ধ্রুব মুখোপাধ্যায়
সোনালি ম্যাকাও শিকার করার কথা শুনেই রেগে গিয়েছিল নোরাইরোহারা। মুখের উপর বলেছিল, “ওরা আমাদের পোষ্য। পরিবারেরই এক জন। আমাদের শিকার নয় ওরা।”
তার পর অবশ্য সবটাই বলেছিল। জঙ্গলের পশুপাখি ওদের প্রাণ। জীবনধারণ আর জঙ্গলের রক্ষণাবেক্ষণই মূল উদ্দেশ্য। পশুপাখির ডাকও ওরা বোঝে। বিপদের সঙ্কেত থেকে প্রাণ খোলা আনন্দের আওয়াজ সমস্ত কিছু। এমনকি কেউ কেউ ডাক নকল করে ডাকতেও পারে। এক ডাকে নাকের ডগায় ডেকে আনতে পারে আমাজন নদীর পিঙ্ক ডলফিন থেকে শুরু করে সুদূর আকাশে উড়ন্ত হার্পি ইগলও। যদিও শিকারে সে সব ডাকের ব্যবহার নিষিদ্ধ। গেল বার, ঝড়ের সময় পাখিটা নীচে পড়ে গিয়েছিল। ডিম ফুটে সদ্য বেরিয়েছে তখন। এ দিকে নীচে তখন নদীর জল ঢুকে জল থইথই। আমারু পেয়েছিল ওকে। একেবারে শেষ অবস্থায়। ঘরে এনে সুস্থ করে তুলেছিল। তার পর ছেড়েও দিয়েছিল। কিন্তু পাখিটা ছাড়েনি। আমারুই ওর মা। মাঝে মধ্যেই আসে।
এ রকম আরও আছে। বন্য শূকর, রাজকীয় শকুনি কত পশুপাখি যে ওদের পোষ্য! রোজ এক বার করে আসে। তবে হাওলার বাঁদরটা সব সময়ই থাকে। ও নোরাইরোহারার বাবা কাটুর ন্যাওটা। নাম, ওয়াঙ্গিরু। মানে বন্ধু। হাওলার বাঁদর শুনে আর নিজেকে আটকে রাখতে পারেনি জোনাটাস। চোখ দুটো জ্বলে উঠেছিল। যদিও তার আগেই ভাষান্তরকারী ড্যানিয়েল বলেছিল, “একখান পাওয়া যাবে?
ড্যানিয়েলকে থামিয়েছিল জোনাটাস। বেশ মাথা খাটিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিল, “এদের রক্ষণাবেক্ষণ দরকার,” আর সব শেষে বলেছিল, “আমার চাই । এ সব পশুপাখি আমার চাই।”
—“কী করবে?” বেশ কড়া নজরে তাকিয়ে বলেছিল নোরাইরোহারা।
আপন খেয়ালে তখন সত্যিটা বলেই ফেলেছিল জোনাটাস, “শহরে নিয়ে যাব। বড় বড় পয়সাওয়ালা লোকেদের বেচব। এ সবের কত শখ ওদের। শখের দাম লাখ টাকা। বাড়িতে খাঁচায় বন্দি করে রাখবে। লোকে দেখবে। দেখে অবাক হয়ে বলবে, ‘কী সুন্দর!” এ সব জন্তু-জানোয়ারের প্রচুর দাম।”
যদিও নোরাইরোহারা সেটা বোঝেনি। ভাষান্তরকারী ড্যানিয়েল কথাগুলো বলেইনি। নোরাইরোহারাদের ভাষায় বলেছিল, “এদের রক্ষণাবেক্ষণ দরকার।”
—“কেন? কিসের রক্ষণাবেক্ষণ? ওরা তো এই জঙ্গলে বেশ আছে,” অবাক হয়ে নোরাইরোহারা বলল।
নিজেকে সংযত করে জোনাটাস বলেছিল, “পৃথিবীতে আমাজনের মতো অরণ্যের কমতি আছে? কঙ্গো, সুন্দাল্যান্ড, ইন্দোবার্মা, ওয়ালেসিয়া কত আছে। সে সব জঙ্গলেও এদের জন্য জায়গা করে দিতে হবে।”
যদিও নোরাইরোহারা বুঝতে পারেনি। আরও বোঝাতে হয়েছিল। অজুহাতের পিঠে অজুহাত দিয়ে সব শেষে বলেছিল, “পৃথিবীর কোনও কিছুই স্থায়ী নয়। এই জঙ্গলও নয়। এক দিন তো শেষ হবেই। তার সঙ্গে শেষ হয়ে যাবে এই জীবকুলও।”
ভিতরে ছ্যাঁৎ করে উঠেছিল নোরাইরোহারার। জীবজন্তু, মানুষকে শেষ হতে দেখেছে ও। তাই বলে ওর ভালবাসার এই বিশাল জঙ্গলও! থমথমে মুখে এক রাশ ভয় নিয়ে নোরাইরোহারা জিজ্ঞেস করেছিল, “তা হলে উপায়?”
_“উপায় একটাই। সংরক্ষণ,” মুহূর্তের মধ্যে বলে জোনাটাস আরও বলেছিল, “পৃথিবীর সব ক’টা জঙ্গল তো একসঙ্গে শেষ হবে না। এই সব পশুপাখিদের যদি অন্যান্য জঙ্গলে রেখে আসা যায়, তা হলে হয়তো বেঁচে যাবে এদের অস্তিত্ব আমাজ়নের মতো হৃষ্টপুষ্ট পশুপাখি অন্যান্য জঙ্গলে নেই।”
প্রস্তাবটা মন্দ লাগেনি নোরাইরোহারার, “কী করতে হবে?” প্রশ্নটা আপন খেয়ালে করেই ফেলেছিল।
জোনাটাসের হাতে তখন আকাশের চাঁদ। হাত-পা ছড়িয়ে বেশ গম্ভীর হয়ে বলেছিল, “এই জঙ্গলের সমস্ত রকমের পশুপাখির কয়েকটা করে আমার চাই। শুরুতে পাখি আর বাঁদর নিয়ে যাব। পরে বাকিদের।”
নোরাইরোহারার মনে তখন প্রশ্নের ঘাড়ে প্রশ্ন। কাজটাকে ঠিক বলে মনে হলেও ভুল হচ্ছে কি না বুঝতে পারছিল না, “শুরুতেই পাখি আর বাঁদর কেন?” প্রশ্নটা করেই ফেলেছিল।
তবে জোনাটাস উত্তর দিতে পারেনি। কিছু একটা ভেবে ড্যানিয়েলই বলে দিয়েছিল, “পাখি আর বাঁদর জঙ্গলের উপরের দিকে থাকে। তাই অন্যান্য হিংস্র জন্তু-জানোয়ারের থেকে বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি,” বলেছিল, “তুমি কিছু লাল টিয়া, সোনালি ম্যাকাও আপাতত ধরে দাও।”
উঁচু উঁচু আকাশছোঁয়া গাছে চড়া নোরাইরোহারার কাছে জলভাত। জঙ্গলের গাছপালা, রাস্তাঘাট, জলস্রোত, পশুপাখির ডেরা সমস্ত কিছু ওর মনের মানচিত্রে একেবারে খোদাই করা। দেরি করেনি। পরের দিনই এক জোড়া লাল টিয়া আর একটা সোনালি ম্যাকাও গাছ থেকে ধরে হাজির হয়ে গিয়েছিল। মাথায় মুখ ঠেকিয়ে আদর করে ওদের তুলে দিয়েছিল জোনাটাসের হাতে। ড্যানিয়েল শুধু ভাষান্তরকারীই নয়, জোনাটাসের ছায়াসঙ্গীও। পাশেই ছিল। ভিতরটা ধুকপুক করছিল নোরাইরোহারার। কোনও ভুল করছে না তো!
প্রাণভরে সে দিন আদিপুরুষ, আরাধ্য নুম্মোকে স্মরণ করে বলেছিল, “ভুল হলে শুধরে দাও প্রভু।” প্রার্থনা জানিয়েছিল লুপুনা গাছকেও। জীবগুলো যেন সুরক্ষিত থাকে। খাদ্য-খাদক সম্পর্কভুক্ত শিকার ছাড়া জীবহত্যা মহাপাপ ।
যদিও জোনাটাস সে সব কানে নেয়নি। হেসে উড়িয়ে বলেছিল, “এই তিনচারটেয় কী হবে? আরও চাই।”
বেশ রাগ হয়েছিল নোরাইরোহারার। সভ্য মানুষ যে খেতে পেলে শুতে চায়, সেটা ও জানত না। রাগ দেখিয়েই বলেছিল, “আরও নিয়ে কী করবে?”
জোনাটাস চালাক তো বটেই, সঙ্গে ধুরন্ধরও। মাথা খাটিয়ে শান্ত ভাবেই বুঝিয়েছিল, “তোমাকে যদি শুধু তোমার মায়ের সঙ্গে একটা আলাদা জঙ্গলে ছেড়ে দেওয়া হয়, ভাল লাগবে? দাদু, বাবা, দলের অন্যান্য বন্ধুদের ছেড়ে থাকতে পারবে তুমি?”
পারত না নোরাইরোহারা। বিশেষত এই জঙ্গল ছেড়ে থাকা তো একেবারেই অসম্ভব। বলেছিল, “সেটাই বলছি। এদের অন্য জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে কী লাভ। এখানেই থাক না।”
—“মহৎ কাজে কষ্ট থাকে। এদের আমরা সংরক্ষণ করব, যাতে পৃথিবী থেকে লোপ না পায়। যাতে হারিয়ে না যায়,” মুহূর্তের মধ্যে ড্যানিয়েল বলেছিল।
সেই সঙ্গে জোনাটাসের বলা কথার অনুবাদ করে বলেছিল, “তুমি কমপক্ষে কুড়িটা করে এক প্রজাতির পাখি এনে দাও। যাতে নতুন জায়গায় ওরা একা না হয়ে পড়ে।”
দোমনা হলেও কথাটা মেনে নিয়েছিল নোরাইরোহারা। কুড়িটা লাল টিয়া আর ম্যাকাও ধরা ওর কাছে কোনও ব্যাপার! দিন দুয়েকেই গিয়েছিল সেই জায়গায়। জঙ্গলেরই মাঝে একটা জায়গা। বছর কয়েক আগে বৃষ্টিতে ধস নেমে জায়গাটা নীচে নেমে গেছে অনেকটা। সেখানেই দেখা যায় শক্তপোক্ত মাটি আঁকড়ে থাকা গাছের শিকড়। সেই শিকড়েই বাসা আছে লাল টিয়ার। হাতে একটা চামড়ার তোয়ালে নিয়ে শিকড় ধরে নীচে নেমেছিল নোরাইরোহারা। লাল টিয়ার ডাক ও জানে। সেই ডাক ডেকেই পাখিদের আশ্বস্ত করেছিল। তার পর গোটা দশেক ধরে তুলে দিয়েছিল জোনাটাসের হাতে। গিয়েছিল অন্য জায়গাতেও। আমাজন নদীর কাছেই পল্লববিতান গাছের সারি। মাথাটা মন্দিরের চুরা বা বিতানের মতো। আকাশছোঁয়া সে সব গাছের কোটরগুলো ভর্তি থাকে ম্যাকাও পাখিতে। সেখান থেকেই ধরেছিল আটটা ম্যাকাও।
কিন্তু কেউ যেন দেখছিল ওকে। আড়ালে থেকে ওর সমস্ত কার্যকলাপে নজরে রাখছিল। পাখি ধরতে গিয়ে বার কয়েক হাওলার বাঁদরের একটা ডাক কানে এসেছিল। ঠিক যেন ওয়াঙ্গিরু। ওয়াঙ্গিরুর ডাক নোরাইরোহারা চেনে। যেন ওর আশপাশেই। তবে গুরুত্ব দেয়নি। ব্যাটা বড্ড বেয়াদব। নোরাইরোহারাকে খুব বিরক্ত করে। মন খারাপ থাকলে চুল ধরে টানে, গাছে চাপা অভ্যেস করলে পা ধরে নীচে নামিয়ে দেয় আর হুই হুই করে হাসে। যাই হোক, জোনাটাস এ বার আর না করেনি। কুড়িটা চাইলে দশটা বা আটটা পাওয়ার অভ্যেস ওর আছে। চাওয়া আর পাওয়ার মাঝের দূরত্বটাই তো সভ্যতার খিদে। অল্পবিস্তর খিদে থাকা ভাল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন