আগমনীর সুর

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

হরিহর বাড়ির চিঠি পায়নি।

এবার বাড়ির থেকে বার হয়ে হরিহর রায় প্রথমে গোয়াড়ী কৃষ্ণনগর যায়। কারো সঙ্গে সেখানে তার পরিচয় ছিল না। শহর-বাজার জায়গা, একটা না একটা কিছু উপায় হবে—এই কুহকে পড়েই সে সেখানে গিয়েছিল ! কিছুদিন থাকবার পর খবর গেল যে, শহরের উকিল কি জমিদারের বাড়িতে দৈনিক বা মাসিক চুক্তি হিসাবে চণ্ডীপাঠ করার কাজ প্রায়ই জুটে যায়। আশায়-আশায় দিন-পনেরো কাটিয়ে বাড়ি থেকে পথ-খরচ হিসেবে সৎসামান্য যা কিছু এনেছিল ফুরিয়ে ফেলল, অথচ কোথাও কিছু সুবিধা হয়নি!

সে পড়ল মহাবিপদে। অপরিচিত জায়গা, একটি পয়সা দিয়ে সাহায্য করে এমন কেউ নেই। খোড়ে বাজারের যে হোটেলটিতে ছিল, পয়সা ফুরিয়ে গেলে সেখান থেকে চলে আসতে হল! একজনের কাছে শুনল—স্থানীয় হরিসভায় নবাগত অভাবগ্রস্ত ব্রাহ্মণ পথিককে বিনামূল্যে থাকতে ও খেতে দেওয়া হয়। অভাব জানিয়ে হরিসভার একটা কুঠুরির একপাশে সে স্থান পেল বটে, কিন্তু সেখানে বড়ো অসুবিধে। অনেকগুলো নিষ্কর্মা গাঁজাখোর লোক রাতে সেখানে আড্ডা জমায়, প্রায় সমস্ত রাত হই-হই করে কাটায়।

অতিকষ্টে দিন কাটি×য়ে সে-শহরের বড়ো-বড়ো উকিল ও ধনী গৃহস্থের বাড়িতে ঘুরতে লাগল। সারাদিন ঘুরে অনেক রাত্রিতে ফিরে এক-একদিন দেখত—তার স্থানটিতে তারই বিছানাটি টেনে নিয়ে কে নাক ডাকিয়ে ঘুমাচ্ছে! হরিহর কয়েকদিন বাইরের বারান্দায় শুয়ে কাটাল। প্রায়ই এরূপ হওয়াতে, এই নিয়ে গাঁজাখোর সম্প্রদায়ের সঙ্গে একদিন তার একটু বচসা হল। পরদিন সকালে ওরা হরিসভার সেক্রেটারির কাছে গিয়ে কী লাগাল ওরাই জানে। সেক্রেটারিবাবু নিজ বাড়িতে হরিহরকে ডাকিয়ে পাঠালেন। বললেন, তাঁদের হরিসভায় তিন দিনের বেশি থাকবার নিয়ম নেই, সে যেন অন্যত্র বাসস্থান দেখে নেয়।

সন্ধ্যার পর জিনিসপত্র নিয়ে হরিহরকে হরিসভার বাড়ি থেকে বের হতে হল।

খোড়ে নদীর ধারে এসে হরিহর অল্প একটু নির্জন জায়গায় পুঁটলিটা নামিয়ে রেখে নদীর জলে হাত-মুখ ধুল।

সারাদিন কিছু খাওয়া হয়নি। সেদিন এক কাঠের গোলায় বসে শ্যামাবিষয় গান করছিল। গোলার অধিকারী একটি টাকা প্রণামী দেয়। সেই টাকাটি ভাঙিয়ে কিছু পয়সা দিয়ে বাজার থেকে মুড়ি ও দই কিনে আনল। খাবার যেন গলা দিয়ে নামে না। মাত্র দিন দশেকের সম্বল রেখে সে বাড়ি থেকে এসেছে। আজ প্রায় দু-মাসের ওপর হয়ে গেল—এ পর্যন্ত একটি পয়সা পাঠাতে পারেনি, এতদিন কী করে তাদের চলছে। অপু বাড়ি থেকে আসবার সময় বারবার বলে দিয়েছে—তার জন্য একখানা 'পদ্মপুরাণ' কিনে আনার জন্য। ছেলে বই পড়তে বড়ো ভালোবাসে। মাঝে-মাঝে সে যে বাপের বাক্সদপ্তর খুলে লুকিয়ে বই বার করে নিয়ে পড়ে, তা হরিহর বুঝতে পারে।

বাড়ি থেকে আসবার আগে হরিহর যুগিপাড়া থেকে একখানা বটতলার 'পদ্মপুরাণ' পড়বার জন্য নিয়ে আসে। অপু বইখানা দখল করে বসল, রোজ-রোজ পড়ে—কুচুনী-পাড়ায় শিবঠাকুরের মাছ ধরতে যাওয়ার কথাটা পড়ে তার ভারী আমোদ হয়। হরিহর বলে—বইখানা দাও বাবা, যাদের বই তারা চাচ্ছে যে ! অবশেষে একখানা 'পদ্মপুরাণ' তাকে কিনে দিতে হবে—এই শর্তে বাবাকে রাজি করিয়ে তবে সে বই ফেরত দেয়। আসবার সময় বারবার বলেছে—সেই বই একখানা এনো কিন্তু বাবা এবার অবিশ্যি অবিশ্যি। দুর্গার উঁচু নজর নেই, সে বলে দিয়েছে একখানা সবুজ হাওয়াই কাপড় ও একপাতা ভালো দেখে আলতা নিয়ে যাবার জন্য। কিন্তু সেসব তো দূরের কথা, কী করে বাড়িতে সংসার চলছে সেটাই না এখন সমস্যা

সন্ধ্যার পর পূর্বপরিচিত কাঠের গোলাটায় গিয়ে সে রাতের মতো আশ্রয় নিল। ভালো ঘুম হল না—বাড়িতে কী করে কিছু পাঠায় এই ভাবনায় বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতে লাগল।

সকালে উঠে সে আবার লক্ষ্যহীনভাবে ঘুরতে লাগল। একটু শুভযোগ বোধ হয় ঘটেছিল। রক্ষিত মশাইয়ের কাঠের গোলাতেই একটা কাজের সন্ধান জুটল। কৃষ্ণনগরের কাছে এক গ্রামে একজন বর্ধিষুž মহাজন গৃহদেবতার পূজা-পাঠ করবার জন্য এমন একজন ব্রাহ্মণ খুঁজছে, যে বরাবর টিকে থাকবে। রক্ষিত মশায়ের যোগাযোগে অবিলম্বে সে সেখানে গেল, বাড়ির কর্তাও তাকে পছন্দ করলেন। থাকবার ঘর দিলেন, আদর-আপ্যায়নের কোনো ত্রুটি হল না।

কয়েকদিন কাজ করবার পরেই পূজো এসে গেল। বাড়ি যাবার সময় বাড়ির কর্তা দশ টাকা প্রণামী ও যাতায়াতের গাড়িভাড়া দিলেন। গোয়াড়ীতে রক্ষিত মশায়ের কাছ থেকে বিদায় নিতে এলে সেখান থেকেও পাঁচটা টাকা প্রণামী পাওয়া গেল। রানাঘাটের বাজারে সে স্ত্রী ও পুত্রকন্যার জন্য কাপড় কিনল। দুর্গা লালপাড় কাপড় পরতে ভালোবাসে, তার জন্য বেছে একখানা ভালো কাপড় ও ভালো দেখে আলতা কয়েক পাতা কিনল। অপুর 'পদ্মপুরাণ' অনেক সন্ধান করেও মিলল না, অবশেষে একখানা 'সচিত্র চণ্ডী-মাহাত্ম্য বা কালকেতুর উপাখ্যান' ছ-আনা দামে কিনে নিল। গৃহস্থালির টুকটাক জিনিস, সর্বজয়া বলে দিয়েছিল—একটা কাঠের চাকি-বেলুনের কথা, তাও কিনল।

i26

ও মা দুগগা, ও অপু-

দেশের স্টেশনে নেমে হাঁটতে-হাঁটতে বিকালের দিকে সে গ্রামে এসে পৌঁছোল। পথে বড়ো একটা কারও সঙ্গে দেখা হল না, দেখা হলেও সে উদবিগ্নচিত্তে কারও দিকে বিশেষ লক্ষ না করে হনহন করে বাড়ির দিকে চলল।

দরজায় ঢুকতে-ঢুকতে আপন মনে বলল—উঃ, দ্যাখো কাণ্ডখানা! বাঁশ-ঝাড়টা ঝুঁকে পড়েছে একেবারে পাঁচিলের ওপর! ভুবন কাকা কাটাবেনও না, মুশকিল হয়েচে আচ্ছা। পরে সে বাড়ির উঠানে ঢুকে অভ্যাসমতো আগ্রহের সুরে ডাকল—ও মা দুগগা, ও অপু—

তার গলার স্বর শুনে সর্বজয়া ঘর থেকে বাইরে এল। হরিহর মৃদু হেসে বলল—বাড়ির সব ভালো তো? এরা সব কোথায় গেল? বাড়ি নেই বুঝি? সর্বজয়া শান্তভাবে এসে স্বামীর হাত থেকে ভারী পুঁটুলিটা নামিয়ে নিয়ে বলল—এসো, ঘরে এসো।

স্ত্রীর অদৃষ্টপূর্ব শান্তভাব হরিহর লক্ষ করলেও তার মনে কোনো খটকা লাগল না, তার কল্পনার স্রোত তখন উদ্দাম বেগে অন্যদিকে ছুটিয়াছে—এখনই বুঝি ছেলে-মেয়ে ছুটে আসবে !

দুর্গা এসে হাসিমুখে বলবে—কী এনেচ বাবা আমার জন্যে? অমনি তাড়াতাড়ি হরিহর পুঁটুলি খুলে মেয়ের কাপড় ও আলতার পাতা এবং ছেলের 'সচিত্র চণ্ডী-মাহাত্ম্য বা কালকেতুর উপাখ্যান' ও টিনের রেলগাড়িটা দেখিয়ে তাদের তাক লাগিয়ে দেবে ! সে ঘরে ঢুকতে-ঢুকতে বলল—বেশ কাঁঠালের চাকি-বেলুন এনিচি এবার। …পরে সতৃষ্ণ নয়নে চারদিকে চেয়ে নিরাশামিশ্রিত-স্বরে বলল—কই, হ্যাঁগা, অপু-দুগগা এরা বুঝি সব বেরিয়েচে?

সর্বজয়া আর কোনো মতেই চাপতে পারল না। উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে ফুকরে কেঁদে উঠল—ওগো দুগগা কি আর আছে গো ! মা যে আমাদের ফাঁকি দিয়ে চলে গিয়েচে গো ! তুমি এতদিন কোথায় ছিলে…

গাঙ্গুলি বাড়ির পূজা অনেক কালের।

আঁসমালির দীনু সানাইদার অন্য-অন্য বছরের মতো এবারও রসুনচৌকি বাজাতে এল। সকালের আকাশে আগমনির আনন্দ-সুর বেজে ওঠে !

নতুন কাপড় পরিয়ে ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে হরিহর নিমন্ত্রণ খেতে যায়। পথে পা দিয়ে কেমন অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে—ছেলেকে বলে—এগিয়ে চলো অনেক বেলা হয়ে গিয়েচে বাবা।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%