সোনার কৌটো

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

দিন কয়েক পরে। ভুবন মুখুজ্জের বাড়ি রানুর দিদির বিয়ে শেষ হয়ে গিয়েছে বটে, কিন্তু এখনও কুটুম্ব-কুটুম্বিনীরা সকলে যাননি। ছেলে-মেয়েও অনেক। একটি ছোট্ট মেয়ের সঙ্গে দুর্গার বেশ আলাপ হয়েছে, তার নাম টুনি। সন্ধ্যার একটু আগে সেজো-ঠাকরুন এঘরে কী কাজ কচ্ছেন, টুনির মায়ের গলা তাঁর কানে গেল। সেজো-ঠাকরুন দালানে এসে বললেন—কী রে হাসি, কী? টুনির মা উত্তেজিতভাবে ও ব্যস্তভাবে বিছানাপত্র, বালিশের তলা হাতড়াচ্ছে, উঁকি মারছে, তোশক উলটিয়ে ফেলেছে, বলল—এই একটু আগে আমার সেই সোনার সিঁদুর-কৌটো এই বিছানার পাশে এইখানটায় রেখেছি, খোকা দোলায় চেঁচিয়ে উঠল—আর তুলতে মনে নেই, কোথায় গেল আর তা পাচ্ছিনে !

সেজো-ঠাকরুন বললেন—ওমা, সে কী? হাতে করে ওঘরে নিয়ে যাসনি তো?

—না সেজদি, এইখানে রেখে গেলুম। বেশ মনে আছে, ঠিক এইখানে।

সকলে মিলে খানিকক্ষণ চারদিকে খোঁজাখুঁজি করা হল—কৌটোর সন্ধান নেই। সেজো-ঠাকরুন জিজ্ঞেস করে জানলেন, দালানে প্রথমটা এ বাড়ির ছেলে-মেয়েরা ছিল, তারপর খাবার খাওয়ার ডাক পড়লে ছেলে-মেয়েরা সব খাবার খেতে যায়, তখন বাইরের লোকের মধ্যে ছিল দুর্গা! সেজো-ঠাকরুনের ছোটো মেয়ে টেঁপি চুপিচুপি বলল—আমরা যেই খাবার খেতে গেলাম, তখন দেখি দুগগাদি খিড়কি-দোর দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে, এই মাত্তর আবার এসেচে।

সেজো-ঠাকরুন চুপিচুপি কি পরামর্শ করলেন, পরে রুক্ষস্বরে দুর্গাকে বললেন—কৌটো দিয়ে দে দুগগা, কোথায় রেখেচিস বল—বার কর এক্ষুনি বলচি—

দুর্গার মুখ শুকিয়ে এতটুকু হয়ে গিয়াছিল, সেজো-ঠাকরুনের ভাবভঙ্গিতে তার জিভ যেন মুখের মধ্যে জড়িয়ে গেল। সে অস্পষ্টভাবে কী বলল, ভালো বোঝা গেল না।

টুনির মা এতক্ষণ কোনো কথা বলেনি, একজন ভদ্রঘরের মেয়েকে সকলে মিলে চোর বলে ধরাতে সে একটু অবাক হয়ে গিয়েছিল। বিশেষত দুর্গাকে সে ক-দিন এখানে দেখছে—দেখতে বেশ, কথাবার্তা ভালো বলে দুর্গাকে পছন্দ করে—সে চুরি করবে তা কি সম্ভব? টুনির মা বলল—ও নেয়নি বোধ হয় সেজদি, ও কেন—

সেজো-ঠাকরুন বললেন—তুমি চুপ করে থাকো না ! তুমি ওর কি জানো, নিয়েচে কি না নিয়েচে? আমি জানি ভালো করে। একজন বললেন—তা নিয়ে থাকিস বের করে দে না, নয়তো কোথায় আছে বল—আপদ চুকে গেল। দিয়ে দে লক্ষ্মীটি, কেন মিথ্যে—

দুর্গা যেন কেমন হয়ে গিয়েছিল, তার পা ঠকঠক করে কাঁপছিল, সে দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে বলল—আমি তো জানিনে কাকিমা—আমি তো—

সেজো-ঠাকরুন বললেন—বললেই আমি শুনব? ঠিক ও নিয়েচে, ওর ভাব দেখেই আমি বুঝতে পেরেচি। আচ্ছা, ভালো কথায় বলচি—কোথায় রেখেচিস দিয়ে দে। জিনিস দিয়ে দাও তো কিছু বলব না—আমার জিনিস পেলেই হল। সেই কুটুম্বিনী বললেন—ভদ্দর লোকের মেয়ে চুরি করে, কোথাও শুনিনি তো কখনো। এ পাড়াতেই বাড়ি নাকি?

