কৌশিক কারক, আকাশ চন্দ, উৎস ভট্টাচার্য

প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে প্রিয়ম যখন বাড়ি ফিরছিল, ঘড়ির কাঁটায় বাজে তখন পাঁচটা। আলো আঁধারি পরিবেশে, ঝিরিঝিরি হাওয়ায় হাঁটতে ভালোই লাগে প্রিয়মের। অবশ্য অনেকবার তাকে গাড়ি নিতে বলেছিল ঠিকই, কিন্তু এই অবস্থায় একটু আধটু হাঁটতে হয় বটে। আর দোকানটাও তো সামনেই।
বাড়ির প্রায় কাছে চলে এসেছে ও।
হঠাৎ একটি বাচ্চার কান্নার আওয়াজ পায় সে। কোথা থেকে আসছে আওয়াজটা আশপাশে খুঁজতে থাকে। কাছাকাছি একটা সরু গলি আছে, অনেকটা অন্ধকার সেখানে, সেদিকে এগিয়ে দেখতে যায় প্রিয়ম।
একটি বাচ্চা মেয়ে, হাঁটুতে মুখ গুঁজে কেঁদে চলছে অনবরত। মায়া হয় প্রিয়মের। কোথা থেকে এলো বাচ্চা মেয়েটি? কেউ কি রেখে গিয়েছে ওকে? নাকি হারিয়ে গিয়েছে?
ওর কাছে গিয়ে, ডাকতে থাকে ওকে, এই অবস্থায় বেশি নীচু হওয়াও সম্ভব নয়। এই মাসেই ডেলিভারির তারিখ আছে প্রিয়মের।
—বাবু, এই বাবু, এখানে কি করছো?
মেয়েটি প্রিয়মের দিকে মুখ তুলে তাকায়। মিষ্টি দেখতে মেয়েটি। কিন্তু চোখগুলো অস্বাভাবিক রকমের উজ্জ্বল, চোখের মণিটা স্থির। কিছু কিছু মানুষের দৃষ্টি এমন হয়ে যাদের দিকে তাকালে মনে হয় তারা বুঝি আমাদের ভেতরটা পুরো দেখে নিচ্ছে। ভেতরের গোপন খবরগুলোও পড়ে নিচ্ছে। এই মেয়েটির দৃষ্টিও অনেকটা সেরকম।
প্রিয়ম আবার বলে।
—তুমি এখানে কি করছো? তোমার সাথে কেউ কি আছে?
মেয়েটি উত্তরে দুদিকে মাথা ঝাঁকায়।
—তোমায় বাড়ি কোথায়? তুমি কি হারিয়ে গিয়েছো?
মেয়েটি আবার দুদিকে মাথা ঝাঁকায়।
এদিকে সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে, বাড়িতে তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে।
মেয়েটিকে এভাবে ফেলে চলে যাবে?
পুলিশ স্টেশনে নিয়ে যাবে? কিন্তু একা একা তো দৌড়ঝাঁপও তো সম্ভব নয়।
প্রিয়ম একটু সোজা হয়ে দাঁড়ায়। কোমরটা ব্যথা করছে ওর।
হঠাৎ মেয়েটি ওর ওড়না টেনে ধরে।
মেয়েটির চোখগুলোতে করুণ আর্তি আর ভয়।
প্রিয়ম আর ভাবে না, ওর হাত ধরে বাড়িতেই নিয়ে আসে। এরপর অনিক মানে ওর বর এলে দেখা যাবে কি হয়।
কলিংবেল টিপতে থাকে অনেকক্ষণ, দরজা খোলার নাম নেই। পিয়া এমনই, বড্ড আলসে। নিশ্চয়ই ইউনিভার্সিটি থেকে ফিরে মোবাইল নিয়ে বসে গিয়েছে। পিয়া প্রিয়মের বোন, পাঁচ বছর হলো প্রিয়মের এখানেই আছে, এখান থেকেই কলেজ করেছে তারপর এখন ইউনিভাসিটিকে পড়ছে।
একটু পর দরজা খোলে পিয়া। চুলগুলো উসকোখুসকো হয়ে রয়েছে ওর।
ওকে দেখেই বাচ্চা মেয়েটি প্রিয়মের পেছনে গিয়ে লুকায়, মনে হয় ভয় পাচ্ছে।
—কি রে, এতোক্ষণ লাগলো দরজা খুলতে? জিনিসগুলো ধরতো।
—আরে, চোখ লেগে গিয়েছিল, আজ এতো চাপ ছিল ক্লাসের। আরে, এই বাচ্চাটা কে? কাকে ধরে নিয়ে এলি তুই?
—সব বলছি চেঁচামেচি করিস না। আমাকে একটু চা খাওয়া তো।
প্রিয়ম মেয়েটিকে নিয়ে বসার ঘরে ঢোকে। সোফার বসিয়ে বাচ্চাটিকে ভালোমতন দেখে, হাত পা একটু ছড়ে গিয়েছে। ফাস্ট এইড বক্সটা বের করে ডেটল দিয়ে মুছে ব্যান্ডেজ লাগিয়ে দেয় সেখানে।
—কি ব্যাপার দি, বললি না তো বাচ্চাটা কে?
প্রিয়ম সব খুলে বলে পিয়াকে।
—দি, তুই কি পাগল? হুট করে একটা অচেনা বাচ্চা মেয়েকে ধরে নিয়ে এলি? পুলিশ যদি একে খোঁজে তখন আমরাই তো ফাঁসবো।
মেয়েটি আবার প্রিয়মের হাত ধরে মুখ লুকায়।
—তুই চিৎকার করিস না তো। দেখেছিস তো ভয় পাচ্ছে। আমি কি ফেলে আসবো নাকি রাস্তায় ওভাবে। এমনিতে যা অবস্থা আজকাল। আমি কথা বলি আগে, সব জানতে পারবো।
এর মধ্যে অনিক চলে আসে সেখানে।
—না প্রিয়ম এটা মোটেও ঠিক হয়নি।
—অনিক, তুমি এতো তাড়াতাড়ি এলে? বলেছিলে যে দেরি হবে?
—আরে মিটিংটা জলদি শেষ হয়ে গেল। যাইহোক, তুমি আমার আর পিয়ার ওপর সবটা ছেড়ে দাও, আমরা মেয়েটিকে নিয়ে যাচ্ছি পুলিশ স্টেশনে।
মেয়েটি পুলিশের নাম যতোবার শুনছে, আরো আঁকড়ে ধরছে প্রিয়মকে।
—অনিক প্লিজ, কাল দেখা যাবে। আজ থাক না, খুব ভয়ে আছে মেয়েটি। এক কথা বলতে বলতে আমি ক্লান্ত।
—ওকে, ওকে। যা খুশি করো। আমি কিছু বলবো না।
অনিক, পিয়া চলে যায় যার যার ঘরে।
—দেখলে বাবু, ওই আঙ্কেলটা কি রাগী একদম তুমি ভয় পাবে না! আমি আছি তো। তুমি কি কিছু খাবে? খিদে পেয়েছে। আবার সম্মতিসূচক মাথা নাড়ায় মেয়েটি।
—তুমি বোসো, আমি আসছি।
কিছুক্ষণ পর একগ্লাস গরম দুধ নিয়ে এলো প্রিয়ম।
দুধের গ্লাসটা ঢকঢক করে শেষ করে, একগাল হাসি দেখা গেল মেয়েটির মুখে।
কি মিষ্টি হাসিটা, গালে গভীর টোল, আর ঠোঁটের ওপর আকর্ষণীয় একটা তিল। আর মাথাভর্তি কোঁকড়া চুল ঠিক প্রিয়মের মতোন।
মেয়েটির মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে হঠাৎ প্রিয়মের চোখে জল চলে আসে। কোন মা বাবার কোল থেকে হারিয়ে গেল মেয়েটা?
মেয়েটি ওর হাত ধরে টানতে থাকে আবার।
—হুম মামনি।
মেয়েটি ওর ছোট ছোট হাত দিতে মুছিয়ে দেয় চোখের জল।
প্রিয়ম জড়িয়ে ধরে মেয়েটিকে।
কেমন একটা টান অনুভব করছে মেয়েটির জন্য। কেন এমন হচ্ছে?
নিজেকে সামলে, এবার মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করে প্রিয়ম।
—তোমার নাম কি মামনি? তোমার বাবা কে? মা কে? বাড়ি কোথায়? সব আমাকে বলবে? মেয়েটা ইশারায় কিছু বোঝাতে চায়। প্রিয়ম বুঝতে পারে না।
রাইটিং টেবিল থেকে লেখার প্যাড আর পেন তুলে নিয়ে ভাঙা ভাঙা বাংলায় মেয়েটি লেখে,
—আমি কথা বলতে পারি না।
সেটা দেখার পর প্রিয়মের আরো মায়া বেড়ে যায়।
—আচ্ছা, আমি একটা করে প্রশ্ন করবো, তুমি উত্তরটা লিখবে কেমন? তোমার নাম কি?
মেয়েটি লেখে,
—পিউ।
নামটা শুনে ভেতরটা ছ্যাঁত করে ওঠে প্রিয়মের। পিউ!
—তোমার বাবার নাম কি?
—অনিন্দ্য পাল।
—তোমার মায়ের নাম?
—স্বপ্না পাল?
—তোমার বাড়ি কোথায়?
—জানি না।
—কোন ক্লাসে পড়ো তুমি?
—পড়ি না।
—তুমি হারিয়ে গিয়েছো?
—হ্যাঁ।
—কিভাবে? কেউ কি তোমাকে ফেলে রেখে গিয়েছে?
—না।
—তাহলে? কেউ তোমার সাথে দুষ্টু করেছে?
—হ্যাঁ।
—কেউ তোমাকে উঠিয়ে নিতে চেয়েছিল আর তুমি পালিয়ে এসেছো?
—হ্যাঁ। কামড় দিয়েছি হাতে।
প্রিয়ম ভয় পায়। আহা, এইটুকুন মেয়ে কত কিছু সহ্য করেছে একটা দিনে। ওকে আজ আর প্রশ্ন করে না জ্বালালেই নয় কি?
পিউকে নিয়ে গিয়ে, স্টাডিরুমের ছোট খাটটায় শুইয়ে দেয়। মেয়েটার জন্য কিছু জামাকাপড় জোগাড় করতে হবে। আপাতত ঘুমোক।
পিউকে ঘুম পাড়িয়ে প্রিয়ম চলে আসে বেডরুমে।
—অনিক, কি করছো?
—দেখছই তো, ল্যাপটপে আর কি করি আমি?
—রাগ করেছো?
—না, রাগ করে আর কি হবে?
—মেয়েটা কথা বলতে পারে না গো। কেউ ওকে উঠিয়ে নিয়ে যেতে চাইছিলো বোধহয়। আমি ফেলে আসলে কি হতো বলো তো?
—কি? কিডন্যাপিং কেস? কি রিস্ক নিচ্ছো তুমি জানো?
—উহু। আর ভালো লাগছে না। কাল যা করার করবো। এখন অন্য কথা বলো না। আচ্ছা, আমাদের বেবির জন্য আরো কিছু জিনিস কেনা দরকার ছিলো না?
—সে কেনা যাবে। কালই আমি আর পিয়া বেরিয়ে যাবো। তুমি লিস্ট করো।
—ভাবো, পিয়া না থাকলে আমি সামলাতাম কিভাবে? এতো হেল্প করে মেয়েটা!
—হুম, সত্যিই।
—অনিক আজকাল খুব ভয় করে, ডেলিভারির ডেট তো চলেই এল সামনে বলো?
অনিকের মনটা গলে এবার। ল্যাপটপ সরিয়ে পিয়াকে জড়িয়ে বসে। ওর মাথায় হাত বোলাতে থাকে।
—সব ঠিক হবে। একদম চিন্তা কোরো না।
রাতের বেলা সবার ডিনার শেষ হয়ে প্রিয়ম একটি থালায় খাবার সাজিয়ে নিয়ে যায় পিউয়ের জন্য। রুমে গিয়ে দেখে পিউ উঠে বসে আছে বিছানায়।
—চলো, পিউ ডিনার নিয়ে এসেছি। খেয়ে নাও।
পিউ ওর ব্যান্ডেজ লাগানো হাতটা দেখায় প্রিয়মকে।
—ও হো, বাবু। তুমি তো একা হাতে খেতে পারবে না। বেশ আমি খাইয়ে দিচ্ছি।
পিউকে খাইয়ে দিতে দিতে প্রিয়ম আবার ভাবুক হয়ে পড়ে। পিউ নামটা ও পাঁচ বছর আগেই ভেবেছিল। যদি মেয়ে হয়, তাহলে পিউ নাম রাখবে।
আচ্ছা, পিউকে হারিয়ে ওর মা বাবাও নিশ্চয় তেমন অসহায়বোধ করছে? সন্তান হারানোর জ্বালাটা সে বোঝে। পিউকে জলদি তার মা বাবার কাছে পৌঁছে দিতে হবে।
খাওয়া শেষে, পিউয়ের মুখ মুছিয়ে দিয়ে আবার ঘুমোতে বলে প্রিয়ম।
রান্নাঘরে কিছু কাজ সেরে নিজের রুমে চলে ও।
অনিক ঘুমিয়ে পড়েছে। নাইট ড্রেসটা পরে, ওষুধটা খেয়ে নিয়ে অনিককে জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়ে ও।
মাঝরাতে কিসের একটা আওয়াজে ঘুম ভেঙে যায় প্রিয়মের।
কে যেন মা, মা বলে ডাকছে।
প্রিয়ম প্রথমে ভাবে ভুল শুনছে। না, আবার শুনছে স্পষ্ট কেউ মা....., মা বলে ডেকেই চলেছে।
প্রিয়ম আস্তে আস্তে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। অনিকের ঘুমটা আবার পাতলা, ভেঙে যেতে পারে।
পা টিপে টিপে বেরিয়ে আসে বসার ঘরে। বারান্দা থেকে আওয়াজটা আসছে।
স্টাডিরুম দিয়ে বারান্দায় যেতে হয়। স্টাডিরুমের বাতি জ্বালিয়ে প্রিয়ম দেখে পিউ সেখানে নেই।
খোলা বারান্দা থেকে হাওয়া আসছে বেশ জোর। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে প্রিয়ম দেখে রাত তিনটে বাজে। আওয়াজের জোরটা আরো বেড়েছে।
বারান্দায় গিয়ে প্রিয়ম দেখে, আধখোলা রেলিঙের ওপর দুই পা তুলে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পিউ। ওর খোলা চুলগুলো হাওয়াতে দুলছে ভালোমতো। দুই হাত প্রসারিত করে সে বারবার ডেকে চলেছে—
—মা,...মা...
প্রিয়ম ভয় পেয়ে যায়, আরেকটু এগোলেই পিউ পড়ে যাবে চারতলার বারান্দা থেকে।
আস্তে আস্তে ওর পেছনে গিয়ে ওকে জাপটে জড়িয়ে ধরে প্রিয়ম। তারপর একটানে নামিয়ে আনে নীচে।
হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞেস করে প্রিয়ম।
—পিউ। কি করছো এসব? যদি পড়ে যেতে?
—মা, মা...
—তুমি যে বললে কথা বলতে পারো না?
—মা, মা...
প্রিয়ম বুঝতে পারে, পিউ হয়তো শুধু মাটুকুনুই বলতে পারে। এর চেয়ে বেশি পারে না।—
ওকে হাত ধরে নিয়ে এসে আবার বিছানায় শুইয়ে দেয়।
—মাকে মনে পড়েছে পিউ?
ও মাথা নাড়ায়।
—তোমার মা কে কেমন দেখতে ছিলো?
পিউ প্রিয়মের গালে আঙুল রাখে।
—আমার মতোন। হা হা হা.....
পিউয়ের কপালে চুমু দেয় প্রিয়ম।
—খুব জলদি আমরা তোমার মায়ের কাছে যাবো। পিউ জড়িয়ে ধরে প্রিয়মকে।
পরদিন সকালে অনিক উঠে দেখে প্রিয়ম নেই। খুঁজতে খুঁজতে দেখে প্রিয়ম শুয়ে পিউয়ের পাশে।
—সরি, অনিক। মেয়েটা কালকে....
—এনাফ প্রিয়ম। তোমার যা ড্রামা করার ইচ্ছে করো। আমি কিছু বলবো না। সরলা এসেছে, তোমাকে ডাকছে রান্নাঘরে।
—হুম যাচ্ছি।
সরলাকে রান্নাঘরে গিয়ে কি কি রান্না হবে আজ, বলে দেয় প্রিয়ম। তারপর সকলের জন্য চা বলে দিয়ে সকালের খবরের কাগজে চোখ বোলাতে থাকে।
হঠাৎ ওর কাঁধে একটা নরম হাতের ছোঁয়া পায়।
—উঠে গিয়েছো পিউ গুড মর্নিং। খবরের কাগজ দেখছি! যদি মিসিং নিউজ থেকে তোমার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়!
সরলা প্রিয়মকে কিছু জিজ্ঞেস করতে রান্নাঘর থেকে আসে। হঠাৎ পিউয়ের দিকে চোখ যেতেই কেমন যেন ফ্যাকাশে হয়ে যায় ওর মুখ।
—দিদি, একটু রান্নাঘরে আসো।
—কেন? সব তো বলেই এলাম।
—আসোই না।
রান্নাঘরে যেতেই প্রিয়মের কানের কাছে প্রায় ফিসফিস করে বলে সরলা।
—দিদি, ওই মেয়েটা কে?
প্রিয়ম কালকের সব ঘটনা বলে সরলাকে।
—কাল কি বার ছিল দিদি?
—শনিবার।
—তার মধ্যে অমাবস্যা, তাই না?
—সেটা জানি না, কেন বলোতো?
—দিদি। তোমরা শিক্ষিত মানুষ, জানি বিশ্বাস করবা না। কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি। আমাদের গেরামে এক সাধু বাবা আছে, প্রতি শনিবার আমি সেইখানে যাই।
—তিনি বলেন, অমাবস্যার দিন যদি শনিবার হয়, ডাইনিদের উৎপাত অনেক বাড়ে। তারা মানুষের বেশে আমাদের লোকালয়ে আসে আর মানুষদের বশ করে। এভাবে তারা মানুষদের মধ্যে মিইশ্যা যায়। তারপর সুযোগ বুইঝ্যা নিজেদের সাধনার জন্য মানুষগুলারে হত্যা করে।
—এইসব আজগুবি গল্প কে শোনায় তোমাকে?
—আজগুবি নয়কো আমাদের গ্রামে এক বুড়ি ছিলো, গ্রামের এককোণায় সে থাকতো, নির্জনে। তার নজর ছিলো খুব খারাপ, একবার কারো দিকে সেই দৃষ্টি হানলে কিছুদিনের মধ্যেই সে শুকায় মারা যাইতো। আমাদের গেরামের পলাশ বলে একটা বাচ্চা ছেলের দিকে নজর দিছিলো। বিশ্বাস করবা না দিদি, বাচ্চাটার শরীর তারপর থেকে শুকায় যাইতে লাগলো। একমাসের মধ্যে বাচ্চাটা মুখে রক্ত তুইলা মরে গেল।
—এটা টিউব্যাকুলোসিসের লক্ষণ। তারপর কি করলি তোরা?
—আর কি, ডাইনিটারে বেঁধে জ্যান্ত পুড়ায় দিছিলো সবাই।
—ইশ, তোরা কি মানুষ? এসব কুসংস্কারে মানুষ হত্যা করে?
—ও বাঁইচা থাকলে আরো মাইনসে মইরতো। তোমার ঘরে অই পিচ্চি মাইয়াটার দৃষ্টি ওরমই, পাথুরের মতন? ওরে আবার ঘরে আনছো? ও যদি ডাইনি হয়...
—চুপ কর তো? একটা বাজে কথা বল আরেকবার। কাজ কর।
—হু হু, ভালো কথা বলি দেখে আমারে বকো। যা মর্জি করোগা। তবে দেইখো দিদি, শুনছি ডাইনিদের ছায়া দেখা যায় না।
—সরলা, দেখ, আমার সত্যি আর ভালো লাগছে না। একটু পর দাদাবাবু বেরোবে, তোর রুটি বানানো হলো না। আজব গল্প ফেঁদে বসলি আবার। মার খাবি এরপর। হাত চালা।
প্রিয়ম তাড়াতাড়ি অনিকের কাছে যায় ওর তো অফিস যাওয়ার সময় হয়ে এলো, কালকে বেবির জন্য যে লিস্টটা বানিয়েছিল সেটা আবার দিতে হবে তো!
ঘরে ঢোকার আগের প্যাসেজটায় হঠাৎ পা পিছলে যায় প্রিয়মের। আরেকটু হলেই পড়ে যেতো যদি না সরলা এসে পেছন থেকে ধরে ফেলতো ওকে।
প্রিয়মের আচমকা চিৎকারে ছুটে আসে অনিক।
—তুমি একটু দেখে চলতে পারো না প্রিয়ম? পড়ে গেলে কি হতো বলোতো।
প্রিয়মের হাত পা কাঁপছে। সরলা ওকে বিছানায় বসিয়ে দেয়। একটু শান্ত হয়ে প্রিয়ম জিজ্ঞেস করে সরলাকে।
—সাবানগুলো জল মেঝেতে এলো কি করে? দেখে কাজ করবি তো সরলা?
—দিদি, আমি তো রুটি বানাইতেছিলাম, ঘর তো মুছিও নাই এখনো। কাপড়ও কাচিনাই। কেমনে আসলো সাবান গোলা জল?
এর মধ্যে দিদির আওয়াজ শুনে পিয়াও চলে আসে। সব দেখে বলে,
—কি সর্বনাশ হতো বলতো দি! এসব ওই মেয়েটার কাজ। আমি একটু আগেই দেখলাম সাবানগোলা জল নিয়ে খেলছে, কোত্থেকে একটা স্ট্র জোগাড় করে বাবল বানাচ্ছে। জাস্ট ডিজগাস্টিং! তুই জানিস এখন তোর ভাইটাল সময়, আর এখন একটা উটকো মেয়েকে জোটালি!
—আমিও তাই কইছিলাম দিদি রে। ওই মাইয়াটা অলক্ষুণে। ওরে তাড়াও।
—তোরা থামবি, প্লিজ সরলা তুই রান্না ঘরে যা। পিয়া তুই ইউনিভার্সিটির জন্য তৈরি হয়ে নে!
অনিকও অফিসের জন্য তৈরি হয়ে যায়। ওকে লিস্টটা দিয়ে প্রিয়ম আব্দার করে পিউয়ের জন্য দুটো জামা কিনে আনতে হবে।
—অনি প্লিজ। মেয়েটা কাল থেকে একটা জামাই পরে আছে।
—বেশ। তোমাকে এই মুহূর্তে জোরও করতে পারিনা। বাট আমি কিন্তু কাল অবশ্যই ওই মেয়েকে নিয়ে পুলিশ স্টেশনে যাবো। আমাকে আটকাবে না।
আর শোনো, আজ পিয়াকে আমি ইউনিভার্সিটি থেকে পিক আপ করে একেবারে জিনিসপত্র নিয়ে ফিরবো। আর প্লিজ, বি কেয়ারফুল। তোমার কিন্তু ক'দিন পর ডেলিভারির ডেট।
বলেই অনিক চুমু খায় প্রিয়মের গলায়, তারপর বেরিয়ে যায় অফিসের জন্য।
সবাই বেরিয়ে যেতেই একটু ভাবতে বসে প্রিয়ম। বিশেষ করে আজকের ঘটনাটা ওকে হতবাক করে দিয়েছে। সরলা তখনো কাজ করে যাচ্ছে, ওকে দেখতেই ডাইনির কথাটা মনে পড়লো। শিক্ষিত মেয়ে প্রিয়ম, ইংলিশে এম.এ. করেছে....কোনদিন কুসংস্কারকে পাত্তা দেয়নি, আজও দেবে না।
—নাও দিদি, খেয়ে নাও।
—পিউকে ডেকে আনতো।
—না বাবা, আমি যাবো না, তুমি যাও।
—একটা বাচ্চা মেয়েকে দেখে এতো ভয় পাচ্ছিস সরলা?
—বল্লাম না, আমি পারবো না, তুমি ডেকে আনোগা।
প্রিয়ম পিউকে স্টাডিরুমেই পায়। কোত্থেকে সেই কবেকার টেডি বিয়ারটা জোগাড় করে খেলছে ও। এই টেডি বিয়ারটা পাঁচ বছর আগেরই কেনা।
পিউকে দেখলেই কেন যে তার মনটা নরম হয়ে যায়, এই মেয়ে যে তার কোন খারাপ করবে, ভাবতেই পারে না প্রিয়ম।
—পিউ, খাবে না!
একগাল হাসিতে সম্মতি জানায় পিউ।
দুজনের খাওয়া শেষ হলে, ওরা একটু ছাদে ঘুরতে যায়। ছয় তলার ওপর ছাদ। ছাদে পিউ যেন উড়ন্ত প্রজাপতির মতোন উড়ছে। খিলখিলিয়ে হাসছে।
অনেকদিন পর ছাদে এলো প্রিয়ম। আশপাশটা ভালো করে দেখে। রেলিংটা একটু নীচু, তাই একটু দূর থেকেই আশপাশটা দেখতে থাকে।
হঠাৎ একটা আচমকা ধাক্কায় বেসামাল হয়ে পড়ে প্রিয়ম। হাতের কাছে মোটা একটা থাম ছিল, সেটা ধরে কোনমতে সামলে যায় ও।
আবার হাঁপাচ্ছে প্রিয়ম। এই নিয়ে দুবার। কি হচ্ছে ওর সাথে এসব? কে করছে? এবার তো পা পিছলে পড়ে যাচ্ছিলো না, স্পষ্ট পেছন থেকে একটা ধাক্কা অনুভব করেছে প্রিয়ম।
পেছনে ঘুরে দেখে সরলা পিউকে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। পিউ দু'হাত বাড়িয়ে মা করে ডেকে যাচ্ছে।...মা...
—আমি স্পষ্ট দেখছি দিদি, ওই ধাক্কা দিছে। দেখো দেখো আবার কেমন করে তাকাচ্ছে আমি যাই গো দিদি! ওর দৃষ্টিতে আমিও নইলে শুকায়ে মরুম।
প্রিয়ম কিছুক্ষণ পর স্বাভাবিক হয়। তারপর ধীর পায়ে পিউয়ের কাছে এসে বলে,—তুমি ধাক্কা দিয়েছো আমাকে?
পিউ জোরে জোরে দুপাশে মাথা নাড়ায়।
—তবে ও যে বললো। ছাদে তো আর কেউ ছিলো না।
হঠাৎ পিউ ঠোঁট উল্টে কান্না শুরু করলো। কি আর বলবে প্রিয়ম, ওকে বুকে জড়িয়ে নেয়।
কিন্তু একটা আশঙ্কায় তখনো বুকটা কাঁপছে ওর।
স্পষ্টই কেউ ধাক্কা দিলো ওকে।
কিন্তু কেন?
ডক্টর বলেছে, এই অবস্থায় কোনরকম দুর্ঘটনা মানে বাচ্চা ও মা দুজনেই মৃত্যুর ঝুঁকি খুব বেশি।
পিউকে নিয়ে নীচে চলে আসে প্রিয়ম।
গভীর ভাবনায় ডুবে আছে প্রিয়ম, অনেকক্ষণ। পিউ পাশে বসে ছবি আঁকছে।
সরলা বাড়ি যাওয়ার আগে প্রিয়মের হাতে ওর ওষুধটা দিয়ে বলে—এতো ভেবোনি, দিদি, ওই মেয়েকে বিদায় করো। সব ঠিক হয়ে যাবে। এই নাও ওষুধ, চিন্তায় চিন্তায় সব ভুলতে বসলা তো।
সরলার হাত থেকে ওষুধ নিয়ে, সবে খেতে যাবে প্রিয়ম। এমন সময় পিউ হঠাৎ ধাক্কা দিয়ে গ্লাসটা ছুঁড়ে ফেলে দেয়। কাচের গ্লাসটা শব্দ করে ভেঙে পড়ে মেঝেতে।
এবার ধৈর্যর বাঁধ ভেঙে যায় প্রিয়মের, প্রচন্ড রেগে পিউয়ের গালে কষে চড় লাগায় ও।
—কি করছো তুমি পিউ? তুমি কি পাগল হয়ে গিয়েছো? গ্লাসটা ফেলে দিলে কেন? যাও এখুনি যাও এখান থেকে, আমি আজকেই তোমাকে পুলিশ আঙ্কেলের কাছে দিয়ে আসবো।
পিউ প্রবল অভিমানে নীরবে কাঁদতে থাকে, তারপর কড়া দৃষ্টি হানে সরলার দিকে। ওই চোখের দিকে তাকিয়ে সরলার ভেতরটা কেমন যেন শুকিয়ে যায়। হাত পা কাঁপতে থাকে।
—কি হলো, দাঁড়িয়ে আছো যে যাও! ঘরে যাও।
পিউ দৌড়ে চলে যায়।
সরলা গ্লাস পরিষ্কার করতে করতে প্রিয়মকে বলে।
—দিদি, সাবধানে থেকো। কোন ভয় লাগলে ঠাকুরের কাছে বইসে থেকো, আসি গো।
সরলা চলে যেতেই প্রিয়ম আবার চিন্তায় ডুবে যায়। সোফার ওপর বসে ভাবতে ভাবতে কখন চোখ বুজে আসে তা খেয়াল থাকে না।
ঘুম ভাঙে অনেক বেলা করে, ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে বেলা দুটো বাজে।
প্রিয়ম উঠে বসে, পিউয়ের কথা মনে পড়লো হঠাৎ! চড় মারা উচিৎ হয়নি—যতই হোক বাচ্চা মেয়ে ত! গা হাত পা ব্যথা করছে কেমন যেন।
স্টাডিরুমে গিয়ে দেখে মেয়েটা ড্রইং খাতার ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। পিউয়ের পাশে বসে ওর মাথায় হাত বোলাতে থাকে, ড্রইং খাতাটা হাতে নিয়ে ড্রইং দেখে ও। কি মিষ্টি ছবি এঁকেছে প্রিয়মের। নীচে আবার লিখেছে মা।
পিউ এর মধ্যে উঠে যায়। উঠেই কান্না কান্না মুখ করে তাকায় প্রিয়মের দিকে।
—সরি পিউ! তুমি ওরকম দুষ্টু করলে, আমিও রেগে গিয়ে, লাগেনি তো বাবু!
পিউ হঠাৎ প্রিয়মের বুকে মুখ ঘষতে থাকে।
প্রিয়মের বুকে কেমন উথালপাতাল শুরু হয়—পিউয়ের ছোঁয়াতে কি যে আছে?
যে করেই হোক ওরে ওর মা—বাবার কাছে পৌঁছে দিতে হবে।
—পিউ, এই পিউ, শোনো।
পিউ হাসিমুখে তাকায়।
—তোমার ডিটেইলসগুলো আমাকে বলো, আঙ্কেলটা পুলিশের কাছে যাবে, তোমাকে যেতে হবে না। আমি প্রশ্ন করবো তুমি এই খাতায় উত্তরগুলো লিখবে কেমন?
পিউ মাথা নীচু করে বসে থাকে।
—পিউ তোমার বাড়ি কোথায় একটুও জানো না, সিটি নেম?
পিউ লেখে, কোলকাতা।
—এরিয়ার নেম? পাড়ার নাম?
—জানি না।
—ওকে, তোমার ডেট অফ বার্থ?
—৩ নভেম্বর, ২০১৫।
—তারিখটা কেমন যেন চেনা চেনা লাগে প্রিয়মের।
—ওকে, বাড়ির ফোন নম্বর?
—জানি না।
—বাড়িতে আর কে কে আছে তোমার?
—মাসি।
—যে লোকটা তোমাকে কিডন্যাপ করতে চেয়েছিল, তাকে চিনতে পারবে?
—না।
—বেশ তুমি তোমার মতোন ছবি আঁকো পিউ কেমন? আমি লাঞ্চের ব্যবস্থা করি, আজকে আর স্নান হবে না।
ওরা দুজনে লাঞ্চ সেরে বসার ঘরে আসে।
পিউ একটা লেখার প্যাডে কি লিখে প্রিয়মকে দেখায়।
—আমি কবিতা বলবো?
মাথা ঝাঁকায় পিউ।
—বেশ কোনটা।
—মনে পড়া, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের।
—মাকে মনে পড়ে তাই না পিউ।
মাথা নীচু করে পিউ।
—বেশ আমি কবিতা বলবো, তোমাকে ইশারায় তা দেখাতে হবে। আমি ভিডিও করবো। কাল যদি তুমি চলেই যাও আর দেখা হবে না হয়তো!
মাথা ঝাঁকাই পিউ।
তারপর সঞ্চয়িতা খুলে আবৃত্তি করতে থাকে আর পিউ ইশারায় তার ভাব ব্যক্ত করে। সবটা ভিডিও হতে থাকে মোবাইলে। দুজনের হাসির কলতানে মুখরিত হয়ে ওঠে সেদিনের বিকেলটা।
সন্ধ্যা ছয়টা নাগাদ পিয়া ফিরে আসে। এসেই প্রিয়মকে খুঁজতে থাকে।
—তুই স্টাডিরুমে বসে, আমি বাড়িময় খুঁজছি তোকে।
—আরে পিউ—এর সাথে গল্প করছিলাম। তুই তো অনিকের সাথে মার্কেটে যাবি না? হঠাৎ কি হলো?
—হ্যাঁ, যাবো তো। আরে এই ড্রেস পরে মলে যাওয়া যায় নাকি। তার মধ্যে ক্লাসের ধকল। এই ফ্রেশ হয়ে চা খেয়েই বেরিয়ে যাবো। তুই চা খাবি?
—না বেলা করে ভাত খেয়েছি, আমি পরে খেয়ে নেবো। তুই খা।
কিছুক্ষণ বাদে পিয়া বেরিয়ে যায়।
ঘড়িতে সাতটা বাজে।
হঠাৎ লোডশেডিং। অন্ধকার নেমে এলো।
—জেনারেটর কাজ করছে না নাকি? দাঁড়াও পিউ আমি রান্না ঘর থেকে মোম জ্বালিয়ে আনি।
পিউ ওর হাত টেনে ধরে।
পিউ এর দৃষ্টি আবার স্থির, পাথরের মতোন। চকচক করছে। মুখে কেমন একটা হাসি।
—কি হলো পিউ, যেতে দাও!
পিউ এবার প্রিয়মের পেটে হাত রাখে।
—মা....মা....মা....
—কি হলো পিউ?
হঠাৎ প্রিময় অনুভব করে গর্ভে ওর বাচ্চা খুব দ্রুত নড়ছে। লেবার পেইন অনুভব করতে শুরু করে প্রিয়ম।
আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। বসে পড়ে বিছানায়, যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকে।
প্রিয়ম ওর পেট থেকে হাত সরিয়ে নেয়। পিউয়ের কিন্তু ব্যথা কমছে না। হাতড়ে হাতড়ে, মোবাইলের ফ্ল্যাশ লাইটটা জ্বালায় প্রিয়ম।
সামনে পিউ দাঁড়িয়ে, অস্বাভাবিক সেই দৃষ্টি নিয়ে।
হঠাৎ একটা জিনিস দেখে প্রিয়মের ঘাম ঝরতে শুরু করে।
সরলা বলেছিল, ডাইনিদের নাকি ছায়া দেখা যায় না।
পিউয়ের দিকে আবার কাঁপা কাঁপা হাতে ফ্ল্যাশলাইটটা ধরে প্রিয়ম।
না, দেয়ালে কোন ছায়া নেই পিউয়ের!
ও এবার সত্যি ভয় পেতে শুরু করেছে। মোবাইল থেকে অ্যাম্বুলেন্সে কল করে আগে। তারা আধঘন্টার মধ্যে পৌঁছে যাবে।
তারপর কল করতে থাকে অনিক আর পিয়াকে।
কিন্তু কেউ কল ধরছে না।
বাড়িতে বাবা—মাকে একটা কল করে। —তারা জানায় যে শীঘ্রই তারা নার্সিংহোমে চলে যাবে ফর্মালিটিগুলো পূরণ করতে থাকবে যাতে তাড়াতাড়ি ওর অপারেশন শুরু করা যায়।
প্রিয়ম আর সহ্য করতে পারছে না। প্রচণ্ড যন্ত্রণা আর ভ্যাপসা গরমে ওর দম বন্ধ হয়ে আসছে। এবারও কি ও বাঁচাতে পারবে না ওর বেবিকে?
—কে তুমি পিউ? কে? কেন করলে আমার সাথে এরকম?
—মা....মা...মা..
—একদম মা বলবে না আমাকে, আমি মা নই তোমার।
—মা....মা...
পিউ আবার এগিয়ে আসতে থাকে প্রিয়মের দিকে।
কিন্তু না, এবার কিছুতেই সে পিউকে নিজের গর্ভস্থ সন্তানকে ছুঁতে দেবে না।
বিছানা ছেড়ে উঠে, হাতে মোবাইল নিয়ে। দেয়াল হাতড়ে হাতড়ে প্রিয়ম এগোতে থাকে। একহাতে মাঝে মাঝে পেট চেপে ধরছে, যেন এখুনি ওয়াটার ব্রেক করবে ওর।
পিউ সেই একই কায়দায় মা বলে দুহাত বাড়িয়ে ওকে ধরতে চাইছে। ...মা...
ভয়ার্ত দৃষ্টি নিয়ে প্রিয়মও এগিয়ে চলছে বসার ঘরের দিকে।
কিছুক্ষণ বাদে বসার ঘরে এসে সোফায় বসে পড়ে প্রিয়ম। পিউ নেই। আসেনি তার সামনে। আশপাশে মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে দেখে নেয়।
হঠাৎ দরজায় আওয়াজ। অ্যাম্বুলেন্স এলো বুঝি।
প্রিয়ম দেওয়াল হাতড়ে সেদিকে এগোয়, দরজা খোলে। নার্সিংহোমের লোকেরা ওকে স্ট্রেচারে তোলে। কারেন্ট চলে আসে হঠাৎ। ওরা তাড়াতাড়ি লিফটে করে প্রিয়মকে নিয়ে ঢুকে যায়।
শেষবারের মতোন পেছনে ফিরে দেখে প্রিয়ম। একগাল হাসি দিয়ে পিউ বিদায় জানাচ্ছে প্রিয়মকে।
তারপর আস্তে আস্তে চোখ বুজে আসে প্রিয়মের।
রাত আটটা।
গাড়িতে ফিরছে অনিক আর পিয়া।
বাড়িতে ফিরে তারা অবাক।
—প্রিয়ম কোথায় পিয়া?
—আমিও তো সেটাই ভাবছি!
—হি হি হি....
—কে হাসছে পিয়া?
পিয়ার চোখ বিস্ফারিত ওর হাত পা কাঁপছে ধপ করে মেঝেয় বসে পড়ে ও।
—আরে, কি হলো?
আঙুল দিয়ে সিলিং এর দিকে ইশারা করে পিয়া।—
—হি...হি...হি...
সিলিং দিয়ে দুহাত পায়ে হামাগুড়ি দিতে দিতে এগিয়ে আসছে পিউ। সেদিকে দেখে অনিক হাঁ করে তাকিয়ে থাকে।—
রাত সোয়া আটটা।
সিজার চলছে পিয়ার।
পিয়ার বাবা—মা খুব চিন্তিত। অনিককে, পিয়াকে ফোন করছে বলছে নট রিচেবল।
রাত নটা।
পুরো ফ্ল্যাটজুড়ে এলপিজির গন্ধ মারাত্মক হারে ছড়িয়ে পড়েছে।
অন্যান্য তলার বাকি লোকজনও টের পেয়েছে কিন্তু কোথায় থেকে আসছে বুঝতে পারছে না। তারা কোন দুর্ঘটনার আশঙ্কা করে ফোন করে দমকলবাহিনীকে।
পিয়া আর অনিক প্রায় বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে রয়েছে রান্না ঘরের মেঝেতে।
অনিক প্রায় আর্তনাদ করছে।
—ছেড়ে দে মামণি। ছেড়ে দে আমাদের। ক্ষমা কর।
পিউয়ের হাতে একটা দেশলাই। সে আবার হাসছে, সেই আগের মিষ্টি হাসিটা।
—মা....মা...মা..
দেশলাইটা জ্বলে ওঠে পিউয়ের হাতে।
আর সঙ্গে প্রচণ্ড বিস্ফোরণ করে পুরো অনিকের পুরো ফ্ল্যাটে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। আগুনের মাঝখানে পিউ দাঁড়িয়ে। অনিক আর পিয়ার জ্বলন্ত দেহটার দিকে তাকিয়ে আছে সেই স্থির দৃষ্টিতে, আর মুখে একটাই বুলি—
—মা...মা...মা...
অন্যদিকে, একই সাথে প্রিয়ম জন্ম দেয় একটি মিষ্টি মেয়ের।
মা ও মেয়ে দুজনেই সুস্থ জানায় ড. গুপ্ত যিনি ছিলেন প্রিয়মের গাইকনোলোজিস্ট।
প্রিয়মের সাথে দেখা করতে যায় ওর মা—বাবা।
—ওদের ফোনে পেলে?
—না রে, পাচ্ছি না তো।
এই সময় একজন নার্স এসে প্রিয়মের বাড়ির ঠিকানা দেখিয়ে বলে,
—আপনি শিওর এটা আপনার বাড়ির ঠিকানা?
—হ্যাঁ, কেন?
—ওই অ্যাপার্টমেন্টে একটু আগেই গ্যাস ফেটে অগ্নিকান্ডের ঘটনা শোনা গিয়েছে, চারতলায়।
—কি বলেছেন এসব কি? চারতালয়ই তো আমার ফ্ল্যাট।
—পুলিশ আপনার সাথে দেখা করতে চাইছে।
প্রিয়ম কান্নায় ভেঙে পড়ে মাকে জড়িয়ে ধরে।
—নমস্কার, মিসেস প্রিয়ম পাল। খুব বাজে সময়ে বাজে একটা ঘটনার জন্য আসা আপনার কাছে.....
—কারো কিছু হয়নি তো ইন্সপেক্টর?
—আগুন নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে, শুধু আপনার ফ্ল্যাটটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর দুজনের লাশ পাওয়া গিয়েছে। বডি পুরোপুরি পুড়ে গিয়েছে একদম।
—দু দুজন। কারা কারা.....বলুন চুপ থাকবেন না।
—একজন মহিলা ও একজন পুরুষের।
—ভুল, ভুল আরেকটি বাচ্চা মেয়েরও থাকবে।....
—না মিসেস পাল। আর কোন লাশ পাওয়া যায়নি। কার কথা বলছেন আপনি?
এই সময় নার্সটি আবার এসে প্রিয়মকে বলে,
—আটটা পঁয়তাল্লিশ নাগাদ আপনার হোয়াটস অ্যাপে তিনটে ভিডিও মেসেজ পরপর ঢোকে।
পুলিশ ইন্সপেক্টরটি সেটি হাতে নিয়ে দেখতে চান, প্রিয়মও দেখে।
প্রথম ভিডিওটি অন হয়।
—আমি অনিক পাল।...
—আমি পিয়া বোস।....
আমরা দুজন মিলে পাঁচ বছর আগেও দিদিকে ও তার আগত সন্তানকে মারার চেষ্টা করি। দিদি সেদিন সিঁড়ি থেকে এমনি পড়ে যায়নি, আমি দুটো ছোট মারবেল সিঁড়ির কাছে রেখেছিলাম যাতে দিদি পড়ে যায়। কিন্তু, কিন্তু সেই যাত্রায় দিদি বেঁচে যায়, যদিও বাচ্চাটি মারা যায়।
দ্বিতীয় ভিডিওটি অন করে ইন্সপেক্টর।
কান্নার ভেঙে পড়ছে পিয়া।
—এরপর বহুদিন নানা ওষুধ আমি প্রিয়মকে খাওয়াতে থাকি যাতে ও মা না হতে পারে। কিন্তু শেষপর্যন্ত আমাদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে ও মা হয়। উপায় থাকে না। এইবার একদম শেষ মুহূর্তে মারতে চাইছিলাম যাতে ও আর ওর বাচ্চা দুজনেই মারা যায়। তাই আজ সারাদিন নানান রকমের প্ল্যান করি আমরা।
—প্রথমেই দিদি যাতে পা পিছলে পড়ে যায় তার জন্য, মেঝেতে সাবান জল ছড়িয়ে দিই আমি। কিন্তু সরলা এসে ওকে বাঁচিয়ে নেয়। কিছু পরে আমার আর অনির কথোপকথন ও শোনে আর আমাদের প্ল্যান টের পায়। তাই ওকে অনেকগুলো টাকা দিয়ে আমরা হাত করি। তারপর ও আরো দুটো অ্যাটেম্পট নেয়াই সরলাকে দিয়ে দিদিকে মারার। একবার ছাদে ধাক্কা দিয়ে। আরেকবার ওষুধ খাওয়ানোর নাম করে জলে বিষ মিশিয়ে। কিন্তু দুটোই ব্যর্থ হয়।
ইন্সপেক্টর সঙ্গে সঙ্গে প্রিয়মের কাছ থেকে সরলার বাড়ির ঠিকানা নিয়ে কন্সটেবল পাঠায়।
তৃতীয় ভিডিওটি অন করা হয়।
—শেষ অব্দি, সরলা যখন জানায় প্ল্যান ফেল। তখন আমরা শেষ চাল চালি। আমাদের আজ মলে যাওয়ার কথা ছিল। ফিরতে এমনি দেরি হতো। তাই পিয়া এর সুযোগ নিয়ে আধঘন্টার জন্য ফ্ল্যাটে যায় এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যা সব একজায়গায় করা ছিল তা নিয়ে, রান্নাঘরে গ্যাসটা অন করে চলে আসে। নীচে এসে প্রায় কুড়ি মিনিটের মতোন অপেক্ষা করে আমাদের ফ্ল্যাটের পাওয়ার বন্ধ করে দেওয়া হয়, জেনারেটর আগেই বন্ধ ছিল। আমরা জানতাম অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে মোমবাতি জ্বালাতে প্রিয়ম ঠিক রান্নাঘরে ঢুকবে আর গ্যাসটা ফেটে যাবে।
—দিদিকে অনি ভালোবাসতো না। আমি দিদির কাছে আসার পর থেকে আমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও শারীরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আমরা চাইছিলাম দিদিকে রাস্তা থেকে সরিয়ে দিতে যাতে আমরা আমাদের মতোন জীবন শুরু করতে পারি।
আমরা দোষী, দিদি পারলে আমাদের...
ভিডিওটি শেষ হয়ে যায়।
—এটা তো আপনার হাসবেন্ডের হোয়াটসঅ্যাপ থেকেই পাঠানো হয়েছে কিন্তু ভিডিওটি করলো কে?
—পিউ, একটি বাচ্চা মেয়ে। আপনি খুঁজুন ওকে একটু। ওই ফ্ল্যাটেই....
—ওখানে দুটো লাশ ছাড়া আর কোন লাশ নেই। আচ্ছা, আর কেউ কি দেখেছে ওকে?
—সরলা আমার বাড়িতে কাজ করতো।...
এর মধ্যে কনস্টেবল এসে হাজির হয়। তারা জানায়, সরলা আজ দুপুরেই বাড়ি ফেরার পথে ট্রাক চাপা পড়ে মারা গিয়েছে। কললিস্ট জানাচ্ছে, শেষ কলটি সে করেছিল এই অনিককেই।
প্রিয়ম ভাবনায় ডুবে যায়। এতো দিন বিশ্বাসঘাতক আর প্রতারকদের মাঝে বেঁচে ছিলো সে ভাবতেও দম বন্ধ লাগছে! কোন দুঃখ নেই তার, কোন দুঃখ নেই।
শুধু পিউ মেয়েটা, যে তাকে বাঁচালো এতোভাবে...
সে তাড়াতাড়ি ইন্সপেক্টরের হাত থেকে মোবাইল নিয়ে দুপুরের আবৃত্তির ভিডিওটা অন করে।
সরলা বলেছিলো, ডাইনিদের ছায়া পড়ে না।
ভিডিওতে কেউ নেই, ফাঁকা বসার ঘরটা খাঁ খাঁ করছে।
—কি হলো মিসেস পাল!
—মিসেস পাল, নয় প্রিয়ম বলুন। আপনি এখন আসুন, সবকিছু তো পরিষ্কারই হয়ে গেল। ওই নোংরা মানুষগুলোর ব্যাপারে আমার আপাতত কিছু বলার নেই।
ইন্সপেক্টর চলে যায়।
এর মধ্যে সেই নার্স এসে প্রিয়মের কোলে তার মেয়েকে দিয়ে যায়। কি সুন্দর দেখতে হয়েছে মেয়েটিকে।
ড. গুপ্ত এসে হাজির।
প্রিয়ম জিজ্ঞাসা করে—
—ডক্টর, পাঁচ বছর আগে আমার ডেলিভারির ডেট মনে আছে?
—আমার ব্রেন খুব শার্প তাই রক্ষা প্রিয়ম। ৩ নভেম্বর, ২০১৫।
চমকে ওঠে প্রিয়ম।
যা ভেবেছিল তাই, এটাই ছিলো পিউয়ের জন্মদিন।
দিদির কর্তব্য পালন করেছে পিউ, তার বোনের জন্য?
নিজের কোলের সন্তানের দিকে ভালো করে চেয়ে দেখে প্রিয়ম।
সেই একই হাসি, গভীর টোল গালে, মাথায় কোঁকড়া চুল। শুধু দৃষ্টিটা প্রাণোচ্ছ্বল।
চোখ বুজে বুকে জড়িয়ে নেয় নবজাতককে।
প্রিয়মের কানে কিন্তু বেজে চলেছে পিউয়ের সেই ডাক....
''মা...মা...মা...''
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন