বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
গ্রামের প্রসন্ন গুরুমশাই বাড়িতে একটি মুদির দোকান করতেন এবং দোকানেরই পাশে তাঁর পাঠশালা ছিল। বেত ছাড়া পাঠশালায় শিক্ষাদানের বিশেষ উপকরণ-বাহুল্য ছিল না।
পৌষ মাসের দিন। অপু সকালে লেপ মুড়ি দিয়ে রৌদ্র উঠবার অপেক্ষায় বিছানায় শুয়ে ছিল, মা এসে ডাকল—অপু, ওঠো শিগগির করে, আজ তুমি যে পাঠশালায় পড়তে যাবে ! কেমন সব বই আনা হবে তোমার জন্যে, সেলেট। হ্যাঁ ওঠো, মুখ ধুয়ে নাও, উনি তোমায় সঙ্গে করে নিয়ে পাঠশালায় দিয়ে আসবেন।
পাঠশালার নাম শুনে অপু চোখ দু-টি তুলে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে মা-র মুখের দিকে চেয়ে রইল। তার ধারণা ছিল যে, যারা দুষ্টু ছেলে মা-র কথা শোনে না, ভাই-বোনেদের সঙ্গে মারামারি করে তাদেরই শুধু পাঠশালায় পাঠানো হয়ে থাকে। কিন্তু সে তো কোনোদিন ওরকম করে না, তবে সে কেন পাঠশালায় যাবে?
খানিক পরে সর্বজয়া আবার এসে বলল—ওঠো অপু, মুখ ধুয়ে নাও, তোমায় অনেক করে মুড়ি বেঁধে দেব এখন, পাঠশালায় বসে-বসে খেয়ো এখন, ওঠো লক্ষ্মী মানিক! …মায়ের কথার উত্তরে সে অবিশ্বাসের সুরে বলল—ইঃ! …পরে সে মায়ের দিকে চেয়ে জিভ বার করে চোখ বুজে একরকম মুখভঙ্গি করে রইল, উঠবার কোনো লক্ষণ দেখাল না।
কিন্তু অবশেষে বাবা এসে পড়াতে অপুর বেশি জারিজুরি খাটল না, যেতে হল। মার প্রতি অভিমানে তার চোখে জল আসছিল। খাবার বেঁধে দেবার সময় বলল—আমি কখখনো আর বাড়ি আসচিনে, দেখো!
—ষাট-ষাট বাড়ি আসবিনে কী ! ওকথা বলতে নেই, ছিঃ। পরে তার চিবুকে হাত দিয়ে চুমু খেয়ে বলল—খুব বিদ্যে হোক, ভালো করে লেখাপড়া শেখো, তখন দেখবে তুমি কত বড়ো চাকরি করবে, কত টাকা হবে তোমার ! কোনো ভয় নেই,— ওগো, তুমি গুরুমশাইকে বলে দিয়ো, যেন ওকে কিছু না বলে।
পাঠশালায় পৌঁছে দিয়ে হরিহর বলল—ছুটির সময় আমি আবার এসে তোমাকে বাড়ি নিয়ে যাব, অপু। বসে-বসে লেখো, গুরুমশাইয়ের কথা শুনো, দুষ্টুমি কোরো না যেন। …খানিকটা পরে পেছন ফিরে অপু চেয়ে দেখল বাবা ক্রমে পথের বাঁকে অদৃশ্য হয়ে গেল। অকুল সমুদ্র! সে অনেকক্ষণ মুখ নীচু করে বসে রইল। পরে ভয়ে মুখ তুলে চেয়ে দেখল গুরুমশাই দোকানের মাচায় বসে দাঁড়িতে সৈন্ধবলবণ ওজন করে কাকে দিচ্ছেন, কয়েকটি বড়ো-বড়ো ছেলে আপন-আপন চাটাই-এ বসে নানারূপ কুস্বর করে কী পড়ছে ও ভয়ানক দুলছে। তার চেয়ে আর একটু ছোটো একটি ছেলে দেয়ালে ঠেস দিয়ে আপন মনে পাততাড়ির তালপাতা মুখে পুরে চিবুচ্ছে। আর একটি বড়ো ছেলে, তার গালে একটা বড়ো আঁচিল, সে দোকানের মাচার নীচে চেয়ে কী লক্ষ করছে। তার সামনে দু-জন ছেলে বসে স্লেটে একটা ঘর এঁকে কী করছিল। একজন চুপি-চুপি বলছিল, আমি এই ঢ্যারা দিলাম, অন্য ছেলেটি বলছিল, এই আমার গোল্লা—সঙ্গে-সঙ্গে তার স্লেটে আঁক পড়ছিল, ও মাঝে-মাঝে আড়চোখে বিক্রয়রত গুরুমহশাইয়ের দিকে চেয়ে দেখছিল।
অপু নিজের স্লেটে বড়ো-বড়ো করে বানান লিখতে লাগল। কতক্ষণ পরে ঠিক জানা যায় না, গুরুমশাই হঠাৎ বললেন—এই ফণে, সেলেটে ওসব কী হচ্ছে রে? সম্মুখের সেই ছেলে-দু-টি অমনি স্লেটখানা চাপা দিয়ে ফেলল, কিন্তু গুরুমশাইয়ের শ্যেনদৃষ্টি এড়ানো বড়ো শক্ত। তিনি বললেন, এই সতে, ফণের সেলেটটা নিয়ে আয় তো। তাঁর মুখের কথা শেষ না-হতে বড়ো আঁচিলওয়ালা ছেলেটা ছোঁ মেরে স্লেটখানা উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে দোকানের মাচার ওপর হাজির করল।
—হুঁ এসব কী খেলা হচ্ছে সেলেটে? সতে, ধরে নিয়ে আয় তো দু-জনকে, কান ধরে নিয়ে আয়।
যেভাবে বড়ো ছেলেটা ছোঁ মেরে স্লেট নিয়ে গেল, এবং যেভাবে বিপন্নমুখে সামনের ছেলে দু-টি পায়ে-পায়ে গুরুমশাইয়ের কাছে যাচ্ছিল, তাতে হঠাৎ অপুর বড়ো হাসি পেল, সে ফিক করে হেসে ফেলল। পরে খানিকটা হাসি চেপে রেখে আবার ফিক-ফিক করে হেসে উঠল। গুরুমশাই বললেন—হাসে কে? হাসচো কেন খোকা, এটা কি নাট্যশালা? অ্যাঁ? এটা নাট্যশালা নাকি?
নাট্যশালা কি, অপু তা বুঝতে পারল না, কিন্তু ভয়ে তার মুখ শুকিয়ে গেল।
—সতে, একখানা থান ইট নিয়ে আয় তো তেঁতুলতলা থেকে, বেশ বড়ো দেখে।
অপু ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে উঠল, তার গলা পর্যন্ত কাঠ হয়ে গেল। কিন্তু ইট আনা হলে সে দেখল, ইটের ব্যবস্থা তার জন্য নয়, ওই ছেলে দু-টির জন্য ! বয়স অল্প বলে হোক বা নতুন ভর্তি ছাত্র বলে হোক, গুরুমশাই সেযাত্রা তাকে রেহাই দিলেন।
গুরুমশাই একটা খুঁটি হেলান দিয়ে একখানা তালপাতার চাটাই-এর ওপর বসে থাকেন। মাথার তেলে বাঁশের খুঁটির হেলান-দেওয়ার অংশটা পেকে গেছে। বিকেল বেলা প্রায়ই গ্রামের দীনু পালিত কী রাজু রায় তাঁর সঙ্গে গল্প করতে আসেন। পড়াশোনার চেয়ে এই গল্প শোনা অপুর অনেক বেশি ভালো লাগত। রাজু রায় মশায় প্রথমে কীভাবে আষাঢ়ুর হাটে তামাকের দোকান খুলেছিলেন সে- গল্প করতেন। অপু অবাক হয়ে শুনত। বেশ কেমন নিজের ছোট্ট দোকানের ঝাঁপ তুলে বসে-বসে দা দিয়ে তামাক কাটা, তারপর রাতে নদীতে যাওয়া, ছোট্ট হাঁড়িতে মাছের ঝোল-ভাত রেঁধে খাওয়া, হয়তো মাঝে-মাঝে তাদের সেই ছেঁড়া মহাভারতখানা কি বাবার সেই দাশুরায়ের পাঁচালিখানা মাটির প্রদীপের সামনে খুলে বসে বসে পড়া ! বাইরে অন্ধকারে বর্ষারাতে টিপ-টিপ বৃষ্টি পড়ছে, কেউ কোথাও নেই, পেছনের ডোবায় ব্যাং ডাকছে—কী সুন্দর ! বড়ো হলে সে তামাকের দোকান করবে।
এই গল্পগুজব এক-একদিন আবার ভাব ও কল্পনার সর্বোচ্চ স্তরে উঠত, গ্রামের ও-পাড়ার রাজকৃষ্ণ সান্ন্যালমশায় যেদিন আসতেন। যেকোনো গল্প হোক, যত সামান্যই হোক না কেন, সাজিয়ে বলার ক্ষমতা তাঁর ছিল অসাধারণ। সান্ন্যালমশায় দেশ-ভ্রমণ-বাতিকগ্রস্ত ছিলেন। কোথায় দ্বারকা, কোথায় সাবিত্রী পাহাড়, কোথায় চন্দ্রনাথ, তা আবার একা দেখে তাঁর তৃপ্তি হত না, প্রতিবারই স্ত্রী-পুত্র নিয়ে যেতেন এবং খরচপত্র করে সর্বস্বান্ত হয়ে ফিরতেন। দিব্যি আরামে নিজের চণ্ডীমণ্ডপে বসে থেলো হুঁকো টানছেন, মনে হচ্ছে সান্ন্যাল মশায়ের মতো নিতান্ত ঘরোয়া, সেকেলে, পাড়াগাঁয়ের প্রচুর অবসরপ্রাপ্ত গৃহস্থ বেশি আর বুঝি নেই, পৈতৃক চণ্ডীমণ্ডপে শিকড় গেড়ে বসেছেন। হঠাৎ একদিন দেখা গেল সদর দরজায় তালাবন্ধ, বাড়িতে জনপ্রাণীর সাড়া নেই। ব্যাপার কী? সান্ন্যালমশায় সপরিবারে বিন্ধ্যাচল না চন্দ্রনাথ-ভ্রমণে গিয়েছেন। অনেক দিন আর দেখা নেই , হঠাৎ একদিন দুপুর বেলা ঠুকঠুক শব্দে লোকে সবিস্ময়ে চেয়ে দেখল, দুই গোরুর গাড়ি বোঝাই হয়ে সান্ন্যালমশায় সপরিবারে বিদেশ থেকে ফিরছেন ও লোকজন ডাকিয়ে হাঁটু সমান উঁচু জলবিছুটি ও অর্জুন গাছের জঙ্গল কাটতে-কাটতে বাড়ি ঢুকছেন।
একটা মোটা লাঠি হাতে তিনি লম্বা-লম্বা পা ফেলে পাঠশালায় এসে উপস্থিত হতেন—এই যে প্রসন্ন, কী রকম আছ, বেশ জাল পেতে বসেচো যে! ক-টা মাছি পড়ল?
নামতা-মুখস্থ-রত অপুর মুখ অমনি অসীম আহ্লাদে উজ্জ্বল হয়ে উঠত। সান্ন্যালমশায় যেখানে তালপাতার চাটাই টেনে বসেছেন, সেখানে হাতখানেক জমি উৎসাহে সে এগিয়ে বসত। স্লেট-বই মুড়ে একপাশে রেখে দিত—যেন আজ ছুটি হয়ে গেছে, আর পড়াশোনার দরকার নেই, সঙ্গে-সঙ্গে তার ডাগর ও উৎসুক চোখ দু-টি গল্পের প্রত্যেক কথা যেন দুর্ভিক্ষের ক্ষুধার আগ্রহে গিলত!

পড়াশোনার চেয়ে এই গল্প শোনা অপুর অনেক বেশি ভালো লাগত
এক-একদিন রেলভ্রমণের গল্প উঠত। কোথায় সাবিত্রী পাহাড় আছে, তাতে উঠতে তাঁর স্ত্রীর কীরকম কষ্ট হয়েছিল, নাভিগয়ায় পিণ্ড দিতে গিয়ে পাণ্ডার সঙ্গে হাতাহাতি হবার উপক্রম। কোথাকার এক জায়গায় একটা খুব ভালো খাবার পাওয়া যায়, সান্ন্যাল মহাশয় নাম বললেন—প্যাঁড়া। নামটা শুনে অপুর ভারি হাসি পেল—বড়ো হলে সে প্যাঁড়া কিনে খাবে।
কোন দেশে সান্ন্যালমশায় একজন ফকিরকে দেখেছিলেন, সে এক অশ্বত্থতলায় থাকত। এক ছিলিম গাঁজা পেলে সে খুশি হয়ে বলত—আচ্ছা, কোন ফল তোমরা খেতে চাও বলো। পরে ইপ্সিত ফলের নাম করলে সে সম্মুখের কোনো একটা গাছ দেখিয়ে বলত—যাও, ওখান থেকে নিয়ে এসো। লোকে গিয়ে দেখত হয়তো আমগাছে বেদানা ফলে আছে, কিংবা পেয়ারা গাছে কলার কাঁদি ঝুলে আছে। রাজু রায় বলতেন—ও সব মন্তর-তন্তরের খেলা আর কী? সেবার আমার এক মামা—
দীনু পালিত কথা চাপা দিয়ে বলতেন—মন্তরের কথা যখন ওঠালে, তখন একটা গল্প বলি শোনো। গল্প নয়, আমার স্বচক্ষে দেখা। বেলডাঙার বুধো গাড়োয়ানকে তোমরা দেখেচো কেউ? একশো বছর বয়সে মারা যায়, মারাও গিয়েছে আজ পঁচিশ বছরের ওপর। জোয়ান বয়সেও আমরা তার সঙ্গে হাতের কবজির জোরে পেরে উঠতাম না। একবার—অনেক কালের কথা—আমার তখন সবে হয়েচে উনিশ-কুড়ি বয়েস, চাকদা থেকে গঙ্গাচান করে গোরুর গাড়ি করে ফিরছি। বুধো গাড়োয়ানের গাড়ি—গাড়িতে আমি, আমার খুড়িমা, আর অনন্ত মুখুজ্জের ভাইপো রাম, যে আজকাল উঠে গিয়ে খুলনায় বাস করছে। কানসোনার মাঠের কাছে প্রায় বেলা গেল। তখন ওসব দিকে কীরকম ভয়ভীত ছিল, তা রাজকেষ্ট ভায়া জানো নিশ্চয়। একে মাঠের রাস্তা, সঙ্গে কিছু টাকাকড়িও আছে—বড্ড ভাবনা হল। আজকাল যেখানে নতুন গাঁ-খানা বসেচে—ওই বরাবর এসে হল কী জানো? জন-চারেক ষণ্ডামাক্কোগোছের মিশকালো লোক এসে গাড়ির পেছনের বাঁশ দু-দিক থেকে ধললে। এদিকে দু-জন, ওদিকে দু-জন। দেখে তো মশাই আমাদের মুখে রা-টা নেই, কোনো রকমে গাড়ির মধ্যে বসে আছি, এদিকে তারাও গাড়ির বাঁশ ধরে সঙ্গেই আসচে, সঙ্গেই আসচে, সঙ্গেই আসচে। বুধো গাড়োয়ান দেখি পিটপিট করে পেছন দিকে চাইচে। ইশারা করে আমাদের কথা বলা বারণ করে দিলে। বেশ আছে ! এদিকে গাড়ি একেবারে নবাবগঞ্জ থানার কাছাকাছি এসে পড়ল, বাজার দেখা যাচ্চে, তখন সেই লোক ক-জন বললে—ওস্তাদজি, আমাদের ঘাট হয়েছে, আমরা বুঝতে পারিনি, ছেড়ে দাও। বুধো গাড়োয়ান বললে—সে হবে না ব্যাটারা, আজ সব থানায় নিয়ে গিয়ে বাঁধিয়ে দেব। অনেক কাকুতি-মিনতির পর বুধো বললে—আচ্ছা, যা ছেড়ে দিলাম এবার, কিন্তু কক্ষনো এরকম আর করিসনি ! তবে তারা বুধো গাড়োয়ানের পায়ের ধুলো নিয়ে চলে গেল। আমার স্বচক্ষে দেখা ! মন্তরের চোটে ওই যে ওরা বাঁশ এসে ধরেচে, অমনি ধরেই রয়েচে—আর ছাড়াবার সাধ্যি নেই—চলেছে গাড়ির সঙ্গে, একেবারে পেরেক-আঁটা হয়ে গিয়েচে! তা বুঝলে বাপু, মন্তর-তন্তরের কথা—।
গল্প বলতে বলতে বেলা যেত। পাঠশালার চারপাশের বন-জঙ্গলে অপরাহ্ণের রাঙা রোদ বাঁকাভাবে এসে পড়ত। কাঠাল গাছের, জগডুমুর গাছের ডালে ঝোলা গুলঞ্চ-লতার গায়ে টুনটুনি পাখি মুখ উঁচু করে দোল খেত। পাঠশালা-ঘরে বনের গন্ধের সঙ্গে তালপাতার চাটাই, ছেঁড়াখোড়া বই-দপ্তর, পাঠশালার মাটির মেজে ও দা-কাটা কড়া তামাকের ধোঁয়া—সবসুদ্ধ মিলে এক জটিল গন্ধের সৃষ্টি করত।
সেই গ্রামের ছায়া-ভরা মাটির পথে একটি মুগ্ধ গ্রাম্য বালকের ছবি আছে। বই-দপ্তর বগলে নিয়ে সে তার দিদির পেছনে পেছনে সাজিমাটি দিয়ে কাচা, সেলাই-করা কাপড় পরে পাঠশালা থেকে ফিরছে। তার ছোট্টো মাথাটির অমন রেশমের মতো নরম, চিক্কণ সুখস্পর্শ চুলগুলি তার মা যত্ন করে আঁচড়িয়ে দিয়েছে—তার ডাগর-ডাগর সুন্দর চোখ দু-টিতে কেমন যেন অবাক ধরনের চাউনি—যেন তারা এ কোন অদ্ভুত জগতে নতুন চোখ মেলে চেয়ে দিশেহারা হয়ে উঠেছে। গাছপালায় ঘেরা এইটুকুই কেবল তার পরিচিত দেশ—এখানেই মা রোজ হাতে করে খাওয়ায়, চুল আঁচড়িয়ে দেয়, দিদি কাপড় পরিয়ে দেয়। এই গণ্ডিটুকু ছাড়ালেই তার চারধার ঘিরে অপরিচয়ের অকূল জলধি—তার শিশুমন থই পায় না!
ওই যে বাগানের ওদিকে বাঁশবন, ওর পাশ কেটে যে সরু পথটা ওধারে কোথায় চলে গেল—তুমি বরাবর সোজা যদি ও-পথটা বেয়ে চলে যাও, তবে শাঁখারিপুকুরের পাড়ের মধ্যে অজানা গুপ্তধনের দেশে পড়বে। বড়ো গাছের তলায় সেখানে বৃষ্টির জলে মাটি খসে পড়েছে, কত মোহর-ভরা হাঁড়ি-কলসির কানা বার হয়ে আছে, অন্ধকার বন-ঝোপের নীচে, কচু ওল বন-কলমির চকচকে সবুজ পাতার আড়ালে চাপা—কেউ জানে না কোথায়!
একদিন পাঠশালায় এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল, যা তার জীবনের একটি নতুন অভিজ্ঞতা। সেদিন বিকালে পাঠশালায় অন্য কেউ উপস্থিত না থাকায় কোনো গল্পগুজব হল না, পড়াশোনা হচ্ছিল। সে গিয়ে বসে পড়ছিল 'শিশুবোধক'। এমন সময় গুরুমশাই বললেন—দেখি, সেলেট নাও, শ্রুতিলিখন লেখো।
মুখে-মুখে বলে গেলেও অপুও বুঝেছিল গুরুমশাই নিজের কথা বলছেন না—মুখস্থ বলছেন, সে যেমন দাশুরায়ের পাঁচালি থেকে ছড়া মুখস্থ বলে তেমনি।
শুনতে শুনতে তার মনে হল অনেকগুলো অমন সুন্দর কথা একসঙ্গে পর পর সে কখনো শোনেনি। ওসব কথার অর্থ সে বুঝতে পারল না, কিন্তু অজানা শব্দ ও ললিত পদের ধবনি, ঝংকার-জড়ানো এই অপরিচিত শব্দসংগীত, অনভ্যস্ত শিশুকর্ণে অপূর্ব ঠেকল এবং সব কথার অর্থ না বোঝার দরুনই কুহেলি-ঘেরা অস্পষ্ট শব্দ-সমষ্টির পেছন থেকে একটা অপূর্ব দেশের ছবি বার-বার উঁকি মারতে লাগল।
বড়ো হয়ে স্কুলে পড়বার সময় সে খুঁজে পেয়েছিল ছেলে-বেলাকার এই মুখস্থ শ্রুতিলিখন কোথায় আছে—
'এই সেই জনস্থানমধ্যবর্তী প্রস্রবণগিরি। এই গিরির শিখরদেশ আকাশপথে সতত সঞ্চরমাণ জলধরমণ্ডলীর যোগে নিরন্তর নিবিড় নীলিমায় অলঙ্কৃত, অধিত্যকা প্রদেশ ঘনসন্নিবিষ্ট বিবিধ বনপাদপসমূহে আচ্ছন্ন থাকাতে সতত স্নিগ্ধ, শীতল ও রমণীয়, পাদদেশে প্রসন্নসলিলা গোদাবরী তরঙ্গ বিস্তার করিয়া…’*
সে ঠিক বলতে পারে না, বুঝাতে পারে না, কিন্তু সে জানে —তার মনে হয়, অনেক সময়েই মনে হয়–সেই যে বছর-দুই আগে কুঠির মাঠে সরস্বতী পূজার দিন নীলকণ্ঠ পাখি দেখতে গিয়েছিল, সেদিন মাঠের ধার বেয়ে একটা পথকে দূরে কোথাও যেতে দেখেছিল সে। পথটার দু-ধারে যে কত কী অচেনা পাখি, অচেনা গাছপালা, অচেনা বনঝোপ—অনেকক্ষণ সেদিন সে-পথটার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে ছিল। মাঠের ওদিকে পথটা কোথায় যে চলে গেছে তা ভেবে সে কূল পায়নি।
তার বাবা বলেছিল—ও সোনাডাঙা মাঠের রাস্তা, মাধবপুর দশঘরা হয়ে সেই ধলচিতের খেয়াঘাটে গিয়ে মিশেছে। ধলচিতের খেয়াঘাটে নয়, সে জানত ও পথটা আরও অনেক দূরে গিয়েছে—রামায়ণ-মহাভারতের দেশে ! সেই অশথ গাছের সকলের উঁচু ডালটার দিকে চেয়ে থাকলে যার কথা মনে উঠে—সেই বহুদূরের দেশটা !
শ্রুতিলিখন শুনতে-শুনতে সেই দু-বছর আগে দেখা পথটার কথাই তার মনে পড়ে গেল।
ওই পথের ওধারে—অনেক দূরে—কোথায় সেই জনস্থানমধ্যবর্তী প্রস্রবণগিরি? বনঝোপের স্নিগ্ধ গন্ধে না-জানার ছায়া নেমে আসা ঝিকিমিকি সন্ধ্যায়, সেই স্বপ্নালোকের ছবি তাকে অবাক করে দিল। কত দূরে সেই প্রস্রবণগিরির উন্নত শিখর, আকাশপথে সতত সঞ্চরমাণ মেঘমালায় যার প্রশান্ত, নীল সৌন্দর্য সর্বদা আবৃত থাকে?
সে বড়ো হলে গিয়ে দেখবে।
________________________
* শ্রুতিলিখনের কথাগুলি বিদ্যাসাগর মশাইয়ের ‘সীতার বনবাস’ নামক প্রথম পরিচ্ছেদ থেকে গৃহীত ।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন