ধ্রুব মুখোপাধ্যায়
“একটানা বৃষ্টি হলেই উপচে পড়ে নদীর জল। হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ে নদীর কাছাকাছি জঙ্গলে। শুরু হয়ে যায় বাঁচার লড়াই। জঙ্গলের মাটিতে থাকা পোকামাকড়, কেঁচো, কেন্নো, পিঁপড়ে সকলেই বাঁচতে তখন উঠে পড়ে গাছের কাণ্ড ধরে। গুঁড়ি আঁকড়ে অপেক্ষা করে জল নামার। গুঁড়িগুলোতে পোকামাকড় গিজগিজ করে। এক অদ্ভুত জীবনযুদ্ধ। সকলেই তখন শিকার। শিকারি শুধু প্রকৃতি। তার পর বৃষ্টি কমে, জল নামে। সেই জলই জঙ্গলের মাটিতে পড়ে থাকা সমস্ত কিছু ধুয়ে মুছে নিয়ে গিয়ে ফেলে নদীর বুকে। নদীও তাদের বয়ে নিয়ে যায় ধীরে ধীরে, মিলিয়ে দেয় মহাসাগরে। কিন্তু সব কিছুকে কী পারে! যেখানে নদীর গভীরতা কম, নদীর জল বাঁক ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত, সেখানেই প্রশ্রয় পেয়ে যায় প্রাকৃতিক আবর্জনা। শুধু মানুষ নয় প্রশ্রয় পেলে মাথায় চড়ে পৃথিবীর সব কিছুই। গেঁড়ে বসে ওরা। নদীকে বাধ্য করে রাস্তা বদলাতে। আর নদীর মাঝখানে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে দ্বীপ ৷
“নদীর তলায় শক্ত পাথর ছিল অনেকটা জায়গা জুড়ে। নদীর গভীরতাও ছিল না ততটা। সেই সঙ্গে ছিল নদীর বাঁক। পশ্চিম থেকে পূর্বে বইতে বইতে নদীপথ হুট করে নীচের দিকে নেমে গিয়েছে। দক্ষিণে। তার পর বাঁকতে, বাঁকতে কিছুটা এগিয়ে চতুর্থীর চাঁদের মতো সোজা উঠে গিয়েছে উপরে, উত্তরে। সব শেষে আবারও সেই পশ্চিম থেকে পূর্বে। এই বাঁকটার পরেই সেই দ্বীপ আরান্ডুকারেন্ডা,” রামায়েচা যখন কথাগুলো বলছে তখন মেঘ সরে আকাশে ঝলমল করছে চাঁদ। জ্যোৎস্না লুটোপুটি খাচ্ছে ডেরাতে। আর ঘুমোতে পারেনি নোরাইরোহারা।
টাটা ঘুমিয়ে গেলেও নোরাইরোহারা বেরিয়ে এসেছিল। রামায়েচা অদ্ভুত মানুষ । আগুনে চোখ গেলেও বাকি ইন্দ্রিয়গুলো এখনও সতেজ, সজাগ। চার পাশ খোলা ছাউনি থেকে হাত কুড়ি দূরের ঝুপড়ির কথা ওর কানে আসতে সময় নেয়নি। এমনকি গভীর রাতে ওর কাছাকাছি আসা নোরাইরোহারাকে বুঝতেও। নিজে থেকেই আরান্ডুকারেন্ডার উৎপত্তির ঘটনাটা পুরোটাই বলল। কিন্তু এ সব নোরাইরোহারার জানা। আরান্ডুকারেন্ডার আলোচনা গোষ্ঠীতে হামেশাই হয় । জঙ্গলের আনাচকানাচও ওর ঠোঁটস্থ। দলের লোকে যেতে দিক বা না দিক, নোরাইরোহারা আরান্ডুকারেন্ডা যাবেই। জোনাটাসকে শেষ করবেই ও। আর সেই শেষ করার উপায়টাই হয়তো লেখা আছে ওখানে। দরকার শুধু আরান্ডুকারেন্ডা যাওয়ার রাস্তাটা। আরান্ডুকারেন্ডা মানে গ্রন্থাগার। তবে এ জায়গা বইয়ে ঠাঁসা গ্রন্থাগার নয়। দলের খুব সুরক্ষিত একটা জায়গা। সেখানে বই নেই, আছে শিলালিপি।
ছেলেবেলা থেকে এ সব শুনেই বড় হয়েছে নোরাইরোহারা। হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে এই জঙ্গলেই ওদের বাস। কত মানুষ এসেছে, গিয়েছে। কত রকম কাজকর্ম তাদের। আরান্ডুকারেন্ডায় স্লেটের মতো পাথরে খোদাই করে রাখা আছে ওদের পূর্বপুরুষদের নানা আবিষ্কার, সামাজিক নীতি, ভবিষ্যদ্বাণী, এমনকি নানা সমস্যার সমাধানও। ভেষজ ওষুধ থেকে অস্ত্রশস্ত্রের ব্যবহার— কত কিছু খোদাই করে লিখে রাখা আছে। কিন্তু আরান্ডুকারেন্ডাতে যাওয়ার রাস্তাটা ও জানে না।
যদিও সে সবে একেবারেই পাত্তা দিল না রামায়েচা। উল্টে বলল, “বাপ-ঠাকুরদার মুখে শুনেছি, বহু কাল আগে আমাজ়ন নাকি পূর্ব থেকে পশ্চিমে বইত। এক মহাসাগরের জল নিয়ে গিয়ে মিলিয়ে দিত অন্য মহাসাগরে। কিন্তু কবে একটা পর্বত গজিয়ে ওঠে নদীপথে। বিশাল পর্বতমালা। আন্দিজ়। ঘুরপথে যাওয়াটাও আর নদীর পক্ষে সম্ভব হয়নি। অগত্যা অভিমুখ বদলাতে হয়েছিল। পর্বত থেকে পূর্ব দিকের মহাসাগরে। সেই জন্যই তো আরান্ডুকারেন্ডা দ্বীপটা ত্রিভুজের মতো নয়, উল্টে অনেকটা বরফির মতো।”
আর ধৈর্য ধরছিল না নোরাইরোহারার। অগত্যা জিজ্ঞেস করে ফেলল, “কিন্তু যাব কী ভাবে? রাস্তা জানো তুমি?”
কিছু ক্ষণ চুপচাপ চার পাশ। তার পর রামায়েচা ফিসফিস করে বলল, “কেউ জানে না। যাত্রীকে খুঁজে নিতে হয়।”
হেঁয়ালি আর পোষাচ্ছিল না নোরাইরোহারার। এ দিকে শিকার না জোটায় সারা দিন কিচ্ছু খাওয়া হয়নি। ভেবেছিল, রাতেই তাকওয়ারাকে নিয়ে জঙ্গলে যাবে। জাবুচিকাবা গাছের ফল বা নীচের কচ্ছপগুলো ধরে প্রাতরাশ করবে। উঠতেই যাচ্ছিল। কিন্তু ঠিক সেই সময় আপন খেয়ালে রামায়েচা বলতে শুরু করল, “নদীপারে খুঁজলে একটা চলমান গাছের জঙ্গল পাওয়া যায়। চলমান মানে মাটির উপরে থাকা শিকড়গুলো জলের দিকে গাছটাকে এগিয়ে নিয়ে যায়। খুব ধীর গতিতে হলেও ওই জঙ্গলের রাস্তাঘাট বদলে যায়। বদলে যায় জঙ্গলের অবস্থান। সেই জঙ্গলেরই মাঝে আছে একটা মাত্র অ্যাঞ্জেলিম ভারমেলহো গাছ। মস্ত লম্বা। একেবারে আকাশ থেকে দেবতাদের মর্তে নামার সিঁড়ি। অ্যাঞ্জেলিম মানে দেবদূত। দেবদূতই বটে। কাঠটা লালচে বলে ভারমেলহো। ভারমেলহো মানে লাল। সেই গাছের মগডালে উঠলে নাকি দ্বীপটা দেখা যায়। ”
চোখ দুটো জ্বলে উঠল নোরাইরোহারার। পারলে তখনই যেন সেই চলমান গাছের জঙ্গল খুঁজতে শুরু করে দেয়। কিন্তু এ বারে থামাল রামায়েচা। থামিয়ে বলল, “খবরদার! ইচ্ছে মতো চলে যাওয়া যায় না সেখানে। অ্যাঞ্জেলিম গাছটা পর্যন্ত যাওয়াই যায়, তবে তার পর যাওয়াটা কিন্তু সোজা ব্যাপার নয়। তার জন্য দলপতির অনুমতি লাগে। দলপতি অনেক জিনিসপত্র দেন। সে সব না থাকলে মৃত্যু অবধারিত। আমাদের বহু দিনের সাধনার ধন সঞ্চিত আছে ওখানে। এমন জিনিসও আছে, যাতে এই ফুটবলের মতো পৃথিবীটাকে এক মুহূর্তে চুপসিয়ে পেটানো টিনের মতো বানিয়ে দেওয়া যায়। ভুল লোক সন্ধান পেলে এক শেষ করে দেবে। খুব সাবধান। ঘুণাক্ষরেও কেউ যেন জানতে না পারে। তা ছাড়া তোমাকে এখনও দলপতি অনুমতি দেননি।”
নিজেকে সংযত করল নোরাইরোহারা। ও জানে ওদের উপরে আসা বিপদের আশঙ্কাগুলো। লোভী সভ্যতা এ সব নিয়ম, নীতি, সহাবস্থানের আদবকায়দার মর্ম বোঝে না।
—“তা হলে তুমি আমাকে এ সব বললে কেন?”
রামায়েচা হাসল। সেই বিশাল শরীরের বেমানান হাসি। বলল, “কারণ, তোমাকে আটকানো মুশকিল। তুমি যাবেই। ঠিক যে ভাবে আটকানো যায়নি তোমার বাবা, কাটুকে।”
—“বাবাকে আটকেছিলে তোমরা?”
নোরাইরোহারা জিজ্ঞেস করলে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল রামায়েচা। বলল, “আটকেছিলাম, কিন্তু শুনল কই! আরান্ডুকারেন্ডা যাওয়া দলের সমস্ত শিকারির স্বপ্ন। আমারও ছিল। ভীষণ ইচ্ছে ছিল স্বপ্নের জায়গায় এক বার অন্তত যাব। সুযোগও এসেছিল। কিন্তু কাটু তখন দলপতি। ও যাব বললে আমি তো আর কিছু বলতে পারি না। কিন্তু এখন দ্যাখো! ভাগ্যের কী পরিহাস। এখন আমার যাওয়া কেউ আটকাতে পারত না। কিন্তু নিয়তি আটকে দিল।”
—“আমার সঙ্গে চলো। আমি নিয়ে যাব তোমাকে,” নোরাইরোহারা আগ্রহের সঙ্গে বললে আবারও হাসল রামায়েচা। এ বারের হাসিটা যেন ওর পুড়ে যাওয়া শরীরে বেশ মানানসই। হাসতে হাসতেই বলল, “গেলেও দেখব কী? চোখ দুটোই তো...”
ভিতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠল নোরাইরোহারার। সেই সঙ্গে জ্বলে উঠল শরীর। দাঁতে দাঁত ঘষে বলল, “জোনাটাস!”
সকালের আকাশে তখন রং ধরতে শুরু করেছে। চাঁদটা কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছে। রামায়েচার পুড়ে যাওয়া মুখটা থমথমে। যদিও ঠোঁটের কোণে তখনও হাসি নিয়েই বলল, “অ্যাঞ্জেলিম ভারমেলহো গাছটার বিষয়ে কাউকে কিছু বোলো না। অনুমতি দেওয়ার সময় ওটা তোমাকে দলপতিই বলবে। এটাই নিয়ম। তোমার বাবা কাটু ছিল আমার প্রিয় বন্ধু। অনুমতি না দিলেও আমাকে বিশ্বাস করে এটুকুই বলেছিল ও। আমিও তোমাকে বিশ্বাস করেই বললাম।”
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন