বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
কয়েক মাস কেটে গেছে। ভাদ্র মাস।
অপু বিকাল বেলা বেড়াতে যাবার সংকল্প করছে, এমন সময় তার মা পিছনে ডেকে বলল—কোথায় বেরুচ্চিস রে অপু? চাল-ভাজা আর ছোলা-ভাজা ভাজচি—বেরিয়ো না যেন ! এক্ষুনি খাবি।
অপু শুনেও শুনল না। যদিও সে চাল-ছোলা-ভাজা খেতে ভালোবাসে বলেই মা তার জন্য ভাজতে বসেছে, তা সে জানে, তবু সে কী করতে পারে? এতক্ষণ কী খেলাটাই না চলছে নীলুদের বাড়িতে? সে যখন বার দরজায় পা দিয়েছে, মা-র ডাক আবার কানে গেল—বেরুলি বুঝি? ও অপু, বা রে দ্যাখো মজা ছেলের ! গরম-গরম খাবি, আমি ঘাট থেকে তাড়াতাড়ি এসে ভাজতে লাগলাম ! ও অপু-উ-উ—
অপু এক ছুট দিয়ে নীলুদের বাড়ি গিয়ে পৌঁছোল। অনেক ছেলে জুটেছিল, অপু আসবার আগেই খেলা সাঙ্গ হয়ে গেছে। নীলু বলল—চল অপু, দক্ষিণ মাঠে পাখির ছানা দেখতে যাবি? অপু রাজি হলে দু-জনে দক্ষিণ মাঠে গেল। ধান খেতের ওপারেই নবাবগঞ্জের বাঁধা সড়কটি পূর্ব-পশ্চিমে লম্বা হয়ে যেন মাঠের মাঝখান চিরে চলে গেছে। গ্রাম থেকে এক মাইলের ওপর হবে। অপু এতদূর কখনো বেড়াতে আসেনি, তার মনে হল যেন সমস্ত পরিচিত জিনিসের গণ্ডি ছাড়িয়ে কোথায় কতদূরে নীলুদা তাকে টেনে আনল ! একটুখানি পরেই সে বলল—বাড়ি চল নীলুদা, আমার মা বকবে, সন্দে হয়ে যাবে, আমি একা গাবতলার পথ দিয়ে যেতে পারব না। তুমি বাড়ি চল।
ফিরতে গিয়ে নীলু পথ হারিয়ে ফেলল। ঘুরে-ফিরে কাদের একটা বড়ো আমবাগানের ধার দিয়ে একটা পথ মিলল। সন্ধ্যা হওয়ার তখনও কিছু বিলম্ব আছে, আকাশে আবার মেঘ ঘনিয়ে আসছে , এমন সময় চলতে চলতে নীলু হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে অপুর কনুই-এ টান দিয়ে সম্মুখের দিকে চেয়ে ভয়ের সুরে বলল—ও ভাই অপু!
অপু সঙ্গীর ভয়ের কারণ বুঝতে না পেরে বলল—কীরে নীলুদা? পরে সে চেয়ে দেখল, যে সুঁড়ি পথটা দিয়ে তারা চলছিল, তা কাদের উঠানে গিয়ে শেষ হয়েছে, উঠানে একখানা ছোট্ট চালাঘর ও এক পাশে একটা বিলাতি আমড়ার গাছ। তার কোনো কথা জিজ্ঞাসা করার আগেই নীলু ভয়ের সুরে বলে উঠল—আতুরী ডাইনির বাড়ি !
অপুর মুখ শুকিয়ে গেল। আতুরী ডাইনির বাড়ি ! সন্ধ্যাবেলা কোথায় তারা এসে পড়েছে ! কে না জানে যে, ওই উঠানের গাছ থেকে চুরি করে বিলিতি আমড়া পাড়ার অপরাধে ডাইনিটা জেলেপাড়ার কোনো এক ছেলের প্রাণ কেড়ে নিয়ে কচুপাতায় বেঁধে জলে ডুবিয়ে রেখেছিল, পরে মাছে তা খেয়ে ফেলবার সঙ্গে-সঙ্গে বেচারির আমড়া খাওয়ার সাধ এ জন্মের মতো মিটে যায়। কে না জানে, সে ইচ্ছা করলে চোখের চাউনিতে ছোটো ছেলেদের রক্ত চুষে খেয়ে তাকে ছেড়ে দিতে পারে? যার রক্ত খাওয়া হল, সে কিছু জানতে পারবে না, কিন্তু বাড়ি গিয়ে খেয়ে-দেয়ে সেই যে বিছানায় শোবে—আর পরদিন উঠবে না ! কতদিন শীতের রাতে লেপের তলায় শুয়ে দিদির মুখে আতুরী ডাইনির গল্প শুনতে-শুনতে সে বলেছে—রাত্তিরে তুই ওসব গল্প বলিসনে দিদি, আমার ভয় করে—তুই সেই কুচবরণ রাজকন্যের গল্পটা বল দিকি !
ঝাপসা দৃষ্টিতে সে সম্মুখে চেয়ে দেখতে গেল বাড়িতে কেউ আছে কিনা, এবং চাইবার সঙ্গে-সঙ্গেই তার সমস্ত শরীর যেন জমে হিম হয়ে গেল ! বেড়ার বাঁশের আগড়ের কাছে অন্য কেউ নয় একেবারে স্বয়ং আতুরী ডাইনিই তাদের—এমনকী যেন শুধু তারই দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে আছে!
যার জন্য এত ভয়, তাকে একেবারে সামনেই এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অপুর সামনে- পেছনে কোনো দিকেই পা উঠত চাইল না !
আতুরী বুড়ি ভুরু কুঁচকে, তোবড়োনো গালটা যেন আরও ঝুলিয়ে, ভালো করে লক্ষ করবার ভঙ্গিতে মুখটা সামনের দিকে একটু বাড়িয়ে দিয়ে পায়ে-পায়ে তাদের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল ! অপু দেখল সে ধরা পড়েছে, কোনো দিকেই আর পালাবার পথ নেই। যে কারণেই হোক ডাইনির রাগটা যেন তার ওপর বেশি—এখনই তার প্রাণটি সংগ্রহ করে বোধ হয় কচুর পাতায় পুরবে।
মুখের খাবার ফেলে, মায়ের ডাকের ওপর ডাক উপেক্ষা করে সে আজ মায়ের মনে যে কষ্ট দিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে এসেছে, তার ফল এইবার ফলতে চলল! সে অসহায়ভাবে চারদিকে চেয়ে বলল—আমি কিছু জানিনে, ও বুড়ি পিসি, আমি আর কিছু করব না, আমায় ছেড়ে দাও, আমি ইদিকে আর কখনো আসব না—আজ ছেড়ে দাও, ও বুড়ি পিসি!

...উঠানে একখানা ছোট্ট চালাঘর ও এক পাশে একটা বিলাতি আমড়ার গাছ
নীলু তো ভয়ে প্রায় কেঁদে ফেলল, কিন্তু অপুর ভয় এত হয়েছিল যে, চোখে তার জল ছিল না।
বুড়ি বলল—ভয় কী মোরে, ও বাবারা? মোরে ভয় কী? পরে খুব ঠাট্টা করা হচ্ছে ভেবে হেসে বলল—মুই কি ধরে নেব খোকারা? এসো মোর বাড়িতি এসো—আমচুর দেবানি, এসো।
আমচুর ! …ডাইনি বুড়ি ফাঁকি দিয়ে ভুলিয়ে বাড়িতে পুরতে চাইছে—গেলেই আর কি…! ডাইনিরা রাক্ষসীরা যে এরকম ভুলিয়ে ফাঁদে ফেলে—এরকম কত গল্প তো সে মা-র মুখে শুনেছে।
এখন সে কী করে!… উপায়?
বুড়ি তার দিকে আরও খানিক এগিয়ে আসতে-আসতে বলল—ভয় কী মোরে ও বাবারা? মুই কিছু বলব না, ভয় কী মোরে?
আর কী, সব শেষ ! মায়ের কথা না শোনার ফল ফেলতে আর দেরি নেই, হাত বাড়িয়ে তার প্রাণটা সংগ্রহ করে এখনি কচুর পাতায় পুরল বলে ! সে আড়ষ্টকণ্ঠে দিশাহারাভাবে বলে উঠল—ও বুড়ি পিসি, আমার মা কাঁদবে, আমায় আজ আর কিছু বলো না। আমি তোমার গাছে কোনো দিন আমড়া নিতে আসিনি—আমার মা কাঁদবে।
আতঙ্কে সে নীলবর্ণ হয়ে উঠেছে। বাড়ি, ঘরদোর, গাছপালা, নীলু, চারধার যেন ধোঁয়া-ধোঁয়া ! কেউ কোনোদিকে নেই—কেবল একমাত্র সে আর আতুরী ডাইনির ত্রূর-দৃষ্টি-মাখানো একজোড়া চোখ...আর অনেক দূরে কোথায় যেন মা আর তার চাল-ভাজা খাওয়ার ডাক !
পরক্ষণেই কিন্তু অত্যধিক ভয়ে তার একরকম মরিয়া-সাহস জোগাল, একটা অস্পষ্ট আর্তনাদ করে প্রাণভয়ে দিশাহারা অবস্থায় সে সম্মুখের ভাঁট, শ্যাওড়া, রাংচিতার জঙ্গল ভেঙে ডিঙিয়ে সন্ধ্যার আসন্ন অন্ধকারে যেদিকে দুই চোখ যায় ছুটল। নীলুও ছুটল তার পেছনে পেছনে।
এদের এত ভয়ের কারণ কী বুঝতে না পেরে বুড়ি ভাবল—মুই মাত্তিও যাইনি, ধত্তিও যাইনি—কাঁচা ছেলে, কী জানি মোরে দেখে কেন ভয় পালে সন্দেবেলা? খোকাডা কাদের?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন