শকুনির ডিম

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

অপু সেদিন জেলেপাড়ায় কড়ি খেলতে গিয়েছিল। কয়েক জায়গায় বিফল মনোরথ হয়ে ঘুরতে-ঘুরতে বাবুরাম পাড়ুইয়ের বাড়ির কাছে তেঁতুলতলার কাছে এসেই তার মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তেঁতুলতলায় কড়ি-খেলার আড্ডা খুব জমেছে। সবাই জেলেপাড়ায় ছেলে, কেবল ব্রাহ্মণপাড়ার ছেলের মধ্যে আছে পটু। অপুর সঙ্গে পটুর তেমন আলাপ নেই, কারণ পটুর যে পাড়ায় বাড়ি, অপুদের বাড়ি থেকে তা অনেক দূর। অপুর চেয়ে বয়সে পটু কিছু ছোটো। অপুর মনে আছে, প্রথম যেদিন সে প্রসন্ন গুরুমশাইয়ের পাঠশালায় ভরতি হতে যায়, সেদিন এই ছেলেটিকেই সে শান্তভাবে বসে তালপাতা মুখে পুরে চিবোতে দেখেছিল। অপু তার কাছে গিয়ে বলল—ক-টা কড়ি? …পটু কড়ির গেঁজে বার করে দেখাল। রাঙা সুতার বুনানি ছোট্ট গেঁজেটি—তার অত্যন্ত শখের জিনিস। বলল—সতেরোটা এনিচি—সাতটা সোনা-গেঁটে, হেরে গেলে আরও আনব। …পরে সে গেঁজেটা দেখিয়ে হাসিমুখে বলল—কেমন দেখেচিস? গেঁজেটায় একপণ কড়ি ধরে।

খেলা আরম্ভ হল। প্রথমটা পটু হারছিল, পরে জিতিতে শুরু করল। কয়েকদিন মাত্র আগে পটু আবিষ্কার করেছে যে, কড়ি-খেলায় তার হাতের লক্ষ্য অব্যর্থ হয়ে উঠেছে। সেজন্যেই সে দিগবিজয়ের উচ্চাশায় প্রলুব্ধ হয়ে এতদূর এসেছিল। খেলার নিয়মানুসারে পটু ওপর থেকে টুক করে বড়ো কড়ি দিয়ে তাক ঠিক করে মারতেই যেমন একটা কড়ি বোঁ করে ঘুরতে ঘুরতে ঘর থেকে বার হয়ে যায়, অমনি পটুর মুখ অসীম আহ্লাদে উজ্জ্বল হয়ে উঠে। পরে সে জিতে-পাওয়া কড়িগুলি তুলে গেঁজের মধ্যে পুরে লোভে ও আনন্দে বার-বার গেঁজেটির দিকে চেয়ে দেখে, সেটা ভরতি হতে আর কত বাকি !

কয়েকজন জেলের ছেলে কী পরামর্শ করল। একজন পটুকে বলিল—আর এক হাত তফাত থেকে তোমায় মারতে হবে ঠাকুর, তোমার হাতের টিপ বেশি।

পটু বলল—বা রে, তা কেন, টিপ বেশি থাকাটা দোষ বুঝি? তোমরাও জেতো না, আমি তো কাউকে বারণ করিনি।

পরে সে চারদিকে চেয়ে দেখল, জেলের ছেলেরা সব একদিকে হয়েছে। পটু ভাবল—এত বেশি কড়ি আমি কোনোদিন জিতিনি, আজ আর খেলচিনে—খেললে কি এই কড়ি বাড়ি নিয়ে যেতে পারব? আবার একহাত বাধ বেশি ! সব হেরে যাব। …হঠাৎ সে কড়ির ছোট্ট থলেটি হাতে নিয়ে বলল—আমি এক হাত বেশি নিয়ে খেলব না, আমি বাড়ি যাচ্ছি। …পরে জেলের ছেলেদের ভাবভঙ্গি ও চোখের নিষ্টুর দৃষ্টি দেখে সে নিজের অজ্ঞাতসারে নিজের কড়ির থলিটি শক্ত মুঠোয় চাপে রাখল।

একজন এগিয়ে এসে বলল—তা হবে না ঠাকুর, কড়ি জিতে পালাবে বুঝি? …সঙ্গে সঙ্গে সে হঠাৎ পটুর থলিসুদ্ধ হাতটা চেপে ধরল। পটু ছাড়িয়ে নিতে গেল, কিন্তু জোরে পারল না। বিষণ্ণমুখে বলিল—বা রে, ছেড়ে দাও না আমার হাত ! …পেছন থেকে একজন তাকে ঠেলা মারল। সে পড়ে গেল বটে, কিন্তু কড়ির থলে ছাড়ল না। সে বুঝেছে এটি কাড়বার জন্য এদের চেষ্টা ! পড়ে গিয়ে সে প্রাণপণে থলিটা পেটের কাছে চেপে রাখতে গেল, কিন্তু একে সে ছেলেমানুষ, তাতে গায়ের জোরও কম, জেলেপাড়ার বলিষ্ঠ ও বয়সে বড়ো ছেলেদের সঙ্গে কতক্ষণ যুঝতে পারবে। হাত থেকে কড়ির থলেটা অনেকক্ষণ কোন ধারে ছিটকিয়ে পড়েছিল—কড়িগুলি চারধারে ছত্রাকার হয়ে গেল।

অপু প্রথমটা পটুর দুর্দশায় একটু যে খুশি না হয়েছিল তা নয়, কারণ সেও অনেক কড়ি হেরেছে। কিন্তু পটুকে পড়ে যেতে দেখে, বিশেষ করে তাকে অসহায়ভাবে পড়ে মার খেতে দেখে তার বুকের মধ্যে কেমন করে উঠল। সে ভিড় ঠেলে এগিয়ে গিয়ে বলল—ছেলেমানুষ ওকে তোমরা মারচ কেন? বা রে, ছেড়ে দাও—ছাড়ো! পরে সে পটুকে মাটি থেকে উঠাতে গেল, কিন্তু পেছন থেকে কার ঘুঁষি খেয়ে অনেকক্ষণ সে চোখে কিছু দেখতে পেল না, তারপর ঠেলাঠেলিতে সে-ও মাটিতে পড়ে গেল।

অপু কাউকে একথা এখনো বলেনি নাই—দিদিকেও না।

সেদিন সে দুপুর বেলা বাবার অনুপস্থিতে অপু ঘরের দরজা বন্ধ করে চুপিচুপি বইয়ের বাক্সটা লুকিয়ে খুলল। অধীর আগ্রহের সঙ্গে সে এ-বই ও-বই খুলে খানিকটা করে ছবি দেখতে এবং খানিকটা বইয়ের মধ্যে ভালো গল্প লেখা আছে কি না দেখতে লাগল। একখানা বইয়ের মলাট খুলে দেখল নাম লেখা আছে 'সর্ব-দর্শন-সংগ্রহ'। এর অর্থ কী বা বইখানা কোন বিষয়ের তা সে বিন্দুবিসর্গও বুঝল না। বইখানা খুলতেই একদল কাগজ-কাটা পোকা নিঃশব্দে বিবর্ণ মার্বেল কাগজের নীচ থেকে বার হয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে যেদিকে দু-চোখ যায় দৌড় দিল। অপু বইখানা নাকের কাছে নিয়ে ঘ্রাণ নিল, কেমন পুরোনো গন্ধ ! মেটে রঙের পুরু-পুরু পাতাগুলির এই গন্ধটা তার বড়ো ভালো লাগে—গন্ধটায় কেবলই তার বাবার কথা মনে করিয়ে দেয়।

i16

অত্যন্ত পুরোনো মার্বেল কাগজের বাঁধাই করা মলাটের—নানাস্থানে চটা উঠে গেছে। এই পুরোনো বইয়ের ওপরই তার প্রধান মোহ। সেইজন্য সে বইখানা বালিশের তলায় লুকিয়ে রেখে, অন্যান্য বই তুলে বাক্স বন্ধ করে দিল।

লুকিয়ে পড়তে-পড়তে এই বইখানিতেই একদিন সে পড়ল বড়ো অদ্ভুত কথাটা ! হঠাৎ শুনলে মানুষ আশ্চর্য হয়ে যায় বটে, কিন্তু ছাপার অক্ষরে বইখানার মধ্যে একথা লেখা আছে, সে পড়ে দেখল। পারদের গুণ বর্ণনা করতে করতে লেখক লিখেছেন—'শকুনির ডিমের মধ্যে পারদ পুরিয়া কয়েকদিন রৌদ্রে রাখিতে হয়, পরে সেই ডিম মুখের ভিতর পুরিয়া, মানুষ ইচ্ছা করিলে শূন্যমার্গে বিচরণ করার ক্ষমতা প্রাপ্ত হয়।'

i17

অপু নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারল না, আবার পড়ল—আবার পড়ল। পরে নিজের ডালাভাঙা বাক্সটার মধ্যে বইখানা লুকিয়ে রেখে বাইরে গিয়ে কথাটা ভাবতে ভাবতে সে অবাক হয়ে গেল।

i18

দিদিকে জিজ্ঞাসা করে—শকুনিরা বাসা বাঁধে কোথায় জানিস দিদি? তার দিদি বলতে পারে না !

সে পাড়ার ছেলেদের—সতু, নীপু, কিনু, পটল, নেড়া—সকলকে জিজ্ঞাসা করে। কেউ বলে—সে এখানে নয়, উত্তর মাঠে উঁচু গাছের মাথায়। তার মা বকে—এই দুপুর বেলা কোথায় ঘুরে বেড়াস! অপু ঘরে ঢুকে শোয়ায় ভান করে, বইখানা খুলে সেই জায়গাটা আবার পড়ে দেখে। আশ্চর্য! এত সহজে উড়বার উপায়টা কেউ জানে না? হয়তো এই বইখানা আর কারও বাড়িতে নেই, শুধু তার বাবারই আছে, হয়তো এই জায়গাটা আর কেউ পড়ে দেখেনি, শুধু তারই চোখে পড়েছে এতদিনে।

i19

বইখানার মধ্যে মুখ গুঁজে আবার সে আঘ্রাণ লয়—সেই পুরোনো-পুরোনো গন্ধটা। এই বইয়ে যা লেখা আছে, তার সত্যতা সম্বন্ধে তার মনে আর কোনো অবিশ্বাস থাকে না। পারদের জন্য ভাবনা নেই—পারদ মানে পারা সে জানে। আয়নার পেছনে পারা মাখানো থাকে, একখানা ভাঙা আয়না বাড়িতে আছে, এটা সে জোগাড় করতে পারবে'খন। কিন্তু শকুনির ডিম এখন সে কোথায় কী করে পায়?

সন্ধান অবশেষে মিলল। হীরু নাপিতের কাঁটাল-তলায় রাখালেরা গোরু বেঁধে গেরস্থের বাড়ি তেল-তামাক আনতে যায়। অপু গিয়ে তাদের পাড়ার রাখালকে বলল—তোরা কত মাঠে-মাঠে বেড়াস, শকুনির বাসা দেখতে পাস? আমায় যদি একটা শকুনির ডিম এনে দিস, আমি দুটো পয়সা দেবো। দিন চারেক পরেই রাখাল তাদের বাড়ির সামনে এসে তাকে ডেকে কোমরের থলি থেকে দুটি কালো রঙের ছোটো-ছোটো ডিম বার করে বলল—এই দ্যাখো ঠাকুর, এনেচি। অপু তাড়াতাড়ি হাত বাড়িয়ে বলল—দেখি ! পরে আহ্লাদের সঙ্গে নেড়েচেড়ে বলল—শকুনির ডিম ! —ঠিক তো? রাখাল সে-সম্বন্ধে ভূরি-ভূরি প্রমাণ উত্থাপিত করল। এটা শকুনির ডিম কিনা এ-সম্বন্ধে সন্দেহের কারণ নেই, সে নিজের জীবন বিপন্ন করে কোথাকার কোন উঁচু গাছের মগডাল থেকে এটা সংগ্রহ করে এনেছে, কিন্তু দু-আনার কমে দেবে না। পারিশ্রমিক শুনে অপু অন্ধকার দেখল। বলল—দুটো পয়সা দেব আর আমার কড়িগুলো নিবি? সব দিয়ে দেব, একটা টিনের কৌটো ভরতি কড়িসব। এই এত বড়ো-বড়ো সোনা-গেঁটে—দেখবি, দেখাব?

রাখালকে সাংসারিক বিষয়ে অপুর চেয়ে অনেক হুঁশিয়ার বলে মনে হল ! সে নগদ পয়সা ছাড়া কোনো রকমেই রাজি হয় না। অনেক দরদস্তুরের পর এসে চার পয়সায় দাঁড়াল। অপু দিদির কাছে চেয়েচিন্তে আর দুটো পয়সা জোগাড় করে দাম চুকিয়ে দিয়ে ডিম দু-টি নিল। তা ছাড়া রাখাল কিছু কড়িও নিল। এই কড়িগুলি অপূর প্রাণ, অর্ধেক-রাজত্ব আর রাজকন্যার বিনিময়েও সে এই কড়ি কখনো হাতছাড়া করত না অন্য সময়, কিন্তু আকাশে উড়বার আমোদের কাছে কি আর বেগুন-বিচি খেলা !

ডিমটা হাতে পাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে তার প্রাণটা যেন ফুঁ-দেওয়া রবারের বেলুনের মতো হালকা হয়ে ফুলে উঠল। তারপর যেন একটু সন্দেহের ছায়া তার মনে এসে পৌঁছোল। সন্ধ্যার আগে, একা- একা নেড়াদের আমগাছের কাটা গুঁড়ির ওপর বসে সে ভাবতে লাগল—সত্যি-সত্যি ওড়া যাবে তো ! আচ্ছা সে উড়ে কোথায় যাবে? মামার বাড়ির দেশে? বাবা যেখানে আছে সেখানে? নদীর ওপারে? শালিক-পাখি ময়না-পাখির মতো ও-ই আকাশের গায়ে তারা যেখানে উড়ছে ওখানে?

সেই দিনই, কি তার পরদিন। সন্ধ্যার একটু আগে দুর্গা সলতে পাকাবার জন্য ছেঁড়া নেকড়া খুঁজছিল। তাকের হাঁড়ি-কলসির পাশে গোঁজা ছেঁড়াখোঁড়া কাপড়ের টুকরার তাল হাতড়াতে-হাতড়াতে কি যেন ঠক করে তার পেছন থেকে গড়িয়ে মেঝের ওপর পড়ে গেল। ঘরের ভিতর অন্ধকার, ভালো দেখা যায় না—দুর্গা মেঝে থেকে উঠিয়ে নিয়ে বাইরে এসে বলল—ওমা, কীসের দুটো বড়ো বড়ো ডিম এখানে! এঃ, পড়ে একেবারে গুঁড়ো হয়ে গিয়েচে! দেখেচো কী পাখি ডিম পেড়েছে ঘরের মধ্যে, মা!

তার পর কী ঘটল, সেকথা না তোলাই ভালো। অপু সেদিন রাত্রে খেল না। কান্না…হইহই কাণ্ড। …তার মা ঘাটে গল্প করে—ছেলেটার যে কী কাণ্ড ! ওমা, এমন কথাও তো কখনো শুনিনি—শুনেচো সেজো ঠাকুরঝি, শকুনির ডিম নিয়ে নাকি মানুষে উড়তে পারে! ওই ওদের বাড়ির রাখাল ছোঁড়াটা—তাকে বুঝি বলেচে, সে কোত্থেকে দুটো কাগের না কীসের ডিম এনে বলেচে—এই নেও শকুনের ডিম। তাই নাকি আবার চার পয়সা দিয়ে কিনেচে তার কাছে ! ছেলেটা যে কি বোকা, সে আর কী বলব? কী করি যে এ-ছেলে নিয়ে আমি !

কিন্তু বেচারি সর্বজয়া কী করে জানবে? সকলেই তো কিছু 'সর্ব-দর্শন-সংগ্রহ' পড়েনি বা সকলেই কিছু পারদের গুণও জানে না।

আকাশে তা হলে তো সবাই উড়ত।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%