দ্বাদশ অধ্যায়

ধ্রুব মুখোপাধ্যায়

ফলবিহীন কাস্তানহা-ডো-ব্রাজিল বা ব্রাজিলিয়ান চেস্টনাট গাছটাকে খুঁজে পেতে খুব একটা অসুবিধে হয়নি। আশি ফুট উঁচু সোজা আকাশের দিকে উঠে যাওয়া একটা গাছ, সেই সঙ্গে প্রায় ষাট ফুট উচ্চতা পর্যন্ত গাছটা ন্যাড়া। একটাও ডালপালা নেই। হিংস্র জন্তু-জানোয়ার চাইলেও উঠতে পারবে না। তবে উপরের দিকে বেশ ডালপালা। ঘন পাতায় ভর্তি। লম্বা একটা বাঁশের মাথায় যেন এক খণ্ড সবুজ মেঘ। সেখানেই কয়েকটা ডাল মাটির সঙ্গে সমান্তরাল দেখে মাচাটা করা হয়েছে। নদীর পার স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সেই মাচার উপরেই হিংস্র বাঁদর বা পাখিদের হাত থেকে রক্ষা পেতে রাখা হয়েছে লোহার খাঁচা।

এক পাশে জ্বলছে ব্যাটারিচালিত কীটপতঙ্গ তাড়ানোর মেশিন, অন্য পাশে রাখা আছে জার্মানি থেকে সদ্য আনা ব্লেসার আর নাইন্টি থ্রি ট্যাকটিকেল রাইফেল। জার্মানির ব্লেসার জাগড ওয়াফেন কোম্পানির বানানো এই রাইফেল আদতে জার্মান, ডাচ পুলিশের ক্ষেত্রে বিশেষে ব্যবহার করা একটা স্নাইপার। অস্ট্রেলিয়ান মিলিটারিও ব্যবহার করে। অনেক দূর থেকে নিশানা করতে এর জুড়ি মেলা ভার। জোনাটাসের আবার মরতে ভীষণ ভয়। যদিও মারতে নয়। সেই জন্যই এত ব্যবস্থা। নীচে গাছের গুঁড়ির চার পাশে সরীসৃপের থেকে বাঁচতে ঢালা হয়েছে কার্বলিক অ্যাসিড, গ্যামাক্সিন। গাছে মোটর-চালিত ওঠা-নামার যন্ত্রটা গাছেই আটকানো। কে জানে, কখন আবার নীচে নামতে হয়!

এক হাতে মনোকুলার ধরে একটা চোখ স্থির করে রেখেছিল। নদীর একটা বিশেষ অংশে তেমন কুমির নেই। তা ছাড়া জলও স্বচ্ছ। সেই অংশেরই একটা পারে বিভিন্ন সময়ে জল খেতে আসে জাগুয়ার। মাহেন্দ্র ক্ষণের প্রহর গুনছিল ও। ফাঁকে ফাঁকে দেখে নিচ্ছিল চার পাশ। আকাশের নীচে কে যেন ঘন সবুজ একটা শতরঞ্জি বিছিয়ে দিয়েছে। নানা রঙের টিয়া পাখি, লাল-ধূসর ট্রোগন বা কুচকুচে পাখি, বড় ঠোঁটওয়ালা সোনালি টোকো টোকান আরও কত পাখি উড়তে উড়তে ঝাঁপিয়ে পড়ছে সেই সবুজ শতরঞ্জিতে। কত রকমের আওয়াজ তাদের। শিকার থেকে মন ঘুরে যাচ্ছিল জোনাটাসের। সরে যাচ্ছিল চোখ।

ঠিক সেই সময় পাশ থেকে জোনাটাসের হাতে থাকা মোনোকুলারটা শক্ত করে ধরল ব্লেড। ব্লেডের ড্রেডলক চুল, গায়ের রং কালো স্লেটের মতো আর চেহারাটা বেশ দশাসই। ভুরু, দাড়ি মুখের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে গিয়েছে। চোখ দুটো ভয়ঙ্কর হিংস্র। ধবধবে সাদা দাঁতগুলো খিঁচিয়ে বলল, “ফোকাস।”

বিগত ক’মাসে অনেক পন্থা অবলম্বন করেছে জোনাটাস। ডেরা থেকে অনেকটা দূরে নদীতে বোট রেখে বেশ কিছু হরিণ শিকার করেছিল প্রথমে। কিন্তু হরিণের চামড়ায় তেমন লাভ নেই। তাই আপাতত মন দিয়েছে জাগুয়ারে। জাগুয়ারের চামড়ার বাজারদর ভাল। বড় বড় আরবপতিরা নিজেদের সামাজিক অবস্থান, প্রতিষ্ঠা বোঝাতে সে সব চামড়া ঝুলিয়ে রাখে ঘরে, অফিসের দেওয়ালে। এমনকি মেঝেতেও। মরা জাগুয়ারের দামও কোটি কোটি টাকা। দাঁত, খুলির বাজারদরও চোখধাঁধানো। এমনকি হাড়ও বিক্রি হয়। হাড় থেকে ওষুধ তৈরি হয়। বেআইনি হলেও চোরাবাজারে বিক্রি করে আজও অনেকে কোটি কোটি টাকা কামায়। সেই জন্যই ব্লেডকে আনা।

ব্লেড জঙ্গলের ভয়ঙ্কর পিস্তলেরাস গুন্ডা দলের এক জন। এদেরকে জঙ্গলদস্যুও বলা চলে। নির্মমতা আর হিংস্রতায় এরা ক্ষুধার্ত জাগুয়ারের চেয়েও ভয়ঙ্কর। টাকা পেলে সব করতে পারে। জঙ্গলের চোরাকারবারিদের সাহায্য করাই এদের প্রধান কাজ। জোনাটাসও সেই কাজেই লাগিয়েছে। যদিও সত্যিটা বলেনি। বলেছে, শিকারে ওর ভীষণ আগ্রহ। শিকার শিখতে চায়। বিশাল অঙ্কের টাকার বিনিময়ে জোনাটাস ব্লেডের কাছ থেকে জাগুয়ার শিকার শিখছে। জঙ্গলের কোন জায়গায় কী ভাবে জাগুয়ার মারা যেতে পারে, সে সব জেনে নিচ্ছে।

মুহূর্তের মধ্যে নদীপারে জঙ্গলের ঝোপে যেন একটা আগুনের হলকা। সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেল জঙ্গলের চার পাশ। অদ্ভুত একটা আওয়াজ। যেন সাবধান করতে চাইল কেউ। ধীর পায়ে এগিয়ে নদীর জলে তত ক্ষণে মুখ ডুবিয়েছে জাগুয়ার। সামনের দিকটা গাঢ় আগুন রঙের হলেও শরীরের পিছনের দিকটা কিছুটা ফিকে। সারা গায়ে ডোরাকাটা দাগ। দেখেই ভয় লাগে। চটপট করে কখন যে ব্লেসার রাইফেলটাকে দু'হাতে তুলে নিয়েছে জোনাটাস, বুঝতেও পারেনি। বন্দুকের রেয়ার সাইটে চোখ স্থির। শ্বাসপ্রশ্বাস যেন দ্রুত বেগে ছুটে চলা রেলগাড়ি। ট্রিগারে আঙুল ঠেকিয়ে গুলি ছুঁড়তে প্রস্তুত জোনাটাস!

কিন্তু সেই সময়েই পাশ থেকে কে একটা কী যেন ছুঁড়ে মারল একেবারে বন্দুকের ডগায়। নড়ে গেল নিশানা। উত্তেজনায় বন্দুকের ট্রিগারে তত ক্ষণে আঙুল চেপে দিয়েছে জোনাটাস। সাইলেন্সার লাগানো বন্দুকে আওয়াজ না হলেও গুলিটা সাঁই করে উড়ে গিয়ে চিরে দিল নদীর জল। চোখ সরাতে না-সরাতেই আগুনের হলকা নিভে গেল। যেন কিছু ছিলই না।

খেঁকিয়ে উঠতে দেরি করেনি ব্লেড, “তামাশা হচ্ছে? জেনে রেখো, জঙ্গলে শিকার আর শিকারির কোনও বাধ্যবাধকতা নেই,” বলে নিজের পিঠ খুলে দেখাল। ধু-ধু মাঠে কতগুলো জলহীন এবড়োখেবড়ো পুকুর যেন। মধু আনতে গিয়ে জাগুয়ারের থাবায় খাবলা খাবলা মাংস এক নিমেষে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল পিঠ থেকে। শিকারির এখানে একটাই উদ্দেশ্য, হামলা।

—“দেখামাত্র গুলি করতে পারলে না? গাধা কোথাকার!” ব্লেডের কথাগুলো গায়ে লাগলেও কিছু বলতে পারল না জোনাটাস। খাঁচায় তখন মুহুর্মুহু আছড়ে পড়ছে হলদেটে টুকুমান ফল। দু'-চারটে খাঁচার জালের ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়েছিল ভিতরেও। দু'হাতে চেপে একটা ফল ছাড়াল ব্লেড। মোটা বীজ আর তার উপরে পাতলা কমলা রঙের আস্তরণ। মাঝারি উচ্চতার এক প্রকার পাম গাছের ফল। এই অঞ্চলে তেমন না পাওয়া গেলেও আছে হয়তো। আপন খেয়ালে খাচ্ছিল ব্লেড। যেন তামাশা দেখছে। জঙ্গলের চার পাশ আবারও স্বাভাবিক। তবে তারই মাঝে কার যেন হাসির শব্দ। শব্দটা জোনাটাসের পরিচিত।

ভিতরটা দপ করে জ্বলে উঠল। চার পাশ খুঁজল। কিন্তু কোথায় সে! যদিও ওয়াঙ্গিরুকে বাগে আনার পদ্ধতি জোনাটাসের জানা। পাখিগুলোকে উদ্ধার করেছে ওয়াঙ্গিরু, কাটুর বলা কথাগুলো মনে পড়তেই দূরে চুপচাপ বসে থাকা একটা সাদা-কালো লাফিং ফ্যালকনকে এক গুলিতে ছিটকে ফেলল নীচে।

তার পরেই এলোপাথাড়ি গুলি ছুড়ে ঝুপঝাপ মাটিতে নামিয়ে আনল কিছু উড়ন্ত স্কারলেট ম্যাকাও আর সব শেষে নদীর জলে ভাসতে থাকা কতগুলো কালো মুখ, সাদা গায়ের জ্যাবারু সারস। কিন্তু কোথায় ওয়াঙ্গিরু! ভিতরটা আরও জ্বলছিল।

ব্লেড গোটা চারেক টুকুমান খেয়ে মুখে বেশ বিরক্তি দেখিয়ে বলল, “হয়েছে? জাগুয়ার মারতে না পারার রাগ নেমেছে?”

তবে জোনাটাস তখনও রাগে ফুঁসছে। যদিও ব্লেড পাত্তা দিল না। আরও বলল, “তুমি এই যে এলোপাথাড়ি গুলি ছোড়ার কাজটা করলে, এর জন্যই তুমি একটা গাধা! শিকারের জায়গাটা নষ্ট করে দিলে তুমি। জন্তুজানোয়ার জঙ্গলটাকে পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে চেনে। যেখানে বিপদ, সেখানে আর আসে না ওরা।”

—“না আসুক। আর কাউকে আসতে হবে না,” রাগে জ্বলতে জ্বলতে জোনাটাস বলতেই দিগ্বিদিক না খেয়াল করে আবারও গুলি ছুঁড়তে যাচ্ছিল। আর তক্ষুনি খাঁচার একেবারে সামনে ওয়াঙ্গিরু। লাফিয়ে-ঝাঁপিয়ে খাঁচাটাকে মাচা থেকে ফেলেই দেয় প্রায়। দু'হাত, দু'পায়ে, লেজে খাঁচার তার আঁকড়ে ধরে প্রাণপণে চেষ্টা করছিল ও। জঙ্গলের ক্ষতি মানে ওরও ক্ষতি। ঠিক তখনই খপ করে ওয়াঙ্গিরুর হাত দুটোকে খাঁচার ভিতরে টেনে নিল ব্লেড। প্রাণপণে ছাড়ানোর চেষ্টা করল ওয়াঙ্গিরু।

কিন্তু তত ক্ষণে ব্লেডকে সাহায্য করতে মাঠে নেমে পড়েছে জোনাটাস। কোমর থেকে থেকে বের করল চামড়ার খাপে মোড়া প্রায় এক হাত লম্বা পুক্কো ছুরিটাকে। তার পর কেটে দিল ওর হাত দুটো। রক্তে রক্তময় ওয়াঙ্গিরুর শরীর। তবুও লেজ আর পা দিয়ে ধরে ছিল খাঁচা। লাফ মেরে পালাতে পারল না ও। লেজটাকেও তত ক্ষণে কেটে ফেলেছে জোনাটাস। সব শেষে বাকি ছিল দুটো পা। সে দুটোকেও ছাড়েনি। আশি ফুট উঁচু ব্রাজিলিয়ান চেস্টনাট গাছ থেকে আছড়ে পড়ল ওয়াঙ্গিরুর হাত-পা-লেজবিহীন শরীরটা। জঙ্গল কেঁপে উঠল ওয়াঙ্গিরুর আর্তনাদে। থমথম করছে চার পাশ। তবে জোনাটাস পাত্তা দিল না।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%