ষষ্ঠ অধ্যায়

ধ্রুব মুখোপাধ্যায়

প্যারার বেলেম। ব্রাজ়িলের বন্দর নগরী, সেই সঙ্গে আমাজ়নের প্রবেশদ্বার। আটলান্টিক মহাসাগর থেকে বড় বড় পণ্যবাহী জাহাজেরও এই বন্দরে ঢুকতে খুব একটা অসুবিধে হয় না। সেই সঙ্গে আছে ভ্রমণ-পিপাসুদের আকর্ষণ করার মতো প্রাকৃতিক উপাদান। সেখানেই একটা চেয়ারে বসেছিল জোনাটাস। সামনে কাঠের বিশালাকায় টেবিল আর ঠিক তার অন্য দিকে বসে এক জন অদ্ভুত দেখতে লোক। লোকটার চুলে লাল রং করা, ভুরু দুটোয় প্ল্যাটিনামের দুল ফোটানো আর দুই কানে ঝকঝক করছে হিরে।

—“ও মিউ নোমি গ্যাব্রিয়েল,” লোকটা নিজের ভাষায় বলতেই নিজের নাম বলল জোনাটাস। দূর থেকে আসা হাওয়া ওর মাথার টুপি উড়িয়ে দিচ্ছিল। খুলেই ফেলল টুপিটা। তার পর ট্রলি ব্যাগটাকে টেবিলের উপরে রাখতেই, “করছেন কী?” বলে চেঁচিয়ে উঠল গ্যাব্রিয়েল।

টেবিলের এক পাশে কিছুটা এগোলেই সারি সারি দোকান। ডাব, ভেষজ ওষুধ, নানা ফলের বীজের গয়না— কত কিছু বিক্রি হচ্ছে। সন্ধে পেরিয়ে গেলেও সে সব দোকানে বিস্তর লোক। গ্যাব্রিয়েল ইশারায় জোনাটাসকে বলল, তাকে অনুসরণ করতে। তার পর পা বাড়াল জলপথের গা বরাবর। জোনাটাসও দেরি করল না। উঠে ট্রলিটাকে টানতে টানতে পিছু পিছু এগিয়ে গেল অনেকটা। একটা বিশালাকায় সামাউমা গাছ। আমাজ়নের আকাশছোঁয়া প্রজাতির গাছেদের এক জন। তারই নীচে দাঁড়াল ওরা। জায়গাটা বেশ খালি খালি।

বন্দরে জলের স্রোতের আওয়াজটা এখানে স্পষ্ট। দূরে জোনাটাসের স্পিডবোট। স্পিডবোটে বসে আছে ড্যানিয়েল। গ্যাব্রিয়েল ইশারা করতেই দুটো লোক এসে ভাঁজ করা কাঠের চেয়ার-টেবিল খুলে পেতে দিল ওদের সামনে। দু'জনেই বসল। ড্যানিয়েল স্পিডবোটে বসে চুপচাপ দেখছিল পুরো ঘটনাটা। গ্যাব্রিয়েল চেয়ারে বসতেই কোমর থেকে বের করে টেবিলের উপরে পেতে রাখল একটা ওয়েবলি স্কট নাইন এমএম পিস্তল। যেন বুঝিয়ে দিতে চাইল, এ সব কাজে চালাকি দেখানোর কোনও সুযোগ নেই।

আমেরিকা, ইউরোপের নানা প্রান্তে প্রচুর ক্রেতা গ্যাব্রিয়েলের। পাখি, বাঁদর, সাপ, ব্যাঙ, হার্পি, ইগল—মানুষের কত শখ। প্রচুর টাকা দিয়ে কেনে। তবে ওর কারবার মূলত পাখি নিয়ে। কাজটা ভীষণ ঝুঁকির। জঙ্গল থেকে জীবজন্তু চালান করা ভয়ঙ্কর অপরাধ। অপরাধের শাস্তিও ভয়ঙ্কর। কিন্তু যে কাজে যত ঝুঁকি, সেই কাজে তত টাকা। সেই জন্যই বন্দুক সঙ্গে রাখা। এ সব বলেই কাজের কথায় এল গ্যাব্রিয়েল। সভ্যতার আলো রাতের অন্ধকারকে গুরুত্ব না দিলেও জায়গাটা জঙ্গলের কাছাকাছি। লোকজন তত ক্ষণে বেশ কমে এসেছে। দুপুর থাকতে থাকতেই বেরিয়েছিল জোনাটাস। সন্ধের মধ্যে কাজটা সেরে বেলেমের একটা হোটেলে রাত কাটাবে ভেবেছিল। কিন্তু এ সব কাজ একটু রাত না হলে করা যায় না। গ্যাব্রিয়েল তাই চার পাশে এক বার চোখ বুলিয়ে নিল।

তার পর বলল, “আমাদের কেনা-বেচা দুটো পদ্ধতিতে চলে। এক, আপনি পুরো ব্যাগ আমাদের দিয়ে দেবেন। সেই ব্যাগের একটা দাম আমরা আপনাকে দিয়ে দেব। আর-একটা হয় ব্যাগ খুলে প্রত্যেকটা জীব আমরা দেখব এবং তাদের দেখে প্রত্যেকের জন্য আলাদা আলাদা দাম দেব। এর মধ্যে আপনি কী চান?”

এই কাজে জোনাটাস নতুন। ঠিক বুঝতে পারল না। যদিও গ্যাব্রিয়েল গুরুত্ব দিল না। নিজে থেকেই জিজ্ঞেস করল, “ব্যাগে ক’টা কৌটো আছে?”

জোনাটাস আঠারোটা বলতেই গ্যাব্রিয়েল পুরো ব্যাগটার একটা দাম বলল। কিন্তু জোনাটাস চালাক। সে জন্যই প্রত্যেকটার দাম এক বার জানতে চাইল। শুনে কালো ছোপ পড়া দাঁত বের করে হাসল গ্যাব্রিয়েল। হাসতে হাসতেই বলল, “পাখিগুলোকে ছোট ছোট বাক্সতে ভরেছেন আপনি। তার পর কাপড়ের ব্যাগে সে সব বাক্স ভরে এই ট্রলি ব্যাগে করে এনেছেন। ক’টা বাঁচবে?”

কথাগুলো বিশ্বাস হল জোনাটাসের। প্রথম কাজ। এখনই বেশি লোভ করা ঠিক নয়। সে সব ভেবেই পুরো ব্যাগটা দিতে প্রস্তুত হল। গ্যাব্রিয়েল কতগুলো টাকার বান্ডিল তুলে দিতেই উঠতে যাচ্ছিল জোনাটাস, কিন্তু থামাল গ্যাব্রিয়েল। আবারও সেই দাঁত বের করে হাসি। বলল, “এত তাড়া কিসের? ব্যাগটা এক বার দেখব না?”

জোনাটাস নিশ্চয়ই বললেও পাত্তা দেয়নি গ্যাব্রিয়েল। ট্রলি ব্যাগের চেন খুলেই টেবিল থেকে ওয়েবলি স্কট নাইন এমএম পিস্তলটা তুলে তাক করল জোনাটাসের দিকে। জোনাটাস তখন কিংকর্তব্যবিমূঢ়। খোলা ট্রলি ব্যাগটা তত ক্ষণে জোনাটাসের দিকে ঘুরিয়েছে গ্যাব্রিয়েল। খালি! একগুচ্ছ কাঁচা শুকনো গাছের পাতা শুধু। আর কিছু নেই! ভিতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। ছোট ছোট আঠারোটা শক্ত কাগজের চোঙে ও নিজে হাতে ঠেসেঠুসে ঢুকিয়েছিল পাখিগুলোকে। সুচ দিয়ে ছোট ছোট ফুটোও করে দিয়েছিল, যাতে দমবন্ধ হয়ে মারা না যায়। তার পর সেগুলোকে কম্বলের চাদরে আলতো করে মুড়ে ভরে নিয়েছিল ট্রলি ব্যাগে। ধাক্কা না খাওয়ার জন্য জামাকাপড়ে ভর্তি করে করে রেখেছিল ব্যাগ। কিন্তু কোথায় গেল সে সব!

পাখিগুলো তখন পরপর শুয়ে। অধিকাংশই মৃত। ঘাড় ভেঙে, দম বন্ধ হয়ে নিদারুণ যন্ত্রণায় শেষ হয়ে গিয়েছে বেশির ভাগই। বেঁচে থাকা পাঁচটার অবস্থা ও শোচনীয়। একটা বাঁশের তৈরি লম্বাটে মাচার উপর ওদের রেখে প্রাণপণে বাঁচানোর চেষ্টা করছিল আমারু। ছোট ছোট সাদা কাগজের চোঙে চেপে ভরতে গিয়ে ডানা ভেঙে গেছে। সেই ভাঙা অংশেই ভেষজ প্রলেপ দিচ্ছিল। অন্য দিকে আমারুকে হাতে হাতে জিনিসপত্র বাড়িয়ে দিচ্ছিল কাটু। হাত লাগিয়েছিল কাটুর ন্যাওটা ওয়াঙ্গিরুও। মুখগুলো থমথমে।

সেই সময়েই ঘরে ঢুকল নোরাইরোহারা। সারা দিন দাদুর কাছে তির ছোড়ার প্রশিক্ষণ নিয়েছে। গাছের ডালে দুটো পায়ে প্যাঁচ লাগিয়ে ঝুলে দূরের জিনিসে নিশানা করা অভ্যেস করেছে। সামনে দু'-চারটে একই ভাবে ঝুলন্ত দানবিক বাদুড় দেখে সেগুলোকেও মারতে গিয়ে বকাও খেয়েছে বিস্তর। বাদুড় ওরা খায় না। খেলে মাথাব্যথা করে। শিকার করাও তাই নিয়মবিরুদ্ধ। এ সব করে শরীরটা ক্লান্ত হলেও মনটা তরতাজা ছিল। কিন্তু ঘরে ঢুকতেই ভিতরটা উথালপাথাল হয়ে গেল। পাখিগুলোকে চিনতে ওর দেরি হয়নি।

—“কী হয়েছে?” বলে এগিয়ে যেতে চাইলেও কাছে যেতে দিল না আমারু। নোরাইরোহারার মন আমারু খুব ভাল বোঝে। জঙ্গল অন্ত-প্রাণ। এরই মাঝে চোখ গেল একটা সোনালি ম্যাকাওয়ের নিথর দেহের দিকে। চোখের উপরে একটা পাতলা সাদা পর্দার আস্তরণ। কখন যেন কেঁদে ফেলেছে নোরাইরোহারা। এক রাশ আফসোসে ভিতরটা জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছিল।

ওকে টেনে ধরে বের করে এনেছিল কাটু। বাইরে তখন অন্ধকার। জঙ্গলে সন্ধে তাড়াতাড়ি নামে। দু'-চার ফোঁটা বৃষ্টিও হচ্ছিল। সবটা বলেছিল কাটু। কাজটা ওয়াঙ্গিরুরই। ওই দেখেছিল সব। দুপুরের দিকে জোনাটাসের স্পিডবোটটা দাঁড়িয়েছিল নদীতে। সেখানেই ব্যাগটা রেখে গিয়েছিল ওর রক্ষীরা। জোনাটাস তখনও আসেনি। নদীর পারে বোট আর তাতে আছে কেবল বোটের চালক৷ ব্যাগটা সরাতে অসুবিধে হয়নি ওয়াঙ্গিরুর। সরিয়ে ব্যাগের সমস্ত কিছু ঢেলে নিয়েছিল। তার পর ঘাস, পাতা যা পেয়েছিল, তাই দিয়েই ভরে ব্যাগটা আবারও ও রেখে দিয়েছিল যথাস্থানে। ব্যাপারটা কেউ বুঝতে পারেনি। পরে জোনাটাস বোট নিয়ে চলে গেলে ডেকে এনেছিল কাটুকে। কাটু তখন তিরের ফলায় বিষ মাখাতে ব্যস্ত। ওয়াঙ্গিরুর ভাষা কাটু বোঝে। দৌড়ে এসেছিল। এসেই দেখল এই কাণ্ড।

—“লোকগুলোর থেকে সাবধানে থাকতে হবে। এ সব পাখি ধরা সোজা কথা নয়। কী ভাবে ধরল জানতে হবে,” কাটু বললে নিজের হাত দুটো কেটে ফেলতে ইচ্ছে করছিল নোরাইরোহারার। ওয়াঙ্গিরু দেখলেও ও পাখি ধরে দেওয়ার ব্যাপারটা বলেনি। জঙ্গল এক আজব জায়গা। এখানে শুধু শিকার আর শিকারি নয়, মানুষ আর পশুর অবস্থানও মাঝে মধ্যে বদলে যায়। ছুটে গিয়ে ওয়াঙ্গিরুকে জাপটে ধরেছিল নোরাইরোহারা। তার পরে চলে গিয়েছিল দূরে। সারা দিনের শেষে চকমকি পাথর ঘষে শুকনো কাঠ-পাতায় আগুন জ্বালায় টাটা। সেখানেই হাতেপায়ে সেঁক নেয়। আরাম হয়। আজও টাটা আগুন জ্বালিয়েছিল। তবে সামনে কেউ ছিল না। সেখানেই হাত দুটোকে গুঁজে দিয়েছিল নোরাইরোহারা। আগুনে পুড়ে যাচ্ছিল হাত। জ্বলছিল। এই যন্ত্রণাই তো চাইছিল ও। শাস্তি। প্রায়শ্চিত্ত। যে হাতে পাখিগুলোকে জোনাটাসের হাতে তুলে দিয়েছে, সেই হাতটাকেই পুড়িয়ে দিতে চেয়েছিল ও। ঝলসে গিয়েছিল হাত দুটো। মুহূর্তের মধ্যে ছুটে এসেছিল টাটা, কাটু। এমনকি আমারুও। টেনে নিয়ে গিয়েছিল ওকে। জোনাটাস কী ভাবে পাখিগুলোকে ধরল, সেটা বুঝতেও ওদের দেরি হয়নি। তবে কেউ কিছু বলেনি। উল্টে আশ্বস্ত হয়েছিল। জোনাটাস চাইলেও আর এই কাজ করতে পারবে না। এই সব পাখি ধরা ওর পক্ষে সোজা কাজ নয়।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%