। বাইরে তুলকালাম চলছে টের পাচ্ছি। ভেতরেও আমি কাছাকাছি চালাচ্ছি ওইরকমই। এখান থেকে বেরিয়ে যেতে পারলে বিভাস সামন্তর ছবিতে মালা পরাবোই শালা। এখন বাড়ি খুঁজে এই আঁধারে দড়িদড়া যোগাড় করা সম্ভব? ফের মুড়ি মাখানো বিছেদের কাটিয়ে সাপের জঙ্গল পেরিয়ে ফেরৎ যাওয়াটাও খুব সোজা নয়। একবার আয়নাটাতে গুলি চালিয়ে দেখবো কি ঘটে! টর্চের আলোয় এটাতেও কোন প্রতিফলন ঘটছে না। কিন্তু বিশেষত্ব আছে আয়নাটায় এটা ধরে নেওয়া যায়। একটু সাইড থেকে রিভলবার তুলে আয়নার মধ্যবিন্দুতে গুলিটা করলাম। বুলেট আয়নার ভেতরে ঢুকে গেল বেমালুম ভাবে। যথেষ্ট হাই ভেলোসিটি বুলেট আমার। আয়না ফুঁড়ে বেরিয়ে গিয়ে ওপাশের দেওয়ালটা কিছুটা ক্ষতি করার কথা। কাঁচের ভেতরে ঢুকে সেটা গেল কোথায়!

কোমরে বোতলটাও গুঁজে নিয়ে এলে ভালো করতাম। বুদ্ধি মোটে যেন খুলছে না। পকেট হাতড়ে সিগারেটের প্যাকেটটা পেলুম। ঠোঁটে সিগারেট ধরে দেশলাই জ্বালতেই তার আলোটা পড়ল আয়নার ওপরে। আয়নাতে প্রতিফলন হলো খুব অদ্ভুতভাবে। আয়নার ভেতর থেকে আলগা আলোর ছটা এসে পড়ল দরজার চৌকাঠে। আর সেই আলোতে একটা ফুট খানেক চওড়া আর ফুট পাঁচেক লম্বা সরু পথ আবছা ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেল।

সিগারেট ধরাতে ভুলে গেছিলাম দৃশ্যটা দেখে, আঙুলে গরম লাগতে হুঁশ হলো।

আমি দেশলাই কাঠিটা ফেলে দিয়ে টর্চ মেরে বেশ কিছুক্ষণ সময় নষ্ট করলাম পথটা ফের দেখার জন্য। কিন্তু বুঝতে পারলাম যে এই আয়নাতে কোন কৃত্রিম আলোর প্রভাব পড়বে না। একমাত্র আগুনের আলোই এই রাস্তা দেখাতে পারে। রাস্তাটা যেখানে দেখেছিলাম সেখানে পা দিয়ে খুব সাবধানে আন্দাজ করার চেষ্টা করেও হাল ছেড়ে দিতে হল। দামি বিদেশি মদ আমার ব্যালেন্স বিগড়ে দিয়েছে কিছুটা। এখন একমাত্র উপায় ফের নীচে গিয়ে একটা মোমবাতি এনে জ্বালানো। অগত্যা কি আর করা যাবে। কিভাবে নীচে নামলাম আর কিভাবে ফের মোমবাতি নিয়ে ওপরে এলাম সে বর্ণনা দিয়ে আর লাভ নেই। শুধু দুঃখের বিষয় হল আমার অত দামি প্রায় গোটা বোতলটা কিভাবে কে জানে শত টুকরো হয়ে ছড়িয়ে আছে গোটা ঘরে। আর মদের পুকুর হয়ে আছে ঘরের মেঝে। অবশ্য বোতল এখনো প্রচুর আছে।

যাইহোক চৌকাঠের সোজাসুজি বাতিটা জ্বেলে দেখলাম কিছু দেখা যাচ্ছে কিনা। না, কিছুই নেই। ধীরে ধীরে বাতিটা ওপরের দিকে তুলতে লাগলাম এবার। আয়নার সোজাসুজি আসতেই ফের আলোর ঝলক চোখে পড়ল। মৃদু, গভীর এবং ডিপ সবুজ রঙের একটা আভা বেরোচ্ছে যেন আয়নাটার ভেতর থেকে। সেই আভায় রাস্তাটা মোটামুটি ভালোই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে।

পথটা দেখা যাচ্ছে কেবলমাত্র একটাই এ্যাঙ্গেল থেকে। সেটা সরে গেলেই পথটা হারিয়ে যাচ্ছে। আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না চোখে দেখেও। এই ঘরের রাস্তাটা ত্রিমাত্রিক পদ্ধতিতে তৈরি।

দুটো ব্যাপার আমি এতক্ষণের অভিজ্ঞতা দিয়ে বুঝেছি। এই চৌকাঠ না দেখে পেরোতে গেলেই নীচে পড়তে হবে এটা ঠিক, কিন্তু কতদূর পর্যন্ত পড়তে হবে সেটা বলা অসম্ভব। আমার হিসেব অনুযায়ী বড়জোর কুড়ি পঁচিশ ফুট পড়ার কথা। কিন্তু আমি দেখলাম আলো কোথাও বাধাপ্রাপ্ত না হয়ে সোজা নামতে নামতে হারিয়ে গেল। তার মানে এটা পাতাল প্রবেশের পথ। আর আয়নাটাও হাওয়াতে ভর করে দাঁড়িয়ে নেই। খুব সম্ভবত ওটাও কোন একটা ত্রিমাত্রিক কিছুর সাথে আটকানো।

আর কিছুক্ষণ থাকলে ব্যঙ্গমা, ব্যঙ্গমী, রাক্ষস—খোক্কস জাতীয় কিছু বেরোতে পারে, কিছুই আর অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে না। শুধু দু ঢোঁক গলায় ঢালতে পারলে মরেও সুখ পাওয়া যেত।

বহু কষ্টে প্রায় বুকে হেঁটে, হামা টেনে অবশেষে পৌঁছনো গেল হতচ্ছাড়া আয়নাটার সামনে। পেটে পানি সাহসী করে তোলে এটা মানতেই হবে সব্বাইকে। আগেরটায় না জেনে হাত বুলিয়ে ঢেউ খেলিয়ে ছিলাম। এবার এটাতে জেনেশুনে আঙুল ঢুকিয়ে দিলাম। আমার গোটা বুলেটটা হজম করতে দেখেই মনে হয়েছিল এটার ওপরদিকে কিছু জায়গা আছে।

আঙুল ঢুকিয়ে নাড়াতে লাগলাম, তারপর হাত, বাহু, কাঁধ অবধি চলে গেল ভেতরে তাও কোনকিছু ঠেকলো না হাতে। এবার পায়ের পালা। সেটাও বাড়িয়ে নাড়িয়ে নানা কসরত করে হাঁফিয়ে পড়লুম।

চোখবুজে দু সেকেন্ড দম নিলাম, যা থাকে কপালে সেটাই হবে। শালার ভূতের নিকুচি করেছে। কেমন নরক একবার চোখেই দেখি। যুধিষ্ঠির বাবুর পর চর্মচক্ষে নরক দর্শনের মহাভাগ্য আমিই লাভ করবো।

দুহাতে আয়নার ফ্রেম চেপে ধরে একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে মাথা গলিয়ে দিলাম আয়না ফুঁড়ে। জলের মতো শীতলতা ভেদ করে মাথা ঢুকে গেল। চোখ চাইলাম ধীরে ধীরে। চোখের সামনে ভেসে উঠল আমার পরিচিত একটা ঘর। ফোঁস করে দম ফেলে বাতাস টানতেই ভেসে এলো মদের গন্ধ। আমি বেকুবের মতো আদ্ধেক মুন্ডু বের করে তাকিয়ে থাকলাম আমার নিজের থাকার ঘরের দিকে।

আমি কি সত্যিই পাগল হয়ে গেলাম!! দুটো আয়না দিয়ে একতলা দোতলা যাওয়ার রাস্তা করে রাখার কি মানে আছে। সিঁড়ি ব্যবহার করলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়। আর আমি নিজেই আমার মদের বোতল ভেঙেছি গুলি চালিয়ে এটাও বোঝা যাচ্ছে পরিষ্কার। এত সাপখোপ না পেরিয়ে সোজাসুজি এই আয়নার ভেতর দিয়েই এখানে আসা যেত আগে জানলে।

মাথা টেনে নিলাম বাইরে। মদের নেশা একটু টলমলে করে দিয়েছে পা দুটো। এবার এই আয়না খুলে নীচে নিয়ে যাবো। কিন্তু এই রাস্তা দিয়ে নিজে এসেছি প্রায় বুকে হেঁটে, আয়না নিয়ে ঘর পেরোব কি করে? একটাই উপায় আগে এটাকে ছুঁড়ে বের করে দেবো। তারপর নিজে যাবো। সময় নষ্ট করে লাভ নেই। আয়না ধরে টানাটানি শুরু করে দিলুম। খানিকটা কোস্তাকুস্তি করে সেটা খুলেও ফেললুম। সরু পথটা থেকে পিছলে গেলে কোথায় ল্যান্ড করবো কোন ধারণা নেই। মোমবাতি না জ্বালিয়ে বেরোনো আর আত্মহত্যা করা একই কথা।

মোমবাতি জ্বেলেই বা ধরবো কি করে। অগত্যা আয়নাটা পথের ওপর আন্দাজ করে শুইয়ে দিয়ে ঠেলে ঠেলে এগোতে শুরু করলাম। কতক্ষণ লাগলো আর কি ভাবে সরু ত্রিমাত্রিক রাস্তা শুধু অনুভবের ওপর নির্ভর করে পেরোলাম সেটা নিজেই ভালো জানি না। চৌকাঠ টপকে এপারে এসে শুয়ে পড়তে ইচ্ছে হচ্ছিল কিন্তু পরের ঘরদুটোতে ঘুরে বেড়ানো প্রাণীগুলোর কথা মনে পড়ে গেল। টর্চটা তুলে নিলাম হাতে।

ওটা রেখে ঢুকতে হয়েছিল। টর্চটা জ্বালতেই আঁতকে উঠলাম। আমার চারপাশে একটা নির্দিষ্ট দূরত্বে আমাকে বৃত্তাকারে ঘিরে ফেলেছে সাপের দল। উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো এবার তারা একসাথে স্থির চোখে আমাকেই দেখছে। টর্চের আলোয় পুঁতির মতো ঝিলিক দিয়ে উঠছে তাদের চোখ। চেরা জিভ বের করে তারা আমাদের মধ্যেকার দূরত্ব বুঝে নিচ্ছে। তাদের স্থির শরীর প্রতি মুহূর্তে অনুধাবন করতে চাইছে আমার নড়াচড়ার স্পন্দন। আমি জাতে মাতাল হলেও তালে ঠিক থাকি। এই আয়নাটা নিয়ে আমার যাওয়াটা এরা আটকাতে চাইছে। আমি পিঠের দিক থেকে আমার রিভলবারটা বের করে হাতে নিলাম। এই আয়না নিয়ে আমাকে নীচে যেতেই হবে। সেটা পৃথিবীর কোন শক্তি ঠেকাতে পারবে না।

আয়নাটা বেশ ভারি। আমার হাত পিছলে যাচ্ছে ওজনের জন্য। তাও ভালো করে সাপটে ধরলাম, যাতে ছুট মারলে পড়ে না যায়। কিন্তু ছোটার জায়গা কই। প্রতি ইঞ্চিতে সাপ শুয়ে আছে। আমি দুপা এগোতেই আমার সামনে ফুট দুয়েক জায়গা খালি হয়ে গেল।

দু পাশ থেকে ঘিরে এলেও আয়নার সামনে তারা আসতে চাইছে না। আয়নাটা ঢালের মতো ঘুরিয়ে নিলাম একবার। যা ভেবেছি তাই, কিছুটা পিছু হটে গেল সরীসৃপ বাহিনী।

কোথায় আমি এলাম আয়না উদ্ধার করতে সেখানে আয়নাই আমাকে উদ্ধার করছে। বিছে ভর্তি ঘরেও তাই ঘটলো। আমি একটা করে পা ফেলছি আর ফুট দুয়েক মতো পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। সাপের ঘর প্রায় ফাঁকা, দু—চারটে এদিক—ওদিক ঘুরছে। অবশেষে সিঁড়ি পেরিয়ে ঘরে এসে ঢুকলাম।

পোকা আর সাপের দল কোন অজ্ঞাত কারণে নীচে নামছে না। তবুও আমি ঝুঁকি না নিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলাম।

ঘরে মোমবাতি জ্বেলেই গেছিলাম, সেটা ঠিকভাবেই জ্বলছে। আমি আয়নাটা নিয়ে আমার ঘরের আয়নার সামনে রাখলাম। দুটো দরজার মুখ সামনে চলে এল। এবার কি কিছু ঘটবে?

হাতের টর্চ জ্বেলে ভালো করে দেখলাম আয়নাটা। সাধারণ একটা জিনিস। কি করে এটা এমন অসাধারণ হয়েছে কে জানে! মাথায় আসছে না পরের কর্তব্য। সেন্টার টেবিলটা টেনে এনে তার ওপর আয়নাটা রেখে মুখটা আমার ঘরের আয়নার দিকে করে দিলাম। তাও কিছু ঘটলো না। হঠাৎ মনে হল আগুন রাস্তা দেখিয়েছিল। জ্বলন্ত মোমবাতিটা এনে রাখলাম টেবিলের ধারে। দুটো আয়নার মধ্যে ফুট দু দুয়েক ফাঁকা জায়গা আছে। আলোর রশ্মি পড়তেই দুটো আয়নার মধ্যে বিদ্যুৎ—এর মতো খেলে গেল কিছু। তারপর দুটো থেকেই লালচে আভা বেরোতে শুরু করল। আভা দুটো ঠিক মাঝখানে এসে মিলতেই সেখানে শূন্যের মধ্যে একটা কালো বিন্দু ফুটে উঠল। তারপর সেটা বড় হতে লাগল ধীরে ধীরে। আমি খানিকটা তফাৎ হয়ে ছিলাম কাণ্ডটা শুরু হতেই। এবার খুব সাবধানে এগোলাম।

গোলাকার এবং ঘূর্ণায়মান একটা কালো গর্ত তৈরি হয়েছে এবং তার ভেতর থেকে ডিপ সবুজ একটা আভা বেরোচ্ছে। আমার মন বলে দিল এটাই দুপুরে বহরু বর্ণিত নরকের দরজা।

তা সে যে দরজাই হোক খুলেছি যখন তখন দেখেই আসি। এমনিতেই বাড়িতে যা কীর্তি চলছে কাল সকাল অবধি বাঁচবো কিনা সন্দেহ আছে। আমি না খুললে এই দরজা হয়তো নিজেই খুলে যেত।

ভেতরে উঁকি মেরে দেখার চেষ্টা করলাম, কিন্তু কিছু চোখে পড়ল না। সোজা ঢুকে যাওয়াটা কি ঠিক হবে! যা হয় হবে, দেখি তো আগে।

কালো গর্ত ঘুরছে চর্কির মতো। তার সামনে দাঁড়িয়ে বড় করে শ্বাস নিলাম একটা, তারপর প্রথমে বাম পা ঢুকিয়ে দিলাম। মাটিতেই পা ঠেকলো বুঝলাম। এবার মাথা সহ বাকি শরীর ঢুকিয়ে নিলাম।

ভেতরে ঢুকে প্রথম যেটা টের পেলাম সেটা হলো অসহ্য ঠান্ডা। হাড় অবধি কেঁপে উঠলো আমার। এটা কোন ঘর নয়। পাথুরে রুক্ষ প্রান্তর ধূ ধূ করছে। পুরো প্রান্তরে যতদূর চোখ যায় সবুজ আলোতে ভরে আছে। এদিক ওদিক পাথর, ঢিবি উঁচু হয়ে আছে। হাওয়া বইছে ঝড়ো বাতাসের মতো। পেছনে কালো গর্ত দিয়ে আমার ঘরে ভেতর দেখা যাচ্ছে। একটাই সমস্যা যদি টেবিলের আয়নাটা পড়ে যায় বা মোমবাতিটা নিভে যায় তাহলে বাকি জীবনটা আমাকে এপারেই কাটাতে হবে। নরকের প্রাণী তো কিছু দেখছি না।

এখানে আদৌ কোন প্রাণী আছে কি! একটা সাধুবাবা উঁকি মেরেছিল দুপুরে। সেকি এপারের লোক? তাহলে একটা মানুষের সাথে দেখা হওয়ার আশা আছে। আমি কয়েক পা এগোলাম।

তারপর আরেকটু। জায়গাটা বাস্তবিকই মৃত। হঠাৎ মনে হল কেউ যেন আসছে আমার দিকেই।

একটা মানুষের চেহারা। পাথুরে খাঁজের পাশ থেকে উঠে আসছে ধাপে ধাপে। আমি কোমরে হাত দিয়ে রিভলবারটা ছুঁলাম। স্বর্গ নরক যাই হোক বিপদ বুঝলে আগেই গুলি চালাবো।

সাধুবাবাই বটে। তবে চেহারাটা খুব চেনা লাগছে। দাড়ি গোঁফের আড়ালে থাকলেও মনে হচ্ছে মুখটা আমি কোথায় যেন দেখেছি। লোকটার বয়স তিরিশ থেকে ষাট যা খুশি হতে পারে। পরনে লম্বা আলখাল্লা গোছের কালচে রঙের পোশাক। বাকি সব আমার মতো।

আমার সামনে এসে দাঁড়ালো লোকটি, তারপর গম্ভীর গলায় বলল— 'অবশেষে তুমি এলে।' গলাটা আমার মতোই অনেকটা।

আমি বললাম—'আপনি কে, আপনাকে আমি কোথায় দেখেছি আগে?' লোকটি সে কথার কোন উত্তর না দিয়ে বলল—'তুমি এই পৃথিবীর দরজা খুলতে পেরেছো কেন জানো, আসলে তুমিই এখানকার বাসিন্দা। আমি নই।' লোকটার কথা মাথামুন্ডু কিছুই বুঝতে পারলাম না। আমি এই নরকের বাসিন্দা হলে এতদিন পৃথিবীতে কি করছিলাম! আর এ যদি এখানের লোক না হয় তাহলে এখানে কি করে এলো।

লোকটার বোধহয় মনের কথা বুঝতে পারার মতো ক্ষমতা আছে। সে বলল—'খুব অদ্ভুত লাগছে আমার কথা শুনে তাই না! এটা কোন জায়গা সেটা জানো?'

বললাম—'নরক নরক তো শুনছিলাম, তা নরকের তো নাকি অনেক নম্বর আছে। এটা কোনটা?'

সাধুবাবা আমার দিকে ঠাণ্ডা চোখে তাকিয়ে বলল—'স্বর্গ বা নরক বলতে আসলে কি সেটা জানো? তুমি যেখান থেকে এসেছো সেখানকার খুব কম লোকেরই ধারণা আছে সত্য সম্বন্ধে। তোমরা জেগে ঘুমোও তাই তোমাদের জ্ঞান এত সীমিত।'

খুব ইচ্ছে করছে একটা দানা পুরে দিয়ে দেখি এ কেমন করে ঘুমোয়। একে শালা মরছি নিজের জ্বালায় তার মধ্যে এসব কচকচানি ভালো লাগে!

আমি বললাম—'এটা নরক না হলে কোন জায়গা সেটা জানতে পারি?'

উত্তর এলো—'এটাও একটা পৃথিবী, শুধু মাত্রাটা আলাদা। এরকম আরো অনেক পৃথিবী আছে বিভিন্ন মাত্রায় আলাদা আলাদা ভাবে। কিন্তু সবার সাথে সবার যোগসূত্র আছে। যে যেটা খুঁজে পায় তখন সেটা দেখতে পারে।'

কেতাত্থ হলুম শুনে। বললাম—'আয়না দিয়ে উঁকিঝুঁকি মারছিলেন কি করতে? লোকের শোবার ঘরে নরকের দরজা ফিট করে রেখেছেন কেন, শর্টকাটে লোক ঢোকানোর জন্য?'

লোকটা রাগ করবে ভেবেছিলাম কিন্তু করলো না। একই রকম সুরে জবাব দিল—'তোমার পৃথিবীর সব ক'টা প্রমাণ মাপের আয়নাই বিভিন্ন পৃথিবীর সাথে যুক্ত হয়ে যায় এক একটা সময়। সেই সময় যে দেখতে পায় সে আসা— যাওয়া করতে পারে ইচ্ছে করলেই। আর আমি দেখছিলাম দরজাটা খুলেছে কিনা, তোমাকে ভয় দেখাতে যাইনি। তুমি তাকিয়ে ছিলে বলে দেখতে পেয়েছো। আমি বহু দিন আগে তোমার পৃথিবীর বাসিন্দা ছিলাম। এই দরজা দিয়েই গেছিলাম। তার পরেই এটা বন্ধ হয়ে যায়। আর খুলতে পারিনি। আজ খুলল।'

আমি লোকটিকে যেন একটু একটু চিনতে পারছি। যতটা পারা যায় স্বাভাবিক গলায় বললাম—'আপনার নাম কি?'

লোকটি আমার দিকে তাকিয়ে বলল—'বিনায়ক হালদার নামেই আমাকে চিনতো তোমার পৃথিবীর বাসিন্দা।'

আমি চেষ্টা করেও কাঁপুনি থামাতে পারছি না, এতো শীত করছে। লোকটাকে এবার চিনলাম।

আমি নিজেরই দ্বিতীর রূপের সাথে কথা বলছি। আমার নাম বিনায়ক হালদার। লোকটা বলে উঠলো—'এবার আমার বাড়ি ফেরার পালা।' আমি তৈরি ছিলাম এটা শোনার জন্য। লোকটা বিড়বিড় করে বললো—'এই পৃথিবী বড় অন্ধকারে ডুবে থাকে। আমি আলোতে যেতে চাই।'

চোখের কোণ দিয়ে দেখতে পেলাম দু তিনটে প্রাণী নিঃশব্দে ওপাশের টিলার পেছন থেকে উঠে আসছে। লম্বা কোন লোক যদি কোমর ভেঙে চার হাত পায়ে ভর দিয়ে হাঁটে তাহলে যেমন দেখতে লাগে তেমন লাগছে। কঙ্কালসার শরীর। মুখটা পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি না, তবে হলফ করে বলতে পারি যে এসব জীব কোনকালেই পৃথিবীর বাসিন্দা ছিলো না। এরাই নরকের আসল ও অকৃত্রিম বাসিন্দা। লোকটা যেন টের পেল ওদের উপস্থিতি।

আমার দিকে তাকিয়ে বলল—'ওরাও কিন্তু তোমার পৃথিবীর কিছু মানুষের একটা রূপ। একটু নীচু দিকের চরিত্র বলে এই পৃথিবীর সঠিক দেহ পায়নি। কিন্তু ওপারে গেলেই মানুষের মতো চেহারা পেয়ে যাবে।' লোকটি তাদের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে হাত তুলল কিছু একটা বলার জন্য, আর আমি নিঃশব্দে একটা লাফ মেরে ছুটতে শুরু করলাম কালো গর্তটার দিকে।

আমাকে ওপারে গিয়ে দরজাটা বন্ধ করতেই হবে যেভাবেই হোক। প্রাণীগুলো তৈরি ছিল আমার জন্য বোঝা গেল। তারা পলকের মধ্যে ছুটে আসতে লাগল আমাকে ধরতে। আমি গর্তের সামনে এসে দাঁড়ালাম না। একটা দম টেনে লাফ দিলাম শরীরটা যতটা সম্ভব সরু করে।

সেন্টার টেবিলের উপর রাখা মোমবাতিটা নিয়ে পড়লাম মাটিতে। সেটা নিভে যেতেই আঁধার হয়ে গেল গোটা ঘরে। আমার শরীরের ধাক্কায় টেবিলে রাখা আয়নাটাও আছড়ে পড়ল একদিকে। নিকষ অন্ধকারে প্রথমে তাল পাচ্ছিলাম না। তারপর মনে পড়তে পকেট হাতড়ে দেশলাইটা বের করলাম। যা ঠান্ডা খেয়েছে জ্বললে হয়। বার কয়েক ঘষে একটা কাঠি জ্বালিয়ে আগে ফের মোমবাতি জ্বালিয়ে নিলাম। আলোকিত হল ঘরটা। আমার হাতের জ্বলন্ত কাঠিটা ফেলে দিলুম মাটিতে। আর ওটাই হল আমার সব থেকে ভুল কাজ। কাঠিটা পড়েও নিভল না। কয়েক পলক, মেঝেতে পড়ে থাকা মদে টেনে নিল আগুনের শেষটুকু।

আমি দরজা খুলে ছুটলাম বাথরুম থেকে জল আনতে। অন্ধকার বাড়িতে এত বিপদের মধ্যে জল আনা সোজা ব্যাপার নয়। বাথরুমে ভারি ড্রাম ছাড়া আর কিছু আছে বলে মনে পড়লো না। মগে করে এনে কতক্ষণ ঢালবো। বিছানার চাদরটা ভিজিয়ে চাপা দিলে হবে কি! আমি ফের ঘরে ঢুকলাম। আর ঢুকতেই থমকে গেলাম।

আগুনের ছড়িয়ে পড়া শিখায় আলোকিত হয়ে দুটো আয়না থেকে লালচে আভা বেরিয়ে এসে রামধনুর মতো বক্র গতিতে মিশছে। যেহেতু সোজা ভাব পায়নি তাই আগের মতো বড়মাপের কালো বৃত্তের রূপ নিতে পারেনি। কয়েক ইঞ্চি একটা হাঁ মুখ তৈরি হয়েছে। আর সেখান থেকে একটা হাত শুধু প্রাণপণে বাতাস হাতড়ে যাচ্ছে। হাতটা কোন মানুষের নয়। কঙ্কালসার লম্বা হাতটায় কোন তালু নেই। কব্জির কাছ থেকে আঙুল শুরু হয়েছে। বড় বড় বাঁকা নখ সবকটা আঙুলেই। ছিন্ন, গলিত মাংসপেশী ঝুলছে হাতটা থেকে। আমি কি করবো ভেবে না পেয়ে হাত বাড়িয়ে বিছানার চাদরটা টেনে সেটা ফেলে দিলাম মাটিতে পড়ে থাকা আয়নাটার ওপরে।

আয়না চাপা পড়তেই বৃত্তের মুখ বন্ধ হয়ে গেল। লালচে আভা মিলিয়ে গেল ধোঁয়ার মধ্যে। যার হাতটা পড়ল মেঝেতে ছিন্ন হয়ে। মাটিতে পড়তেই হাতটা চেহারা পাল্টে মানুষের হাতের মতো হয়ে গেল। কালো শীর্ণ সেই কাটা হাতের দিকে আমি দুবার আর তাকালাম না।

ছুটলাম আগুন নেভাতে। এবারে টর্চ লাইট নিয়ে এসেছি। বার দশেক ছোটাছুটি করার পর খানিকটা আয়ত্তে আনলাম আগুনের দাপট। ড্রামটাও কিছুটা খালি হয়েছে তাই সেটাও টেনে এনেছি। অনেক কায়দা কানুন করে অবশেষে আগুন নেভালাম। আর কোন ঝুঁকি নেওয়ার প্রশ্নই নেই। বড় ঘরেই মোমবাতি জ্বালিয়ে বসলাম। মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে নানা কথা। আমি যেখানে গেছিলাম সেটা আসলে কি জায়গা? ওটাই কি নরক না সত্যিই আরেকটা পৃথিবী? আর আমার নিজের আরেকটা রূপ ওখানে আছে এবং সেও চাইছে এপারে আসতে।

তারপর ওই প্রাণীগুলো ওখানে ওরকম অপার্থিব চেহারা নিয়ে ঘুরছে কিন্তু এই জগতে তার রূপ পাল্টে মানুষের মতো হয়ে যাচ্ছে। কিভাবে সম্ভব এটা। ভূতুড়ে ব্যাপার কি এরকম হয়? বাইরে ঝড়ের শব্দ বদ্ধ ঘরেও কানে প্রায় তালা লাগিয়ে দিচ্ছে। ডাইনিং—এর পাশের পয়েন্টে আমার ফোনটা চার্জে লাগানো ছিল। সেটা এইসব হুড়োহুড়িতে খুলতে মনে ছিল না। সেটায় আলো জ্বলতে দেখে আমি চমকে গেছিলাম প্রথমে। ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলাম আমার বউ—এর ফোন ঢুকেছে।

আমি রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে বউ—এর গলা ভেসে এলো।—'হ্যাঁগো তুমি কোথায় আছো? এখানে কি সব হচ্ছে আর তুমি নেই।'

বললাম—'কি হচ্ছে? আমি একটা দরকারি কাজে কয়েক দিনের জন্য বাইরে এসেছি। কাজ হলেই ফিরবো।'

—'না, তুমি তাড়াতাড়ি এসো, একটা অদ্ভুত ব্যাপার হয়েছে। আমাদের শোবার ঘরে অনেকটা তোমার মতো দেখতে একটা লোক ঢুকে বসে আছে আর বলছে সে নাকি তুমি। আমি বাইরে থেকে দরজা আটকিয়ে দিয়েছি। তুমি এক্ষুনি এসো আমার খুব ভয় করছে।'

আমার হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়েই যাচ্ছিল, কোনরকমে সেটা চেপে ধরে বললাম—'লোকটাকে বেরোতে দিও না, আমি যত তাড়াতাড়ি পারি পৌঁছচ্ছি। তুমি সাবধানে থাকো।' ওপাশের লাইনটা কেটে গেল। আমি দু—তিনবার ঘুরিয়ে ফোন করার ব্যর্থ চেষ্টা করে দেখলাম আমার ফোনের টাওয়ার নেই। আমি রিভালবারটা একবার স্পর্শ করে নিলাম হাত দিয়ে তারপর এগিয়ে গেলাম দরজার দিকে।

এক পৃথিবীতে একই নাম আর চেহারার দুটো লোকের জন্য জায়গা খুব কম আছে। কার ভাগ্যে জায়গা হবে সেটাই দেখবো এবার।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%