অষ্টম অধ্যায়

ধ্রুব মুখোপাধ্যায়

ভোর ভোর বেরিয়ে পড়েছিল জোনাটাস। ফেরার পথে স্পিডবোটে এক প্রকার ফুঁসছিল। লোভ, খিদে, ব্যর্থতা- সব মিলেমিশে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে দিচ্ছিল ওর মন। ভেবেছিল, কোম্পানির কাজ করতে করতেই নিজের আখেরটাও গুছিয়ে নেবে। কাঠের ব্যবসা, পশু-পাখির ব্যবসা করে বাড়তি টাকা কামাবে। কিন্তু শুরুতেই এই! ধাক্কাটা হজম হচ্ছিল না। চোরা কারবারের ব্যবসায় এক বার বদনাম হয়ে গেলে আর সেই দিক মাড়ানো মুশকিল। তবে পাখির ব্যবসা গেলেও পশুর ব্যবসায় হাত দেওয়া তখনও বাকি। কিন্তু কাজটা কে করল?

প্রশ্নটা বেশ কয়েক বার করেছে জোনাটাস। এমনকি বোটে কেউ এসেছিল কিনা তাও জানতে চেয়েছিল ওর লোকেদের কাছে? কিন্তু ড্যানিয়েল বা বোটের চালক কেউই কিছু বলতে পারেনি। কাটুর দলের লোক ছাড়া কে-ই বা আর আসবে? কে আছে এই জঙ্গলে! ভেবেছিল, গিয়েই বন্দুক তুলবে ওদের দিকে। বলবে, “জোনাটাসের সঙ্গে চালাকি!”

ঠিক সেই সময়েই চোখ গেল নদীর পারে। তখন ওরা জঙ্গলের অনেকটাই ভিতরে। সেই সব গাছেরই ডালে ঝুলে ঝুলে মন দিয়ে বাঁদরামো করছিল এক দল কুচকুচে কালো স্পাইডার বাঁদর। ঠিক যেন এক একটা মাকড়সা। জাল বুনতে বুনতে এগিয়ে যাচ্ছে এক গাছ থেকে অন্য গাছের ডালে। তবে যত না ফল খাচ্ছিল, তার থেকে ফেলছিল বেশি। যদিও জঙ্গলে কোনও কিছুই ফেলা যায় না। নীচে পড়তে থাকা সে সবই কুড়িয়ে খেতে চুপচাপ হাজির হয়ে গিয়েছে এক দল শূকর। রেড রিভার হগ।

আর তার সামনেই নদীর জল পর্যন্ত এগিয়ে এসেছে একটা গাছের কাণ্ড । সেই কাণ্ডর উপরেই জল থেকে উঠে আপন খেয়ালে সামনের দৃশ্য দেখছিল একটা কচ্ছপ। যদিও দৃশ্য দেখা বেশি ক্ষণ ভাগ্যে জোটেনি ওর। কিছু ক্ষণেই আরও একটা বড় মাপের কচ্ছপ এসে ব্যাটাকে ঠেলে ফেলে দিল। জোর যার মুলুক তার। এর পর আরও এল। এক এক করে কচ্ছপের দল একে অপরকে ঠেলে ফেলে, উপরে উঠে বড় থেকে ছোটর একটা লম্বা লাইন করতে না-করতেই জোনাটাস বোটটাকে থামাতে বলল। ইঞ্জিন বন্ধ হতেই কানে নানান রকমের আওয়াজ। জঙ্গলে কানের বিশ্রাম নেই। এক দল স্পিক্সস গুয়ান, রেড রিভার হগগুলোর সঙ্গে খুঁটে খুঁটে খাচ্ছিল নদীপারের পোকামাকড়। স্পিক্সস গুয়ান অনেকটা দেশি মোরগের মতো দেখতে। তবে লাল রঙের ঝুঁটিটা গলার নীচে।

বেশ সাবধানী পাখি। মুহূর্তের মধ্যেই নদীর জলে টুক টুক করে উঠে এল বেশ কতগুলো পাথর। যেন জলের স্তর নেমে গিয়ে নদীর তলা থেকে ওঠে এল।

চোখ স্থির করে দেখল জোনাটাস। পাথর নয়, চোখ দুটোকে জলের উপরে তুলেছে দু'খানা ব্ল্যাক কেইমেন। এক প্রকার কুমির। সেই চোখের অভিমুখ বরাবর সোজা তাকালেই একটা হরিণ। রেড ব্রোকেট হরিণ। স্পাইডার বাঁদরের ফেলে দেওয়া ফলে ভাগ বসাতে এসেছে হয়তো। পেট ভরে খেয়ে আপাতত নদীর জলে মুখ ঠেকিয়েছে। মায়াবী চোখে পরিতৃপ্তি। কিন্তু জঙ্গলে খাদ্য আর খাদকের মাঝে কারও জায়গা নেই। তা ছাড়া দয়ামায়া দেখাতে গেলে খাবে কী। খিদে ভয়ঙ্কর জ্বালা। ব্ল্যাক কেইমেন দুটো কখন যেন হরিণটার একেবারে কাছেই চলে এসেছে। জল এতটুকুও নড়েনি। ঠিক সেই মুহূর্তেই অদ্ভুত ভাবে ডেকে উঠল স্পিক্সস গুয়ান। বিপদের সাইরেন। মুহূর্তের মধ্যে ভ্যানিস হয়ে গেল ওরা। চটপট জায়গা থেকে চম্পট দিল বাঁদরগুলোও। রেড রিভার হগেরাও তত ক্ষণে খাবার ফেলে পালাতে ব্যস্ত।

নড়ল না শুধু জল পর্যন্ত বিস্তৃত কাঠের উপরে ঘাড় উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কচ্ছপের দল। ভাল করে শুনতে পায় না ওরা। আর ঠিক সেই সময়েই একটা আগুনের হলকা। হুট করে ঝাঁপিয়ে পড়ল হরিণটার উপরে। গলায় দাঁত বসিয়ে হরিণটাকে আছড়ে ফেলল ডাঙায় । “জাগুয়ার!” ড্যানিয়েল বলতে গেলে ওর মুখ হাত দিয়ে চেপে দিল জোনাটাস।

ব্ল্যাক কেইমেন দুটোও দেরি করেনি। ঝাঁপিয়ে কোপ বসিয়ে দিল হরিণটার পায়ে। সে এক ভয়ানক যুদ্ধ! জল-স্থল সব কিছু একেবারে মিশে গিয়েছে এক হিংস্র যুদ্ধে। কেইমেন দুটো কিছু ক্ষণেই হরিণটাকে জলে নামিয়ে এনেছে অনেকটা। যদিও জাগুয়ারটা তখনও নাছোড়বান্দা। তবে শরীরের বল দিয়ে সব সময় যুদ্ধ জেতা যায় না। কিছু ক্ষেত্রে মাথাও খাটাতে হয়। শত্রুর অবস্থান, পরিস্থিতি সব কিছুর খেয়াল রাখতে হয়। হরিণটাকে ছেড়ে দিল জাগুয়ার। নদীর জল তখন লাল। জঙ্গল তো শুধু দেখার জায়গা নয়, শেখারও। জোনাটাস যেন শিখে নিল অনেক কিছু। জঙ্গলে সহাবস্থানের জন্য শুধু ক্ষমতা নয়, মাথাও খাটাতে হয়। হাজার কষ্ট হলেও মানতে হয় অনেক নিয়ম।

নোরাইরোহারাদের দিকে বন্দুক তাক করাটা কোনও ভাবেই ঠিক কাজ হবে না। তবে হরিণটাকে ছেড়ে দিলেও শিকার করা থামাল না জাগুয়ার। আবারও ধীর পায়ে কিছুটা এগিয়ে এক ঝাঁপে ধরে ফেলল দৌড়োতে থাকা একটা রেড রিভার হগ। তার পর মুহূর্তের মধ্যে শিকার নিয়ে আগুনের ফুলকির মতো হারিয়ে গেল ঘন জঙ্গলের অন্ধকারে। খিদে জোনাটাসেরও আছে। এখন দরকার শুধু শিকার। অন্য কী ভাবে নিজের লোভের খিদে মেটানো যায়, সেটা ভাবতে ভাবতেই বোট চালু করতে বলল।

চার পাশ আবারও শান্ত। আবারও সব স্বাভাবিক। আওয়াজ করতে করতে একদল ম্যাকাও পাখি নদীর উপরে আকাশে ডানা মেলেছে। যেন বলতে চাইছে, সকালের পেট ভরানোর পর্ব শেষ হল। কিন্তু জোনাটাসের তখন ভীষণ খিদে। লোভ মেটানোর খিদে। নিজের আধিপত্য বিস্তারের খিদে। সেই খিদেতেই ভিতরটা জ্বলে উঠল। বোটে রাখা রেমিংটন থার্টি ফাইভ বা লি এনফিল্ড ডবল ব্যারেল রাইফেলটাকে তুলে তাক করে গুলি ছুড়ল। ঝুপ করে নদীর জলে আছড়ে পড়ল একটা ম্যাকাও। পাখিটার সাদা লম্বাটে ঠোঁট। উপরের লাল আর নীচের আকাশি পালকগুলোকে আলাদা করে রেখেছে মাঝখানের সবুজ পালক। জলে পড়তেই কী একটা গপ করে গিলে নিল পাখিটাকে!

—“জঙ্গলে কোনও কিছুই ফেলা যায় না,” বলেই ভাবতে বসল জোনাটাস।

আপাতত কোম্পানির কাজেই মন দিতে হবে ওকে। যত বেশি রাবার, তত বেশি মুনাফা। কোম্পানির মুনাফার সঙ্গে মুনাফা হবে ওরও। নোরাইরোহারাদের চটালে ওর চলবে না। নোরাইরোহারারা তখন যেন জলের সেই ব্ল্যাক কেইমেন। সংখ্যায় বেশি, সেই সঙ্গে নিজের জায়গাতেও আছে। সেই জন্যই বিকেলের আগেই নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে নোরাইরোহারাদের ডেরাতে গেল জোনাটাস। সঙ্গে গেল ড্যানিয়েলও। ভেবেছিল, সমস্যাটা মিটিয়ে নেবে। ডেরাটা তখন শান্ত, চুপচাপ বাইরে দু'হাতে ভেষজ প্রলেপ লাগিয়ে দুই হাঁটুর মাঝে থুতনি রেখে উদাস হয়ে বসে রয়েছে নোরাইরোহারা। দেখেই ভিতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠল জোনাটাসের। যাই হোক না কেন, নোরাইরোহারা তখনও ওর তুরুপের তাস। সোনার ডিম পাড়া হাঁস। তার পর আবার গোষ্ঠীর দলপতি কাটুর ছেলে। যুবরাজ। জঙ্গলে ব্যবসা বিস্তার করতে গেলে নোরাইরোহারাকে ছাড়া চলবে না ওর।

পাশেই আমারু। দু'পাশে দুটো বাঁশের খুঁটিতে বাঁধা খেজুরের দড়ির দোলনায় বসে বসে হাতে পাতা থেঁতলে তার গন্ধ শুঁকছিল। হয়তো ভেষজ ওষুধ বানাচ্ছিল। অন্য পাশে ওদের ডেরার এক কোণে ডাঁই করে রাখা পাখি রাখার ছোট ছোট সাদা কাগজের চোংগুলো। দেখতেই মেরুদণ্ডে কে যেন আগুন ধরিয়ে দিল জোনাটাসের। বুঝতে অসুবিধে হয়নি, কাজটা কে করেছে! রাগে জ্বলে যাচ্ছিল।

তবুও দাঁতে দাঁত চেপে সামলে নিল। ড্যানিয়েল নিজে থেকেই নোরাইরোহারার কাছে যেতে উঠে দাঁড়াল আমারু। থামাল ওদের। বলল, “দূরে। এখন আসবেন না।”

বনে থেকে বাঘের সঙ্গে শত্রুতার পরিণতির ব্যাপারটা জানে জোনাটাস। তা হলে কি শত্রুতা হয়েই গেল? কিছুটা হলেও ভয় পেয়েছিল জোনাটাস। কিন্তু সেই ভয় কাটিয়ে দিয়েছিল আমারুই। স্পষ্ট করেই বলেছিল, “আপনারা শহর থেকে আসছেন। সভ্য মানুষের শরীরে প্রচুর রোগ। সেই রোগের ছোঁয়া আমরা পেতে চাই না। দয়া করে চলে যান। দু'-তিন দিন পরে সুস্থ থাকলে আসবেন।”

বেশ কয়েক বার জঙ্গলের অন্যান্য গোষ্ঠীর সঙ্গে সভ্য মানুষেরা দেখা করেছে। আর সেই দেখা করার পরিণতিতেই ছোঁয়াচে রোগ ছেঁকে ধরেছিল ওদের। আমারু ঘটনাটা শুনেছে। সেই জন্যই কথাগুলো বলল। শুনে ভিতরটা যেন স্বস্তি পেল জোনাটাসের। কিন্তু জোনাটাস যে শহরে গিয়েছিল, সেটা এরা জানল কী করে? প্রশ্নটা মাথায় নিয়েই চুপচাপ পা বাড়াল জোনাটাস।

পথে ড্যানিয়েল জোনাটাসকে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা, নোরাইরোহারার হাতে কী হয়েছে, বলো তো?”

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%