রুক্মিণী

কৌশিক কারক, আকাশ চন্দ, উৎস ভট্টাচার্য

উফফ! আবার সেই শব্দটা শোনা যাচ্ছে। খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে আবার পাকদন্ডী বেয়ে নামতে শুরু করল ইমন।

বেশ কয়েকদিন ধরে এই এক ঝামেলা হয়েছে। একা একা ছোট ছোট পায়ে চলা পাহাড়ি রাস্তায় হাঁটতে গেলেই খালি কোনও একজনের উপস্থিতি টের পায় ইমন। অথচ, কাউকেই চোখে দেখা যায় না। ও থেমে গেলে সেই শব্দও থেমে যায়।

মাঝে মাঝে মনে হয় কোনও বন্যজন্তু নয়তো! আবার নিজেই মনকে বোঝায় যে, বন্যজন্তু হলে নিশ্চয়ই ও থামলেই থেমে যেত না? তবে কি অতিপ্রাকৃতিক কিছু? স্থানীয় লোকজনের সাথে কথা বলে সেই সম্ভাবনাও মোটামুটি নস্যাৎ হয়ে গেছে।

কালিম্পং—এর কাছে এই পাহাড়ি অঞ্চলে সরকারি একটা স্বাস্থ্যপ্রকল্পের জন্য ইমনকে ছয় মাসের জন্য বদলি করা হয়েছে। প্রথমেই বাবা—মা যথেষ্ট আপত্তি করা সত্ত্বেও শুধুমাত্রই মনের পাহাড়ের প্রতি অমোঘটান আর সরকারি চাকরির মায়ার জোরে এখানে চলে আসতে পেরেছে। অবশ্য, বাবা—মায়ের আপত্তির উপযুক্ত কারণও ছিল। অবিবাহিত, পঁচিশ বছরের মেয়ে একা একা পান্ডববর্জিত জায়গায় থাকতে এলে বাবা—মা ভয় পেলে তাঁদের দোষ দেওয়াও যায় না।

এসে থেকে বেশ ভালোই ছিল ইমনের। ও এখানে একটা নেপালী পরিবারের সাথে তাদের বাড়িতেই থাকে। প্রথমদিন বাবা সাথে এসে এই ব্যবস্থা করে দিয়ে গেছেন। রান্নায় বেশি ঝালের জন্য প্রথম প্রথম অসুবিধা হলেও এখন বেশ সয়ে গেছে।

ওর সঙ্গে স্থানীয় বেশ কিছু ছেলেমেয়ে এই প্রকল্পে কাজ করছে। সকাল সকাল তাদের সাথে পাহাড়ি বস্তিতে গিয়ে গিয়ে তথ্যসংগ্রহ করে দুপুরবেলা বাড়ি ফিরেই খেয়েদেয়ে হাঁটতে বেরোয় ইমন। পাহাড়ি পথে হাঁটতে হাঁটতে রাস্তা হারিয়ে আবার পথ চিনে ঘরে ফেরাটা এখন নেশার মতো হয়ে গেছে। যখন ঝুপ করে পাহাড়ের বুকে অন্ধকার নেমে আসে আর অজস্র পাখির কলতানের সঙ্গে সঙ্গে দূরের পাহাড়গুলোর গায়ে ফুটকি ফুটকি আলো জ্বলতে শুরু করে তখন বুকের ভেতর একটা শিরশিরে আনন্দের অনুভূতি নিয়ে ইমনও ঘরে ফেরে। অদ্ভুত এক শান্তি আছে এই সহজ সরল গ্রাম্য পাহাড়ি জীবনে।

হঠাৎ, ''নমস্তে বইনি'' শুনে ভাবনার স্রোতে ব্যাঘাত ঘটতে চমকে তাকিয়ে দেখল....হাসিমুখে এখানকার রেশন দোকানের মালকিন হেমা প্রধান সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। চিন্তা করতে করতে কখন যে চেনা পথ বেয়ে গঞ্জে এসে গেছে বুঝতেই পারেনি ইমন। একটু অপ্রস্তুত হয়ে হেমার দিকে হালকা হাসি ছুঁড়ে দিয়ে বাড়ির পথ ধরল।

আজ আবার সেই শুকনো পাতার ওপর পায়ের খচমচে আওয়াজ শুনে থেকে মনের ভেতরটা কিরকম একটা করছে। এই নিয়ে দিনসাতেক এই একই ঘটনা ঘটছে। আজ এটা নিয়ে রুক্মিণীর সাথে একবার কথা বলতে হবে।

রুক্মিণী একজন বিহারী মেয়ে, লোয়ার কালিম্পং বাজারে ওদের নেপালী পোশাকের দোকান আছে। ওর পুরো পরিবার এই ব্যবসার সাথে যুক্ত। ইমন যে বাড়িতে থাকে.....তার পাশের গলিতেই ওদের বাড়ি। এখানে আসার পরে পরেই একদিন পাহাড় ঘুরে ফেরার সময়ে ফাঁকা রাস্তায় ওর সাথে আশ্চর্যভাবে ইমনের আলাপ হয়। পাহাড় থেকে নামতে একটু দেরি হয়ে গেছিল বলে ইমন অন্ধকারে রাস্তা চিনতে পারছিল না, ভুল করে অন্য একটা পায়ে চলা পথে চলে যাচ্ছিল। একটু রাস্তা ভুল পথে গিয়েই বুঝতে পারে যে রাস্তাটা অন্যরকম লাগছে। যখন ভয়ে অন্ধকারে হাত—পা ঘামতে শুরু করে দিয়েছে; ঠিক তখনই একটা ঠান্ডা হাত ওর হাতটা ধরে টানতে থাকে। ভয়ে তখন ইমনের গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোচ্ছিল না, অবশ্য চিৎকার করলেও এই জঙ্গলে শোনার লোকই বা কোথায়? হঠাৎ, সেই ঠান্ডা হাতের মালকিনের রিনরিনে মিষ্টি গলার স্বরে, ''ম্যায় রুক্মিণী হুঁ, আপ মেরি সাথ আইয়ে।'' শুনে নিশ্চিন্ত হয়। তারপর রুক্মিণী ওর থেকে ওর বাড়ির মালিকের নাম জেনে ওকে পৌঁছে দিয়ে যায়। অবশ্য অনেক অনুরোধেও রুক্মিণী সেদিন ওর ঘরে ঢোকেনি। আর ওকে বারবার করে বলে দিয়েছিল যে, ও যেন এই বাড়ির কাউকে রুক্মিণীর সাথে আলাপের কথা না বলে। রুক্মিণীর পরিবারের সাথের এদের কি সব ব্যবসায়িক শত্রুতা আছে, সেই জন্য নাকি এরা ইমনকে ওর সাথে মিশতে বাধা দেবে।

যাওয়ার আগে ও ইমনকে নিশ্চিন্ত করে গেছিল যে, ও মাঝে মাঝেই আসবে বা দেখা করবে। সেই থেকে সন্ধ্যেবেলার দিকে প্রায়ই রুক্মিণী ইমনের কাছে চলে আসে। ওর ঘটা বাড়ির বাইরের দিকে হওয়ার জন্য আর পাহাড়ি অঞ্চলের লোকজন সন্ধেবেলায় প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে না বেরানোর জন্য এখনও পর্যন্ত কেউ ইমন আর রুক্মিণীর বন্ধুত্বের কথা জানতেও পারেনি। বিগত তিন মাসে ইমনের রুক্মিণীর ওপর একটা ভরসার জায়গা তৈরি হয়ে গেছে। বয়সে ইমনের থেকে বছর দুয়েকের বড় হলেও বা সেরকম শিক্ষিত না হলেও ওর বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনার আর সাধারণ জ্ঞান আছে। ওর মুখে বিভিন্ন গল্প শুনতে, যেমন—ওর পরিবার দুপুরুষ আগে কিভাবে এখানে এসে স্থানীয় মেয়েকে বিয়ে করে সংসার পাতলো, ব্যবসা শুরু করলো থেকে স্থানীয় মানুষদের জীবনযাত্রার গল্প সবই ভালো লাগে। আর রুক্মিণীর অপূর্ব সুরেলা গলায় গান শুনতেও দারুণ লাগে।

ঘরে ফিরে আগেই বাড়িওয়ালির কাছে গিয়ে ওর জন্য বরাদ্দ চা আর নুডলস খেয়ে হটপটে করে রাতের খাবার...রুটি আর চিকেন কষা নিয়ে ঘরে এল।

জামা—কাপড় বদলে রুক্মিণীর জন্য অপেক্ষা করতে করতে হাতে পায়ে বেশ করে ক্রীম—ঘষতে ঘষতে ভাবতে লাগল যে, এই মেয়েটার আসার কোনও নির্দিষ্ট সময় নেই। আদৌ আসবে কিনা তারও ঠিক নেই, তার ওপর আজ আবার ঠান্ডাটাও জাঁকিয়ে বসেছে।

দরজায় ঠিক তিনবার 'ঠকা! ঠক!! ঠক!!!' আওয়াজ শুনে রুক্মিণীর আগমন সম্বন্ধে নিশ্চিন্ত হয়ে দরজা খুলল ইমন।

আপাদমস্তক কালো চাদরে শরীর ঢেকে রুক্মিণী চট করে ঘরের মধ্যে ঢুকে এল।

আজ যেন রুক্মিণীর মুখটা বেশ গম্ভীর লাগছে, ফর্সা গালগুলো বেশি রকমের লাল লাগছে। ইমন ওকে ঘরে ঢুকিয়েই দরজা বন্ধ করে ওর বিগত কয়েকদিনের অভিজ্ঞতার কথা বলল। রুক্মিণীর মুখটা একটু চিন্তিত দেখাচ্ছিল। ও বারবার করে ইমনকে শিবমন্দিরের দিকটাতে যেতে নিষেধ করে একটু তাড়াতাড়িই চলে গেল।

সে ও যাই বলুক, ইমন শিবমন্দিরের দিকটাতেই যাবে। এখন নভেম্বরের শেষের ঠান্ডায় সাপের ভয়ও নেই। আর ওদিকটাতে অনেক রকমের পাখিরও দেখা মেলে। আর যেদিকটাতে রুক্মিণীর সাথে ইমনের প্রথম দেখা হয়েছিল সেদিকে বিশেষ গাছপালা নেই। সেদিকে পাখিও বিশেষ দেখা যায় না, তাই ইমন এখন পরিত্যক্ত শিবমন্দিরটার দিকেই রোজ যায়। ওর জনমানবহীন জায়গা আজকাল বেশিই ভালো লাগে।

পরের দিন কিসের একটা আকর্ষণে যেন ইমন শিবমন্দির ছাড়িয়ে আরও ওপরের দিকে উঠতে শুরু করল। এদিকটায় যে মানুষজন বিশেষ আসে না তা গাছপালার ঘনত্ব দেখেই দিব্যি বোঝা যাচ্ছে। একটু ওঠার পরেই আবার জঙ্গলের মধ্যে পাতার ওপরে অন্য পায়ের শব্দ শুনে ইমন সজাগ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। আজকে ও হাতে করে একটা টর্চ নিয়ে এসেছে। আওয়াজটা লক্ষ্য করে ঝট করে টর্চটা জ্বালিয়েই দেখল, ওর পাশে জঙ্গলে একটা নীল ডেনিম আর স্নিকার্স পরা কোনও একজন পুরুষ মানুষের পা দেখা যাচ্ছে। টর্চটা সেই লোকটার মুখের ওপর ফেলতেই সে হাত দিয়ে চোখটা আড়াল করে ফেলল।

''বেরিয়ে আসুন''। আগন্তুকের উদ্দেশ্যে কথাগুলো ছুঁড়ে দিয়েই ইমন টর্চটা বন্ধ করে অপেক্ষা করতে লাগল। মিনিট দুয়েক পরেই প্রায় ছয়ফুট লম্বা, অত্যন্ত সুদর্শন এক যুবক বেশ লজ্জিত মুখে গাছের আড়াল থেকে বাইরে বেরিয়ে এল। ঘড়িতে বিকেল চারটে বাজে তাই এখনও অল্পস্বল্প আলো রয়েছে। সেই আলোয় দেখে যুবকটিকে স্থানীয় বলে মনে হচ্ছে না।

যুবক বেরিয়েই অপ্রস্তুত মুখ করে নিজের পরিচয় দিল, ''আমি গৌতম সান্যাল, পক্ষী বিশারদ।''

''কিন্তু, আমি তো পাখি নই, তাহলে ক'দিন ধরে আমাকে অনুসরণ করছেন কেন বলুন তো?'' বেশ রাগত স্বরে বলে উঠল ইমন।

এবারে 'হাহা' করে হেসে উঠে গৌতম বলল, ''আপনাকে না জানিয়ে অনুসরণ করার জন্য দুঃখিত....ইয়ে....আপনার নামটা জানতে পারি?''

''ইমন....ইমন দত্ত।''

গৌতম বলে ওঠে,

''আচ্ছা ধন্যবাদ। আসলে কাছেই যে নামকরা ট্যুরিস্ট প্লেস আছে সেখানে আমার একটা রিসোর্ট আছে। সময় পেলেই আমি আশেপাশের পাহাড়ে পাখি খুঁজতে বেরিয়ে পড়ি। গত সপ্তাহে হঠাৎই আপনাকে দেখে অবাক হয়ে যাই। আপনার উদ্দেশ্য বোঝার জন্য অনুসরণ করতে শুরু করি। সরি এগেইন টু ডিস্টার্ব ইউ।''

ছেলেটার করুণ মুখচোখ দেখে ইমনের মজা লাগে। ও হেসে ফেলে বলে, ''আচ্ছা, আচ্ছা। আমি ছয় মাসের জন্য একটা সরকারি কাজে এখানে এসেছি। তারমধ্যে প্রায় আর্দ্ধেক সময় কাটিয়েও ফেলেছি। আর আমিও পাখি দেখতে ভালোবাসি।''

''অন্ধকার হয়ে যাবে, নামা যাক।''

গৌতমের কথায় ইমন ওর সাথেই কথা বলতে বলতে নামতে থাকে। লোকালয়ের আগেই একটা গাছের আড়াল থেকে নিজের মোটর সাইকেল বের করে ওকে হাত নেড়ে বিদায় জানিয়ে গৌতম চলে যায়।''

একটা পুরুষালি গন্ধ ইমনকে ঘিরে থাকে। কিরকম একটা সুখানুভূতি হচ্ছে ওর সাথে কথা বলার পর থেকেই, একেই কি প্রেম বলে? ধ্যুস, একদিন কাউকে দেখলেই কি আর প্রেম হয়? অবশ্য যদি তা না হয় তবে কেন বারবার ওর কথা মনে হচ্ছে? আগে তো কারোর প্রতি এরকম অনুভূতি হয়নি?

আজ ইমন বেশ উৎসাহ নিয়ে রুক্মিণীকে গৌতম সান্যালের সাথে দেখা হওয়ার কথা বলল। শুনেই ওর চোখমুখ যেন অল্পের জন্য হিংস্র হয়ে উঠল, প্রচন্ড গম্ভীর হয়ে স্বভাববিরুদ্ধ রাগতঃস্বরে ও বলে উঠল, ''মন্দিরের দিকে গেছিলে কেন? তোমাকে বারণ করেছিলাম তো?''

এবারে ইমনের প্রচন্ড রাগ হয়ে গেল। ওকে একদিন রাস্তা দেখিয়ে রুক্মিণী কি নিজেকে ওর মালকিন মনে করছে? স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে ও গৌতমের সাথে ইমনের আলাপের কথা শুনে হিংসায় জ্বলে যাচ্ছে। আর ও যে গৌতমকে বেশ ভালো করেই চেনে সেটাও বোঝা গেল। না হলে তো গৌতমের সম্বন্ধে জানার জন্য উৎসাহ দেখাত!

ইমন বেশ ঝাঁঝালো স্বরে বলে উঠল, ''তুমি চলে যাও রুক্মিণী, আর আমার কাছে আসার প্রয়োজন নেই।''

রুক্মিণী ইমনের মুখে এরকম কর্কশ বাক্য শুনে হতচকিত হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল। তারপর মাথা নিচু করে ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে গেল।

এরকম বাজে ব্যবহার করে নিজের খারাপ লাগলেও ইমন নিজেকে সামলে নিল। ওরএখন শুধু গৌতমের কথাই মনে হচ্ছে।

এর পরের কিছুদিন ঘনঘন গৌতমের সাথে দেখা হতে থাকল। দিনগুলো যেন রামধনুর মতো রঙিন হয়ে উঠল। এক রবিবারে গৌতমের সাথে সকালবেলা ওদের রিসোর্ট দেখতে যাওয়ার ঠিক হল। ইমনের মনে মনে ইচ্ছা, ওদের রিসোর্টটা পছন্দ হলে এর মধ্যে একবার বাবা—মাকে এসে থেকে যেতে বলবে। অন্যরকমের কিছু স্বপ্নও মনের মধ্যে উঁকিঝুঁকি মারছে। এখন ইমনের নিজেকে বেশ ফুরফুরে লাগে। মাঝে সাঝে রুক্মিণীর কথা মনে পড়লেই ওর সেই হিংসুটে মুখটা মনে করেই ওকে ভুলে থাকতে পারে। তাছাড়া গৌতমের কথা মনে করলে আর কারোর কথা মনেই পড়ে না!

নির্দিষ্ট রবিবার ভোরবেলা পাঁচটার মধ্যে সেজেগুজে প্রজাপতির মতো ঝলমলে হয়ে গৌতমের মোটর সাইকেলে উঠে বসল ইমন। ইচ্ছে করেই ভালো করে গৌতমকে জড়িয়ে ধরে বসল। আজ পুরুষালিগন্ধটা আরও বেশি করে পাচ্ছে ইমন, ওর খুব ভালো লাগছে। ভালোলাগার আবেশে চোখটা বুঁজে এসেছে প্রায়, এমন সময়ে আচমকা ব্রেক কষার জন্য চমকে চোখ খুলেই দেখল, সামনে রাস্তার ওপর আলুথালুবেশে রুক্মিণী রাস্তা আটকে দাঁড়িয়ে আছে, ওর চোখগুলো জ্বলছে। একবার ব্রেক কষে দাঁড়িয়েই গৌতম ওকে এড়িয়ে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যেতে চেষ্টা করল....পাশেই গভীর খাদ দেখে ভয় পেয়ে ইমন চোখটা বন্ধ করে ফেলল। মাথায় প্রচন্ড জোরে আঘাত লাগার পরে আর কিছু মনে নেই।

সারা শরীরে অসম্ভব যন্ত্রণা নিয়ে চোখ খুলে দেখল, শরীরে নল লাগিয়ে ও কোনও একটা হাসপাতালে শুয়ে আছে। চোখ খুলতেই সামনে নার্সের পোশাকে একটা মেয়েকে দেখল দরজা খুলে বাইরে যেতে। ওঠার চেষ্টা করতে গিয়ে দেখল উঠতে পারছে না। এমন সময় সেই মেয়েটার সাথে বাবা—মাকে হন্তদন্ত হয়ে ঢুকতে দেখল, সাথে একজন পুলিশের পোশাকপরা ভদ্রলোকও আছেন।

ইমন কোনোরকমে গৌতমের নামটা বলতেই পুলিশ ভদ্রলোক বললেন, ''একজন অজ্ঞাত পরিচয় মহিলার ফোন পেয়ে স্পটে পৌঁছে আমরা আপনাকে অজ্ঞান অবস্থায়, খাদের পাশেই একটা গাছের ডালে পোশাক আটকে ঝুলতে দেখি। গৌতম সান্যাল তার বাইক সমেত খাদের মধ্যে মৃত অবস্থায় পড়েছিল। 'রুক্মিণী সিং' নামের এক মহিলাকে শারীরিক অত্যাচার করে, খুন করে, পাহাড়ের ওপর শিবমন্দিরের সামনের খাদে ফেলে যাওয়ার জন্য গৌতম সান্যালকে একবার গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। ওনার বাবা প্রভাবশালী হওয়ায় ওনাকে ছেড়ে দিতে আমরা বাধ্য হই। অথচ দেখুন, ওপরওয়ালা ঠিক শাস্তি দিয়ে দিল। না হলে আপনার পরিণতি যে কী হত তা সহজেই অনুমেয়।''

''আমাকে একবার রুক্মিণীর ছবি দেখাতে পারেন অফিসার?'' ক্লান্ত স্বরে বলল ইমন।

''এই যে, দেখুন।''

বলে পুলিশ অফিসার তাঁর ফোন থেকে বের করে রুক্মিণীর ছবি দেখালেন।

অতি পরিচিত হাসিমুখের রুক্মিণী যেন ছবির মধ্যে থেকেই ইমনের দিকে তাকিয়ে কৌতুকের হাসি হাসছে। ইমন চোখ বন্ধ করে ফেলল, চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় নোনতা জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। আসল বন্ধুকেই ও চিনতে পারেনি!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%