বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
বিকালের দিকটা হঠাৎ চারদিক অন্ধকার করে কালবৈশাখীর ঝড় উঠল। অনেকক্ষণ থেকে মেঘ-মেঘ করছিল, তবুও ঝড়টা যেন খুব শীঘ্র এসে পড়ল। অপুদের বাড়ির সামনের বাঁশঝাড়ের বাঁশগুলো পাঁচিলের উপর থেকে ঝড়ের বেগে হটে ওধারে পড়াতে বাড়িটা যেন ফাঁকা ফাঁকা দেখাতে লাগল—ধুলো, বাঁশপাতা, কাঁঠালপাতা, খড় চারধার থেকে উড়ে তাদের উঠান ভরে ফেলল। দুর্গা বাড়ির বাইরে গিয়ে আম কুড়াবার জন্য দৌডাল। অপুও দিদির পিছু পিছু ছুটল ! দুর্গা ছুটতে-ছুটতে বলল—শিগগির ছোট, তুই বরং সিঁদুরকোটার তলায় থাক, আমি যাই সোনামুখি তলায়—দৌড়ো—দৌড়ো। ধুলোয় চারদিক ভরে গেছে—বড়ো-বড়ো গাছের ডাল ঝড়ে বেঁকে গাছ নেড়া-নেড়া দেখাচ্ছে। গাছে গাছে সোঁ-সোঁ বোঁ-বোঁ শব্দে বাতাস বইছে—বাগানে শুকনো ডাল, কুটো, বাঁশের খোলা উড়ে পড়ছে—শুকনো বাঁশপাতা ছুঁচালো আগাটা উঁচুদিকে তুলে ঘুরতে-ঘুরতে আকাশে উঠছে—কুকশিমা গাছের শুঁয়ার মতো পালকওয়ালা সাদা সাদা ফুল ঝড়ের মুখে কোথা থেকে অজস্র উড়ে আসছে—বাতাসের শব্দে কান পাতা যায় না !
সোনামুখি তলায় পৌঁছেই অপু মহাউৎসাহে চিৎকার করতে-করতে লাফিয়ে এদিক-ওদিক ছুটতে লাগল—এই যে দিদি, ওই একটা পড়ল রে দিদি—ওই আর একটা রে দিদি। …চিৎকার যতটা করতে লাগল, তার অনুপাতে সে আম কুড়াতে পারল না। ঝড় ঘোর রবে বেড়ে চলেছে। ঝড়ের শব্দে আম পড়ার শব্দ শুনতে পাওয়া যায় না, যদি বা শোনা যায়, ঠিক কোন জায়গা বরাবর শব্দটা হল—তা ধরতে পারা যায় না। দুর্গা আট-ন-টা আম কুড়িয়ে ফেলল, অপু এতক্ষণের ছুটাছুটিতে পেল দু-টি। তাই সে খুশির সঙ্গেদেখিয়ে বলতে লাগল—এই দ্যাখ দিদি, কত বড়ো দ্যাখ। ওই একটা পড়ল—ওই ওদিকে—
এমন সময় হইহাই শব্দে ভুবন মুখুজ্জের বাড়ির ছেলে-মেয়েরা সব আম কুড়াতে আসছে শোনা গেল। সতু চেঁচিয়ে বলল—ও ভাই, দুগগাদি আর অপু আম কুড়ুচ্ছে।
দল এসে সোনামুখিতলায় পৌঁছোল। সতু বলল—আমাদের বাগানে কেন এয়েচ আম কুড়ুতে? সেদিন মা বারণ করে দিয়েচে না? দেখি কতগুলো আম কুড়িয়েচ? পরে দলের দিকে চেয়ে বলল—সোনামুখির কতগুলো আম কুড়িয়েচে দেখেচিস টুনু? যাও আমাদের বাগান থেকে দুগগাদি—মাকে গিয়ে নইলে বলে দেব।
রানু বলল—কেন তাড়িয়ে দিচ্ছিস সতু? ওরাও কুড়ুক—আমরাও কুড়ুই।
—কুড়ুবে বইকি? ও এখানে থাকলে সব আম ও-ই নেবে। আমাদের বাগানে কেন আসবে ও— না, যাও দুগগাদি—আমাদের তলায় থাকতে দেব না।
অন্য সময় হলে দুর্গা হয়তো এত সহজে পরাজয় স্বীকার করত না, কিন্তু সেদিন মায়ের কাছে মার খেয়ে তার আবার ঝগড়া বাধাবার সাহস ছিল না ! তাই খুব সহজেই পরাজয় স্বীকার করে নিয়ে সে একটু মনমরা ভাবে বলল—অপু, আয় রে চল। পরে হঠাৎ মুখে কৃত্রিম উল্লাসের ভাব এনে বলল—আমরা সেই জায়গায় যাই চল অপু, এখানে থাকতে না দিলে বয়ে গেল—বুঝলি তো? —এখানকার চেয়েও বড়ো-বড়ো আম—তুই আমি মজা করে কুড়ুব এখন—চলে আয়।
রানু বলল—কেন ভাই ওদের তাড়িয়ে দিলে—তুমি ভারি হিংসুক কিন্তু সতুদা। রানুর মনে দুর্গার চোখের ভরসা-হারা চাহনি বড়ো ঘা দিল।
অপু অতশত বোঝেনি, বেড়ার বাইরের পথে এসে বলল—কোন জায়গায় বড়ো-বড়ো আম রে দিদি? পুঁটুদের সলতেখাগি তলায়?
কোন তলায় দুর্গা তা ঠিক করেনি, একটু ভেবে বলল—চল গড়ের পুকুরের ধারের বাগানে যাবি—ওদিকে সব বড়ো-বড়ো গাছ আছে—চল।
গড়ের পুকুর এখান থেকে প্রায় পনেরো মিনিট ধরে সুঁড়িপথে অনবরত বন-বাগান পেরিয়ে তবে পৌঁছানো যায়। অনেক কালের প্রাচীন আম ও কাঁঠালের গাছ—গাছতলায় দুর্ভেদ্য জঙ্গল। দূরে বলে এবং জনপ্রাণীর বাসশূন্য গভীর বনের মধ্যে এসব জাগায় কেউ বড়ো একটা আম কুড়াতে আসে না। কাছির মতো মোটা-মোটা অনেক কালের পুরোনো গুলঞ্চ লতা এ-গাছে ও-গাছে দুলছে, বড়ো-বড়ো প্রাচীন গাছের তলাকার কাঁটাভরা ঘন ঝোপজঙ্গল খুঁজে তলায়-পড়া আম বার করা সহজসাধ্য তো নয়ই, তার ওপর আবার ঝড়ো মেঘ এমন অন্ধকারের সৃষ্টি করেছে যে, কোথায় কী ভালো দেখা যায় না। তবুও খুঁজতে-খুঁজতে নাছোড়বান্দা দুর্গা গোটা আট-দশ আম পেল।
হঠাৎ সে বলে উঠল—ওরে অপু, বিষ্টি এল!
সঙ্গে সঙ্গে ঝড়টা যেন খানিকক্ষণ একটু নরম হল—ভিজে মাটির সোঁদা-সোঁদা গন্ধ পাওয়া গেল—একটু পরেই মোটা-মোটা ফোঁটায় চড়বড় করে গাছের পাতায়-পাতায় বৃষ্টি পড়তে শুরু করল।
—আয় আমরা এই গাছতলায় দাঁড়াই, এখানে বৃষ্টি পড়বে না। দেখতে-দেখতে চারদিক ধোঁয়াকার করে মুষলধারে বৃষ্টি নামল। বৃষ্টির ফোঁটা পড়বার জোরে গাছের পাতা ছিঁড়ে উড়ে পড়তে লাগল—ভরপুর টাটকা ভিজে মাটির গন্ধ আসতে লাগল। ঝড় একটু যে নরম পড়েছিল—তাও আবার বেশ বাড়ল। দুর্গা ও অপু যে গাছতলায় দাঁড়িয়েছিল, এমনি হয়তো হঠাৎ তার তলায় বৃষ্টি পড়ত না, কিন্তু পুবে-হাওয়ায় জলের ঝাপটা গাছতলা ভাসিয়ে নিয়ে চলল। বাড়ি থেকে অনেক দূরে এসে পড়েছে, অপু ভয়ের স্বরে বলল—ও দিদি, বড্ড যে বৃষ্টি এল !
—তুই আমার কাছে আয় …দুর্গা তাকে কাছে এনে আঁচল দিয়ে ঢেকে বলল—এ বিষ্টি আর কতক্ষণ হবে—এই ধরে গেল বলে ! বিষ্টি হল ভালোই হল—আমরা আবার সোনামুখিতলায় যাব এখন, কেমন তো?
দু-জনে চেঁচিয়ে বলতে লাগল.
নেবুর পাতায় করমচা,
হে বিষ্টি ধরে যা—
ক্কড়—ক্কড়—ক্কড়—কড়াৎ …প্রকাণ্ড বন-বাগানের অন্ধকার মাথাটা যেন এদিক থেকে ওদিক পর্যন্ত চিরে গেল। অপু ভয়ে দুর্গাকে জড়িয়ে ধরে বলল—ও দিদি !
—ভয় কী রে রাম-রাম বল—রাম-রাম-রাম-রাম—নেবুর পাতায় করমচা, হে বিষ্টি ধরে যা—নেবুর পাতায় করমচা, হে বিষ্টি ধরে যা—নেবুর পাতায় করমচা…
অপু ভয়ে চোখ বুজল।

নেবুর পাতায় করমচা,
হে বৃষ্টি ধরে যা-
দুর্গা শুষ্ক গলায় উপরের দিকে চেয়ে দেখল—বাজ পড়ছে নাকি? …গাছের মাথায় বন-ধুঁদুলের ফল দুলছে।
শীতে অপুর ঠকঠক করে দাঁতে-দাঁত লাগছিল। দুর্গা তাকে আরও কাছে টেনে এনে শেষ আশ্রয়ের সাহসে বার-বার দ্রুত আবৃত্তি করতে লাগল—নেবুর পাতায় করমচা, হে বিষ্টি ধরে যা—নেবুর পাতায় করমচা, হে বিষ্টি ধরে যা—নেবুর পাতায় করমচা…ভয়ে তারও স্বর কাঁপছিল।
সন্ধ্যা হতে বেশি দেরি নেই। ঝড়-বৃষ্টি খানিকক্ষণ থেমে গিয়েছে। সর্বজয়া বার দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। পথে জমে যাওয়া বৃষ্টির জলের ওপর ছপ-ছপ শব্দ করতে করতে রাজকৃষ্ণ পালিতের মেয়ে আশালতা পুকুর-ঘাটে যাচ্ছিল। সর্বজয়া জিজ্ঞাসা করল—হ্যাঁ মা, দুর্গা আর অপুকে দেখেছিস ওদিকে? আশালতা বলল—না, খুড়িমা, দেখিনি তো। কোথায় গিয়েচে? তারপর হেসে বলল—কী ব্যাং-ডাকানি জল হয়ে গেল খুড়িমা!
—সেই ঝড়ের আগে দু-জন বেরিয়েচে আম কুড়োতে যাই বলে, আর তো ফেরেনি! এই ঝড়-বৃষ্টি গেল, সন্দে হল, ও মা কোথায় গেল তবে?
সর্বজয়া উদবিগ্ন মনে বাড়ির মধ্যে ফিরে এল। কী করবে ভাবছে, এমন সময় খিড়কির দরজা ঠেলে আপাদমস্তক সিক্ত অবস্থায় দুর্গা আগে-আগে একটা ঝুনা নারকেল হাতে ও পিছনে-পিছনে অপু একটা নারকেলের বাগলো টেনে নিয়ে বাড়ি ঢুকল। সর্বজয়া তাড়াতাড়ি ছেলে-মেয়ের কাছে গিয়ে বলল—ওমা আমার কী হবে ! ভিজে যে সব একেবারে পান্তভাত হয়েছিস? কোথায় ছিলি বিষ্টির সময়? …ছেলেকে কাছে এনে মাথায় হাত দিয়ে বলল—ওমা, মাথাটা যে ভিজে একেবারে জুবড়ি ! পরে আহ্লাদের সঙ্গে বলল—নারকোল কোথায় পেলি রে দুগগা?
অপু ও দুর্গা দু-জনে চাপা কণ্ঠে বলল—চুপ চুপ মা—সেজোজেঠিমা বাগানে যাচ্ছে—এই গেল, ওদের বাগানের বেড়ার ধারের দিকে যে নারকোল গাছটা—ওর তলায় পড়েছিল। আমরাও বেরুচ্চি, সেজোজেঠিমাও ঢুকলো।
দুর্গা বলল—অপুকে তো ঠিক দেখেচে, আমাকেও বোধ হয় দেখেচে…পরে সে উৎসাহের সঙ্গে অথচ চাপা সুরে বলতে লাগল—একেবারে গাছের গোড়ায় পড়েছিল মা, আগে আমি টের পাইনি, সোনামুখির তলায় যদি আম পড়ে থাকে, তাই দেখতে গিয়ে দেখি বাগলোটা পড়ে রয়েছে। অপুকে বললাম—অপু বাগলোটা নে—মা-র ঝাঁটার কষ্ট, ঝাঁটা হবে। তারপরই দেখি—হাতের নারকোলটার দিকে উজ্জ্বল মুখে চেয়ে বলল—বেশ বড়ো, না মা?
অপু খুশির সুরে হাত নেড়ে বলল—আমি অমনি বাগলোটা নিয়ে ছুট।
সর্বজয়া বলল—বেশ বড়ো দোমালা নারকেলটা। ছেঁচতলায় রেখে দে, জল নিয়ে নেব। আয় সব কাপড় ছাড়িয়ে দি আগে, পায়ে জল দিয়ে রোওয়াকে ওঠ সব।
খানিক পরে সর্বজয়া কুয়োর জল তুলতে ভুবন মুখুজ্জের বাড়ি গেল। ভুবন মুখুজ্জের খিড়কি-দোর পর্যন্ত যেতেই সে শুনল, সেজো-ঠাকরুন বাড়ির মধ্যে চিৎকার করে বাড়ি মাথায় করছেন…
—একটা মুঠো টাকা খরচ করে তবে বাগান নেওয়া—মাগনা তো নয়। তার কোনো কুটোটা যদি হাঘরেদের জন্যে ঘরে ঢুকবার জো আছে ! ভাবলাম বিষ্টি থেমেচে, যাই একবার বাগানটা গিয়ে দেখে আসি—এই এত বড়ো নারকেলটা কুড়িয়ে নিয়ে একেবারে দুড়দুড় দৌড়? —এত শত্তুরতা যেন ভগবান সহ্যি না করেন—উচ্ছন্ন যাক—উচ্ছন্ন যাক—এই ভর সন্দে বেলা বলচি, আর যেন নারকোল খেতে না হয়।
সর্বজয়া খিড়কির বাইরে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ছেলে-মেয়ের কচিমুখ মনে করে সে ভাবল, যদি গালাগাল ওদের লাগে? বাবা যে লোক! দাঁতে বিষ আছে! কী করি! কথাটা ভাবতেই তার গা শিউরে উঠে সর্বশরীর যেন অবশ হয়ে গেল। সে আর মুখুজ্জে-বাড়ি ঢুকল না—ভয়ে-ভয়ে জল তুলবার ছোট্ট বালতিটা ও ঘড়া কাঁখে নিয়ে বাড়ির দিকে ফিরল।
পথে আসতে-আসতে ভাবল—যদি নারকোলটা ওদের ফেরত দিই তাহলে কি গাল লাগবে? তা কেন লাগবে—যার জিনিস তাকে তো ফেরত দেওয়া হল, তা কখনো লাগে?
বাড়িতে পা দিয়েই মেয়েকে বলল—দুগগা, নারকোলটা সতুদের বাড়ি দিয়ে আয় গিয়ে। অপু ও দুর্গা অবাক হয়ে মায়ের মুখের দিকে চেয়ে রইল।
দুর্গা বলল—একখুনি?
—হ্যাঁ, একখুনি দিয়ে আয়। ওদের খিড়কির দোর খোলা আছে। চট করে যা। বলে আয়—আমরা কুড়িয়ে পেইছিলাম, এই নাও দিয়ে গেলাম।
—অপু একটু দাঁড়াবে না মা? বড্ড অন্ধকার হয়েছে, অপু, চল আমার সঙ্গে।
ছেলে-মেয়েরা চলে গেলে সর্বজয়া তুলসীতলায় প্রদীপ দিতে দিতে গলায় আঁচল দিয়ে প্রণাম করে বলল—ঠাকুর, নারকোল তো ওরা শত্তুরতা করে কুড়তে যায়নি সে তো তুমি জানো, এ গাল যেন ওদের না লাগে। দোহাই ঠাকুর ওদের তুমি বাঁচিয়ে-বর্তে রেখো, ঠাকুর। ওদের তুমি মঙ্গল কোরো। তুমি ওদের মুখের দিকে চেয়ো, দোহাই ঠাকুর।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন