ধ্রুব মুখোপাধ্যায়
কয়েক বছর আগের ঘটনা। এলোমেলো শুকনো গাছের ডাল দিয়ে তৈরি একটা ছাউনি আর তার উপরে পাইন, তাল পাতার ঘন আচ্ছাদন। ফাঁকফোকর দিয়ে আলো ঢোকার সুযোগ নেই। চার ফুটের একটা ছোট্ট দরজার ফাঁক দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে ঘরের ভিতরে ঢুকছে শান্ত আলো। তবে ভিতরটা অন্ধকারই। সেখানেই একটা ঘাসের দড়ির খাটিয়ায় শুয়ে ছিল জোনাটাস। কপালে থেঁতলানো গাছের পাতার প্রলেপ। ডান হাতের কব্জির কিছুটা উপরে ক্ষতের অংশটা পুড়ে কালো হয়ে গিয়েছে। যন্ত্রণা নেই। এমনকি সারা শরীরের লাল হয়ে যাওয়াটাও কমে গিয়েছে। হাতটাকে এক বার নাড়ানোর চেষ্টা করল। কোনও অসুবিধে হল না। উঠে বসতেও যাচ্ছিল। তবে আটকাল আমারু।
আমারু নোরাইরোহারার মা। পেশিবহুল চেহারা। দু'হাতে কব্জি থেকে বাহুমূল পর্যন্ত লতানো পাতাসমেত গাছের উল্কি। কোমর পর্যন্ত ছড়ানো কালো চুল। মাথায় তাল পাতার টুপি। গলায় নানান রঙের পাথরের হার আর গোটা গায়ে জড়ানো পশুর চামড়ার বস্ত্র। চোখ দুটো বেশ শান্ত, মায়াবী। ছোটবেলা থেকেই আমারুর গাছগাছড়া এবং তার ব্যবহারিক প্রয়োগে ভীষণ আগ্রহ। সেই আগ্রহটাই ওকে এই উপজাতির এক প্রকার চিকিৎসক বানিয়ে দিয়েছে। দলের কারও কিছু হলেই নেমে পড়তে হয় আমারুকে। হাজার হাজার টোটকা, ওষুধ ওর ঠোঁটস্থ।
আমারু তাড়াতাড়ি গরম জলে কালো গুয়ারানা ফলের বীজ গুঁড়ো করে গুলে খাইয়ে দিল জোনাটাসকে। এই বীজ মনোবল ও সহ্য ক্ষমতা বাড়ানোর অমোঘ ওষুধ। অসুস্থ মানুষকে এই তরল খাইয়ে সুস্থ করার চল ওদের গোষ্ঠীতে বহু দিনের। তরলটা খেয়েই উঠে বসল জোনাটাস। তবে এ বারে আর বাধা দিল না আমারু। যদিও বাধা পেল উঠে দাঁড়াতে গেলে। বাধা দিল একটা পাখি। হুট করে বাইরে থেকে উড়ে আসা একটা সোনালি ম্যাকাও আমারুর টুপির উপরে বসে ওদের ভাষায় কী সব বলে এমন ডানা ঝাপটাল, যেন আদেশের সুরেই বলল, “চুপচাপ বোস।”
চোখ জুড়িয়ে গিয়েছিল জোনাটাসের। সেই সঙ্গে মনও। কিন্তু সভ্য মানুষের মন তো আর এমনি এমনি ভরে না। তার পিছনে খরচ করতে হয়। আর সেই খরচের পিছনেই ওত পেতে বসে থাকে লাভ, লোভ। এ রকম একটা মনমুগ্ধ করা পাখির বাজারে কত দর হতে পারে, সেই হিসেবটাই কষছিল জোনাটাস। যদিও আমারু সে সব ধারণাও করতে পারেনি। আমারু পাখিটাকে থামিয়ে আকারে ইঙ্গিতে “সবে তো এক দিন হয়েছে। আরও তিন দিন। তবেই বেরোতে পারবেন,” বললে বেশ বুঝল জোনাটাস ।
বিপদটা ঘটেছে গতকাল দুপুরে। ডেরার বাইরের কলা গাছে এক কাঁদি পাকা কলা দেখে জোনাটাস লোভ সামলাতে পারেনি। নিজেই পাড়তে গিয়েছিল। তখনই চোখে পড়েছিল খাকি রঙের মাকড়সাটা। চোখে দেখা তো দূর, মাকড়সা যে এত বড় হতে পারে, সেটা ভাবতেও পারেনি ও। দু'পাশের চারটে করে লম্বা পা নিয়ে একটা বড় আকারের ভাতের থালায় বোধ হয় আঁটত না। দেখতেও অদ্ভুত। ব্রাজিলিয়ান ওয়ান্ডারিং মাকড়সা। বিষাক্ত। এরা সাধারণত দিনে বেরোয় না। রাতে শিকার করে। সেই সময় নিজের খেয়ালেই ছিল। কিন্তু বিরক্ত করেছিল জোনাটাসই। মাকড়সাটাকে হাতে নিয়ে ভেবেছিল বোতলে ভরে দেশে নিয়ে যাবে৷ লোককে দেখাবে। বন্যেরা বনেই সুন্দর। সেই সৌন্দর্যে হাত দিলেই বিপত্তি। বিপদ ঘটতেও দেরি হয়নি। মাকড়সাটা সামনের দুটো পা তুলে আত্মরক্ষার চেষ্টা করলেও পাত্তা দেয়নি জোনাটাস। পরিণতিতে কামড়। কামড়টা বসেছিল হাতেই। তীব্র জ্বালা আর অসাড়তা। কেঁপে কেঁপে উঠছিল পেশি। যেন মেরুপ্রদেশে বরফের মধ্যে কেউ সমাধি দিয়ে দিয়েছে। মরে যাবে নাকি! চোখের সামনেটা ঘোলাটে হতে হতে কখন যে চার পাশ অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল, জোনাটাস বুঝতেই পারেনি। বুঝেছিল ওর সঙ্গীরা। মুহূর্তের মধ্যে অচেতন শরীরটাকে তুলে এনে ফেলে দিয়েছিল আমারুদের বসতির সামনে।
আমারুদের কাছে প্রকৃতি হল মা। অপরিচিত হলেও জোনাটাসের শরীরও সেই মায়েরই সন্তান। শুশ্রূষা দিতে তাই দেরি করেনি। কব্জির উপরের অংশে ক্ষতটা তীব্র বিষে তত ক্ষণে পাকতে শুরু করেছে। মুহূর্তের মধ্যে জায়গাটাকে অসাড় করতে ঘষে দিয়েছিল কর্ডনসিলো গাছের পাতা। তার পরেই আগুনে পোড়ানো তপ্ত পাথর ঠেকিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছিল ক্ষতটাকে। বাহুতে টেনে বেঁধে দিয়েছিল শুকনো ঘাসের দড়ি। শুরু হয়ে গিয়েছিল ভেষজ উপায়ে সুস্থ করার প্রক্রিয়া প্রাচীন পদ্ধতি। সুস্থও হয়ে গিয়েছিল। দিন তিনেকেই দাঁড়িয়ে গিয়েছিল সে। কিন্তু মানসিক ভাবে সুস্থ হতে পারেনি। লোভটা ছিলই। সভ্য মানুষের লোভ জঙ্গলের দাবানলের চেয়েও ভয়ঙ্কর। সেই আগুন থামে?
সেই আগুনের সূত্র ধরেই জোনাটাসের সঙ্গে নোরাইরোহারাদের পরিচয়। নোরাইরোহারা তখন খুব ছোট। বছর আটেকের। নামকরণ পর্যন্ত হয়নি। জন্মানোর পরে নাম পেতে ওদের অনেকটা সময় লাগে। তার চরিত্র, কার্যকলাপ না দেখে নামকরণ হয় না। অন্য দিকে রাবারশিল্প তখন মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। চাহিদাও তুঙ্গে। চটি-জুতো, গ্লাভস, খেলনা, দড়ি এ সব দৈনন্দিন জীবনের জিনিসপত্র তো আছেই, সেই সঙ্গে আছে গাড়ি শিল্পের বাড়বাড়ন্ত। কিসে নেই রাবারের ব্যবহার! সেই সময়েই ইউরোপের একটা রাবার প্রস্তুতকারক সংস্থার ম্যানেজার করে এই অঞ্চলে পাঠানো হয়েছিল জোনাটাসকে।
জোনাটাসের বয়স তখন মেরেকেটে তিরিশ। প্রবল সাহস, সেই সঙ্গে জীবনে কিছু করে দেখানোর অদমনীয় ইচ্ছে। কিন্তু ইচ্ছেটা কবে যেন হিংস্র লোভ হয়ে গিয়েছিল। আর হবে নাই বা কেন? আমাজনের জঙ্গল পৃথিবীর ফুসফুস। তাতে প্রাকৃতিক সম্পদের পরিমাণ তো আর কম নয়। সেই দেখে সভ্য মানুষের লোভ না হয়ে পারে! যাই হোক, শত্রুতার শুরু সেই তখন থেকেই। নোরাইরোহারাদের গোষ্ঠীটা তখন জঙ্গলের আরও কিছুটা উত্তর-পূর্ব দিকে থাকত। ওর বাবা কাটু তখন ওদের দলপতি। আর মা আমারু গোষ্ঠীর চিকিৎসক। গোষ্ঠীতে লোকও ছিল প্রচুর। ওই অংশেও তখন এখানের মতোই ঘন জঙ্গল। সেই জঙ্গলের মাঝেই গাছ কেটে, ফুটবল মাঠের মতো একটা জায়গায় ডেরা করেছিল জোনাটাস। দলপতি কাটু কিছু বলেনি। জঙ্গলে সকলের অধিকার। সেই অধিকারে হস্তক্ষেপ করার নিয়ম ওদের নেই। শুধু ক্ষতি না করলেই হল। আমাজ়নের ঘন জঙ্গলে প্রচুর রাবার গাছ। সেই গাছের বাকল সরিয়ে তেরচা করে ভিতরের অংশটাকে চেঁছে দিত ওরা। এক পাশে ঢালু চেঁছে ফেলা অংশ দিয়েই টুপটাপ গড়িয়ে পড়ত তরল রাবার। ধবধবে সাদা দুধের মতো তরল ধরতে নীচে বাঁধা থাকত মগ। ভরে যেত দু'দিনেই। মগ সরাতেও লোক আসত।
কিছু অন্য উপজাতির লোকদেরও কাজে লাগিয়েছিল ওরা। বেশ চলছিল। তরল রাবার মগে জমে গিয়ে তৈরি হত রাবারের মণ্ড। সেটিই রফতানি করা হত কারখানায়। কোম্পানির হয়ে এ সব পর্যবেক্ষণ করত জোনাটাস। সেই সঙ্গে মাঝে মধ্যেই আসত নোরাইরোহারাদের ডেরায়। সঙ্গে নিয়ে আসত ভাষান্তরকারী ড্যানিয়েলকে। ড্যানিয়েল জোনাটাসের কথাগুলো বুঝিয়ে দিত ছোট্ট নোরাইরোহারাকে। নানা ধরনের আধুনিক খেলনাও উপহার দিত। যদিও সে সবে একেবারেই আগ্রহ দেখায়নি নোরাইরোহারা। ওর কাছে তখন জঙ্গল একটা স্বর্গ ছোট্ট একটা ধনুকের ছিলায় টান মেরে অনেক উঁচুতে ঝুলতে থাকা স্বর্গের ফল পাড়ার আনন্দ ওই সব খেলনা দিতে পারে!
তবে জোনাটাসকে দূরছাইও করেনি সে। খেলনাগুলো ফিরিয়ে দিত হাসি মুখে। বলত, “আমি শিকারি। তির ধনুক আর ফুঁ-বন্দুক ছাড়া কোনও কিছুতেই আমার আগ্রহ নেই।”
কিন্তু জোনাটাস নাছোড়বান্দা। রোজগারের লোভ ছিল ওর। সেই লোভের বশেই বলেছিল, “তোমাদের ওই সোনালি ম্যাকাওটা ভারী সুন্দর। আমাকে একটা শিকার করে দেবে?”
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন