বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রথম যখন হরিহর কাশী থেকে এল, তখন সকলে বলত—তার ভবিষ্যৎ বড়ো উজ্জ্বল, এ অঞ্চলে ওরকম বিদ্যা শিখে কেউ আসেনি। তার বিদ্যার সুখ্যাতি সকলের মুখে ছিল, সকলে বলত—সে এবার একটা কিছু করবে। সর্বজয়াও ভাবত, শীঘ্রই ওরা তার স্বামীকে ডাকিয়ে একটা ভালো চাকরি দেবে। (কারা চাকরি দেয় সে-সম্বন্ধে তার ধারণা ছিল কুয়াশাচ্ছন্ন সমুদ্র-বক্ষের মতো অস্পষ্ট)। কিন্তু মাসের পর মাস, বছরের পর বছর করে বহুকাল চলে গেল। ঘরের পোকা-কাটা কপাট দিন-দিন আরও জীর্ণ হতে চলল, কড়িকাঠ আরও ঝুলে পড়তে চাইল। আগে যা-ও বা ছিল তাও আর সব থাকছে না, তবুও সে একেবারে আশা ছাড়েনি। হরিহরও বিদেশ থেকে এসে প্রতিবারই একটা-একটা আশার কথা এমনভাবে বলে, যেন সব ঠিকঠাক, অল্পমাত্র দেরি আছে, অবস্থা ফিরল বলে ! …কিন্তু হয় কই?
হরিহর বাড়ি থেকে গিয়েছে প্রায় দু-তিন মাস। টাকাকড়ি খরচপত্রও অনেকদিন পাঠায়নি। দুর্গা অসুখে ভুগছে একটু বেশি, খায়-দায়—অসুখ হয়, দু-দিন একটু ভালো থাকে, হঠাৎ একদিন আবার হয়।
দুর্গা একটা ছোট্ট মানকচু কোথা থেকে জোগাড় করে এনে রান্নাঘরে ধরনা দিয়ে বসে থাকে। তার মা বলে—তোর হল কী দুগগা? আজ কী বলে ভাত খাবি? কাল সন্ধ্যেবেলাও তো জ্বর এসেচে। দুর্গা বলে—তা হোক মা, সে জ্বর বুঝি? একটু তো মোটে শীত করল ! তুমি এই মানকচুটা ভাতে দিয়ে দুটো ভাত—
তার মা বলে—অসুখ হয়ে তোর খাই-খাই বড্ড বেড়েচে। আজ আর কাল ভালো যদি থাকিস তো পরশু বরং দেব।
অনেক কাকুতি-মিনতির পর, না পেরে শেষে দুর্গা মানকচু তুলে রেখে দেয়। খানিকটা চুপ করে বসে থাকে, আপন মনে বলে—আজ ভালো আছি, আজ আর জ্বর আসবে না আমার, ওবেলা দু-খানা রুটি আর আলুভাজা খাব। …একটু পরেই হাই ওঠে, সে জানে এটা জ্বর আসার পূর্বলক্ষণ। তবুও সে মনকে বোঝায়, হাই উঠুক, এমনি তো কত হাই ওঠে, জ্বর আর আসবে না। ক্রমে শীত করে, রৌদ্রে গিয়ে বসতে ইচ্ছা হয়।

সে লুকিয়ে গিয়ে রৌদ্রে বসে,পাছে মা টের পায়
সে লুকিয়ে গিয়ে রৌদ্রে বসে, পাছে মা টের পায়। তার মন হু-হু করে, ভাবে জ্বর জ্বর ভেবে এরকম হচ্চে, সত্যি-সত্যি জ্বর হয়নি।
রাঙা রোদ শ্যাওলাধরা ভাঙা পাঁচিলের গায়ে গিয়ে পড়ে। বিকালের ছায়া ঘন হয়—দুর্গার মনে হয় অন্যমনস্ক হয়ে থাকলে জ্বর চলে যাবে। অপুকে বলে—বোস দিকি একটু আমার কাছে, আয় গল্প করি।
গল্প ভালো করে শেষ হতে না হতে দুর্গা জ্বরের ধমকে আর বসতে পারে না, উঠে ঘরের মধ্যে কাঁথা মুড়ি দিয়ে শোয়। আজকাল বাবা বাড়ি নেই, অপুকে আর খুঁজে মেলা দায় ! বই-দপ্তরে ঘুণ ধরার জোগাড় হয়েছে। সকালে সেই যে এক পুঁটলি কড়ি নিয়ে বার হয়, আর ফেরে একেবারে দুপুর গেলে খাবার সময়। তার মা বকে—ছেলের না নিকুচি করেচে, তোমার লেখাপড়া একেবারে ছিকেয় উঠল? এবার বাড়ি এলে সব কথা বলে দেব, দেখো এখন তুমি।
অপু ভয়ে-ভয়ে দপ্তর নিয়ে বসে। বইগুলো খুলে চারদিকে ছড়ায়। মাকে বলে—একটু খয়ের দাও মা, আমি দোয়াতের কালিতে দেব।
পরে সে বসে বসে হাতের লেখা লিখে রোদে দেয়। শুকিয়ে গেলে খয়ের-ভিজানো কালি চকচক করে—অপু মহাখুশির সঙ্গে সেদিক চেয়ে থাকে, ভাবে—আর একটু খয়ের দেব কাল থেকে—ওঃ কী চকচক করছে দ্যাখো একবার! পানের বাটা থেকে মাকে লুকিয়ে বড়ো একখণ্ড খয়ের নিয়ে কালির দোয়াতে দেয়। পরে লেখা লিখে শুকাতে দিয়ে কতটা আজ জ্বলজ্বল করে দেখবার জন্য কৌতূহলের সঙ্গে সেদিকে চেয়ে থাকে। মনে হয়—আচ্ছা যদি আর একটু দিই?
একদিন মা-র কাছে ধরা পড়ে যায়। মা বলে—ছেলের লেখার সঙ্গে খোঁজ নেই, কেবল ড্যালা-ড্যালা খয়ের রোজ দরকার। রেখে দে খয়ের। ধরা পড়ে অপু একটু অপ্রতিভ হয়ে বলে—খয়ের নইলে কালি হয় বুঝি? আমি বুঝি এমনি-এমনি—
—না, খয়ের নইলে কালি হবে কেন? এইসব রাজ্যির ছেলে আর লেখাপড়া কচ্চে না? তাদের সের-সের খয়ের রোজ জোগান রয়েচে যে দোকানে !
অপু বসে বসে একখানা খাতায় নাটক লেখে। বহু লিখে সে খাতা প্রায় ভরে ফেলেছে—মন্ত্রীর বিশ্বাসঘাতকতায় রাজা রাজ্য ছেড়ে বনে যান, রাজপুত্র নীলাম্বর ও রাজকুমারী অম্বা বনের মধ্যে দস্যুর হাতে পড়েন, ঘোর যুদ্ধ হয়, পরে রাজকুমারীর মৃতদেহ নদীতীরে দেখা যায়। নাটকে সতু বলে একটি জটিল চরিত্র সৃষ্ট হওয়ার অল্প পরেই বিশেষ কোনো মারাত্মক দোষের বর্ণনা না থাকা সত্ত্বেও সে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত হয়। নাটকের শেষদিকে রাজপুত্রী অম্বার নারদের বরে পুনর্জীবন প্রাপ্তি ও বিশ্বস্ত সেনাপতি জীবনকেতুর সঙ্গে তাঁর বিয়ে প্রভৃতি ঘটনার বর্ণনা।
দপ্তরে একখানা বই আছে—বইখানার নাম 'চরিতমালা', লেখা আছে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রণীত। পুরোনো বই। তার বাবার নানা জায়গা থেকে ছেলের জন্য বই সংগ্রহ করার বাতিক আছে, কোথা থেকে এ-খানা এনেছিল, অপু মাঝে-মাঝে খানিকটা খুলে পড়ে থাকে। বইখানাতে যাঁদের গল্প আছে, সে ওইরকম হতে চায়।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন