মনে পড়ে

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

দুপুরে এক কাণ্ড ঘটল।

তার মা সাবিত্রী-ব্রতের নিমন্ত্রণে গিয়েছে, হরিহর পাশের ঘরে দুপুরের খাওয়া সেরে ঘুমাচ্ছে, অপু ঘরের মধ্যে তাকের উপরের জিনিসপত্র কী নিয়ে যেতে পারে না-পারে ঘেঁটে দেখছে। উঁচু তাকের একটা ছোটো মাটির কলসি সরাতে গিয়া তার ভেতর থেকে একটা কী জিনিস গড়িয়ে মেঝের ওপর পড়ে গেল। সে সেটাকে মেঝে থেকে কুড়িয়ে দেখে অবাক হয়ে গেল। নোনা ও মাকড়সার ঝুল মাখা হলেও জিনিসটা যে কী তা বুঝতে বাকি রইল না। সেই ছোট্ট সোনার কৌটোটা—আর বছর যেটা সেজো-ঠাকরুনদের বাড়ি থেকে চুরি গিয়েছিল।

কৌটোটা হাতে নিয়ে অপু অনেকক্ষণ অন্যমনস্কভাবে দাঁড়িয়ে রইল, চৈত্র-দুপুরের তপ্ত-রৌদ্রভরা নির্জনতায় বাঁশবনের শনশন শব্দ অনেক দূরের বার্তার মতো কানে আসে। আপন মনে বলল—দিদি হতভাগী চুরি করে এনে ওই কলসিটার মধ্যে লুকিয়ে রেখে দিয়েছিল!

সে একটুখানি ভাবল, পরে ধীরে-ধীরে খিড়কি-দোরের কাছে গিয়ে দাঁড়াল—বহুদূর পর্যন্ত বাঁশবন যেন দুপুরের রৌদ্রে ঝিমাচ্ছে, সেই শঙ্খচিলটা কোন গাছের মাথায় টেনে টেনে ডাকছে, দ্বৈপায়ন-হ্রদে লুক্কায়িত প্রাচীন যুগের সেই পরাজিত ভাগ্যহত রাজপুত্রের বেদনাকরুণ মধ্যাহ্নটা! একটু দাঁড়িয়ে থেকে সে হাতের কৌটোটাকে জোরে গভীর বাঁশবনের দিকে ছুড়ে ফেলে দিল। মনে মনে বলল—রইল ওইখানে, কেউ জানতে পারবে না কোনো কথা, ওখানে আর কে যাবে?

সোনার কৌটোর কথা অপু কাউকে জানাল না, এমনকী মাকেও না।

দুপুর একটু গড়িয়ে গেলে হীরু গাড়োয়ানের গোরুর গাড়ি রওনা হল।

সকালের দিকে আকাশে একটু-একটু মেঘ ছিল বটে, কিন্তু বেলা দশটার আগেই সেটুকু কেটে গিয়ে বৈশাখী মধ্যাহ্নের পরিপূর্ণ প্রখর রোদ গাছপালায় পথেঘাটে যেন অগ্নিবৃষ্টি করছে।

পটু গাড়ির পিছনে-পিছনে অনেক দূর পর্যন্ত আসছিল, বলল—অপুদা, এবার বারোয়ারিতে ভালো যাত্রাদলের বায়না হয়েচে, তুই শুনতে পেলিনে এবার!

অপু বলল—তুই পালার কাগজ একখানা বেশি করে নিবি, আমায় পাঠিয়ে দিবি।…

আবার সেই চড়কতলার মাঠের ধার দিয়ে রাস্তা। মেলার চিহ্নস্বরূপ সারা মাঠটায় কাটা ডাবের খোলা গড়াগড়ি যাচ্ছে, কারা মাঠের একপাশে রেঁধে খেয়েছে, আগুনে কালো মাটির ঢেলা ও একপাশে কালিমাখা নতুন হাঁড়ি পড়ে আছে।

হরিহর চুপ করে বসেছিল, তার যেন কেমন-কেমন ঠেকছিল। ...কাজটা কি ভালো হল? কতদিনের পৈতৃক ভিটে, ওই পাশের পোড়ো ভিটেতে সে সব ধুমধাম তো একেবারে শেষ হয়ে গিয়েছিলই, যা-ও বা মাটির প্রদীপ টিমটিম জ্বলছিল, আজ সন্ধ্যা থেকে তা চিরদিনের জন্য নিবে গেল। পিতা রামচাঁদ তর্কালঙ্কার স্বর্গ থেকে দেখে কী মনে করবেন?

গ্রামের শেষ বাড়ি আতুরী-বুড়ির সেই দোচালা ঘরখানা যতক্ষণ দেখা গেল অপু হাঁ করে সেদিকে চেয়ে রইল। তার পরই একটা বড়ো খেজুর-বাগানের পাশ দিয়ে গাড়ি গিয়ে একেবারে আষাঢ়ু যাবার বাঁধা রাস্তার ওপর উঠল।

গ্রাম শেষ হবার সঙ্গে-সঙ্গে সর্বজয়ার মনে হল—যা কিছু দারিদ্র্য, যা কিছু দীনতা-হীনতা, যা কিছু অপমান সব রইল পেছনে পড়ে—এখন সামনে শুধু নতুন সংসার, নবীন জীবনযাত্রা, নব সচ্ছলতা !

রাত প্রায় দশটার সময় স্টেশনে এসে গাড়ি পৌঁছোল। আজ অনেকক্ষণ থেকেই কখন গাড়ি স্টেশনে পৌঁছোবে অপু সেই আশায় বসেছিল, গাড়ি থামতেই নেমে সে একদৌড়ে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে গিয়ে হাজির। সন্ধ্যা সাড়ে আটটার ট্রেন অনেকক্ষণ চলে গিয়েছে। বাবাকে জিজ্ঞাসা করে সে জেনেছে সারা রাতের মধ্যে আর ট্রেন নেই। ওই হীরু গাড়োয়ানের গোরু দুটির জন্যই এমন ঘটল, নইলে এখনি সে ট্রেন দেখতে পেত।

প্ল্যাটফর্মে একরাশ তামাকের গাঁট সাজানো, দু-জন রেলের লোক একটা লোহার বাক্সের মতো দেখতে অথচ খুব লম্বা ডান্ডাওয়ালা কলে তামাকের গাঁট চাপিয়ে কী করছে। জ্যোৎস্না পড়ে রেলের পাটি চিকচিক করছে। ওদিকে রেললাইনের ধারে একটা উঁচু খুঁটির গায়ে দু-টি লাল আলো, এদিকে আবার ঠিক সেই রকম দু-টি লাল আলো। স্টেশনের ঘরে টেবিলের ওপরে চৌপায়ায় তেলের লন্ঠন জ্বলছে। একরাশ বাঁধানো খাতাপত্র। অপু দরজার কাছে গিয়ে খানিকটা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল, একটা ছোট্টো খড়মের বউলের মতো জিনিস টিপে স্টেশনের বাবু খট খট শব্দ করছে।

i28

দিদি যেন ম্লান মুখে দাঁড়িয়ে তাদের রেল গাড়ির দিকে চেয়ে আছে !

ইস্টিশান! ইস্টিশান! বেশি দেরি নয়—কাল সকালেই সে রেলের গাড়ি শুধু যে দেখবে তা নয়—চড়বেও।

প্ল্যাটফর্ম থেকে নড়তে তার মন সরছিল না। কিন্তু তার বাবা ডাকতে এল। খড়মের বউলের মতো জিনিসটাই নাকি টেলিগ্রাফের কল, তার বাবা বলল।

অপু ফিরে দেখল—স্টেশনের পুকুর-ধারে রাঁধবার-খাবার জোগাড় হচ্ছে! আর একখানি গোরুর গাড়ি আগে থেকেই সেখানে দাঁড়িয়েছিল। আরোহীর মধ্যে আঠারো-উনিশ বছরের একটি বউ ও একটি যুবক। অপু শুনল—বউটি হবিবপুরের বিশ্বাসদের বাড়ির, ভায়ের সঙ্গে বাপের বাড়ি যাচ্ছে। তার মায়ের সঙ্গে বউটির খুব ভাব হয়ে গিয়েছে। মা খিচুড়ির চাল-ডাল ধুচ্ছে, বউটি আলু ছাড়াচ্ছে। রান্না একসঙ্গে হবে।

সকাল সাড়ে-সাতটায় ট্রেন এল!

অপু হাঁ করে অনেকক্ষণ থেকে গাড়ি দেখবার জন্য প্ল্যাটফর্মের ধারে ঝুঁকে দাঁড়িয়েছিল, তার বাবা বলল—খোকা, অত ঝুঁকে দাঁড়িয়ে থেকো না, সরে এসো এদিকে। একজন খালাসিও চেঁচিয়ে লোকজনদের হঠিয়ে দিচ্ছিল। ইস, কত বড়ো ট্রেনখানা! কী ভয়ানক শব্দ ! সামনের প্রকাণ্ড কালো মতো ধোঁয়া-ওড়ানো গাড়িটাকেই তা হলে ইঞ্জিন বলে? উঃ! কী কাণ্ড!

হবিবপুরের বউটি ঘোমটা খুলে কৌতূহলের সঙ্গে প্রবেশমান ট্রেনখানার দিকে চেয়ে থাকল।

গাড়িতে হইহই করে মোটঘাট সব উঠানো হল। কাঠের বেঞ্চি সব মুখোমুখি করে পাতা। গাড়ির মেঝেটা যেন সিমেন্টের বলে মনে হল। ঠিক যেন ঘর একখানা, জানালা-দরজা সব হুবহু।

এই ভারী গাড়িখানা, যা এসে দাঁড়িয়েছে, তা যে আবার চলবে, সে বিশ্বাস অপুর হচ্ছিল না। কি জানি হয়তো না-ও চলতে পারে, হয়তো ওরা এখনই বলতে পারে—ওগো, তোমরা সব নেমে যাও, আমাদের গাড়ি আজ আর চলবে না!

তারের বেড়ার এদিকে একজন লোক একবোঝা উলুঘাস মাথায় করে ট্রেনখানা চলে যাওয়ার অপেক্ষায় দাঁড়িয়েছিল, অপুর মনে হল লোকটি কৃপার পাত্র। আজকের দিনে যে গাড়ি চড়ল না, সে বেঁচে থাকবে কোন সুখে? …হীরু গাড়োয়ান ফটকের বাইরে দাঁড়িয়ে গাড়ির দিকে একদৃষ্টে চেয়ে আছে।

গাড়ি চলল। অদ্ভুত, অপূর্ব ঝাঁকুনি আর দুলুনি! দেখতে দেখতে মাঝেরপাড়া স্টেশন, লোকজন, তামাকের গাঁট, হাঁ-করে দাঁড়িয়ে থাকা হীরু গাড়োয়ান, সকলকে পেছনে ফেলে গাড়ি বাইরের উলুখড়ের মাঠে এসে পড়ল। গাছপালাগুলা সটসট করে দু-দিকের জানলার পাশ কাটিয়ে ছুটে পালাচ্ছে—কী বেগ! এরই নাম রেলগাড়ি! উঃ, মাঠখানা যেন ঘুরিয়ে ফেলছে! ঝোপঝাড়, গাছপালা, উলুখড়ের ছাউনি, ছোটোখাটো চাষিদের ঘর—সব একাকার করে দিচ্ছে। গাড়ির তলায় জাঁতা-পেষার মতো একটানা একটা শব্দ হচ্ছে—সামনের দিকে ইঞ্জিনের কী শব্দটা!

সে আর দিদি যেদিন দু-জনে বাছুর খুঁজতে খুঁজতে মাঠ-জলা ভেঙে ঊর্ধ্বশ্বাসে রেলের রাস্তা দেখতে ছুটে গিয়েছিল! সেদিন—আর আজ?

ওই যেখানে আকাশের তলে আষাঢ়ু-দুর্গাপুরের বাঁধা সড়কের গাছের সারি ক্রমশ দূর থেকে দূরে গিয়ে পড়ছে, ওরই ওদিকে যেখানে তাদের গাঁয়ের পথ বেঁকে এসে সোনাডাঙা মাঠে এসে উঠেছে, সেখানে পথের ঠিক সেই মোড়টিতে, গ্রামের প্রান্তের বুড়ো জামতলাটায় তার দিদি যেন ম্লানমুখে দাঁড়িয়ে তাদের রেলগাড়ির দিকে চেয়ে আছে! ...তাকে কেউ নিয়ে আসেনি, সবাই ফেলে এসেছে! তার যেন মনে হয় দিদিকে আর কেউ ভালোবাসত না, মা না, বাবা না, কেউ না। কেউ তাকে ছেড়ে আসতে দুঃখিত নয়। দিদি মারা গেলেও—দু-জনের খেলা করার পথেঘাটে, বাঁশবনে, আমতলায় সে দিদিকে যেন এতদিন কাছেকাছে পেয়েছে, দিদির অদৃশ্য স্নেহস্পর্শ ছিল নিশ্চিন্দপুরের ভাঙা কোঠাবাড়ির প্রতি গৃহ-কোণে—আজ কিন্তু সত্যসত্যই দিদির সঙ্গে তার চিরকালের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল!

হঠাৎ অপুর মন এক বিচিত্র অনুভূতিতে ভরে গেল। তা দুঃখ নয়, শোক নয়, তা কী সে জানে না। কত কি মনে এল অল্প কয়েক মুহূর্তের মধ্যে …আতুরী-ডাইনি …নদীর ঘাট …তাদের কোঠাবাড়িটা …চালতেতলার পথ …রানুদি …কত বিকাল, কত দুপুর …কতদিনের কত হাসিখেলা …পটু …দিদির মুখ …দিদির কত না-মেটা সাধ…

দিদি যেন এখনও একদৃষ্টে চেয়ে আছে।

পরক্ষণেই তার মনের অবাক ভাষা চোখের জলে আত্মপ্রকাশ করে যেন একথাই বারবার বলতে চাইল—আমি যাইনি দিদি, আমি তোকে ভুলিনি, ইচ্ছে করে ফেলেও আসিনি—ওরা আমায় নিয়ে যাচ্ছে।

সত্যই সে ভোলেনি।

বড়ো হয়ে নীলকুন্তলা সাগরমেখলা ধরণির সঙ্গে তার বড়ো ঘনিষ্ঠ পরিচয় ঘটেছিল। কিন্তু যখনই গতির পুলকে তার সারাদেহ শিউরে উঠত, সমুদ্রগামী জাহাজের ডেক থেকে প্রতিমুহূর্তে নীল আকাশের নব-নব মায়ারূপ চোখে পড়ত, হয়তো দ্রাক্ষাকুঞ্জবেষ্টিত কোনো নীল পর্বতসানু সমুদ্রের বিলীয়মান চক্রবাল-সীমায় দূর থেকে দূরে ক্ষীণ হয়ে পড়ত, দূরের অস্পষ্ট দেখতে-পাওয়া বেলাভূমি এক প্রতিভাশালী সুরস্রষ্টার প্রতিভার দানের মতো মহামধুর কুহকের সৃষ্টি করত তার ভাবময় মনে—তখনই তার মনে পড়ত এক ঘনবর্ষার রাত্রে, অবিশ্রান্ত বৃষ্টির শব্দের মধ্যে, এক পুরোনো কোঠায়, অন্ধকার ঘরে, রোগশয্যাগ্রস্ত এক পাড়াগাঁয়ের গরিব-ঘরের মেয়ের কথা—তার হারানো দিদির স্মৃতি... অপু, সেরে উঠলে আমায় একদিন তুই রেলগাড়ি দেখাবি?…

মাঝেরপাড়া স্টেশনের ডিসট্যান্ট সিগন্যালটা দেখতে-দেখতে অস্পষ্ট হতে-হতে শেষে একেবারে মিলিয়ে গেল।

i29
অধ্যায় ১৯ / ১৯
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%