ধ্রুব মুখোপাধ্যায়
বিকেলে একটা আলোচনা হয়েছিল। টাটা সঙ্কোচ প্রকাশ করলেও মনে মনে জানত, নোরাইরোহারাকে আটকানো মুশকিল। ও যাবেই। ওময়োকাভার অনুমতি পেতেও দেরি হয়নি। শুরু হয়ে গিয়েছিল প্রস্তুতি পর্ব। নিজেদের প্রথা থেকে এক চুলও নড়তে নারাজ ওরা। জঙ্গলের বহু উপজাতি নিজেদের প্রথা জলাঞ্জলি দিয়ে সভ্যতার সঙ্গে হাত মেলালেও নোরাইরোহারারা সেটা করেনি। নিজেদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি আগলে বেঁচে থাকার আনন্দই আলাদা। যদিও নোরাইরোহারার মাঝে মধ্যেই একে শাস্তি মনে হয়। সভ্যতার সঙ্গে হাত মেলালে আজ ওরও কাছে থাকত জোনাটাসের মতো আগ্নেয়াস্ত্র। এক গুলিতে সমস্যার সমাধান। কিন্তু নোরাইরোহারা এ-ও জানে যে, ভালর পথ সততই দুর্গম। তা ছাড়া যে ঐতিহ্য, সংস্কৃতিকে এত দিন ধরে ওর বাপ-ঠাকুরদা মেনে এসেছে, সেটাকে অমান্য করা মানে পূর্বপুরুষের অপমান। এ সব ভেবেই নিজেকে প্রস্তুত করেছে ও। প্রস্তুতি পর্ব তিন দিনের। এই তিন দিন শিকারে যাওয়া বারণ। আমিষ খাবার খাওয়াও বারণ। খাদ্য বলতে শুধুই ফলমূল। শরীরকে কোনও রকম আঘাত এবং অসুস্থতা থেকে বাঁচাতেই এই রীতি। এমনিতেই ভোর থাকতেই ঘুম থেকে উঠে যায় নোরাইরোহারা।

এর পরেই শুরু হয় শপথ নেওয়া। তিন দিনের প্রতি দিন সকালে লুপুনা গাছকে সাক্ষী রেখে বলতে হয়, এই যাত্রায় কোনও রকম চালাকি করবে না যাত্রী। আরান্ডুকারেন্ডা গিয়ে পাথরের চাকতি রেখে আসার ব্যাপারে কোনও রকমের মিথ্যে বলতে পারবে না সে। এমনকি সেখান থেকে দেখে আসা ভবিষ্যৎ, পূর্বপুরুষদের রেখে আসা জিনিসের ব্যপারেও কোনও মিথ্যে বলা বারণ। শপথের পরেই চলে যেতে হয় ঝর্নায়। চার পাশে পাথর আর সে সব পাথরকে আঁকড়ে থাকা আকাশছোঁয়া গাছেদের মাঝে গিয়ে স্নান করে বসতে হয় চুপচাপ।
প্রস্তুতি পর্বের এ সব রীতি দলের দলপতিই বলে থাকেন। কিন্তু ওময়োকাভা বিস্তারিত জানে না। আসলে দলপতির হস্তান্তর স্বাভাবিক ভাবে হয়নি। তবে টাটা সব জানে। এত দিনের অভিজ্ঞতা! টাটার সঙ্গেই সেই ঝর্নায় গেল নোরাইরোহারা। সকালের সূর্যের আলতো আলোর রেখা গাছগাছালির ফাঁকফোকর দিয়ে এসে চিরে দিচ্ছে ভিতরের রাস্তাঘাট। টাটার কাঁধে একটা ইরাপারা বা ধনুক, পিঠে বিষ মাখানো তিরের তূণীর আর হাতে একটা তাকওয়ারা। তবে নোরাইরোহারা নিরস্ত্র। ঝর্নার কাছে যেতেই ভিতরটা জুড়িয়ে গেল। চার পাশ শান্ত, স্নিগ্ধ। তাকওয়ারা, ধনুক, তূণীর সব নামিয়ে রেখে জঙ্গলের উত্তর পূর্ব দিকে ইশারা করল টাটা। ধন্যবাদ জানাতে বলল। জঙ্গলের উত্তর-পূর্ব দিকে আটলান্টিক মহাসাগরের পরেই সুবিশাল মরুভূমি। সেই মরুভূমিতে ঝড় ওঠে। মরু ঝড়। মরুভূমি থেকে বিস্তৃত আটলান্টিক মহাসাগর পার করে বাতাসে ভেসে ভেসে উড়ে আসে নানান সূক্ষ্ম খনিজ।
সে সব খনিজ গাছেদের বৃদ্ধির সহায়ক। জঙ্গলের পুষ্টিতে সে সবের ভূমিকা অপরিসীম। সেই জন্যই ধন্যবাদ জানানো। টাটার চোখ-মুখ বিষণ্ণ। গত বার এ ভাবেই কাটুকে প্রস্তুতিপর্বে সঙ্গ দিয়েছিল টাটা। সব মনে পড়ে যাচ্ছিল। সন্তানশোক ভয়ঙ্কর এক অভিশাপ। নোরাইরোহারা বুঝল। তবে কিছু বলল না। হাত দুটো উপরে তুলে এক ঝাঁপে মুহূর্তের মধ্যে শরীরটাকে ডুবিয়ে দিল সামনের পাথরে ঘেরা জলাশয়ে। নীচে আরাধ্য নুম্মোর প্রতিকৃতি। সেখানেই হাত বুলিয়ে উঠে এল ঝর্নার মাঝামাঝি থাকা সেই গুহায়। টাটা দূর থেকে ইশারা করে বলল, “আমি চললাম। নিতে আসব।”
প্রস্তুতিপর্বে এই গুহায় বসে থাকতে হয় সারা সকাল। মন স্থির হয়ে যায়। মনোযোগ বাড়ে। স্বচ্ছ জলের নীচে নুম্মোর প্রতিকৃতি। সেই দিকেই তাকিয়ে চুপচাপ বসে রইল নোরাইরোহারা। মন স্থির। তার পর কখন যে টাটা এসে ওকে ডেরায় নিয়ে গিয়েছে এবং ফলমূল খেয়ে ভরা পেটে ভরদুপুরে ওর চোখ লেগে গিয়েছে ও বুঝতেই পারেনি। ঘুম ভাঙল রামায়েচার ডাকে।
রামায়েচা বিষ তৈরিতে দক্ষ। নানান রকমের বিষ, বিষের ব্যবহার কিছুটা হলেও সংক্ষেপে বলে দিল ওকে। সেই সঙ্গে শিখিয়ে দিল টিম্বো তৈরির পদ্ধতি। টিম্বো ওদের মাছ ধরার বিষ। গন্ধহীন, বর্ণহীন, জিকামা লতা, ফ্যাবেসি গাছের শিকড় থেকে তৈরি রোটেনান বিষ। অল্প মাত্রায় জলে দিলে মাছেরা ভেসে ওঠে জলের উপরে। সহজেই ধরে, পুড়িয়ে খাওয়া যায়। যাত্রাপথে খিদে পেলে সব চেয়ে সহজে খাবার জোগাড়ের পন্থা। আর সব শেষে বলল, “আরান্ডুকারেন্ডা যাওয়াটাই বড় কথা নয়, বড় কথা গিয়ে ফিরে আসা। অনেকেই গিয়েছে। কিন্তু সকলে ফিরতে পারেনি। কাটু ফিরে এসেছিল। সেই রক্ত তোমার শরীরে। তোমাকেও ফিরতেই হবে।”
রাতেও টাটা অনেক কিছু শিখিয়েছে। ঘন গভীর জঙ্গলে গাছে উঠে সূর্যের অবস্থান দেখে সময় এবং দিক বোঝা, ঠিকঠাক বুঝতে না পারলে রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করা, আকাশে তারা দেখে দিক নির্ণয় আরও কত কিছু। এই করেই তিনটে দিন পেরিয়ে গেল। সব শেষে এসেছিল ওময়োকাভা। একটা ঝুপড়ির ভিতরে ওকে একা নিয়ে গিয়ে হাতে তুলে দিয়েছিল একটা হরিণের চামড়ায় তৈরি থলে। অনেক কিছু ছিল তাতে। বিষ, মাঝখানটা খালি করা জল ধরে রাখার বাঁশের বোতল, পাখির পালক লাগানো মাথায় বাঁধার ফেট্টি, পিরানহা মাছের দাঁতওয়ালা চোয়াল আরও কত কিছু। সে সব হাতে নেড়ে দেখেওছিল নোরাইরোহারা। কিন্তু কোনও পাথরের চাকতি খুঁজে পায়নি।
দলের কেউ আরান্ডুকারেন্ডা গেলে পাথরের চাকতি নিয়ে যায়। সেই চাকতিতে আঁকা থাকে ওদের গোষ্ঠীর বর্তমান অথবা সদ্য ঘটে যাওয়া ঘটনা। চাকতি রেখে আসা মানে যেন নিজের অস্তিত্বকে অমর করে রাখা। দলের প্রত্যেক শিকারির স্বপ্ন। অবাক হয়ে চাকতির কথা জিজ্ঞেস করতেই একটা পাথরের চাকতি হাতে তুলে দিয়েছিল ওময়োকাভা। তবে দেখতে বারণ করেছিল। বলেছিল, “আরান্ডুকারেন্ডা যাওয়ার পথে প্রধান বাধা হল, রাগ, দুঃখ, অভিমান। এ সব থাকলে পৌঁছোতে পারবে না। মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটবে। এটা দেখো, তবে পৌঁছে।”
আর তার পরেই তুলে দিয়েছিল ঠাসাঠাসি করে তিরভরা একটা তূণীর, ধনুক আর একটা বেশ বড় একটা মাপের তাকওয়ারা। এ সব দেওয়ার পরেই ওময়োকাভা ভেবেছিল, নোরাইরোহারা উঠে যাবে। কিন্তু ও ওঠেনি। এমনকি কোনও প্রশ্নও করেনি। বিশ্বাস করেছিল দলপতি সবটা বলবে ওকে। নোরাইরোহারা উত্তীর্ণ হয়েছিল ওময়োকাভার ধৈর্যের পরীক্ষায়। খুশি হয়ে ওময়োকাভাও বলেছিল “এই ধৈর্য যেন ফিরে আসা পর্যন্ত থাকে। পা ফেলার আগে হাজার বার ভাববে। মনে রেখো, ওই রাস্তাতেই তোমাকে ফিরতে হবে। খিদে পেলে খাবার দেখে খাবে। পদে পদে বিপদ অপেক্ষায়।”
সব শেষে ওর হাতে তুলে দিয়েছিল এক জোড়া রণপা। রণপা এর আগে কখনও দেখেনি নোরাইরোহারা। তবে জিজ্ঞেসও করেনি কিছু। ওর ভিতরটা তখন স্থির। উত্তেজনার লেশ নেই ।
—“আমারও ইচ্ছে ছিল যাওয়ার। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে দল ছেড়ে নিজের স্বপ্নের পিছনে ছুটলে দলটার আর কিছু থাকবে না। আমি জানি তুমি পারবে। সব দেখে আসবে। আর বিশেষ করে দেখে আসবে জোনাটাসকে আটকানোর পন্থা,” বলেই রণপার ব্যবহার দেখিয়ে দিয়েছিল। বলেছিল, সেই অ্যাঞ্জেলিম ভারমেলহো বা লাল দেবদূত গাছের কথাটা।
কিন্তু কোথায় সেই গাছ? এক রাত, দু'দিন হয়ে গেল এখনও সেই গাছের দেখা পাওয়া গেল না। ক্লান্ত শ্রান্ত, খিদের জ্বলায় ও নদীর পারে একটা গাছের ডালে বসে এ সবই ভাবছিল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন