ধ্রুব মুখোপাধ্যায়
ভেলা ছাড়া আর গতি নেই। পিঠে ইংরেজি এক্সের মতো করে বাঁধা দুটো রণপা, মাথায় পাখির পালক বসানো ফেট্টি, কাঁধের এক পাশ থেকে ঝুলছে লম্বাটে ইরিপারা, অন্য পাশে হরিণের চামড়ার থলে। হাতে শক্ত করে তাকওয়ারাটা ধরে নদী পারে দাঁড়িয়েছিল নোরাইরোহারা। আমাজ়ন পৃথিবীর সব চেয়ে বেশি জল বহন করা নদী। এত জলের জন্যই দু'পাশের মাটি নরম। ভীষণ নরম। উপরে ব্রিজ নেই। আধুনিক সভ্যতার চোখধাঁধানো পরিকাঠামোতেও বানানো যায়নি। ও পারে যাবে কী ভাবে!
ধৈর্য ধরছিল না নোরাইরোহারার। সাঁতার কাটতে অসুবিধে নেই, অসুবিধে নিজের জীবন নিয়ে। তবুও মনের জোরে থলে আর তাকওয়ারাটাকে হাতে ধরেই জলে ঝাঁপ দিয়েছিল। বেশ স্বচ্ছ জল। কিছুটা এগোতেই জলের উপরে মাথা তুলে চোখওয়ালা কতগুলো পাথরখণ্ড ভেসে উঠেছিল। নোরাইরোহারা চটপট উঠে এসেছিল। তীরে এসে তরী ডোবানোর কোনও মানে হয় না। অগত্যা আশপাশ থেকে কিছু হালকা গাছের গুঁড়ি আর শক্ত শিকড়ের দড়ি দিয়ে ভেলা বানিয়েছিল। সময় লাগছিল যেতে।

একটা অ্যানিবা রোজ়উড গাছের ডাল দিয়ে জলে ভাসমান ভেলাটাকে আর কত জোরেই বা টানা যায়! অ্যানিবা রোজ়উড গাছের ডাল বেশ শক্ত। বেশ সুন্দর গন্ধ। কিন্তু তাই বলে যে দাঁড় হিসাবে বেশি কাজে আসবে তা তো নয়! তা ছাড়া ব্ল্যাক কেইমেনের জায়গাটা। উপরে মেঘ জমতে শুরু করেছে। আকাশ কালো করে বৃষ্টি নামল তেড়েফুঁড়ে। রণপাটা কাজে লাগানোর চেষ্টা করেও কোনও লাভ হয়নি। কিছুটা এগোতেই নদীর গভীরতা অনেক। মাথায় কিছুই আসছিল না। থলে থেকে জিকামা লতা, ফ্যাবেসি গাছের শিকড় থেকে তৈরি রোটেনান বিষ কিছুটা নদীতে ছড়িয়েও লাভ হল না। এত বড় নদী, তার উপর বহমান জল। বিষের অস্তিত্ব যেন মুহূর্তে মিলিয়ে যায়। তা ছাড়া মাছ মারার বিষে কী আর কুমির মরে! তা হলে কি ফিরে যাবে?
—“নুম্মোকে ডাকো। প্রার্থনা করো। ঠিক রাস্তা পেয়ে যাবে,” কানের কাছে ফিসফিস করে কে যেন বলল। ঠিক যেন ওর বাবার মতো। ছেলেবেলায় জঙ্গল চেনাতে মাঝেমধ্যেই কাটু জঙ্গলে নিয়ে যেত ওকে। তার পর টুক করে লুকিয়ে পড়ত আড়ালে। ইচ্ছে করেই। পথ চিনতে না পেরে নোরাইরোহারার মুখটা তখন দেখার মতো হত। সেই সময়েই সামনে এসে কাটু ঠিক এই কথাগুলোই বলত। আজও যেন বলল। নদীপারে একটা ভেলার উপরে দাঁড়িয়ে নোরাইরোহারা। ভিতরটা আনাচান করছিল।
তারই মাঝে বেশ জোর গলাতেই “নুম্মো,” বলে চেঁচিয়ে উঠল ও। এক বার নয়, বেশ কয়েক বার। কাজও হল জবরদস্ত। হুট করে ভেলাটা নড়ল। কে যেন পিছন থেকে ঠেলল ভেলাটাকে। বৃষ্টির জল আর জলের সঙ্গে দুনিয়ার অন্য প্রান্ত থেকে বয়ে আনা হাওয়া কাটিয়ে দুরন্ত গতিতে জলের উপরে প্রায় ছুটছিল ওর ভেলা। পিছনে একটা গোলাপি ডলফিন। ঠিক যেন মিচি।
সে বারে বৃষ্টি হয়েছিল অবিশ্রান্ত। জঙ্গলের কাদামাটি ধুয়ে মুছে মিশে গিয়েছিল নদীতে। গোলাপি ডলফিন বা বোটো, স্বচ্ছ এবং মিষ্টি জলের প্রাণী বাঁচতে পারে? মরতে বসেছিল ওরা। সেই সময়েই আমারু নদী থেকে তুলে এনেছিল অনেককে। এনে রেখেছিল সেই ঝর্নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পাথরে ঘেরা জলাশয়ে। প্রাণে বেঁচে গিয়েছিল। নোরাইরোহারাও হাত লাগিয়েছিল মায়ের সঙ্গে। তুলে এনেছিল ছোট ছোট বাচ্চা গোলাপি ডলফিন। এক জনের সঙ্গে ওর সখ্যও হয়েছিল। তারই নাম দিয়েছিল মিচি। মিচি মানে ছোট্ট। হয়তো সেই মিচিই আজ কৃতজ্ঞতা জানাতে এসেছে।
ভেলা থেকেই ‘মিচি' বলে ডাকল নোরাইরোহারা। ওদের কান প্রখর। কিন্তু ডাকে সাড়া দিল না। নোরাইরোহারাকে পৌঁছে দেওয়াটা যেন ওর দায়িত্ব। আর সত্যি বলতে দায়িত্বই। আরেন্ডুকারেন্ডা যেতে ভেলা বানিয়ে এ ভাবেই ডাকতে হয় ওদের। নোরাইরোহারা জানত না। জানত কাটু।
এ ভাবেই নদী পেরিয়ে দ্বীপটা যখন বেশ কাছে, নদীর গভীরতাও কমে এসেছে, সেই সময় ভেলাটা থেমে গেল। হুস করে কোথায় যেন হারিয়ে গেল ডলফিন। সামনেই কিছুটা দূরে, পারের কাছাকাছি একটা ব্ল্যাক কেইমেন। থরথর করে কাপছে। মুখটা হাঁ করে আর বন্ধ করতে পারছে না। আরও কিছুটা দূরে কতগুলো আরিরানহা। মানে জলজ জাগুয়ার। মাছখেকো দৈত্যাকার ভোঁদড়গুলো ভীষণ হিংস্র হয় বলেই এমন নাম। নোরাইরোহারা গুনল। প্রায় সাতটা ভোঁদড় কাঠ হয়ে পড়ে রয়েছে আরেন্ডুকারেন্ডার পারের দিকে। সপরিবারে হয়তো শিকারে বেরিয়েছিল!
জলে পা ছোঁয়াল নোরাইরোহারা। আর ছুঁতেই সারা শরীর চমকে উঠল। বিদ্যুৎ! স্বছ জলের নীচে অনেকটা লম্বাটে মাগুরের মতো মাছ। বৈদ্যুতিক ইল। মুখগুলো ভয়ঙ্কর। সামনে কিলবিল করছে। রণপাটা যেন এই জন্যই। তাড়াহুড়োতেই মানুষ ভুল করে। দ্রুত রণপায়ে ভর দিয়ে এগিয়ে যেতেই ভেসে যাচ্ছিল ওর ভেলাটা। পদে পদে বিপদ। ওময়োকাভা বলেছিল, “ধৈর্য যেন ফিরে আসা পর্যন্ত বজায় থাকে। মনে রেখো, ওই রাস্তাতেই তোমাকে ফিরতে হবে।”
ধৈর্য ধরল নোরাইরোহারা। হাতে বানানো ভেলাটার গাছের গুঁড়িগুলোর মাঝে বিস্তর ফাঁক। সেই ফাঁক দিয়েই গলিয়ে গোলাপি রঙের দাঁড়টাকে গেঁথে দিল নদীর তলে। রণপায়ে ভর দিয়ে দেখল ভেলাটা আছে সেই জায়গায়। আর কিছু বাকি নেই। এ বারে যেতেই পারে। গেলও। ধীরে ধীরে নদীর গভীরতা কমতে কমতে মিলিয়ে গিয়েছে আরেন্ডুকারেন্ডায়। তবে বোঝা যায় না। পারে প্রচুর গাছের ডালপালা। জঙ্গল ধুয়ে বয়ে আনা ডালপালা যেন ভিড় করেছে এই পারেই। ফাঁকে ফাকে নানান জীবজন্তু, সাপ। আরও কিছুটা এগোলে কিছু বিষাক্ত ব্যাঙও।
তবে ওরা কেউ থামাতে পারেনি ওকে। দূর থেকে ছোট মনে হলেও দ্বীপটা বেশ বড়। শুধু ঝোপঝাড় নয়, কিছু বড় গাছও আছে। নীচটা পাথরের। তবে নদী মাঝে মধ্যেই পলিমাটি তুলে জড়ো করেছে সেই পাথরের উপরে। গজিয়ে উঠেছে গাছপালা, ঝোপঝাড়। বেশ খানিকটা এগোতেই একটা কামু-কামু গাছ। অনেক ফল। সেখান থেকেই লাইন করে কতগুলো তির গাঁথা। অনেক দূর পর্যন্ত চলে গিয়েছে তিরের সারি। কিছু তির ভেঙে-পচেও গিয়েছে। যারা এসেছে, তারা গেঁথে রেখেছে নিজেদের উপস্থিতির প্রমাণ। দাঁড়াল নোরাইরোহারা। রণপাটা রেখে, গাছ থেকে লালচে বেগুনি চেরির মতো ফল খেল বেশ কিছু।
তার পর পা বাড়াল সেই তিরের সারি ধরে। সে অনেক তির। একটা জায়গায় গিয়ে তিরের সারিটা ঘুরে গিয়েছে বৃত্তাকারে। একেবারে শেষের তিরটায় হাত বোলাল ও। বৃষ্টিটা ধরেছে। তবুও জলের ফোঁটা তিরের গা বেয়ে নেমে যাচ্ছিল। জলে ভেজা হাতটা মুখে ঘষল ও। আকাশ তখনও কালো। তবে রাত নয়। তবুও আকাশে যেন ধনুক-হাতে এক যোদ্ধা। নোরাইরোহারা আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেল তাঁকে। আপন খেয়ালই বলল, “বাবা!”
এক রাশ শূন্যতা নিয়ে গেঁথে দিল ওর তূণীর থেকে বের করা একটা তির। তাকাল সামনের দিকে। সামনেটা পাথরের। গাছপালা নেই। এই অংশে নদী পলিমাটি জড়ো করতে পারেনি। কিছু ঘাস আর লতানো গাছ চুপচাপ উঠে এসেছে উপরে। কালো কালো থালার মতো পাথর পাশাপাশি রেখে লম্বা তিনটে লাইন। সব নোরাইরোহারার পূর্বপুরুষদের। কত আবিষ্কার, কত সময়কাল, কত ভবিষ্যদ্বাণী! স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল ও। বেশ লাগছিল। শূন্যতা যেন মিলিয়ে গেল। পৃথিবীতে ও একা নয়। হাজার হাজার বছর ধরে ওর জন্যই কত কিছু সাজিয়ে রেখেছে ওর পূর্বপুরুষ। দৌড়ে গিয়ে দেখতে ইচ্ছে হচ্ছিল। কিন্তু সামনে তখন কতগুলো বিরাট সবুজ সাপ। জায়গাটাকে ঘিরে রয়েছে কতগুলো সবুজ অ্যানাকোন্ডা। ফুট বিশেক লম্বা তো হবেই। সদ্য খাবার খেয়ে ঝিমোচ্ছে। এই অবস্থায় ওরা হামলা করে না। খিদে আর বিপদ, এই দুটোই ওদের শত্রু। নোরাইরোহারা এ সব ভালই জানে।
তবে সময় থাকতে কাজ সেরে ফেলতে হবে। অ্যানাকন্ডাগুলো যেন সময় দেখানো ঘড়ি। পেট খালি হলেই শেষ! সেই সঙ্গে নীচটা সাবানের মতো পিচ্ছিল, স্যাঁতসেঁতে। সাবধানে পা ফেলে এগিয়ে একটা চাকতি তুলল ও। এই সারিটা ভবিষ্যদ্বাণীর। যে-কোনও চাকতি তুললেই তাতে দেখা যায় ঘন জঙ্গল। আর সেই জঙ্গলে বিভিন্ন পশুপাখির শেষ মৃত ছবি। কিন্তু শেষেরটা তুলতেই ভিতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। চাকতিটাতে শুধুই উঁচু উঁচু অট্টালিকা, রাস্তাঘাট। জঙ্গল কই? তা হলে কী সব শেষ হয়ে যাবে!
দ্রুত পিছনের চাকতি তুলল ও। পিছনে জঙ্গল আছে তবে জঙ্গলে শুধু দুটো ধরনেরই গাছ। রাবার আর সয়াবিন। বেশ বুঝল নোরাইরোহারা। বুঝল যার শুরু আছে, তার শেষও আছে। চোখ গেল পাশের সারিতে। এই সারিতে নানান গাছ গাছের পাতার উপকারিতা, ওদের আবিষ্কার। সেগুলোতেই চোখ বোলাল। কিন্তু জোনাটাসকে শাস্তি দেওয়ার মতো কিছু চোখে পড়ল না।
তবে একটা চাকতি যেন কিছুটা অগোছালো। কেউ যেন তুলে দেখেছে। চাকতিটায় একটা মানুষ-সমান গাছ আর সেই গাছটার গায়ে কিছুটা ক্ষত। কী যেন ঝরছে। আর সেই ক্ষতটাকেই ছুঁয়ে রয়েছে একটা মানুষ। মানুষটার হাতটাও গাছ হয়ে গিয়েছে। গাছটার অনেক পাতা। তবে একটা পাতা বেশ বড় করে আঁকা। পাতাটা অদ্ভুত। পান পাতার মতো দেখতে। পাতাটার মধ্যশিরা থেকে শিরাগুলো উপরের দিকে ওঠেনি। উল্টে উপর থেকে নীচের দিকে নেমে মিলে গিয়েছে বৃন্তে। সেই সঙ্গে পত্রশীর্ষে একটা গোল সবুজ অংশ। এ রকম পাতা জন্মেও দেখেনি নোরাইরোহারা।
ছবিটাকে আরও ভাল করে দেখল। আর দেখতেই ভিতরটা কেমন যেন নেচে উঠল। জোনাটাসকে থামানোর অস্ত্র! কিন্তু চাকতিটার নীচেই তর্জনী-ঠেকানো দুটো ঠোঁট। কাউকে বলা যাবে না। চুপচাপ প্রথম সারির একেবারে শুরুর, জঙ্গলে আঁকা চাকতিটাকে সরিয়ে সামনে রাখতে যাচ্ছিল। জঙ্গলটাকে শেষ ও কিছুতেই হতে দেবে না। ও তো যোদ্ধা। আর তখনই পা-টা পিছলে একেবারে বিপদ৷ বিপদ বুঝলে ওরা আর স্থির থাকে না। কোনও রকমে সঙ্গে করে আনা চাকতিটাকে রেখে দৌড়। কামু-কামু গাছের নীচে রাখা রণপাটা নিয়ে প্রাণপণে ছুটল। ছুটতে ছুটতেই প্রাণ খুলে ডাকল, “নুম্মো...নুম্মো।”
গোলাপি ডলফিনটা যেন অপেক্ষা করছিল। কালো আকাশের নীচে নদীটাকে চিরে দিল ভেলা। কিন্তু জঙ্গল-আঁকা পিছনের চাকতিটাকে কী ঠিকঠাক সমানে রাখতে পারল? এমনকি সঙ্গে আনা চাকতিটাকেও দেখা হল না। তবে ও জানত। জানত যে, ওই চাকতিটাতেই আঁকা আছে আগুনে জ্বলতে থাকা ওদের আগেকার ডেরা।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন