বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
সেদিন চুপিচুপি দুর্গা বলল—চড়ুইভাতি করবি অপু? তাদের বাড়ির সামনে দিয়ে পাড়ার সকলে কুলুই-চণ্ডীর ব্রতের বনভোজনে গ্রামের পেছনের মাঠে যায়। তার মা-ও যায়, কিন্তু আজকাল তাকে আর নিয়ে যায় না। সেখানে সব নিজের নিজের জিনিসপত্র। অত উপকরণ তাদের নেই। বনভোজনে গিয়ে আর সবাই কত কী জিনিস বার করে—ভালো চাল, ডাল, আলু, ঘি, দুধ। তার মা বের করে শুধু মোটা চাল, মটরের ডালবাটা, আর দু-একটা বেগুন ! পাশে বসে ভুবন মুখুজ্জের সেজো-ঠাকরুনের ছেলে-মেয়েরা নতুন আখের গুড়ের পাটালি দিয়ে দুধ ও কলা মেখে ভাত খায়, নিজের ছেলে-মেয়ের জন্য তার মায়ের মন কেমন করে। তার অপু ওইরকম দুধ-কলা দিয়ে পাটালি মেখে ভাত খেতে বড়ো ভালোবাসে।
নীলমণি রায়ের জঙ্গলাকীর্ণ ভিটের উপরের খানিকটা বন দুর্গা নিজের হাতে দা দিয়ে কেটে পরিষ্কার করে ভাইকে বলল—দাঁড়িয়ে দ্যাখ তেঁতুলতলায় মা আসচে কিনা, আমি চাল-ডাল বের করে নিয়ে আসি শিগগির করে।
একটা ভালো নারকেলের মালায় দু-পলা তেল চুপিচুপি তেলের ভাঁড়টা থেকে তুলে নিল। অপহৃত মালামাল বাইরে এনে ভাইয়ের জিম্মা করে দিয়ে বলল—শিগগির নিয়ে যা, দৌড়ো অপু ! সেইখেনে রেখে আয়, দেখিস যেন গোরু-টরুতে খেয়ে না ফেলে।
চারদিক বনে ঘেরা, বাইরে থেকে দেখা যায় না। খেলাঘরের মাটির ছোবার মতো ছোট্ট একটা হাঁড়িতে দুর্গা ভাত চড়িয়ে দিয়ে বলল—এই দ্যাখ অপু, কত বড়ো-বড়ো মেটে-আলুর ফল নিয়ে এসেচি এক জায়গা থেকে। পুঁটুদের তালতলায় একটা ঝোপের মাথায় অনেক হয়ে আছে, ভাতে দেব।
অপু মহাউৎসাহে শুকনো লতা-কাটি কুড়িয়ে আনে… এই তাদের প্রথম বনভোজন। অপুর এখনো বিশ্বাস হচ্ছিল না যে, এখানে সত্যিকারের ভাত-তরকারি রান্না হবে, না, খেলাঘরের বনভোজন— যা কতবার হয়েছে—সেরকম—ধুলোর ভাত, খাপরার আলু-ভাজা, কাঁটাল-পাতার লুচি!

অপু মহাউত্সাহে শুকনো লতা-কাটি কুড়িয়ে আনে...এই তাদের প্রথম বনভোজন
কিন্তু বড়ো সুন্দর বেলাটি, বড়ো সুন্দর জায়গা বনভোজনের। প্রথম বসন্তের দিনে ঝোপে-ঝোপে নতুন কচি পাতা, ঘেঁটুফুলের ঝাড় পোড়ো ভিটেটা আলো করে ফুটে আছে, বাতাবি লেবু গাছটায় কয়দিনের কুয়াশায় ফুল অনেক ঝরে গেলেও থোপাথোপা সাদাসাদা ফুল উপরের ডালে চোখে পড়ে।
চড়ুইভাতির মাঝামাঝি অপুদের বাড়ির উঠানে কার ডাক শোনা গেল। দুর্গা বলল—বিনির গলা যেন, নিয়ে আয় তো ডেকে অপু। একটু পরে অপুর পেছনে-পেছনে দুর্গার সমবয়সি একটি কালো মেয়ে এল, একটু হেসে যেন কতকটা সম্ভ্রমের সুরে বলল—কী হচ্ছে দুগগা দিদি?
দুর্গা বলল—আয় না বিনি, চড়ুইভাতি কচ্চি—বোস !
বিনি ওপাড়ার কালীনাথ চক্কত্তির মেয়ে। পরনে আধময়লা শাড়ি, হাতে সরু-সরু কাচের চুড়ি, একটু লম্বা গড়ন, মুখ নিতান্ত সাদাসিধা। যুগির বামুন বলে সামাজিক ব্যাপারে পাড়ায় তাদের নিমন্ত্রণ হয় না, গ্রামের একপাশে নিতান্ত সংকুচিতভাবে বাস করে। অবস্থাও ভালো নয়।
বিনি সানন্দে দুর্গার ফরমায়েশ খাটতে লাগল। বেড়াতে এসে হঠাৎ সে যেন একটা লাভজনক ব্যাপারের মধ্যে এসে পড়েছে। দুর্গা বলল—বিনি, আর দুটো শুকনো কাঠ দ্যাখ তো—আগুনটা জ্বলচে না ভালো।
বিনি তখনি কাঠ আনতে ছুটল এবং একটু পরে এক বোঝা বেলের ডাল এনে হাজির করে বলল—এতে হবে দুগগা দিদি, না আর আনব?
দুর্গা যখন বলল—বিনি এসেচে, ও-ও তো এখানে খাবে, আর দুটো চাল নিয়ে আয় অপু, বিনির মুখখানা খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। খানিকটা পরে বিনি জল এনে দিল। আগ্রহের সুরে জিজ্ঞাসা করল—কী কী তরকারি দুগগা দিদি? দুর্গা ভাত নামিয়ে, তেলটুকু দিয়ে তাতে বেগুন ফেলে দিয়ে ভাজে। খানিকটা পরে সে অবাক হয়ে ছোবার দিকে চেয়ে থাকে, অপুকে ডেকে বলে—ঠিক একেবারে সত্যিকারের বেগুন-ভাজার মতো রং হচ্ছে, দেখিচিস অপু? ঠিক যেন মা-র রান্না বেগুন-ভাজা, না?
অপুরও ব্যাপারটা আশ্চর্য বোধ হয় ! তারও এতক্ষণ যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না যে, তাদের বনভোজনে সত্যিকার ভাত, সত্যিকার বেগুন-ভাজা সম্ভব হবে! তার পর তিনজনে মহাআনন্দে কলার পাতে খেতে বসে, শুধু ভাত আর বেগুন-ভাজা আর কিছু না। অপু গ্রাস মুখে তুলবার সময় দুর্গা সেদিকে চেয়েছিল, আগ্রহের সঙ্গে জিজ্ঞাসা করে—কেমন হয়েছে রে বেগুন-ভাজা?
অপু বলে—বেশ হয়েছে দিদি, কিন্তু নুন হয়নি যেন !
লবণকে ইহারা ভুলক্রমে একেবারেই বাদ দিয়েছে, লবণের বালাই রাখেনি ! কিন্তু মহাতৃপ্তিতে তিনজনে কোষো আলুর ফল-ভাতে ও পানসে আধ-পোড়া বেগুনভাজা দিয়ে চড়ুইভাতির ভাত খেতে বসল ! দুর্গার এই প্রথম রান্না—প্রথম এই বন-ঝোপের মধ্যে, এই শুকনা লতাপাতার রাশের মধ্যে খেজুরতলায় ঝরে-পড়া খেজুর-পাতার পাশে বসে সত্যিকারের ভাত-তরকারি খাওয়া !
খেতে খেতে দুর্গা অপুর দিকে চেয়ে হি-হি করে খুশির হাসি হাসল। খুশিতে ভাতের দলা তার গলার মধ্যে আটকে যাচ্ছিল যেন !
বিনি খেতে খেতে ভয়ে-ভয়ে বলল—একটু তেল আছে দুগগাদি? মেটে-আলুর ফল-ভাতে মেখে নিতেম! দুর্গা বলল—অপু ছুটে নিয়ে একটু তেল…
অপু বলল—মাকে কী বলবি দিদি? আবার ওবেলা ভাত খাবি?
—দূর, মাকে কখনো বলি ! সন্দের পর দেখিস খিদে পাবে এখন।
যুগির বামুন বলে পাড়ায় জল খেতে চাইলে লোকে ঘটিতে করে জল খেতে দেয়, তাও আবার মেজে দিতে হয়। বিনি দু-একবার ইতস্তত করে অপুর গেলাসটা দেখিয়ে বলল—আমার গালে একটু জল ঢেলে দাও তো অপু! জল তেষ্টা পেয়েছে।
অপু বলল—নাও না বিনিদি, তুমি নিয়ে চুমুক দিয়ে খাও না! তবু যেন বিনির সাহস হয় না। দুর্গা বলল—নে না বিনি, গেলাসটা নিয়ে খা না।
খাওয়া-দাওয়া হয়ে গেলে দুর্গা বলল—হাঁড়িটা ফেলা হবে না কিন্তু, আবার আর একদিন বনভোজন করব, কেমন তো? ওই কুলগাছটার ওপরে টাঙিয়ে রেখে দিই।
অপু বলিল—হ্যাঁ, ওখানে থাকবে কিনা? মাতোর-মা কাঠ কুড়োতে আসে, দেখতে পেলে নিয়ে যাবে দিদি।
একটা ভাঙা পাঁচিলের ঘুলঘুলির মধ্যে হাঁড়িটা দুর্গা রেখে দিল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন