কৌশিক কারক, আকাশ চন্দ, উৎস ভট্টাচার্য

হঠাৎ করেই কিভাবে যেন সমস্ত কিছুই ওলটপালট হয়ে গেল তৃষার। সমস্ত জীবনটাই যেন আজ একটা ধ্বংসস্তূপ, সুখের প্রাসাদ নির্মাণ করতে গিয়ে সেই প্রাসাদের ভগ্নস্তূপের মধ্যেই সে যেন চাপা পড়ে আটকে ছটফট করছে, বেরিয়ে আসার আকুল আকুতি নিয়ে। কিন্তু নিজের তৈরি ভুলের বোঝা ছেড়ে মানুষ যেমন বেরিয়ে আসতে পারে না সহজে; ভুলটাকে ঠিক ভেবে, বা ভুল বুঝতে পেরেও স্বনির্বাচিত সেই ভুলের অতলে তলিয়ে তলিয়ে যেতে থাকে ক্রমশ, তেমনই তৃষাও যেন তার এই সাধের অট্টালিকার মায়া ছেড়ে চলে যাওয়ার থেকে তার ভারী প্রাচীরের তলায় চাপা পড়ে থাকাটাই শ্রেয় মনে করেছে চিরকাল। সে কখনোই বিশ্বাস করে না যে নির্মল তার জীবনের কোন ভুল ছিল। মানুষ মাত্রই ভালো খারাপ থাকে। নির্মলেরও ছিল। ভালো খারাপটা বুঝে নিজেকে শুধরে নেওয়াটাই আসল। আর প্রকৃত জীবনসাথীর কাজ হলো সেই ভুলগুলো ধরিয়ে দেওয়া। তৃষা আগেও চেষ্টা করেছে নির্মলকে তার ভুল বুঝিয়ে দেওয়ার, শুধরে দেওয়ার। কিন্তু শত চেষ্টাতেও পারেনি সে তা এতদিন। তবে আজ সে সম্ভবত সফল। নির্মল আজ নিজেকে একা করে নিয়েছে তার শয়নকক্ষে। দরজা বন্ধ তার, আত্মনির্বাসনে সে এখন। সে বদলাবে তৃষা জানে। পুরনো নির্মল মৃত আজ। দরজা খুলে যে বেরিয়ে আসবে, সে নতুন এক নির্মল। তৃষা বসার ঘরে সেই নতুন নির্মলেরই প্রতীক্ষায়, তৃষাকে যে বুঝবে পুরোপুরি। প্রেমিকার নয়নে নয়ন রেখেই সেই প্রেমিক অনায়াসে উপলব্ধি করতে পারবে তার মনের গোপন গহীন সব বাসনার কথা, চোখে চোখেই সে পান করে নেবে তৃষার হৃদয়ে লুকিয়ে থাকা ইচ্ছে কণাগুলো। তৃষা অদম্য আগ্রহে অপেক্ষায় আছে তার হারিয়ে যাওয়া প্রিয়তমর। সে চাইলেই অবশ্য যেতে পারে দরজার ওপারে, নির্মলের শোবার ঘরে। যেখানে নির্মল শুয়ে আছে হয়ত বিছানার ওপরে। তার বুকে বা পিঠে মাথা রেখে বলতে পারে নিজের সব কথা। কিন্তু তৃষা তা করবে না। করবে না একটি বিশেষ কারণে। তাছাড়া নির্মল এখন বুঝতেও পারবে না তার ভাষা। তাকে আগে প্রস্তুত হতে হবে। নিজে থেকেই বেরিয়ে আসতে হবে নিজের ঘেরাটোপ থেকে। তবেই তো সে তৃষার চোখে চোখ রাখার সামর্থ্য অর্জন করবে।
নির্মল ও তৃষার প্রেম কাহিনী শুরু হয়েছিল আজ থেকে পাঁচ বছর আগে, একসাথে কলেজের পড়ার সময়। রকিং রোমিও নির্মল মিত্রের সাথে ডাকসাইটে সুন্দরী তৃষা মার্টিনেজ এর প্রেম কাহিনী শুধু কলেজের মধ্যেই নয়, ছড়িয়ে পড়েছিল ছোট্ট মফস্বল শহরটার আনাচে কানাচেও। এই গল্পে উত্তেজক উপাদানের খামতি ছিল না। ছিল নির্মলকে পছন্দ করা বান্ধবীদের কলকাঠি নাড়ার অপচেষ্টা; ছিল তৃষার পেছনে সারি দেওয়া রোড রোমিওদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা, নির্মলকে কখনো ভয় দেখিয়ে, কখনো বা ভুলিয়েভালিয়ে অন্য পথে পাঠিয়ে দেওয়ার। কলেজ জীবন শেষ হওয়ার সাথে সাথে এসব উপদ্রব শেষ হয়ে শুরু হল জীবন নিয়ে তাদের সত্যিকারের সিরিয়াস পরিকল্পনা। আর তখন বাধাটা এল অন্য দিক দিয়ে, দুই পরিবারের তরফ থেকে। উপলক্ষ্য অতি প্রাচীন তৃষা ও নির্মলের ধর্মে পার্থক্য। কিন্তু সেসবকে পাত্তা না দিয়ে দুজনেই চাকরি নিয়ে পাড়ি জমালো নতুন এক শহরে। সেখানে এক কামরা আর একটা ড্রয়িংরুমের এই ছোট্ট সুন্দর ফ্ল্যাটখানা ভাড়া নিয়ে সাজিয়ে গুছিয়ে শুরু করল তাদের একত্র জীবনের পরিকল্পনা আপাতত লিভ টুগেদার দিয়ে শুরু করে পরে বিয়েতে গড়ানো নিয়ে। আর তখনই তাদের জীবনচিত্রে প্রবেশ ঘটল সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে বিষাক্ত সেই খলনায়কের। সেই খলনায়ক, যে না জানি কত সুখী সংসারকে দেখতে দেখতে তছনছ করে দিয়েছে, ভেঙে দিয়েছে কত স্বপ্নের ঘর। সে সবারই অতি পরিচিত, নাম তার শ্রীযুক্ত সন্দেহ কর। হ্যাঁ, ব্যাপারটা শুরু হওয়ার পর প্রথমদিকে তৃষা মজা করে নির্মলকে এই নামেই ডাকত মাঝে মধ্যে।
নির্মলের ভেতরে এই সন্দেহবাতিকগ্রস্ত হওয়ার ব্যাপারটা নতুন শহরে আসার মাস ছয়েক পর শুরু হয়। দুজনেই একসাথে দুটো আলাদাকোম্পানিতে চাকরিজীবনের সূত্রপাত করে। কিন্তু কাজ শুরুর ছমাসের মধ্যেই তৃষার পদোন্নতি, রোজগারের দিক দিয়ে নির্মলকে ছাপিয়ে যাওয়া, আর তৃষার মাত্রাতিরিক্ত সুদর্শন, সপ্রতিভ আর সাপোর্টিভ বস, এই ত্র্যহ্যস্পর্শে নির্মলের মনে রোপিত হল সন্দেহের বীজ।
প্রথম প্রথম ব্যাপারটাকে হাল্কাভাবে নিলেও পরে বেশ বুঝতে পারা যাচ্ছিল যে নির্মলকে বেশ অদ্ভুত একটা হীনম্মন্যতা গ্রাস করছে ধীরে ধীরে, তার ধীর গতির উন্নতি, প্রচুর কাজের চাপ ইত্যাদি তার কুল ড্যুডের আবরণ খসিয়ে দিয়ে বের করে আনছে এক খিটখিটে দজ্জাল পুরুষ সত্ত্বাকে, যে কিনা সব সময়ই তার সঙ্গীর সাথে নিজেকে তুলনায় উন্মত্ত, সঙ্গীর উন্নতিতে যে তার কর্মদক্ষতার বদলে বসের সাথে তার সম্পর্কের রসায়নই বেশি দায়ী বলে মনে করে। এমনকি একসময় সে তৃষার মোবাইল গোপনে ঘাঁটাঘাঁটিও শুরু করে। কিন্তু সেখানে আপত্তিকর কিছু না পেয়ে হতাশ হয়ে তার বসের সাথে তার সাধারণ বার্তালাপ তুলেও ঠুকে ঠুকে কথা বলতে পিছপা হয় না শেষে। তৃষা তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল যে তারা প্রেমিক—প্রেমিকা হলেও প্রত্যেকের জীবনে একটা ব্যক্তিগত অংশও আছে। একজনের মোটেও উচিৎ নয় আরেকজনের সেই অংশটার পরিধির মধ্যে অযাচিতভাবে ঢুকে পড়া।
তৃষা যেমন নির্মলের ব্যক্তিগত পরিসরে ঢোকে না কখনোই, তেমনই নির্মলেরও উচিৎ তৃষাকে সমান মর্যাদা দেওয়া। কিন্তু বোঝাতে গিয়ে ফল হয় উল্টো। কথাকাটাকাটি দিয়ে শুরু করে প্রায় মাথা ফাটাফাটির জোগাড়। নির্মল সেই প্রথমবার—তৃষার গায়ে হাত তুলল। সেদিন অঝোরে কেঁদেছিল তৃষা। কাঁদতে কাঁদতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল খেয়াল ছিল না নিজেরই। তখন ছিল মাঘের শীত। ঘুমের ঘোরেই বুঝতে পেরেছিল কেউ তার গায়ে চাদর টেনে দিচ্ছে, জড়িয়ে ধরেছে তাকে তার ঘুমের মধ্যে। ঘুম ভেঙে গিয়েছিল তার। রাতের নাইটবালবের ঘুমন্ত আলোয় সে মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখেছিল নির্মলের ঘুমন্ত মুখ। কি নিষ্পাপ! তৃষা কিছুক্ষণ কল্পনা করার চেষ্টা করেছিল কি চলছে ইদানীং নির্মলের মাথার মধ্যে, প্রয়াস করেছিল তার মানসিক অবস্থাকে অনুভব করার।
তার পরদিনই সে পদত্যাগপত্র দিয়েছিল তার অফিসে। নির্মল খুশি হয়েছিল বেশ। তৃষার বস যখন কারণ জানতে চেয়েছিলেন, পারিবারিক কারণের কথাই বলেছিল তৃষা। বস যেন কিছুটা আন্দাজ করতে পেরেছিলেন ব্যাপারটা। আর কিছু বলেননি।
তারপর আরেকটা চাকরির জন্য ইন্টারভিউ দেওয়া নির্মলের বাইকের পিছনে চড়ে। সেদিন মনে হচ্ছিল আবার যেন পুরনো জীবনে ফিরে গিয়েছিল তারা। সেই আগের নির্মল, সেই পুরনো তৃষা, সেই বাইক রাইড, চাকার তলায় পিছলে যাওয়া মসৃণ রাস্তা, আর নির্মলের শক্তসবল পেশিবহুল শরীরটাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে থাকা তৃষার দুটি কোমল পেলব হাত। পুরনো বাইকভ্রমণের স্মৃতিগুলোকে উসকে দেওয়া এই যাত্রার শেষে তারা যখন তাদের গন্তব্যে পৌঁছল, তখন মনে হল যেন স্বপ্নভঙ্গ হল। প্রথম প্রচেষ্টাই সফল, তৃষা নতুন চাকরির নিয়োগপত্র নিয়ে রিসেপশনে অপেক্ষারত নির্মলের হাতে ধরিয়ে দিল। খেয়াল করল, নির্মলের চোখে খুশির ঝিলিক। তৃষা এটাই আশা করেছিল। একসপেক্টেড স্যালারি হিসেবে তৃষা যা চেয়েছিল, তা নির্মলের চেয়ে একটুখানি কম। মুদ্রার চেয়ে নির্মলের সাথে শান্তির নিদ্রাই বেশি পছন্দ করেছিল তৃষা। কিন্তু সেই নিদ্রাও স্থায়ী হল কই? কিছুদিন নির্মলের খুশি খুশি থাকা আর তাই দেখে তৃষারও খুশির অন্ত না থাকাটাই কাল হল।
সেদিন অফিসের কিছু একটা কাজ নিয়ে খুব চাপে ছিল নির্মল, আর তাই দেখে তৃষা তার মন ভালো করার জন্য কিছু চুটকি, অফিসের কিছু মজার গল্প শোনাচ্ছিল, আর সাথে কিছু ভালো রান্নাবান্না করার চেষ্টা করছিল। কিন্তু হঠাৎই যেন বিদ্যুৎ চমকের মতো চমকে উঠল শোবার ঘর থেকে নির্মলের গলা শুনে, ''আচ্ছা আজ তোমার এত খুশি কিসের বলো তো? আবার নতুন কোন নাগর জুটল না কি?'' তৃষার হাতের খুন্তি থেমে গেল, থেমে গেল তার মুখের কথা। চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল কয়েকফোঁটা জল কড়াইয়ের গরম তেলের মধ্যে, চিড়বিড় শব্দে ভরে উঠল রান্নাঘরটা। যেন জানাতে চাইল যে তেলে আর জলে কখনোই মেশে না, সে যতই চেষ্টা করো না কেন। সেদিন আর তারপর তাদের মধ্যে কোন কথা হয়নি। তৃষা দেখেছিল, আবার তার মোবাইল ঘাঁটা হয়েছে। তাদের লাস্ট প্রোজেক্টটার রিভিউ পাঠিয়েছে ক্লায়েন্ট। খুবই খুশি তিনি, ছত্রে প্রশংসা তাদের।
বিশেষ করে তৃষার, কারণ সেই তো বেশিরভাগ কাজটা দেখেছিল। আর সেই ক্লায়েন্ট রিভিউ—এর খবরটাই তার এক কলিগ পরিমল হোয়াটসঅ্যাপে জানিয়েছিল। তৃষা তখন রান্না করছিল। ''কনগ্র্যাচুলেশনস ডার্লো, ক্লায়েন্ট তো তোর ওপর পুরো ফিদা।'' সাথে আরো কিছু প্রশংসায় ভরানো মন্তব্য। তৃষা দেখেছিল, ওর এই হোয়াটসঅ্যাপ বার্তাটা ইতিমধ্যেই রীড হয়ে গেছে। নির্মল জানে তৃষার মোবাইলের পাসওয়ার্ড। তৃষা কিছু বলেনি নির্মলকে আর। নির্মলও সেদিন টুঁ শব্দটি উচ্চারণ করেনি তারপর। সেদিন রাতে তৃষার গায়ে কেউ চাদর টেনে দেয়নি। কেউ জড়িয়ে ধরেনি তাকে। তেল আর জল কি তাহলে সত্যিই আলাদা হতে চাইছে? এভাবেই চলতে থাকলো। যদিও আর গায়ে হাত তোলেনি নির্মল, কিন্তু কাটাকাটা মন্তব্য ভেসে আসতে লাগলো এরপর থেকে মাঝে মাঝেই, যা ছিল আরো কয়েক কাঠি ওপরের। চুপচাপ মুখ বুজে সহ্য করে গেছে তৃষা, শুধুমাত্র নির্মলেরই জন্য। ভেবেছিল ঝড় একদিন থেকে যাবে, সে আস্তে আস্তে শান্ত হয়ে যাবে, বন্ধ করবে এসব অর্থহীন কাজকর্ম। কিন্তু সেই দিনটাতে আর সহ্য হয়নি তার। যখন তাকে নিয়ে অফিস থেকে ফেরার পথে একজায়গায় বাইক থামিয়ে সিগারেট টান দিয়েই বলে উঠেছিল। ''আচ্ছা তৃষা, তোর এখন কতোগুলো ক্লায়েন্ট?''
তৃষা সহজভাবেই বলেছিল, ''আমি তো একটা প্রোজেক্টেই কাজ করছি। তাই একটাই ক্লায়েন্ট।'' নির্মল ধোঁয়া ছেড়ে কেমন যেন একটা অদ্ভুত কুটিল হাসি হেসে বলেছিল, ''আরে না না। আমি তোর পার্সোনাল ক্লায়েন্টদের কথা বলছি। যেমন আজ তুই কফিশপে বসে যার সাথে কথা বলছিলি হেসে হেসে।''
তৃষার মনে হল নির্মলের গালে ঠাস করে একটা থাপ্পড় কষিয়ে দেয়। ''নির্মল, ও হল আমার কলিগ পরিমল। ভুলভাল বকার আগে একটু ভাবিস।'' ঝাঁঝিয়ে উঠে আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল সে, কিন্তু নির্মলের মুখের সেই কুটিল হাসিটা আরো প্রসারিত হয়ে অবিশ্বাসের হাসিতে পরিণত হতে দেখে বুঝল কোন লাভ নেই কিছু বলে আর। সব হাতের বাইরে চলে গেছে। তৃষা বাইকে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল এতক্ষণ। এবার সটান দাঁড়িয়ে হাঁটতে লাগল এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে।
কোথায় যাচ্ছে সে জানে না। রাগে তার মাথা দপদপ করছে। কান লাল হয়ে গেছে। তার মনে হচ্ছে আশেপাশের কিছু লোকও যেন নির্মলের ওই কথাগুলো শুনতে পেয়েছে। তারাও তৃষাকে ওগুলোই জিজ্ঞেস করছে, ''কটা ক্লায়েন্ট? পার্সোনাল না কি?'' তৃষার কানে কিছুই ঢুকছে না এখন। সে পা চালালো জোরে, আরো জোরে, যেদিকে দুচোখ যায়। কিন্তু লোকগুলো এখনো চিৎকার করে চলেছে তার পেছনে। কি সাহস! কিন্তু তৃষা হঠাৎ থেমে গিয়ে ঘুরল ওদের দিকে। তার মনে হল, ওরা যেন অন্য কিছু বলতে চাইছে। এবার শুনতে পেল সে, ''ম্যাডাম সরে যান। ট্রেন আসছে।'' তৃষা বাঁদিকে তাকাতেই দেখল পেল একটা চোখ ধাঁধানো আলো সন্ধ্যার অন্ধকার চিরে ছুটে আসছে তার দিকে প্রবল গতিতে। সে একটা রেল লাইনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যার কোনো গেট ছিল না।
তৃষা এখন বসে আছে ওদের ড্রয়িংরুমে। এই নিয়ে দুই রাত্রি হল, এসে বসে আছে। নির্মল শোয়ার ঘরে বসে কাঁপছে ভয়ে। যে তৃষা তার মনে প্রবল প্রেমের সঞ্চার করেছিল একসময়, যা পরিবর্তিত হয়েছিল প্রবল ঘৃণায় পরবর্তীকালে, সেই তৃষাই আজ তার মনে সৃষ্টি করছে এক অপার্থিব আতঙ্কের। ভয় পাওয়ার জন্য তাকে দোষ দেওয়াও যায় না বিশেষ। কিন্তু তৃষারও তো আর কোন উপায় নেই। তাকে তার হারিয়ে যাওয়া প্রেমকে ফিরে পেতেই হবে, অন্তত আর একবারের জন্য হলেও। নির্মলকে বোঝাতেই হবে যে তার ধারণাগুলো ছিল সম্পূর্ণ ভুল। তাকে বুঝতে হবে তৃষার যন্ত্রণাগুলো, অনুভব করতে হবে সেগুলো হৃদয় দিয়ে, বুঝতে হবে যে নির্মলই ছিল, আছে আর থাকবে তার হৃদয় জুড়ে, মৃত্যুর আগে এবং মৃত্যুর পরেও। আর নির্মল তা বুঝলেই তার মুক্তি। কিন্তু সেজন্য তাকে চোখ রাখতে হবে তৃষার চোখে, শুনতে হবে তৃষার কথা মন দিয়ে, সব ইগো, সব ভয় সরিয়ে রেখে। যদিও এই মুহূর্তে তা করা নির্মলের পক্ষে বেশ কষ্টকর।
কারণ ট্রেনের ধাক্কায় ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া তৃষার শরীরে চোখ দুটো যে কোনটা কোথায় আছে, তা বোঝা দুষ্কর এখন। তার ভোকাল কর্ডেরও ছিঁড়ে চেপ্টে গিয়ে খুব খারাপ অবস্থা। আওয়াজ বেরোচ্ছেই না প্রায়, আর বেরোলেও তা কেমন যেন ভয়ংকর ঘড়ঘড়ে অতিপ্রাকৃত ধরনের শোনাচ্ছে। প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছে তার এভাবে কথা বলতে, দেখতে। কিন্তু তবুও তাকে তা করতেই হবে, নিজের মুক্তির জন্য। তার প্রেমে কোন খাদ নেই, ছিল না কখনো। সেটা বোঝাতেই হবে নির্মলকে। তাতে যত কষ্টই হোক না তার। প্রতিরাতে কফিন থেকে বেরিয়ে এসে এভাবেই নিজের ঘরে আসা যাওয়া করতে হবে এই বিকৃত হয়ে যাওয়া মাংসপিন্ডসম শরীরটাকে নিয়ে। নির্মল যে তার মৃত্যুতে প্রচন্ড শোক পেয়েছে তা তার মৃতদেহের সামনে দাঁড়িয়ে নির্মলের কান্না থেকেই বুঝতে পেরেছিল তৃষা। শিশুর মতো কাঁদছিল সে।
ক্ষমা চাইছিল তৃষার কাছে। তৃষার মৃত্যুযন্ত্রণার দুঃখ যেন ধুয়ে গিয়েছিল তার সেই অনুশোচনার অশ্রুধারায়। কিন্তু নির্মলের বোঝা উচিৎ প্রেম কখনো বলপূর্বক হয় না, হয় না একতরফা। একজনের সম্মানকে জীবিত অবস্থায় ধুলোয় লুটিয়ে দিয়ে তাকে শুধু প্রেম করে যাওয়া তো পোষ্যপালনেরই নামান্তরমাত্র। তাই এখন নিজের অনুভবগুলোকে নির্মলের মধ্যেও চালনা করার জন্য, নির্মলের হৃদয়ের প্রেমের সাথে সাথেই তার পুরনো সম্মানের জায়গাটা ফিরে পাওয়ার জন্যই তৃষা দুদিন ধরে আসছে শত কষ্ট উপেক্ষা করে। দরকার পড়লে আরো আসবে।
গতকালও তাকে দেখে নির্মল ভয়ে নিজের বেডরুমে গিয়ে লুকিয়ে পড়েছিল, আর সারারাত বেরোয়নি। কিন্তু আজ তার সেরকম ভয় ছিল না প্রথম দিকে। হয়ত ভেবেছিল কাল রাতের ব্যাপারটা ছিল তার দুঃস্বপ্ন। কিন্তু আজও যখন তৃষা তার বিকৃত শরীরটা নিয়ে ফ্ল্যাটের জানলা দিয়ে প্রবেশ করল পাইপ বেয়ে, নির্মলের মুখ আতঙ্কে সাদা হয়ে গিয়েছিল। তাই দেখে তৃষা বলতে গিয়েছিল ''ভয় পেও না নির্মল। আমি কিছু কথা বলেই চলে যাব।'' তৃষা জানে না তার সেই কথা নির্মলের কানে কিরকম ভাবে ধরা দিয়েছিল, কিন্তু সে বিন্দুমাত্র দেরি না করে আবার দৌড়ে ঢুকে পড়েছিল তাদের শোবার ঘরে, কালকের মতোই, তৃষার মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে।
তৃষা বুঝতে পেরেছিল, ওই শোবার ঘর নির্মলের একান্ত ব্যক্তিগত পরিসর এখন। আর নির্মলের প্রতি তৃষার ভালোবাসা শুধু পাশবিক অধিকার ফলানোর প্রেম তো নয়, সে জানে তার প্রেমিককে যথেষ্ট সম্মান দিতে, তার ব্যক্তিগত অধিকারের মর্যাদা রক্ষা করতে। তাই শোবার ঘরের দরজায় ঠেলা সে দেবে না, ঢুকবে না সেখানে। বরঞ্চ আধো অন্ধকার ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে অপেক্ষা করবে সেই ঘরের দরজার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে। প্রতীক্ষায় থাকবে নির্মলের নিজে থেকেই বেরিয়ে আসার। তার এই অমূলক ভয় নিশ্চয়ই কাটবে কখনো না কখনো।
আজ না হোক কাল, না হোক তার পরের দিন; অথবা কোন না কোন দিন। সে ততদিনই এভাবে আসতেথাকবে প্রত্যেকটি রাত। নির্মল যদি অন্য কোথাও চলে যায় তাদের নিজেদের হাতে সাজানো এক সময়ের ভালোবাসায় গড়া এই স্বপ্নের বাসা ছেড়ে, তা হলে তৃষাও সেখানে যাবে তার সাথে সাথেই।
আতঙ্ক কাটিয়ে নির্মল যেদিন প্রথম আসবে তার কাছে, চোখে চোখ রেখে শুনতে পারবে তার ভয়ংকর কণ্ঠের জান্তব সেই ঘড়ঘড় স্বর, সেদিন আর কোন ভাষার প্রতিবন্ধকতা থাকবে না তাদের মাঝে। সব বুঝতে পারবে সে অবলীলায়। তৃষাও ফিরে পাবে তার যথাযোগ্য সম্মান, তার হারানো প্রেম। তারপর নিশ্চিন্তে সে ফিরে গিয়ে নিজের কফিনে শায়িত হতে পারবে চিরনিদ্রায়। আর যাওয়ার দরকার পড়বে না তার কোথাও কখনো। কারণ সে তখন সম্পূর্ণ মুক্ত হয়ে যাবে অনিবার্য সেই চিরকালীন ভয় থেকে, যা এই জগতের প্রতিটি জীবিত ও মৃত সত্ত্বাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে অবিরত হারিয়ে যাওয়ার ভয়—চিরদিনের জন্য। সে তো তারপর বেঁচে থাকবে নির্মলের মধ্যেই, তার সমগ্র অস্তিত্ব নিয়ে। তাই তৃষা প্রহর গুণছে এখন, অসীম ধৈর্য আর ভালোবাসা নিয়ে, জীবিত আর মৃতের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা অহং ও আতঙ্কের সেই পলকা দরজাটার দিকে তাকিয়ে, যার ভেঙে পড়াটা শুধু সময়ের অপেক্ষা।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন