এই নিশ্চিন্দিপুর

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

আসলে অপু কিন্তু ঘুমোয়নি, সে জেগেছিল। চোখ বুজে শুয়ে—মায়ের সঙ্গে বাবার রাতে যেসব কথাবার্তা হচ্ছিল, সে সব শুনেছে। তারা এদেশের বাস উঠিয়ে কাশী চলে যাচ্ছে। এদেশের চেয়ে কাশীতে থাকার নানা সুবিধের কথা বাবা গল্প করছিল মায়ের কাছে। বাবা অল্পবয়সে সেখানে অনেকদিন ছিল, সেদেশের সকলের সঙ্গে বাবার আলাপ ও বন্ধুত্ব, সকলে চেনে বা মানে। জিনিসপত্রও সস্তা। তার মা খুব আগ্রহ প্রকাশ করল, সেসব সোনার দেশে কখনো কারও অভাব নেই—দুঃখ এদেশে বারোমাস লেগেই আছে, সাহস করে সেখানে যেতে পারলেই সব দুঃখ ঘুচবে। মা আজ যেতে পারলে আজই যায়, একদিনও আর থাকবার ইচ্ছা নেই। শেষে স্থির হল বৈশাখ মাসের দিকে তাদের যাওয়া হবে।

বৈশাখ মাসের প্রথমে হরিহর নিশ্চিন্দিপুর থেকে বাস উঠাবে বলে সমস্ত ঠিক করে ফেলল। যে জিনিসপত্র সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়া চলবে না, সেগুলি বেচে, নানা খুচরো দেনা শোধ দিল। সেকালের কাঁঠাল কাঠের বড়ো তক্তপোশ, সিন্দুক, পিঁড়ি অনেকগুলো ছিল—খবর পেয়ে এপাড়া-ওপাড়া থেকে খদ্দের এসে সস্তা দরে কিনে নিয়ে গেল।

গ্রামের মুরুবিবরা এসে হরিহরকে বুঝিয়ে নিবৃত্ত করবার চেষ্টা করতে লাগলেন। নিশ্চিন্দিপুরে দুধ ও মাছ যে কত সস্তা এবং কত অল্প খরচে এখানে সংসার চলে, সে-বিষয়ের একটা তুলনামূলক তালিকাও মুখে-মুখে তাঁরা দাখিল করে দিলেন। কেবল রাজকৃষ্ণ ভট্টাচার্য, স্ত্রীর সাবিত্রীব্রত উপলক্ষ্যে নিমন্ত্রণ করতে এসে অনেকক্ষণ কথাবার্তার পর বললেন—বাপু, আছেই বা কী দেশে যে থাকতে বলব? তা ছাড়া এক জায়গায় কাদায় গুণ পুঁতে থাকাও কোনো কাজের নয়, এ আমি নিজেকে দিয়ে বুঝি—মন ছোটো হয়ে থাকে, মনের বাড় বন্ধ হয়ে যায়! দেখি, এবার তো ইচ্ছে আছে একবার চন্দ্রনাথটা সেরে আসব, যদি ভগবান দিন দেন !

রানু কথাটা শুনে অপুদের বাড়ি এল। বলল—হ্যাঁরে অপু, তোরা নাকি এ গাঁ ছেড়ে চলে যাবি? সত্যি? অপু বলল—সত্যি রানুদি, জিগগেস করো মাকে।

তবুও রানু বিশ্বাস করে না। শেষে সর্বজয়ার মুখে সব শুনে রানু অবাক হয়ে গেল।

অপুকে বাইরের উঠানে ডেকে বলল—কবে যাবি রে?

—সামনের বুধবারের পরের বুধবার।

—আসবিনে কখনো?

রানুর চোখ অশ্রুপূর্ণ হয়ে উঠল ! সে বলল—তুই যে বলিস নিশ্চিন্দিপুর আমাদের বড়ো ভালো গাঁ, এমন নদী, এমন মাঠ কোথাও নেই—সে গাঁ ছেড়ে তুই যাবি কী করে?

অপু বলল—আমি কী করব, আমি তো আর বলিনি যাবার কথা ! বাবার সেখানে বাস করবার মন, এখানে আমাদের চলে না যে !

স্নানের ঘাটে পটুর সঙ্গে অপুর কত কথা হল। পটুও কথাটা জানত না, অপুর মুখে সব শুনে তার মনটা বেজায় দমে গেল। ম্লানমুখে বলল—তোর জন্যে নিজে জলে নেমে কত কষ্টে শ্যাওলা সরিয়ে ফুট কাটলাম, একদিনও মাছ ধরবিনে তাতে?

এবার রামনবমী, দোল, চড়কপূজা ও গোষ্ঠবিহার অল্পদিনের পরে-পরে পড়ল। প্রতিবছর এই সময় অপূর্ব অসংযত আনন্দ অপুর বুক ভরে তোলে! সে ও তার দিদি এ সময় আহার- নিদ্রা ভুলে যেত। চড়কের দিনে গ্রামের আতুরী বুড়ি মারা গেল। নতুন যে মাঠটাতে আজকাল চড়কমেলা বসে, তারই কাছে আতুরী বুড়ির সেই দোচালা ঘরখানা। অনেক লোক জড়ো হয়েছে দেখে সে-ও সেখানে দেখতে গেল। সেই যে একবার আতুরী ডাইনির ভয়ে বাঁশবন ভেঙে দৌড় দিয়েছিল—তখন সে ছোটো ছিল। এখন তার সেকথা মনে হলে হাসি পায়। আজ তার মনে হল আতুরী বুড়ি ডাইনি নয়, রাক্ষসী নয়, কিছু নয়। গ্রামের একধারে লোকালয়ের বাইরে একা থাকত—গরিব, অসহায়—ছেলে ছিল না, মেয়ে ছিল না, কেউ দেখবার ছিল না, থাকলে কি আজ সারাদিন ঘরের মধ্যে মরে পড়ে থাকত? সৎকারের লোক হয় না? …পাঁচু জেলের ছেলে একটা হাঁড়ি বাইরে এনে ঢালল—এক হাঁড়ি শুকনো আমচুর। ঝোড়ো আম কুড়িয়ে বুড়ি আমসি-আমচুর তৈরি করে রেখে দিত ও তা হাটে-হাটে বিক্রয় করে দিনপাত করত। অপু তা জানে, কারণ গত রথের মেলাতেও তাকে ডালা পেতে আমসি বেচতে দেখেছে।

চড়কটা যেন এবার কেমন ফাঁকা-ফাঁকা ঠেকতে লাগল! আর-বছরও চড়কের বাজারে দিদি নতুন পট কিনে কত আনন্দ করেছে। মনে আছে, সেদিন সকালে দিদির সঙ্গে তার ঝগড়া হয়েছিল! বিকালে তার দিদি বলল—পয়সা দেব অপু, একটা সীতাহরণের পট দেখিস যদি মেলায় পাস? অপু প্রতিশোধ নেবার জন্য বলল—যত সব পানসে-পুতু পট, তাই তোর কিনতে হবে? আমি পারব না যা। কেন রাম-রাবণের যুদ্ধ একখানা কেন না? তার দিদি বলল—তোর কেবল যুদ্ধু আর যুদ্ধু—ছেলের যা কাণ্ড! কেন ঠাকুর-দেবতার পট বুঝি ভালো হল না? …দিদির শিল্পানুভূতিশক্তির ওপর অপুর কোনো কালেই শ্রদ্ধা ছিল না।

তাদের বেড়ার গায়ে রাংচিতা ফুল লাল হয়ে ফুটলে, তার মুখ মনে পড়ে, পাখির ডাকে, সদ্যফোটা ওড়কলমির ফুলের দুলুনিতে—দিদির জন্য মন কেমন করে। মনে হয়, যার কাছে ছুটে গিয়ে বললে কত খুশি হত, সে কোথায় চলে গেছে—কতদূর! আর কখনো, কখনো কি সে এসব নিয়ে খেলা করতে আসবে না?

i27

তাদের বেড়ার গায়ে রাংচিতা ফুল লাল হয়ে ফুটলে,তার মুখ মনে পড়ে

চড়ক দেখে, নানা গাঁয়ের চাষির ছেলে-মেয়েরা রঙিন কাপড়-জামা, কেউ বা নতুন কোরা শাড়ি পরনে, সার দিয়ে ঘরে ফিরছে। ছেলেরা বাঁশি বাজাতে-বাজাতে চলেছে। গোষ্ঠবিহারের মেলা দেখতে চার-পাঁচ ক্রোশ দূর থেকেও লোকজন এসেছিল। শোলার পাখি, কাঠের পুতুল, রঙিন কাগজের পাখা, রং-করা হাঁড়ি ছোবা—সকলেরই হাতে কোনো না কোনো জিনিস। চিনিবাস বৈষ্ণব মেলায় বেগুনি-ফুলুরির দোকান খুলেছিল, তার দোকান থেকে অপু দু-পয়সার তেলেভাজা কিনে হাতে নিয়ে বাড়ির দিকে চলল। ফিরতে-ফিরতে মনে হল, যেখানে তারা উঠে যাচ্ছে সেখানে কি এরকম গোষ্ঠবিহার হয়? হয়তো সে আর চড়কের মেলা দেখতে পাবে না। মনে ভাবল—সেখানে যদি চড়ক না হয়, তবে বাবাকে বলব—আমি মেলা দেখব বাবা, নিশ্চিন্দিপুর চলো যাই—না হয় দু-দিন এসে খুড়িমাদের বাড়ি থেকে যাব।

চড়কের পরদিন জিনিসপত্র বাঁধা-ছাঁদা হতে লাগল।

কাল দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর রওনা হতে হবে।

সন্ধ্যার সময় রন্নাঘরের দাওয়ায় তার মা তাকে গরম গরম পরোটা ভেজে দিচ্ছিল। নীলমণি জ্যাঠার ভিটায় নারকেল গাছটার পাতাগুলো জ্যোৎস্নার আলোয় চিকচিক করছে—চেয়ে দেখে অপুর মন বিষাদে পরিপূর্ণ হয়ে গেল। এতদিন নতুন দেশে যাবার জন্য তার যে উৎসাহটা ছিল, যতই যাওয়ার দিন কাছে এসে পড়ছে, ততই আসন্ন বিরহের গভীর ব্যথায় তার মনের সুরটি করুণ হয়ে বাজছে।

এই তাদের বাড়িঘর, ওই বাঁশবন, সলতেখাগীর আমবাগানটা, নদীর ধার, দিদির সঙ্গে চড়ুইভাতি করার ওই জায়গাটা—এসব সে কত ভালোবাসে ! ওই অমন নারকেল গাছ কি তারা যেখানে যাচ্ছে সেখানে আছে? জ্ঞান হওয়া থেকে এই নারকেল গাছটা সে এখানে দেখছে, জ্যোৎস্নারাতে পাতাগুলো কী সুন্দর দেখায়! ফুটফুটে জ্যোৎস্নারাতে এই দাওয়ায় বসে চুমকি-ঝরা নারকেল শাখার দিকে চেয়ে কত রাতে দিদির সঙ্গে সে দশ-পঁচিশ খেলেছে। কতবার মনে হয়েছে কি সুন্দর দেশ তাদের এই নিশ্চিন্দিপুর! যেখানে যাচ্ছে, সেখানে কি রান্নাঘরের দাওয়ার পাশে বনের ধারে অমন নারকেল গাছ আছে? সেখানে কি সে মাছ ধরতে পারবে, আম কুড়াতে পারবে, নৌকো বাইতে পারবে, রেল-রেল খেলতে পারবে? কদমতলার সায়রের ঘাটের মতো ঘাট কি সে-দেশে আছে? রানুদি আছে? সোনা-ডাঙার মাঠ আছে? এই তো বেশ ছিল তারা—কেন এসব মিছামিছি ছেড়ে যাওয়া?

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%