সেজো-ঠাকরুন বললেন—তুমি ভালো কথার কেউ নও। দেখবে তুমি মজাটা একবার, তুমি আমার বাড়ির জিনিস নিয়ে হজম কত্তে গিয়েচ—এ কী যা তা পেয়েচ বুঝি? তোমায় আমি আজ—

পরে তিনি দুর্গার হাতটা ধরে হিড়হিড় করে টেনে তাকে দালানের ঠিক মাঝখানে এনে বললেন—দুর্গা, বল এখনো কোথায় রেখেছিস? …বলবি নে? …না, তুমি জানো না, তুমি কচি খুকি—তুমি কিচ্ছু জানো না ! শিগগির বল, নইলে নোড়া দিয়ে দাঁতের পাটি ভেঙে গুঁড়ো করে ফেলব এখুনি ! বল, শিগগির—বল এখনো বলচি।

টুনির মা হাত ছাড়াতে এগিয়ে আসছিল, একজন বললেন—রোসো না, দেখচো না ও-ই ঠিক নিয়েচে ! চোরের মারই ওষুধ—দিয়ে দাও, এখুনি মিটে গেল ! কেন মিথ্যে…দুর্গার মাথার মধ্যে কেমন করছিল ! সে অসহায়ভাবে চারদিকে চেয়ে অতিকষ্টে শুকনো জিভে জড়িয়ে উচ্চারণ করল—আমি তো জানিনে কাকিমা, ওরা সব চলে গেলে আমিও তো…কথা বলার সময় ভয়ে সে আড়ষ্ট হয়ে সেজো-ঠাকরুনের দিকে চোখ রেখে দেয়ালের দিকে ঘেঁষে যেতে থাকল।

পরে সকলে মিলে আরও খানিকক্ষণ তাকে বোঝাল। তার সেই এক কথা—সে জানে না।

কে একজন বলল—পাকা চোর!

টেঁপি বলিল—বাগানের আমগুলো ওর জ্বালায় তলায় পড়বার যো নেই কাকিমা !

এই কথাতেই বোধ হয় সেজো-ঠাকরুনের কোনো লুকোনো ব্যথায় ঘা লাগল। তিনি হঠাৎ বাজখাঁই রকমের আওয়াজ ছেড়ে বলে উঠলেন—তবে রে পাজি, নচ্ছার, চোরের ঝাড়, তুমি জিনিস দেবে না? দেখি তুমি দেও কি না দেও ! …কথা শেষ না করেই তিনি দুর্গার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তার মাথাটা সজোরে দেয়ালে ঠুকতে লাগলেন। বল কোথায় রেখেছিস—বল শিগগির, বল।

i21

এঃ, রক্ত পড়চে যে

টুনির মা তাড়াতাড়ি ছুটে এসে সেজো-ঠাকরুনের হাত ধরে বলল—করেন কী, করেন কী সেজদি ! থাকগে আমার কৌটো, ওরকম করে মারেন কেন? ছেড়ে দিন, থাক হয়েচে, ছাড়ুন, ছিঃ ! টুনি মার দেখে কেঁদে উঠল। কুটুম্বিনীটি বললেন—এঃ, রক্ত পড়চে যে !

দুর্গার নাক দিয়ে ঝর-ঝর করে রক্ত পড়ছে আগে কেউ লক্ষ করেনি। বুকের কাপড়ের খানিকটা রক্তে রাঙা হয়ে উঠেছে।

টুনির মা বললেন—শিগগির একটু জল নিয়ে আয় টেঁপি, রোয়াকের বালতিতে আছে দ্যাখ।

চেঁচামেচি ও হইচই শুনে পাশের বাড়ির কামারদের ঝি-বউরা ব্যাপার কী দেখতে এল। রানুর মা এতক্ষণ ছিলেন না—দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর কামার বাড়ি বসে গল্প করছিলেন, তিনিও এলেন।

মারের চোটে দুর্গার মাথার মধ্যে ঝিমঝিম করছিল, সে দিশেহারাভাবে ভিড়ের মধ্যে একবার চেয়ে কি দেখল।

জল এলে রানুর মা তার চোখে-মুখে জল দিয়ে তাকে ধরে বসালেন। তার মাথার মধ্যে কেমন করছিল, সে দিশাহারাভাবে বসে পড়ল। রানুর মা বললেন—এমন করে কী মারে সেজদি ! …রোগা মেয়েটা—ছিঃ।

—তোমরা ওকে চেনোনি এখনো ! চোরের মার ছাড়া ওষুধ নেই—এই বলে দিলুম। মারের এখনো হয়েছে কী, জিনিস না পাওয়া গেলে, অমনি ছাড়ব নাকি? হরি রায় আমায় যেন শূলে-ফাঁসে দেয় এরপর।

রানুর মা বললেন—খুব হয়েচে, এখন একটু সামলাতে দাও সেজদি। যে কাণ্ড করেচো। টুনির মা বলল—ওমা, এত কাণ্ড হবে জানলে কে কৌটোর কথা বলত? বাবা, চাইনে আমার কৌটো, ওকে তুমি ছেড়ে দাও সেজদি।

সেজো-ঠাকরুন এত সহজে ছাড়তেন কিনা বলা যায় না, কিন্তু জনমত তাঁর বিরুদ্ধে রায় দিতে লাগল। কাজেই তিনি আসামিকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হলেন।

রানুর মা তাকে ধরে ওদিকের দরজা খুলে খিড়কির উঠোনে বার করে দিলেন, বললেন—ভালো ক্ষণে আজ বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলি যা হোক ! যা, আস্তে-আস্তে যা, টেঁপি খিড়কিটা ভালো করে খুলে দে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%