গ্রীষ্ম-দুপুর

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

অপুদের বাড়ি থেকে কিছু দূরে একটা খুব বড়ো অশ্বত্থ গাছ ছিল। কেবল তার মাথাটা ওদের দালানের জানলা কি রোয়াক থেকে দেখা যায়। অপু মাঝে-মাঝে সেদিকে চেয়ে চেয়ে দেখত। যতবার সে চেয়ে দেখে, ততবার তার যেন অনেক—অনেক দূরের কোনো দেশের কথা মনে হয়। কোন দেশ তা তার ঠিক ধারণা হত না—কোথায় যেন কোথাকার দেশ—মায়ের মুখে ওই সব দেশের রাজপুত্তুরদের কথাই সে শোনে!

অনেক দূরের কথায় তার শিশুমনে একটা বিস্ময়-মাখানো আনন্দের ভাবের সৃষ্টি করত। এবং সবচেয়ে কৌতুকের বিষয় এই যে, অনেক দূরের এই কল্পনা যখন তার মনকে অত্যন্ত চেপে যেন কোথায় নিয়ে গিয়ে ফেলছে, ঠিক সেই সময়েই মায়ের জন্য তার মন বড়ো কেমন করে উঠত, যেখানে সে যাচ্ছে সেখানে তার মা নেই, অমনি মায়ের কাছে যাবার জন্য মন আকুল হয়ে পড়ত। কতবার যে এরকম হয়েছে! আকাশের গায়ে অনেক দূরে একটা চিল উড়ে যাচ্ছে—ক্রমে ছোট্ট—ছোট্ট—আরও ছোট্ট হয়ে নীলুদের তাল গাছের উঁচু মাথাটা পেছনে ফেলে দূর আকাশে মিলে যাচ্ছে। চেয়ে দেখতে-দেখতে যেমন উড়ন্ত চিলটা দৃষ্টিপথের বার হয়ে যেত, অমনি সে চোখ নামিয়ে নিয়ে বারবাড়ি থেকে এক দৌড়ে রান্নাঘরের দাওয়ায় উঠে গৃহকার্যরত মাকে জড়িয়ে ধরত! মা বলত—দ্যাখো-দ্যাখো ছেলের কাণ্ড দ্যাখো! ছাড়—ছাড়—দেখেছিস সকড়ি হাত? …ছাড়ো মানিক আমার, সোনা আমার! তোমার জন্যে এই দ্যাখো চিংড়ি মাছ ভাজছি—তুমি যে চিংড়ি মাছ ভালোবাসো? হ্যাঁ, দুষ্টুমি করে না—ছাড়ো…

খাওয়া-দাওয়ার পর দুপুরবেলা তার মা কখনো কখনো জানালার ধারে আঁচল পেতে শুয়ে ছেঁড়া কাশীদাসী মহাভারতখানা সুর করে পড়ত। বাড়ির ধারে নারকেল গাছটাতে শঙ্খচিল ডাকত, অপু কাছে বসে হাতের লেখা ক-খ লিখতে-লিখতে একমনে মায়ের মুখে মহাভারত বিশেষত কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের কথা শুনতে-শুনতে তন্ময় হয়ে যায়। বেলা পড়লে, মা গৃহকার্যে উঠে গেলে, সে বাইরে এসে রোয়াকে দাঁড়িয়ে দূরের সেই অশ্বত্থ গাছটার দিকে এক-এক দিন চেয়ে দেখে—কর্ণ যেন ওই অশ্বত্থ গাছটার ওপারে, আকাশের তলে, অনেক দূরে কোথায় এখনও মাটি থেকে রথের চাকা দু হাতে প্রাণপণে টেনে তুলছে …রোজই তোলে… রোজই তোলে…

এক-একদিন মহাভারতের যুদ্ধের কাহিনি শুনতে-শুনতে তার মনে হয় যুদ্ধ জিনিসটা মহাভারতে বড়ো কম লেখা আছে। এই অভাব পূর্ণ করার জন্য এবং আশ মিটিয়ে যুদ্ধ জিনিসটা উপভোগ করার জন্য সে এক উপায় বার করেছে। একটা বাখারি কিংবা হালকা কোনো গাছের ডালকে অস্ত্র হিসাবে হাতে নিয়ে সে বাড়ির পেছনে বাঁশ বাগানের পথে অথবা বাইরের উঠানে ঘুরে বেড়ায় ও আপন মনে বলে—তারপর দ্রোণ তো একবারে দশ বাণ ছুড়লেন, অর্জুন করলেন কি একেবারে দুশোটা বাণ দিলেন মেরে! তারপর—ওঃ সে কী যুদ্ধ! কী যুদ্ধ—বাণের চোটে চারদিক অন্ধকার হয়ে গেল! তারপর অর্জুন করলেন কি, ঢাল আর তরোয়াল নিয়ে রথ থেকে লাফিয়ে পড়লেন—পরে এই যুদ্ধ! …দুর্যোধন এলেন—ভীম এলেন—বাণে বাণে আকাশ অন্ধকার করে ফেলেছে—আর কিছু দেখা গেল না !

গ্রীষ্মকালের দিনটা—বৈশাখের মাঝামাঝি।

নীলমণি রায়ের ভিটার দিকে জঙ্গলের ধারে সেদিন দুপুরের কিছু আগে দ্রোণগুরু বড়ো বিপদে পড়েছেন—কপিধবজ রথ একেবারে তাঁর ঘাড়ের উপরে, গাণ্ডীব ধনু থেকে ব্রহ্মাস্ত্র মুক্ত হওয়ার বিলম্ব চোখের পলক মাত্র, কুরুসৈন্যদলে হাহাকার উঠেছে—এমন সময় শ্যাওড়া বনের ওদিক থেকে হঠাৎ কে কৌতুকের কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল—ও কীরে অপু? অপু চমকে উঠে চেয়ে দেখল, তার দিদি জঙ্গলের মধ্যে দাঁড়িয়ে তার দিকে চেয়ে খিলখিল করে হাসছে। অপু চাইতেই বলল—হ্যাঁরে পাগলা, আপন মনে কী বকচিস বিড়বিড় করে, আর হাত-পা নাড়ছিস? পরে সে ছুটে এসে সস্নেহে ভায়ের কচি গালে চুমু খেয়ে বলল—পাগল! …কোথাকার একটা পাগল, কী বকছিলি রে আপন মনে?

অপু লজ্জিতমুখে বার-বার বলতে লাগল—যাঃ, বকছিলাম বুঝি? …আচ্ছা, যাঃ—

অবশেষে দুর্গা হাসি থামিয়ে বলল—আয় আমার সঙ্গে। পরে সে অপুর হাত ধরে বনের মধ্যে নিয়ে চলল। খানিক দূর গিয়ে হাসিমুখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলল—দেখেচিস? কত নোনা পেকেচে?… এখন কী করে পাড়া যায় বল দিকি?

অপু বলল—উঃ, অনেক রে দিদি ! —একটা কঞ্চি দিয়ে পাড়া যায় না?

i5

বাণের চোটে চারিদিক অন্ধকার হয়ে গেল

দুর্গা বলল—তুই এক কাজ কর, ছুটে গিয়ে বাড়ি থেকে আঁকশিটা নিয়ে আয় দিকি? আঁকশি দিয়ে টান দিলে পড়ে যাবে দেখিস এখন—

অপু বলল—তুই এখানে দাঁড়া দিদি, আমি আনচি—

অপু আঁকশি আনলে দু-জনে মিলে বহু চেষ্টা করেও চার-পাঁচটার বেশি ফল পাড়তে পারল না। খুব উঁচু গাছ, সর্বোচ্চ ডালে যে ফল আছে তা দুর্গা আঁকশি দিয়েও নাগাল পেল না। পরে সে বলল—চল আজ এগুলো নিয়ে যাই, নাইবার বেলায় মাকে সঙ্গে আনব, মার হাতে ঠিক নাগাল আসবে। দে নোনাগুলো আমার কাছে, তুই আঁকশিটা নে। নোলক পরবি?

একটা নীচু ঝোপের মাথায় ওড়কলমি লতায় সাদা সাদা ফুলের কুঁড়ি ছিঁড়তে লাগল। বলল—এদিকে সরে আয়, নোলক পরিয়ে দি। তার দিদি ওড়কলমি ফুলের নোলক পরতে ভালোবাসে, বনজঙ্গল সন্ধান করে সে প্রায়ই খুঁজে এনে নিজে পরে ও আগে কয়েকবার অপুকেও পরিয়েছে। অপু কিন্তু মনেমনে নোলক পরা পছন্দ করে না। তার ইচ্ছা হল বলে—নোলকে তার দরকার নেই। তবে দিদির ভয়ে সে কিছু বলল না। দিদিকে চটাবার ইচ্ছে তার আদৌ নেই, কারণ দিদিই বনজঙ্গল ঘুরে কুলটা, জামটা, নোনাটা, আমড়াটা সংগ্রহ করে তাকে লুকিয়ে খাওয়ায়, এমন সব জিনিস জুটিয়ে আনে, যা হয়তো কুপথ্য হিসাবে তাদের উভয়েরই খাওয়া নিষেধ আছে, কাজেই অন্যায় হলেও দিদির কথা না শোনা তার সাহসে কুলোয় না।

একটা কুঁড়ি ভেঙে সাদা জলের মতো যে আঠা বার হল, তার সাহায্যে দুর্গা অপুর নাকে কুঁড়িটি এঁটে দিল, নিজেও একটা পরল। তারপর ভাইয়ের চিবুকে হাত দিয়ে মুখ নিজের দিকে ভালো করে ফিরিয়ে বলল—দেখি, কেমন দেখাচ্চে? বাঃ বেশ হয়েচে—চল মাকে দেখাইগে।

অপু লজ্জিতমুখে বলল—না দিদি—

—চল না, খুলে ফেলিসনে যেন, বেশ হয়েচে !

বাড়ি এসে দুর্গা নোনাফলগুলি রান্নাঘরের দাওয়ায় নামিয়ে রাখল। সর্বজয়া রাঁধছিল— দেখে খুব খুশি হয়ে বলল—কোথায় পেলি রে?

দুর্গা বলল—ওই লিচু জঙ্গলে—অনেক আছে, কাল গিয়ে তুমি পাড়বে মা? এমন পাকা—একেবারে সিঁদুরের মতো রাঙা। সে আড়াল ছেড়ে দাঁড়িয়ে বলল—এদিকে দ্যাখো মা —

অপু নোলক পরে দিদির পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। সর্বজয়া হেসে বলল—ও মা ! ও আবার কে রে? কে —চিনতে তো পারচি নে!

অপু লজ্জায় তাড়াতাড়ি নাকের ডগা থেকে ফুলের কুঁড়ি খুলে ফেলে। বলল—ওই দিদি পরিয়ে দিয়েচে।

দুর্গা হঠাৎ বলে উঠল—চল রে অপু, ওই কোথায় ডুগডুগি বাজচে, চল, বাঁদর খেলাতে এসেছে ঠিক, শিগগির আয়। আগে-আগে দুর্গা ও তার পেছনে-পেছনে অপু ছুটে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। সামনের পথ ধরে—বাঁদর নয়, ও-পাড়ার চিনিবাস ময়রা মাথায় করে খাবার ফেরি করতে বার হয়েছে। চিনিবাস হরিহর রায়ের দুয়ার দিয়ে গেলেও এ বাড়ি ঢুকল না। কারণ, সে জানে এ বাড়ির লোক কখন কিছু কেনে না। তবুও দুর্গা-অপুকে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞাসা করল—চাই নাকি?

অপু দিদির মুখের দিকে তাকাল। দুর্গা চিনিবাসের দিকে ঘাড় নেড়ে বলল—নাঃ।

চিনিবাস ভুবন মুখুজ্জের বাড়ি গিয়ে মাথার চাঙারি নামাতেই বাড়ির ছেলে-মেয়েরা কলরব করতে করতে তাকে ঘিরে দাঁড়াল। ভুবন মুখুজ্জে অবস্থাপন্ন লোক, বাড়িতে পাঁচ-ছ-টা গোলা আছে।

ভুবন মুখুজ্জের স্ত্রী বহুদিন মারা গেছেন। এখন তাঁর সেজো ভাইয়ের বিধবা-স্ত্রী সংসারের কর্ত্রী। বয়স চল্লিশের ওপর হবে, অত্যন্ত কড়া মেজাজের মানুষ বলে তাঁর খ্যাতি আছে।

সেজো-বউ একখানা মাজা পিতলের রেকাবিতে চিনিবাসের কাছ থেকে মুড়কি, সন্দেশ, বাতাসা দশহরা পূজার জন্য নিলেন। ভুবন মুখুজ্জের ছেলে-মেয়ে ও তাঁর নিজের ছেলে সুনীল সেখানেই দাঁড়িয়েছিল, তাদের জন্যও খাবার কিনলেন। পরে অপুকে সঙ্গে নিয়ে দুর্গা চিনিবাসের পেছন-পেছন ঢুকে উঠানে এসে দাঁড়িয়ে আছে দেখে সেজো-বউ নিজের ছেলে সুনীলের কাঁধে হাত দিয়ে একটু ঠেলে বলল—যাও না, রোয়াকে উঠে গিয়ে খাও না। এখানে ঠাকুরের জিনিস, মুখ থেকে ফেলে এঁটো করে বসবে!

চিনিবাস চাঙাড়ি মাথায় তুলে অন্য বাড়ি চলল। দুর্গা বলল—আয় অপু, চল দেখিগে টুনুদের বাড়ি।

এরা সদর দরজা পার হতেই সেজো-বউ মুখ ঘুরিয়ে বলে উঠলেন—দেখতে পারিনে বাপু, ছুঁড়িটার যে কী হ্যাংলা স্বভাব ! নিজের বাড়ি আছে, গিয়ে বসে কিনে খেগে যা না?  তা না, লোকের দোর-দোর—যেমনি মা তেমনি ছা।

এদের বাড়ি থেকে বার হয়ে দুর্গা ভাইকে আশ্বাস দেবার সুরে বলল—চিনিবাসের ভারী তো খাবার! বাবার কাছ থেকে দেখিস রথের সময় চারটে পয়সা নেব—তুই দুটো, দুটো,আমি দুটো। তুই আর আমি মুড়কি কিনে খাব।

খানিকটা পরে ভেবে-ভেবে অপু জিজ্ঞাসা করল—রথের আর কতদিন আছে রে দিদি?

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%