ত্রয়োদশ অধ্যায়

ধ্রুব মুখোপাধ্যায়

সুদীর্ঘ নদী, জঙ্গলের বুক চিরে বিস্তীর্ণ একটা ভূখণ্ডকে প্রায় দু'ভাগ করে দিয়েছে। সেই নদীর পার ধরে ঘুরে ঘুরে এক খণ্ড চলমান গাছের জঙ্গল খোঁজা কী সহজ কথা! তবে একেবারে যে নেই, তেমনটাও নয়। কিছু চলমান গাছের জঙ্গল পেয়েছিল ও। চোখ-মুখ আশায় জ্বলেও উঠেছিল। কিন্তু লাভের হয়নি। জঙ্গল পেলেও, লাল দেবদূত গাছটাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। রাতে গাছের উঁচু ডাল সুরক্ষিত। সেই জন্যই ‘গাছ খেকো’ স্ট্রান্সলার ফিগ গাছের উপরে চুপচাপ বসেছিল। বুড়ো গাছ। প্রায় দেড়শো বছর বয়স তো হবেই। বিশালাকায় একটা মেহগনি গাছকে জাপটে ধরে গাছটা বেড়ে উঠেছে। বেড়ে উঠে মেরে ফেলেছে মেহগনি গাছটাকে। শুধু তাই নয়, উধাও করে দিয়েছে। অস্তিত্ব বলতে উপরে পাতাবিহীন কতগুলো শুকনো ডাল ।

হয়তো এ ভাবেই জোনাটাসের মতো সভ্য মানুষেরা এক দিন শেষ করে দেবে এই জঙ্গলটাকে! এক রাশ অসহায়তা ভিড় করছিল নোরাইরোহারার মনে। সব ছেড়ে পালাতে ইচ্ছে করছিল। উপরের দিকটা ডালপালা বিছিয়ে বেশ সুন্দর মাচার মতো। সেখানেই সাবধানে শরীর এলিয়ে আকাশ দেখছিল ও। আকাশে থালার মতো চাঁদ নদীর জলে যেন রুপো গুলে দিয়েছে। হাতের অনামিকা আর বুড়ো আঙুলটাকে টান টান করে সেই ফাঁকে চাঁদটাকে আড়াল করল। আড়াল করতেই ফুটে উঠল এক গুচ্ছ তারা। তারই মাঝে ফুটে উঠল সেই মানুষটা, যার কোমরে বেল্ট আর হাতে তরোয়াল। ছেলেবেলায় তারাভরা আকাশে ঠিক এ ভাবেই দেখত ও। বাবা এসে তখন মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলত, “এ রকমই হতে হবে। যোদ্ধা! যোদ্ধারা কখনও মরে না। হারেও না। তারা শুধু যুদ্ধ করে যায়।”

এই জন্যই কাটু ওর নাম রেখেছিল নোরাইরোহারা। নোরাইরোহারা মানে যোদ্ধা।

পূর্ণিমায় জঙ্গলের আওয়াজ বদলে যায়। দূর থেকে ডেকে উঠছিল একটা পোটো পাখি। এমনিতে পোটো পাখির ডাক ভয়ঙ্কর হলেও আজকের ডাক বেশ স্বস্তির। পোটো পাখি নাকি চাঁদের জন্য কাঁদে। কেঁদে কেঁদে, চাঁদকে ডাকে। জঙ্গলে প্রচলিত লোককথার এই গল্পটা ও জানে। আর চাঁদ উঠলে এই ডাক শোনা বেশ ভাল। জঙ্গলে একে বলে, ‘ইচ্ছেপূরণের ডাক'। ইচ্ছে করছিল তক্ষুনি ছুটে যায় সেই পাখিটার কাছে। হয়তো ওখানেই সেই চলমান গাছের জঙ্গল। কিন্তু থামিয়ে দিল ওময়োকাভার বলা কথাগুলো, “পা ফেলার আগে হাজার বার ভাববে।”

যদিও খিদেটা থামতে দিল না। গাছটার নীচে কী যেন ঘোরাফেরা করছে। সাপের আওয়াজ বেশ ভালই বোঝে নোরাইরোহারা। কোনও চঞ্চল জন্তু যেন। হাতে কিছু বিষমাখানো তির নিয়ে নীচে নামতে দেরি করেনি। কিন্তু চাঁদের আলোয় স্পষ্ট দেখা গেল গিনিপিগের মতো দেখতে কতগুলো ক্যাপিবারা। দেখেই রাগে তিরগুলো ভেঙে ফেলতে ইচ্ছে করছিল। আরাধ্য নুম্মো যেন পরীক্ষা নিচ্ছেন। ক্যাপিবারা ওরা খায় না। তবে কিছু দূরে একটা স্পিক্স গুয়ান দেখেই জিনিসপত্র গাছের উপর থেকে এনে তাকে ধাওয়া করল নোরাইরোহারা। তিরটাকে ধনুকে এঁটে এগোল। স্পিক্স গুয়ানটা যেন কিছুতেই ধরা দেবে না।

ঘন জঙ্গলের ভিতরে চাঁদের আলো ঢোকে না। গাছের ফাঁকে ফাঁকে শুধু মাত্র শব্দ শুনে দৌড়। কোন দিকে যাচ্ছে, ফেরার রাস্তা পাবে কিনা, কিছুই মাথায় ছিল না। তবে মাটি দেখে নিচ্ছিল। ভিজে মাটি মানেই নদীর কাছাকাছি। সব শেষে যখন স্পিক্স গুয়ানটা সুযোগ দিল, তখন নোরাইরোহারার বিষমাখানো তির গলার নীচে গেঁথে পাখিটা একটা গাছের তলায় গোঙাচ্ছে ঠিক তখনই ডেকে উঠল সেই পোটো পাখিটা। পাখিটা ওই গাছটারই ডালে ছিল। বিশাল উঁচু গাছ। সব গাছ ছাড়িয়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে যেন আকাশ ফুঁড়ে দিয়েছে। উপরটা চাঁদের আলোয় ঝলমল করছে। সেই আলোতেই চকচক করছে বড় বড় দুটো চোখ।

নোরাইরোহারা দেখল, পোটো পাখিটা মিশে গিয়েছে গাছের ডালের সঙ্গে। সেই সঙ্গে ডেকে চলেছে প্রাণ খুলে। শুধু চাঁদ নয়, যেন নোরাইরোহারাকেও ডাকছে। এই পাখির ডাক শুনেই খুঁজতে হয় চলমান গাছের জঙ্গল। পোটো পাখির বাসা থাকে ওই গাছে। এই পদ্ধতির কথা কাটু জানত। দলপতিরা নিজেদের উত্তরসূরিদের বলে যান এই কথা। কিন্তু কাটু বলার সুযোগ পায়নি। নোরাইরোহারাও তাই জানত না। তবে জানল সকালে। পুব আকাশের আলতো আলোয় জঙ্গলটা তখন বেশ মোহময়। রাতে খেয়েদেয়ে ওই গাছটাতেই উঠে ঘুমিয়ে পড়া নোরাইরোহারাকে জাগিয়ে দিল ভোরের পাখিরা। নীচে নেমে গাছটাকে দেখতেই ভিতরটা নেচে উঠল।

গাছের একটা ডাল ভাঙতেই চমকে উঠেছিল ও। ভিতরটা লাল। এই তা হলে চলমান গাছের দল! চটপট গাছটার উপরে উঠে চার পাশটা দেখল। সামনেই মাটির অনেকটা উপরে, শিকড় উঠে আসা সারি সারি চলমান গাছ। গাছটাকে পিছনে ফেলে এগিয়ে গিয়েছে অনেকটা। আর সেই জায়গায় গজিয়ে উঠেছে অন্য গাছ। রাস্তা বদলে গিয়েছে আরান্ডুকারেন্ডার। কাটু হয়তো সুযোগ পেলে, বলত। দ্রুত গাছটার মগডালে উঠল নোরাইরোহারা। আর গাছটাকে আঁকড়ে ধরে সামনের দিকে তাকাতেই খুশিতে চিৎকার করে উঠল। সুবিশাল নদীতে তখন আছড়ে পড়ছে সকালের কমলা আলো। উপরে ডানা মেলে উড়ছে পাখি। আর তার পরেই বরফির মতো এক খণ্ড দ্বীপ। নদীটা দু'ভাগ হয়ে দ্বীপটাকে মাঝে রেখে আবারও জুড়ে গিয়েছে সামনেই। বড় গাছগাছালি নেই, তবে ছোট ছোট ঝোপঝাড় আর ঘাস যেন সবুজ রং করে দিয়েছে।

“আরেন্ডুকারেন্ডা...” নোরাইরোহারার চিৎকার ছড়িয়ে পড়ল দিগন্ত বিস্তৃত জঙ্গলে। উড়ে গেল আশপাশের পাখপাখালি। আর সব শেষে দূর থেকে ভেসে এল একটা হাওলার বাঁদরের আওয়াজ। যেন দুনিয়ার অন্য কোনও প্রান্ত থেকে ওয়াঙ্গিরু খুশি হয়ে চিৎকার করে উঠল, “তুমি পেরেছ।”

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%