বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
এবার বাড়ি থেকে যাবার সময় হরিহর ছেলেকে সঙ্গে করে নিয়ে চলল। বলল—বাড়ি থেকে কিছু খেতে পায় না, তবুও বাইরে বেরুলে দুধটা, ঘিটা পাবে—ওর শরীরটা সারবে এখন।
অপু জন্মিয়া অবধি কোথাও কখনো যায়নি। এ গাঁয়েরই বকুলতলা, গোঁসাইবাগান, চালতেতলা, নদীর ধার, বড়ো জোর নবাবগঞ্জ যাবার পাকা সড়ক—এই পর্যন্ত তার দৌড়। মাঝে-মাঝে বৈশাখ কি জ্যৈষ্ঠ মাসে খুব গরম পড়লে বিকালে দিদির সঙ্গে নদীর ঘাটে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। আজ সেই অপু সর্বপ্রথম গ্রামের বাইরে পা দিল। কয়েকদিন আগে থেকেই উৎসাহে তার রাত্রিতে ঘুম হওয়া দায় হয়ে পড়েছিল। দিন গুনতে-গুনতে অবশেষে যাবার দিন এসে গেল।
তাদের গ্রামের পথটি বেঁকে নবাবগঞ্জের সড়ককে ডাইনে ফেলে মাঠের বাইরে আষাঢ়ু-দুর্গাপুরের কাঁচা রাস্তার সঙ্গে মিশেছে। দুর্গাপুরের রাস্তায় উঠেই সে বাবাকে বলল—বাবা, যেখান দিয়ে রেল যায়, সেই রেলের রাস্তা কোন দিকে? তাহার বাবা বলল—সামনেই পড়বে এখন, চলো না ! আমরা রেললাইন পেরিয়ে যাব এখন।
সেবার তাদের রাঙি-গাইয়ের বাছুর হারিয়েছিল। নানা জায়গায় দুই-তিন দিন ধরে খুঁজেও কোথাও পাওয়া যায়নি। সে তার দিদির সঙ্গে দক্ষিণ মাঠে বাছুর খুঁজতে এসেছিল।
তার দিদি পাকা রাস্তার ওপারে বহুদূর ঝাপসা মাঠের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে কী দেখছিল, হঠাৎ সে বলে উঠল—এক কাজ করবি অপু, চল যাই আমরা রেলের রাস্তা দেখে আসি, যাবি?
অপু বিস্ময়ের সুরে দিদির মুখের দিকে চেয়ে বলল—রেলের রাস্তা, সে যে অনেক দূর ! সেখানে কী করে যাবি?
তার দিদি বলল—বেশি দূর বুঝি! কে বলেছে তোকে? ওই পাকা রাস্তার ওপারে তো—না?
অপু বলল—কাছে হলে তো দেখা যাবে। পাকা রাস্তা থেকে দেখা যায় যদি, চল গিয়ে দেখি।

এইখানে এসে তারা পথ হারিয়ে ফেলল
দু-জনে অনেকক্ষণ নবাবগঞ্জের সড়কে উঠে, চারদিকে চেয়ে দেখল। তার দিদি বলল—বড্ড অনেক দূর, বোধ হয় যাওয়া হবে না ! কিছু তো দেখা যায় না—অত দূর গেলে আবার আসব কী করে?
তার সতৃষ্ণ দৃষ্টি কিন্তু দূরের দিকে আবদ্ধ ছিল, লোভও হচ্ছিল, ভয়ও হচ্ছিল। হঠাৎ তার দিদি মরিয়াভাবে বলে উঠল—চল যাই, গিয়ে দেখে আসি অপু—কতদূর আর হবে? দুপুরের আগে ফিরে আসব এখন। হয়তো রেলের গাড়ি দেখা যাবে এখন। মাকে বলব বাছুর খুঁজতে দেরি হয়ে গেল।
প্রথম তারা একটুখানি এদিক-ওদিক চেয়ে দেখল—কেউ তাদের লক্ষ করছে কিনা। পরে পাকা রাস্তা থেকে নেমে পড়ে দুপুর রোদে ভাই-বোনে মাঠ-বিল-জলা ভেঙে সোজা দক্ষিণ মুখে ছুটল। দৌড়, দৌড়, দৌড়—
পরে যা হল, তা সুবিধাজনক নয়, খানিক দূরে গিয়ে একটা বড়ো জলা পড়ল একেবারে সামনে—হোগলা আর শোলা গাছে ভরা, এইখানে এসে তারা পথ হারিয়ে ফেলল। কোনো গ্রামও চোখে পড়ে না—সামনে ও দু-পাশে কেবল ধান-খেত, জলা আর বেতঝোপ। ঘন বেতবনের ভিতর দিয়ে যাওয়া যায় না, পাঁকে পা পুঁতে যায়। শেষে রৌদ্র এমন বেড়ে উঠল যে, শীতকালেও তাদের গা দিয়ে ঘাম ঝরতে লাগল। দিদির পরনের কাপড় কাঁটায় নানা স্থানে ছিঁড়ে গেল, তার নিজের পায়ের তলা থেকে দু-তিনবার কাঁটা টেনে-টেনে বার করতে হল। শেষে রেলরাস্তা দূরের কথা, বাড়ি ফেরাই মুশকিল হয়ে উঠল। অনেক দূরে এসে পড়েছে, পাকা রাস্তাও আর দেখা যায় না। জলা ভেঙে ধানখেত পার হয়ে যখন তারা বহুকষ্টে আবার পাকা রাস্তায় এসে উঠল, তখন দুপুর ঘুরে গেছে। বাড়ি এসে তার দিদি ঝুড়ি-ঝুড়ি মিথ্যা কথা বলে তবে নিজের ও তার পিঠ বাঁচাল।

সেই রেলের রাস্তা আজ এমনি সহজভাবে সামনে পড়বে—সেজন্য ছুটতে হবে না, পথ হারাতে হবে না—বকুনি খেতে হবে না !
কিছুদূর গিয়ে সে বিস্ময়ের সঙ্গে চেয়ে দেখল নবাবগঞ্জের পাকা সড়কের মতো একটা উঁচু রাস্তা মাঠের মাঝখান চিরে ডাইনে-বাঁয়ে বহুদূর গিয়েছে। রাঙা-রাঙা খোয়ার রাশি উঁচু হয়ে ধারের দিকে সারি দেওয়া ! সাদা-সাদা লোহার খুঁটির ওপর যেন এক সঙ্গে অনেক দড়ির টানা বাঁধা—যতদূর দেখা যায় ওই সাদা খুঁটি ও দড়ির টানা বাঁধা দেখা যাচ্ছে। তার বাবা বলল—ওই দ্যাখো খোকা, রেলের রাস্তা।
অপু একদৌড়ে ফটক পার হয়ে রাস্তার ওপর এসে উঠল। পরে সে রেলপথের দু-দিকে বিস্ময়ের চোখে চেয়ে-চেয়ে দেখতে লাগল। দুটো লোহা বরাবর পাতা কেন? …ওর ওপর দিয়ে রেলগাড়ি যায়? …কেন? মাটির ওপর দিয়ে না গিয়ে লোহার ওপর দিয়ে যায় কেন? …পিছলিয়ে পড়ে যায় না কেন? …ওগুলোকে তার বলে? তারের মধ্যে সোঁ-সোঁ কীসের শব্দ? তারে খবর যাচ্ছে? …কারা খবর দিচ্ছে? কী করে খরব দেয়? …ওদিকে কী ইস্টিশন? …এদিকে কি ইস্টিশন? শেষে অপু বলল—বাবা, রেলগাড়ি কখন আসবে? আমি রেলগাড়ি দেখব বাবা।
—রেলগাড়ি এখন কী করে দেখবে? সেই দুপুরের সময় রেলগাড়ি আসবে, এখনও দু-ঘন্টা দেরি।
—তা হোক বাবা, আমি দেখে যাব, আমি ককখনো দেখিনি, হ্যাঁ বাবা—
—ওরকম কোরো না, ওই জন্যে তো তোমায় কোথাও আনতে চাইনে—এখন কী করে দেখবে? সেই দুপুর অবধি বসে থাকতে হবে তাহলে এই ঠায় রোদ্দুরে ! চল, আসবার দিন দেখাব।
অপুকে অবশেষে জল-ভরা চোখে বাবার পেছনে-পেছনে এগিয়ে যেতে হল।
সন্ধ্যার পর তারা গন্তব্য স্থানে পৌঁছাল। শিষ্যের নাম লক্ষ্মণ মহাজন, বেশ বড়ো চাষি ও অবস্থাপন্ন গৃহস্থ। সে বাইরের বড়ো আটচালা ঘরে মহাসমাদরে তাদের থাকবার স্থান করে দিল।
লক্ষ্মণ মহাজনের ছোটো ভাইয়ের স্ত্রী সকালে স্নান করার জন্য পুকুরঘাটে এসেছিল। জলে নামতে গিয়ে পুকুরের পাড়ে নজর পড়াতে সে দেখল—পুকুর-পাড়ের কলাবাগানে একটি অচেনা ছোটো ছেলে একখানি কঞ্চি-হাতে কলাবাগানের একবার এদিক একবার ওদিক, পায়চারি করছে ও পাগলের মতো আপন মনে কী বকছে! সে ঘড়া নামিয়ে কাছে এসে জিজ্ঞাসা করল—তুমি কাদের বাড়ি এসেচ, খোকা !
অপুর যত জারিজুরি তার মায়ের কাছে। বাইরে সে বেজায় মুখচোরা। প্রথমটা অপুর মাথায় এল যে, সে টেনে দৌড় দেয়। পরে সঙ্কুচিত সুরে বলল—ওই ওদের বাড়ি।
বধূটি বলল—বটঠাকুরদের বাড়ি? তুমি বটঠাকুরের গুরুমশাইয়ের ছেলে বুঝি? ও !
বধূ সঙ্গে করে তাকে নিজের বাড়ি নিয়ে গেল। তাদের বাড়ি পৃথক , লক্ষ্মণ মহাজনের বাড়ি থেকে অতিসামান্য দূরে, কিন্তু মধ্যে পুকুরটা পড়ে।
বধূর ব্যবহারে অপুর লাজুকতা কেটে গেল। সে ঘরের মধ্যে ঢুকে ঘরের জিনিসপত্র কৌতূহলের সঙ্গে চেয়ে-চেয়ে দেখতে লাগল। ওঃ, কত কী জিনিস ! তাদের বাড়িতে এরকম জিনিস নেই। এরা খুব বড়োলোক তো ! কড়ির আলনা, রং-বেরঙের ঝুলন্ত শিকা, পশমের পাখি, কাচের পুতুল, মাটির পুতুল, শোলার গাছ—আরও কত কী ! দু-একটা জিনিস সে ভয়ে-ভয়ে হাতে তুলে নেড়ে-চেড়ে দেখল !
এতক্ষণ ভালো করে ছেলেটির মুখের দিকে চেয়ে দেখে বধূটির মনে হল যে এ এখনো ভারী ছেলেমানুষ, মুখের ভাব যেন পাঁচ-বছরের ছেলের মতো কচি। এমন সুন্দর, অবোধ চোখের ভাব সে আর কোনো ছেলের চোখে এ পর্যন্ত দেখেনি, এমন রং, এমন গড়ন, এমন সুন্দর মুখ, এমন তুলি দিয়ে আঁকা ডাগর-ডাগর নিষ্পাপ চোখ ! অচেনা ছেলেটির ওপর বধূর বড়ো মমতা হল।
অপু বসে নানা গল্প করল—বিশেষ করে গতকালের রেলপথের কথাটি। খানিকটা পরে বধূ মোহনভোগ তৈরি করে তাকে খেতে দিল। একটা বাটিতে অনেকখানি মোহনভোগ—এত ঘি দেওয়া যে আঙুলে ঘি মাখামাখি হয়ে যায়। অপু একটুখানি মুখে তুলে খেয়ে অবাক হয়ে গেল—এমন অপূর্ব জিনিস আর কখনো সে খায়নি তো ! মোহনভোগে কিশমিশ দেওয়া কেন? কই তার মায়ের তৈরি মোহনভোগে তো কিশমিশ থাকে না …বাড়িতে সে মার কাছে আবদার ধরে—মা, আজ আমাকে মোহনভোগ করে দিতে হবে। তার মা হাসিমুখে বলে—আচ্ছা ওবেলা তোকে করে দেব। পরে সে শুধু সুজি, জলে সেদ্ধ করে ও গুড় মিশিয়ে, পুলটিসের মতো একটা দ্রব্য তৈরি করে কাঁসার সরপুরিয়া থালাতে আদর করে ছেলেকে খেতে দেয়। অপু তাই খুশির সঙ্গেএতদিন খেয়ে এসেছে। মোহনভোগ যে এমন হয় তা সে জানত না। আজ তার মনে হল—এ মোহনভোগ আর মায়ের তৈরি মোহনভোগে আকাশ-পাতাল তফাত ! …সঙ্গে-সঙ্গে মায়ের ওপর করুণায় ও সহানুভূতিতে তার মন ভরে উঠল। হয়তো তার মাও জানে না যে, এরকমের মোহনভোগ হয়। সে যেন আবছায়াভাবে বুঝল তার মা গরিব, তারা গরিব, তাই তাদের বাড়ি ভালো খাওয়া-দাওয়া হয় না।
একদিন পাড়ার এক ব্রাহ্মণ প্রতিবেশীর বাড়ি অপুর নিমন্ত্রণ হল। দুপুরবেলা সে-বাড়ির একটি মেয়ে এসে অপুকে ডেকে নিয়ে গেল। ওদের রান্নাঘরের দাওয়ায় যত্ন করে পিঁড়ি পেতে, জল ছিটিয়ে, অপুকে খাবার জায়গা করে দিল। যে মেয়েটি অপুকে ডাকতে এসেছিল, নাম তার অমলা, বেশ টকটকে ফর্সা রং, বড়ো-বড়ো চোখ, বেশ মুখখানি, বয়স তার দিদির মতো। অমলার মা কাছে বসিয়ে, তাকে খাওয়ালেন, নিজের হাতের তৈরি চন্দ্রপুলি পাতে দিলেন। খাওয়ার পর অমলা তাকে সঙ্গে করে বাড়ি দিয়ে গেল।
সেদিন বিকালে খেলতে-খেলতে অপুর পায়ের আঙুল হঠাৎ বাগানের বেড়ার দুই বাঁশের ফাঁকে পড়ে আটকে গেল। টাটকা-চেরা নতুন বাঁশের বেড়া—আঙুল কেটে রক্তারক্তি হল। অমলা ছুটে পা-খানা বাঁশের ফাঁক থেকে সাবধানে বার না করলে গোটা আঙুলটাই হয়তো কাটা পড়ত। সে চলতে পারছিল না, অমলা তাকে কোলে করে গোলার পাশ থেকে পাথরকুচির পাতা তুলে বেটে আঙুলে বেঁধে দিল। পাছে বাবার কাছে বকুনি খেতে হয়, এই ভয়ে অপু একথা কারও কাছে প্রকাশ করল না।
অপু অমলার সঙ্গে তাদের বাড়ি গেল। অমলা তাদের আলমারি খুলে কাচের বড়ো মেম-পুতুল, মোমের-পাখি, শোলার গাছ আরও কতকি দেখাল। কালীগঞ্জের স্নানযাত্রার মেলা থেকে সেসব নাকি কেনা, অপু জিজ্ঞাসা করে জানল। কত নতুন-নতুন খেলার জিনিস ! একটা রবারের বাঁদর, সেটা তুমি যেদিকে চাও তোমার দিকে চেয়ে চোখ পিটপিট করবে। একটা কীসের পুতুল, সেটার পেট টিপলে মৃগীরোগীর মতো হঠাৎ হাত-পা ছুড়ে দু-হাতে খঞ্জনি বাজাতে থাকে। সবার চেয়ে আশ্চর্যের জিনিস হচ্ছে একটা টিনের ঘোড়া, রানুদির কাকা তাদের বাড়ির দালানের ঘড়িতে যেমন দম দেয়, ওই রকম দম দিয়ে ছেড়ে দিলে সেটা ঘড়-ঘড় করে মেজের ওপর চলতে থাকে—অনেকদূর যায়—ঠিক যেন একেবারে সত্যিকারের ঘোড়া। সেটা দেখে অপু অবাক হয়ে গেল। হাতে তুলে বিস্ময়ের সঙ্গে উলটিয়ে-পালটিয়ে দেখে অমলার দিকে চেয়ে বলল—এ কীরকম ঘোড়া, বেশ তো ! এ কোথা থেকে কেনা, এর দাম কত?
তার পর অমলা তাকে একটা সিঁদুরের কৌটো খুলে দেখাল—সেটার মধ্যে রাঙা রঙের একখানা ছোটো রাংতার মতো কী ! অপু বলল—ওটা কী? রাংতা? অমলা হেসে বলল—রাংতা হবে কেন? সোনার পাত দেখোনি? অপু সোনার পাত দেখেনি। সোনার রং কী এত রাঙা? সোনার পাতখানা নেড়েচেড়ে ভালো করে দেখতে লাগল। অমলার সঙ্গে বাড়ি ফিরতে-ফিরতে সে ভাবল—আহা, দিদিটার এ সব খেলনা কিছুই নেই—মরে কেবল শুকনো নাটাফল আর রড়ার বিচি কুড়িয়ে, আর শুধু পরের পুতুল চুরি করে মার খায় ! তার দিদির বয়সি অন্য কোনো মেয়ের খেলনার ঐশ্বর্য যে কত বেশি, তা সে এ পর্যন্ত কোনোদিন দেখেনি, আজ তুলনা করবার সুযোগ পেয়ে দিদির প্রতি গভীর করুণায় তার মনটা যেন গলে গেল। তার পয়সা থাকলে সে দিদিকে একটা কলের ঘোড়া কিনে দিত, আর একটা রবারের বাঁদর—তুমি যে দিকে তাকাও, তোমার দিকে চেয়ে সেটা চোখ পিটপিট করে !
বধূর কাছে একজোড়া পুরোনো তাস ছিল, ঠিক একজোড়া বলা চলে না, সেটা নানা জোড়া তাসের পরিত্যক্ত তাসগুলি এক জায়গায় জড়ো করা আছে মাত্র। অপু সেগুলিকে নিয়ে মাঝে মাঝে নাড়াচাড়া করে। রানুদির বাড়িতে মাঝে-মাঝে দুপুরবেলা তাসের আড্ডা বসত, সে বসে-বসে খেলা দেখত। টেক্কা, গোলাম, সাহেব, বিবি—কাগজ ধরা নিয়ে প্রায়ই মারামারি হয়—বেশ খেলা! সে তাস খেলতে জানে না, তার মা দিদি কেউই জানে না। এক-একদিন তার মা তাস খেলতে যায়। তার মাকে নিয়ে কেউ বসতে চায় না। সকলে বলে—ও কিচ্ছু খেলা জানে না। সে যদি একজোড়া তাস পায়, তবে সে, মা ও দিদি খেলে।
সন্ধ্যার পরে বধূর ঘরে অপুর নিমন্ত্রণ ছিল। খেতে বসে খাবার জিনিসপত্র ও আয়োজনের ঘটা দেখে সে অবাক হয়ে গেল। খুব ছোট্ট একখানা ফুলকাটা রেকাবিতে আলাদা করে নুন ও নেবু কেন? নুন-নেবু তো মা পাতেই দেয়। প্রত্যেক তরকারির জন্য আবার আলাদা-আলাদা বাটি ! —তরকারিই বা কত ! অত বড়ো গলদা চিংড়ির মাথাটা কী তার একার জন্যে? লুচি লুচি ! তার ও তার দিদির স্বপ্নকামনার পারে এক রূপকথার দেশের নীল বেলা আবছা দেখা যায়।
দিন দুই পরে হরিহর ছেলেকে নিয়ে বাড়ি এল।
এই তো মোটে ক-দিন, এরই মধ্যে সর্বজয়া ছেলেকে না দেখে আর থাকতে পারছিল না।
দুর্গার খেলা ক-দিন থেকে ভালোরকম জমেনি। অপুর বিদেশ যাত্রার দিনকতক আগে দেশি-কুমড়ার শুকনো খোলার নৌকা নিয়ে ঝগড়া হওয়াতে দু-জনের মুখ দেখাদেখি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, এখন আরও অনেক কুমড়ার খোলা জমেছে, দুর্গা কিন্তু আর সেগুলি জলে ভাসাতে যায় না—কেন মিছিমিছি এ নিয়ে ঝগড়া করে তার কান মলে দিলাম? আসুক সে ফিরে, আর কক্ষনো তার সঙ্গে ঝগড়া করব না, সব খোলা সে-ই নিয়ে নিক !

দিন দুই পরে হরিহর ছেলেকে নিয়ে বাড়ি এল
বাড়ি এসে অপু দিন পনেরো ধরে নিজের অদ্ভুত ভ্রমণকাহিনি সর্বত্র বলে বেড়াতে লাগল। কত আশ্চর্য জিনিস সে দেখেছে এই ক-দিনে! …রেলের রাস্তা, যেখান দিয়ে সত্যিকারের রেলগাড়ি যায়! মাটির আতা, পেঁপে, শশা—অবিকল যেন সত্যিকার ফল। সেই পুতুলটা, যেটার পেট টিপলে মৃগীরোগীর মতো হাত-পা ছুড়ে হঠাৎ খঞ্জনি বাজাতে শুরু করে! তারপর অমলাদি। কতদূর যে সে গিয়েছিল, কত পদ্ম ফুলে ভরা বিল—কত অচেনা নতুন গাঁ পার হয়ে কত মাঠের উপরকার নির্জন পথ বেয়ে। সেই যে কোন গাঁয়ের পথের ধারে কামার-দোকানে বাবা তাকে জল খাওয়াতে নিয়ে গেলে, তারা তাকে বাড়ির মধ্যে ডেকে নিয়ে গিয়ে যত্ন করে পিঁড়ি পেতে বসিয়ে দুধ, চিঁড়ে, বাতাসা খেতে দিয়েছিল ! কোনটা ফেলে সে কোনটার গল্প করে? রেল-রাস্তার গল্প শুনে তার দিদি মুগ্ধ হয়ে যায়, বারবার জিজ্ঞাসা করে—কত বড়ো নোয়াগুনো দেখলি অপু? তার টাঙানো বুঝি? খুব লম্বা? রেলগাড়ি দেখতে পেলি? না—রেলগাড়ি অপু দেখেনি। ওইটাই কেবল বাদ পড়েছে—সে শুধু বাবার দোষে। মোটে ঘন্টা দুই রেল রাস্তার ধারে চুপ করে বসে থাকলেই রেলগাড়ি দেখা যেত, কিন্তু বাবাকে সে কিছুতেই বুঝিয়ে উঠতে পারেনি।
বেলা হয়ে যাওয়াতে ব্যস্ত অবস্থায় সর্বজয়া তাড়াতাড়ি অন্যমনস্কভাবে সদর দরজা দিয়ে ঢুকে উঠানে পা দিতেই কী যেন একটা সরু দড়ির মতো বুকে আটকাল ও সঙ্গে-সঙ্গে কী একটা পটাং করে ছিঁড়ে যাবার শব্দ হল এবং দু-দিক থেকে দুটো কাঠির মতো কী উঠানে ঢিলে হয়ে পড়ে গেল। সমস্ত কার্যটি চক্ষের নিমিষে হয়ে গেল—কিছু ভালো করে দেখবার কী বুঝবার আগেই।
অল্পক্ষণ পরে অপু বাড়ি এল। দরজা পার হয়ে উঠোনে পা দিতেই সে থমকে দাঁড়িয়ে গেল—নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারল না—এ কী! বা রে, আমার টেলিগিরাপের তার ছিঁড়লে কে?
পরে একটু সামলিয়ে নিয়ে চেয়ে দেখল উঠানের মাটিতে ভিজে পায়ের দাগ এখনও মিলায়নি। তার মনে ভেতর থেকে কে ডেকে বলল—মা ছাড়া আর কেউ নয় ! কক্ষনো আর কেউ নয়, ঠিক মা। বাড়ি ঢুকে সে দেখল মা বসে বসে বেশ নিশ্চিন্ত মনে কাঁঠালবিচি ধুচ্ছে। সে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল এবং যাত্রাদলের অভিমন্যুর মতো ভঙ্গিতে সামনের দিকে ঝুঁকে বাঁশির সপ্তমের মতো রিনরিনে তীব্র মিষ্টসুরে বলল—আচ্ছা মা, আমি কষ্ট করে ছোটাগুলো বুঝি বন-বাগান ঘেঁটে নিয়ে আসিনি?
সর্বজয়া পেছনে চেয়ে বিস্মিতভাবে বলল—কী নিয়ে এসেচিস? কী হয়েচে?
—আমার বুঝি কষ্ট হয় না? কাঁটায় আমার হাত-পা ছড়ে যায়নি বুঝি?
—কী বলে পাগলের মতো? হয়েচে কী?
—কী হয়েচে? আমি এত কষ্ট করে টেলিগিরাপের তার টাঙালাম, আর ছিঁড়ে দেওয়া হয়েচে, না?
—তুমি যত উদঘুট্টি কাণ্ড ছাড়া তো এক দণ্ড থাকো না বাপু! —পথের মাঝখানে কী টাঙানো রয়েচে—কী জানি টেলিগিরাপ কী কি-গিরাপ, আসচি তাড়াতাড়ি, ছিঁড়ে গেল—তা এখন কী করব বলো?
পরে সে পুনরায় নিজ কাজে মন দিল।
উঃ! কী ভীষণ হৃদয়হীনতা। আগে আগে সে ভাবত বটে যে, তার মা তাকে ভালোবাসে। অবশ্য যদিও তার সে ভ্রান্ত ধারণা অনেক দিন ঘুচে গেছে—তবুও মাকে এতটা নিষ্ঠুর, পাষাণীরূপে কখনো স্বপ্নেও কল্পনা করেনি! কাল সারাদিন কোথায় নীলমণি জ্যাঠার ভিটে, কোথায় পালিতদের বড়ো আমবাগান, কোথায় প্রসন্ন গুরুমশাইয়ের বাঁশবন—ভয়ানক ভয়ানক জঙ্গলে একা ঘুরে বহুকষ্টে উঁচু ডাল থেকে দোলানো গুলঞ্চলতা কত কষ্টে জোগাড় করে সে আনল—এখনি রেল-রেল খেলা হবে—সব ঠিকঠাক, আর কিনা,…
হঠাৎ সে মাকে একটা খুব কড়া, খুব রূঢ়, খুব একটা প্রাণ-বিঁধানো কথা বলতে চাইল, এবং খানিকটা দাঁড়িয়ে বোধ হয় অন্য কিছু ভেবে না পেয়ে আগের চেয়েও তীব্র নিখাদে বলল—আমি আজ ভাত খাব না, যাও—কক্ষনো খাব না। তার মা বলল—না-খাবি না খাবি যা, ভাত খেয়ে একেবারে রাজা করে দেবেন কিনা? এদিকে তো রান্না নামাতে তর সয় না, না-খাবি যা, দেখব খিদে পেলে কে খেতে দ্যায়?
ব্যাস ! চক্ষের পলকে—সব আছে, আমি আছি, তুমি আছ—সেই তার মা কাঁঠালবিচি ধুচ্ছে—কিন্তু অপু কোথায়? সে যেন কর্পূরের মতো উবে গেল ! কেবল ঠিক সেই সময়ে দুর্গা বাড়ি ঢুকতে দরজার কাছে তাকে পাশ কাটিয়ে ঝড়ের বেগে বার হয়ে যেতে দেখে বিস্মিত-সুরে ডেকে বলল—ও অপু, কোথায় যাচ্ছিস অমন করে, কী হয়েচে? ও অপু, শোন—
তার মা বলল—জানিনে আমি, যত সব অনাচ্ছিষ্টি কাণ্ড বাপু তোমাদের, হাড়-মাস কালি হয়ে গেল ! কী এক পথের মাঝখানে টাঙিয়ে রেখেচে, আসচি, ছিঁড়ে গেল—তা এখন কী হবে? আমি কি ইচ্ছে করে ছিঁড়িচি? তাই ছেলের রাগ—আমি ভাত খাব না—না খাস যা, ভাত খেয়ে সব একেবারে স্বগগে ঘন্টা দেবে কিনা তোমরা?
মাতা-পুত্রের এমন অভিমানের পালায় দুর্গাকেই মধ্যস্থ হতে হয়। সে অনেক ডাকাডাকির পরে বেলা দুটোর সময় ভাইকে খুঁজে বার করল। সে শুষ্কমুখে উদাস-নয়নে ওপাড়ার পথে রায়েদের বাগানের পড়ন্ত আমগাছের গুঁড়ির ওপর বসেছিল।
বিকালে যদি কেউ অপুদের বাড়ি এসে তাকে দেখত, তবে সে কখনোই মনে করতে পারত না যে, এ সেই অপু—যে আজ সকালে মায়ের ওপর অভিমান করে দেশত্যাগী হয়েছিল। উঠানের এ-প্রান্ত হতে ও-প্রান্ত পর্যন্ত আবার তার টাঙানো হয়ে গেছে। অপু বিস্ময়ের সঙ্গেচেয়ে-চেয়ে দেখছিল, কিছুই বাকি নেই, ঠিক যেন একেবারে সত্যিকার রেল রাস্তার তার !
সে সতুদের বাড়ি গিয়ে বলল—সতুদা, আমি টেলিগিরাপের তার টাঙিয়ে রেখেচি আমাদের বাড়ির উঠানে, চলো রেল-রেল খেলা করি—আসবে?
—তার কে টাঙিয়ে দিল রে?
—আমি নিজে টাঙালাম ! দিদি ছোটা এনে দিয়েছিল।
সতু বলল—তুই খেলগে যা, আমি এখন যেতে পারব না।
অপু মনে-মনে বুঝল বড়ো ছেলেদের ডেকে দল বেঁধে খেলার জোগাড় করা তার কর্ম নয়। কে তার কথা শুনবে? তবুও আর একবার সে সতুর কাছে গেল। নিরাশ মুখে রোয়াকের কোণটা ধরে নিরুৎসাহভাবে বলল—চলো না সতুদা, যাবে? তুমি, আমি আর দিদি খেলব এখন। পরে সে প্রলোভনজনকভাবে বলল—আমি টিকিটের জন্যে এতোগুলো বাতাপি নেবুর পাতা তুলে এনে রেখেচি। সে হাত ফাঁক করে পরিমাণ দেখাল।—যাবে?
সতু আসতে চাইল না। অপু বাইরে বড়ো মুখ-চোরা, সে আর কিছু না বলে বাড়ি ফিরে গেল। দুঃখে তার চোখে প্রায় জল আসছিল—এত করে বলতেও সতুদার মন ভিজল না !
পরদিন সকালে সে ও তার দিদি দুজনে মিলে ইট দিয়ে একটা বড়ো দোকানঘর বেঁধে জিনিসপত্রের জোগাড়ে বার হল। দুর্গা বন-জঙ্গলে উৎপন্ন দ্রব্যের সন্ধান বেশি রাখে। দু-জনে মিলে নোনাপাতার পান, মেটে আলুর, ফলের আলু, রাধালতা ফুলের মাছ, তেলাকুচার পটোল, চিচ্চিড়ের বরবটি, মাটির ঢেলার সৈন্ধব লবণ—আরও কত কী সংগ্রহ করে আনল, এনে দোকান সাজাতে বড়ো বেলা করে ফেলল। অপু বলল—চিনি কীসের করবি রে দিদি?
দুর্গা বলল—বাঁশতলার পথে সেই ঢিবিটায় ভালো বালি আছে, মা চাল-ভাজা ভাজবার জন্যে আনে, সেই বালি চল আনিগে—সাদা চকচক কচ্ছে—ঠিক একেবারে চিনি ! বাঁশবনে চিনি খুঁজতে-খুঁজতে তারা পথের ধারের বনের মধ্যে ঢুকল। খুব উঁচু একটা বন-চটকা গাছের আগডালে একটা বড়ো লতার ঘন সবুজ আড়ালে, টুকটুকে রাঙা, বড়ো-বড়ো সুগোল কী ফল দুলছে ! অপু ও দুর্গা দু-জনেই দেখে অবাক হয়ে গেল। অনেক চেষ্টায় গোটা কয়েক ফল নীচের দিকের লতার খানিকটা অংশ ছিঁড়ে তলায় পড়তেই মহাআনন্দে দু-জনে একসঙ্গে ছুটে গিয়ে সেগুলিকে মাটি থেকে তুলে নিল।
পাকা ফল মোটে তিনটি। প্রধানত বিপণি-সজ্জার উদ্দেশ্যেই তা দোকানে এমনভাবে রাখা হল যে, খরিদ্দার এলে প্রথমেই যেন তার নজরে পড়ে। পুরোদমে বেচা-কেনা আরম্ভ হয়ে গেল। দুর্গা নিজেই পান কিনে দোকানের পান প্রায় ফুরিয়ে ফেলল ! খেলা খানিকটা এগিয়েছে, এমন সময় দরজা দিয়ে সতুকে ঢুকতে দেখে অপু মহাআনন্দে তাকে আগিয়ে আনতে দৌড়ে গেল—ও সতুদা, দ্যাখো না কীরকম দোকান হয়েছে। কেমন ফল এই দ্যাখো, আমি আর দিদি পেড়ে আনলাম, কী ফল বলো দিকি? জানো?
সতু বলল—ও তো মাকাল-ফল, আমাদের বাগানে কত ছিল। সতু আসাতে অপু যেন কৃতার্থ হয়ে গেল, সতুদা তাদের বাড়িতে তো বড়ো একটা আসে না। তা ছাড়া সতুদা বড়ো ছেলেদের দলের চাঁই। সে আসাতে খেলায় ছেলেমানুষিটুকু যেন কতকটা ঘুচে গেল।
অনেকক্ষণ পুরা মরশুমে খেলা চলবার পর দুর্গা বলল—ভাই, আমাকে দু-মন চাল দাও, খুব সরু, কাল আমার পুতুলের বিয়ের পাকা দেখা, অনেক লোক খাবে।
সতু বলল—আমাদের বুঝি নেমন্তন্ন, না?
দুর্গা মাথা দুলিয়ে বলল—না বইকী? তোমরা তো হলে কনেযাত্রী—কাল সকালে এসে নকুতো করে নিয়ে যাব। সতুদা, রানুকে বলবে আজ রাত্তিরে যেন একটু চন্দন বেটে রাখে, কাল সকালে নিয়ে আসব—
দুর্গার কথা ভালো করে শেষ হয়নি, এমন সময় সতু দোকানে বিক্রয়ার্থ রক্ষিত পণ্যের ভেতর থেকে কী যেন তুলে নিয়ে হঠাৎ দৌড়ে দরজার দিকে ছুটল, সঙ্গে-সঙ্গে অপুও—ওরে দিদিরে, নিয়ে গেলোরে—বলে, তার রিনরিনে গলায় চিৎকার করতে করতে সতুর পিছনে-পিছনে ছুটল।
বিস্মিত দুর্গা ভালো করে ব্যাপারটা কী বুঝবার আগেই সতু ও অপু দৌড়ে দরজার বাইরে চলে গেল ! সঙ্গে-সঙ্গে খেলাঘরের দিকে চোখ পড়তেই দুর্গা দেখল সেই পাকা মাকাল-ফল তিনটির একটিও নেই !
দুর্গা একছুটে দরজার কাছে এসে দেখল—সতু গাবতলার পথে আগে-আগে ও অপু তা থেকে অল্প পিছু-পিছু ছুটছে। সতুর বয়স অপুর চেয়ে তিন-চার বছরের বেশি, তা ছাড়া সে অপুর মতো ওরকম ছিপছিপে মেয়েলি গড়নের ছেলে নয়—বেশ জোরালো হাত-পা-ওয়ালাও ও শক্ত। তার সঙ্গে ছুটে অপুর পারার কথা নয়, তবুও যে সে ধরি-ধরি করে তুলেছে, তার কারণ এই যে, সতু ছুটছে পরের দ্রব্য আত্মসাৎ করে আর অপু ছুটছে প্রাণের দায়ে।
হঠাৎ দুর্গা দেখল যে, সতু গতিবেগ কমিয়ে একবারটি নীচু হয়ে যেন পেছন ফিরে চাইল, সঙ্গে-সঙ্গে অপুও হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। সতু ততক্ষণ ছুটে দৃষ্টির বাইরে চালতেতলার পথে গিয়ে পড়েছে।
দুর্গা ততক্ষণে দৌড়ে অপুর কাছে পৌঁছেছে। অপু একটু সামনের দিকে নীচু হয়ে ঝুঁকে দুই হাতে চোখ রগড়াচ্ছে। দুর্গা বলল—কী হয়েচে রে অপু?
অপু ভালো করে না চেয়েই যন্ত্রণার সুরে দু-হাত দিয়ে চোখ রগড়াতে-রগড়াতে বলল—সতুদা চোখে ধুলো ছুড়ে মেরেচে দিদি, চোখে কিছু দেখতে পাচ্ছিনে রে—
দুর্গা তাড়াতাড়ি অপুর হাত নামিয়ে বলল—সর সর দেখি, ওরকম করে চোখ রগড়াসনে, দেখি। অপু তখনি দু-হাত আবার চোখে উঠিয়ে আকুল সুরে বলল—উঁহু ও দিদি, চোখের মধ্যে কেমন হচ্ছে, আমার চোখ কানা হয়ে গিয়েচে দিদি।
—দেখি দেখি, ওরকম করে চোখে হাত দিসনে—সর …পরে সে কাপড়ে ফুঁ পেড়ে চোখে ভাপ দিতে লাগল। কিছু পরে অপু একটু একটু একটু চোখ মেলে চাইতে লাগল। দুর্গা তার দুই চোখের পাতা তুলে অনেকবার ফুঁ দিয়ে বলল—এখন বেশ দেখতে পাচ্ছিস? আচ্ছা, তুই বাড়ি যা, আমি ওদের বাড়ি গিয়ে ওর মাকে আর ঠাকমাকে সব বলে দিয়ে আসচি—রানুকেও বলব। আচ্ছা দুষ্টু ছেলে তো—তুই যা, আমি আসচি এক্ষুনি।

বিক্রয়ার্থ রক্ষিত পন্যের ভেতর থেকে কী যেন তুলে নিয়ে হঠাৎ দৌড়ে দরজার দিকে ছুটল
রানুদের খিড়কির দরজা পর্যন্ত গিয়ে দুর্গা কিন্তু আর যেতে সাহস করল না। সেজো-ঠাকরুনকে সে ভয় করে, খানিকক্ষণ খিড়কির কাছে দাঁড়িয়ে ইতস্তত করে সে বাড়ি ফিরল। সদর দরজা দিয়ে ঢুকে সে দেখল—অপু দরজার বাঁধারের কবাটখানি সামনে ঠেলে দিয়ে তারই আড়ালে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে কাঁদছে। সে ছিঁচকাঁদুনে ছেলে নয়, বড়ো কিছুতেই সে কখনো কাঁদে না—রাগ করে, অভিমান করে বটে, কিন্তু কাঁদে না। দুর্গা বুঝল আজ তার অত্যন্ত দুঃখ হয়েছে, অত সাধের ফলগুলি গেল, তা ছাড়া আবার চোখে ধুলো দিয়ে এমন কষ্ট দিল! অপুর কান্না সে সহ্য করতে পারে না—তার বুকের মধ্যে যেন কেমন করে।
সে গিয়ে ভায়ের হাত ধরে, সান্ত্বার সুরে বলল—কাঁদিসনে অপু। আয়, তোকে আমার সেই কড়িগুলো সব দিচ্ছি—আয়। চোখে কি আরও ব্যথা বাড়চে? …দেখি, কাপড়খানা বুঝি ছিঁড়ে ফেলেচিস?…
খাওয়া-দাওয়ার পর দুপুরবেলা অপু কোথাও না গিয়ে ঘরেই থাকে। অনেকদিনের জীর্ণ পুরোনো কোঠাবাড়ির পুরানো ঘর। জিনিসপত্র, কাঠের সেকালের সিন্দুক, কটা রঙের সেকালের বেতের প্যাঁটরা, কড়ির আলনা, জলচৌকিতে ঘর ভরা। এমন সব বাক্স আছে যা অপু কখনো খুলতে দেখেনি, তাতে রক্ষিত এমন সব হাঁড়ি-কলসি আছে, যার অভ্যন্তরস্থ দ্রব্য সম্বন্ধে সে সম্পূর্ণ অজ্ঞ।
সবসুদ্ধ মিলে ঘরটিতে পুরোনো জিনিসের কেমন একটা পুরোনো-পুরোনো গন্ধ বার হয়। সেটা ঠিক কীসের গন্ধ সে জানে না, কিন্তু তা যেন বহু অতীতকালের কথা মনে এনে দেয়। সেই অতীত দিনে অপু ছিল না, কিন্তু এই কড়ির আলনা ছিল, ওই ঠাকুরদার বেতের ঝাঁপিটা ছিল, ওই কাঠের বড়ো সিন্দুকটা ছিল, ওই যে সোঁদালি গাছের মাথা বনের মধ্যে থেকে বের হয়ে আছে, ওই পোড়োজঙ্গলে-ভরা জায়গাটাতে কাদের বড়ো চণ্ডীমণ্ডপ ছিল, আরও কত নামের কত ছেলে-মেয়ে একদিন এই ভিটেতে খেলে বেড়াত, কোথায় তারা ছায়া হয়ে মিলে গিয়েছে, কতকাল আগে!
যখন সে একা ঘরে থাকে, মা ঘাটে যায়, তখন তার অত্যন্ত লোভ হয় ওই বাক্সটা, বেতের ঝাঁপিটা খুলে দিনের আলোয় বার করে পরীক্ষা করে দেখে কী অদ্ভুত রহস্য ওদের মধ্যে গুপ্ত আছে। ঘরের আড়ার সর্বোচ্চ তাকে কাঠের বড়ো বারকোশে যে তালপাতার পুথির স্তূপ ও খাতাপত্র আছে, বাবাকে জিজ্ঞাসা করে জানতে পেরেছিল, সেগুলি তার ঠাকুরদা রামচাঁদ তর্কালঙ্কারের, তার বড়ো ইচ্ছা ওগুলি যদি হাতের নাগালে ধরা দেয়, তবে সে একবার নীচে নামিয়ে নেড়েচেড়ে দেখে। এক-একদিন বনের ধারের জানালাটায় বসে দুপুর-বেলা সে সেই ছেঁড়া কাশীদাসের মহাভারতখানা নিয়ে পড়ে। সে নিজেই খুব ভালো পড়তে শিখেছে, আগেকার মতো আর মার মুখে শুনতে হয় না, নিজেই জলের মতো পড়ে যায়—বুঝতেও পারে।
পড়াশোনায় তার বুদ্ধি খুব তীক্ষ্ণ। তার বাবা মাঝে-মাঝে তাকে গাঙ্গুলি-বাড়ির চণ্ডীমণ্ডপে বৃদ্ধদের মজলিশে নিয়ে যায়। রামায়ণ কী পাঁচালি পড়তে দিয়ে বলে—পড়ো তো বাবা, এঁদের একবার শুনিয়ে দাও তো।
বৃদ্ধেরা খুব তারিফ করেন। দীনু চাটুজ্জে বলেন—আর আমার নাতিটা, এই তোমার খোকার বয়েস হবে, দু-খানা বর্ণপরিচয় ছিঁড়লে বাপু, শুনলে বিশ্বাস করবে না, এখনও ভালো করে অক্ষর চিনলে না ! বাপের ধারা পেয়ে বসে আছে। ওই যে ক-দিন আমি আছি রে বাপু, তারপর চোখ বুজলেই লাঙলের মুঠি ধরতে হবে।
পুত্রগর্বে হরিহরের বুক ভরে যায়। মনে ভাবে—ওকি তোমাদের হবে? কল্লে তো চিরকাল সুদের কারবার! —হলামই বা গরিব, হাজার হোক পণ্ডিতবংশ তো বটে! বাবা মিথ্যেই তালপাতা ভরিয়ে ফেলেননি পুঁথি লিখে, বংশে একটা ধারা দিয়ে গেছেন, সেটা যাবে কোথায়?
তাদের ঘরের জানালার কয়েক হাত দূরেই বাড়ির পাঁচিল এবং পাঁচিলের ওপাশ থেকেই পাঁচিলের গা ঘেঁষে কী বিশাল আগাছার জঙ্গল আরম্ভ হয়েছে! জানালায় বসে শুধু চোখে পড়ে সবুজ সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো ভাঁটশ্যাওড়া গাছের মাথাগুলো, এগাছে-ওগাছে দোদুল্যমান কত রকমের লতা, প্রাচীন বাঁশঝাড়ের শীর্ষ বয়সের ভারে যেখানে সোঁদালি বন-চালতা গাছের ওপর ঝুঁকে পড়েছে, তার নীচের কালো মাটির বুকে খঞ্জন পাখির নাচ। বড়ো গাছপালার তলায় হলুদ, বনকচু, কটুওলের সবুজ জঙ্গল ঠেলাঠেলি করে সূর্যের আলোর দিকে মুখ ফিরাতে প্রাণপণ চেষ্টা করেছে।
তাদের বাড়ির ধার থেকে এই বনজঙ্গল একদিকে, সেই কুঠির মাঠ, অপরদিকে নদীর ধার পর্যন্ত একটানা চলেছে। অপুর কাছে এ-বন অফুরন্ত ঠেকে। সে দিদির সঙ্গে কতদূর এ বনের মধ্যে তো বেড়িয়েছে, বনের শেষ দেখতে পায়নি ! শুধু এই রকম তিত্তিরাজ গাছের তলা দিয়ে পথ, মোটা-মোটা গুলঞ্চলতা-দুলানো, থোলো-থোলো বনচালতার ফল চারধারে। সুঁড়ি পথটা একটা আমবাগানে এসে শেষ হয়, আবার এগাছের ওগাছের তলা দিয়ে বন-কলমি, নাটা-কাঁটা, ময়না-ঝোপের ভেতর দিয়ে চলতে-চলতে কোথায় কোনদিকে নিয়ে গিয়ে ফেলেছে! শুধুই বন-ধুঁদুলের লতা কোথায় সেই ত্রিশূন্যে দোলে, প্রাচীন শিরীষ গাছের শ্যাওলা-ধরা ডালের গায়ে পরগাছার ঝাড় নজরে আসে।
এই বনের মধ্যে কোথায় একটা মজা পুরোনো পুকুর আছে, তারই পারে যে ভাঙা মন্দিরটা আছে, আজকাল যেমন পঞ্চানন্দ ঠাকুর গ্রামের দেবতা—কোনো সময়ে ওই মন্দিরের বিশালাক্ষী দেবী সেই রকম ছিলেন। তিনি ছিলেন গ্রামের মজুমদার বংশের প্রতিষ্ঠিত দেবতা। একসময় কী বিষয়ে সফল-মনস্কাম হয়ে তাঁরা দেবীর মন্দিরে নরবলি দেন, তাতে রুষ্ট হয়ে দেবী স্বপ্নে জানিয়ে যান যে, তিনি মন্দির পরিত্যাগ করে চলে গেলেন—আর কখনো ফিরবেন না। সে অনেক কালের কথা। বিশালাক্ষীর পূজা হতে দেখেছে, এমন কোনো লোক আর জীবিত নেই, মন্দির ভেঙেচুরে গেছে, মন্দিরের সম্মুখের পুকুর মজে ডোবায় পরিণত হয়েছে, চারধার বনে ছেয়ে ফেলেছে। মজুমদার বংশেও বাতি দিতে আর কেউ নেই !

সে সময় নিরালা বনের ধারে একটি অল্পবয়সি সুন্দরী মেয়েকে দেখে স্বরূপ চক্রবর্তী দস্তুরমতো বিস্মিত হলেন
কেবল—সেও অনেকদিন আগে—গ্রামের স্বরূপ চক্রবর্তী ভিনগাঁ থেকে নিমন্ত্রণ খেয়ে ফিরছিলেন, সন্ধ্যার সময় নদীর ঘাটে নেমে আসতে পথের ধারে দেখলেন একটি সুন্দরী ষোড়শী মেয়ে দাঁড়িয়ে। স্থানটি লোকালয় থেকে দূরে, সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হয়ে গেছে, পথে কেউ কোথাও নেই, এ সময়ে নিরালা বনের ধারে একটি অল্পবয়সি সুন্দরী মেয়েকে দেখে স্বরূপ চক্রবর্তী দস্তুরমতো বিস্মিত হলেন। কিন্তু তিনি কোনো কথা বলার আগেই মেয়েটি ঈষৎ গর্বমিশ্রিত অথচ মিষ্টসুরে বলল—আমি এ গ্রামের বিশালাক্ষী দেবী। গ্রামে অল্পদিনের মধ্যে ওলাউঠার মড়ক আরম্ভ হবে—বলে দিও, চতুর্দশীর রাত্রে পঞ্চানন্দতলায় একশো আটটা কুমড়ো বলি দিয়ে যেন কালীপুজো করে। …কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গেই স্তম্ভিত স্বরূপ চক্রবর্তীর চোখের সামনে মেয়েটি চারিধারে শীত-সন্ধ্যার কুয়াশায় ধীরে-ধীরে মিলিয়ে গেল। এই ঘটনার দিন কয়েক পরে সত্যই সেবার গ্রামে ভয়ানক মড়ক দেখা দিয়েছিল।
এসব গল্প কতবার অপু শুনেছে ! জানালার ধারে দাঁড়ালেই বিশালাক্ষী ঠাকুরের কথা তার মনে ওঠে। দেবী বিশালাক্ষীকে একটিবার দেখতে পাওয়া যায় না? সে-বনের পথে হয়তো গুলঞ্চের লতা পাড়ছে—হঠাৎ সে সময়—খুব সুন্দর দেখতে, রাঙা-পাড় শাড়ি পরনে, হাতে গলায় মা-দুর্গার মতো বালা হার।
—তুমি কে?
—আমি অপু !
—তুমি বড়ো ভালো ছেলে, কী বর চাও?
সে বিছানায় গিয়ে শোয় ! এক-একবার ঝিরঝিরে হাওয়ায় কত কী লতাপাতার তিক্ত-মধুর গন্ধ ভেসে আসে। ঠিক দুপুর বেলা, অনেক দূরের কোনো বটগাছের মাথার ওপর থেকে গাঙচিল টেনে টেনে ডাকে... কখন সে ঘুমিয়ে পড়ে বুঝতে পারে না , উঠে দেখে বেলা একেবারে নেই। জানালার বাইরে সারা বনটায় ছায়া পড়ে আসছে, বাঁশঝাড়ের আগায় রাঙা রোদ।
অপূর্ব, অদ্ভুত বিকালটা ! নিবিড় ছায়াভরা গাছপালার ধারে খেলাঘর…, গুলঞ্চলতার তার টাঙানো…খেজুর ডালের ঝাঁপ। …বনের দিকে থেকে ঠান্ডা-ঠান্ডা গন্ধ বার হয়… রাঙা রোদটুকু জেঠামশাইয়ের পোড়ো ভিটায় বাতাবিলেবু গাছের মাথায় চিকচিক করে… চকচকে বাদামি রঙের ডানাওয়ালা তেড়ো পাখি বনকলমি-ঝোপে উড়ে এসে বসে…তাজা মাটির গন্ধ…ছেলেমানুষের জগৎ ভরপুর আনন্দে উছলে ওঠে, কাকে সে কী করে বোঝাবে—সে কী আনন্দ!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন