ধ্রুব মুখোপাধ্যায়
কাটু কী যেন তন্ন তন্ন করে খুঁজেছিল। গাছের পাতা দেখত পাগলের মতো। কিন্তু পেলে তো! এক-একটা গাছের পাতা দেখে হতাশ হয়ে এগিয়ে যেত সামনে জঙ্গলে কত রকমের গাছ, কত রকমের পাতা। সব দেখত কাটু। আরেন্ডুকারেন্ডা থেকে ফিরে এলেও ডেরায় ফেরেনি। আমারুই উদ্ভ্রান্তের মতো ঘুরতে দেখে ফিরিয়ে এনেছিল ওকে। জিজ্ঞেস করেছিল আরান্ডুকারেন্ডার ব্যাপারে। জঙ্গলের শেষ হয়ে যাওয়ার কথাটা বলেই আপন খেয়ালে কাটু বলেছিল, “একটা অদ্ভুত পাতা! সেই অদ্ভুত পাতাওয়ালা গাছটাই বাঁচাতে পারে আমাদের।”
এর বেশি আর কিছু বলেনি। এমনকি টাটা কিংবা রামায়েচা বার বার জিজ্ঞেস করলেও বলেনি। ঠোঁটের উপরে তর্জনী ঠেকিয়ে ইশারায় বলত, “বলা বারণ।”
নিয়মের পালন ওরা করে। তাই জোর করেনি। তবে জোরাজুরি করেছিল জোনাটাস। বিশেষ করে লুপুনা গাছ কাটাতে। জোনাটাস ইচ্ছে করেই ধরে ধরে কেটে ফেলেছিল জঙ্গলের একটা একটা লুপুনা গাছ। বাঁকাতে গেলে লোহাকে গরম করতে হয়। কাটুদের দলটাকে বেঁকিয়ে নত না করে ওর শান্তি নেই। ভয় দেখিয়ে শায়েস্তা করতে চেয়েছিল ও। আর ভয় না পেলে পরবর্তী পদক্ষেপ ও ছকে রেখেছিল। জোনাটাসের সভ্যতায় নিয়ম ভাঙতে পারাই কৃতিত্বের। ওটাতেই মজা। সেই মজার অপেক্ষায় ছিল। আর তাতে খুব একটা দেরিও হয়নি। সে দিন সকালের আলো ফুটে গিয়েছে অনেক ক্ষণ। জঙ্গলের আলো-আঁধারির মাঝেই কানে আসছে পাখির ডাক। কানের পর্দাফাটানো আওয়াজ। জঙ্গলে গাছের গায়ে গাছ।
তবে এই জায়গায় গাছগুলো কিছুটা ছাড়া ছাড়া। লুপুনা গাছটাকে ঘিরে আশপাশের গাছগুলোর মাঝে বেশ কিছুটা জায়গা। লুপুনা গাছটার সামনে কিছু ক্ষণ বসল আমারু। বসতেই পাশ থেকে ডেকে উঠল পাখিটা। আওয়াজটা কেমন যেন বুককাপানো। জঙ্গলে আমারু কখনও একা একা ঘোরে না। ওষুধের জন্য পাতা জোগাড় করতে গেলেও কাউকে না-কাউকে সঙ্গে নেয়। কিন্তু ইদানীং সকালের দিকে এই চত্বরে ও একাই আসে। চুপচাপ বসে লুপুনা গাছটার সামনে। প্রার্থনা জানায়। মনে মনেই বলে, ‘কাটুর খোঁজ যেন পূর্ণ হয়।’
ও যেন খুঁজে পায় সেই পাতাওয়ালা গাছটাকে। নোরাইরোহারার জন্যও প্রার্থনা করে। যেন দলের যোগ্য শিকারি হয়ে ওঠে নোরাইরোহারা, তার যেন কোনও বিপদ না হয়–এ সবই প্রার্থনা করছিল আমারু। আর ঠিক তখনই একটা কানফাটানো বন্দুকের আওয়াজ। ভিতরটা কেঁপে উঠল। সকালের আলো ফুটলেই জঙ্গলে বেরিয়ে পড়ে জোনাটাস। ভাড়া করা কাঠুরের দল নিয়ে জঙ্গলে ইপে গাছ খোঁজে। না পেলে অন্য গাছ কাটে। রোজ দু'-তিনটে গাছ তো কাটেই। রাতে নদীতে প্রস্তুত থাকে বোট। সে সব গাছের গুঁড়ি পাচার করে শহরে।
আমারুকে দেখতেই কী যেন একটা মাথায় খেলে গিয়েছিল ওর। আর ধৈর্য ধরতে পারেনি। রাইফেলের সাইলেন্সার খুলে গাছের উপরে থাকা পাখিটাকে গুলি করল। উপরে একটা পাখির বাসাও ছিল। সেটাতেও গুলি ছুড়তে দেরি করেনি। কতগুলো পাখির বাচ্চা উপর থেকে নীচে আছড়ে পড়ে মৃতপ্রায় অবস্থায়। এগিয়ে গিয়ে ওদের হাতে তুলল জোনাটাস। আমারুও বুঝে গিয়েছিল জোনাটাসের অভিসন্ধি। কিছুটা কাতর হয়েই বলল, “দয়া করে মারবেন না। ওরা তো কোনও ক্ষতি করেনি।”
কিন্তু কে কার কথা শোনে। পাখিগুলোকে মেরেই কড়া সুরে আদেশ দিল লুপুনা গাছটা কাটার। ভাড়া-করা কাঠুরেরা প্রস্তুতই ছিল। কিন্তু বাধা দিয়েছিল আমারু। ও দলপতির স্ত্রী। প্রয়োজনে যুদ্ধের জন্যও প্রস্তুত। বিরাট লুপুনা গাছটাকে দু'হাতে যতটা সম্ভব আঁকড়ে ধরে বলেছিল, “এই গাছ আমি কাটতে দেব না। কাটলে আমাকে কাটুন।”
জোনাটাসের মাথায় তখন রামায়েচার বলা কথাগুলো, ‘লুপুনা গাছে হাত দিলে আমরা তার আঙুল কেটে দিই।' সেই সঙ্গে কাটুর মুখটা। কাটুই ওকে বলেছিল, ‘জঙ্গলের ক্ষতি হলে চুপ থাকতে পারব না ।
আজ যেন সেই দিন! জঙ্গলের নয়, কাটুর ক্ষতি করার দিন। সর্বনাশ করলে যদি ভয় পায়। যদি ভয় পেয়ে আর নাক না গলায় ওরা। ভাবতে ভাবতেই আমারুর আঙুল লক্ষ করে গুলি ছুড়ল জোনাটাস। কিন্তু গুলিটা অবাধে ঢুকে গেল আমারুর গায়ে। রক্তে ভিজে গেল ওর শরীর। তবুও জোনাটাস থামেনি। লক্ষ্যভেদের নেশায় তখন পাগল জোনাটাস। একটার পর-একটা গুলি চালিয়ে গিয়েছিল। প্রত্যেকটাই লেগেছিল আমারুর শরীরে।
ধীরে ধীরে আমারুর নিথর শরীরটা লুপুনা গাছটার গা বেয়ে বসে পড়ল গাছটারই নীচে। রক্তে রক্তময়। রাগে গজগজ করতে করতে জোনাটাস এগিয়ে গিয়ে চামড়ার খাপে মোড়া পুক্কো ছুরিটা দিয়ে এক এক করে কেটে দিল আমারুর সব ক’টা আঙুল। আর তখনই পিছন থেকে একটা বুককাপানো ডাক। না কাটু বা ওর দলের কেউ নয়। ডেকেছিল ড্যানিয়েল। ড্যানিয়েল একটু পরে এসেছিল সে দিন। গুলির আওয়াজ শুনে ছুটে এসেই দ্যাখে জোনাটাসের কাণ্ড৷
“করছেন কী?” বলেই জোনাটাসকে পালাতে বলল ড্যানিয়েল। জঙ্গলে থেকে বাঘের সঙ্গে শত্রুতা আর কাটুর দলের সঙ্গে শত্রুতা একই ব্যাপার। ড্যানিয়েল সেটা ভালই বুঝেছিল। এক মুহূর্তও ওই জায়গায় থাকা মানে বিপদ। কেউ দেখে ফেললেই শেষ! জোনাটাস রাগে ফুঁসলেও ড্যানিয়েলের কথা শুনেছিল সে দিন। প্রাণের ভয় ওর ভীষণ। প্রাণপণে তাই চেয়েছিল, আমারুর শরীরটা যেন বাঘের পেটে যায়, যেন কাটুদের হাতে না যায়।
আমারুর দেহ যখন ডেরায় এল, তখন মাঝরাত। উপরের আকাশ স্লেটের মতো কালো। মেঘে ঢাকা কালো আকাশের নীচে দড়ির খাটিয়ায় শোয়ানো ছিল আমারুর দেহ। আমারুর ফিরতে দেরি দেখে দলের লোকেরাই তাকে খুঁজতে গিয়েছিল। আরেন্ডুকারেন্ডা থেকে আসার পর সে দিনই প্রথম গাছের পাতা ছেড়ে কাটু পাগলের মতো খুঁজেছিল আমারুকে। জঙ্গল, নদীর পার, ঝর্না কোথাও বাদ রাখেনি। এমনকি সন্ধে গড়িয়ে রাত হয়ে গেলেও থামেনি। মোমে চোবানো তুলো পশুর হাড়ের মাথায় লাগিয়ে আগুন জ্বালিয়ে রাতেও খুঁজেছিল।
অবশেষে পাওয়া গেল নদীপারেই। লতানো পাতাওয়ালা গাছের উল্কি আঁকা বাহুমূল দেখেই হাত-পা অসাড় হয়ে গিয়েছিল কাটুর। তত ক্ষণে জন্তুরা ঘিরে ধরেছিল আমারুর দেহ। জন্তুদের সঙ্গে লড়ে আমারুকে উদ্ধার করে নিয়ে এসেছিল ডেরাতেই। আমারুর মুখটা তখনও খোলা। চোখ দুটো স্থির। তবে দেহের বাকি অংশ ঢাকা একটা চামড়ার চাদরে। নোরাইরোহারা তখন ছোট। জীবন আর মৃত্যুর মাঝে থাকা জটিল হিসেবও তখনও শেখেনি। ভেবেছিল, কিছু ক্ষণেই হয়তো আমারু উঠবে। উঠেই রেগেমেগে বলবে, “এখনও জেগে আছিস?”
কিন্তু আর ওঠেনি। জোরে জোরে খাটিয়াটাকে নেড়েছিল নোরাইরোহারা। সব শেষে চাদরে ঢাকা একটা হাত চোখে পড়েছিল ওর। হাতটাকে খুবলে খেয়েছে হিংস্র জন্তু। তার পরেই চোখ গিয়েছিল হাতটার একেবারে শেষে। একটাই আঙুল অবশিষ্ট। কিন্তু সেটাকে কেউ যেন কেটে দিয়েছে। সেই ওয়াঙ্গিরুর লেজের মতোই। ছোট হলেও জোনাটাসকে বুঝত ও।
রামায়েচাও বলেছিল, ও কাজ জোনাটাসের। কিন্তু কারও বিশ্বাস হয়নি। মানুষ যে মানুষকে এ ভাবে মারতে পারে, সেটা ওদের কল্পনারও অতীত। আঁতকে উঠেছিল ওরা। রাগে-দুঃখে ভিতরটা ফালা ফালা হয়ে গিয়েছিল কাটুর। কাটু বুঝেছিল, সহ্যের একটা সীমা থাকে। নিয়মের ধার ধারতে গিয়ে তো দলটাই এক দিন শেষ হয়ে যাবে। তবে দলপতি হলেও দলের নিয়ম মেনেই কাজ করতে হয়। তাই সদলবলেই এগিয়ে গিয়েছিল জোনাটাসের ডেরায়। চিৎকার করে ডেকেছিল ওকে। কিন্তু কোথায় জোনাটাস?
ড্যানিয়েল বেরিয়ে এসে বলেছিল, “জোনাটাস তো নেই। গত তিন দিন হল শহরে গেছে। তা ছাড়া যে আমারু ওকে প্রাণে বাঁচিয়েছিল, সেই আমারুকে ও মারবে? ভাবলেন কী করে!”
ড্যানিয়েলের কথা সে দিন কোনও এক জাদুবলে দলের অনেকে বিশ্বাস করেছিল। কিন্তু বিশ্বাস হয়নি নোরাইরোহারা আর কাটুর। ওরা জানত কাজটা জোনাটাসেরই।
—“কাজটা বোধ হয় জোনাটাসের না,” ফিসফিস করে দলের লোকেরা বলছিল।
—“আমার যা ক্ষতি হওয়ার হয়েই গিয়েছে। কিন্তু এর পর এই দলের যেন আর কোনও ক্ষতি না হয়!” তারস্বরে চিৎকার করেছিল কাটু।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন