ধ্রুব মুখোপাধ্যায়
তিন দিন যেন তিন বছর। সময় কাটতেই চায় না। রাতে দু'চোখের পাতা এক করতে পারেনি জোনাটাস। কোম্পানির কাজ আর ড্যানিয়েলের থেকে নোরাইরোহারাদের ভাষাটা মোটামুটি কাজ চালানোর মতো শিখতে শুরু করেছে। কিন্তু দুশ্চিন্তা পিছু ছাড়েনি। পাখির ব্যবসাটা গেলেও বিকল্প ব্যবসার অভাব নেই। বাঁদর আর সাপ বিক্রি করতে পারলে মুনাফার অঙ্ক আকাশছোঁয়া। এই ব্যাপারে বেলেমের এক পশু চালানকারির সঙ্গে কথাও বলে নিয়েছে। আর সেটাও না হলে, কাঠের ব্যবসা আছে। ঘন জঙ্গলের মাঝে চুপিসারে দামি দামি গাছ কাটতে কোনও অসুবিধে নেই। ঠিক সেই রকমই অসুবিধে নেই বন্দুকের গুলিতে বন্য জন্তুদের ধরাশায়ী করতেও। মরা জাগুয়ারের দাম অনেক। এই জন্যই নোরাইরোহারার মতো ছেলেদের ওর খুব দরকার। মতলব খুঁজছিল জোনাটাস। সেই ফাঁকেই পাশে থাকা ড্যানিয়েলকে জিজ্ঞেস করল, “কী মনে হয় তোমার, নোরাইরোহারার হাতে কী হয়েছে?”
—“মনে হচ্ছে হাতটা পুড়ে গিয়েছে,” ড্যানিয়েলের সোজাসাপ্টা উত্তরটা শুনেই খেঁকিয়ে উঠল ও। মাথায় কী যেন একটা খেলে গেল। নোরাইরোহারার কাছে যাওয়ার একটা পাকাপোক্ত সুযোগ যেন। ড্যানিয়েলকে দিয়ে কিছু ফল, আধুনিক ওষুধ গুছিয়ে নিয়ে এক প্রকার ছুটে গেল জোনাটাস। পিছন পিছন ছুটল ড্যানিয়েলও। হন্তদন্ত হয়ে নোরাইরোহারাদের ডেরায় ঢুকে সোজা এল কাটুর সামনে।
কাটুর ঘাড় পর্যন্ত বিস্তৃত চুল। সবুজ রঙের তিনটে রেখা নাকের দু'পাশ থেকে চোয়াল ছাড়িয়ে গলা পর্যন্ত আঁকা। গলায় ঝোলানো একটা শুকনো ঘাসের হার আর তাতে ঝুলছে পিরানহা মাছের দাঁত। ঊর্ধ্বাঙ্গ খালি। চওড়া কাঁধ, পেটানো বুক পেট। নিম্নাঙ্গে হাঁটু ছাড়িয়ে ইঞ্চি চারেক নামা একটা পশুর চামড়া জড়ানো। আজানুলম্বিত হাত। শিকার থেকে ফিরেছে সদ্য।
জোনাটাস নোরাইরোহারাদের ভাষায় বলল, “নোরাইরোহারার তো কোনও দোষ নেই। দোষ তো আমার। আমি ওকে পাখি ধরে দিতে বলেছিলাম। তুমি ওইটুকু বাচ্চাকে আমার দোষের শাস্তি দিলে? আগুনে পুড়িয়ে দিলে ওর হাত?”
ড্যানিয়েলও অভ্যাসের বশে আবারও বলল কথাগুলো। পাশ থেকে ওয়াঙ্গিরু তখন তারস্বরে চিৎকার করছে। কাটুর সঙ্গে জোনাটাসের কথাবার্তা ওর পছন্দ নয়। কাটু স্থির। নির্বাক। ঝুপড়ির ভিতরে নোরাইরোহারা তখন একটা তির বানাচ্ছে। সামনে বসে সেটাই মন দিয়ে দেখছে দাদু, টাটা। দেখেই পিলে চমকিয়ে গেল ড্যানিয়েলের। তা হলে কি কিছুই হয়নি! জোনাটাস সঙ্গে আনা ফল-ওষুধের ঝাঁপিটাকে দিতে গিয়েও থেমে গেল।
অগত্যা কাটুকেই বলতে হল, “এই জঙ্গল আমাদের মা। জঙ্গলের ক্ষতি মানে আমাদেরও ক্ষতি। সেই আক্ষেপেই শাস্তিটা ও নিজে নিজেকে দিয়েছে।”
শুনেই ঝাঁপি থেকে ওষুধ সরিয়ে ফলগুলো দিতে গেল জোনাটাস। কিন্তু কার্টু নিল না। মুখের উপরেই বলল, “বাইরের মানুষের থেকে আমরা কিছু নিই না। এমনকি যোগাযোগও রাখি না। আপনার বিপদে আমরা আপনাকে সাহায্য করেছিলাম। সেই সূত্রেই নোরাইরোহারার সঙ্গে আপনাদের পরিচয়। যাই হোক, ওর ক্ষত এখন শুকিয়ে গিয়েছে। আমাদের ভেষজ ওষুধে দারুণ কাজ হয়। ও সুস্থ আছে। ও আর আপনাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে চায় না। ”
শুনেই মুখটা পাংশু হয়ে গেল জোনাটাসের। তা হলে কি ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে ওর স্বপ্ন! কখনই না। নিজেকে শক্ত করল। মাথা খাটিয়ে বলল, “যোগাযোগ রাখার দরকার নেই। আপনাদের মতো আমিও এই জঙ্গলেরই। পৃথিবীর ফুসফুস আমাজ়ন। একে রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব আমারও। তবে আশা করব, আপনারা আমার কাজে বাধা দেবেন না৷”
—“কী করবেন আপনি?” সংশয়ের সঙ্গেই জিজ্ঞেস করল কাটু।
জোনাটাস বলেছিল, “সংরক্ষণের কাজ। এই জঙ্গলের সমস্ত পশুপাখিদের সংরক্ষণ একান্ত দরকার।”
শুনেই কিছুটা থতমত খেয়ে গেল কাটু। সংরক্ষণের নামে যে পশুপাখিদের চালান করবে জোনাটাস, সেটা বুঝতে ওর বিন্দুমাত্রও দেরি হয়নি। বেশ কড়া ভাবেই বলল, “আমি কিন্তু নোরাইরোহারার মতো বাচ্চা নই। আপনাদের অভিসন্ধি আমি বুঝি। জঙ্গলের ক্ষতি হলে চুপ থাকতে পারব না।”
আর যেন কোনও উপায়ই নেই জোনাটাসের। ভিতরটা রাগে গজগজ করছিল। ইচ্ছে করছিল তক্ষুনি কোমরে গোঁজা ওয়েবলি স্কট নাইন এমএম পিস্তলটা বের করে ওখানেই মেরে ফেলে দলপতি কাটুকে। কিন্তু কার্টু সেই সময়েই, “শুধু আমরা নয়, এই জঙ্গলের একটা প্রাণও জঙ্গলের ক্ষতি সহ্য করতে পারে না। বাড়াবাড়ি করলেই শেষ!” বলায় নিজেকে থামাল জোনাটাস ।
তার মানে শুধু এরাই নয়। আরও শত্রু আছে। ড্যানিয়েল কিছুটা আশাহত হয়েই বলল, “আমরা যে উপকারটা করতে চাইছিলাম, বুঝলেন না আপনারা। তবে এক দিন বুঝবেন।”
কাটু তখনও চুপ। চার পাশ থমথমে। ঝুপড়ির ভিতরে একটা তির বানিয়ে ফেলেছে নোরাইরোহারা। টাটা সেই তিরটারই নানান ভুল দেখিয়ে দিচ্ছিল। সে সব কথা বাইরে আসতেই জোনাটাস বলল, “ভাল কাজে বাধা আসবেই। কিন্তু আটকাতে পারবেন না। এই জঙ্গলের মঙ্গল আমি করেই ছাড়ব।”
ভয় না পেলেও এক রাশ দুশ্চিন্তা যেন ভিড় করল কাটুর মাথায়। যদিও কথা বাড়াল না। কথা বাড়াল না জোনাটাসও। মনে মনে তত ক্ষণে ঠিক করে নিয়েছে, শেষ এদের করতেই হবে। তবু কিছু তো বলতেই হয়। ফিরতি পথে পা বাড়ানোর আগে এক বার ঘুরে গিয়ে তাই আফসোসের সঙ্গে বলল, “কিছু না পারলে আমি জঙ্গলে গাছ লাগাব। আরও সবুজ করে তুলব এই জঙ্গলকে।”
আর কথাটা শুনেই তারস্বরে হেসে উঠল ওয়াঙ্গিরু। দু'পাশের দুটো গাছের গুঁড়িতে বার দুয়েক ঝাঁপ মেরে মাটিতে কিছু ক্ষণ গড়াগড়ি দিয়ে হাসল। ধুলো উড়িয়ে দিল চার পাশে। সেই দেখে হাসি পাচ্ছিল কাটুরও। বাড়ির চৌবাচ্চা থেকে মগে করে সমুদ্রে জল ঢালা আর আমাজনের জঙ্গলে গাছ লাগানো একই ব্যাপার। হাসি না এসে থাকে! তবে কার্টু সামলে নিল। সব শেষে বলল, “পাখিগুলোকে আমি নই, ওয়াঙ্গিরুই উদ্ধার করেছে। এ রকম ওয়াঙ্গিরু হাজার হাজার আছে। আর এরা শুধু উদ্ধার নয় যুদ্ধও করতে জানে। সুতরাং সাবধান।”
নোরাইরোহারাদের ডেরায় সেই শেষ বার গিয়েছিল জোনাটাস। আর বলে এসেছিল, “এর শেষ দেখে ছাড়ব আমি।”
কার? ডেরাটার না জঙ্গলের, বুঝতে পারেনি কাটু।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন