ধ্রুব মুখোপাধ্যায়

কেরচা তারস্বরে চিৎকার করে উঠল, “কাহ ই কাহ ই”, অমনি থেমে গেল পাগুলো। সামনের জাবুচিকাবা গাছের মগডালে তখন সকলের চোখ স্থির। গাছটার সারা গা জুড়ে গোল গোল কালো আঙুরের মতো ফল। ব্রাজিলিয়ান আঙুর। এই ফল খেতেও বেশ সুস্বাদু। কিন্তু আজ শিকারের দিন।
সে দিকে তাকাল না কেউ।
“শুরু করো এ বার,” নোরাইরোহারার দাদু টাটা পিঠে চাপড় মেরে বলতেই চোখ ঘুরিয়ে চার পাশ দেখল ও। আকাশ কোথায়? বড় বড় গাছের পাতায় ছেয়ে আছে উপর। তবে ভাল করে খুঁজলে পাতার ফাঁকফোকর থেকে চোখে পড়ে এক চিলতে আকাশ। ঘন কালো মেঘে ঢাকা আকাশ। কাল সারা রাত বৃষ্টি হয়েছে। নীচেও তাই জল। জঙ্গলের এই অংশে অল্প বৃষ্টি হলেই জল ঢুকে পড়ে। কাছেই নদী। আর দেরি করল না নোরাইরোহারা। হাতে ধরা ফুঁ-বন্দুকটাকে উঁচিয়ে তারস্বরে গর্জে উঠল, “হুইইইইইই...উহু...হুস...”
কেঁপে উঠল জঙ্গল। ঠিক যেন সাইরেন। যদিও জাবুচিকাবা গাছটার মগডালটা তখনও স্থির। ডালে বসে থাকা ক্যাপুচিন বাঁদরটা নড়ল না একচুল। ‘কাহ ই’ মানে ওদের ভাষায় বাঁদর। চার পাশটা এক বার দেখে বাঁদরটা আপন খেয়ালে আবারও মন দিল ফল খাওয়ায়। আরও বার কয়েক চিৎকার করল নোরাইরোহারা। কিন্তু পাত্তা পেলে তো। ভিতরটা অস্থির লাগছিল। ভেবেছিল, বসেই যখন আছে তখন ফুঁ-বন্দুকে ফুঁ দিয়ে ফলায় বিষ মাখানো তিরটা ছুড়েই দেয়। এমনকি তূণীর থেকে তির নিয়ে ছুড়তেও যাচ্ছিল। কিন্তু আটকাল দাদু।
“শিকার খুব একটা সোজা কাজ নয়। শিকারিকে যেমন চটপটে হতে হয়, ঠিক তেমনই ক্ষেত্র বিশেষে অপরিসীম ধৈর্যও দেখাতে হয়,” চোখে চোখ রেখে দাদু যেন বলেই দিল।
নোরাইরোহারা আজ প্রথম শিকারে বেরিয়েছে। এর আগে অবশ্য শিকারের জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত প্রশিক্ষণ নিয়েছে ও। ঝোপঝাড়ের মধ্যে দিয়ে গা বাঁচিয়ে ছুটে যাওয়া, ঘণ্টার পর-ঘণ্টা না নড়ে এক জায়গায় নিজেকে লুকিয়ে রাখা, নানান রকমের সাঁতার, গাছের মগডালে উঠে অবস্থান বোঝা, জঙ্গলের পথঘাট চেনা, তিরের ফলায় বিষ মাখানো, তির ছোড়ার আগে হাওয়ার গতিবিধি বোঝা, আকাশছোঁয়া গাছের মগডালে ঝুলন্ত ছোট্ট ফলে নিশানা— সমস্তই শিখেছে। এমনকি পরীক্ষাও দিয়েছে। তবুও ভুল করে ফেলল। চোখে লজ্জা নিয়ে নিজেকে সংযত করল নোরাইরোহারা। তার পর মন দিয়ে দেখল গাছটাকে। প্রায় পঞ্চাশ ফুট লম্বা একটা গাছ। গাছের গায়েও খুব একটা ছাল নেই। অনেকটা দৈত্যাকার পেয়ারা গাছের মতো। ডালপালা আছে, তবে সব ফলে ভর্তি। নষ্ট করা চলবে না। জিনিস নষ্ট করা জঙ্গলের জীবনযাত্রায় নেই। এই খেয়েই হয়তো তিন-চার বেলা পেট ভরবে ওদের। সাবধানে গাছটার একেবারে নীচে গেল সে।
গিজগিজ করছে কচ্ছপ। ‘জাবুচি’ মানে কচ্ছপ, আর ‘কাবা’ মানে স্থান। গাছটার নীচে কচ্ছপ পাওয়া যায় বলেই এমন নাম। নোরাইরোহারা এ সব জানে। কচ্ছপগুলোকে ধরে নিয়ে গেলেও হয়। কিন্তু শিকারকে শনাক্ত করে ফেলার পর তার থেকে মুখ ঘোরানো মানে কাপুরুষতা। তা ছাড়া আজ ওদের শিকারের দিন।
শিকারের অনেক নিয়ম। সেই সঙ্গে নিয়ম আছে ওদের জনগোষ্ঠীরও। এই জঙ্গল ওদের মা। শুধু রক্ষণাবেক্ষণই নয়, জঙ্গল ওদের লালন-পালনও করে। পেটভরা খাবার, সারা বছরের পোশাক, দরকারি ভেষজ ওষুধ— সমস্তই দেয় এই জঙ্গল। নিয়মের এক চুল এ-দিক ও-দিক হলেই মা রুষ্ট হবেন। নিয়ম মেনে তাই সাবধানে গাছে চড়তে শুরু করল নোরাইরোহারা। ফল বাঁচিয়ে অনেকটা উপরে উঠল। তার পর জোরে জোরে দোলাল গাছটাকে। এ বারে আর পাত্তা না দিয়ে পারল না বাঁদরটা। কুচকুচে কালো গা। তবে গলা আর হাত দুটোর উপরের অংশ ঘিয়ে সাদা। লেজের শেষ অংশটা পাকানো। সেই লেজ দিয়েই ধরেছিল গাছের অন্য একটা ডাল। নোরাইরোহারা গাছটা দোলাতেই চটপট কতগুলো ফল মুখে ভরে হাত-পাগুলো শূন্যে ছুড়ে দিল। নোরাইরোহারাদের অভিসন্ধি সে যেন বুঝে গিয়েছে। তবে লেজটা গাছের ডালেই আটকে ছিল। তখনও ছাড়েনি। বার কয়েক দোল খেল। বুঝে নিতে চাইল শিকারিদের অবস্থান ।
ঠিক সেই মুহূর্তেই নোরাইরোহারা জোর গলায় “হুইই হুস হুস...” বলতেই লেজের বাঁধন খুলে দিয়ে এক ঝাঁপ। এইটাই যেন চেয়েছিল সে।
ঘাড় পর্যন্ত বিস্তৃত এলোমেলো চুল, দুটো কান চুলে ঢাকা, গাছের পাতা থেঁতলে তৈরি সবুজ রঙের তিনটে দাগ নাকের দু' পাশ থেকে চোয়াল ছাড়িয়ে গলা পর্যন্ত আঁকা। গলায় ঝোলানো একটা শুকনো ঘাসের হার। তাতে ঝুলছে পিরানহা মাছের মাড়িসমেত সারিবদ্ধ দাঁত। পশুর চামড়া দিয়ে তৈরি একটা দড়ি কাঁধের এক পাশ থেকে ঝুলে আটকে রেখেছে পিঠে ঝুলন্ত মোটা বাঁশের তূণীর। কব্জি থেকে আঙুলগুলো আগুনে পোড়া। সেই কব্জিদুটোতেই আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে শুকনো ঘাসের বালা। সেই হাতেই রয়েছে ফুঁ-বন্দুক।
কাঁধে একটা ফুট চারেকের ধনুক, যার ছিলাটা তালজাতীয় গাছের মজ্জা দিয়ে বানানো। পশুর চামড়া ঢেকে রেখেছে কোমরের নীচের অংশ। চামড়াটার সামনের দুটো পা বেঁধে রেখেছে পিছনের পা দুটো দিয়ে। তার উপরে রয়েছে ঝুলন্ত ঘন সবুজ পাতার আস্তরণ। মেদহীন কাঠ কাঠ চেহারা। সারা গা জুড়ে ঝোপঝাড়, গাছের ডালপালা, কাঁটায় কেটে যাওয়া টাটকা-পুরনো ক্ষত চোখদুটো জ্বলজ্বল করছে। এ সব নিয়েই বাঁদরটার সঙ্গে ঝাঁপ মারল নোরাইরোহারা।
জঙ্গল এখানে ভীষণ গভীর। সামনেই একটা ফুট দশেকের মোমবাতি গাছ। গায়ে ঝুলন্ত লম্বা লম্বা মোমবাতির মতো ফল। সেটারই একটা নিচু ডালে ঝুলে চট করে নেমে পড়ল নীচে। তত ক্ষণে ওর সঙ্গীরা এগিয়ে গিয়েছে অনেকটা। কাউকেই দেখা যাচ্ছে না। দৌড় দিল নোরাইরোহারা। শিকারে ওর সঙ্গে আছে দাদু টাটা-সহ ওদের গোষ্ঠীর কেরেচা আর ওময়োকাভা।
ওময়োকাভা এখন ওদের দলপতি। জঙ্গলে গা বাঁচিয়ে দৌড়তে ওস্তাদ কেরেচা নোরাইরোহারার দাদু টাটা এক কালে দলের সেরা শিকারি ছিল। দৌড়, নিশানা, শিকারের নিয়মকানুন সব কিছুতেই একেবারে তুখোড়। কিন্তু বয়সের ভারে ধার কমে গিয়েছে অনেক। তবুও দলের শিকারিদের থেকে টাটার নাম বাদ পড়েনি । কেরেচা এগিয়ে গিয়েছে বহু দূর। প্রায় বাঁদরটার সঙ্গে সঙ্গেই। তারস্বরে চিৎকার করছে “আপে আপে” মানে ‘এখানে’।
সেই শুনেই দৌড়োচ্ছে বাকি তিন জন। প্রায় ঘণ্টা দেড়েক মতো চলল এই শিকার-শিকারির দৌড়ঝাঁপ। গাছের এক ডাল থেকে অন্য ডালে এক প্রকার উড়ে চলেছে শিকার আর নীচে শিকারির দাপাদাপি। কেউ কাউকে সুযোগই দিতেই চায় না। দৌড় আর ফুঁ-বন্দুক উঁচিয়ে মুহুর্মুহু “হুইইইইইই...উহু...হুস,” আওয়াজ।
এই করতে করতেই কখন যে ওরা জঙ্গলের আরও গভীরে ঢুকে পড়েছে কেউ বুঝতেই পারেনি। তবে বুঝেছিল দলপতি ওময়োকাভা। জঙ্গলের চেহারা প্রতি মুহূর্তে বদলায়। রাস্তা খুঁজে না পেলে মৃত্যু অনিবার্য। আমাজন নদীর গতিপথ থেকে কিছুটা দূরে যেতেই তাই দৌড়োতে দৌড়োতে ধারালো কাতান দিয়ে গাছের গায়ে গায়ে একটা করে দাগ কেটে রাখছিল ও।
বাঁদরটা তখন একটা বিশাল গাছে। লাফিয়ে-ঝাঁপিয়ে, হাঁপিয়ে যাওয়া বাঁদরটা তখন আত্মরক্ষার জন্য উচ্চতা খুঁজছে। মগডালে উঠে ডালটাকে লেজ দিয়ে আঁকড়ে ধরে পিঠ এলিয়ে দিয়েছে গাছের গায়ে। এক বার নীচে শিকারিদের দিকেও তাকাল। করুণ চাহনি। এই তল্লাটে এই ক্যাপুচিন বাঁদর খুব একটা আসে না। এলেও দলবদ্ধ হয়ে আসে। এ হয়তো দলছুট। পরিণাম মৃত্যু। ভাবতেই ভিতরটা শিউরে উঠল নোরাইরোহারার। কিন্তু শিকারির কাছে দয়ামায়ার কি কোনও গুরুত্ব থাকে? বিশেষত শিকার যখন সামনে। এ তো এক যুদ্ধ৷
আর দেরি করল না নোরাইরোহারা। তূণীর থেকে বিষ মাখানো একটা তির নিয়ে ঘষতে থাকল গলায় ঝুলন্ত পিরানহা মাছের ভয়ঙ্কর ধারালো দাঁতে। বিষমাখানো অংশটাকে ঘষে ঘষে আরও ধারালো করে তুলল ও। ক্ষত মানেই রক্ত। রক্তের গতিবেগ বাড়ানোর জন্যই এত কসরত, এত তাড়া করা। সেই দ্রুতগামী রক্তে মিশে যাবে বিষ। বিষ ছড়িয়ে যাবে শরীরে, হৃৎপিণ্ডে। তার পরেই সব শেষ।
তাড়াতাড়ি ফুঁ-বন্দুকের গায়ে জড়ানো কার্পাস তুলো থেকে কিছুটা তুলো ছিঁড়ে নিল নোরাইরোহারা। তার পর মুখে নিয়ে ভিজিয়ে জড়িয়ে নিল তিরের গায়ে। ফুঁবন্দুকের নলে অনায়াসে ঢুকে যায় তির। সেই নল আর তিরের মাঝে ফাঁক থেকে যায়। নড়ে যেতে পারে। তুলো নড়তে দেয় না তিরকে। তা ছাড়াও এতে অল্প ফুঁ দিলেই অনেকটা দূরে ছিটকে যায়। ফুট দশেকের ফুঁ-বন্দুকটা পাইন কাঠের। মাঝে সরু একটা ফুটো একেবারে এ-পাশ থেকে ও-পাশ পর্যন্ত। সেই ফুটোতেই তির ঢুকিয়ে দু'হাতে শক্ত করে ধরে মুখ ঠেকাল ফুঁ-বন্দুকে। নিশানাও করল।
আর মাত্র কয়েক মুহূর্ত। দলের সঙ্গে ঘন জঙ্গলে গিয়ে নোরাইরোহারার প্রথম শিকার। প্রাণ ভরে শ্বাস নিল ও। কিন্তু সেই মুহূর্তেই ফুঁ-বন্দুকটাকে এক ঝটকায় সরিয়ে দিল ওর দাদু। খেঁকিয়ে উঠল, “করছিস কী?”
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন