ঊনবিংশ অধ্যায়

ধ্রুব মুখোপাধ্যায়

পাগলের মতো গাছের পাতা দেখতে দেখতেই ডেরায় ঢুকল নোরাইরোহারা। আর ঢুকতেই খালি হয়ে গেল ওর ভিতর। চারপাশ খাঁ খাঁ করছে। কেউ কোথাও নেই। ব্যবহারের জিনিসপত্র আগের মতো থাকলেও ডেরায় মানুষজন কেউ নেই। এমনটা কখনও হয়নি। হওয়ার কথাও নয়। যেন কোনও জাদুকর অদৃশ্য করে দিয়েছে ওদের। প্রাণপণে রামায়েচাকে খুঁজল। সকলে বেরিয়ে গেলেও রামায়েচার কোথাও যাওয়ার নেই। ডেরার অতন্দ্র প্রহরী ও। চিৎকার করে ডাকল। কিন্তু কোথায় রামায়েচা!

ভিতরটা হালকা হয়ে আসছিল। সেই সঙ্গে একটা বুক খালি করা ভয় যেন গিলে খাচ্ছিল নোরাইরোহারাকে। জোনাটাস কী তা হলে... ইচ্ছে করছিল জঙ্গলের প্রতিটা কোন এক মুহূর্তে খুঁজে শেষ করে ফেলে। কিন্তু এত বড় জঙ্গল। কোথায় খুঁজবে? সঙ্গে থাকা জিনিসপত্র নামিয়ে একটা ধনুক আর কিছু তির নিয়েই ছুটে গেল ঝর্নার দিকে। ডেরার বিপদের সময়ে অনেকেই ঝর্নায় যায়। আরাধ্য নুম্মোর কাছে প্রার্থনা জানায়। হয়তো সেখানেই। কিন্তু ঝর্নার সামনের জলাধারটা স্থির। চার পাশ থমথমে। একটা বুককাঁপানো স্ক্রিমিং পিহার ডাকে চমকে উঠল। যেন আর্তনাদ করছে পাখিটা। ঝুপ করে ডুব মারল সামনের জলে। তার পর নীচে থাকা নুম্মোর প্রতিকৃতিটা ছুঁয়ে জল থেকে মাথা তুলে তাকাল সামনের দিকে। আর তাকাতেই ছ্যাঁৎ করে উঠল ভিতর।

ঝর্নার জল উপর থেকে দু' পাশে ভাগ হয়ে আছড়ে পড়ছে নীচে। মাঝখানটা খালি। সেই ফাঁকেই গুহা। আর সেই গুহার উপরেই একটা গাছ। অদ্ভুত তার কাণ্ড। যেন বেশ কয়েকটা সাপ কাণ্ড জড়িয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছে। গাছের পাতায় চোখ যেতেই চমকে উঠল ও। পান পাতার মতো দেখতে পাতাগুলোর পত্রশীর্ষে একটা গোল সবুজ অংশ। ভিতরটা নেচে উঠলেও কে যেন থামিয়ে দিল। আর কী! যাদের জন্য এই গাছ আজ তারাই নেই! কাকে বাঁচাবে ও? কার জন্য লড়বে এই ডাল নিয়ে?

তবুও ঝর্নার মুখে গেল। নদীর উপচে পড়া জলের জলধারা। স্রোত প্রায় নেই। গাছটার কাছে যেতে তেমন অসুবিধে হল না। পাতাগুলোকে দেখল। ঠিক যেমনটা আঁকা ছিল তেমনই। কাণ্ডটাকেও ভাল করে দেখল। শুধু সাপ নয়, নীচে বেশ কিছু কচ্ছপ, পোকা, ব্যাঙও কাঠ হয়ে গিয়েছে। সাপগুলো গাছের গুঁড়িতে কামড় বসিয়েই রয়েছে। নিজেদের আর ছাড়াতে পারেনি। ছুঁলে নোরাইরোহারাও কাঠ হয়ে যাবে না তো! হলেই বা কী! ছুঁয়ে দেখল ও। কিচ্ছুটি হল না। একটা ডাল ভেঙে নিল। ভাঙা অংশটা দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা আঠা ঝরছে। আর ঠিক সেই সময়েই কানে এল কতগুলো গুলির শব্দ। সাবধানে সেই ডাল হাতেই ছুটল নোরাইরোহারা। প্রাণপণে ছুটল। কেউ তো আছেই!

সবুজ ডালপালা ঢাকা বিশাল জায়গা জুড়ে করা গর্তটার এক পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে ওরা। হাতে ধনুক, ধনুকের ছিলায় তির। সামনে ওময়োকাভা, টাটা আর হিংস্র রামায়েচা। রামায়েচা দেখতে না পেলেও দাঁড়িয়ে আছে বীরের মতো। কান খাড়া করে শুনছে। ওময়োকাভার দু'পায়ে কোমর থেকে গোড়ালি পর্যন্ত শক্ত লাঠি বাঁধা। সে ভাবেই তাক করে রেখেছে তির। টাটার বাহুতে জ্যাসির ভেষজ ওষুধের গাঢ় প্রলেপ। যন্ত্রণাটা অনেকটাই কমে গিয়েছে।

অন্য প্রান্তে গোটা বিশেক গুন্ডা। প্রত্যেকের হাতে রাইফেল। সামনে জোনাটাস আর ড্যানিয়েল। জোনাটাসের হাতে জাগুয়ার মারার ব্লেসার রাইফেল। আর ড্যানিয়েল নিয়েছে একটা লি এনফিল্ড ডবল ব্যারেল রাইফেল। মাঝখানটা থমথমে। এমনকি জঙ্গলের পশুপাখিও যেন বিপদের আঁচটা বুঝে গিয়েছে। আর সহ্য হয়নি ওময়োকাভাদের।

“সহ্যের একটা সীমা থাকে। এ ভাবে সহ্য করতে থাকলে দলটাই না এক দিন নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়! ওকে থামাতেই হবে,” গুলির যন্ত্রণায় কাতরানো টাটাকে দেখে কয়েক বছর আগে কাটুর বলা কথাগুলোই বলেছিল ওময়োকাভা।

টাটা, “নোরাইরোহারাকে ফিরতে দাও,” বললেও কানে নেয়নি। আরেন্ডুকারেন্ডা থেকে ফিরে আসা খুব একটা সোজা ব্যাপার নয়। “অন্তত ভয়টা তো দেখিয়ে আসি,” বলে দলের সকলকে নিয়ে চলে এসেছে। সকল বলতে শিকারি, মহিলা, বাচ্চা, বুড়ো সব মিলিয়ে প্রায় পঞ্চান্ন জন। জোনাটাসের দল গুলি ছুড়লে ওময়োকাভাদের শেষ করা কয়েক মুহূর্তের ব্যাপার। কিন্তু গুলি ছুড়ল না জোনাটাস। জোনাটাস বুদ্ধিমান মানুষ। নোরাইরোহারাদের প্রাণশক্তি ও জানে। কাটুর মৃত্যুটা ও নিজের চোখে দেখেছে। মরতে মরতেও জোনাটাসকে মারতে ওদের অসুবিধে হবে না। তাই ইশারা করল বন্দুক নামাতে। ভেবেছিল, বন্দুক নামালে ওরাও ধনুক নামাবে। আর সেই সুযোগেই শেষ করে দেবে ওদের। কিন্তু জোনাটাসকে চিনতে ওদের বাকি নেই। ধনুক নামাল না কেউ। রাগে ফুঁসছিল জোনাটাস। চিৎকার করে বলল, “ধনুক নামাও। কথা আছে তোমাদের সঙ্গে।”

যদিও পাত্তা দিল না ওময়োকাভা। ধনুক উঁচিয়েই বলল, “তোমার সঙ্গে কোনও কথা নেই। জঙ্গলের ক্ষতি আমরা করতে দেব না। এখনই এই জায়গা ছেড়ে পালাও।”

অবাক হয়ে গেল জোনাটাস। এত সাহস পায় কোত্থেকে! ভয় দেখাতে তাই রাইফেলের সাইলেন্সার খুলে শূন্যে গুলি চালাল। গুলির আওয়াজে কেমন যেন অশান্ত হয়ে গেল জায়গাটা। ডানা ঝাপটে উড়ে গেল এক ঝাঁক পাখি। জলে ছপাৎ করে আওয়াজ তুলে পাল্টি খেল কিছু ব্ল্যাক কেইমেন। দূরে ডেকে উঠল বাঁদর। ওময়োকাভার ভয় পাওয়ারই কথা। ভয় পেয়েওছিল। তবে ভয়টা ওর নিজের জন্য নয়। ভয়টা ছিল দল শেষ হয়ে যাওয়ার। জঙ্গলের ক্ষতির। কী করবে, বুঝে উঠতে পারছিল না। মানুষ হয়ে শেষ পর্যন্ত মানুষ মারতে হবে?

আর তখনই রামায়েচা গর্জে উঠল, “কেউ নড়বি না। নড়লেই এরা পেয়ে বসবে। যুদ্ধের নিয়ম এরা মানে না। শেষ করে দেবে।”

রামায়েচার গর্জনটা শুনতে পেল জোনাটাস। আর ধৈর্য ধরছিল না। সভ্য মানুষের ধৈর্য বড় কম। গুলি করতে দেরি করেনি তাই। গুলিটা পায়ে লাগতেই বসে পড়ল রামায়েচা। সকলের তির ধনুকের ছিলার টানে তটস্থ। রামায়েচা দলের সেরা শিকারিদের এক জন। চোখ গেলেও মনটা মরেনি। পিছনের দিকে তাকিয়ে বলল, “কেউ নড়বি না। শাস্তি জোনাটাস পাবেই। আমি না বলা পর্যন্ত কেউ তির ছুড়বি না।”

তার পর তির ধনুক হাতেই এগিয়ে গেল সামনে। টাটা আটকাতে গেলেও পারল না। জোনাটাস অপরাধ করলেও ওকে হাতেনাতে এখনও পর্যন্ত কেউ ধরতে পারেনি। রামায়েচার মাথায় সেই ফন্দিই। কিন্তু জোনাটাসও ধুরন্ধর। তিরের ফলায় লাগানো বিষের কথা ও জানে। তাই আর গুলি ছুড়ল না। স্থিতধী হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কিছুটা এগিয়ে তির উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল রামায়েচাও। শব্দ চাই ওর। শব্দ আসছিল না কানে। কোন দিকে তির ছুড়বে? অগত্যা জোনাটাসকে ওস্কাতে শূন্যে ছুড়ল তির। আর মুহূর্তের মধ্যে গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে গেল ওর শরীর। ধপ করে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল রামায়েচা। মাথাটা তখনও উপরের দিকে। অন্ধ হলেও হয়তো আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখছিল সেই ধনুক-হাতের যোদ্ধাকে। ওময়োকাভা আর দেরি করেনি। হামলা বলতেই তির ছুড়তে যাচ্ছিল সকলে। কিন্তু তার আগেই কোত্থেকে একটা তির ঝাঁপিয়ে পড়ল জোনাটাসের সামনে। ঠিক তির নয়। একটা ডাল। দূর থেকে একটা ভাঙা ডাল ছিটকে এসে পড়ল। ডালটা ঋজু নয়, মুখটা ফলার মতো সুচালোও নয়। হাসতে হাসতে ডালটা হাতে নিয়ে আকাশের দিকে তুলে ধরল জোনাটাস। বিদ্রুপের হাসি হেসে বলল, “এই তোমাদের তির?”

ডালটায় আঠার মতো কী যেন। আঙুলে নিয়ে দেখল জোনাটাস। আর দেখতে দেখতেই হাতটা অসাড়। মুহূর্তের মধ্যে যেন গাছের বাকল হয়ে গেল। ট্রিম্যান সিনড্রোম রোগটার ব্যাপারে জানে জোনাটাস। খুব বিরল একটা জিনগত রোগ। কিন্তু এই আঠা ছুঁতেই এ রকমটা হল কী করে? ভাবনার মাঝেই দূরে সরতে শুরু করেছে আশপাশের লোকেরা। এমনকি সর্ব ক্ষণের সঙ্গী ড্যানিয়েলও। স্বার্থপর সব। জোনাটাসের হাত, মুখ তত ক্ষণে গাছের বাকল। ভয়ে অসাড় হয়ে গেল পা। ধপ করে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল মাটিতে। এক প্রান্তে রামায়েচা আর অন্য প্রান্তে জোনাটাস। তবে জোনাটাসের মুখটা নীচের দিকে। বীভৎস-বিকৃত দুটো দেহ রামায়েচা আকাশের দিকে তাকিয়ে তখনও কী দেখছে। দূর থেকে ভেসে আসছে নোরাইরোহারার চিৎকার। বলছে, “বাবা, আমি পেরেছি। জঙ্গলটাকে আমি শেষ হতে দিইনি। নিয়ম মেনেছি আমি।”

চিৎকারটা কানে গেল রামায়েচার। হাসল ও। হাসলে ওকে বীভৎস দেখায়, কিন্তু তখন ওর হাসিতে স্বস্তি। স্বস্তি তখন সকলের চোখে-মুখে। এমনকি টাটারও। আফসোস শুধু একটাই। কাটু, আমারু বা কেরেচারা এ দিন দেখতে পেল না। কিছু পেতে গেলে কিছু তো হারাতেই হয়। কিন্তু এ কী পাওয়া? এ তো অধিকার। বাঁচার অধিকার। ভাবতে ভাবতেই জায়গাটা খালি হয়ে গেল। পড়ে রইল শুধু কাঠ হয়ে যাওয়া একটা শরীর। আধুনিক সভ্যতার সঙ্গে প্রকৃতির পূজারিদের লড়াইয়ের প্রতীক। আজও পড়েই আছে। ভয়ে কেউ ছোঁয়নি শরীরটাকে। সেই রাত্রেই ওময়োকাভা দলের ভার তুলে দিয়েছিল নোরাইরোহারার হাতে। তবে ওই অদ্ভুত পাতাওয়ালা গাছের ব্যাপারে আর কেউ কিছু জিজ্ঞেস করেনি। জিজ্ঞেস করেছিল শুধু ওয়াঙ্গিরু। রাতে ওয়াঙ্গিরুকে স্বপ্নে দেখেছিল নোরাইরোহারা। হ্যামকে শুয়ে শুয়ে ঘুমোনোর চেষ্টা করছে নোরাইরোহারা আর বার বার পায়ের তলায় সুড়সুড়ি দিয়ে বিরক্ত করছে ওয়াঙ্গিরু। বিরক্ত হয়ে উঠে বসলেই মুখটাকে ডিম্বাকার করে হেসে জিজ্ঞেস করছে, “কী কেমন লাগছে?”

তবে নোরাইরোহারা উত্তর দেয়নি।

উত্তর দিচ্ছিল ওয়াঙ্গিরু নিজেই। হেসে বলছিল, “আমার তো দারুণ লাগছে।”


উচ্চারণের সুবিধের জন্য কিছু স্থানীয় শব্দের বাংলা বানানের পরিবর্তন করা হয়েছে।

অধ্যায় ১৯ / ১৯
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%