চতুর্দশ অধ্যায়

ধ্রুব মুখোপাধ্যায়

তিন দিন ধরে ঘরে ফেরেনি ওয়াঙ্গিরু। ওয়াঙ্গিরু কাটুর ন্যাওটা। মাঝেমধ্যে জঙ্গলের এ-পাশ ও-পাশ গেলেও ফিরে আসতে সময় নেয় না। কার্টুর প্রতিটা কাজে ওর নজর থাকে। মনে কু ডাকছিল কাটুর। জঙ্গলের আনাচকানাচে অনেক খুঁজেছে। তার দলের লোকেরাও খুঁজেছে। কোথাও পায়নি। জঙ্গলে কোনও কিছুই ফেলা যায় না। মৃত শরীরও না। ভাবতেই বুক কেঁপে উঠেছে কাটুর। মাঝরাতেও জঙ্গলে ঘুরেছে কাটু। দু'হাতের তালুতে মুখ ঘিরে ওয়াঙ্গিরুর ভাষায় আওয়াজ করে ডেকেছে। অবশেষে পাওয়া গেল নদীর কাছাকাছি একটা অর্কিডের ঝোপে ৷

ওয়াঙ্গিরুর ভাষায় ডাকতেই একটা মৃদু আওয়াজ এল কানে। হাত-পা-লেজবিহীন শরীরটাকে গড়িয়ে গড়িয়ে জলের জন্য নদীর দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল ওয়াঙ্গিরু। কিন্তু পারেনি। এত গাছগাছালিতে ভরা জঙ্গলে গড়িয়ে গড়িয়ে আর কত দূরই বা যাবে। শরীর প্রায় রক্তশূন্য। চোখ দুটো আলতো করে খোলা । চোখের দু'পাশ থেকে গড়িয়ে পড়ছে জল। তাকে দেখতেই হাত পা অসাড় হয়ে গিয়েছিল কাটুর। ওয়াঙ্গিরুকে কোলে তুলে ছুটে গিয়েছিল নদীতে। জল দিয়েছিল ওয়াঙ্গিরুর চোখে-মুখে।

চোখের পাতা দুটো খুলে কোনও রকমে তাকাল ওয়াঙ্গিরু। যেন বলতে চাইল, তোমার জন্যই এখনও বেঁচে আছি।

“কে করেছে?” কাটু এক প্রকার গর্জন করে উঠলে ওয়াঙ্গিরু ঘাড় ঘুরিয়ে সামনের চেস্টনাট গাছটাকে দেখাল। উপরে বেতের মাচাটা তখনও আছে। সেই মাচার উপরেই পড়ে রয়েছে রক্তমাখা ওয়াঙ্গিরুর হাত, পা, লেজ। নীচ থেকে বেশ দেখা গেল। রাগে হাত-পা কাঁপছিল কাটুর। আবারও তারস্বরে গর্জন করে উঠল, “কে? কে করেছে?”

এ বারে প্রাণপণে শরীরটাকে ঝাঁকিয়ে কাটুর কোল থেকে নিজেকে নীচে ফেলল ওয়াঙ্গিরু। তার পর গড়াগড়ি খেল। মুখের হাঁ-টাকে ডিম্বাকার করে চেষ্টা করল হাসার। পারল না যদিও। তবে বোঝাতে পারল, জোনাটাস যে দিন বলেছিল সে জঙ্গলে গাছ লাগাবে, সে দিনের হাসির সঙ্গে এই হাসির মিল আছে। তার কিছু ক্ষণ পরেই ধীরে ধীরে ওর শরীর স্থির হয়ে গেল। চোখ দুটো তখনও খোলা। শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল আকাশের দিকে। চোখ দুটোকে আর বন্ধ করেনি কাটু। ওয়াঙ্গিরুকে ও ভাবেই শেষ বারের মতো দেখেছিল ওদের দলের লোকেরা। দেখেছিল নোরাইরোহারা। যেন বলতে চাইছিল, “তোমরা কিছু করবে না?”

করতে তো হতই। ভিতর ফুঁসছিল কাটুর। ডেরায় ফিরেই একটা তাকওয়ারা নিয়ে বেরিয়ে পড়ছিল। জোনাটাসের হাত-পা আর লোভটাকে না মেরে যেন শান্তি নেই। কিন্তু আটকেছিল টাটা। চেপে ধরেছিল কার্টুর হাত। তবে থামতে চায়নি ও। স্পষ্ট করেই বলেছিল, “ওয়াঙ্গিরু আমাদের দলেরই এক জন। আমাদের পরিবারের সদস্য। ওয়াঙ্গিরুকে মারা মানে আমাদের গায়ে হাত তোলা। ওকে আমি ছাড়তে পারি না।”

ঠিক তখনই ফিসফিস করে টাটা বলেছিল, “তুমি দলপতি। দলপতি আবেগ, রাগ, শোক, দুঃখের বশবর্তী হয়ে কোনও কাজ করতে পারে না। আমাদের দলের নিয়মনীতির রক্ষক তুমি।”

কাটুর সামনে তখন দলের সকলে। সকলেই অবাক হয়ে দেখছে ওয়াঙ্গিরুর দেহটা। কেউ যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না। এ ভাবেও কেউ কাউকে মারতে পারে? ফুঁসছিল সকলেই। কার্টুর এক ডাকে সকলেই তখন বেরিয়ে যেতে প্রস্তুত। তবুও নিজেকে সামলে নিল ও। দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “আরান্ডুকারেন্ডা যেতে হবে। জেনে আসতে হবে কী আছে জঙ্গলের ভবিষ্যতে। কী ভাবে আটকানো যায় এই দানবটাকে। কোন পথে এগোব আমরা।”

শুনেই এগিয়ে এসেছিল রামায়েচা। দলের অন্যতম সেরা শিকারি। কার্টুর সহশিকারিও। দৌড়, সাঁতার, গাছে চাপা তো আছেই সেই সঙ্গে কয়েকশো ফুট দূর থেকে জলের নীচে দুরন্ত গতিতে ছুটে চলা মাছকে নিশানা করতেও সিদ্ধহস্ত। যেমন চোখ, তেমন কান। জঙ্গলের মাঝে আওয়াজ শুনে বলে দিতে পারত, ঠিক কতটা দূরে কোন শিকার বসে আছে। আরান্ডুকারেন্ডা যাওয়ার অন্যতম দাবিদার।

কিন্তু মুখের উপরেই না করে দিয়েছিল কাটু। জোনাটাস তখন জঙ্গলে। ওয়াঙ্গিরুকে যে ভাবে মেরেছে তাতে দলের লোককে মারা ওর কাছে জলভাত। যে কোনও সময় হামলা করতে পারে। সুতরাং দলকে সুরক্ষা দেওয়ার কাজটা এখন অনেক বেশি দরকার। এ সব বলেই থামিয়েছিল রামায়েচাকে।

যদিও রামায়েচা থামেনি। বলেছিল, “সেই সুরক্ষা তো আমার থেকে তুমি বেশি ভাল দেবে।”

কিন্তু কথা শোনেনি কাটু। রামায়েচাও আর কিছু বলতে পারেনি। কাটু বন্ধু হলেও দলপতি। দলের ভালমন্দ বোঝার ভার তার কাঁধে। অগত্যা মেনেই নিয়েছিল। সে বারে ওদের দলের, জঙ্গলের ভবিষ্যৎ দেখতে আরান্ডুকারেন্ডা গিয়েছিল কাটু। তবে জোনাটাস কোথাও যায়নি। ব্লেডকে টাকাপয়সা মিটিয়ে ছেড়ে দিলেও মনে পুষে রাখা স্বপ্ন ছাড়তে পারেনি। জঙ্গলে থেকে পশু-পাখির ব্যবসাটা যে ওর দ্বারা হবে না, সেটা ভালই বুঝেছিল। জঙ্গল যেন মায়ের কোল। সেখানে সকলেই নিরাপদে। তার উপরে বিপদ কাটুদের দলটা। তবে থেমে থাকার পাত্র সে নয়। ব্লেডের উপর রাগ থাকলেও ব্লেডের ওই হামলা করার কথাটা ওর মনে ধরেছিল। হামলা ছাড়া গতি নেই। তবে ঠান্ডা মাথায় ৷

তা ছাড়া একা পেরে উঠত না জোনাটাস। টাকার বিনিময়ে জোগাড় করেছিল এক দল কাঠুরে। জঙ্গলে গাছ কাটার মতো সহজ-সরল পন্থা আর কী হতে পারে। শুরু করেছিল ইপে গাছ দিয়ে। ইপে কাঠের দাম আকাশছোঁয়া। জঙ্গলের সবচেয়ে দামি কাঠ। টেকসই, পোকা ধরে না। সেই সঙ্গে আগুনও ধরে না সহজে। ইপে গাছের বৃদ্ধি কম। বৃক্ষ হতে সময় নেয় প্রায় একশো বছরের কাছাকছি। তবে অভাব নেই। সমুদ্রের ধারে পড়ে থাকা ঝিনুক যেন। বেশ চলছিল। চেন-শ দিয়ে ডালপালা ছেঁটে তার পরে গুঁড়ি। ঘন জঙ্গলে গাছ কাটলে গুঁড়ি মাটিতে আছড়ে পড়ে না। ঠেস দেওয়ার জায়গা পায়। সেখান থেকে গুঁড়ি নামাতে খুব একটা অসুবিধেও হয় না। সব শেষে নদীপথে অন্ধকারে রাতে সে সব গুঁড়ি শহরে পাচার করতেও অসুবিধে নেই। কাঁচা টাকা পকেটে ঢুকছিল। সেই লোভেই শুধু ইপে গাছে আর আটকে থাকতে পারেনি জোনাটাস।

জাটোবা, কেপক, রুমন নানান ধরনের দামি কাঠ কাটতে কাটতে প্রতিশোধের জন্য কবে যেন হাত দিয়েছিল লুপুনা গাছে। কাটুদের দলটাকে শেষ না করে ওর শান্তি নেই। জঙ্গলের এমনি গাছের হিসেব না থাকলেও লুপুনা গাছের অবস্থান, বৃদ্ধি নজরে থাকে কাটুদের। জঙ্গলের পবিত্র গাছ। জঙ্গলের লোকেরা ভুলেও লুপুনা গাছ কাটে না। আর জঙ্গলে বাইরের লোক বলতে জোনাটাসরাই। বুঝতে অসুবিধে হয়নি। এ দিকে কাটু তখনও ফেরেনি। আরান্ডুকারেন্ডা অত্যন্ত দুর্গম স্থান। ওখান থেকে না ফেরার দেশে হারিয়ে যাওয়ার উদাহরণ ভূরি ভূরি। অপেক্ষা করতে পারেনি রামায়েচা। টাটা আর কেরেচাকে সঙ্গে নিয়ে সোজা হাজির হয়ে গিয়েছিল জোনাটাসের ডেরায়।

এত দিন জোনাটাস গিয়েছিল। কিন্তু এ বারে ওরা এল। কাটুর দলের অস্বস্তিতে স্বস্তি পেয়েছিল জোনাটাস। যদিও কেরেচার কথায় গুরুত্ব দেয়নি। মুখের উপরেই অস্বীকার করেছিল।

—“তা হলে কাটল কে?” টাটা জিজ্ঞেস করলে স্পষ্ট করে বলেছিল, “জঙ্গলে কে কোথায় গাছ কাটছে, আমি কী করে জানব! তবে আমি কাটিনি।

—“বেশ। তবে লুপুনা গাছে হাত দিলে আমরা তার আঙুল কেটে দিই। সে নিজের লোক হলেও,” বেশ কড়া ভাষায় রামায়েচা বললে কথাটা গায়ে লেগেছিল জোনাটাসের। ভিতরটা এমনিতেই ফুঁসছিল ওর। ও জানত, কাটুর দল থাকলে জঙ্গলে থেকে কোনও ব্যবসাই করে ওঠা হবে না।

সেই রাগটাই হুট করে মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল জোনাটাসের, “যা করেছি বেশ করেছি। এই জঙ্গল আমি সাফ করব। দেখি কে আটকাতে পারে!” সদ্য শেখা কাটুদের ভাষায় কথাগুলো বলতে এক বিন্দুও বাধেনি ওর। যুদ্ধ ঘোষণা করে দিয়েছিল জোনাটাস ।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%