ধ্রুব মুখোপাধ্যায়
শিকারের বারো জনের মধ্যে এখন ওরা এগারো জন। নোরাইরোহারা এখন আরেন্ডুকারেন্ডার রাস্তায়। টাটার মন সায় না দিলেও দলের নিয়ম মানতে হয়েছে।
তবে আজ ওরা তিনটে দলে ভাগ হয়নি। সকলে মিলে একসঙ্গেই মাছ ধরেছে। নদীর একটা অংশকে গাছের ডাল দিয়ে ঘিরে সেই জলে মিশিয়ে দিয়েছে টিম্বো বা রোটেনান বিষ। কিছু ক্ষণেই জলের উপরে ভেসে উঠেছে মাছ। তাদের ধরে চামড়ার বস্তায় ভরতেও খুব একটা অসুবিধে হয়নি। সে সব নিয়েই ডেরায় ফিরছিল। নদীপারটা তখন অনেকটা পিছনে। পাতার ফাঁকফোকর দিয়ে ঠিকরে পড়ছে আলো। সেই আলোই পথ চিনিয়ে দিচ্ছিল। আর বিপত্তিটা ঘটল ঠিক সেই সময়েই। হুট করে একটা কম্পন আর মুহূর্তের মধ্যে গর্তে। কী যেন হয়ে গেল!
চার পাশে আর্তনাদ, হাহাকার। ভয়ে আতঙ্কে ডানা ঝাপটে উড়ে গেল ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি। কিছু বাঁদরের ডাকও মিশে গেল সেই ডানা ঝাপটানোর সঙ্গে। কানফাটানো শ্লথ, বুনো শূকরের চিৎকার আর তারই মাঝে তারস্বরে চিৎকার করে উঠল কেরেচা। একটা সাদা শিমুল গাছ আছড়ে পড়েছে ওর বুকে। গলায় গেঁথে গিয়েছে ঝোলানো পিরানহা মাছের চোয়াল। শুধু ওরা নয়, গাছগাছালি, পশুপাখি সব কিছু নিয়েই জায়গাটা ঢুকে গিয়েছে গর্তে। কেউ যেন হাওয়া টেনে চুপসে দিয়েছে পৃথিবীর একটা অংশ। ঘাবড়ে গিয়েছিল।
জঙ্গলে ধস মাঝেমধ্যেই নামে। কিন্তু সেটা নদীর কাছাকাছি। এই জায়গাটা নদী থেকে অনেকটাই দূরে। গলগল করে রক্ত পড়ছে কেরেচার গলা থেকে। ওময়োকাভা প্রথমে কিছু বুঝতে পারেনি। ধড়ফড় করে উঠতে গিয়েই দেখল ওর পা দুটো অকেজো। কোনও সাড় নেই। গাছের উপর আছড়ে পড়েছে গাছ। আর তারই মাঝে থেঁতলে গিয়েছে ওর দুটো পা। টাটা আর কয়েক জন মিলে কোনও রকমে উঠে গাছ সরাল। তবে কেরেচার অবস্থা ভাল নয়। কথা বলতে গেলেই ক্ষত থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত উঠছে। উপরে উঠে দৌড়ে ডেরায় নিয়েও গিয়েছিল ওকে। কিন্তু টাটারা পারেনি। দলের সেরা দৌড়বিদের দৌড় থেমে গিয়েছিল ডেরায় পৌঁছোনোর আগেই। জ্যাসি ওর চোখ দুটোকেও বন্ধ করতে পারেনি। তার আগেই ছুটে যেতে হয়েছিল ওময়োকাভার দিকে।
আমারুর পর জ্যাসিই ওদের দলের চিকিৎসক। এক কালে আমারুর সঙ্গে থেকে অনেক কিছু শিখে নিয়েছে। কিন্তু নিজের ভাই কেরেচাকে বাঁচাতে পারল না। এমনকি ওর নিথর শরীরটার দিকেও তাকায়নি আর। আসলে তাকাতে পারেনি। কেরেচাকে খুব বিরক্ত করত ও। ঝগড়াও হত। তবে কেরেচা ঠিক পেরে উঠত না। সবশেষে রেগেমেগে কেরেচা বলত, “তোকে আমার সহ্য হয় না। তোর মুখ আমি দেখতে চাই না।”
তাই আর মুখ দেখায়নি জ্যাসি। তবে পা দুটোকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দিতে না পারলেও ওময়োকাভাকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল। লাঠিই তার চিরসঙ্গী।
এমন ঘটনা কী ভাবে ঘটল, খুঁজতে বাকি রাখেনি ওরা। ধসটা খালি একটা জায়গাতেই নয়, জঙ্গলের অনেক জায়গাতেই হয়েছে। সেই খুঁজতে খুঁজতেই চোখে পড়ল একটা অদ্ভুত জায়গা। নদীর কাছাকাছি অনেকটা জায়গা জুড়ে প্রায় চার-পাঁচ মানুষ গর্ত। কেউ যেন খুবলে নিয়েছে জঙ্গলের মাংস। গর্তটাকে সাবধানে ঢেকে রেখেছে কেউ। কিছুটা উপরে বিশালাকায় বেতের ছাউনি আর তারও উপরে সবুজ পাতাওয়ালা গাছের ডালপালা। উপর থেকে দেখলে বোঝার উপায় নেই। ফাক দিয়ে তাকালে দেখা যায়, গর্তের চার পাশে নানান দিকে মাটির গভীরে ঢুকে গিয়েছে বেশ কতগুলো নল। মেশিনের সাহায্যে নলগুলো জঙ্গলের নীচ থেকে তুলে আনছে থাক থাক মাটি। গর্তটার মাঝেও একটা যন্ত্র। যন্ত্রটার দু'পাশে দুটো কপিকল আর মাঝে একটা চেন। সেই চেনেই বাঁধা রয়েছে বড় বড় লোহার পাত।
চেনটা ঘুরলে সেই সব লোহার পাতগুলোকে এক এক করে মাটিতে ভরিয়ে দিচ্ছে নলগুলো। নদী থেকে জল এনে সেই জল আছড়ে ফেলা হচ্ছে মাটি ভরা পাতের উপরে। ধুয়ে যাচ্ছে মাটি। আর অবশিষ্ট অংশ জড়ো হচ্ছে একটা বিশাল পাত্রে। পাত্রটা জলে ভরা। একটা মেশিন ক্রমাগত নাড়িয়ে যাচ্ছে জলটাকে। থিতিয়ে পড়ছে জঙ্গলের নীচ থেকে তুলে আনা ছোট ছোট কণা। কতগুলো পিস্তলেরাস গুন্ডা সময়মতো তুলে নিচ্ছে সে সব। মিশিয়ে দিচ্ছে অদ্ভুত রঙের তরলে। আর তার পরেই মুখগুলো খুশিতে ভরে যাচ্ছে ওদের। পিস্তলেরাসরা আমাজনের জঙ্গলের কুখ্যাত গুন্ডা।
তরল, কণার মিশ্রণ থেকে আলাদা করে দেয় সোনা। গুঁড়ো গুঁড়ো সোনা। সোনা তুলেই ছুটে যাচ্ছে জোনাটাসের কাছে। বেতের চেয়ারে বসে বসে হাতের তালুতে এক বার করে সোনাগুলো দেখেই পাশের একটা পাত্রে রেখে দিচ্ছে ও। জোনাটাসের চোখ দুটো যেন লোভে জ্বলছে। অন্য দিকে সমস্ত কিছুর তদারকি করছে ড্যানিয়েল। কিছুটা দূরের একটা বাকুরি গাছের আড়াল থেকে অনেক ক্ষণ ধরে দেখছিল টাটা। দেখেই ভিতরটা জ্বলে গেল। এ বারে যেন জঙ্গলটাকে ভিতর থেকে শূন্য করে দেবে জোনাটাস। থামাতেই হবে ওকে।
নোরাইরোহারার জন্য ভিতরটা ককিয়ে উঠছিল টাটার। ছেলেটা ফিরবে তো? জোনাটাসকে থামানোর উপায় জেনে আসবে তো! এক রাশ দুশ্চিন্তার মধ্যেই জঙ্গলের অন্ধকারে পা বাড়াল টাটা। অসহায় লাগছিল। এই এত বড় পৃথিবীতে শুধু বেঁচে থাকতেই এত লড়াই! এত লোভ মানুষের! কী করবে এত সব নিয়ে? ভাবতে ভাবতেই সাঁই করে কী যেন চলে গেল কানের পাশ দিয়ে। তার পর আরও। গুলির বৃষ্টি হচ্ছে যেন। প্রাণপণে দৌড়ল টাটা। জঙ্গলের অন্ধকারে মিলিয়ে যেতে চাইল। মিলিয়ে গেলও। কিন্তু ওর বাঁ হাতটা তত ক্ষণে অসাড়। রক্তে ভিজে গিয়েছে। পেটানো বাহুটাকে এফোঁড় ওফোঁড় করে দিয়েছে একটা গুলি। প্রাণপণে দৌড় দিল টাটা।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন