অষ্টাদশ অধ্যায়

ধ্রুব মুখোপাধ্যায়

ডেরায় রাখা গোলাপি ল্যাপচা গাছের গুঁড়িগুলোকে কাটতে বসেছে কাটু। এই কাঠ বেশ হালকা। টেকসইও। ধনুকের সঙ্গে সঙ্গে তিরও তৈরি হয় দারুণ। কে জানে, কখন যুদ্ধে নামতে হবে। সেই জন্যই বেশ মোটা করে কাটছিল গাছের গুঁড়ি। এ বারের তির আর পশুপাখি শিকারের জন্য নয়। যুদ্ধের জন্য। মোটামুটি আড়াই হাত লম্বা কাটা কাঠিগুলোকে মসৃণ করছিল টাটা। সেই সঙ্গে দু'পাটি দাঁতের মাঝে রেখে রেখে সোজা করছিল তিরের কাঠিগুলোকে। এক পাশে শুকনো ডাল-পাতা দিয়ে জ্বালানো হয়েছে আগুন। সেই আগুনটার আঁচেই সোজা করা তির কাঠিগুলোকে আলতো করে পোড়াচ্ছিল রামায়েচা। পুড়িয়ে শক্ত করছিল কাঠিগুলোকে। আর সব শেষে কাঠির মাথায় বেঁধে দিচ্ছিল বেশ সুচালো করে কাটা বাঁশ, ভাঙা তীক্ষ্ণ খাঁজওয়ালা পশুর হাড়।

খুব জোরে হাওয়া দিচ্ছিল। ঝড় যেন। জঙ্গলের ঝড় মারাত্মক। ঝড় এলেই গাছদের ঝগড়া লেগে যায়। একে অপরের গায়ে পড়ে ঝগড়া করে। সেই আওয়াজ মারাত্মক। তার পর এখন আবার শুষ্ক আবহাওয়া। বিগত কয়েক দিনে সারা রাত ধরে তির বানিয়েছে ওরা। কাটু জানে জোনাটাস ওদের শেষ করে দিতে চায়। জঙ্গলে রাজত্ব করতে চায়। এক এক করে সব গাছ কেটে শুধু কাজের গাছ লাগাতে চায় জোনাটাস। ‘কাজের গাছ' কথাটাতে বেশ হাসি পায় ওর। ভাবে এরা এত সভ্য হয়েও গাছ চেনে না। দুনিয়ায় অকাজের গাছ কি কিছু আছে?

তার পরেই ওর চোখে ভেসে ওঠে আরেন্ডুকারেন্ডাতে দেখে আসা শেষ চাকতিটা । জঙ্গলটা শেষ হয়ে গিয়েছে। সেখানে শুধুই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে অট্টালিকা। ভিতরটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে ওর। ছ্যাঁৎ করে উঠলেই জঙ্গলের উত্তর-পূর্ব দিকে তাকিয়ে প্রার্থনা জানায়। সমুদ্রপারের মরুভূমি সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম কণা দিয়ে পরিপুষ্ট করে তুলেছে এই জঙ্গল। এ বার সেই জঙ্গলকে বাঁচানোর পালা।

“হে আরাধ্য নুম্মো, সাহায্য করো। গাছটাকে খুঁজে দাও,” মনে মনে এই প্রার্থনাই করছিল কাটু। আর ঠিক তখনই “আগুন...আগুন,” বলে কারা যেন আর্তনাদ করে উঠল। ডেরার চার পাশে ঝুপড়ি। ঝুপড়ির বাইরে কাঁটা গাছের ঘের। সেই কাঁটা গাছের বেড়ার কিছুটা পর থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছে ঘন জঙ্গল। তবে ডেরার মাঝের চার পাশ খোলা ছাউনির নীচে বসে তির বানাচ্ছিল ওরা। আগুনের হলকা দেখতে না পেলেও তার লালচে আভায় চার পাশ আলোকিত। কিন্তু কোন দিকে আগুন?

জঙ্গলে আগুন লাগে গাছেদের ঘষাঘষিতে। সেই আগুন এক জায়গা থেকে ছড়িয়ে পড়ে চার পাশে। কিন্তু এই আগুন যেন ডেরার চার পাশ থেকে ধেয়ে আসছে ডেরার দিকে। আঁতকে উঠল কাটু। দলে ওরা তাও প্রায় তিনশো লোক। তার মধ্যে বাচ্চা, বয়স্ক, মহিলাও আছে। রামায়েচা নদী থেকে জল আনতে ছুটছিল। ওকে আটকাল কাটু। নদী অনেকটাই দূরে। জল এনে আগুন নেভানো আর জোনাটাসের জঙ্গলে গাছ লাগানোর প্রচেষ্টা একই ব্যাপার।

“বাঁচাতে হবে। সকলকে বাঁচাতে হবে। তোর দায়িত্ব সকলকে বাঁচানো,” চিৎকার করে কাটু বলতেই একটা তাকওয়ারা নিয়ে ঝুপড়িগুলোর দিকে দৌড় দিল রামেয়েচা। ডেরার চার পাশের আগুনের আভাটা আগুনের হলকা হতে সময় নিল না। খুব জোরে হাওয়া দিচ্ছিল। আগুনের হলকা বুনো মোষের মতো তেড়ে আসছিল ডেরার ঝুপড়িতে। আছড়ে পড়ছিল জ্বলন্ত গাছ। শুকনো ডালের কাঠামোর উপরে শুকনো গাছের পাতা। আগুন ধরতে দেরি হচ্ছে না। জঙ্গলের আগুন লাগতে অনেক বার দেখলেও এ রকম দৃশ্য জীবনে দ্যাখেনি ওরা। কেউ যেন ইচ্ছে করে আগুন লাগিয়েছে। টাটা, রামায়েচা, কাটু, কেরেচা, ওময়োকাভা দৌড়ে যাচ্ছে ডেরার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। কিন্তু ঝুপড়ি থেকে বেরিয়ে আসা মানুষগুলোকে পাঠাবে কোথায়?

বাইরে তখন আগুনের পাঁচিল। শিখাটা আকাশছোঁয়া। কাটু বেরিয়ে এল। সারা শরীর জ্বলে গেলেও ঝাঁপ মেরে পার করল সেই আগুনের পাঁচিল। আগুন শুধু ডেরার দিকেই নয়। ছড়াচ্ছে জঙ্গলেও। তাকওয়ারা দিয়ে বাড়ি মেরে মেরে নীচে জ্বলতে থাকা শুকনো পাতা নিভিয়ে একটা রাস্তা করল। এই দিক দিয়েই বেরিয়ে আসবে আগুনে ঘেরা ডেরার মানুষ। জোরে একটা চিৎকার করল, যাতে টাটা, রামায়েচা, কাটু, কেরেচা, ওময়োকাভারা শুনতে পায়। কিন্তু শুনতে পেল কি না, কে জানে! ওই রাস্তা দিয়েই ডেরাতে ঢুকতে যাচ্ছিল ও। আর তখনই পিছন থেকে কে যেন ডাকল। হিংস্র সেই আওয়াজ।

পিছনে তাকাল ও। বন্দুক উঁচিয়ে জোনাটাস। পাশে বন্দুক-হাতে ড্যানিয়েলও। আর ওদের পিছনে বেশ কয়েক জন পিস্তলেরাস গুন্ডা। সাইলেন্সার-লাগানো বন্দুক থেকে গুলি ছুড়তে দেরি করল না জোনাটাস। শরীরটা যেন এলিয়ে পড়ছিল মাটিতে। কিন্তু কার্টু দলপতি। দলের বিপদে শরীর এলানো মানায় না। এগিয়ে যাচ্ছিল জোনাটাসের দিকে। ভেবেছিল, ওর বন্দুকটা কেড়ে নেবে।

জোনাটাস সে সুযোগ ওকে দেয়নি। সভ্য সমাজে নিরপরাধ অসহায়কে মারা সহজ। গুলিতে ঝাঁঝরা করে দিল কার্টুর শরীর। তার পর মুখের সামনে এসে বলল “কেমন লাগছে?”

রাগে ক্ষোভে ভিতরটা জ্বলে যাচ্ছিল কাটুর। পুড়ে যাওয়া শরীরের জ্বালার থেকে ভিতরের জ্বালাটা যেন বেশি। ওঠার চেষ্টা করেও পারল না। জোনাটাসের অভিসন্ধি বুঝে গিয়েছিল। আগুনটা ওই লাগিয়েছে। আগুন থেকে কেউ বেরিয়ে এলেই মারবে। কাউকে বাঁচতে দেবে না। কিন্তু দলটাকে বাঁচাতেই হবে।

নোরাইরোহারাকে বাঁচাতে হবে। অসহায় কাটু আর জোনাটাসের দিকে এগোল না। এগোল ওর তৈরি করা রাস্তাটায়।

যতটা পারা যায়, শুকনো জ্বলন্ত পাতা, কাঠ আবারও বিছিয়ে দিল সেই রাস্তায়। রাস্তাটা যেন মৃত্যুর। সেই রাস্তায় যেন কেউ না আসে। আবারও চার পাশে আগুন। সেই আগুনের মাঝেই চোখের সামনে ভেসে উঠল নোরাইরোহারা। ও আর ছোট নেই। ওর হাতে ধনুক আর পিঠে বিষমাখানো তির। ওর পায়ের নীচে শুয়ে রয়েছে জোনাটাস।

হাসতে হাসতে নোরাইরোহারা বলছে, “বাবা, দ্যাখো আমি পেরেছি। জঙ্গলটাকে আমি শেষ হতে দিইনি।”

পুড়ে যাওয়া শরীরে চোখের জল বোঝা যায়? কে জানে! তবে কাটু বুঝতে পারল। এক ফোটা জল গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। ঠোঁটের কোণে হাসিটা নিজে থেকেই উপচে পড়ল। সেই সঙ্গে শরীর থেকে উপচে পড়ল ওর প্রাণবায়ু। শেষ নিঃশ্বাস। ডেরা থেকে ওরা আর কেউ বেরোতে পারেনি। সকলেই প্রায় শেষ। যদিও ও একেবারে শেষ করতে পারেনি জোনাটাস। আগুন যেমন ডেরার দিকে ধেয়ে গিয়েছিল, সে ভাবেই ধেয়ে গিয়েছিল উল্টো দিকেও। নোরাইরোহারাদের ডেরাটার সঙ্গে ওর দূরত্ব বেড়ে গিয়েছিল অনেকটা। আর অপেক্ষা করেনি।

তবে অপেক্ষা করেছিল নোরাইরোহারারা। আগুন নেভার অপেক্ষা। বৃষ্টির অপেক্ষা। যদিও বৃষ্টি পড়েনি সে দিন। ডেরার মাঝখানটা শুকনো। সেখানে আগুনের হলকা এলেও আগুন ধরেনি কিছুতে। পশুর চামড়ার চাদর মুড়ে ওখানেই অপেক্ষা করেছিল। কয়েক জন বেঁচে গিয়েছিল। ঝুপড়ি থেকে উদ্ধার করতে গিয়ে ঝলসে গিয়েছিল রামায়েচা। ওদের হাজার হাজার বছরের ডেরাটা অভিশপ্ত হয়ে গিয়েছিল কয়েক মুহূর্তে। ওরা আর ওখানে থাকেনি। ছেড়ে চলে এসেছিল। কিন্তু কাটুকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। এমনকি ওর দেহটাও না। পাওয়া গিয়েছিল শুধু ওর গলায় সর্ব ক্ষণের জন্য ঝুলে থাকা পিরানহা মাছের দাঁতগুলোকে। সেই সঙ্গে কিছুটা দূরে খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল কতগুলো ধাতুখণ্ড। কার্তুজের বুঝতে অসুবিধে হয়নি নোরাইরোহারার। তবে কাউকে কিছু বলেনি। দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করেছিল যন্ত্রণাটা। অপেক্ষা করেছিল সুযোগের। কিন্তু সে বারে আর সুযোগ পাওয়া যায়নি।

—“জঙ্গলে আগুন লাগে প্রকৃতির নিয়মে,” এ সব বলেই কোম্পানির সুযোগ্য কর্মচারী হয়ে আগুন নিভলে সেই জায়গায় গাছ লাগিয়েছিল জোনাটাস। কাজের গাছ! সেই সঙ্গে কোম্পানি থেকে পুরস্কার হিসেবে পেয়েছিল অনেক টাকা। ফিরে গিয়েছিল নিজের স্বাচ্ছন্দ্যের শহুরে সভ্যতায়।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%