কৌশিক কারক, আকাশ চন্দ, উৎস ভট্টাচার্য

সেদিন সন্ধেতে, অন্ধকার ঘরে প্রদীপ জ্বালিয়ে নায়েবমশাই বসে আছেন। হঠাৎ একটা শীতল অনুভূতি। ঘাড় ঘোরাতেই দেখেন, আবছা একটা অবয়ব। সলতেটা বাড়িয়ে দিতেই, সেটা দপদপ করে নিভে গেল। পিঠ দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল নায়েবের।
মনে পড়ল, সাধকবাবা বলেছিল—এই পিশাচীরা বড় ভয়ঙ্কর। ওদের কাজ যদি শেষ না হয়, আর ফিরে আসতে হয়, তাহলে কিন্তু...
পরদিন সকালবেলায় লেঠেল বিশু খবর দেয়—মা, মা, নায়েবকাকা, নিজের ভিটেতে মরে পড়ে আছে। কে যেন তার ঘাড় মটকে দিয়েছে।
সারাকে আমি তিন দিনে কিছুই খেতে দেখি নি।
অবশ্য সেটা খুব আশ্চর্যের কিছু নয়। এই বিদেশি পর্যটকরা আমাদের দেশে যতই ঘুরুক, অথবা স্থানীয় মানুষের সাথে যতই মেলামেশা করুক, খাওয়া—দাওয়ার ব্যাপারে তাদের অনেকেই খুব খুঁতখুঁতে হয়। বাইরের রেস্তোরাঁর খাবার তারা সাধারণতঃ এড়িয়ে চলে।
সারার পিঠের রুকস্যাকটা খুব বড় না হলেও—, হয়তো তার ভেতর বিদেশ থেকেই নিয়ে আসা কোনোরকম শুকনো খাবার থাকত। আমার অগোচরে নিজের ঘরে বসে হয়তো সেই খাবারই...
কিন্তু মুশকিলটা হল, তাকে আমি জল খেতেও দেখিনি। একটা ঘটনায় যদিও মনে হয়েছিল, খেয়েছে।
শ্রীনগরের মুঘল গার্ডেন—এ ঢোকার মুখে সে একটা মিনারেল ওয়াটারের বোতল কেনে এবং সেটা নিয়ে নানা ভঙ্গিমায় সেলফি তোলে। তারপর থেকে বোতলটা তার হাতেই ঘুরছিল, গলায় ঢালতে দেখিনি। তবে বোতল আর রুকস্যাক আমার জিম্মায় রেখে সে যখন মুঘলস্থাপত্যের সাথে সেলফি তুলতে ব্যস্ত, তখন আমি লক্ষ্য করি, বোতলটা খালি। নিশ্চয় কোনো ফাঁকে জলটুকু খেয়ে ফেলেছে এই ভেবে সেটা ডাস্টবিনে ফেলে দিই। ফেলার সময়—এক লহমার জন্য যেন মনে হয়েছিল, বোতলের সীলটা অক্ষত!
সেসময় অবশ্য এ নিয়ে অতটা ভাবিনি, কিন্তু এখন.....
নাঃ, এভাবে মাঝখান থেকে বললে আপনারা ব্যাপারটা ঠিক ধরতে পারবেন না। বরং গোড়া থেকেই শুরু করা যাক।
আমার নাম রুহি মহাজন। আদতে আমি জম্মুর মেয়ে। পঁচিশ বছর বয়েস। বাবা—মা ও অন্যান্য পরিজনের উপরোধ সত্ত্বেও এখনও অবিবাহিতা। আসলে আমি একটু স্বাধীনভাবে থাকতে ভালোবাসি। তাই বছর তিনেক হল—কাশ্মীরের বিখ্যাত পর্যটন সংস্থা ''প্যারাডাইস ট্যুরস অ্যাণ্ড ট্র্যাভেলস''—এ যোগ দিয়েছি। আমার কাজটা একটু অদ্ভুত ধরনের।
ভূস্বর্গে বিদেশি পর্যটকরা বরাবরই ভিড় জমায়। পর্যটনের মরশুমে তো বটেই, মরশুমের বাইরেও। ইদানীং অনেক মহিলা পর্যটক একা একা আসে। কিন্তু একা ঘুরলে দুষ্কৃতীদের ভয়, তাই তাদের অনেকেই স্থানীয় কোনো মহিলাকে সফরসঙ্গী হিসাবে চায়। এর জন্য অতিরিক্ত খরচেও তারা পিছপা নয়।
''প্যারাডাইস''—এর হয়ে এই ক'বছর আমি সেই সফরসঙ্গীর কাজই করে আসছি। ''প্যারাডাইস''—এর হয়ে এই ক'বছর আমি সেই সফরসঙ্গীর কাজই করে আসছি। পর্যটকের সাথে কথাবার্তা বলে বিমানের টিকিট কাটা, কাশ্মীরের বিভিন্ন জায়গায় হোটেল ও গাড়ি বুকিং—এ সবের দায়িত্ব সংস্থার। সমস্ত কিছু চূড়ান্ত হলে আমাকে জানানো হয়।
মহিলাটিকে শ্রীনগর এয়ারপোর্টে অভ্যর্থনার পর তার সুবিধামতো সফরসূচ তৈরি করা, দ্রষ্টব্য স্থানগুলিতে তাকে সঙ্গদান এবং অবশেষে তাকে আবার এয়ারপোর্টে পৌঁছে দেওয়া অবধি আমার দায়িত্ব। অতিথি যে হোটেল বা হাউসবোটে ওঠে, সেখানে অফিস থেকে আমার জন্য আলাদা ঘরের বন্দোবস্ত রাখা হয়।
এপ্রিল মাস। পর্যটনের মরশুম সবে শুরু হয়েছে। কয়েকটা দিন ফাঁকাই বসে ছিলাম। হঠাৎ একদিন আমাদের ম্যানেজার আসিফসাহেব আমাকে ফোন করলেন।—
''রুহি, সারা লিবার নামে একজন ট্যুরিস্ট আগামী পরশু শ্রীনগরে নামছে। তুমি ওকে রিসিভ করে ডাল লেকে নিয়ে যাবে। ওখানে মাদার ইণ্ডিয়া হাউসবোটে তোমাদের থাকার ব্যবস্থা করা আছে। দু'দিন থেকে সারা হায়দ্রাবাদ চলে যাবে। তুমি এই দু'দিনে ওকে শ্রীনগর ঘুরিয়ে দিও।''
''সারা লিবার?''—আমি প্রশ্ন করলাম, ''কোন দেশ থেকে আসছে?''
''সুইজারল্যাণ্ড''।
শুনে আশ্বস্ত হলাম। সুইস পর্যটকদের সাথে আগে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে। অধিকাংশের মাতৃভাষা জার্মান হলেও ওরা ইংরেজিতে সাবলীল; বলার ধরনধারণ অনেকটাই আমাদের মতো। উচ্চারণও ব্রিটিশদের মতো প্রলম্বিত বা আমেরিকানদের মতো সানুনাসিক নয়। ফলে কথোপকথনে সুবিধাই হয়। তাছাড়া ওরা ভদ্র, এ পর্যন্ত কোনো উন্নাসিকতা চোখে পড়েনি।
এদিকে ''মাদার ইন্ডিয়া'' হাউসবোটও আমার পরিচিত। আগে সেই বোটে বারছয়েক থেকেছি। মালিক মহম্মদ শাজাহান সদালাপী প্রৌঢ়, আমাকে মেয়ের মতো স্নেহ করেন। ওঁর একমাত্র ছেলে ইমরানের ব্যবহারও খুব ভালো। সব মিলিয়ে, এবারের কাজ মোটেও কঠিন হওয়ার কথা নয়।
নির্দিষ্ট দিনে বেলা এগারোটায় ''সারা লিবার'' লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে এয়ারপোর্টের বাইরে দাঁড়ালাম। শ্রীনগর এয়ারপোর্টে নিরাপত্তা ব্যবস্থার কড়াকড়ি থাকায় বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হল। বেলা প্রায় বারোটার সময় এক স্বর্ণকেশী বিদেশিনী প্ল্যাকার্ডের লেখা দেখে হাসিমুখে আমার দিকে এগিয়ে এল। বয়স ত্রিশ থেকে চল্লিশের মাঝামাঝি কোথাও, লম্বা ছিপছিপে চেহারা, মাথার চুল পেছনে টেনে একটা আলগা খোঁপা করা, লাগেজ বলতে শুধু পিঠের রুকস্যাক।
''হাই! আমার নাম সারা লিবার।''
কোম্পানির রেওয়াজ অনুযায়ী তার হাতে একটা লাল গোলাপ আর একটা ছোট মেওয়ার প্যাকেট তুলে দিয়ে আমি বললাম, ''ভূস্বর্গে সুস্বাগত আমি রুহি মহাজন! আগামী দু'দিনের জন্য শ্রীনগরে তোমার সঙ্গী। আশা করি, তোমার এই সংক্ষিপ্ত সফর উপভোগ্য হবে।''
উপহার পেয়ে সারার আনন্দ দ্যাখে কে! সে তৎক্ষণাৎ জিনসের পকেট থেকে একটা ঢাউস মোবাইল বের করল। বাঁ হাতে বুকের কাছে ফুল আর মেওয়ার প্যাকেট নিয়ে ডান হাতে মোবাইলটা ধরল। অনেকটা সময় নিয়ে একটা সেলফি তুলে আমাকে বলল, ''এই দ্যাখো, ভালো হয়েছে না?''
বাইরে আমাদের জন্য কোম্পানির ঠিক করা গাড়ি অপেক্ষা করছিল। আমি তখন তার ড্রাইভার শাহদাব—কে ফোন করতে ব্যস্ত। তবুও ছদ্ম—আগ্রহ দেখিয়ে বললাম, ''দারুণ হয়েছে!''
সারা খুশি হয়ে একবার ছবির মেওয়া আর ফুলের ঘ্রাণ নেওয়ার ভঙ্গি করল। তারপর আমার সাথে গাড়ির উদ্দেশ্যে চলল।
গাড়ি আমাদের ডাল লেকের ধারে পৌঁছে দিল। দূরে সারিসারি—হাউসবোট। তার মধ্যে ''মাদার ইণ্ডিয়া''ও দেখা যাচ্ছে। ছোট বোট'' নৌকো বা শিকারায় করে ওখানে পৌঁছতে হয়।
শিকারা ঘাটেই দাঁড়িয়ে ছিল। সারা রুকস্যাক নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে দিব্যি তরতর করে গিয়ে তাতে উঠে পড়ল। আমিও তাকে অনুসরণ করতে যাব, পেছন থেকে শাহদাব ডেকে বলল, ''ও ম্যাডাম, এগুলো পড়ে রইল যে''!
তাকিয়ে দেখি, তার হাতে সেই মেওয়া আর গোলাপ। কিন্তু ও হরি, তাদের এ কি অবস্থা! গোলাপের পাপড়িগুলো এর মধ্যেই কেমন যেন ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। কেনার সময় রক্তলাল ছিল, আমার স্পষ্ট মনে আছে। অথচ এখন একটা সাদাটে ফুল শাহদাবের হাতে নেতিয়ে পড়ে রয়েছে। মেওয়ার অবস্থাও তথৈবচ। আখরোট, আঞ্জীর, পেস্তা সবই যেন কিরকম বিশুষ্ক—প্যাকেটটা হাতে নিয়ে আর ভঙ্গুর চাপ দিতেই সেগুলো গুঁড়িয়ে যেতে লাগল।
দু'নম্বরী মাল নাকি? অথচ ভালো দোকান থেকেই তো কিনেছিলাম!
ভাগ্য ভালো, মেমসাহেব এই মেওয়া মুখে দেয় নি আমি একবার আড়চোখে শিকারার দিকে তাকালাম। সারা মুগ্ধ দৃষ্টিতে ডাল লেকের সৌন্দর্য দেখতে ব্যস্ত, তার এদিকে নজর নেই। এই ফাঁকে ফুল মেওয়া রাস্তার পাশে ফেলে দিয়ে আমিও—শিকারায় উঠে পড়লাম। মাঝি হাউসবোটের উদ্দেশ্যে নৌকো ছাড়ল।
হাউস বোটের মালিক শাজাহানও নিজেই আমাদের অভ্যর্থনা করলেন। সারা দু'হাত জড়ো করে ভারতীয় কায়দায় তাঁকে নমস্কার করল। তাকে ঘর দেখিয়ে বেরিয়ে এসে শাজাহান হাসিমুখে আমাকে বললেন, ''রুহিবেটি, কেমন আছ?''
''ভালো, আব্বু! ইমরান কই?''
''সে একটা কাজে পহেলগাঁও গেছে মা। কাল দুপুরে ফিরবে।''
কোনো মতে জিনিসপত্র নামিয়ে রেখে সারাকে একরকম তাড়া দিয়েই ঘর থেকে বের করলাম। কারণ সফরসূচিতে ডাল লেকে শিকারা ভ্রমণ সেরে ফেলতে আছে। সেটা আজ সন্ধ্যার আগে—না পারলে মুশকিল। আগামীকাল পুরো শ্রীনগর চক্কর দেওয়ার কথা। তাতে সারাদিন লেগে যাবে।
শিকারা ভ্রমণ পর্ব নির্বিঘ্নেই সমাধা হল। ডাল লেকের ভাসমান বাজারের—ব্যবসায়ীরা বিদেশিনী দেখে লুব্ধ হয়ে তাদের ছোট ছোট নৌকো নিয়ে এগিয়ে এসেছিল।
সারা তাদের পশরা শাল পশমি, পাথরের গয়না, ভেষজ ওষুধ ইত্যাদি নেড়েচেড়ে দেখল—কয়েকটা জিনিস হাতে নিয়ে মোবাইলে সেলফিও তুলল। কিন্তু শেষমেশ—কিছুই কিনল না। বিফলমনোরথ হয়ে বেচারীরা ফিরে গেল। অন্ধকার নেমে আসায় আমরাও ফেরার পথ ধরলাম।
হাউসবোটে ফিরে এসে সারা ঘোষণা করল, সে নিজের ঘরে একটু বিশ্রাম নিতে চায়। একেবারে ডিনারের সময় যেন তাকে ডাকা হয়। সে ঘরে দোর দেওয়ার পর শাজাহানসাহেব আর আমি ধূমায়িত চায়ের কাপ হাতে হাউসবোটের সামনের লাউঞ্জে এসে বসলাম। এখান থেকে রাতের ডাল লেকের দৃশ্য বেশ উপভোগ্য। সুদূরপ্রসারী ঘনকৃষ্ণ বিস্তার। অনেক দূরে অন্য তীরে কয়েকটি আলোর বিন্দু। সেদিকে চোখ রেখে শাজাহানসাহেবের সাথে বেশ কিছুক্ষণ গল্প করলাম। বিষয় বিবিধ। কাশ্মীরের বর্তমান পরিস্থিতি, পর্যটনব্যবসার সম্ভাবনা,—দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ইত্যাদি।
বোটের পেছনে লেকের পাড়ে মালিকের বাড়ি। রাত আটটা বাজতেই সেখান থেকে শাজাহান—সাহেবের চাকর খাবারের পাত্র এনে ডাইনিং রুমে রাখল। আমি সারা—কে ডাক দিলাম।
আয়োজন সামান্যই—রুটি, পনীর—ক্যাপসিকামের তরকারী আর সেমাই।
সারা কিন্তু তাই দেখে বাচ্চা মেয়ের মতোই খুশি হয়ে উঠল। নিজের প্লেটে একটা রুটির সাথে অল্প তরকারি আর সেমাই নিয়ে সেই প্লেট সামনে রেখে সে হাসিহাসি মুখে একটা সেলফি তুলে ফেলল। তারপর ছবিটা আমাকে দেখতে দিল।
কামেরার গুণে না তার হাতের গুণে জানি না, ছবিটা দেখলাম অসাধারণ হয়েছে। রুটি আর তরকারি একেবারে আসলের মতো, যেন মোবাইলের স্ক্রীন থেকে তুলে খাওয়া যায়।
সারাকে এ কথা বলতে সে হেসেই গড়িয়ে পড়ল, ঠাট্টার ছলে একবার স্ক্রীন থেকে খুঁটে খাওয়ার ভঙ্গীও করল। কিন্তু আদৌ কিছু খেল না।
একটু পরে আমাদের শুভরাত্রি জানিয়ে সে যখন নিজের ঘরে চলে গেল, আমরা দু'জনেই দেখলাম প্লেটে—র কোনো খাবারই সে স্পর্শ করেনি। চাকর যখন সেই উচ্ছিষ্ট একটা বালতিতে ফেলছে, শাজাহান দুঃখিত স্বরে বললে, ''ও খেল না কেন? আমিষ নেই বলে খানা পসন্দ হয়নি?''
আমি কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললাম, ''জানি না''!
শাজাহানসাহেব বোধহয় কিছুটা রোখ চেপে গিয়ে থাকবে।
তিনি একটু জেদি সুরে বললেন, ''বেশ কাল তো তোমরা বাইরে বাইরে ঘুরবে—সারদিন? ফিরে এসো, তারপর রাতে একদম মনপসন্দ খানা লাগাব মেনুতে গোস্তাবা থাকবে।
গোস্তাবা হল স্থানীয় গোলাকৃতি সসেজ, ছাগমাংসের কিমা থেকে তৈরি হয়। সাদা আর লাল, দু'রকম ঝোলের মধ্যে বস্তুটি পরিবেশন করা হয়। পারিবারিক অভ্যাসের দরুন আমি নিজে প্রায় নিরামিষাশী, কিন্তু এই একটি আমিষ পদ আমারও বিশেষ প্রিয়।
আমি উৎফুল্ল হয়ে বললাম, ''হ্যাঁ আব্বু, সে—ই ভালো!''
পরের দিন সকালে প্রাতঃরাশ খেতে বসেও কিন্তু সারা আগের রাতের পুনরাবৃত্তি ঘটাল! টেবিলে মাখন ও জ্যাম সহযোগে টোস্ট দেওয়া হয়েছে, সেদিকে সে ফিরেও তাকাল না। কাশ্মিরী কারুকাজ করা পটটা সম্ভবতঃ তার ভালো লেগে থাকবে। সেটা একেবারে সামনে টেবিলের ওপর মুখ রেখে সে একটা সেলফি তুলল। আমাকেও দেখাল। ছবিটা এমন কৌশলে তুলেছে, যেন মনে হচ্ছে সরাসরি টি পট থেকেই চুমুক দিচ্ছে!
এরপরেই কিন্তু সারা উঠে ঘরে চলে গেল। আমাকে বলে গেল খেয়ে নিয়ে রেডি হতে। একটু অবাক হয়েই আমি টিপট থেকে চা ঢেলে নিলাম।
চুমুক দিয়ে কিন্তু আঁতকে উঠতে হল আমার মুখে বিস্বাদ! গন্ধীহীন এক তরল অথচ! রঙ তো চায়ের মতোই আবার কাপের—পটের ঢাকনা সরিয়ে তার দিকে তাকিয়ে দেখলাম। তারপর উঁকি মারলাম। তার ভেতরের চাও দেখে অন্ততঃ অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। অবশ্য এমনটা হতেই পারে। হয়তো কোনো কারণে চায়ের স্বাদগন্ধ উৎরোয় নি। বাকি চা আর খাওয়া গেল না। নতুন করে বানাতে বললে সময় লাগবে, তাই ঝটপট দু'টো টোস্ট খেয়ে সারার সাথে বেরিয়ে পড়লাম।
মুঘল গার্ডেনে যাওয়ার কথা আগেই বলেছি। সেখানকার পর্ব শেষ করে আমাদের পরবর্তী গন্তব্য হল টিউলিপ গার্ডেন।
পুরোপুরি মরশুম না হলেও বাগানের অনেক ফুলই ইতিমধ্যে ফুটে উঠেছে। না ফোটা বা আধফোটা কুঁড়িও কিন্তু বর্ণময় এবং দৃষ্টিনন্দন। আমার অনেকবার এখানে আসার ফলে কিছুটা অভ্যাস হয়ে গেছে, কিন্তু সেই অপূর্ব দৃশ্য দেখে সারা মোহিত হল। বিশেষ করে এক ধরনের বেগুনি—লাল টিউলিপের সামনে থেকে সে আর নড়তেই চায় না। হাত বাড়িয়ে ছুঁতেও যাচ্ছিল, কিন্তু আমি মানা করলাম।
একটু মনঃক্ষুণ্ণ হয়েই সারা তার মোবাইল বার করে সেই ফুলগুলোর সাথে একটা সেলফি তুলল। ছবির ফুলের ওপর কয়েকবার আঙুল বোলাল।
তারপরেই কিন্তু সে আমাকে সংক্ষেপে বলল, ''চলো''!
বলেই দ্রুতপায়ে বাগানের গেটের দিকে হাঁটা লাগল। মেয়েটা কি একটু ছিট গ্রস্ত?
—ভাবতে ভাবতে আমিও তার পিছু নিলাম—।
গাড়ির কাছাকাছি এসে কিন্তু আমি থমকে দাঁড়ালাম। আমার হাতে ভ্যানিটি ব্যাগটা নেই—উদভ্রান্ত ভাবে কিছুক্ষণ এদিক—ওদিক তাকাবার পর মনে পড়ল, বাগানের সেই শেষ জায়গায় একটা বসার বেঞ্চের ওপর ব্যাগটা ফেলে এসেছি। সারাকে বললাম, ''একটু দাঁড়াও'' আবার সেদিকে দৌড়লাম।
ভাগ্য ভালো, ভ্যানিটি ব্যাগ যথাস্থানেই আছে। সেটা নিতে নিতে লক্ষ্য করলাম—একজন মালী একটা কাঁচি দিয়ে সেখানকার কিছু টিউলিপ কেটে ফেলছে। মুখচোখ দেখে মনে হয়, যথেষ্ট হতভম্ব। তাকে বিড় বিড় করে কিছু বলতে শুনে কৌতূহলবশতঃ কান পাতলাম।
''এই ফুলগুলো তো আজ সকালেই ফুটল এর মধ্যেই এরকম শুকিয়ে মরে গেল কি করে?''
বলাই বাহুল্য, এটাও সামান্য ঘটনা। তখন তাড়াহুড়োর মধ্যে ভালো করে খেয়ালও করিনি। অনেক পরে মনে পড়েছে।
সাধারণতঃ অতিথিকে টিউলিপ গার্ডেন দেখানোর পরেই আমরা মধ্যাহ্ন ভোজের বিরতি নিয়ে থাকি। কিন্তু শ্রীনগরের নামকরা রেস্তোরাঁ ''মুঘল দরবার''—এর সামনে এসে সারা—কে সেই প্রস্তাব দিতে সে বেঁকে বসল।
''আমার খিদে নেই, তোমরা খেয়ে নাও।''
শত উপরোধেও সে গাড়ি থেকে নামতে চাইল না। আচ্ছা বিড়ম্বনা! বাধ্য হতে তাকে সেখানেই রেখে শাহদাব আর আমি রেস্তোরাঁয় ঢুকলাম।
শাহদাব একটু অবাক হয়েই বলল, ''মেমসাবকে তো পথেও কিছু—খেতে দেখলাম না।''
ব্যাপারটা আমারও চোখে পড়েছে। কিন্তু সে নিয়ে তখন আর ভাববার অবকাশ নেই। যত দ্রুত সম্ভব নাকে মুখে কিছু গুঁজে ফিরে এলাম। আমরা গাড়িতে সমস্ত দ্রষ্টব্য জায়গা ঘুরে লেকে ফিরতে ফিরতে বিকেল গড়িয়ে গেল। প্রায় অন্ধকারের মধ্যেই আমরা লেকের তীরে এসে নামলাম। সেখান থেকে আবার শিকারায় করে হাউসবোট।
বোটে উঠতেই মহম্মদ শাজাহান আমাদের দু'টো খবর দিলেন। প্রথমতঃ, ইমরান দুপুরবেলা ফিরেছে। সে বাড়িতে ঘুমোচ্ছে, ডিনারের সময় এসে আমাদের সাথে দেখা করবে।
দ্বিতীয়তঃ, তিনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আজ মেনুতে গোস্তাবার ঝোল রেখেছেন।—
সারা গোস্তাবা নামটা শুনে কৌতূহল প্রকাশ করল। শাজাহান তাঁর নিজস্ব ইংরেজিতে তাকে বুঝিয়ে বললেন, জিনিসটা কি। স্থানীয় খাবার, তদুপরি অনাস্বাদিত নতুন খাবারের কথা শুনে তার বেশ উৎসাহ লক্ষ্য করলাম।
নৈশভোজের সময় শাহাজাহানসাহেবের চাকর একটা সুদৃশ্য চীনামাটির পাত্রে সেই গোস্তাবা নিয়ে এল। রক্তিম সুরুয়ার মধ্যে ভাসমান মাংসের গোলক সত্যিই দৃষ্টিনন্দন। ঘ্রাণেও মাতোয়ারা। উৎফুল্ল হয়ে সারা আমার প্লেটে কয়েকটা তুলে দিল, নিজ্যে নিল গোটাচারেক। আমি একটা ভেঙে মুখে দিলাম। দুর্দান্ত স্বাদ।
সারার কেমন লাগছে দেখবার জন্য তার দিকে তাকিয়ে হতবাক হয়ে রইলাম। সে একটি গ্রাসও খায়নি। বরং প্লেট সামনে রেখে সেলফি তুলতেই ব্যস্ত। এভাবেই কেটে গেল প্রায় পাঁচ মিনিট।
সেলফি তোলার পর ছবির সেই গোস্তাবার প্লেটের ওপর একটা আঙুল রেখে সে আরো অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে রইল। ভাবলাম, হয়তো ছবিটা নেটে আপলোড করতে চাইছে। কিন্তু তা নয়। হঠাৎ সে আঙুলটা নিজের জিভে ঠেকাল। একবার, তারপরে আরো একবার। কেন জানি না, ভঙ্গীটা আমার খুব অশালীন আর দৃষ্টিকটু মনে হল।
শাজাহান—সাহেবও ব্যাপারটা লক্ষ্য করেছিলেন। তিনি সবে সারা—কে আসল জিনিসটা আস্বাদনের অনুরোধ করতে যাবেন, এমন সময় ইমরান ডাইনিং রুমে এসে ঢুকল। সারা খাবার ফেলে হাঁ করে তার দিকে চেয়ে রইল।
অবশ্য ইমরান দেখার মতোই ছেলে বটে! ছ'ফুট লম্মা, টকটকে ফরসা, পেটানো স্বাস্থ্য।
গ্রীক ভাস্কর্যের মতো সুন্দর নাক—মুখ—চোখ। আচরণও মার্জিত। তবুও, সারা—র তাকিয়ে—থাকার ভঙ্গীটা আমাদের সবারই কেমন অসঙ্গত মনে হল।
এরপর আরো স্থূলভাবে সে বলল, ''হোয়াট আ হ্যাণ্ডসাম ইয়ং মান''!
ইমরান বেশ অপ্রতিভ হল। হাউসবোটের বৈদ্যুতিক আলো বিশেষ জোরালো নয়। তবু তাতেই দেখা গেল, তার দুই গাল কাশ্মিরী আপেলের মতোই লাল হয়ে উঠেছে। জোর করে হেসে উঠে সে ধন্যবাদ জানাতে যাচ্ছে, হঠাৎ সারা উঠে পড়ল।
''আমার খাওয়া শেষ'' এই সংক্ষিপ্ত বিবৃতি দিয়ে সে নিজের ঘরে ঢুকে গেল। গোস্তাবা যেমন কে তেমন পড়ে রইল।
শাজাহানের কষ্ট হচ্ছিল। নিজের মাথার দিকে সাহেবের হতাশ মুখের দিকে তাকিয়ে আমার—ইঙ্গিত করে আমি বোঝালাম, সারার মস্তিষ্কের সুস্থতা সম্পর্কেই আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। তারপর তার ফেলে যাওয়া প্লেট থেকে একটা—গোস্তাবা ফর্কের সাহায্যে সন্তর্পণে নিজের প্লেটে তুলে নিলাম। খাবার এভাবে নষ্ট করা উচিত নয়।
কিন্তু একি রসহীন শক্ত—সেই গোস্তাবায় কামড় দিয়েই আমি চমকে উঠলাম। স্বাদহীন! রবারের মতো একটা বস্তু তৎক্ষণাৎ, মুখ থেকে ফেলে দিতে বাধ্য হলাম।
শাজাহানকে সে কথা বলতে তিনি হাঁ করে কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর একটা চামচ দিয়ে সারার প্লেটের একটা গোস্তাবার একটুখানি কেটে মুখে দিলেন।
একবার চিবোতেই কিন্তু তাঁর মুখের ভাবের পরিবর্তন হল। কিছুটা অনিশ্চয়তার সুরে তিনি বললেন, ''তাই তো মনে হয়!'' এগুলো কোনো ভাবে নষ্ট হয়ে গেছে।
ইমরান কিন্তু বিশ্বাস করল না। সে বলল, ''হতেই পারে না একটু আগেই আমি নিজে চেখে দেখেছি।''
ঘাড় নেড়ে আমি তার কথায় সায় দিলাম। এখনই এই গোস্তাবা খেয়ে দেখেছি আমিও। ঠিক তখনই আগের কয়েকটা ঘটনার কথা আমার মনে পড়ে গেল।
সকালবেলার সেই টিপটের চা সারা ছবি তুলে নিয়ে চলে যাওয়ার পর সেটাও তো আমার এরকমই বিস্বাদ লেগেছিল! টিউলিপ গার্ডেনের সেই ফুলগুলো? সারা তাদের সাথে সেলফি তোলার কিছুক্ষণ পরেই সেগুলো শুকিয়ে নষ্ট হয়ে গেছিল না? অন্ততঃ আমি ফিরে গিয়ে তাই তো দেখেছিলাম!
একবার ভাবলাম, বাবা ছেলেকে কথাটা বলি। পরক্ষণেই মত পরিবর্তন করলাম। তুচ্ছ বিষয়, সম্ভবতঃ কাকতালীয়। বলার মতো কিছুই না। তাই দু'জনকে শুভরাত্রি জানিয়ে আমিও ঘরে চলে এলাম।
রাতে কিন্তু ঘুম হল না। মনের মধ্যে কি যেন অস্বস্তি চেপে বসেছে। বারবারই—মনে হচ্ছে, আমি যেন এমন কোনো ঘটনা প্রত্যক্ষ করছি, যা ঠিক সঙ্গত বা স্বাভাবিক নয়।
সারারাত বিছানায় উসখুস করার পর ভোরের দিকে চোখ জুড়ে এসেছিল। ঘুম ভাঙল শাজাহানসাহেবের ডাকে।—''রুহি বেটি—, উঠে পড়ো তিনি দরজা ধাক্কাচ্ছেন—চটপট রেডি হয়ে নাও। আমি ব্রেকফাস্ট দিয়ে দিয়েছি। একটু পরেই তো তোমাদের এয়ারপোর্ট রওনা হতে হবে''!
তাড়াতাড়ি উঠে মুখহাত ধুয়ে নিলাম। ব্রেকফাস্ট টেবিলে কিন্তু সারাকে দেখতে—পেলাম না।
''আব্বু, সারা কোথায়?''
স্মিত হেসে প্রৌঢ় বললেন, ''আরে, সে সত্যিই এক পাগলী চা না খেয়েই সোজা আমার বাড়িতে চলে গেছে''!
বাড়িতে? একটু অবাক হলাম। ঝটপট ব্রেকফাস্ট শেষ করে হাউসবোটের পাশের কাঠের পাটাতন ধরে আমিও বোটের পেছন দিকে রওনা দিলাম। গিয়ে দেখি, আশ্চর্য দৃশ্য!
বাড়ির সামনের চাতালে সারা ইমরানের হাত ধরে হেসে লুটিয়ে পড়ছে, যেন দু'জনে কতকালের বন্ধু! তার প্রগলভতার স্পর্শে ইমরান—ও এখন সাবলীল, কাল রাতের জড়তা উধাও।
সেও হেসে হেসে গল্পও করছে, নিজের বাড়ির দিকে আঙুল তুলে কিছু একটা দেখাচ্ছে। আমার সামনেই সারা তার পাশে দাঁড়িয়ে মোবাইল বার করে তাকে সাথে নিয়ে একটা সেলফি তুলল।
দু'জনের কাণ্ডকারখানা দেখে আমারও মজা লাগছিল। গতরাতের অস্বস্তিটা তখন পুরোই—কেটে গেছে। খালি একটা কারণেই একটু ভয় করছিল।
ইমরানের বিয়ে হয়েছে মাস ছয়েক হল। নবপরিণীতা বধূটিও দেখলাম বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। বিদেশিনীর সাথে স্বামীর মাখামাখি দেখে সে যদি চটিতং হয়?
অচিরেই সে আশঙ্কা দূর হল। দেখলাম, মেয়েটি হিজাব একটু সরিয়ে দুজনের রকমসকম দেখছে এবং মিটিমিটি হাসছে।
আমিও তাদের সাথে যোগ দিতে যাব, এমন সময় আমার ফোন বেজে উঠল। তুলে দেখি, শাহদাব ফোন করেছে। সে গাড়ি নিয়ে লেকের অন্য পাড়ে এসে দাঁড়িয়ে আছে। সারাকে ডাক দিয়ে—আমি বোটের দিকে ফিরলাম। এবারের মতো ভ্রমণপর্ব শেষ।
এয়ারপোর্ট ফেরার পথে আমি গাড়ির সামনে শাহদাবের পাশে বসেছিলাম। রাস্তায় সারা বিশেষ কথা বলে নি। এয়ারপোর্টের কাছাকাছি পৌঁছে ''এসে গেছি'' বলে আমি পেছনে ফিরলাম। ফিরেই, স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে রইলাম।
সারার কোনোদিকে নজর নেই। গভীর আশ্লেষে সে তার মোবাইলের পর্দায় চুম্বন করছে। আমার ডাকে তার সম্বিৎ ফিরল। চোখে চোখ পড়তেই একটু অপ্রস্তুত হয়ে সে ফোনটা নামাল।
এক মুহূর্তের জন্য আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম, মোবাইলের পর্দায় ইমরানের সাথে তোলা তার সেই ছবি। একটা অজানা আশঙ্কায় আমার বুকের ভেতর অবধি কেঁপে উঠল মুহূর্ত মাত্র।
তারপরেই সারা গাড়ির দরজা খুলে নেমে পড়ল। অত্যন্ত স্বাভাবিককভাবেই হেসে এবং করমর্দন করে আমার কাছে বিদায় নিল। শাহদাবকে কিছু—বকশিস দিয়ে সে গটগট করে এয়ারপোর্টের ভেতর ঢুকে গেল।
মনের মধ্যে একটা অনির্দেশ্য অস্বস্তি নিয়েই আমি বাড়ির পথে রওনা হলাম। এরপর প্রায় দু'মাস ডাল লেকের দিকে আর যাওয়া হয়ে ওঠেনি। পরপর দু'জন মহিলা পর্যটককে আমার নিজের অঞ্চল জম্মুর বৈষ্ণোদেবী মন্দির দেখালাম। তারপর তিনজন ব্রিটিশ মহিলার একটি দলের সাথে শ্রীনগর ছুঁয়ে পাড়ি জমালাম লেলাদাখ। প্রায় পনেরো দিনের লম্বা সফর।
জুন মাসের গোড়ার দিকে অ্যালিস নামে একটি আমেরিকান মেয়ের সঙ্গী হয়ে আবার ফিরলাম ডাল লেকে। আবার সেই ''মাদার ইন্ডিয়া'' হাউসবোট। কিন্তু এবার মহম্মদ শাজাহানকে দেখে রীতিমতো চমকে উঠতে হল।
এই ক'দিনে ভদ্রলোকের চেহারা যেন অর্ধেক হয়ে গেছে। চুল ও সযত্নলালিত দাড়ি দু'টোই অবিন্যস্ত। মুখ গম্ভীর এবং চিন্তাক্লিষ্ট; সেই প্রসন্ন হাসিটি উধাও। উদ্বিগ্ন হয়ে একান্তে আমি তাঁকে প্রশ্ন করলাম, ''কি হয়েছে আব্বু, শরীর খারাপ নাকি?''
প্রথমে বলতে চাইছিলেন না। অনেক চাপাচাপি পর প্রকাশ হল, সমস্যা তাঁকে নিয়ে নয়, ইমরানকে নিয়ে।
দু'মাস আগে আমরা চলে যাওয়ার পর থেকেই তার একটা অদ্ভুত পরিবর্তন শুরু হয়। খিদে নেই, ঘুম নেই, কাজে মন নেই। সব সময় একটা উদভ্রান্ত ভাব।
শাজাহানসাহেবের বিবি প্রথমে ভেবেছিলেন—স্বামী স্ত্রীর মনোমালিন্য। কিন্তু ইমরান পত্নী রোকেয়াকে প্রশ্ন করে জানা গেল—সেও অন্ধকারে। বেশ খানিকটা ইতস্ততঃ করার পর সে শাশুড়িকে বলে ফেলল, হঠাৎ করেই অন্তর্হিত হয়েছে ইমরানের প্রাণচাঞ্চল্য। এমনকি, সহবাসেও সে এখন সম্পূর্ণ অক্ষম।
স্থানীয় ডাক্তার ভালোভাবে পরীক্ষা—নিরীক্ষা করে জানালেন—ইমরানের সমস্যা শারীরিক নয়, সম্ভবতঃ মানসিক। তাঁর পরামর্শে মনোবিদের কাছে যাওয়া হল।
সেই মানসিক চিকিৎসা এখনও চলছে, কিন্তু লাভ কিছুই হচ্ছে না। অবস্থা দ্রুত আরো অবনতির দিকেই এগোচ্ছে।
শুনে আমি শিউরে উঠলাম। হঠাৎ করেই মনে পড়ে গেল দু'মাস আগের সেই দৃশ্য। শ্রীনগর এয়ারপোর্টে ফেরার পথে মোবাইলের পর্দায় ইমরানের ছবিতে চুমু খাচ্ছে সারা!
শাজাহান সাহেবের অনুমতি নিয়ে অসুস্থ ইমরানকে দেখতে তাঁর বাড়িতে গেছিলাম। না গেলেই হয়তো ভালো হত। শয্যাশায়ী, কঙ্কালসার, বিকারগ্রস্ত মানুষটি আমাকে চিনতে পারেনি।
এর প্রায় একমাস পরে জম্মুর বাড়িতে বসেই তার মৃত্যুর খবর পাই।
''প্যারাডাইস স্ট্যুরস অ্যাণ্ড ট্র্যাভেলস''—এর কাজটা ছেড়ে দিয়েছি। এখন ঘরে বসেই অনলাইনে কাশ্মিরী গয়নার ছোট ব্যবসা চালাই।
বাবা মা বিয়ের জন্য বহুদিন থেকেই চাপ দিচ্ছেন ভাবছি এবার করেই ফেলব।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন