আমের কুশি

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

সকাল বেলা। আটটা কি নয়টা। হরিহরের পুত্র আপন মনে রোয়াকে বসে খেলা করছে।

এমন সময় তার দিদি দুর্গা উঠানের কাঁঠালতলা থেকে ডাকল—অপু—ও অপু—। সে এতক্ষণ বাড়ি ছিল না, কোথা থেকে এইমাত্র এল। তার স্বর একটু সতর্কতামিশ্রিত।

দুর্গার বয়স দশ-এগারো বছর। গড়ন পাতলা-পাতলা, রং অপুর মতো অতটা ফর্সা নয়, একটু চাপা। হাতে কাচের চুড়ি, পরনে ময়লা কাপড়, মাথার চুল রুক্ষ—বাতাসে উড়ছে, মুখের গড়ন মন্দ নয়, অপুর মতো চোখগুলি বেশ ডাগর ডাগর। অপু রোয়াক থেকে নেমে কাছে গেল, বলল—কী রে?

দুর্গার হাতে একটা নারকেলের মালা। সেটা সে নীচু করে দেখাল, কতকগুলি কচি আম কাটা। সুর নীচু করে বলল—মা ঘাট থেকে আসেনি তো?

অপু ঘাড় নেড়ে বলল—উঁহু—

দুর্গা চুপি-চুপি বলল—একটু তেল আর একটু নুন নিয়ে আসতে পারিস? আমের কুশি জারাবো—

অপু আহ্লাদের সঙ্গে বলে উঠল—কোথা পেলি রে দিদি? দুর্গা বলল—পটলিদের বাগানে সিঁদুরকোটোর তলায় পড়েছিল—আন দিকি একটু নুন আর তেল।

অপু দিদির দিকে চেয়ে বলল—তেলের ভাঁড় ছুঁলে মা মারবে যে! আমার কাপড় যে বাসি!

—তুই যা না শিগগির করে, মা-র আসতে এখন ঢের দেরি—ক্ষার কাচতে গিয়েচে—শিগগির যা—

অপু বলল—নারকেলের মালাটা আমায় দে। ওতে ঢেলে নিয়ে আসব, তুই খিড়কি দোরে গিয়ে দ্যাখ মা আসচে কি না। দুর্গা নিম্লস্বরে বলল—তেল-টেল যেন মেজেতে ঢালিসনে, সাবধানে নিবি, নইলে মা টের পাবে, তুই তো একটা হাবা ছেলে—

অপু বাড়ির ভেতর থেকে বার হয়ে এলে দুর্গা তার হাত থেকে মালা নিয়ে আমগুলি বেশ কবে মাখল, বলল—নে হাত পাত।

i4

...সাবধানে নিবি,নইলে মা টের পাবে...

—তুই অতগুলো খাবি দিদি?

—অতগুলো বুঝি হল? এই তো—ভারী বেশি—যা, আচ্ছা নে আর দু-খানা—বাঃ, দেখতে বেশ হয়েছে রে, একটা লঙ্কা আনতে পারিস? আর একখানা দেব তাহলে—

—লঙ্কা কি করে পাড়ব দিদি। মা যে তক্তার ওপর রেখে দ্যায়—আমি যে নাগাল পাইনে!

—তবে থাকগে যাক—আবার ওবেলা আনব এখন। পটলিদের ডোবার ধারের আমগাছটায় গুটি যা ধরেচে, দুপুরের রোদে তলায় ঝরে পড়ে।

খিড়কির দোর ঝনাৎ করে খোলার শব্দ হল এবং একটু পরেই সর্বজয়ার গলা শোনা গেল—দুগগা—ও দুগগা—

দুর্গা বলল—মা ডাকচে, যা দেখে আয়—ওখানা খেয়ে যা—মুখে যে নুনের গুঁড়ো লেগে আছে, মুছে ফ্যাল—

মায়ের ডাক আর একবার কানে গেলেও দুর্গার এখন উত্তর দেবার সুযোগ নেই, মুখ ভরতি। সে তাড়াতাড়ি জারানো আমের চাকলাগুলি খেতে লাগল। পরে এখনও অনেক অবশিষ্ট আছে দেখে কাঁঠালগাছটা কাছে সরে গিয়ে গুঁড়ির আড়ালে দাঁড়িয়ে সেগুলি গোগ্রাসে গিলতে লাগল। অপু তার পাশে দাঁড়িয়ে নিজের অংশ প্রাণপণে গিলছিল, কারণ চিবিয়ে খাওয়ার আর সময় নেই। খেতে খেতে দিদির দিকে চেয়ে সে দোষ সম্বন্ধে সচেতনতাসূচক হাসি হাসল। দুর্গা খালি মালাটা এক টান মেরে জঙ্গলের মধ্যে ছুড়ে দিল। ভাইয়ের দিকে চেয়ে বলল—মুখটা মুছে ফ্যাল না বাঁদর, নুন লেগে রয়েছে যে!

পরে দুর্গা নিরীহ মুখে বাড়িতে ঢুকে বলল—কী মা?

—কোথায় বেরুনো হয়েছিল শুনি? একলা নিজে কতদিকে যাব? অত বড়ো মেয়ে, সংসারের কুটোগাছটা ভেঙে দু-খানা করা নেই, কেবল পাড়ায় পাড়ায় টো-টো করে টোকলা সেধে বেড়াচ্ছেন—সে বাঁদর কোথায় গেল?

অপু এসে বলল—মা, খিদে পেয়েছে।

—রোসো, রোসো, একটুখানি দাঁড়াও বাপু, একটুখানি হাঁপ ছাড়তে দাও। তোমাদের রাতদিন খিদে, আর রাতদিন ফাইফরমাজ! ও দুগগা, দ্যাখতো বাছুরটা ডাক পাড়ছে কেন? খানিকটা পরে সর্বজয়া রান্নাঘরের দাওয়ায় বঁটি পেতে শশা কাটতে বসল। অপু কাছে বসে পড়ে বলল—আর এট্টু আটা বের করো না মা, মুখে বড্ড লাগে।

দুর্গা নিজের ভাগ হাত পেতে নিয়ে সঙ্কুচিত সুরে বলল—চাল-ভাজা আর নেই মা?

অপু খেতে-খেতে বলল—উঃ চিবনো যায় না, আম খেয়ে যা দাঁত টকে—

দুর্গার ভ্রূকুটিমিশ্রিত চোখ-টেপায় বাধা পেয়ে তার কথা অর্ধপথেই বন্ধ হয়ে গেল। তার মা জিজ্ঞাসা করল—আম কোথায় পেলি? সত্য কথা প্রকাশ করতে সাহসী না হয়ে অপু দিদির দিকে জিজ্ঞাসাসূচক দৃষ্টিতে তাকাল। সর্বজয়া মেয়ের দিকে চেয়ে বলল—তুই ফের এখন বেরিয়েছিলি বুঝি?

দুর্গা বিপন্নমুখে বলল—ওকে জিগগেস করো না? আমি—এই তো এখন কাঁঠাল তলায় দাঁড়িয়ে—তুমি যখন ডাকলে তখন তো—

স্বর্ণ গোয়ালিনি গাই দুইতে আসায় কথাটা চাপা পড়ে গেল। মা বলল—যা, বাছুরটা ধরগে যা—ডেকে-ডেকে সারা হল! কমলে বাছুর, ও সন্ন, এত বেলা করে এলে কি বাঁচে? একটু সকাল করে না এলে এই তেতপ্পর পজ্জন্ত বাছুর বাঁধা—

দিদির পেছনে পেছনে অপুও দুধ-দোয়া দেখতে গেল। সে বাইরের উঠানে পা দিতেই দুর্গা তার পিঠে দুম করে নির্ঘাত এক কিল বসিয়ে দিয়ে বলল—লক্ষ্মীছাড়া বাঁদর! পরে মুখ ভ্যাঙিয়ে বলল—আম খেয়ে দাঁত টকে গিয়েছে! আর কোনোদিন আম দেব—ছাই দেব! এই বেলাই পটলিদের কাঁকুড়তলির আম কুড়িয়ে এনে জারাব, এত বড়ো গুটি হয়েছে, মিষ্টি যেন গুড়—দেব তোমায়? খেও এখন! হাবা একটা কোথাকার—যদি একটুকু বুদ্ধি থাকে!

দুপুরের কিছু পরে হরিহর কাজ সেরে বাড়ি ফিরে এল। সে আজকাল গ্রামের অন্নদা রায়ের বাড়িতে গোমস্তার কাজ করে। জিজ্ঞাসা করল—অপুকে তো দেখচিনে।

সর্বজয়া বলল—অপু তো ঘরে ঘুমুচ্ছে।

—দুগগা বুঝি—

—সে সেই খেয়ে বেরিয়েছে—সে বাড়ি থাকে কখন? দুটো খাওয়ার সঙ্গে যা সম্পর্ক! আবার সেই খিদে পেলে তবে আসবে! কোথায় কার বাগানে, কার আমতলায় জামতলায় ঘুরছে—এই চত্তির মাসের রোদ্দুরে। ফের দ্যাখো না এই জ্বরে পড়ল বলে—অত বড়ো মেয়ে, বলে বোঝাব কত? কথা শোনে, না কানে নেয়?

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%