তৃতীয় অধ্যায়

ধ্রুব মুখোপাধ্যায়

বাঁদরটা যে লুপুনা গাছে বসে আছে, সেটা নোরাইরোহারা খেয়াল করেনি। এমনকি টাটা ছাড়া বাকি কেউই লক্ষ করেনি। লুপুনা গাছ জঙ্গলের রক্ষাকর্তা। পবিত্র গাছ। কত গল্প এই গাছ নিয়ে। বিপদেআপদে, সমস্যায় জঙ্গলের মানুষ এই গাছের কাছেই প্রার্থনা জানায়। গাছ নাকি কথা শোনে। প্রার্থনা ফলে যায়।

“নিয়মের বিরুদ্ধাচারণ করাটা ঠিক হবে না,” দলপতি বলতেই ফুঁ-বন্দুকটা নীচে নামাল নোরাইরোহারা। যদিও কেরেচা তখনও ফুঁ-বন্দুক উঁচিয়ে “হুইইইইইই... উহু... ...হুস” আওয়াজ করে চলেছে। বাঁদরটাকে যদি অন্য গাছে তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু জঙ্গল মায়ের কোল। কত জীবজন্তুর নিরাপদ আশ্রয়। বাঁদরটাও হয়তো বোঝে। হয়তো লুপুনা গাছ ও চেনে। সেই জন্য নড়লই না। অনেক কসরত করল ওরা। অনেক চেঁচামেচি। কিন্তু বাঁদরটাকে নড়াতে পারল না। দলের সঙ্গে গিয়ে ঘন জঙ্গলে নোরাইরোহারার জীবনের প্রথম শিকার অসম্পূর্ণই রয়ে গেল।

ভাগ্য খারাপ। কিছু ক্ষণেই উপর থেকে কয়েক ফোটা জল এসে পড়ল নোরাইরোহারার কপালে। বৃষ্টি। শুরু হয়েছে বেশ কিছু ক্ষণ আগেই। জঙ্গলে বৃষ্টির জল মাটি ছুঁতে সময় নেয়। এখন আর শিকার নয়। বৃষ্টি পড়লে ওরা শিকার করে না। বৃষ্টি মানে প্রকৃতির কান্না। সেই সময়ে জীবহত্যা করে প্রকৃতিকে আর দুঃখ দেওয়া উচিত নয়। ফুঁ-বন্দুকটাকে মাটিতে গেঁথে দু' হাঁটুর মাঝে থুতনি রেখে কিছু ক্ষণ বসল ও। ঠিক যেমন করে গাছের মগডালে বসে রয়েছে বাঁদরটা। ওরা সকলে একই মায়ের সন্তান। আজ যেমন বাঁদরটা একা, ঠিক সেই ভাবেই কোনও দিন হয়তো নোরাইরোহারাকেও একা এবং অসহায় অবস্থায় লুকিয়ে থাকতে হবে কোনও এক গাছের আড়ালে। কোনও হিংস্র জন্তুর থেকে প্রাণ বাঁচাতে প্রার্থনা করতে হবে লুপুনা গাছের কাছে।

জঙ্গলে শিকার আর শিকারির পরিচয় বদলাতে সময় লাগে না। চার পাশ শান্ত, থমথমে। টুপটাপ বৃষ্টির ফোটা পড়ার আওয়াজে চার পাশ বেশ মোহময় । বসে বসে এ সবই ভাবছিল নোরাইরোহারা। ঠিক তখনই এক ফালি রোদ পাতার ফাঁক দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল ওর সামনে। বৃষ্টি থেমে গিয়েছে। আমাজন জঙ্গলের এই অঞ্চলের বৃষ্টি এ রকমই। এই আছে এই নেই। কেরেচা আবারও এক হাতে ফুঁবন্দুক তুলে চিৎকার করে উঠল, “হুইইইইইই...উহু...হুস।”

উপরে গাছের মগডালে তাকাল নোরাইরোহারা। খালি। মুহূর্তের মধ্যে ঝাঁপিয়ে উঠে তারস্বরে চিৎকার করল, “হুইইইইইই...উহু...হুস।” আর তার পরেই আবার শুরু হল দৌড় দৌড়। রক্ত যেন ফুটছে তার। চোখে আগুন। বড় বড় পা ফেলে এমন দৌড় দিল, যেন উড়ছে! এই অবস্থায় দল থেকে বিছিন্ন হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। রাস্তাও হারিয়ে ফেলতে পারে। কোমরে গোঁজা কাতানটা বের করে গাছের গায়ে দাগ কাটতে কাটতে এক প্রকার উড়তে থাকল ও। আবারও শিকারকে ক্লান্ত করে ফেলতে হবে। শিকারের রক্তকে ছুটিয়ে দিতে হবে আলোর মতো। ঘন জঙ্গলের ভিতরটা প্রায় অন্ধকার। সাঁই সাঁই করে ছুটছিল। সেই সঙ্গে “হুইইইইইই...উহু...হুস” চিৎকার।

সেই চিৎকার থেমে গেল কিছু ক্ষণেই। থমকে দাঁড়াল ও। ঘন কালো অন্ধকার জঙ্গলের মাঝেই একটা ফুটবল মাঠের মতো খালি জায়গা। একটাও গাছ নেই। গাছ, ঝোপঝাড় একেবারে কচুকাটা করে কাটা। উপর থেকে মেঘ সরে গিয়ে আছড়ে পড়ছে রোদ। আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে গেল নোরাইরোহারার। জঙ্গলের আনাচকানাচ ও ভালই চেনে। দু'দিন আগেও জায়গাটা এ রকম ছিল না। রোদ তো দূর, বৃষ্টির জলও মাটিতে পড়তে সময় নিত প্রায় মিনিট দশেক।

হতবাক হয়ে জায়গাটাকে দেখছিল ও। সামনে তিন মানুষ উঁচু তারজালির বেড়া। বেড়াটাকে পরিখার মতো ঘিরে রেখেছে সরু একটা নর্দমা। নর্দমায় মিষ্টি গন্ধের তরল। সাপ, কীটপতঙ্গ তাড়ানোর ব্যবস্থা। গন্ধটা নাকে আসতেই বুঝল নোরাইরোহারা। ভিতরে নকল ঘাসের মাঠ। আর তার মাঝখানে বিশালাকায় একটা ধাতব ঘর। মাঠে তাগড়াই চেহারার গোটা দশেক কুকুর। সেই সঙ্গে চার জন কালো পোশাকের রক্ষী। হাতে লম্বা নলওয়ালা অস্ত্র। বন্দুক। নোরাইরোহারাকে দেখতেই কুকুরগুলো দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে তেড়ে এল৷ কী হিংস্র মুখ! নিজের অজান্তেই ধনুকে তির রেখে ছিলাটাকে টেনে রেখে দিয়েছে নোরাইরোহারা। ওর সহযোদ্ধারাও তত ক্ষণে ওর পাশে। কেরেচা, টাটা, ওময়োকাভা একই ভাবে দাঁড়িয়ে। ঠিক তখনই বন্দুক উঁচিয়ে ছুটে এল কালো পোশাকের রক্ষীরা। কয়েক মুহূর্ত একে অপরকে তাক করেই ওরা দাঁড়িয়ে। মাঝে শুধু একটা তারজালি আর কানফাটানো কুকুরের আওয়াজ। জঙ্গলে শিকার আর শিকারির পরিচয় বদলাতে সময় লাগে না ।

“সাবধান,” বলে এক জন রক্ষী চিৎকার করতেই ধনুকের ছিলায় আরও জোরে টান দিল নোরাইরোহারা। সঙ্গে বাকিরাও। তখনই ভিতরের ঘর থেকে হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এল দু'জন। এক জনের পরনে হাফ প্যান্ট, ধবধবে সাদা টি-শার্ট আর মাথায় বেসবল টুপি। গায়ের রং ফ্যাকাসে সাদা। চোখ দুটো কটা। অন্য জনের পরনে ডাংরি প্যান্ট, ভিতর থেকে উঁকি দিচ্ছে সাদা টি-শার্ট। নোরাইরোহারাদের দেখতেই টুপিপরা লোকটা দু'হাত তুলে নিজের ভাষায় কী যেন বলল।

নোরাইরোহারা বুঝতে পারল না। তবে মুহূর্তের মধ্যে বন্দুক নামিয়ে দিল রক্ষীরা। সেই দেখে ধনুক নামাল নোরাইরোহারার সঙ্গীরাও। নামাল না শুধু নোরাইরোহারা। কুকুরগুলো তখন শান্ত। তবে নোরাইরোহারার শরীর জ্বলছে। ধকধক করছে হৃৎপিণ্ড। টুপিপরা লোকটার মুখটা দেখেই বুঝে গিয়েছিল, জীবনের আসল শিকারটা এখন ওর সামনে। মারতেই হবে। কিন্তু বাধা দিল দাদু। ফিসফিস করে বলল, “শান্ত হও। এমনি এমনি কাউকে মারতে পারি না আমরা।”

প্রতিশোধ শব্দটা তখন তার জিভের ডগায়। তবুও বলল না। দাঁতে দাঁত ঘষে, “শিকার আমি পেয়ে গেছি। তোমাকে আমি দেখে নেব জোনাটাস,” বলেই ধনুক নামাল। রাগে তাক করা তিরটাকে ভেঙে ছুঁড়ে দিল অনেকটা দূরে। সব শেষে চুপচাপ পা বাড়াল ফিরতি পথে। পিছনে তারজালি ঘেরা জায়গাটা থেকে তখনও টুপি পরা জোনাটাস উত্তেজনায় নিজের ভাষায় আর আধা খাপছাড়া নোরাইরোহারাদের ভাষায় কী সব বলেই যাচ্ছে।

তার সে সব কথা নোরাইরোহারাদের ভাষায় অনুবাদ করে সাদা ডাংরি প্যান্ট পরা ড্যানিয়েলও বলে চলেছে, “দাঁড়াও। কথা আছে তোমাদের সঙ্গে। আমরা তোমাদের উপকার করতে এসেছি। ক্ষতি করব না আমরা।”

লোকটার বলা কথাগুলো কানে এল নোরাইরোহারার। কিন্তু থামাতে পারল না নিজেকে। জোনাটাসের মতো বিশ্বাসঘাতকের কথা আর কেউ শোনে! ন্যাড়া বেলতলায় এক বারই যায়।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%