পঞ্চম অধ্যায়

ধ্রুব মুখোপাধ্যায়

ঘন সবুজ জঙ্গলের মাঝে এক খণ্ড শুকনো ফাঁকা জায়গা। অনেকটা সবুজ ক্রিকেট মাঠের মাঝে আলোয় ঝকঝক করতে থাকা পিচের মতো। তবে পিচটা লম্বাটে নয়, গোলাকার। বেশ বড়। চার পাশে বেতের বেড়া আর তার গায়ে কাঁটাওয়ালা ক্যাকটাসের ঘন ঝোপ। হিংস্র জন্তু-জানোয়ারের থেকে বাঁচতেই এই ব্যবস্থা। ভিতরে প্রায় গোটা বিশেক ঝুপড়ি। শুকনো ডালের কাঠামোর উপরে গাছের পাতায় ঢাকা তাঁবুর মতো ঝুপড়ি।

ঝুপড়িগুলো জায়গাটার চার পাশে। আর মাঝে একটা চার পাশ খোলা ছাউনি। সেই ছাউনিতেই কাঠের গুঁড়ির উপরে বসেছিল রামায়েচা। ছাউনির উপরের দিকে বেঁধে রাখা আছে কয়েক আঁটি তির আর অন্য পাশে গোলাপি ল্যাপচা গাছের একটা কাণ্ড। এই ল্যাপাচা গাছকেই ওরা ‘বো ট্রি’ বলে। মানে ধনুক গাছ। খুব সুন্দর ধনুক তৈরি হয় এই কাঠে। চওড়া ছাতির রামায়েচার উচ্চতা প্রায় সাত ফুট। সেই সঙ্গে আজানুলম্বিত হাত। এক কালে দলের লোকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শিকার করত। গোষ্ঠীর সেরা শিকারিদের এক জন।

কিন্তু সে বারে রামায়েচার সারা শরীর আগুনে পুড়ে... মাথা থেকে পা পর্যন্ত ওর ত্বক পুড়ে জর্জর। চুল তো নেই-ই, চোখ দুটোও নেই। ভয়ঙ্কর দেখতে। বসে বসে খেজুরের পাতায় তৈরি বিশালাকায় ঝুরি থেকে কাঁচা পাতা নিয়ে একটা মুখখোলা ছোট পাত্রে ভরে পাথর দিয়ে থেঁতলাচ্ছিল। থেঁতলানো শেষ হলেই পাতার রস ঢেলে দিচ্ছিল একটা বড় মাটির হাঁড়িতে। হাঁড়িটা দড়ি দিয়ে ঝুলে রয়েছে ছাউনির একেবারে উপর থেকে। আর নীচে জ্বলছে কিছু শুকনো কাঠ।

মাঝে মধ্যেই হাঁড়িতে ফুটন্ত রসের কাছে নাক এগিয়ে গন্ধ শুঁকছিল। আলতো করে আঙুলে তুলে ঘনত্ব তো বটেই, এমনকি জিভে ঠেকিয়েও দেখছিল। বিষ তৈরি করছিল ও। শিকারের বিষ। এ ভাবেই পাতার রস ফুটে চিটচিটে ঘন কালো হয়ে গেলে সে সবই তিরের ফলায় লাগায় ওরা। বিভিন্ন শিকারের বিভিন্ন বিষ সেই সময়েই ছাউনিতে ঢুকল নোরাইরোহারা। কাঁধের ধনুকটাকে এক পাশে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে ফুঁ-বন্দুকটাকে গেঁথে দিল মাটিতে। রামায়েচার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, “এ বারে মানুষ মারার বিষ বানাতে হবে কাকা। এই বিষে আমার কাজ হবে না।”

রামায়েচা গুরুত্ব দিল না। মৃদু হাসল মাত্র। হাসলে রামায়েচাকে বড্ড অসহায় লাগে। নিয়তির ভয়ঙ্কর পরিহাসে ওর ওই বিশাল শরীরে হাসিটা সত্যিই বেমানান। রামায়েচা আপন খেয়ালেই বলল, ““ইরাপারা' শিকারির জীবন। ওটাকে ও ভাবে ছুঁড়ে ফেলাটা ঠিক নয়।”

ইরাপারা মানে এক প্রকার ধনুক। যদিও সে সব কানে গেল না নোরাইরোহারার। অন্য পাশে তখন কতগুলো ছড়ানো-ছিটানো তির। পিছনে দ্রুত বেগে হাওয়া কাটিয়ে ছুটে যাওয়ার জন্য পালক আর সামনে আঁকশির মতো সরু তীক্ষ্ণ বাঁশের ফলা। সেই ফলাতেই এক বার আঙুল চেপে দেখল নোরাইরোহারা। উইআওয়া তির। এগুলো বাঁদর, হরিণ, অ্যাগাউটিস এই ধরনের কিছু বড় জন্তু শিকারের জন্য। এ সবে ওর কাজ হবে না। অগত্যা হাত বাড়াল ছাউনির উপরে। একটা তাকওয়ারা পাড়ল। এটাও এক ধরনের তির। ফলাটা সরু এবং লম্বাটে তরোয়ালের মতো। বন্য শূকর, ব্রাজিলিয়ান হিংস্র টাপির, জাগুয়ার-এ সব মারতেই এর ব্যবহার। শিকার নয়, আত্মরক্ষার জন্য। বেশ শক্তপোক্ত। কিন্তু এতে কি মানুষ মরবে!

—“কপালে শিকার জোটেনি মনে হচ্ছে! প্রথম দিনেই ফক্কা?” ও পাশ থেকে রামায়েচা রসিকতা করে বললে ভিতরটা আরও জ্বলে গেল।

দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “শিকার জোটেনি নয়, শিকার করতে পারিনি।”

—“সে কী?” বলে রামায়েচা কিছুটা বিস্ময় দেখালেও গ্রাহ্য করল না নোরাইরোহারা। তাকওয়ারাটাকে হাতে নিয়েই রামায়েচার কানের কাছে গিয়ে বলল, “শিকার আমি জুটিয়ে নিয়েছি কাকা। জোনাটাস এসেছে।”

চমকে উঠল রামায়েচা বলল, “জোনাটাস! এখানেও এসেছে?” রামায়েচা বলতে বলতেই আঙুলে অনেকটা ফুটন্ত বিষ তুলে মিশিয়ে নিল নিজের জিভে। এই বিষে ওর কিছুই হয় না। সামান্য মাথা ঝিমঝিম করে। রাগ, ঘেন্না, লোভ সব উড়ে যায়। এ ভাবেই নিজেকে কিছুটা শান্ত করে রামায়েচা বলল, “ওকে তো আমরা মারতে পারি না। ও তো আমাদের শিকার নয়।”

—“কিন্তু আত্মরক্ষার জন্য...”

নোরাইরোহারা বললে ওকে আবারও থামাল রামায়েচা। বুঝিয়ে বলল, “ও তো আমাদের কোনও ক্ষতি করেনি।”

—“তুমি বলছ এটা?” বেশ অবাক হয়ে নোরাইরোহারা আরও বলল, “কিন্তু জঙ্গলের তো করেছে। গাছ, পশুপাখি কত কিছু মেরেছে। জঙ্গলের ক্ষতি মানে তো আমাদের ক্ষতি।”

—“না। জঙ্গল উপরে, আমরা নীচে। জঙ্গল আমাদের মা। আমরা তার সন্তান। জঙ্গলের রক্ষণাবেক্ষণ আমাদের কাজ ঠিকই তাই বলে কাউকে আমরা মেরে ফেলতে পারি না। ও ভাবে ওকে মারা আমাদের নিয়মবিরুদ্ধ। তা ছাড়া আমরা স্বচক্ষে তো দেখিনি। মানুষটা সুবিধের নয়। ওদের অনেক রকমের অস্ত্র। যদিও অস্ত্রে ভয় লাগে না। কিন্তু ভয় হয় ওদের নির্মমতায়। নিয়মের বিরুদ্ধাচারণে...” রামায়েচা বললেও মন শান্ত হল না নোরাইরোহারার।

হাতে থাকা তাকওয়ারাটাকে ছুঁড়ে ফেলে দিল দূরে। আর ঠিক তখনই ঢুকল ওদের গোষ্ঠীর বাকি শিকারিরা। গোষ্ঠীতে বারো জন শিকারি। সপ্তাহে দু'দিন করে শিকারে যায়। ওই দু'দিনই খাবারের থালায় আমিষ। বাকি দিনে গাছের ফলমূল বা অন্য কিছু। বারো জন তিনটে দলে ভাগ হয়ে চার জন করে শিকার করে। এক জন পিঠে করে একটা মৃত বেবুন আর অন্য দল একটা শূকর নিয়ে ঢুকল। কিছু ক্ষণেই শিকার দুটোকে ধুয়ে তিরে আঘাত পাওয়া অংশটাকে আলাদা করে কেটে ফেলে দিল। এক পাশে বসে চুপচাপ দেখছিল নোরাইরোহারা। ভিতরটা আনচান করছিল। শিকারি খালি হাতে ফিরলে ওরা কিছু খায় না। এতে শিকার করার উদ্যম বাড়ে।

আজ নোরাইরোহারাও কিছু খাবে না। খাওয়ার ইচ্ছেও নেই। খাবারের দিকে তাকালই না। নিজের ঝুপড়িতে ফিরে গিয়ে গলা থেকে খুলে ফেলল পিরানহা মাছের লকেটটা। তার পর বেরিয়ে এল বাইরে। আকাশে তখনও মেঘ। দু'-চার ফোটা বৃষ্টি পড়ছে। দূরে জঙ্গল থেকে ভেসে আসছে নানান রকমের আওয়াজ। তারই মাঝে কানে এল সেই হাওলার বাঁদরের ডাক। যেন ওয়াঙ্গিরু। যেন বলতে চাইল, “জোনাটাস এসেছে। তুমি কিছু করবে না?”

—“করব। অবশ্যই করব,” বলতে বলতেই পিঠে একটা হাত। শক্ত করে কাঁধটাকে ধরে ঝাঁকিয়ে দিল দাদু। বলল, “নিয়মটাই আসল। নিয়মের বাইরে গিয়ে তো যে কেউ যা খুশি তাই করতে পারে। প্রতিশোধ নিয়ম মেনেই নিতে হবে,” আর সব শেষে বলল, “যাও। ঝর্নায় গিয়ে গা ধুয়ে এসো। আর আরাধ্য নুম্মোর সামনে কিছু ক্ষণ বোসো। মন শান্ত হবে।”

যে দিকে ঢাল, সে দিকেই গড়িয়ে যায় জল। আমাজন নদীর জলেও তার ব্যাতিক্রম নেই। তবে এই ঢালটা আমাজন নদীর মূল জলধারাকে টেনে আনতে পারেনি। নদীর জলের উপরের অংশের কিছুটা উপচে পড়ে ঢাল বয়ে আছড়ে পড়েছে একটা খাদে। সেখানেই শেষ। চার পাশে পাথর আর সেই পাথরকে জাপটে ধরেই গজিয়ে উঠেছে আকাশছোঁয়া গাছ। জায়গাটা বড্ড ভিজে ভিজে। সেই সঙ্গে ঠান্ডা। পাথরের একটা চাঙড়ের উপরে চেপে বসল নোরাইরোহারা। জলের ঢেউয়ের আছড়ে পড়ার শব্দের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে আশপাশ থেকে আসা পাখপাখালির ডাক। এরই মাঝেই আবারও সেই হাউলার বাঁদরটা যেন ডাকল। ঠিক যেন ওয়াঙ্গিরু। সেই একই কথা বলল আবারও, “তুমি কিছু করবে না?”

আত্মরক্ষার জন্য সঙ্গে করে আনা তাকওয়ারাটাকে পাশে রেখে উপরে দু'হাত তুলে হাত দুটোকে জড়ো করে নিল নোরাইরোহারা। তার পর দক্ষ সাঁতারুর মতো ঝাঁপ মেরে শরীরটাকে উপর-নীচ করতে করতে নিজেকে ডুবিয়ে নিল একেবারে জলের তলায়। খাদের তলটাও পাথরের। এখানেই ওদের কোনও এক পূর্বপুরুষ খোদাই করে রেখেছে আরাধ্য নুম্মোর প্রতিকৃতি। তলে গিয়ে হাত বুলিয়ে বুলিয়ে দেখল নোরাইরোহারা। দু'হাত উপরে তোলা ঠিক যেন একটা মানুষ। খোদাই করা অংশটা অনেকটা বড়। ঝর্নার জল উপর থেকে নীচে পড়ার সময় দু'পাশে ভাগ হয়ে গিয়েছে। মাঝখানটা দিয়ে জল পড়ে না। সেই জায়গাটা শুকনো।

ওখানে একটা অদ্ভুত গাছ। গাছটার কাণ্ডটা অদ্ভুত। কাণ্ড জড়িয়ে যেন বেশ কয়েকটা সাপ। যেন জীবন্ত কোনও সাপ গাছটাকে জড়িয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছে। তারই নীচে একটা গুহার মতো জায়গা। গুহা থেকেই স্বচ্ছ খাদের জলের তলে থাকা নুম্মোর প্রতিকৃতিটা স্পষ্ট এবং পুরোপুরি দেখা যায়। সাঁতরে সেই জায়গাটায় গেল নোরাইরোহারা। গুহাটার দু'পাশ থেকে জলধারার আছড়ে পড়ার শব্দ আর সামনে টলটলে জলের তলায় আরাধ্য নুম্মো। মনটা স্থির হয়ে গেল। চার পাশ মায়াময়। কানের কাছে কে যেন ফিসফিস করে বলল, “তুমি পারবে। জোনাটাসকে থামাতে তুমিই পারবে। নিয়ম মেনেই পারবে । ”

আর ঠিক তখনই একটা ডাক। এই গুহা থেকে জলের তলায় আরাধ্য নুম্মোর প্রতিকৃতি ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না। সেই একই ভাবে ঝাঁপ মেরে, সাঁতরে খাদের পারে এল ও। ওখানে তখন কেরেচা। কেরেচা মানে স্বপ্ন। হয়তো কোনও নতুন স্বপ্ন নিয়েই এসেছে। নোরাইরোহারাকে দেখতেই কেরেচা বলল, “ডেরায় জোনাটাস এসেছে।”

আর কোনও দিকে তাকায়নি নোরাইরোহারা। ভিজে গায়েই তাকওয়ারাটা কুড়িয়ে নিয়ে দৌড় দিল ডেরার দিকে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%