সপ্তম অধ্যায়

ধ্রুব মুখোপাধ্যায়

আগের ডেরাটা ছিল বিশাল। অনেকটা জায়গা জুড়ে। এখনকার ডেরাটা বড় হলেও আগের মতো নয়। গোষ্ঠীতে লোকও কমে গিয়েছে অনেক। এমনকি পোষা জন্তু-জানোয়ারও আর নেই। মন ভেঙে গিয়েছে ওদের। আর কাউকে পোষে না এক সঙ্গে একগুচ্ছ পশুপাখির মৃত্যু দেখার পর যন্ত্রণাটা আর নিতে পারে না। জঙ্গলে অসহায়, রুগ্ন, মৃতপ্রায় পশুপাখি দেখলে ডেরায় এনে শুশ্রূষা করে ছেড়ে দেয়। নোরাইরোহারা ডেরার কাছাকাছি যেতেই চোখে পড়ল এক গুচ্ছ লোক বেড়ার বাইরে দাঁড়িয়ে রয়েছে জোনাটাস আর ওর পাশেই ড্যানিয়েল।

জোনাটাস এখন বড় ব্যবসাদার। এখন আর কোম্পানির বেতনভুক্ত ম্যানেজার নয়। সেই জন্যই আগের মতো একা একা আসেনি। ওদেরকে ঘিরে রয়েছে চার জন কালো পোশাকের রক্ষী। দু'জনের হাতে বন্দুক আর অন্য দু'জনের হাতে দড়ি বাঁধা দুটো কুকুর। কুকুরগুলো পেশিবহুল। হিংস্র চোখ-মুখ। যেন বাঘ! ওদের সঙ্গে কথা বলছিল দলপতি, ওময়োকাভা। নোরাইরোহারা আর কেরেচাকে দেখতেই কুকুরগুলো দড়ি ছিঁড়ে পারলে ঝাঁপ দেয়। প্রাণপণে দড়ি ধরে রেখেছে রক্ষীরা। সেই আওয়াজেই ডেরার ভিতর থেকে বেরিয়ে এল টাটা।

—“কী হয়েছে?” নোরাইরোহারা জিজ্ঞেস করতেই ওকে ভাল করে দেখল জোনাটাস। লম্বা ভিজে চুল ঢেকে দিয়েছে কাঁধ। মেদহীন চেহারা । হাতে তাকওয়ারা। দেখলে চেনা যায় না। তবে চোখ দুটো সেই আগের মতো সরল নিষ্পাপ। ঠিক যেন কাটু। চিনতে অসুবিধে হল না জোনাটাসের। ও এখন নোরাইরোহারাদের ভাষাতে বলল, “আমি ক্ষমা চাইতে এসেছি।”

এই ঘন জঙ্গলে এত সব ব্যবস্থা করে ক্ষমা চাইতে যে জোনাটাস আসবে না, সেটা নোরাইরোহারা বোঝে। ভেবেছিল, কড়া ভাষায় কিছু কথা শুনিয়ে ঝামেলা বাধাবে। বন্দুক তুলতে বাধ্য করবে জোনাটাসের রক্ষীদের। আর সেই সুযোগে আত্মরক্ষার বাহানায় মেরে ফেলবে জোনাটাসকে। তিরবিদ্ধ জোনাটাসকে পুড়িয়ে ফেলবে আগুনে। ঠিক যেমন করে... ভাবতেই ভিতরটা কেঁপে উঠল ওর। বুকের ধুকপুকানি বেড়ে গেল। দূরে দাঁড়িয়ে টাটা যেন বুঝল সেটা। তাই বেশ সাবধানে, “তোমাকে আমরা ক্ষমা করে দিলাম,” বলে জোনাটাসকে তাড়াতে চাইল। কিন্তু গেলে তো!

জোনাটাস ধুরন্ধর লোক। সাবধানে বলল, “গত বারে ভুলটা আমারই ছিল। পাখিগুলোকে সংরক্ষণের জন্য ও ভাবে নিয়ে যাওয়া ঠিক হয়নি। ভীষণ অনুশোচনা হয়েছিল। তবে বাকি ঘটনার জন্য আমি দায়ী নই।”

হাতে ধরে থাকা তাকওয়ারাটা আরও শক্ত করে ধরল নোরাইরোহারা। চোখের সামনে সব কিছু যেন জ্বলছে। আর সেই আগুন দেখে হাসছে জোনাটাস। হাসতে হাসতেই বলছে, “আমি দায়ী নয়। আমি কী করব?”

তবে সামলে নিল। জোনাটাস তখনও মুখটাকে কাঁচুমাচু করে বলেই চলেছে, “ভেবেছিলাম এ সব ছেড়ে চলেই যাব। গিয়েওছিলাম। কিন্তু থাকতে পারলাম না । এই জঙ্গল ছেড়ে থাকা যায়! মায়া পড়ে গিয়েছে।”

তার পর সামনে থাকা মুখগুলোকে দেখল। আশা করছিল, অনেক দিন পরে আসা অতিথির মতো মুখগুলো স্বাগত জানাক। কিন্তু কেউ কিছু বলল না। অগত্যা জোনাটাসকেই বলতে হল, “আপনাদের মতো আমারও অধিকার আছে এই জঙ্গলে। এই জঙ্গল তো সকলের। কিন্তু আমি তো আর শিকার করতে পারি না। খাব কী? তাই বাঁচার জন্য আমার একটাই অস্ত্র। ব্যবসা।”

সব শেষে বেশ জোর গলায় অভিমান মাখিয়ে বলল, “তবে জঙ্গলের কোনও ক্ষতি না করে। আমি সামান্য একটু জায়গা এবং আপনাদের সাহায্য চাইতে এসেছি। দেবেন না?”

নোরাইরোহারা খেঁকিয়ে বলতে যাচ্ছিল “না, দেব না,” কিন্তু সামনে তখন ওময়োকাভা। দলপতির সামনে কিছু বলা ঠিক নয়। তাই ওময়োকাভাই ভেবেচিন্তে বলল, “জঙ্গলের ক্ষতি না করে আপনি যা করার করুন। তবে আমাদের থেকে কোনও সাহায্য আশা করবেন না।”

জোনাটাস আর কিছু বলল না। চুপচাপ হারিয়ে গেল জঙ্গলের গাছগাছালির ফাঁকে। তবে নোরাইরোহারা বলল, “কুকুরের লেজ কখনও সোজা হয় না,” বলেই রাগে গজগজ করতে করতে ঢুকে গেল ডেরার ভিতরে।

পরিশ্রম, রোমাঞ্চ, খাওয়াদাওয়া- সব মিলিয়ে শিকারের দিনগুলো বেশ জমজমাট থাকে। রাত নামলেই ঘুমের কোলে ঢুলে পড়তে দেরি হয় না। ঝুপড়ির ভিতরে দু'পাশের বাঁশে বাঁধা হ্যামকটায় শরীর এলিয়ে দিয়েছিল নোরাইরোহারা। দিন একেবারেই ভাল যায়নি। শিকারের দিন খিদে পেটে কাটাতে হয়েছে। সেই সঙ্গে আরও বড় সমস্যা জোনাটাস। ওর পাশেই অন্য একটা হ্যামকে শুয়ে ছিল টাটা। বাইরে চার পাশ খোলা রামায়েচার ছাউনিতে জ্বলছে শুকনো কাঠ। আগুনের এক পাশে বসে বসেই ঘুমিয়ে পড়েছে রামায়েচা। রামায়েচার কিবা দিন কিবা রাত। আগে পুরনো ডেরায় রাতে পালা করে পাহারা দিত ওরা। কিন্তু এখন আর দিতে হয় না। রামায়েচা এখন স্বঘোষিত পাহারাদার। অন্ধ হলেও অনুমানক্ষমতা, দেহের শক্তি, মনের তেজ এক বিন্দুও কমেনি। কমেছে শুধু বেঁচে থাকার ইচ্ছেটা। ছোট্ট দরজা দিয়ে সেই আগুনেরই আলো হামা দিয়ে ঢুকছিল নোরাইরোহারার ঝুপড়িতে। রাতের জঙ্গল অন্য রকম। আওয়াজও ভিন্ন। রাতজাগা পাখি, শিকারির আওয়াজ, শিকারের আর্তনাদ ভিতর কাঁপিয়ে দেয়। যদিও সে সবে অভ্যস্ত ওরা। তবুও ঘুম আসছিল না।

—“ঘুমোতে পারছিস না?” পাশ থেকে দাদু বললেও নোরাইরোহারা কিছু বলল না।

টাটা আবারও বলল, “জোনাটাস আমারও শত্রু। ওকে সরিয়ে দিতে আমিও চাই। কিন্তু যুদ্ধে আবেগের কোনও স্থান নেই। ওদের অস্ত্র আছে, সেই সঙ্গে আছে নির্মমতা। যুদ্ধের নিয়ম, সহাবস্থানের রীতিনীতি ওরা মানে না। নিয়ম ভাঙতেই ওদের মজা। সেই জন্যই ভয় হয়।”

টাটা কথা শেষ করতেই ঝুপড়িতে ঢুকল ওময়োকাভা। “ঘুমিয়ে পড়েছেন?” ওময়োকাভা বলতেই বেশ আফসোসের সুরে টাটা বলল, “ঘুম উড়ে গিয়েছে সেই কবেই। বাপ-ঠাকুরদার ভিটে ছেড়ে আসার পর আর ঘুমোতে পারলাম কই!”

“আমিও ঘুমোতে পারছি না। কাজটা কি ঠিক হল? জোনাটাসকে প্রশ্রয় দেওয়া কি ঠিক হল? যদি আবার ও ...”

ওময়োকাভা বলতে গেলে ওকে থামিয়ে নোরাইরোহারা বলল, “যদি নয়। হবে। ও আবারও ক্ষতি করবে। শুধু জঙ্গলের নয়, আমাদেরও আবার ভিটেছাড়া করবে। এই বিশাল জঙ্গল ও সাফ...” তবে পুরোটা বলতে পারল না।

—“থাম তুই। অমন কথা মুখেও আনবি না,” বলে এক প্রকার ওকে থামাল টাটা। তার পর বেশ গুছিয়ে বলল, “এ ছাড়া আর কী-ই বা বলতে তুমি?”

—“কিন্তু ওকে আটকাব কী করে?” প্রশ্নটা শুধু ওময়োকাভার ছিল না। ছিল ওদের গোষ্ঠীর সকলেরই। এমনকি টাটারও।

—“ওকে মারলে ওর দলবল অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মেরে ফেলবে আমাদের। এমনিতেই আমরা এখন ছেলে-বুড়ো-মহিলা নিয়ে মাত্র ষাট জন। এর পরেও যদি ওদের হাতে আমাদের মরতে হয়, তা হলে তো আমাদের গোষ্ঠীই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। সেই সুযোগে জঙ্গলটাকেও শেষ করে দেবে ও।”

ওময়োকাভা বললে টাটা কিছু বলতে পারল না। থামাতেও পারল না।

—“উপায়....উপায়?” বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।

—“এক বার আরান্ডুকারেন্ডাতে গেলে হয় না! যদি কোনও উপায় পাওয়া যায়!” ওময়োকাভা প্রস্তাবটা নিজেই দিল।

—“কিন্তু যাবে কে? সে তো ভয়ঙ্কর দুর্গম স্থান!” টাটা প্রশ্নটা করতেই চুপ করে গেল ওময়োকাভা।

শেষ বার কাটু গিয়েছিল সেখানে। দেখে এসেছিল জঙ্গলের ভবিষ্যৎ। ওদের দলের সমস্যা দলপতি মেটালেও জঙ্গলের কোনও সমস্যা হলেই ওরা আরান্ডুকারেন্ডা যায়। গিয়ে দেখে আসে জঙ্গলের ভবিষ্যৎ, তাকে রক্ষা করার উপায়। যাই হোক, কিন্তু এ বারে ওখানে যাওয়ার মতো সাহস, শক্তি কারই বা আছে? নোরাইরোহারা আর চুপ থাকতে পারল না। ওর শরীরের রক্ত ফুটছে। হ্যামক থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “আমি যাব।”

টাটা তখনও চুপ। বাধা দিল না ওকে। তবে প্রশ্রয়ও দিল না। গোষ্ঠীর আগের দলপতির ছেলে নোরাইরোহারা। সেই রক্তই বইছে ওর শরীরে। বুক চিতিয়ে আরান্ডুকারেন্ডাতে যাওয়াটা ওকে মানায়। কিন্তু সদ্য শিকারের অধিকার পাওয়া কাউকে আরান্ডুকারেন্ডার মতো দুর্গম স্থানে পাঠানোটাও বিপজ্জনক। নোরাইরোহারাকেও যদি হারিয়ে ফেলে টাটা! ওময়োকাভার দিকে অসহায় হয়ে তাকাল। ওময়োকাভাও যেন বুঝল, “বেশ, সকলে মিলে আলোচনা করা যাক,” বলেই বেরিয়ে গেল নোরাইরোহারাদের ঝুপড়ি থেকে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%